মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

গীতা দাসের গল্প : নাগরিক প্রথা

আকাশী এখন ময়নার মা, কাজের লোক,ঠিকা ঝি,ছুটা বুয়া।প্রতিদিন ফ্ল্যাট এ টু বাসায় কলিং বেল টিপেই অন্যান্য দরজার বাইরে মনোযোগ দিয়ে দেখে।দেখে জুতার বাহার।পাপোছের উপরে জুতার সারি দেখেই বুঝা যায় ফ্ল্যাট এ টু বাসায় কতজন ইস্টি এসেছে। 

সাধারণত এ টু বাসার দরজায় দশটা থেকে এগারোটা বা সাড়ে দশটা থেকে সাড়ে এগারোটা, অথবা কোন কোন দিন অন্য সময় অর্থাৎ দশটা থেকে বারটার মধ্যেই এক ঘন্টার জন্য ছুটা বুয়া ময়নার মায়ের এক জোড়া পঞ্জের স্যান্ডেল থাকে। এছাড়া জুতা থাকে না, সব ঘরে নিয়ে যায়।কাজেই এর বাইরে জুতার জোড়াই বলে দেয় ইষ্টি কতজন। 

ফ্ল্যাট সি টু এর দরজার পাশে একটা স্টিলের আলনা।এর উপরে এক জোড়া স্যান্ডেল প্রায়শ:ই থাকে।এছাড়া বাড়তি কোন জুতা দরজার বাইরে থাকে না।ডি টু এর দরজার বাইরে কখনো কোন জুতা থাকে না।বি টু এর দরজার জুতা দেখে কিছুই ঠাহর করা যায় না। চার পাঁচ জোড়া জুতা বাইরে থাকা সাধারণ চিত্র। কখনো কখনো এর বেশিও থাকে। 

আর বাসায় ইষ্টি আসলে দরজার বাইরে জুতার টিলা। আবার কখনো কোন জুতাই বাইরে থাকে না। বি টু দরজার বাইরে জুতার নির্দিষ্ট চিত্র নেই। 

ময়নার মা ফ্ল্যাট এ টুতে কলিং বেল টিপল। কলিং বেল টিপে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে শুনতে পাচ্ছে গৃহকর্ত্রী খালাম্মা মোবাইল ফোনে কথা বলছে। 

আর বইলেন না আপা, এখনো আসার নাম নাই। তিন চার বাসায় কাজ করে। বাসায় ঢুকেই কি তাড়াহুড়া। কখন যাবে ! 

ময়নার মা এমনিতে খালি হাতে কাজ করতে আসে। কোন পুটলা পুটলি নিয়ে আসে না। হাতে কিছু থাকলে খালাম্মারা সন্দেহের চোখে দেখে। কিন্তু আজ হাতে একটা পুটুলি নিয়ে কলিং বেল টিপে। পুটুলিটা একটা কাপড়ের ব্যাগে গিট্টু দিয়ে বানানো।এ কাপড়ের ব্যাগটা এ খালাম্মার বাসা থেকেই দেয়া। একদিন একটা আইসক্রিমের খালি বাক্সে বিরানী ভরে এ ব্যাগে দিয়েছিলেন।আজ ব্যাগে অন্য কিছু নিয়ে এসেছে। পুরো শীত ময়নার মা এ ব্যাগ নিয়ে প্রত্যেকের বাসায় কাজে যাবে। এখন চিন্তা তা খালাম্মারা মানবে কি না।আজ ঘরে ঢুকেই পুটুলিটা দরজার কাছে সোফার নিচে রাখে। 

খালাম্মা অন্যদিনের মতোই দরজা খুলে চলে যায়। দরজাটা সাধারণত ময়নার মা বন্ধ করে। আজও তাই করল। খালাম্মা ফোনে কথা বলতে বলতে দরজা খুলেছে। তবে, কথাবার্তায় মশগুল বলে ময়নার মায়ের হাতের দিকে খেয়াল করেনি। বা খেয়াল করলেও কিছু বলেনি। 

আজ কথা বলতে বলতেই খালাম্মা দরজা খুলে দিলেও টেলিফোনের কথাবার্তা চলতেই থাকে। কথাবার্তায় ময়না মা স্পষ্টই বুঝতেই পারে কথার বিষয় সে। 

ওপাশ থেকে কি যেন বললে এপাশ থেকে উত্তর, মোবাইল ফোন নাই। আজকাল মোবাইল ফোন ছাড়া চলে? মাঝে মাঝেই কোন হদিস পাই না-- আসবে কি আসবে না। 

ঐপাশ থেকে আবার কিছু একটা বলার পর এপাশ থেকে খালাম্মা নিজের রুমে যেতে যেতে বলে, হ্যাঁ, হুট করেই মোবাইল বন্ধ রাখলেও আপনি তো মোবাইওয়ালী পেয়েছেন। 

পুটুলি নিয়ে অস্বস্থির মধ্যেই ময়নার মা বাথরুমে কাপড় ভিজিয়ে রাখে।পরে সোফা ঝেড়ে,অন্যান্য ফার্নিচার পরিস্কার করে,ঘর মুছে পরে কাপড় ধুয়ে বারান্দায় ছড়িয়ে দিয়ে যায়। 

তিন বাসায় কাজ করে। সব খালাম্মারই একই রকম মেজাজ মর্জি। তাদের কথাবার্তা ময়নার মা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দেয়।কানের ভিতর দিয়া মরমে পশায় না। অভিযোগের কোন উত্তর দেয় না। প্রতিবাদও করে না। খালাম্মাদের দেমাগ হলো ভাত ছড়ালে কাকের অভাব? ঢাকা শহরে সব সময় বাসায় থাকার জন্য বিশ্বস্থ কাউকে না পাওয়া গেলেও ছুটা বুয়ার কোন সমস্যা নেই।ভাত ছিঁটালে কাকের অভাব নেই যেমন সত্য,এর চেয়ে দ্বিগুণ সত্য নিজের কোমড়ে জোর থাকলে কামেরও অভাব নাই।তবে মুখে ময়নার মা কিছুই বলে না। 

মায়নার মা যে টেন পর্যন্ত পড়েছে তা কাউকে বলে না। এক বিষয়ে টেস্টে ফেল করেছিল বলে ফর্ম ফিলাপে স্কুল বেশি টাকা চেয়েছিল। মোটে মায় রান্ধে না ততা আর পান্তা। এমনেই টাকা নেই, আবার বেশি টাকা।অন্যরা টেস্টে দুই তিন বিষয়ে ফেল করেও বেশি টাকা দিয়ে ফর্ম ফিলাপ করে এস এস সি পাশ করেছিল। 

শিক্ষকরা কোচিং করাবেন বলে বেশি টাকা। বেশি বিষয়ে ফেল। বেশি কোচিং। বেশি টাকা। টাকার জন্য এস এস সি পরীক্ষা দিতে পারেনি। এ খবর বলে লাভ নেই। ছুটা বুয়া টেন পর্যন্ত পড়েছে তা গৃহকর্তৃদের কাছে অষ্টম আশ্চর্যজনক খবর হবে। অবিশ্বাসের চোখে তাকাবে। কাজের বুয়া কখনো কোন কাজে বুদ্ধির পরিচয় দিলে খালাম্মাদের কন্ঠ স্বরে রাজ্যের বিরক্তি প্রকাশ পায়। 

ছুটির দিনে খালাম্মার দুই ছেলেমেয়ে ভাইজান আর আপার কথাবার্তা, আলাপ আলোচনা ময়নার মা কিছু কিছু বুঝে। কিন্তু কখনই বুঝার অনুভুতি প্রকাশ পায় না। করে না। 

ঘর মুছতে মুছতে ভাইবোনের কথা শুনছিল। জমিদারী প্রথায় প্রজারা পায়ে জুতা পরে জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া বেয়াদপী ছিল। জুতা হাতে নিয়ে জমিদার বাড়ির সীমানা পার হতে হতো। এখনও এ ধরণের কিছু নিয়ম নাকি চা বাগানে আছে। কুলীদের বড় কর্মকর্তাদের বাড়ির সীমানায় জুতা পায়ে প্রবেশ নিষেধ। 

ময়নার মায়ের মনে মনে রাগ উঠলেও মুখ দিয়ে কিছু বের হয়নি।শীতে গ্রীস্ম বর্ষায় ময়নার মায়ের জুতা জোড়া দরজার বাইরে অপেক্ষমান থাকে।নিজে মেঝে ঝকঝকে তকতকে ফকফকে রাখে।বাসার সবাই তাগদ পা জুতার উমে তকতকে মেঝেতে হাঁটাহাঁটি করে। কিন্তু শীতে দরজার বাইরে স্যান্ডেল খুলে ট্যালকা মেঝেতা পা রাখলেই ময়নার মায়ের গা কাঁপুনি ধরে।পায়ে জুতা পা না দিলে নাকের আগা স্যাতস্যাতে থাকে।কিন্তু এ শহরে বাসার ভিতরে কোন বাসায় কাজের লোক,ঠিকা ঝি, ছুটা বুয়ার স্যান্ডেল বা জুতা পরে কাজ করা মেনে নেয় না। 

রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসা, শুধু কি রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসে। এ জুতা নিয়েই পায়খানাসহ কোথায় কোথায় যায়।কাজেই কাজের বুয়ার জুতা বাসার ভিতরে ঢুকানো নিষেধ। যেমন নিষিদ্ধ ছিল জুতা পায়ে প্রজাদের জমিদার-প্রাসাদ পার হওয়া। 

ময়নার মা খবরে শুনেছে শীত আরও ঝাঁকিয়ে নামবে।মনে মনে বুদ্ধি খুঁজে শীতে কীভাবে বাসা বাড়ির চাকরি করবে। জুতা পায়ে না দিলে ট্যালকা বেশি লাগবে। এখনই জুতা পা থেকে খুলে মেঝেতে রাখতেই ট্যালকায় গলা জমে আসে।গা শিরশির ঝির ঝির করে।দাঁত ঠোঁটে ঘষা লাগে। 

তার এমনিতেই ঠান্ডার বাতিক।খালি পায়ে আরও বেশি লাগবে।একদিন কাজে না আসলেই প্যানাপ্যানি। কেন আসেনি তা শোনার কোন প্রয়োজন বা বোধ কাজ করে না। একটা বুদ্ধি অবশ্য মাথায় ঢুকার সাথে সাথেই একজোরা নতুন স্যান্ডেল কিনেছে।আজ পুটলিতে করে নিয়ে এসেছে, কিন্তু খুলেনি। 

ভেবেই রেখেছে খালাম্মার ছেলে মেয়ের ছুটির দিন ময়না এ কাজটি করবে। ভাইবোন দুজনই ময়নার মায়ের খোঁজ খবর নেয়।তার ছেলেমেয়ে স্কুলে যায় কি না ইত্যাদি। 

আজ শুক্রবার। দুজনেই বাসায় আছে ভেবেই পুটুলিতে জুতা জোড়া। ভাইবোন বাসায় থাকলে তাদেরই একজন দরজা খোলে। কিন্তু খালাম্মা দরজা খুলাতে পুটুলিটা খোলার সুযোগ ও স্বস্তি পায়নি। তবে আগামীকাল শনিবারেও ভাইবোন বাসায় থাকবে। আর দরজা যে ই খুলুক, ঘরে পা রেখেই পুটুলি থেকে জুতা খুলে পরে নেবে।

৩টি মন্তব্য:

  1. অত্যন্ত জীবন ঘনিষ্ঠ লেখা। গৃহকর্মীদের জীবন প্রত্যক্ষে লেখকের তীক্ষ্ণ এবং দরদী মনের পরিচয় ফুটে ওঠেছে... পাঠক হিসেবে বিষয়টা খুব ছুঁয়ে গেলো। সুন্দর ছিমছাম একটা গল্পের জন্য গীতাদি রে উত্তম জাঝা! আমাদের জন্য আরো লিখবেন আশা করি।

    উত্তরমুছুন
  2. এত নরম ভাষা! নরম একটা গল্প। সুন্দর।

    উত্তরমুছুন