মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

লরি মুর'এর গল্প : জুনিপার গাছ

ভাষান্তর : মিতা চৌধুরী

“রবিন রস” সে রাতে হাসপাতালে মৃত্যু যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছিল। আর আমি একজন লোকের আসার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। লোকটি আমাকে বাসা থেকে তুলে নেবে। আমার সঙ্গে এই লোকটির সম্পর্ক হওয়ার এক মাস আগে রবিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। তার দেরি দেখে আমি ভাবছিলাম ওঁকে সঙ্গে নিয়ে রবিনকে দেখতে যাওয়াটা আসলে ঠিক হবে কিনা। আমার মনে হয় একাই যাওয়া উচিত। আমাদের সহকর্মি জেজি সকালে ফোন দিয়ে বলছিল “রবিনের অবস্থা বেশি ভালো না। হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিলেও সে আর বাড়িতে যেতে পারবে বলে মনে হয় না।”

“আজ রাতেই আমি ওঁকে দেখতে যাচ্ছি,” আমি বললাম। আমার মনে হচ্ছিল আমি এক কথার মানুষ--আমি যা বলি তা করে ফেলি। এটা এক ধরনের শক্তি বলে মনে হয় এবং ম্যাজিকের মতোই ঢের শক্তি। 

“খুব ভালো হবে,” জেজি’র বলল।

লোকটি ছিল আমাদের কলেজের নাট্যবিভাগের প্রধান কর্তা, আর রবীনের অনুরোধে সে স্বামীর মতোই এই দ্বায়িত্বটি নিয়েছিল। রবীনের ভাগ্য সম্পর্কে তার কান্নাকাটি ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিল। এইডস রোগে ৮০’র দশকে সে আরো একজন বন্ধুকে হারিয়েছিল, আর তাই গত কয়েকমাস ধরে রবিন’এর অসুস্থতা জনিত এবং আইনি কাজকর্মের সিদ্ধান্তে পৌছতে তাকে তেমন বেগ পেতে হচ্ছে না। 

কিন্তু আমি তখনও অপেক্ষা করছিলাম, দ্রুতই ঘড়িতে সাড়ে সাতটা বাজলো, তারপর রাত আট’টা। আমি কল্পনায় দেখছিলাম ক্লান্ত রবিন হাসপাতালের লোহার ফ্রেম লাগানো খাটে ঘুমিয়ে আছে , এবং সকালে ওঁকে আর একটু প্রাণবন্ত লাগবে। শেষপর্যন্ত লোকটা যখন এলো আমি তাকে বললাম “ কত দেরি হয়েছে, তুমি জানো তা? আমরা বরং তাহলে রবিনকে সকালেই দেখতে যাই, তখন সে সজাগ আর একটু সুস্থও থাকবে। বেচারা, টিউমারটা ওর মাথার ভেতর ঢুকে যাওয়াতে আরো বেশি কষ্ট পাচ্ছে”।

“তোমার যা ভালো মনে হয়”, লোকটির উত্তর। আমি তাকে জেজির কথাগুলো শোনালাম। শোনালাম যে, হাসপাতাল থেকে রবিন আর বাড়ি ফিরতে পারবে না, লোকটা তখন হতবুদ্ধি হয়ে গেল। 

“ তাহলে ও কোথায় যাবে?” রবিন’এর সঙ্গে ওর সম্পর্কটা বেশিদিন টিকে নাই, মাত্র কয়েক সপ্তাহের স্থায়িত্ব পেয়েছিল ওদের প্রেম, আর রবিনকে ও ঠিক বুঝেও উঠতে পারেনি ওই স্বল্প সময়ে। লোকটা আমার কাছে একবার অভিযোগ করেছিল, “ওর গ্যারেজটা ছিল একটা আস্তাকুঁড়। আমি না দেখলে বিশ্বাসও করতে পারতাম না যে ওখানে কত জঞ্জাল রাখা আছে”। 

আমি সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে ভাবছিলাম, ও আমাকেও একই কথা বলবে। আমার নিজের গ্যারেজটাও অত গোছানো না, যাই হোক । আমিও নাম জানা না জানা বহু বস্তু দিয়ে আমার নিজ গ্যারেজ ঠেসে রেখেছি। আর আমি ততদিনে এটাও বুঝতে পেরেছিলাম এই লোক বহু নারীকে কিংকর্ত্যবিমুঢ় বানিয়েছে। আর খুব শীঘ্রই আমিও তার কাছে পরিণত হবো অবোধ্য আর অতি সাধারণে। এই হলো আমাদের এই শহরের মধ্যবয়সি নারীদের প্রেমের জীবন : একজন পুরুষকেই পাওয়া যায় এক বছর বা তার চেয়ে বেশি কিছু দিনের জন্য, যেনতেন সে’ই পালা করে সবার কাছে ঘুরতে থাকে। হাসতে হাসতে রবিন বলেছিল “ আমি তোমাকে ভাগ দিতে পারি। আমি ভালো ভাগাভাগি করতে পারি”।

“আমি পারি না” আমি বললাম। “অন্তত ভাগাভাগিতে আমি মোটেও ভালো না”।

আমি আবারও লোকটার উদ্দেশ্যে বললাম “ দেরি হয়ে গিয়ছে”, তারপর মোমবাতিটা জ্বেলে দিয়ে দুটো জিন রিকি মিক্স বানালাম।

এখানের যত মহিলাকে আমি জানি সবাই রাতে মাতাল থাকে। ঠিক জায়গাটিতে আমাদের ভালোবাসার খুদে খুদে শক্তিকে খুঁজছিল আমাদের মায়েরা। তাদের খুঁজতে দেখেছিলাম আমরা। কিন্তু বংশধারার জিন, পুরুষ-মানুষ, উচ্চ বিদ্যালয়, আমাদের মা এবং এদের কাউকে এই জায়গাটিতে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমরা সব বন্ধুরাই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম, আমরা ছিলাম অনেকটা দূর্গ থেকে বহুদূরে অবস্থান করা একদল শিল্প সৈন্য--অথবা এরকম কিছুই আমরা কল্পনা করেছিলাম। সবার মধ্যে আমিই ছিলাম একমাত্র ভাগ্যবান যার এখন পর্যন্ত খারাপ কিছু ঘটে নাই।

পরদিন সকালে আমি একটা চেরি রঙের পোষাক পরে তৈরী হলাম। কমলা আর লাল। রবিন’এর জন্য নেয়ার মতো তেমনকিছুই ছিল না, তাই আমি কিছু ডাঁটিসহ ফুল দিয়ে একটা তোড়া বানালাম। আর একটা প্লাস্টিক কাপে তোড়াটি রাখলাম। ডাঁটির গোড়ায় কয়েকটি ভেজা পেপার টাওয়েল গুঁজে দিলাম। আমি যখন বের হবো বলে দরজার দিকে এগোলাম তখনই ফোনটা বেঁজে উঠলো। ফোনটা করেছে জেজি। আমি বললাম “ আমি রবিনকে দেখতে বের হচ্ছিলাম এখনই”।

“তার আর দরকার হবে না”।

“ওহ--না।” আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। আমার দৃষ্টিশক্তি যেন কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে গেলো।

“ও কাল রাতে মারা গিয়েছে। আনুমানিক ভোর রাত দু’টার দিকে”।

আমি ধপাস করে একটা চেয়ারে বসে পড়লাম, ফুলের তোড়াটি আমার হাত থেকে পড়ে গেল। দুটো ফুলের ডাঁটি ভেঙ্গে গেল। “হায় খোদা,” আমি হাহাকার করে উঠলাম।

“আমি বুঝতে পারছি তোমার অবস্থা,” সে বলল।

“আমি কাল--রাতেই ওঁকে দেখতে যাচ্ছিলাম। পরে ভাবলাম রাত বেশি হয়ে গেছে বলে সকালে ও যখন বিশ্রাম নিয়ে একটু সতেজ থাকবে তখন যাব,” আমি না কাঁদার চেষ্টা করছিলাম।

“তুমি এ নিয়ে অস্থির হয়ো না। ,” জেজি বলল।

“আমার খুব খারাপ লাগছে।” আমার কাঁদছিলাম, যেন আমি না যাওয়াতেই এসব হলো।

“ও আসলে খুবই ভুগছিল। ও এক অর্থে বেঁচে গিয়েছে”। 

জানা ছিল, অসুখটা সারার নয়। ওর অসুখের শুরু থেকে শেষ বিপর্যয় ঘটবে। সেমিস্টারের শুরতে ও যথারীতি শিক্ষকতা শুরু করল। কিন্তু আচমকাই ওর নতুন কেমো’টা ওর শরীরে আর কাজ করছিল না। ভয়ানক রকমের অসুস্থতা নিয়ে ও হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সামনে কংক্রিটের উপর জুবুথুবু হয়ে পড়ে রইল। তার ভয় ছিল-- জরুরী বিভাগের ভেতরে থাকলে অন্য রোগীদের কাছ থেকে জীবানু আক্রমণ করতে পারে। পরে ওকে হাসপাতালের মেইন ওয়ার্ডে ভর্তি করে নেয়া হলো। স্বাভবতই সে যায়গাটিও ছিল অন্য রোগীর জীবানু দিয়ে ঠাসা। ও সেখানে সপ্তাহের উপরে ছিল আর এই পুরো সময়ের মধ্যে আমি ওঁকে একবারের জন্যও দেখতে যেতে পারিনি। 

“সবকিছু আমার কাছে খুব অবিশ্বাস্য লাগছে।”

“আমি বুঝতে পারছি।”

“তুমি কেমন আছ”? এবার আমি জানতে চাইলাম। 

“আমার পক্ষে ওখানে যাওয়াটাও অসম্ভব', সে উত্তরে বলল।

“আমার পক্ষ থেকে কোন কিছু করার মতো থাকলে অবশ্যই ফোন দেবে।”, আমার শূন্য গলায় বললাম। “ ওর সৎকার কখন হবে আমাকে জানিও”।

“অবশ্যই।” সে জবাব দিল। 

আমি উপরতালায় গেলাম। আমার সেই চেরি রঙের পোষাকেই বিছানায় ফিরে গেলাম। বিছানাটায় এখনো কেমন যেন একটা পুরুষালী গন্ধ রয়ে গিয়েছ। আমি চাদর টেনে মাথা ঢেকে শুয়ে রইলাম, আমার শরীরের প্রতিমা মাংসপেশি অসার হয়ে আসছিল। আমি নড়তেও পারছিলাম না।

তবুও আমি নিশ্চয়ই কিছু সময়ের জন্য ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। কারণ নিচতলার ডোরবেলের শব্দে যখন আমি আমার আমার মুখের উপরের চাদর সরিয়ে তাকালাম তখন দেখি-- এর মধ্যে অন্ধকার হয়ে গিয়েছে চারপাশ। দিন ছোট হয়ে আসার কারণে সুর্য এখন চার’টায় পরে ডুবে যায়। তাই জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দিনের সময়টা অনুমান করা কঠিন। আমি ডোরবেলের শব্দ শুনে নিচে নামতে নামতে শোবারঘর, হলঘর, সিড়ি সবখানের আলো জ্বেলে দিলাম। বাইরের পোর্চের আলো জ্বেলে দরজা খুললাম।

ইসাবেলকে দেখতে পেলাম। ও দাঁড়িয়ে আছে। ওর কোটের বা’পাশের হাতটি একপাশে কাত হয়ে ঢলঢল করে ঝুলেছিল, ওর পাশেই দাঁড়ানো প্যাট। প্যাটের গভীর চোখ দুটো ছিল কুকুরদের মতো একটু খ্যাপাটে আর জ্বলজ্বলে। “আমরা জিন এনেছি, রিকি মিক্সড এনেছি।” ওদের দু’জনের হাতে ধরা ব্যাগের দিকে নির্দেশ করে বলল। “তাড়াতাড়ি কর। আমরা রবিনকে দেখতে যাচ্ছি”।

“ কিন্তু আমি ভেবেছিলাম রবিন মারা গিয়েছে”, আমি বললাম।

প্যাট আমার দিকে একবার তাকাল। ” হ্যা, তা ঠিক”। সে বলল। 

“ওটা ছিল বাজে হাসপাতাল,” ইসাবেল বলল। ও আজকে ওর নকল হাতটি খুলে এসেছে। খুব বেশি দরকার না হলে অন্যের সাহায্য নিতে হয় বলে ও ঐ বস্তুটির ব্যবহার তেমন করে না। কিন্তু রবিন এখন বাসায় ফিরেছে। আর আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে,” 

“ কী করে সম্ভব!” 

“তুমি ওদের চেনো আর তাদের ব্যাপার স্যাপারগুলো জানো। ” প্যাট’এর উত্তর দিল। “এ দু’টির সম্পর্ক ছিন্ন করা বেশ কঠিন।” বছর দুই আগে প্যাট’এর একটা বড় স্ট্রোক হয়েছিল, সেই থেকে ওর উচ্ছ্বল ব্যাক্তিত্বটা হারিয়ে গিয়েছে। আর স্মৃতিশক্তিও লোপ পেয়েছে। আবার সময় সময় ওর সবকিছু ঠিক হয়ে যায়। আর মনে হয় ও আবার আগের হাসিখুশিতে উচ্ছ্বল সেই প্যাট। তখন ও নিজেই বুঝতে পারে আর বলে, “মনে হয় আমি অনেক বছর ঘুমিয়ে ছিলাম।”, আর এই প্যাটের এই হাসি খুশি স্থায়ী হয় অল্প কিছুদিনের জন্য, তারপর ওর অনিদ্রা , আড্ডা দেয়া, পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ, ছবি আঁকা এ সবই চলতে থাকে বিরামহীন ভাবে। এরপর একদিন হঠাৎ আবার যেই সেই-- গম্ভীর চুপচাপ হয়ে যায় প্যাট। ওর এই অসুস্থতার জন্য ও এখন কলেজ থেকে ছুটিতে আছে। ওর দেখভাল করার জন্য একজন ছাত্র নিয়োগ দেয়া হয়েছে সারাদিনের জন্য। 

আমি বললাম, “ মনে হয় আমরা সবাই একটু বেশি জিন পান করে ফেলেছি”।

কিছু সময়ের জন্য একটা নিরবতা নেমে এলো। “তুমি কি দুর্ঘটনার ব্যাপারটা মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছ?” ইসাবেল’এর গলায় অভিযোগের সুর। ও ওর বা হাতটি একটি গাড়ীর সঙ্গে এক্সিডেন্টে ক্ষত বিক্ষত হয়েছিল। একজন সার্জন তার পুরো দল নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে তারপর ওর হাতটি আবার পুনঃস্থাপন করতে সফল হয়েছিল, কিন্তু সেখান থেকে চামড়ার নিচ দিয়ে অনবরত রক্ত পড়তো। আর অসহ্য যন্ত্রনায় কষ্ট পাচ্ছিল— ওর প্রথম নাচের পরে যখন ও শুধুই একজন দর্শক ছিল না, একটি একক নৃত্যানুষ্ঠানের সময় ওঁকে অনেক কসরত করতে হয়েছিল। আর টানা দেয়া দড়ির উপর দাড়িয়ে বহুবার ঘুরতে হয়ছিল, মঞ্চ জুড়ে ছিল ওর রক্তের দাগ— এবং এর ঠিক এক বছর পর ও সেই সার্জনের কাছেই ফিরে গিয়ে অনুরোধ করলো পুরো হাতটি ফেলে দিতে। ও ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল, আর পারছিল না ও।

“না না”, আমি বলে উঠলাম। “আমি কোন কিছুর প্রসঙ্গেই টানছি না”।

“তাহলে আর কি, চল চল” প্যাট বলে উঠলো। মনে হলো ও আগের অস্থায় আছে এখন, হাসি খুশি উচ্ছ্বল প্যাট। “রবিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

“কী নিয়ে যাবো?”

“ কী নিয়ে যাবে?” বলেই প্যাট আর ইসাবেল হাসাতে ভেঙ্গে পড়লো। “ তুমি মজা করছো, তাই না?”

“ও মজা করছে,” ইসাবেল বলল। ও আমার কমলা সোয়েট্যারের হাতটি ছুয়ে দেখলো, যেটা আমি তখনও পরেছিলাম। “শোন, এই রংটা তোমাকে মানিয়েছে। কোথায় পেয়েছিলে এটা?”

“ভুলে গিয়েছি।”

“হ্যা, আমিও,” প্যাট’ও বলল, তারপরই সে আর ইসাবেল আবার হাসাতে ফেটে পড়লো। আমি জুতা পরলাম, হাতে একটা জ্যাকেট নিয়ে ওদের সঙ্গে চললাম।

রবিন’এর বাসায় যেতে ইসাবেল ড্রাইভ করলো এক হাতে। আমরা যখন পৌঁছলাম, তখন সারা বাড়ীজুড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আর রাস্তার আলো এসে সবকিছু আরো ভৌতিক করে তুলেছিল। রবিন রূপকথার উপর নাটক লিখতো , তাই ওর বাড়ীর সামনের অংশ ছিল সেরকম গাছগাছালিতে ভরা। সেগুলো বেশ এলোমেলো ভাবে লাগানো। রূপকথার গল্পে যে ধরনের গুল্ম আর গাছের বর্ণনা বেশি থাকে সেরকম আপেল, জুনিপার, কাঠবাদাম আর গোলাপের ঝাড় সেখানে রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই এলাকাটি এধরনের গাছের জন্য খুব একটা উপযুক্ত ছিল না। এমন কি অন্যান্য গাছগাছলিও বছরের এই সময়টাতে এসে কেমন যেন নিষ্প্রাণ আর নির্জীব হয়ে যায়। এই সময়টাতে যখন পাতা হারিয়ে গাছগুলো ন্যাড়া হয়ে যায় , তখন মাঝে মাঝে এটা মৃত গাছ, না জীবিত গাছ তা বুঝতেই সমস্যা হয়। বসন্তে এলে এর উত্তর পাওয়া যায়।

একজন পুরুষ এত সুন্দর বাগান বাদ দিয়ে কেন গ্যারেজ নিয়ে পড়ে আছে? এই প্রশ্ন দিয়ে কারো ব্যাক্তিত্বের বিচার করা যায় না। নিজেকেই একবার ওর জায়গায় বসিয়ে দেখো, কেউ তখন আর দোষ খুঁজে পাবে না। 

আর একজন পুরুষ রবিনকে রেখে অন্য কোন কিছুর দিকে নজর দেয়’ইবা কি করে?

আমরা ড্রাইভওয়েতেই গাড়ী রাখলাম। সেখানে এখনো রবিন’এর গাড়ীটি দাঁড়িয়ে আছে, সন্দেহাতীতভাবে ওর গ্যারেজ তালা দেয়া আছে— এই অন্ধকারেও রাস্তার দিকে মুখ করা জানালা দিয়ে যে কেউ দেখতে পারবে ওর গ্যারেজ বাক্সের উপর আরো বাক্স দিয়ে ঠাসা।

“ দরজার মাদুরের নিচে চাবি রাখা আছে” ইসাবেল বলল। যদিও আমি জানতাম না কিছুই। কিন্তু কেমন করে যেন ও জানে। প্যাট চাবিটি খুঁজে পেলো যথাস্থানে। চাবি দিয়ে ও দরজাটি সন্তর্পনে খুলল। আমরা সবাই ঘরের ভেতর ঢুকে গেলাম। “ঘরের বাতি জ্বালিও না,” ইসাবেল আমাদের নির্দেশ দিল।

“ আমি জানি,” প্যাট ফিসফিস করে বলল। যদিও আমি জানতাম না এর কিছু। 

“কেনো আমরা আলো জ্বালাতে পারবো না,” আমি ফিসফিস করেই জানতে চাইলাম। আমাদের পিছনের দরজাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, আমরা দাঁড়িয়ে আছি শান্ত আর গাঢ় অন্ধকার ঘরে। 

“পুলিশ? “ প্যাট জানালো।

“না, পুলিশ নয়।,” ইসাবেল বলল।

“তাহলে কি?”

“ বাদ দাও। একটু অপেক্ষা করো। দেখবে অল্প সময়ের মধ্যেই তোমার চোখ এতে মানিয়ে নিয়েছে।” আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমাদের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনছিলাম। আমরা নড়ছিলামও না, যেন কোনো কিছুতে পা আটকে পড়ে না যাই ।

এবং তারপর, ঘরের অপর প্রান্তে, হল ঘরের শেষ প্রান্তের কোথাও একটা ছোট্ট আলো জ্বলে উঠলো। আমরা নিচের কোন কিছু দেখতে পারছিলাম না। কিন্তু কোত্থেকে যেনো রবিন ঢুকলো। ওর মধ্যে কোন পরিবর্তন নেই। ঠিক আগের মতোই দেখতে। তবে ওর গলায় জড়িয়ে বাঁধা রয়েছে একটা সুতির সাদা ওড়না। সাদা রঙের কারণে ওর দাঁতগুলিতে একটা জ্যোর্তিময় ঔজ্জ্বল্য এসেছে। এছাড়াও ওঁকে উচ্ছ্বল আর রাজকীয় লাগছিল। ও আমাকে সমেত সবার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। আমার মনে হচ্ছিল ও আসলে আমাকে পরীক্ষা করে দেখছে। এরপর ও ওর তর্জনটি ঠোঁটে চেপে ধরে মাথাটা না সুচক ভাবে নাড়লো। আর তাই আমরাও কোন কথা বলি নি।

“তুমি এসেছো,” নিরবতা ভেঙ্গে ওর প্রথম কথা, সোজাসুজি আমাকেই লক্ষ্য করে বলল। “ হাসপাতালে থাকতে আমি তোমাকে একটু মিস করছিলাম।” ওর হাসিটা এবার স্পষ্ট আর উদ্দেশ্যমুলক হলো।

“আমি খুবই দুঃখিত”, আমি অপরাধী গলায় বললাম।

“কোন সমস্যা নাই, ওরা তোমাকে সব বলবে,” ইসাবেল আর প্যাটকে উদ্দেশ্য করে ও বলল। “এই ব্যাপারটা একটু বেশি খারাপ ছিল।”

“ খুবই খারাপ ছিল,” প্যাট যোগ করলো।

'দাঁড়িয়ে থেকে কাউকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে দেখা ব্যাপারটা দেখা সহজ নয়, ” এবার ইসাবেল আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল। 

“ আর এর কারণ?” রবিন একটু রুঢ় গলায় বলল। তারপর গলাটা পরিস্কার করলো। “ কোনো জড়িয়ে ধরা চলবে না। পোস্টমর্টেম এবং টানা সপ্তাহ জুড়ে গলার ভেতর টিউব ঢুকানো আর বের করার কারনে সবকিছু এখনো বিপদজ্জনক অবস্থায় আছে। শুধু এই ওড়নাটা দিয়ে আমার মাথাটা শরীরের সঙ্গে আটকে রেখেছি।” যদিও ওঁকে ফ্যাকাসে লাগছিল, তারপরও ওর দাঁড়ানোর ভঙ্গীটা ছিল নিখুঁত। ওর গাঢ় লাল চুলগুলো সুন্দর করে এলিয়ে রাখা। ওর নিখুঁত সুন্দর লম্বা হাত জোড়া ভাঁজ করে রেখেছে বুকের উপর। ও ওর নিয়মিত পোষাকই পরেছে--কালো জিন্সের উপর নীল রঙের সেয়েট্যার। হঠাৎ করেই আমার মনে হচ্ছিল, ও একজন মহিয়সী, আর এই অসীমতার সঙ্গে মৃত্যুর কোথায় যেন সম্পর্ক ছিল। আমরা চেয়ার টেনে সবাই বসলাম।

“ আমরা কি একটু জিন রিকি বানাবো?” ব্যাগে রাখা লাইম জুস আর মদের দিকে ঝুঁকে ইসাবেল জানতে চাইলে।

“না, মনে হয় আজ থাক,” রবিন বলেছিল।

“ আমরা এখানে এসে প্রত্যেকেই তোমাকে কিছু উপহার দিতে চেয়ছিলাম,” প্যাট বলল।

“আমরা তাই চেয়ছিলাম?” আমি বললাম। “আমি তো কিছুই আনিনি। আমি তোমার জন্য কিছু আনতে পারি কিনা তা ওদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। আর আমার কথাটা ওরা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল।”

রবিন আমার দিকে তাকালো। “সবসময় একটা অজুহাত, তাই না।” তারপর উপহাসের ভঙ্গীতে হাসলো।

প্যাট ওর ঝোলানো ব্যাগটায় কিছু একটা যেনো খুঁজছিল। তা এতক্ষণ আমি লক্ষ্যই করি নি।

“এখানে একটা ছোট্ট পেইন্টিং আছে। সেটা আমি তোমার জন্য এঁকেছিলাম,” রবিনকে একটা ক্যানভাস হস্তান্তর করতে করতে সে বলল। সেটা বাঁধানো হয়নি। পেইন্টিংটা কেমন হয়েছে সেটা আমি দেখতে পারছিলাম। রবিন ওটার দিকে অনেক সময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো। তারপর প্যাট-এর দিকে তাকিয়ে বলল, “ তোমাকে অনেক ধন্যবাদ”। 

সাবধানে পেইন্টিংটা ও ওর কোলের উপর রাখল। আর তখন খালি ক্যানভাসটাকে দেখতে পেলাম। ক্যানভাসটা শূন্য-- কোন কিছুই আঁকা নেই।

আমি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে মদ সহ কাগজের প্যাকেটার দিকে তাকালাম।

“আর আমি তোমাকে একটা নতুন নাচ দেখাবো,” ইসাবেল উত্তেজিতভাবে ফিসফিস করলো।

“তুমি নাচবে,” আমি বিস্ময় নিয়ে বললাম।

রবিন আবার আমার দিকে ঘুরলো। “সবসময় সবার শেষে সবকিছু জানো, তাই না,” বলেই ছটফট করে উঠলো যেন কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছিল। ও প্যাট এর দেয়া পেইন্টিংটা ওর পেটে চেপে ধরলো।

ইসাবেল দাঁড়িয়ে ওর পাশে রাখা চেয়ারটা সরালো। “ এই অংশটুকু তোমার জন্য উৎসর্গ করা”, সে ঘোষণা দিল। এরপর কিছু সময় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর ও আস্তে আস্তে ঘুরতে শুরু করলো। আর বরাবরের মতোই ওর নিজের পছন্দের কবিতার লাইন আওড়াতে লাগলো, “পাহাড়ের ওখানে আছে গাঁদা, আছে গোলাপ যা সে খুব ভালোবাসে/ কেনো গোলাপ দিয়ে ওকে ভ্রষ্ট করছো/ যা কিনা ও শুকতে পারছে না দখতে পারছে না।” আরো কি কি সব বলেই চলল সেই কবিতা থেকে। ও একপায়ের ওপর ভর করে ঘুরেই চলছি। মনে হচ্ছিল ও যেনো শুন্যে উড়ছে। আর আমি ভাবছিলাম এটা কেমন আজব কবিতার অংশ। এটা আমার কাছে খুব রুঢ় লাগছিল। কবিতায় একজন মৃত লোককে আবার মৃত্যুর কথা বলা হচ্ছে। আমি বার বার রবিন এর মুখের দিকে তাকিয়ে এরকম একটা উদ্ভট একটা কবিতা শুনে ওর মুখের প্রতিক্রিয়া কেমন হয় সেটা বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু রবিনকে বেশ নির্লপ্ত আর আবেগহীন মনে হলো। নাচ শেষ হতেই বুকে চেপে ধরা পেইন্টিংটা কোলে নামিয়ে রবিন তালি দিতে লাগলো। আমিও তালি দিতে যাচ্ছিলাম আর ঠিক তখনই আচমকা ড্রাইভওয়ে থেকে রুমে হেডলাইটের আলো ঢুকলো।

“এটা পুলিশ! নিচু হয়ে থাকো!” বলেই ইসাবেল মেঝেতে শুয়ে পড়লো।

“আমার মন হচ্ছে ওরা বাসায় পাহারা দিতে এসেছে,” মাদুরের উপর শুয়ে রবিন ফিসফিস করে বলল। ও তখনও প্যাট এর দেয়া উপহারটা বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। “মনে হয় প্রতিবেশিদের কেউ বা অন্য কেউ পুলিশকে ফোন দিয়ে জানিয়েছে। চুপচাপ কিছুক্ষণ শুয়ে থাকো এখানে। আমাদের না দেখে ওরা চলে যাবে।” পুলিশের গাড়ীটা ড্রাইভওয়ে’তে মিনিট খানেক দাঁড়ালো। সম্ভবত ইসাবেল’এর গাড়ীর নাম্বার টুকে নিল। তারপর চলে গেলো। 

“আমরা এখন উঠে বসতে পারি,” রবিন বলল।

“বাব্বা, প্রায় যাচ্ছিলাম ধরা পড়ে”, প্যাট হাঁপ ছেড়ে বলল।

আমরা সবাই আমাদের চেয়ারে ফিরে গেলাম। রবিন’এর একটু সমস্যা হচ্ছিল। তারপর একটা লম্বা নীরবতা নেমে এলো, যেনো আমরা কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বসে অপেক্ষা করছিলাম পরবর্তী ঘটনাক্রম দেখার জন্য। এবং অপেক্ষাটা আসলে আমার জন্য-- সেটা আমি বুঝতে পারছিলাম।

“আচ্ছা, তাহলে এখন আমার পালা,” আমি নীরবতা ভেঙ্গে বললাম। “এই মাস’টা আমার খুব খারাপ কেটেছে। প্রথমে নির্বাচন, আর এখন এটা। এই--তুমি,” আমি রবিনকে উদ্দেশ্য করে বললাম। সে সামান্য তাকালেও প্রথমে মাথাটা, তারপর ওর গলায় জড়ানো ওড়নাটা ধরে ঠিকঠাক করলো আবার। “এবং আমার সঙ্গে ভায়োলিন বা পিয়ানো কিছুই নেই যেটা আমি বাজাবো,” আমি যোগ করলাম। ইসাবেল আর প্যাট আমার দিকে তাকাচ্ছিল অনেকটা হতাশ দৃষ্টি নিয়েই। “সুতরাং— আমি বরং একটা গান গাই।” আমি দাঁড়িয়ে গিয়ে আমার গলা পরিস্কার করলাম। আমি খুব ভালো করেই জানতাম “আকাশের উজ্জল তারা’রা” গানটি যদি খুব ধীরে আবেগ দিয়ে গাওয়া যায় তবে শুধু যে এর ভাবের পরিবর্তন হয় তাই নয়, বরং আক্ষরিক অর্থের মধ্যেও পরিবর্তন আসে। তখন গানটা প্রতিবাদ মূলক জিজ্ঞাসাতে পরিণত হয়। আমি খুবই ধীর লয়ে গানটা গাইছিলাম। আমার এই ধীর লয়ে গাওয়া গানটার আলাদা একটা গভীরতা ছিল। গান শেষ করে আমি বসে পড়লাম। ওরা তিনজনই গানটাতে বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিল। ইসাবেল উত্তেজনায় ওর উরু নাচাচ্ছিল।

“খুব ভাল হয়েছে,” রবিন বলল। “তোমার আরো গাওয়া উচিত “ ও যোগ করলো। আমার লক্ষ্য ওর হাসিটা ছিল খোঁচা দেয়া আর উদ্দ্শ্য প্রণোদিত। “এখন আমাকে যেতে হবে,” বলে ও উঠে দাঁড়ালো। বুকে জড়ানো প্যাট’এর দেয়া পেইন্টিংটা চেয়ারের পিছনে রেখে দিল। তারপর হলঘরের আবছা আলোতে হেঁটে চলে গেলো। এবং এরপর আমরা হলঘরের আলোটা নিভিয়ে দেয়ার শব্দ পেলাম। সমস্ত ঘর জুড়ে আবার কবরের অন্ধকার।

বাড়ী ফিরতে ফিরতে আমি বললাম, “ আমরা ওর সঙ্গে দেখা করতে পেরেছি বলে আমি খুব খুশি হয়েছি।” আমি পিছনে একা বসে বসে একটু জিন পান করছিলাম— লাইম জুসের সঙ্গে মেশানোর দরকারও প্রয়োজন মনে করিনি। জিন’এর গ্লাস হাতে আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিলাম। আর হঠাৎই সামনে তাকিয়ে দেখি প্যাট গাড়ী চালাচ্ছে। বেশ কিছু সময় হলো প্যাট এখন আর ড্রাইভ করে না। বাম্পার “No Hillary, No way” লেখা মাঝারি আকারের একটা পিকআপ ভ্যান গর্জন তুলে আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। আর আমরা গাড়ীর বাম্পার লাগানো স্টিকারটার দিকে অমন ভাবে তাকিয়ে রইলাম যেন সেই স্টিকারে স্বস্তিকা চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি। আমরা কোথায় বাস করতাম?

“বেয়াদপ” ইসাবেল বিড়বিড় করে ঐ ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বলল।

“এটা একটা ফাঁদ, তাই নয় কি,” আমি বলে উঠলাম।

“কোনটার কথা বলছো?” প্যাট জানতে চাইলো।

“এই জায়গাটা,” ইসাবেল উম্মা প্রকাশ করে বলল। “আমাদের কাজ; আমাদের ঘর, আমাদের কলেজ”।

“এগুলো সবই আসলে ফাঁদ,” আমি আবার বললাম। 

কিন্তু আমরা এটা সবটুকুই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমাদের মনের ছোট্ট কোনো এক গহীনে লুকিয়ে ছিল কিছু দুরন্ত শিশু। আমাদের জীবন ভালোই চলছিল। আমরা যেখানে ভালো লাগতো সেখানে যেতাম, যা ভালোবাসতাম তাই করতাম। কিন্তু আমাদের নিজ কারণেই হোক বা অন্য কারোর জন্যই হোক-- আসলে আমরা ছিলাম অন্ধ কূপে আটকে পড়া অসমর্থ একটি দল। আমাদের শক্তি এবং সামর্থ্য--কোনটাই ছিলনা সেই কূপ থেকে বেরিয়ে আসার। আমি পেছনে বসে আবারও বললাম “ রবিনকে দেখতে পেয়ে ভালো লাগছে,” “ ওঁকে দেখতে পেয়ে আমি খুব খুশি”।

“ঠিক বলেছ,” ইসাবেল উত্তর দিল। প্যাট নিরুত্তর রইলো। সে তার ঐ পাগলাটে সময়ে ফিরে যাচ্ছিল আর গাড়ী চালানোর কারণে ও এখন আরো গম্ভীর। 

“সবচেয়ে বড় কথা হলো; আমরা একটা সুন্দর রাত কাটিয়েছি”, আমি বললাম।

“হ্যা রাত’টা সত্যিই সুন্দর ছিল,” ইসাবেল সম্মতি জানালো।

শেষবারের মতো সুস্থ অবস্থায় রবিন যখন বলেছিল “শুভ রাত্রি' তখন সে ওর নিজের বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম। দু’জনে একসঙ্গে সময় কাটাবো বলে ও আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিল ওর বাসায়। ওর ভাজি করা গ্রীষ্মকালিন সবজি খেতে খেতে যখন আমাকে ঐ লোকটা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল তখন আমাদের মাঝে একটা উষ্ম নিরবতা নেমে এসেছিল। লোকটার সঙ্গে কিছুদিনের জন্য ওর প্রেম ছিল।

“ঠিক জানি না,” আমি বলেছিলাম। বলেছিলাম একটু ভারী গলায় । আমি তখন চেয়ারে বসে ছিলাম আর আবিস্কার করলাম-- আমি ভাতের দানা আঙ্গুল দিয়ে ডলে ডলে গোল করার চেষ্টা করছি। রবিন বলেছিল, “ এখন আমার মনে হচ্ছে ও অন্য আরো একজনের সঙ্গে প্রেম করছে— তার নাম ড্যাফনি কার? তুমি চিনতে পারছো তাকে? সে ও ঐসব বিউটিশিয়ান কাম আর্ট ডিলারদের একজন।” 

এলাকার সব রেঁস্তোরা , কফির দোকান, স্যালন হঠাৎ করেই শিল্পকর্মের প্রদর্শনী এবং বিক্রি দু’টোই শুরু করেছে। আমার সুন্দর গানের গলা, পিয়ালো আর ভায়োলিন বাজানোর দক্ষতার কারণে আমি কি নিজেকে অন্যদের চেয়ে উপযুক্ত আর আকর্ষণী ভেবেছিলাম”।

“আমি ড্যাফনিকে জানি। আমি ওর কাছে একটা যোগ ব্যায়ামের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। ও তখন এটা শেখাতো”

“তুমি তাকে চিনতে?” আমি নিজেকে আর সংবরণ করতে পারছিলাম না। “তা ওর এমন কি বিশেষ গুন আছে শুনি,” আমি চেষ্টা করেও আমার গলার আবেগ ঢাকতে পারছিলাম না। “সে কি আমার চেয়েও ভালো?”

“ড্যাফনি সুন্দরী, রুচিবান এবং একটু পাগলাটে,” রবিন তার সকল গুণের বর্ণনা দিচ্ছিল। “সে আসলে একজন মেধাবী যোগ ব্যায়ামের প্রশিক্ষক। সে খুবই আবেদনময়ী। এমন কি ও যখন কথা বলে তখনও সে তার শারীরিক ভাষা খুব ব্যাবহার করে। আর সত্যি বলতে কি জানো? সে সম্ভবত বিছানায় ছেলেদের তুষ্ট করতে পারে খুব।”

আমার হৃদপিন্ড যেন কেউ চেপে ধরলো, আমার পায়ের আঙ্গুল থেকে শুরু করে শরীরের বা’পাশটা যেন অসাড় হয়ে আসছিল। নিজেকে বিশালতর মাঝে একটা ক্ষুদ্র নুড়ী পাথরের মতো মনে হয়েছিল। নিজেকে সামলে নিচ্ছিলাম। কিন্তু মিষ্টি খাবারের সময় আবার সব আগের মতো হয়ে গেলো।

রবিন চেয়ার ছেড়ে উঠে ময়লা প্লেট বাটি গুছাতে গুছাতে বলেছিল, “ তোমার জন ল্যামন ম্যারেং পাই করেছি।” ও আরো অনেক বেশি গল্প লিখতে পারতো যদি ও এসব পাই বানানোতে সময় একটু কম ব্যায় করতো। 

“আমি দুঃখিত যে আসলে লেবু কম হয়ে গিয়েছে। আর ম্যারেং অনেক বেশি হয়েছে”।

“ওহ, ধন্যবাদ, আমি আর কিছু খেতে পারবো না।,” আমি নিচের দিকে তাকিয়ে আমার না শেষ করা খাবার দেখিয়ে বলছিলাম।

“আমি দুঃখিত” অস্থির গলায় রবিন বলল। “আমার ড্যাফনি বিষয়ে ঐ কথাগুলো বলা একদম ঠিক হয়নি।”

“না, তা নয়,” আমি উত্তরে বললাম। “আমি ঠিক আছি, এগুলো কিছু না।” কিন্তু কিছুক্ষনের মাঝেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমাকে যেতে হবে, এবং এর পরে এক কাপ চা কোনরকম শেষ করেই আমি উঠে দাড়ালাম, নোংড়া থালাবাসন পরিস্কারেও রবিন কে তেমন সাহায্য করলাম না। আমি আমার পার্সটা খুঁজে নিয়ে সোজা দরজার দিকে রওনা দিলাম। 

না খাওয়া একটা পাই হাতে ধরে , ও দড়জার সামনে দাড়িয়ে ছিল। “ বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, এই স্কার্ট’টা খুব সুন্দর”, ও উৎফুল্ল গলায় বলল। “কমলা রঙে তোমাকে মানায়। কমলা আর সোনালী।”

“ধন্যবাদ “ উত্তরে বললাম।

এরপর কোনরকমের পূর্বাভাস ছাড়াই হঠাৎ ও হাতের পাই’টি ওর নিজের মুখে চেপে ধরলো। পাই এর টিন’টা মুখ থেকে টেনে যখন সরালো তখন ওর সারা মুখ জুড়ে তুষারের মতো সাদা সাদা ম্যারেং লেগেছিল। ওর চোখের পিশি, ভ্রু সবকিছুতে পাই’এর ফেনা তোলা ম্যারেং লেগে আছে, আর ওর গাঢ় লাল চুলে সবকিছু মিলিয়ে ওঁকে উন্মাদ রানী এলিজাবেথের মতো লাগছিল।

“মানে কি?” আমি মাথা ঝাকিয়ে একটু বিরক্ত গলায় বললাম। আমাকে আসলে নতুন বন্ধু খুঁজতে হবে। আমি আরো বেশি করে নতুন নতুন কন্ফারেন্সে গেলে আরো নতুন মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবো। 

“আমি সবসময় এরকম হাস্যকর কিছু করতে চাচ্ছিলাম,” রবিন’এর হাস্যোজ্জল উত্তর। পাই এর ফেনায় ঢাকা ওর মুখটি আমার কাছে হাস্যকর লাগেনি, বরং ওঁকে আমার ভুতুরে লাগছিল, মুখ ভরা সাদা ফেনায় ঢাকা মুখে ও যখন কথা বলছিল তখন ওঁকে মনে হচ্ছিল যেন কোন ভবন গ্রহের প্রানী, যেন অনেকটা পাপ্যাট বা মাছের মতো। “আমি এরকম হাস্যকর কিছু করাতে অনেক দিন ধরেই চাইছিলাম, অবশেষে আজকে করলাম।” 

“শোন,” আমি বললাম । “শো ব্যাবসার চেয়ে ভালো কোন ব্যাবসা নেই।” আমি আমার গাড়ীর চাবি খুঁজছিলাম আমার সারা ব্যাগজুড়ে।

ওর লম্বা চুলগুলো মাথার উপর উড়ছিল, ওর মুখ থেকে গড়িয়ে একটুকরো পাই নিচে মেঝেতে পরল, ও আমাকে মঞ্চের মতো করেই নুয়ে কুর্নিশের একটা ভঙ্গি করলো যেনো মাত্রই শেষ করলো কোন পারফর্মেন্স। “সবকিছুই” ও ওর পাই’এর মুখোশ।ার আড়াল থেকে বলে চলল। “সব, সব, সত্যি বলতে, সবকিছু এই নাটকের অংশ,”— প্রায় গড়িয়ে পরা একটা পাই এর অংশ মুখের কোনা থেকে চোটে নিয়ে— “ এটা আবেগী।”

“চমৎকার,” আমি স্মিত হেসে উত্তর দিলাম। ততক্ষনে আমি চবিটা খুঁজে পেয়েছিলাম। “এখন আমি যাচ্ছি।” 

“অবশ্যই”, ও যে হাতে পাই নেই তা নাড়িয়ে বলেছিল।
লেখক পরিচিতি
লরি মুর
মার্কিন লেখক লরি মুর'এর জন্ম ১৯৫৭ সালে। তার লেখা কৌতুকপুর্ণ। তার প্রকাশিত বইয়ের নাম--Who Will Run The Frog Hospital(1994) ,Birds of America (1998), A Gate at the Stairs (2009) , Bark (2014)। 


অনুবাদক পরিচিতি
মিতা চৌধুরী
অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন