মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

বিদ্যাসাগরের জন্মসার্ধশতবর্ষ ও গ্রাম মধুবনীর নকুল মণ্ডল

জ্যোৎস্নাময় ঘোষ 
---------------------------------------------------------------------------------
হারিয়ে যাওয়া গল্পটি নিয়ে অমর মিত্রের নোট--
জ্যোৎস্নাময় ঘোষের এই গল্প, 'বিদ্যাসাগরের জন্মসার্ধশতবর্ষ ও গ্রাম মধুবনীর নকুল মণ্ডল' লেখা হয়েছিল ১৯৭২-৭৩ নাগাদ। জ্যোৎস্নাময় ঘোষ এখন বেঁচে নেই। নাট্যকার হিশেবেও তিনি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন সেই সময়। থিয়েটারে গিয়ে গল্প থেকে সরে গিয়েছিলেন একটু। কলম ছিল অসামান্য। কলকাতা থেকে দূরে থাকতেন নৈহাটি ,গরিফা। আমি একবার তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম বহু বছর আগে। তিনি লিখতেন পরিচয়, চতুষ্কোণ, সাহিত্যপত্র ইত্যাদি পত্রিকায়। পরিচয় পত্রিকায় তাঁর গল্প 'কাজি সাহেব' এখনো মনে আছে। 'এবং আমরা' নামে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এই গল্প।

বিদ্যাসাগরের জম্মসার্ধশতবর্ষ ও গ্রাম মধুবনীর নকুল মণ্ডল

আরে এই নকুল, নোক্‌লে বাড়ি আচিস? -- নকুল মণ্ডলের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়ে নকড়ি, সেই সঙ্গে সাইকেলের ঘন্টিও বাজতে থাকে জোরে জোরে। 

ছিটে বেড়ার দরজা পেরিয়ে নকড়ির হাঁক এবং ঘণ্টির বাজনা ভেতর বাড়ির উঠোনে দাপাদাপি করে বেড়াতে থাকে, কুন্তি গোবরের তাল ফেলে পড়ি-মরি করে ছুটে আসে, বাঁ হাতে ঘোমটা টেনে বেড়ার আড়াল থেকে ফিফিস করে বলে, সি তো বাড়ি লাই, মাটে।

অ। --কথাটা বলেই সাইকেলের বেলের কান মুচড়ে দেয় নকড়ি। --তালে একটা খবর করাও। তার এয়েচে। জরুরী খবর মনে লিচ্চে। 

কি এসিচে-- বলে কিছুক্ষণ শব্দটাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করে অবরুদ্ধ কান্নায় ভেঙে পড়ে কুন্তি, ও আমার কি হঅলো রে বা-বা...। 

নকডি অপ্রস্তুত। গাঁয়ের ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসের পিওন সে, খবর বিলনো তার কাজ, অবিশ্যি কালেভদ্রে কখনো-সখনো ‘তার' আসে মধুবনী গাঁয়ের ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসে, নকড়ি তার দীর্ঘ ছ-বছরের পিওন জীবনে ‘তার’ বিলিয়েছে মাত্র পাঁচটি। গাঁয়ের লোকজনের মতো তারও একটা ‘তার-ভীতি’ রয়েছে, তারের খবর সাধারণত ভাল হয় না। তবু, নকুল মণ্ডলের বর্ষীয়ান বউ কুন্তির এই আকস্মিক বিলাপ-ধ্বনিতে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে সে, এই মুহূর্তের কুন্তিকে যেন চিনতে পারে না নকড়ি, কে বলবে, এই কুন্তির দাপটেই মধুবনী গাঁয়ের পুব পাড়ায় কাক-চিল তিষ্ঠোতে পারে না। 

নকড়ি সান্ত্বনা দেয়ার মতো করে বলে, কী বেপদ, বলি কাঁদতে নেগেচ ক্যানে! নোলেকে খবর দাও, কী বেত্তান্ত জানো আগে, তারপর ঝা হয় কোরো। তুমি ঝে৷ বাপু আগ বাড়িয়ে কাঁদতে নাগলে-- 

অরে বাবা গ-অ, ড্যাকরা কী সব্বনেশে খবর নে এয়েচে গ, বা-বা, অরে, আমার কি হবি রে.... 

কুস্তির বিলাপ শুনে পুবপাড়া ভেঙে পড়ে। প্রথমে আসে গতিপিসি, পেট খালাস থেকে শুরু করে শাখা ভাঙা পর্যন্ত পুবপাড়ার, বলতে গেলে, মধুবনী গাঁয়ের সব বউ-ঝিয়ারিদেরই সুখে-দুঃখে বুক দিয়ে যিনি পড়েন সেই গতিপিসি। গতিপিসি ছিটেবেড়ার আব্রু ঠেলে ভেতরে ঢুকে দুহাতে কুন্তিকে জড়িয়ে ধরে, কুন্তির শোকের বেগ তাতে আরো বেড়ে যায়, গতিপিসির বাহুমূলে গোবরছানা হাতের আঙুলের ছাপ ফেলে ডুকরে ওঠে কুন্তি, অ পিসি, আমি ঝে আর বাপের মুখ দেখতি পেলাম না গ পিসি— 

বাইরে গদাধর মণ্ডল ঘষা-ঘষা চোখে নকড়ির দিকে তাকিয়ে ধমকে ওঠে, মেয়াছলের কাছে তুই ডম্ফাই দ্যাখাস, হারামজাদা। নোকলের কাছে খবরটা দিতে কি হয়েছিল! বরাবর দেখে আসচি তোর এই কচালি। 

নকড়ির চোখে মুখে অসহাতার ছায়া পড়ে, সমবেত জন-মনিষ্যিকে যেন সাক্ষী মেনে সে বলে, ইতে আমার দুষটা কোথায় বলোদিন! গাদাজ্যাটা মিচিমিচিই আমাকে গালমন্দ করতি নেগেছে। আমি হঅচ্চি সরকারি নোক, আমি ক্যানে কচালি করতে গেলাম,নক্‌লের বউকে বঅল্লাম ঝে, নোক্‌লের খবর করো, তার এয়েচে। তা সি বেম্‌মাণ্ড ভাইস্যে দিল কেঁদে, কথাটা কানে নিলে! নোক্,লের বউ কাঁদে ক্যান অকে শুধাও দেখি-- 

গদাধর বাজখাঁই হাঁক হাঁকল, নেবারণ, নোক্‌লকে ডেকে আন, ঝা। বলি অ গতি, নোকলের ভার্যাকে থামতে বলো। বেত্তান্তটা কি আগে শুনি। 

গতিপিসি মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠে, ঐ ঘাটের মড়া নকড়িটাকে আগে তাড়াও গদাদা। মুয়ে আগুন অমন সরকারি নোকের। এ্যা, তোর কি কোনো ভালো খবর দিতে নেই রে আবাগীর ব্যাটা! আঃ, বউ, চুপ কর দিন, বেত্তান্তটা আগে শোন। আগেভাগেই যদি এতো কাঁদিস, তা হোলে পরে কি করবি মা, জল যে সব শুক্‌কে যাবে ত্যাখোন! চুপ কর-- 

নকড়ি ব্যাজার-ব্যাজার মুখে জিওল গাছের গোড়ায় সাইকেল দাঁড় করিয়ে রেখে একটু তফাতে গিয়ে দাঁড়ায়। নকুল মণ্ডলের বাড়ির উঠোন এবং সামনেটায় তখন লোকজন থিকথিক। পরান হালদার গুটিগুটি নকড়ির পাশটিতে এসে দাঁড়ায়, ট্যাঁক থেকে বিড়ি বের করে নকড়িকে দেয়, নিজেও ধরায়, তারপর ভেতরের ধোঁয়া বাইরে বের করে দিতে দিতে দমধরা গলায় বলে, গতিপিসির এটা অন্যায়, হ, নির্যস। কথাটা শেষ করেই সতর্ক ভঙ্গিতে চারপাশটায় নজর বুলিয়ে খাটো গলায় অন্তরঙ্গ সুরে নকড়ির ওপর ঝুঁকে পড়ে সে, নোক্‌লের বউটা, বুয়েলে না, এ্যমান কাঁদচে ঝ্যান কতোই না শোক হঅচ্চে। এ-সব হঅচ্চে গে তোমার ঐ নোক দ্যাখানো। সি কেঁদেলো বটে দখিন পাড়ার মুখিমাসী। তিন দিন নাগাডে কেঁদেলো, কনে দে ঝে সুজ্জি গেল, চন্দ্র গেল-- তিন দিন তিন রাত পর মুখিমাসী তো কান্না থামালে, বামুন দিঘিতে ডুব দে কোরা থান পরে তে ভাত চাপ্‌পে আবার বসি গেল ডাক ছাড়ি, তারপর ভাত নামে, বুয়েচ না, তিন থাবা খেয়ে নে বাসন-কোসন ঘষে-মেজে আবার পা ছড়ায়ে বসি গেল রাতের নামে-- হ্যা তাকে বলে শোক, বুয়েচ, নকড়ি ভাই। তার কাচে নাগে এ-সব! 

অভিমানে কংবা ধোঁইয়ার চাপেই হয়তবা, নকড়ির গলা বুজে বুজে আসে, বলোদিন,গদা জ্যাটার এটা কি একটা উচিত কাজ হঅয়েচে, এ্যা! আমার দুষটা কি বলো। সরকার আমাকে রাখিচে কি করতি, বলো- না না, বলো-- 

সি তো বটেই। কথাটা খুব জোর দিয়েই বললে পরাণ, আরে আমাকে তা আর বলতে হবি নে। সদরের ইস্কুলে পাঁচ কেলাস পড়েছি, বুয়েছ। প্যাটে কালির আঁচড় রয়েছে, আমাকে বুঝাতে হবি নে। 

এমন সময় নকুল মণ্ডলের ভরাট গলার চিৎকার ভেসে এল, বলি হঅয়েচেডা কি, হ্যা, এত নোকজন জমিচে ক্যানে, আরে হেই—মুখে চিৎকার নিয়েই নকুল ছুটে এল,ঘামতেল্পমাজা অসুরের মতো দেখাছিল তাকে, হাতপায়ে শুকনো মাটি, নেতানো ঘাস,বাড়ির কাছ বরাবর আস্তেই হাঁটার বেগ মরে গেল তার। 

গদাধর দুচোখে শুন্য দৃষ্টি নিয়ে নকুলের চিৎকার লক্ষ্য করে এগিয়ে যায়, লাঠির মাথায় দুহাতের ভর রেখে কাঁপা-কাঁপা গলায় জিগ্‌গেশ করে, নোক্‌লে এলি?। 

হ, জ্যাটা। – নকুল তার সামনে এসে দাঁড়ায়। 

নকড়ি কি ঝ্যানে খবর এনেচে, আর তোর ভার্যা ইদিকে কেঁটে কেটে-- 

এই যে নোক্‌লে— নকুলকে দেখে নকড়ি এগিয়ে যায়, তোর তার এয়েচে। নিয়ে আমাকে ধন্যি করো। বাপরে বাপ, এমন গেরোতেও পড়ে মানুষ। 

কী এয়েছে? – নকুলের চোখে মুখে বিস্ময় ঝিলিক দিয়ে গেল। হাঁ করে তাকিয়ে রইল সে নকড়ির দিকে। 

তার, তার – টেলি টেলি, বুঝলি নে ? 

অ, অ-অ, অ-অ-অ! তাই বলো! - নকুলের মুখ ক্রমশ সহজ হয়ে আসে কি—তা কি নিকেচে? 

আ মোলো! তা আমি ঝানবো কি করে? আমি কি দেখিচি নাকি তাই? এই নে— সই কর এই কাগজডায়। 

হে হে-- বোকার মতো হেসে ওঠে নকুল, হে, আমি কঅরবো সই, এ্যা। নক্‌ড়ে, তুই কি শালা গাঁজা খাস? 

আচ্চা, বাবা, আচ্চা— শব্দগুলো যেন আলতো করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় নকড়ি, টিপ সই দে। তা তো পারবি, নাকি? 

হ-হ, সি ঠিক পারবো, বলতে বলতে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল চুলের ওপর ঘষে নেয় সে, তারপর নকড়ির দিকে একটি বিশেষ মুদ্রায় আঙুলটি বাড়িয়ে দিয়ে বলে, কালি নাগা। ভালো করে নাগাস। 

বিরক্তিতে ঝাঁকিয়ে ওঠে নকড়ি, কালি কি আমি সঙ্গে নে ঘুরচি নাকি। এই রইলো তোমার তার, ওব্‌লা গিয়ে সই করে এসো। 

নকড়ি সাইকেল উঠিয়ে নিতেই নকুল তাকে চেপে ধরে প্রায়, কি নিকেচে পড়ে যাও। 

নিকেচে, উ— পড়তি হবে? আচ্চা— সাইকেলে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় নকড়ি, তার চারপাশে ছোটখাটো একটা ভিড় গড়ে ওঠে, খামটা এক টানে ছিড়ে ফেলে ভেতরকার গোলাপী আভার কাগজখানা সামনে মেলে ধরে, তার দৃষ্টি মৌমাছির মতো 

গানে ছিড়ে ফেলে সে, রে, তার দৃষ্টি মৌমাছির মতো 

কাগজখানার ওপর দিয়ে ঘুরে ঘুরে যায়, থিতোয় না—খানিকবাদেই চোখ-ভুরু কুঁচকে যায় তার, ডান হাতে রোদ ঠেকিয়ে বলে, এই য্‌যা, চশমাডা, চশমাডা তো আনি নি—পরাণ, ও পরাণ, দ্যাখোদিনি, তুমি কিছু ঠাউরাতে পারো কিনা--
হ্যা, আমার বলে কতো কতো কাজ রয়েচে মাটে—গতিপিসি কি আর ওমনি ওমনি বলে,মুয়ে আগুন. অমন সরকারি নোকের’-- বলতে বলতে রাগতভাবে বড় বড় পা ফেলে বোধহয় মাঠের দিকেই হাঁটতে থাকে পরাণ। 

তা হলে ও কতাই থাকলো নোক্‌লে-- বলে প্যাডেলে পা রেখে নকড়ি দ্যাখ-না-দ্যাখ করে উধাও। 

হাতে কাগজখানা নিয়ে 

নির্বোধের মতো দাঁড়িয়ে নকুল, আশপাশের লোকেরা দু-এক করে সরে পড়ে, গতিপিসি ভেতর বাড়ি থেকে বাইরে এসে একসময় বলেন,ভেতরে যা নোক্‌লে-- 

ভেতরে পা দিতেই বিলাপে খান্‌ খান্‌ কুন্তি, নকুল স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে পড়ে, 

কাগজখানার আঁকিবুকির দিকে নজর পড়তেই আবার বাইরে পা রাখে সে, বেরিয়ে আসার আগে কুন্তির পিঠে হাত রেখে ভেজাভেজা গলায় সে বলল, চিটিডা পইড়ে নে সি। তুই তো জানিস বউ, হাড় মুকখুর সাথে বিয়ে হয়েছে তোর - কাঁদিস নি, আমি এলাম বলে— 

কি যে একখানা আঙুল গজিয়েছিস, বাপ, য্যানে গদা একখানা। এইখানটায় দেখি, দাঁড়া দাঁড়া, অত তাড়াহুড়ো করিস নে-এ্যা – এ্যা—হ্যা, হয়েছে। ওঃ, কি একখান টিপরে বাবা, পুরো কাগজটাই নিয়ে নিলি! কাগজখানা ভাঁজ করে খাতার ভেতর ঢুকিয়ে রেখে হরিপদ মাস্টার নকুলের দিকে চেয়ে বলল, হয়ে গেছে, তুই যা এখন। 

নকুল তার হাফহাতা শার্টের বুক পকেট থেকে টেলিগ্রামখানা বের করে হরিপদর দিকে বাড়িয়ে ধরে বলে, তারখানা ঝে পড়ে দিতি হয় ম্যাস্টার। 

হরিপদ মধুবনী ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার এবং গাঁয়ের পাঠশালার 

গুরুমশাই, দুইই। এ-তল্লাটের লোকজন, স্বভাবতই, এই ‘ডাবল মাস্টার’কে সমীহ করে। হরিপদ হাত বাড়িয়ে কাগজখানা নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরল, ভেংচি কেটে সেদিকে চেয়ে রইল, তার চোখ কখনো বিস্ফারিত, গোল-গোল, কখনো কুঞ্চিত,কুঁতকুঁতে হয়ে এল, মাথা ডাইনে-বাঁয়ে ক্রমাগত সঞ্চালিত হল তার, বেশ খানিকখন বাদে একটি আওয়াজ বের করল সে, হ্যাঁ:-- দাঁড়া, বলে, ভেতর পানে চলে গেল। 

ভেতরে গিয়ে পুরোহিত দর্পণ এবং হালফিল পাঁজির তলা থেকে মলাটহীনি বিবর্ণ 

ডিকশেনারি বের করল সে, কিন্তু পাতা ওল্টাতেই তার কপালে ঘাম দেখা 


দিল, এটি ‘বেঙ্গলি টু ইংলিশ’ ডিকশোনারি, হরিপদ বুঝতে পারল ‘ইংলিশ টু বেঙ্গলি’ খানা তার 

ছেলে হাতিয়েছে। হাতের কাগজখানা পুরোহিত দর্পণের পাশে রেখে যেন ধ্যানস্থ হয়ে বসে রইল সে। ঘামের স্রোত কপাল বেয়ে একেবেঁকে নিচের দিকে নেমে আসে ক্রমশই, মুখে নোনতা স্বাদ পেল হরিপদ। 

কিগো, নাওয়া-খাওয়া কি হবেনি? – ঘরে পা দিয়েই কিন্তু অবাক হয়ে যায় কমলা,তাড়াতাড়ি 

হরিপদর পাশে এসে দাঁড়ায়, গায়ে হাত রেখে উদ্‌বেগ নিয়ে বলে, কি হয়েছে গো? 

পাঁজর বেয়ে দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে হরিপদর, ন-না, কিছু নয়। সুভোকে একটা ভাল ডিকশেনারি কিনে দিতে হবে এবার, জানো। স্কুলের শেষ ক্লাশের পড়া, ঐটুকু ডিকশেনারিতে কি হয়! গরমের ছুটিতে ও এলে কথাটা মনে করিয়ে দিও তো। 

কমলা আরো ঘেঁষে দাঁড়ায়, দুচোখে ঘোর ঘোর বিস্ময় নিয়ে বলে, তোমার কোন অসুখ-বিসুক করেনি তো, হ্যা গো ? 

হরিপদ করুণ করে হাসে, উঠে পড়তে পড়তে বলে, হ্যা, এটা একটা অসুখই, তবে সারান যেত, কিন্তু রোগী আর চিকিৎসকে কখনো দেখা হল না— আমি আসছি-- 

হরিপদকে আসতে দেখে নকুল তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল, হরিপদ তার কাঁধে হাত রেখে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত বলল, কি জানো নকুল – সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ে যায় যে সে এ-তল্লাটের ‘ডাবল মাস্টার' - আর একটু হলে নিজের হাতেই নিজের সমাধি রচনা করছিল সে। নকুলের কাঁধ থেকে হাত নেমে আসে তার, মুখে কৃত্রিম কিংবা স্বাভাবিক গাম্ভীর্য নিয়ে ভারি গলায় সে বলে, ইয়ে, হয়েছে কি জানো নকুল, আমার এখন পুজোর সময়। এ-সময় বিজাতীয় ভাষা আমি পড়তে পারিনে। তুমি কি চাও নকুল, জেনে-শুনে আমি পাপ করি? 

না, পণ্ডিতমশাই, না! – অভিভূত নকুল হরিপদর পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে, আমার অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন, অপরাধ-- 

হরিপদ ডান হাত নকুলের মাথায় রেখে ক্ষমাসুন্দর ভঙ্গিতে বলে, ওঠো ওঠো, সন্তানের আবার অপরাধ কি-- 

নকুল ভার-ভার মনে পঞ্চায়েত অফিসের দিকে পা বাড়াল, হরিপদর দেবনিষ্ঠা তার মনের তন্ত্রিগুলো তখনো ছুঁয়ে রয়েছে, এবং সেই সঙ্গে রয়েছে অজানা এক অপরাধবোধের পীড়ন তার সমগ্র মন এবং অস্তিত্ব জুড়ে। 

সূর্য এখন মাথার ওপর খাড়াখাড়ি, ভরা মাঘেব জবুথবু প্রবীণ আকাশ থেকে দাপটের রোদ খাড়াই নেমে আসছে, গা-হাত-পা চিড়বিড় করে নকুলের,নীল নীল নখেরা ইতিউতি ঘুরে বেড়ায় শরীরে, শরীর যেন জ্যৈষ্ঠের খরার ফুটিফাটা মাটি, খোড়ি ওঠে সারা গায় নকুলের। 

হেই নোক্‌লে হে-ই! হ-হ-হ 

পঞ্চাননতলার কাছাকাছি আসতেই হাঁকটা শুনতে পেয়ে থেমে যায় নকুল। ঘুরে দাঁড়াতেই রাঘবকে হালের গরু তাড়াতে তাড়াতে এদিকপানে আসতে দেখে সে। রাঘব বেশ খানিকটা দূর থেকেই ভরাভরতি গলায় চিৎকার করে, 'তার' এয়েচে নাকি তোর বাড়ি? কি সব্বুনেশে! হ-হ-হ-হ, বলে ডান দিকের গরুটির লেজ মলে দিল সে। 

হ, সে এয়েছে একটা।-- নিস্পৃহ গলায় নকুল জবাব দেয়, সঙ্গে সঙ্গে পেছন ফিরে হাঁটতে থাকে। প্রসঙ্গটা যেন সে এড়িয়ে যেতে চায়। 

রাঘব তেজী গলায় চেঁচায়, আরে হেই, বলি বেত্তান্তটা কয়ে ঝা— 

নকুল দ্রুত পা চালায়, রাগত সুরে ঝাঁজিয়ে ওঠে, সি শালোর বেত্তান্ত কি আমিই ঝানি--এ এক জমেছে ভাল! মাথার ওপর সুজ্জি নিয়ে ঘুরে বেড়াও এখোন— 

পঞ্চায়েত অফিসে ‘তার’ পড়ার মতো কাউকেই দেখতে পেল না সে, বাবুরা শহরে গিয়েছেন ‘মিটিন’ করতে। অফিসের বারান্দায় গা এলিয়ে দিয়ে বসে পড়ল সে। ফটিক বেয়ারার তাকে দেখে কি যেন মনে হয়, পাশটিতে বসে ধীরে ধীরে জিগগেশ করে, কি হোয়েচে গা মোড়ল, তোমাকে ঝ্যানে ক্যামন-ক্যামন দেখাচ্ছে-- 

নকুল ঝপ করে ফটিকের দুহাত চেপে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে, ঠোট কেঁপে কেঁপে ওঠে তার, আমার বড় বেপদ ফটিক, ‘তার' এসিচে— 

কি এসিচে? কথাটা ঠিক মতো ধরতে পারে না ফটিক, অবাক চোখে নকুলকে ধরে রাখে তাই। 


নকুল পকেট থেকে কাগজখানা বের করে ফটিকের হাতে দেয়, ফটিক তা উল্টেপাল্টে নেড়েচেড়ে দেখে মন্তব্যের সুরে বলে, অ, টেলি- খারাপ খবর? 

নকুল মাথা নাড়ে, ভাঙা-ভাঙা গলায় অস্ফুটে জানায়, কী কতা জানতেই তো ঘুরে বেড়াচ্চি। 

ফটিক ঝটিতি উঠে পড়ে, বারান্দা থেকে নিচে নামতে নামতে বলে, আসো দিন, মেজোকত্তার ছাওয়াল কলেজে পড়ে, সি ঠিক পড়ি দিবে।। 

ফটিক নকুলকে সঙ্গে নিয়ে মেজকত্তার ছাওয়ালের সন্ধানে যায়। 

মেজোকত্তার ছাওয়াল বৈঠকখানায় ইয়ার-বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল তখন। ফটিক তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ভুরু কুঁচকে গেল তার, কী ব্যাপার! 

ফটিক আলগোছে তার সামনে কাগজখানা রেখে বিনীত ভঙ্গিতে বলে, এজ্ঞে, এটা 

যদি এটটু পড়ে দ্যান-- 

কাগজখানা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তুলে নিল সে, ভাঁজ খুলে দু-চার মুহূর্ত তাকাল, দেখতেই সারা মুখে বিরক্তির রেখা ফুটে উঠল তার, ইয়ার-বন্ধুদের দিকে কাগজখানা ছুড়ে দিয়ে বলল, দ্যাখো তো, কিছু বোঝ কিনা— 

কাগজখানা হাতফেরতা হতে থাকে, নানা রেখা ফুটে ওঠে তাদের মুখে, কেউ বা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে, কারো মুখে সূক্ষ্ম বিদ্রূপ খেলে যায়। কাগজখানা হাত ঘুরে ঘুরে আবার মেজকত্তার ছাওয়ালের কাছেই ফিরে আসে, দু আঙুলের ভাঁজে ধরে সে গম্ভীর গলায় বলে, এটা তোমার? 

গলার শব্দে ফটিক ঘাবড়ে যায়, তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, এজ্ঞে না কত্তা। এনার-- বলে পাশে দাঁড়ান নকুলকে দেখায় সে। 

অ। – তার সারা মুখে শ্রাবণের মেঘ থমথম, চোখ কাগজ থেকে নকুলের মুখে চলাফেরা করে। নকুল তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মেজকত্তার ছাওয়ালের কপালে জমে ওঠে বিন্দু বিন্দু ঘাম। তারপর একসময় প্রবল কণ্ঠে ধমকে ওঠে সে, করো কী? 

এজ্ঞে! ধমকের দাপটে দিশেহারা নকুল। 

চোখ কাগজ এবং কাগজ থেকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। 

কী করো? 

নকুল একেবারে হতভম্ব যেন। উত্তরটা মুখের কাছে এসে দলা পাকিয়ে যায়। মেজকত্তার ছাওয়াল আবার চড়া সুরে প্রশ্ন – বলি, করো কী তুমি ? 

এজ্ঞে, চাষির কাজ করি এজ্ঞে— 

চোপ্‌! গর্জে ওঠে মেজকত্তার ছাওয়াল।- - ব্যবসা ট্যাবসা কর না ? 

এজ্ঞে-- 

চোরাই চালান-টালান? 

এজ্ঞে - আমি – আমি – আপনি – শব্দগুলো ক্রমাগত গলায় আটকেআটকে যায় নকুলের। বাওয়া, সিংকিং সিংকিং ড্রিংকিং ওয়াটার, এ্যা! পাঞ্চুগোপাল কে? – ধমকের সুরে চেঁচিয়ে ওঠে সে।। 

পাঞ্চুগোপাল! – মনের আনাচে-কানাচে হাতড়ে বেড়ায় নকুল। একসময় মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার, অ, পাঁচুগাপাল— আমার জামাই! 

জামাই-- বা, বা! শ্বশুর-জামাই মিলে আজকাল - বেশ, বেশ! – মেজোকত্তার ছাওয়ালের চোখ সকলের ওপর দিয়ে এক চক্কর ঘুরে গেল। – ফরসেপস ডেলিভারি স্টপ'। ফরসেপস বলে কোন জিনিসের নাম শুনেছ? --ইয়ার-বন্ধুরা অকপটে জানালে বাপের জন্মেও এ-জিনিসের নাম শোনেনি তারা। -- আমিও শুনিনি।কিন্তু সে জিনিসের ডেলিভারি স্টপ অর্থাৎ চালান বন্ধ! – ‘মেল চাইল্ড স্টপ’। মেল হচ্ছে তো পুরুষ- তাহলে মানে দাঁড়াচ্ছে, পুরুষ বাচ্চার চালানও বন্ধ। এর যে কী অর্থ তা নোকুল আর তার জামাই-ই জানে।তবে মনে হচ্ছে কথাগুনো চোরাকারবারিদের সঙ্কেত। ফরসেপস হয়তো হচ্ছে শুপারি, মেল চাইল্ড হয়তো লবঙ্গ। জানা আছে নিশ্চয়ই। – ‘মাদার রিগেনিং'। রিগেনিং না, আসলো গেইন--রি’ 

কথাটা সেঁটে দেওয়া হয়েছে লোক ঠকানোর জন্যে। গেইন মানে তো জানোই, লাভ। মাদার গেইন মোটা লাভ। অথাৎ, ওই লবঙ্গ শুপারির চালান এখন যদিও বন্ধ, তবে সেজন্য চিন্তার কিছু নেই, মোটাসোটা লাভ পরে হবেই। - আশ্চর্য, হ্যা, দেখে তো হয় ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না— 

প্রবল আতঙ্কে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে নকুল, আমি কিছু জানি নে কত্তা-- 

যখন শহরে পৌঁছোল শীতের সূর্য তখন ডুবুড়ব, বুকের ভেতর চাপচাপ আতঙ্ক নিয়ে প্রমদা উকিলের বাড়ির দিকে হাঁটে সে, প্রমদা উকিলের সঙ্গে তার পরিচয় অনেক দিনের, দেওয়ানী মামলার সূত্রেই অবশ্য এই পরিচয়। প্রমদার বিদ্যাবুদ্ধি এবং যুক্তির ওপর নকুলের নির্ভরতা একসময় বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। 

নকুল আতিপাতি করে খুঁজে দেখেছে, কে তার সঙ্গে এই শত্রুতা করতে পারে। ‘তারটা' করেছে নাকি তার জামাই পাঁচুগোপাল, অর্থাৎ শশুর-জামাইকে ফাঁদে ফেলতে চাইছে কেউ। কে সে? - ভূপতি? – হতি পারে। পুবির ডাঙার জমিটা নিয়ে তার সঙ্গে একটা খারাখারি চলছে। তাছাড়া, দুর্গার ওপর একটা নজর ছেল - ‘দুগ্‌গাকে আমার বংশীর হাতে দে নোক্‌লে, সুখি থাকবি'-- কতোবার ঝে কতাডা শুনিয়েচে-- হতি পারে, ঐ শালো সে সুমুন্দিরই কাজ-- আচ্চা, আম্মো যদি না আজ ঠুকে যাচ্ছি গোটা দুয়েক মামলা তো আমার নাম নকুল মণ্ডল লয় 

টেলিগ্রামের কাগজটা হাতে নিয়ে বেশ করে একটা প্রতিশোধের ছক কাটে মনে মনে নকুল। 


এই সময়ই বড় ইস্কুলের গেটের সামনে প্রমদা উকিলের গাড়ি দেখতে পেল সে এবং গাড়ির পেছনের আসনে হেলান দেয়া প্রমদা উকিলকেও। সে গেটের মুখে পৌঁছোবার আগেই প্রমদার গাড়ি ভেতরে ঢুকে গেল। 

বড় ইস্কুল অর্থাৎ স্থানীয় কলেজের লনে বিশাল ম্যাপ দেখতে পেল নকুল। গেটে এবং গেটের কাছাকাছি রং-বাহার উজ্জল ছেলেমেয়েদের বুকে গোল গোল ব্যাজ লটকে লঘু পায়ে ঘুরে বেড়াতে দেখল সে। গেটের পাশে অনেকখন দাড়িয়ে থাক সে। তার সামনে দিয়ে হাতে-কার্ড-লোকজনেরা ভেতরে ঢুকে যেতে থাকে। বুকে-ব্যাজ ছেলেমেয়েদের নজর তার ওপর মাঝে মাঝে চলে আসে, কিন্তু তারা তাকে কেউ লক্ষ করে না। একসময়, সাহস কুড়িয়ে-বাড়িয়ে নিয়ে পাশের মেয়েটিকে সে জিগ্‌গেশ করে-- বুকের ভেতরটা অবস্য ঢিপঢিপ-- এখানে কি হঅচ্চে, মা নক্ষী? 

তার কথা বলার ঢংয়েই বোধহয়, মেয়েটির আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিন-চারটি মেয়ে 

খিলখিল করে হেসে ওঠে, একটি মেয়ে তাকে কুনুই দিয়ে গুতিয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে বলে, তোর ফাদার-ইন-ল জিগগেশ করছে, শোন। 

শুনবোই তো – তারপর তার 

দ্যাসাগরের নাম শুনেছেন? খ উদভাসিত হয়ে ওঠে, সি আপনিই ঝাই বলো ক্যানে, 

অন্যেরা সশব্দ। প্রথম মেয়েটি  আরক্তিম মুখে মুখ ঝাম্‌টা দিয়ে ওঠে, শুনবোই তো—তারপর তার দিকে ফিরে সহজ কণ্ঠে বলে, এখানে একটা মিটিং হচ্ছে। বিদ্যাসাগরের নাম শুনেছেন? 

এজ্ঞে- অ, বিদ্যেবাবুর কথা বলচেন- নকুলের মুখ উদ্‌ভাসিত হয়ে ওঠে, সি আর চিনিনি তাকে! রিদয় উকিলির মুয়ুরি তো? সি আপনিই ঝাই বলো ক্যানে, মনিষ্যিটি সুবিধের লয়, বেঝায়-- 

না না, সে নয়। – মোলায়েম করে হাসে মেয়েটি। অন্যেরা সশব্দে। প্রথম মেয়েটি মিষ্টি করে আরো একবার বোঝাবার চেষ্টা করে, ইনি একজন খুব—কি যে ছাই বলি— এই অচিন্ত্য, বিদ্যাসাগর সম্পর্কে একে কিছু বলো না। 

আপনি জানতে চাইছেন? ব্বা! – কলার উঁচু অচিন্ত্য নকুলের সামনে দাঁড়ায়। – ইনি আসলে আপনাদেরই লোক ছিলেন। শিক্ষা প্রসারে ইনি অনেক কিছু করে গিয়েছেন। তাঁর জন্যেই আজ দেশে... 

অচিন্ত্যর কথা শুনতে শুনতে নকুলের একবার মনে হয়, বিদ্যেসাগরকে দিয়ে ‘তারটা' পড়িয়ে নিতে পারলে মন্দ হতো না। 

বুঝলেন, তারই জন্মসার্ধশতবার্ষিকী উদ্যাপন করছি আমরা। তিনি আমাদের মাখে ভাষা— 

কি কচ্চেন ঝানো বললেন ?-- শব্দগুলো কেমন যেন তালগোল পাকানো বলে মনে হয় নকুলের। 

এ-বছর তাঁর জন্মের একশ পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হচ্ছে, বুঝলেন ? সে-জন্যেই একটি অনুষ্ঠান— 

বাব্বা! মেলাই দিন বেঁচে রয়েচেন ঝা হোক, এ্যা-- 

ছেলেটির পেছন থেকে তোলপাড় হাসির শব্দ ওঠে। অচিন্ত্যকে অসহায় দেখায়, তবু ঠোঁটের হাসিটুকু মিলিয়ে যেতে দেয় না সে, না না, একাত্তর বছর বয়সেই-- 

এই সময়ই মাইকে শোনা গেল ‘অচিন্ত্য মৈত্র, আপনি যেখানেই থাকুন, মঞ্চে চলে আসুন’-- অচিন্ত্য দ্রুত পায়ে চলে যায়, যাবার মুখে বলে, পরে কখনো বলব, কত্তা-- 

নকুল আবার একলা হয়ে পড়ে, গেটের পাল্লাদুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়, নকুল পাল্লার গায়ে হাত রেখে ওপাশের ছেলেটিকে বলে, আমি ভেতরে যাবো একবার,বাবু? তাকে দেখতি ঝ্যানো মনে লিচ্ছে। 

কার্ড আছে? 

এজ্ঞে! 

বাইরে দাঁড়িয়ে শুনুন। 

আচ-চা।- - এইখানটায় দাঁড়াই বাবু— 

কথা বলবেন না। ধমক খেয়ে নকুল থমকে পড়ে। ভেতর থেকে হঠাৎ গমগম করে মাইক বেজে ওঠে, ভরাট গলার আওয়াজ শোনা যায়, ভারতীয় রেনেসাঁসের প্রাণপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তর্কত তঞ্চিত তার আপন মণ্ডলীতে বারবার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। কিন্তু সমাজ যে-অংশে প্রাণবান, 

যেখানে কামার-কুমোর-তাঁতি-কৃষক এবং শ্রমিকের কর্মকাণ্ডে জীবনের নিয়ত অভিষেক, সেই অংশে বিদ্যাসাগরের সহজ প্রতিষ্ঠা। বাংলার নিরক্ষর তাঁতি ধুতির পাড়ে ‘বেঁচে থাক বিদ্যেসাগর চিরজীবী হয়ে’ এই ঐতিহাসিক বিবৃতি ধরে রেখে সমাজের ভদ্রমণ্ডলীর অকৃতজ্ঞতার বিরুদ্ধে ভদ্রেতর বাংলার.. 

ঘুম পায় নকুলের, একটু সরে এসে দেয়ালে ঠেসান দিয়ে বসে পড়ে সে, চারপাশে শব্দেরা ঘুরে-ঘুরে বাজতে থাকে, হাততালি পড়ে, ঘোষণা হয়, শব্দেরা আবার ঘুরে ঘুরে.. হাততালি... ঘোষণা... শব্দেরা... 

ভদ্রেতর বাংলার নকুল বিদ্যাসাগর জন্মসার্ধশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানের আয়তনের বাইরে বুকে সেই আতঙ্কের তারবার্তাটি চেপে অবশেষে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। আয়তনের বাইরে, কেননা, নকুলদের কার্ড বিলনো হয়নি। 

গাড়ির হর্নে নকুলের ঘুম ভাঙে। 

মিটিং তখন শেষ, হাতে হাতে আঠেরো টাকার বিদ্যাসাগর নিয়ে উনবিংশ শতকের ভদ্রজনদের অনিবার্য বংশধররা এবার ঘরমুখো । 

নকুল ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ায়, কষের লালা জামায় মুছে গেটের সামনে আসে সে, বুকে-ব্যাজ বর্ণালী তরুণ-তরুণীদের এখন আর দেখা যায় না, পায়ে পায়ে ভেতরে ঢুকে যায় সে, চক্‌চকে আলোর তলায় অনেক মানুষজন, আলোর ধার ঘেষে ঘেঁষে সন্তর্পণে সে হাঁটে, তার মনে হয় আলোর ভেতর পা রাখলেই হাজার কণ্ঠ যেন খিলখিল হো-হো হি-হি 

কী চাই?-- ভারী চোয়ালের তেজালো চেহারার একজন লোক তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে হঠাৎ রাগী গলায় প্রশ্ন করে। 

এজ্ঞে-- নকুলের জিব শুকিয়ে আসে, তবু কোন রকমে ঢোক গিলে গিলে বলে - ঠোঁটে-জিবে একাকার, এজ্ঞে, আমি একজনকে খুঁজছি, এজ্ঞে— 

কাকে খুঁজছো? 

এজ্ঞে - নামটা কিছুতেই মনে পড়ে না তার, ক্রমশ গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকে সে। 

কাকে খুঁজছো ? 

নকুলের মনে হয়, কানের গোড়ায় প্রচণ্ড শব্দের একটা পটকা ফাটল যেন, দুচোখ 

ঝাঁপিয়ে কান্না আসে তার।। 

নিবারণ, নিবারণ-- চীৎকার করে ওঠে লোকটি। 

আশপাশ থেকে অনেকেই ছুটে আসে, ত্রস্ত কণ্ঠ শোনা যায় এখানে-ওখানে, কী হল সার?গ 

এই লোকটা - 

কথাটা শেষ করতে পারে না সে, তার আগেই ছুটতে ছুটতে একজন এসে বলে, প্রমদাবাবু চলে যাচ্ছেন, সার, আপনাকে ডাকছেন। 

সেই মুহুর্তে ভেতরকার অন্ধকার ফালা ফালা করে দিয়ে বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠে, আকণ্ঠ অশ্রু নিয়ে ডুক্‌রে ওঠে নকুল, প্রমদাবাবু, প্রমদাবাবু কান্নার ঢেউ-এ পরবর্তী কথাগুলো ভেসে ভেসে চলে যায় যেন কোথায়। 

তেজালো চেহারার লোকটি কিছু যেন বুঝতে পারে, গলার স্বর যথাসম্ভব নরম করে বলে, প্রমদাবাবুকে খুঁজছো তুমি ? আহা, কান্নার কী হল! 

নকুল মাথা নাড়ে। 

লোকটি আদেশের মতো করে বলে, এস আমার সঙ্গে। 

নকুল তার পিছু পিছ, পা অবশ হয়ে হয়ে যায় তার, অজানা এক ভয়ের পাকে পাকে ক্রমশই যেন সে জড়িয়ে পড়ে, অনেক আলোকের ম্যারাপ পেছনে রেখে তিনতলা কোঠা বাড়ির গা ঘেঁষে ঘেঁষে একটি উজ্জ্বল ঘরের সামনে এসে সে থমকে দাঁড়ায়,লোকটি ভেতরে ঢুকে যায়। 

খানিকবাদেই প্রমদাবাবুর গলা শুনতে পায় নকুল, কে--কে গো ? ভেতরে এস। 

নকুলের পা ভারি হয়ে আসে, চৌকাঠে ভর রেখে সে দরজার সামনে দাঁড়ায়। 

আরে, নকুল যে, কী ব্যাপার! 

অনেকখন কোন কিছুই দেখতে পেল না নকুল, তার ঠোঁট শুধু কেঁপে কেঁপে ওঠে। 

প্রমোদাবাবুর মনে হল, নকুল যেন যে-কোন মুহূর্তেই পড়ে যেতে পারে, প্রায় ছুটেই এল সে তার কাছে, একগলা উদ্‌বেগ নিয়ে বলে, নকুল, কি হয়েছে-- 

আবছায়ার মতো সব কিছু অস্পষ্ট মনে হয় নকুলের, গলার স্বর ফোটে না তার, কম্পিত বয়স্ক হাতে কাগজখানা বাড়িয়ে ধরে শুধু। 

টেলিগ্রাম! দেখি কাগজখানা যেন থাবা দিয়েই নিয়ে নেয় প্রমদা, চোখ বুলোতেই দুচোখে থিকথিক বিস্ময় ঘনিয়ে আসে তার, নকুলের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে তার দৃষ্টি টাইপ করা সেই কাগজেই ফিরে আসে আবার। 

যে-লোকটির পিছু পিছু নকুল এসেছিল, সে প্রমদার পেছন থেকে বলে, চ্যাটার্জি, ব্যাড নিউজ-- 

প্রমদা কাগজখানা তার হাতে তুলে দিয়ে বিচিত্র মুখভঙ্গি করে। তার বার্তায় চোখ রাখতেই সে দেখে-- 


FORCEPS DELIVERY STOP MALE CHILD STOP MOTHER REGAINING 
PANCHUGOPAL 


পড়া শেষ করে বিস্মিত চোখে সে প্রমদার দিকে তাকায়। প্রমদা নকুলের কাঁধে হাত রেখে জিগ্গেশ করে, পাঁচুগোপাল কে? 

নকুল ব্যাকুল সুরে বলে, আমার জামাই বাবু। কোন দোষ নেই তার। 

প্রমদা হালকা গলায় ধমকে ওঠে, দোষের কথাটা আবার এল কোথায়! তোমার 

মেয়ের কি সন্তান-টন্তান-- এ্যা! 

নকুল এবার প্রমদার হাত জড়িয়ে ধরতে গেল, কিন্তু উত্তেজনার প্রাবল্যেই বোধহয় হাতখানা 

খুঁজে পেল না সে, তা না পেলেও চোখ উজ্জ্বল হয়ে এল তার, হ্যা বাবু, দুগ্‌গার তো ছেলেপুলে হওয়ার কতা ছেল-- 

প্রমদা খুশির সুরে বলে, তোমার নাতি হয়েছে গো, জামাই তাই জানিয়েছে, কাঁটাছেঁড়া করতে হয়েছিল মেয়েকে, এখন ভাল আছে। কী গো, এমন আনন্দের খবর, আর তুমি যে কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছেলে সব! মিষ্টি খাওয়াও মোড়ল-- 

নকুলের আরক্তিম চোখজোড়া মুহূর্তেই বিস্ফারিত, শরীরের বাঁধন ঢিলেঢালা, বুকের ভেতর বিস্ময়াহত আনন্দের ভরা কোটাল, মুখমণ্ডলে নানা দুর্বোধ্য রেখা নিয়ে সে চীৎকার করে ওঠে, নাতি হয়েছে, নাতি - আ আ আ হা হা...। 

পরমুহর্তেই, গ্রাম মধুবনীর বর্ষীয়ান নকুল মণ্ডলের তোলপাড় বুকের শতাব্দী প্রাচীন নিরক্ষরতার নিম্নচাপের কেন্দ্র থেকে ব্যাপক এক জলীয় বাষ্প প্রবল বেগে বেরিয়ে আসে, দুচোখের লবণাক্ত অন্ধকারে আলোর শেষতম কণিকাটিও তলিয়ে যায়। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন