মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

সাগুফতা শারমীন তানিয়া'এর গল্প : কূর্মবৃত্তি, আরেকরকম

ছুটির দিনের সকালবেলা চুনি আর চুনির দাদাজানের এই কানাগলির বাসায় কেউ আসে না, তারাও কোত্থাও যায় না। কেউ তাদের চায় না, তারাও কোথাও অনাহুত হয়ে ধরা দেয় না। দু’জনেই ক্ষেপা, মাথার দোষ আছে বলে লোকে। কথা বলতে গেলে হয় সানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলে, নয় বায়ূগ্রস্তের শূন্য চাহনি নিয়ে বসেই থাকে,ঘন্টা কাটলেও রা কাড়ে না। চুনি এবং চুনির দাদাজান উভয়েই অত্যন্ত অজনপ্রিয়। চুনি ইস্কুলে মারপিট করে, অল্পবিস্তর হাতটানও, ঝগড়ায় চুনি কদাচ পিছু হটে না। বর্ষার পর থেকে তার নাকে পোঁটা পড়তে থাকে, চুনির ময়লা ইউনিফর্মের পকেটে সে লুকিয়ে রাখে কবেকার পড়ে যাওয়া দুধদাঁত। চুনির দাদাজানের সাথে বসলেই দাদাজান সমাস জিজ্ঞেস করে, ট্রান্সলেশন জিজ্ঞেস করে, কবেকার বাঁধাই টেস্টপেপার থেকে কারেকশন করতে বসায়, আজকাল যে এ’সব কেউ করে না তা নিয়ে কেউ বলতে এলেই তেড়ে যায়। কেউ যদি খেলতে চায়- দাদাজান ক্যারম খুব ভাল খেলে কিন্তু চুরি করে। লুডুতেও। মোটের উপর দাদাজানকে জিততে হবে। চুনিকেও। খেলুড়ি না পেয়ে তারা নিজেরাই কানাগলির এই এঁদো বাসাটায় খেলতে বসে। চীনাকাগজের ঘুড়ি ওড়ায় আর একে অপরের ঘুড়ি কাটে। কাটা ঘুড়ির পেছনে হৈহৈ করে দৌড়ায়। এইসবই হয় নিমগাছতলার বেতের চেয়ারদু’টিতে বসে বসে। যেমন- 

(সেদিন সকাল থেকেই চুনির মন খাপ্পা।মাঝে মাঝেই সে বিশ্বসংসারের ওপর বেজায় বিরক্ত হয়ে ঘুম থেকে ওঠে, সমস্ত জগত যে তাকে প্রবঞ্চিত করবার জন্যে রামধনুর এই তলা থেকে ঐ তলা অব্দি ফাঁদ পেতে রেখেছে সেটা দিব্য বুঝতে পেরেই এই মন খারাপ।) 

-“দাদাজান, তুমি আমার মায়েরে তোমার বউয়ের গোলাপবালাদুইটার একটাও দিলা না, ফুটকলাই হাতে বউ আনলা,সেই বউ রানলো বাড়লো খাওয়াইলো, নিজে খাইতে পাইলো আগা-বুকার তরকারি, তোমার এই দিমু দিমু শুনতে শুনতে আমার মা মইরাও গেল, তবু তোমার দেওনের সময় হইলো না। তুমিও ঘটিগো মতন হাড়কেপ্পন। তোমারে উদ্দিশ কইরা জসীম উদ্দিন তাঁর ‘কেরপন মোল্লা’র গল্প লিখছেন।” 

-“যা যা! ঘরে খাওন আছিল না, চিনার জাউ খায়া কতদিন রইছি, হোগলা বিছায়া শুইছি… কেডা খবর রাখে।” 

-“আমার নানাবাড়ি থেকে কত কিছু আসতো ঈদে-চান্দে। আর তুমি খালি একবেলা আমাদের মুদিদোকানে নিয়া গিয়া বলতা কে কি কিনবি বল। তাও এমন দোকানে যেইখানে কাঠপেন্সিল ছাড়া কিছু কেনার নাই! এলাকার দোষ যাইব কই। ঘটি ঘটিই থাকব। আবার কত আবদার, দাদাজান কি দাদু ডাকবি আমায়, দাদুভাই।” 

(নিমগাছে একটা কাক এসে নিমফল ঠোকরাচ্ছে। পাশের বাড়ির দীপা আবার ফেল করেছে বোধহয়, দীপার মা গুমগুম করে কিল মারছে দীপাকে, দীপাও তারস্বরে চেঁচিয়ে কাঁদছে। সকালবেলা তিতে কথা বলে আর শুনে দু’জনেরই মেজাজ গুম। এখন তোষামুদে কিছু না বললে চুনি প্রাতরাশটাও বরাদ্দ করবে না বলে দাদাজান কথা হাতড়ায়। আশ্বিনের শেষে কোন কোন ধান পাকতো সেই ধানের নাম ভ্রূ কুঁচকে মনে করতে চেষ্টা করে। পারে না। অঘ্রাণমাসে বিলের পানি বের হওয়ার মুখে পুঁটিমাছ ধরতো মোড়লদের তিন নম্বর ছেলের সাথে, তার নাম মনে করতে পারে না। সন্ধ্যা নামতে সেই তালের ডোঙাভাসানিয়া জলে উধাও তারার তীক্ষ্ণ ছায়া মনে করতে পারেনা। অ্যাকর্ডিয়ানের হাঁপর কতটা কুঁচকে নিজের কাছে টেনে আনলে সুর বের হয়, ততটা ভ্রূ কুঁচকেও লাভ হয় না। অতএব দাদাজান বিড়বিড় করে… ) 

-“এক যুগীতে সরু শলার পাটি বুনাইতো, আরেক যুগীতে তাঁত বুনাইতো, এই দুই যুগীতে বিয়া হইতো না। তেলিগো সব মোছলমান। আর মোছলমানের ভিতরে আমরা সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাত। আমরা জোলা।” 

-“মোছলমানের জাত আছে নিকি? জাত না খোয়াইলে কেউ মোছলমান হবার পারে?” 

-“আত্রাফের জাত গুনবার একরকম রীতি আছে, তরে আমি জাত গোনা শিখায়া দিমু নে। ইস্কুল থিকা আসবার সময় ক’টা মার্বেল নিয়া আসিস।” 

(এই আজব কারখানায় চুনির মন টানে না। সে সকালের রোদে নিজের হাত মেলে খড়ি তোলে। বাসী বিনুনি খুলে দিয়ে আঙুল দিয়ে চুল চিরে চিরে জট ছাড়ায়, ঝরা চুলের নুটি পাকায় হাতের তেলোয়, থুতু দিয়ে সেটা বাইরে ফ্যালে। দাদাজান কথা খুঁজে পেয়ে খুশি হয়ে ওঠে।) 

-“মাটির জালায় পুঁটি রাইখ্যা খড়মপায়ে মাড়াইতে হইতো, মাড়াইতো আমার ছোটফুপু। গায়ে ইঁদারার জলে ধুইতে ধুইতে লাল হইয়া যাওয়া থান।” 

-“মোছলমানের ঘরে তো বিধবাদের বিয়া হয়, তোমরা তোমাদের ছোটফুপুর বিয়া দিলা না কেন?” 

-“আমরা হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকার লুক। সেইজন্য হয়তো।“ 

-(চুনির মুখ আপনা থেকে বেঁকে যায়।) “ঘরে একটা খাটাইবার স্থায়ী মুনিষ পাইলে কেউ কি ছাড়ে? বিনাপয়সার দাসী।” 

-“টরটরাইয়া কথা কস লো ছেমড়ি।” 

-“তুমি তইলে মুর্শিদাবাদের কথা কও। মাটির রঙ কেমন আছিল সেইখানে? আইট্যাল লাল মাটি না লাঙল চালাইতে সুবিধা এমন? চাষের জিনিস কেমন আছিল? নদীর ধার দিয়া শনের ক্ষেত আছিল? আখ হইতো? বিদ্যুতের তারে সেপাই বুলবুলি? হাটের দিন কিন্যা আনতা পাঁউরুটি বিস্কুট? তেলকল আছিল? গরু আছিল তোমাগো গোশালে?” 

-“গেরামে গরু মরলেই লোকে ঋষিপাড়ায় গিয়া হাতের সুখ কইরা নিত, ঋষিরা বিষ দিয়া গরু মারতো তো, নৈলে চামড়া পাবো কই। শীতকালে চাষায় ক্ষেতে পায়ে দিব কি?” 

-“এইপারে না ঐপারে? কোন পারের কথা কও তুমি?” 

-“পারাপার নাই রে। গরুরে কত খেসারি খাওয়াইছি।” (শ্বাস ফেলে দাদাজান। শ্বাসের শব্দটা শুনে মন সামান্য আর্দ্র হয়ে আসে চুনির।তার ঘুড্ডি কাটা আপাততঃ শেষ। কাটা ঘুড্ডি ইলেকট্রিক তারে বাকি বেলা গোত্তা খাবে।) 

আরেকদিনের কথা। সেদিন চুনি বেশ করে রেঁধেছে। চুনি রান্না করতে শিখেছে সাতবছর বয়েসে, সফটেক্সের ব্যবহার শিখেছে বয়ঃসন্ধিতে আপনা থেকে, মানুষের আত্তীকরণের ক্ষমতা এবং বিবর্তনে টিকে থাকার ক্ষমতা নিয়ে কোনো একটি অভিসন্দর্ভের বিষয় হতে পারে সে। সে-ই গৃহকর্ত্রী। এখন দু’জন বর্ষার দুপুরে ঢ্যালা খিচুড়ি মারছে। খুশিয়াল হাসিতে দাদাজানের তেকোনা হনু তালমিছরির মতন চকচকে হয়ে আছে, হাতা ভরে খিচুড়ি নিতে নিতে দাদাজান বলে, “আহা, তুলাইপঞ্জী চাইলের খিচুড়ি, তাতে গাওয়া ঘি আর হাতের পাঞ্জার সমান বিশাল বেগুনভাজা! কি খাইতাম। খুব বেগুন হইতো সেই অঞ্চলে। ময়ানে ঘি দিতে উসখুস করে লোকে এইকালে আর আমরা খাইতাম ঘিয়ে ভাজা।” চুনির মুখ বেঁকতে গিয়েও বাঁকা হয় না। দাদাজানের মন ভাল থাকলে বর্ষায় টলমল নদীতে কাঁসারিগো মালবোঝাই নৌকার গল্প হয়, নদীতে মোচার খোলায় জশনের দীপ ভাসানোর গল্প হয়। বাইরে বৃষ্টি ক্ষ্যান্ত দিয়ে এখন জালালি কবুতরের ডানার মতন নীল নম্র মেঘের স্তূ্প, তাদের বাড়ির চৌহদ্দিতে অনেক কবিরাজি গাছ, নিম- অর্জুন- রিঠা- বহেড়া। দাদাজানের বাপ ছিল গাঁয়ের কবিরাজ, পিত্তশূলের ব্যারাম সারানোর ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলেছিল বুড়া। অনুপান লিখে রাখার কাগজখানা শুধু হারিয়ে ফেলেছিল। কপিলা গাছে একটা ইষ্টিকুটুম এসে সারা পাড়া জানান দিয়ে শিস দিল। সেই দিকে তাকিয়ে দাদাজানের চোখ ভগবানগোলা থেকে চালান হয়ে আসা ভেড়ার মতন ঘোলা হয়ে এলো একটু। 

-“চুনি রে, তুই কুটুমপাখির গল্প জানোস?” 

চুনি মাথা নাড়লো। 

-“কুটুমপাখির বিয়া হওনের কথা চান্দের লগে। গায়ে হলুদ দিতাছে, কালো পাখি তো, সইরা সবতে মিল্যা তারে খুব হলুদবাটা ডলতাছে। চান্দের মনও খুশি। সে ঘরে গিয়া দ্যাখে, তার মায়ে একখান আস্ত মৈষ আগুনে ঝলসায়া খাইবার লাগছে। চান্দে তো দেইখা বেহুঁশ, মায় করে কী! মায় কান্তে কান্তে কইলো, বাছা রে, তর বউ আইব , আমারে তো আর খাইতে দিব না, আমি এই বেলা সাধ কইরা খায়া নিই। মায়ের দুঃখে চান্দের চোখে জল আসলো, সে বিয়া ভাইঙ্গা দিল, বিয়ার কনের গায়ের হলুদ গায়েই রইয়া গেল।” 

-“এই গল্প আমার পোষায় না গো দাদাজান। মায়ের চোখের পানি মুছলো। চান্দের জিভের পানিও নিশ্চয় কোথাও আর কোনো পাখির বাসায় গিয়া পুরা হইলো। খালি মুছলো না বৌপাখির গায়ের হলুদ।” 

-“তৈলে অন্য গল্প শুনবি? আমাগো গ্রামে পুকুরে নাইতে গিয়া এক মেয়ের পায়ে জড়ায়া গেল দীঘল চুলের রাশ। সে পুষ্কুনি থিকা উইঠ্যা যেইখানে যায় সেইখানে তার পায়ে পায়ে চুল যায়, যদ্দুর সে যায়- চুল তত লম্বা হইয়া যায়, যেন শিকলি। সারাদিন এমন গেল। রাইতের বেলা চুলের গোছা তার পায়ে ধইরা টান দিল পুকুরের তল থিকা। সেই টানে মেয়েটা পুকুরে আইসা তলায়া গেল গিয়া। এই গল্প আমার মায় কইতো সত্য।” 

(দাদাজান এখন অনেকক্ষণ কাঁদি মহকুমার সেই গ্রামটাকে মনে করবে। মহারাজা মনীন্দ্র নন্দীর নামে ইস্কুল ছিল একটা। যেখানে দাদাজান মাদ্রাজী হেডমাস্টারের বেত খেত। যেখানে রেবতীমাসি সরস্বতীপূজার পরে খেতে দিত আঁজলাভরা কুল। যেখান থেকে সেই অলৌকিক চুলের টান পড়তো ডাঙার মানুষকে জলের দিকে নিয়ে যেতে। হিজলের বিল। বাদা জমিতে বনখেজুর আর তালগাছ। শ্যামাধানের ক্ষেত। কূপ শুকিয়ে যেত সেখানে। সাঁওতালদের ঘর। হিংসেয় পুড়ে যাওয়া ভিটে। যেখান থেকে অপশন দিয়ে তারা সাতভাই পিঠ ফিরিয়ে চলে এসেছিল ঢাকায়।) 

-“তুমি চালান হইয়া গেলা কবে মুর্শিদাবাদে? জন্মাইলা তো ষোলঘর। কবিরাজবাড়ি।” 

-“আহা, আমার বাপজানের শখ আছিল ছেলেদের ব্যারিস্টর বানাবে, পড়ালেখার বড় সমঝদার। মায়ের দুধ ছাড়তেই তাই ভাইয়ের কাছে পাঠায়া দিল আমারে। ভাই ছিল মুর্শিদাবাদে। দারোগা। মহারাজা তারে ঘুষ দিতে আসছিল, সে নেয়নাই।” (আর তুমি লুডুর গুটি চুরি কইরা পাকায়া ফ্যালো। মনে ভাবলো চুনি। কী ভেবে দাদাজান হাসে।) 

-“ওরে আমার বড়ভাইয়ের সন্তান আমার চাইতে বয়সে বড়। আমি শুইতাম ভাইভাবীর মাঝখানে, কোলের ছেলের মতন। সৎ ভাই কিন্তু। কেউ বিশ্বাস যাইব এইকালে?” 

-“খায়াদায়া পিছনের বেড়ার ধারের সব ঢোলকলমী কাইট্যা দিবা আজকে। পোকা হইতেসে, সাঙ্ঘাতিক পোকা।“ উঠতে উঠতে বলে চুনি। 

-“আমাদের বাড়ির বেড়া ছিল মাদারগাছের। অসার বিরিক্ষ, জ্বালানি হয় শুধু।” কার উপর বিরক্ত হয়ে ওঠে দাদাজান, এই তো হৃষ্ট ছিল তার মন। 

চুনি কিন্তু সত্যিকারের মানুষ, মানে যাদের হস্তরেখা থাকে, শরতকালে কৃমি হয়, যারা ভ্যাটকানো কমলা রঙের ইউনিফর্ম পরে রিকশায় করে ইস্কুলে যায়, মাঝে মাঝে বাসে করে চালান হয়ে যায় এয়ারপোর্টের দুইধার দিয়ে পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে ‘নতুন বাংলাদেশ গড়বো মোরা নতুন করে আজ শপথ নিলাম’ গাইতে। ওর দাদাজানও সত্যিকারের মানুষ। যাদের মুখ জরায় ইকড়িমিকড়ি দাগে বুড়িয়ে আসে, যারা অবসরে আমকাঠের পিঁড়ি বানায় আর পড়শীর মেয়ে দীপাকে ইংরেজি ট্র্যান্সলেশন করায়, ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগিনী মরিয়া গেল শুনে যাদের ছাত্রীরা মড়ার চোখে তাকিয়ে থাকে। ওরা কিছুটা স্থাবর, ওদের দুইজনেরই স্থায়ী ঠিকানা আছে, একটা কানাগলির ভিতরে, যে গলিতে নালা উপচে যায় বিলের পানি এসে, যে গলিতে অ্যাম্বুলেন্স ঢুকবার প্রস্থ নেই। অথচ গলির মানুষগুলির পরিধি আছে, আছে মুর্শিদকুলির কামান দাগলে চমকানোর মতন পিলে। 

যেমন বলেছি, চুনিকে পথেঘাটে উত্যক্ত করবার লোক আছে। তার উঠন্তি বুকে ছোবল দিয়ে ক্যারমের গুটি ছোঁ মারতে গিয়ে লেগে গেছে এমন ভান করার রোগাটে হাতের লোক আছে। দাদাজান মরে গেলে চুনির বিয়েতে দেবার মতন আসলেই কিছু রেখে যাবে কি না সেইসব সামাজিক দুশ্চিন্তা আছে। চুনির দাদাজানের জন্য রাতের বেলা ভয়ে জাগিয়ে রাখবার স্মৃতি আছে (সবচেয়ে প্রত্যক্ষ-দর্শী হিসেবে নিজের কাছেও আবৃত্তি করতে যা ভয় হয়), চোরের লুটপাটের আওয়াজ আছে, ‘সেহরি খাওয়ার সময় হয়েছে’ বলে দুয়ারে ঢ্যাঁড়া দেয়ার লোক আছে। এইসব থেকে যে কচ্ছপের খোলে গিয়ে তারা দুই উঞ্ছজীবী লুকায়, তার নাম অতীতকাল। 

পাড়ার ইস্কুলের হেডমাস্টারের সাথে মিলে চুনির দাদাজান একটা গ্রামার বই লিখেছিল, সেটার কপি অনেক খুঁজেপেতে পাওয়ার পরে সে’দিন দু’জনেরই মন দুয়ের প্রতি প্রসন্ন। ছোট্ট হাতলভাঙা কাপ থেকে ওঠা দুধের গন্ধে চুনির দাদা উৎফুল্ল হয়ে বলে, “দার্জিলিং এ যখন আবগারি অফিসার আছিলাম, গাইয়ের দুধ খাইতাম, কী খাঁটি। শিশিরের জল খাইলে এমন হয়। একদিন মেঘ আইসা খোলা ঘরের জানলা দিয়া ঢুইক্যা উল্টাদিকের দেয়ালের জানালা দিয়া বার হইয়া গেল গিয়া। আকাশের রঙ ধোঁয়ার মতন, রাইতেও মাঝে মাঝে মৈষের চোখের মতন লাল। সেই আকাশ আর মেঘের মইধ্যে বইসা মায়ের জন্য কানলাম সেই রাতে। পরদিন চইলা আসলাম। ম্যালেরিয়াতে মরমু তবু মায়ের কাছেই থাকমু।” 

এরপর চুপচাপ। দীপার বোন নীপার গানের মাস্টার এসেছে। বর্ষণক্ষান্ত বিকেলে হারমোনিয়াম প্রবল বেগে চেপে মাস্টারমশাই গাইছে- ‘হে এ এ এ আকাশবিহারী নীরদ বাহন জল…’ ঘরে উর্ধ্বাকাশে উড্ডীন মেঘ ভেসে এলে কেউ কেন মায়ের শোকে কাঁদবে সেটা চুনির বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল। সে উসখুস করে বল্লো, “তারপর আইস্যা বিয়া কইরা ফেল্লা, (মাদারকাঠের মতন অসার, জ্বালানি হয় কেবল। এমন মেয়া) তুমি বিয়া কইরা ফেল্লা? খালি তোমার মা কইলো বইলা?” 

দাদীজানের গল্প আগেও কয়েকদিন হয়েছে, সেই গল্প গল্পের নায়িকার মতোই নির্বিশেষ। শুধু একবার চুনির দাদাজান ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করেছিল, “চুনি তুমি কি ব্রাইডাল চেম্বারের গল্প জানতে চাও?” সবেগে মাথা নেড়ে চুনি জানিয়েছিল, সে চায়। সে গল্পে অপরিচিত মানুষের পাশে শুতে অনিচ্ছুক কেঁদে ফেটে পড়া একটি মেয়েশিশু ছাড়া তেমন কিছু নেই। বালিকাবধূর বিভাময়তা আশা করে চুনি একটু মুখ তুলেছিল, বাল্যবিবাহের চারদিকে সেই রমণীয় বিভা সে দেখতে পেল না, হয়তো নেই। 

-“দাদাজান তুমি আপত্তি করোনাই ক্যান? ব্যাটাছেলের কি মনের মানুষ লাগে না? (শুধু শরীলের?)” 

-“আমেরে আঁব কইব, মামারে কইব বাবা… এতদিন ঘটিগো লইয়া যা কিছু কইয়া লোকরঞ্জন করছি, তাই তো দেখি মা টরটরায়া কইয়া যাইতাছে। ওরে তরে জনমভর বৌ গাল পাড়বো ‘পুঁটিমাছের কাঙ্গাল’ বইলা। চব্বিশ পরগণার মাইয়া ভাল হইব ক্যামনে… আমার সেই চন্দ্রের মায়ের মতন একখান মৈষ খাইয়া বইসা থাকতে হইব, পোলার বউ তো আর ভাত দিব না… আর কি কইবার পারি। মা বড় ধন, কীসের মাসি কীসের পিসী কিসের বৃন্দাবন…” দাদাজান প্রায় ফড়িঙের ডানার মতন তিরতিরে শব্দে বলে, পোড়া বাড়ির কালিময় ঘ্রাণ তার শ্বাসরোধ করে… হয়তো সেজন্য দাদাজান কিছুক্ষণ থেমে থাকে, আবার বলে- “জ্যোতি বসু কইয়া গেছে ঘটিতে আর বাঙ্গালে কুনোদিন মিশ খাইব না! বাপজান বাঁইচ্যা থাকতে কইতো- ‘কুন ফায়াকুন’ কয়্যা এগোরে মিশান যাইব না।”, বলে এই অযাচিত ফুটনোটের দায়ে মাথা নিচু করে কোঁচকানো দুই হাতের আড়ালে ‘হেড ডাউন’ করে বসে থাকে। 

উৎকর্ণ চুনি কেবল উদ্ধার করতে পারে, তার মানে কেউ ছিল, মনোনীত কেউ। 

-“তার নাম কি ছিল দাদাজান?” 

দাদাজান মুখ তোলে না। কেশবিরল মাথার কুঞ্চিত তালু কেঁপে কেঁপে ওঠে শুধু। নিমগাছ থেকে দাঁড়কাক ডাকে- কা কা। দীপাদের বাড়িতে কাপড় কাচতে আসা বুয়া খুব ঝগড়া করছে, সাবান যে চুরি করে সে ইসের বেটি এইসব। দাদাজান মাথা না তুলেই বলে, “তার নাম ছিল… ইয়ে রুবি।” 

চুনির হঠাৎ মনে পড়লো, তার নামখানা দাদাজানের দেয়া। 

আমার পেলাস্টিকের পুতুলের গালে তুমি সবসময় শিসকলম দিয়া খালি একটা বড় লাল তিল কেন দিতা? রুবির গালে আছিল? তিল? 



১৫/০৭/২০১৭ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন