মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

মোস্তাক শরীফের গল্প : আবু তোরাবের দৌড়

বদরাগী ষাঁড়ের মত ছুটে চলছিল বাসটি।

জৈষ্ঠ্যের তীব্র রোদ পুড়ছে প্রকৃতি। চারদিক থম মেরে আছে। বহুদিন না পরা শার্টের মত রংজ্বলা নীল আকাশ, গাছের পাতায় থেকে থেকে ঝিলিক মেরে যাচ্ছে হলদেটে রোদ। বৃষ্টির দেখা নেই আজ অনেক দিন, সহসা হবে বলেও মনে হয় না।

রাস্তায় গাড়িঘোড়া খুব একটা নেই, এরই মধ্যে গোঁ গোঁ করে ছুটে চলেছে বাস। একেবারে পেছনের দিকের একটা আসনে বসেছে আবু তোরাব। চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে আছে তার, চোখে ভাবলেশহীন দৃষ্টি। তবে খেয়াল করে দেখলে সে দৃষ্টিতে ফেনিয়ে ওঠা ক্রোধ আর অব্যক্ত যন্ত্রণা চোখে পড়বে। সামনের আসনটি শক্ত করে চেপে ধরে আছে আবু তোরাব। মাঝেমাঝেই চোখ দুটো জ্বালা করছে, জ্বলুনি বন্ধ করার জন্য শক্ত করে চোখ বন্ধ করছে সে, আর অন্ধকার পর্দার মধ্যে ভেসে উঠছে দু’ বছর বয়সী আবু হামজার ছবি। ঘরের দাওয়ায় আপনমনে খেলা করছে আবু হামজা, কিংবা দু হাত সামনে বাড়িয়ে টলমল করে হাঁটছে, ফোকলা দাঁতে হাসছে আর বলছে Ñ আব্বা...

দরদর করে ঘামছে আবু তোরাব। কিসের যেন অস্থিরতা কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে, আর থেকে থেকে খা খা করে উঠছে বুকটা। কাল রাত থেকে দানাপানি পড়েনি পেটে, তারপরও এক বিন্দু খিদে নেই। আবু হামজার হাসি আর তার আধো আধো কথা তাকে স্থির থাকতে দিচ্ছে না। কেবলই মনে হচ্ছে লাফ দিয়ে নেমে পড়ে বাস থেকে, তারপর বাসের চাকার নিচে জীবনটাকে শেষ করে দেয়। কিংবা উঁচু কোনো সেতু থেকে লাফিয়ে পড়ে, অথবা বুক পেতে দাঁড়ায় ছুটে চলা ট্রেনের সামনে...

আর তারপরই আবু হামজার কচিমুখটি ছাপিয়ে আরেকটি মুখ হিলহিলিয়ে ওঠে তার চোখের সামনে। দমকা হাওয়ায় উড়ছে তার এলোচুল। ঠোঁটে মুচকি হাসি, আর কাজলকালো চোখে কিসের যেন আহ্বান। মুহূর্তেই কলিজাটা যেন বুকের ছাতি ভেঙে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়, তীব্র আক্রোশে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়। নিজেকে সংবরণ করতে কষ্ট হয় আবু তোরাবের।

আফরোজা! 

ভুলে থাকতে চায় তাকে, তবু সমস্ত বাধা ঠেলে সামনে এসে দাঁড়ায় আফরোজা।

তার চোরা চাহনি, দুষ্টু-মিষ্টি হাসি আর রংঢং বুকের মধ্যে পাগলা হাওয়ার কাঁপন তুলত। আফরোজার সান্নিধ্যে নিজেকে মনে হত শাহানশাহ, মনে হত দুনিয়াটা যেন তার পায়ের তলায়। অথচ সেই আফরোজার ভাবনাই এখন মাথায় খুন চাপিয়ে দিচ্ছে। আবু তোরাব জানে না এ মুহূর্তে আফরোজার মুখোমুখি হলে সে কী করবে। হয়ত গলা টিপে ধরবে, নয়ত তার মাথাটা ঠেসে ধরবে থিকিথিকে কাদায় ভরা পানাপুকুরের মাঝে...

চুরি করতে গিয়ে বমাল ধরা পড়ে গণপিটুনিতে মারা গিয়েছিল আফরোজার বাবা শামসুদ্দিন। সেই আফরোজাকে বিয়ে করার জন্য সমাজ-সংসার সবকিছুকে তুচ্ছ করেছিল আবু তোরাব। ‘শামসু চোরার মাইয়ারে বিয়া করবি তুই? তাইলে এই বাড়িতে আর জায়গা অইবা না তোর। আইজই বাইর অইয়া যা,’ প্রচ- রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলেছিল বড় ভাই আবুল কালাম। অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর পর এই ভাই-ই কোলে কাঁখে করে বড় করেছিল আবু তোরাবকে। একটা শব্দ উচ্চারণ করেনি আবু তোরাব। বেরিয়ে এসেছিল মাথা নিচু করে। নিজের জায়গায় ছোট্ট একটা ঘর তুলে আফরোজার সাথে সংসার পেতেছিল। সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে হামিদপুর বাজারে একটা মুদি দোকান দিয়েছিল। কেবল একটাই অপূর্ণতা ছিল, একটা সন্তানের। বিয়ের চার বছরের মাথায় সেই অপূর্ণতাও দূর হল। চাঁদের মত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়েছিল আবু তোরাবের। গঞ্জের মসজিদের পেশ ইমামের পরামর্শে ছেলের নাম রেখেছিল আবু হামজা। ইমাম সাহেব কাঁচাপাকা দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলেছিলেন, ‘হামজা মাইনে অইল গিয়া তেজি।’ ছেলের মহা উৎসাহে হাত পা নাড়া দেখে আবু তোরাবেরও মনে হয়েছিল, একেবারে মোক্ষম নাম রেখেছেন ইমাম সাহেব। সিংহের মত শক্তিশালী আর ঘোড়ার মতই তেজি হবে তার ছেলে।

আবু হামজার বয়স যখন এক বছর, আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল গোটা হামিদপুর বাজার, বাদ গেল না আবু তোরাবের সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে গড়া মুদি দোকানটাও। সব কিছু হারিয়ে যখন চোখে অন্ধকার দেখছিল তোরাব, তখন এগিয়ে এল আফরোজা। তার সমস্ত গয়না তুলে দিল তোরাবের হাতে, সঙ্গে দিল মায়ের কাছ থেকে আনা বিশ হাজার টাকা। আবারও দোকান দিল তোরাব, তবে এবার টঙ্গিতে। আফরোজা আর আবু হামজাকে ছেড়ে টঙ্গিতে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেয়াটা সহজ ছিল না। আফরোজাই ভরসা দিল, হামিদপুর বাজার আবার উঠে দাঁড়াতে সময় লাগবে। তাছাড়া বাজারের আরো দু-একজন টঙ্গিতে দোকান দিয়েছে, অল্পদিনে ব্যবসা দাঁড় করিয়ে ফেলেছে তারাও। টঙ্গি বাজারের কাছাকাছি ছোট্ট একটা টং দোকান ভাড়া নিল আবু তোরাব। অল্প পুঁজি আর অমানুষিক শ্রম দিয়ে তিলতিল করে দাঁড় করাল ব্যবসাটাকে। দোকানের পাশেই একচালা একটা বাড়িতে ঘর নিল। সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর ঘরে ফিরে আফরোজা আর আবু হামজার ছবি বের করে চোখের সামনে ধরে রাখত। ছয়মাসে ব্যবসাটা মোটামুটি দাঁড়ানোর পর ঠিক করেছিল, সামনের বৈশাখেই আফরোজা আর হামজাকে নিয়ে আসবে টঙ্গিতে, একটা ঘরও দেখে রেখেছিল। দু’ হাজার টাকা ভাড়া, দোচালা টিনের ঘর, সামনে একটু উঠোনমত আছে। সেই উঠোনে আবু হামজা খেলবে, সে আর আফরোজা বারান্দায় বসে প্রাণভরে দেখবে Ñ কত কিছু ভেবে রেখেছিল আবু তোরাব...

ফাঁকা রাস্তা পেয়ে বাসটা এখন প্রচ- গতিতে ছুটছে। এই গরমেও ড্রাইভারের গলায় মাফলার, ঠোঁটের কষা বেয়ে পানের পিক পড়ছে, থেকে থেকে তার চঞ্চল চোখদুটো রাস্তার এপাশ-ওপাশ জরিপ করে বেড়াচ্ছে। ড্রাইভারের পাশে ঝোলানো আয়নার ভেতর দিয়ে লোকটাকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল আবু তোরাব। মনে হচ্ছে তার মতই আগুন জ্বলছে যেন ড্রাইভারের বুকেও, সামনে যা পাবে সবকিছু ভেঙেচুরে চলে যাবে।

আজ সকালে ফোনটা যখন এসেছিল তখন সবে দোকানে ঢুকে জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখছে সে। ফোন করেছিল ভাই আবুল কালাম। আবু তোরাবের বিয়ের পর বহুদিন তার সাথে কথা বলা বন্ধ রেখেছিল কালাম। মেয়ের বিয়ের দাওয়াত দিতে এসে আবার কথা বলেছিল। আবু তোরাবের সাজানো সংসার আর আবু হামজার হাসি দেখেই বোধহয় ভাই আর ভাইবৌর ওপর রাগ ভুলেছিল আবুল কালাম। আফরোজার বানানো চা খেয়ে প্রশংসাও করেছিল। তারপর থেকেই ফের আসা যাওয়া শুরু হয়েছিল দুই বাড়িতে। মাঝেমধ্যে ফোন করে আবুল কালাম, তবে এই সময়ে কখনো না। একটু বিস্ময়ের সাথেই ভাইয়ের ফোন ধরেছিল তোরাব। ওপাশ থেকে কালামের কণ্ঠস্বর কেমন যেন জড়ানো, ‘তুই কি আইতে পারবি বাড়ি?’

আবু তোরাবের বুকের মধ্যে গুড়গুড় করতে শুরু করেছিল অশুভ আশঙ্কা। ‘কিছু অইছে মিয়াভাই? আফরোজা, হামজা...?’ 

‘না, হ্যারা সব ঠিক আছে, তুই আয়...’ 

‘মিয়াভাই, আমারে হাছা কইরা কও কী অইছে।’ তোরাবের গলার স্বর চড়ছিল। 

‘কিছু অয়নাই ভাই, তুই....’ কালাম কথা শেষ করতে পারেনি, মনে হচ্ছিল কান্নায় জড়িয়ে যাচ্ছিল তার কণ্ঠ।

সঙ্গে সঙ্গে ফোন রেখে দিয়ে আফরোজাকে ফোন করে তোরাব, একটানা রিং হতে থাকে, আফরোজার খবর নেই। মনের মধ্যে তখন নিশ্চিত বিপদের পুর্বাভাস। কালামের বউকে ফোন দেয় তোরাব, সেও ধরেনি। তোরাবের তখন পাগলপ্রায় দশা। ভাতিজা জহিরকে ফোন দেয় সে, জহির ফোন ধরেই কাঁদতে শুরু করে।

‘জহির, কী অইছে আমারে হাছা কইরা ক।’

‘কাকা, আব্বা আমারে কইতে মানা করছে,’ কান্নার দমকে জহিরের কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল।

‘আমার ক জহির, কী অইছে!’ প্রায় চিৎকার করে ওঠে তোরাব।

‘হামজা...হামজা পানিতে পইড়া....কাকা আমরা হামজারে বাঁচাইতে পারি নাই...’

স্তব্ধ হয়ে যায় তোরাব। তার চারপাশে পৃথিবীটা তখন ঘুরতে শুরু করেছিল। নক্ষত্র গতির সে ঘূর্ণনের মাঝখানে নির্জীব পতঙ্গের মত ভাসতে থাকে তোরাব; মনে হচ্ছিল মরে গেছে সে, আর তার মৃতদেহটা টঙ্গি চেরাগ আলীর সেই পাঁচ ফুট বাই পাঁচ ফুট দোকান নামের কফিনের ভেতর অনন্তকালের মত আটকে গেছে। ওদিকে জহির ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলে যাচ্ছিল, ‘বেয়াইন বেলা কানতে কানতে আমাগো বাড়ি আইছিল ভাবি, হামজারে নাকি পাইতাছে না...আমি, আব্বা সবাই খুঁজতে খুঁজতে শেষে...ভিতর বাড়ির পুকুরে..,’ একটানা বলে চলছিল জহির, তখন আর কিছু শোনার অবস্থায় ছিল না তোরাব। মনে হচ্ছিল চেতন ও অবচেতনের মাঝামাঝি অসম্ভব কোনো অবস্থার মধ্যে ঝুলে আছে সে। কীভাবে দোকান বন্ধ করেছে, কীভাবে বাস্ট্যান্ডে গিয়ে মধুপুরগামী বাসে চেপে বসেছে খেয়ালও নেই ঠিকমত।

সমানে হর্ন বাজাচ্ছে বাসটা, চটকা ভেঙে দেখে তোরাব, মধুপুর এসে গেছে। যন্ত্রের মতই রিকশা ভ্যানে উঠে বসে সে। কাঁকর বিছানো, ভাঙাচোরা রাস্তা ধরে হামিদপুর বাজারের উদ্দেশে রওনা দেয় ভ্যান, আবু তোরাবের মনে হতে থাকে জীবনের অসহ্যতম গন্তব্যের দিকে তিলতিল করে এগিয়ে যাচ্ছে সে, যার শেষবিন্দুতে অপেক্ষা করছে আবু হামজার মৃতদেহ।

বাড়ির সামনে অনেক মানুষের জটলা। তাদের কেউ কেউ তোরাবকে দেখে এগিয়ে আসে। সবার সামনে জহির; তোরাবকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে, তোরাব পাথরের মত স্থির। জহিরকে জড়িয়ে ধরেই ভেতর বাড়ির দিকে এগোলো সে। মাথায় হাত দিয়ে আবু তোরাবের ঘরের দাওয়ায় বসে ছিল আবুল কালাম, ভাইকে দেখেই ছুটে এল। বড় ভাইয়ের আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে আর নিজেকে সামলাতে পারল না আবু তোরাব, হু-হু করে কেঁদে উঠল উন্মত্তের মত। কান্নার তোড়ে গত কয়েক ঘণ্টা ধরে বুকের মধ্যে জমে থাকা বিষবাস্প যেন গলে গলে বের হয়ে এল তার চোখ দিয়ে। শিশুর মত কাঁদল আবু তোরাব। তার কান্না দেখে কাঁদতে শুরু করল চারপাশে ভিড় করে দাঁড়ানো নারী ও শিশুরা। পুরুষদের অনেকের চোখও আর্দ্র হল। এদিকে ভিড় ক্রমশ বাড়ছে। বানের পানির মত ছুটে আসছে সারা গ্রামের মানুষ; সবার চোখে কৌতূহল Ñ নিজ চোখে দেখতে চায় সন্তান হারানোর বেদনায় বিধ্বস্ত আবু তোরাবকে।

ভাইয়ের পাশে ঘরের দাওয়ায় বসল আবু তোরাব। এখনও কাঁদছে সে, থেকে থেকে চোখ মুছছে লুঙ্গির খুটে। ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় ভাইকে ঘটনার যে ইতিবৃত্ত জানাল কালাম সেটি সংক্ষেপে এই Ñ অন্যান্য দিনের মত আজও ঘুম থেকে উঠে ছেলের দুধ গরম করার জন্য চুলা ধরিয়েছিল আফরোজা। রান্নাঘরটা বসতঘরের লাগোয়া, উঠানের এক মাথায়। দুধ গরম করা শেষে রুটি বেলতে বসে আফরোজা, এর মধ্যেই ছেলের কান্নার শব্দ পেয়ে ঘরে যায়। হামজার হাত মুখ ধুয়ে একটা রুটি ভেঙে খাওয়ায়। তারপর তাকে বিছানার ওপর খেলতে বসিয়ে ফের রান্নাঘরে যায়। রুটি বেলতে বেলতে অনেকক্ষণ ছেলের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ঘরে গিয়ে দেখে, খাটের ওপর আবু হামজা নেই। পুরো ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজে শেষে আবুল কালামের বাড়িতে যায় আফরোজা। কালাম, জহিরসহ আট-দশজন খুঁজতে শুরু করে গোটা বাড়ি আর তার চারদিক। সাড়ে দশটার দিকে একটা ছেলে ভেতর বাড়ির পুকুরের পাশে ছাগলের জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে পুকুরের মধ্যে কিছু একটাকে ভাসতে দেখে খবর দেয় এসে। জহিরসহ চার পাঁচজন পানিতে নামে এবং এক পর্যায়ে আবু হামজার লাশ আবিষ্কার করে। আফরোজা বারবার বলেছে, দশ থেকে পনের মিনিট হামজার সাড়াশব্দ পায়নি সে। এরই মধ্যে ঘর থেকে অন্ততপক্ষে একশো হাত দূরের ঐ পুকুরে কীভাবে গেল আবু হামজা, সে এক রহস্য বটে।

স্খলিত কণ্ঠে আবুল কালাম জানায়, আর খানিক পর, আসরের নামাজের পর জানাজা। দীঘির নামায় তোরাব আর কালামের মা বাবার পাশেই তাকে কবর দেয়া হবে, তোরাবের কি সায় আছে?

কী বলবে তোরাব? তার বুকের ধন পানাপুকুরের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে, এখন কোথায় তাকে কবর দেয়া হবে কী এসে যায় তাতে! সবার সাথে নামাজে অংশগ্রহণ করে আবু তোরাব, মসজিদের এক পাশে খাটিয়ার মধ্যে সাদা কাফনে মুড়ে রাখা ছোট শরীরটার দিকে বারবার দৃষ্টি যায়। সত্যিই কি ওতে মোড়ানো আছে তার বুকের ধন আবু হামজা? সত্যিই কি ঐ নির্মম কাফন সরিয়ে উঁকি মারলে দেখা যাবে সেই প্রিয় মুখ? আবু তোরাবের সারা শরীর কাঁপতে থাকে, মনে হয় আদিঅন্তহীন এক কম্পনের মধ্যে আটকে গেছে তার আত্মা এবং অস্তিত্ব, তার সমস্ত চেতনাকে বিদীর্ণ করে দিয়ে, তাকে এবং গোটা পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিয়ে তবেই হয়ত থামবে এই বিপুল কম্পন...

জানাজার প্রক্রিয়াটি কখন যে শেষ হয়, কখন যে বাকি সবার সাথে সেও পায়ে পায়ে রওনা দেয় কবরের দিকে, কখন যে সাদা কাপড়ে মোড়া ছোট্ট ঐ শরীরটাকে কবরের গহীন গহ্বরে স্থাপন করে তারা, কখন যে বাঁশের পাটাতনের ওপর মুঠি মুঠি কালো মাটি দিয়ে ঢেকে দেয় আবু হামজাকে, চিরদিনের জন্য, কিছুই যেন টের পায় না আবু তোরাব। অনেকের বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও কাফন সরিয়ে একবারও ছেলের মুখটার দিকে তাকায়নি তোরাব। কীভাবে তাকাবে? তাকানোর পর ছেলের চিরঘুমন্ত মুখটাকে দেখে তার মধ্যে বেদনার যে বিস্ফোরণ ঘটবে সেটি সহ্য করার শক্তি কি তার হবে?

ভাইয়ের সাথে স্খলিত পায়ে বাড়ির দিকে এগোয় আবু তোরাব। শবযাত্রীদের বেশির ভাগই যার যার বাড়ির দিকে রওনা দেয়, থেকে যায় দু-চারজন, যাদের কৌতূহল এখনও নিঃশেষিত হয়নি। ফের বাড়ির দাওয়ায় গিয়ে বসে দুই ভাই। কে যেন এক গ্লাস পানি আর এক বাটি মুড়ি দিয়ে যায় সামনে। আবু তোরাব মাথা নিচু করে বসে থাকে, দু’চোখ বন্ধ। একটু ইতস্তত করে আবুল কালাম জানায়, তার বাড়িতেই আছে আফরোজা, প্রথমে কান্নাকাটি করেছে অনেক, এখন পাথরের মত স্তব্ধ হয়ে আছে। তোরাব কি তার সাথে দেখা করবে? শুন্য দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকায় আবু তোরাব। বুকের মধ্যে রক্তের কাঁপন টের পায়, মাথার মধ্যে আবার ফণা তুলতে শুরু করে চ-াল রাগ। দেখা করবে সে আফরোজার সাথে, অবশ্যই দেখা করবে। কী করবে তারপর? অভিশাপ দেবে? গায়ে হাত তুলবে? নাকি পাগলের মত কান্নাকাটি করবে?

ভাইয়ের পিছু পিছু ঘরে ঢোকে আবু তোরাব। ভেতরের দিকের একটা কক্ষের দরজার ভারি পর্দা সরিয়ে ভেতরে যায় কালাম। হাতছানি দিয়ে ডাকে তোরাবকে। যন্ত্রের মত ভেতরে ঢোকেব তোরাব। বিছানার ওপর আলুথালু ভঙ্গিতে পড়ে আছে একটি মানবমূর্তি। তোরাব ভেতরে প্রবেশ করার সাথে সাথেই, কার যেন অদৃশ্য ইঙ্গিতে সেই মূর্তিতে প্রাণসঞ্চার হয়, নড়ে উঠে সে, তারপর আধশোয়া হয়ে উঠে বসে।

একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আবু তোরাব। আফরোজাকে চিনতে কষ্ট হয়। চোখদুটো রক্তজবার মত লাল, চোখের নিচে কালি। এলোমেলো, বি¯্রস্ত চুল চারদিকে ছড়িয়ে আছে। অপলকে আফরোজার দিকে তাকিয়ে থাকল আবু তোরাব, তারপর তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সাদা কাপড়ে মোড়া আবু হামজার ছোট্ট শরীর আর কবরের ওপর মুঠি মুঠি কালো মাটি। আবু তোরাবের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা ছাই চাপা আগুন যেন ধকধক করে জ্বলে উঠল।

‘তুই আমার পোলারে শেষ করছস,’ দাঁতে দাঁত ঘষে বলল সে। ‘আমার জীবনডারে শেষ করছস। তোরে আমি ছাড়মু না!’

আফরোজা স্তব্ধ, অবোধ প্রাণীর মত তাকিয়ে আছে আবু তোরাবের দিকে।

‘কী না করছি আমি তোর লাইগা? তুই একটা চোরের মাইয়া, তোর বাপেরে পিটায়া মারছে মানুষ, তারপরও তোরে বিয়া করছি আমি। আমার ভাইয়ের, আমার বাপ-মা’র অভিশাপ মাথায় নিয়া। হের লাইগাই এত বড় শাস্তি দিছস তুই আমারে?’

‘তোরাব, এইসব কী কইতাছস? মাথা খারাপ অইয়া গেল তোর?’

আবুল কালামের ভর্ৎসনা গায়ে মাখে না আবু তোরাব। তার চোখে ধিকিধিকি জ্বলা আগুন, দৃঢ়বদ্ধ চোয়াল আর তীব্র চাহনি দেখে মনে হয় আসলেই পাগল হয়ে গেছে সে। আফরোজার দিকে এক পা বাড়ায় সে, ঘৃণায় থিকথিকে কন্ঠস্বরে বলে, ‘বেশি কিছু চাইছিলাম তোর কাছে? বেশি কিছু চাইছিলাম? খালি আমার পোলাডারে দেইখা রাখবি। ক্যান রাখস নাই? কোন নাগরের কাছে গেছিলি হারামজাদি? ক কোন নাগরের কাছে গেছিলি?’

ভাইকে নিবৃত করার জন্য তার কাঁধে হাত রাখতে যায় আবুল কালাম, এক ঝটকায় হাত সরিয়ে দেয় তোরাব, তারপর মারমুখী ভঙ্গিতে আরো এক পা এগোয় আফরোজার দিকে। ‘আইজ আমি কারো কোনো কথাই হুনমু না। কিয়ের লাইগা হুনমু? আমার কলিজার টুকরারে মাইরা ফালাইছে ঐ কালনাগিনী, আমি তারে মাথায় তুইলা নাচমু? জবাব দেস না ক্যান হারামজাদি? ক, আমি তোর কোন ক্ষতি করছিলাম? ক!’

আফরোজা নির্বাক। পুতুলের মত অনড় হয়ে বসে আছে। গর্তের ভেতর বসে যাওয়া চোখে কোনো ভাষা নেই, নিস্পলক তাকিয়ে আছে আবু তোরাবের দিকে।

‘আহারে আমার পোলা, আমার কলিজার টুকরা!’ বুকে চাপড় দিয়ে আহাজারি করে ওঠে আবু তোরাব। ‘কার লাইগা মাথার ঘাম পায়ে ফালাইয়া, দিনেরে রাইত আর রাইতেরে দিন কইরা টঙ্গিতে পইড়া থাকলাম আমি! কার লাইগা? তোগো লাইগাই তো। আর তুই কী করলি? তুই আমার বুকের ধনরে কাইড়া নিলি। ক্যান নিলি, তুই মরতে পারস না?’ উদ্যত হাত তুলে আরো এক পা এগোয় আবু তোরাব, ভীত হরিণীর মত মাথাটা পিছিয়ে নেয় আফরোজা। তার চুল চেপে ধরে খাট থেকে টেনে নামায় আবু তোরাব, আফরোজাকে হিড়হিড় করে দরজার দিকে টেনে নিতে নিতে বলে, ‘যা চোরের মাইয়া, গলায় ফাঁস দিয়া মর! আর য্যান কোনোদিন না দেখি তোরে!’

দরজার কাছে নিয়ে এক ধাক্কায় তাকে বের করে দেয় আবু তোরাব, উঠানে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আফরোজা। টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়, তারপর রান্নাঘরের পাশ দিয়ে এলোমেলো পায়ে পেছনের আমবাগানের দিকে চলে যায়। তার শাড়ির দীর্ঘ আঁচল মাটিতে লুটাচ্ছে, চুলে লেগে আছে ধুলো আর কাদা। আফরোজার বিধ্বস্ত, কম্পমান শরীরটা আমবাগানের ভেতর পুরোপুরি অপসৃত হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থাকে আবু তোরাব, তারপর ধপ করে বসে পড়ে দাওয়ায়। হাঁটুতে মুখ গুজে বসে থাকে।

‘এইডা একটা কাম করলি তুই?’ তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলে কালাম। ‘ইচ্ছা কইরা নিজের সন্তানরে মারে কেউ? তোর পোলা মরছে, ওরডা মরে নাই? সন্তানহারা একটা মায়ের লগে এই ব্যবহার ক্যামনে করলি তুই?’

আবু তোরাব মাথা তুলে ভাইয়ের দিকে তাকায়। 

‘পোলাডারে যক্ষের ধনের মত আগলাইয়া রাখত মাইয়াডা, আমরা তো দেখছি। পোলা যে কোন ফাঁকে পুকুরের দিকে চইলা গেছে হ্যায় জানব কেমনে? বড় খারাপ কাজ করছস তোরাব, বড় খারাপ কাজ করছস। এহন মাইয়াডা যদি নদীতে ঝাপ দিয়া পড়ে তাইলে?’

ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে আবু তোরাব। আফরোজার বোবা দৃষ্টি, তার ধুলো-কাদামাখা চুল, কাঁপতে কাঁপতে চলে যাওয়া Ñ এ সবই সিনেমার দৃশ্যের মত ভাসতে থাকে তার চোখে। তার বুকের গহনে একটা ঝড় ওঠে, সেই ঝড়ে ছিন্নপত্রের মত ভাসতে থাকে একটির পর একটি দৃশ্য। পান খেয়ে লাল করা ঠোঁটে আফরোজার হাসি, আবু হামজাকে ভাত খাওয়ানোর জন্য আফরোজার প্রাণান্ত চেষ্টা, দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে আবু তোরাবকে বিদায় জানানো...

আবু তোরাবের বুকের মধ্যে ঢেউ ওঠে, আবু হামজা চলে যাওয়ার পর তার জীবনে সামান্য যেটুকু আলো আছে সেই আলোটিও এক ফুঁৎকারে নিভে যাওয়ার আশঙ্কা আর অজানা এক আতঙ্ক তাকে এলোমেলো করে দেয়। স্খলিত পায়ে উঠে দাঁড়ায় আবু তোরাব। তারপর দৌড়ায় আমবাগানের দিকে, পেছন পেছন দৌড়াতে থাকে আবুল কালামও।

ঐ তো সামনে আমবাগান, বসন্তপুরের বিল, বংশী নদী...

ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকে আবু তোরাব। তার চুলগুলো উড়তে থাকে পতাকার মত, বুকের খাঁচা ছেড়ে বেেিরয় আসতে চায় হৃৎপি-টি। লুঙ্গিতে পা জড়িয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয় বারবার, তবু সমস্ত শক্তি দিয়ে, উজানে বৈঠা ঠেলবার মত দৌড়াতে থাকে সে।

বসন্তপুরের বিল এখন শুকনো। বিল পেরোতেই বংশী নদীর ঢেউয়ের রূপালি ঝিলিক চোখে পড়ে। শেষ বিকেলের রোদে এঁকেবেঁকে বয়ে যাওয়া নদীটিকে আবু তোরাবের উ™£ান্ত চোখে জীবন-মৃত্যুর সীমানা বলে ভ্রম হতে থাকে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন