মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

মোস্তফা অভি’র গল্প: উৎসবের রাত্রি

বয়সের কাছে নিদারুণভাবে তিরস্কৃত তেইশ বছরের যুবক ছোরাপের মনে হয় আজ সন্ধ্যার আলো-আঁধার একসঙ্গে মিলিত হয়ে হৈ হৈ করে নাচছে। অনেকদিন বাদে বিঘাই গ্রামে আজ তিন উৎসব। আমন ধানের ক্ষেত এখন ফাঁকা। হাইস্কুল মাঠে ওয়াজ মাহফিলের সামাজিক উৎসবে দলেদলে লোক যোগদান করছে।
ওয়াজকে এইসব কারণে উৎসব বলা যায়-ফি বছর হাইস্কুল মাঠে জারিগান, যাত্রাপালা কিংবা ওরস মোবারকের আয়োজন করা হয়। মাঠের এককোণে পুরনো শিমুল গাছের নিচে কয়েকটা দোকান বসে। গ্রামের মানুষ ফয়জুদ্দিন বুড়োর থেকে কেনে মিষ্টি পান। আটার গুলগুলা, মদন মুরালি ও চিনি ময়দার আঙুটের দোকানও থাকে সেখানে। রাসু ময়রা এক কোণে ভাজে আড়াই প্যাচের জিলাপি। তখন মাঠের থেকে শিমুল গাছের নিচে ভ্রাম্যমান বাজারে মানুষের ভীড় হয় বেশি। হোক ওয়াজ কিংবা জারিগান অথবা যাত্রাপালা; গ্রামীন এমন লোকজ অনুষ্ঠানকে উৎসব ছাড়া আর কী বলা চলে? হাইস্কুল মাঠ আর উত্তরকান্দার ঠিক মাঝামাঝি শরীফ বাড়িতে চলছে আরেক উৎসব। শহুরে কায়দায় ধিরিম ধিরিম শব্দে সাউন্ডবক্সে বাজছে বিয়ের গান বাজনা। এই বাড়ির পোলাপাইন মধ্যপ্রাচ্যে কামাই করে।বিয়ের হাদ্যবাদ্য ছাড়া মরুভূমির পয়সা গ্রামের মানুষকে দেখানোর আর কোনো ভালো উপায় নেই। ফলে লতালম্বুরে পেঁচানো আত্মীয়-স্বজনের সমাগম শরীফ বাড়ির বিয়ের উৎসবে খুব চোখে পড়ে। এই দুই উৎসবের বাইরে আরেকটি নীরব উৎসবের আয়োজন চলছে নদীর ধারে গাছ-গাছালিতে ছাওয়া বাড়িটিতে। এই গোপন আয়োজনের সংবাদ গ্রামের কতিপয় যুবক ছাড়া আর কারও জানা নেই। তবে ওইসব যুবকের বিড়ি ধরানোর আগুন, তেজপাতা দিয়ে লাল চা বানানোর জন্য সেই বাড়িতে আছে বকুলের মা। মাথাভর্তি ঢেউ খেলানো অজস্র কালো চুলের ভেতর থেকে কয়েকগাছি সাদাচুল উঁকি মারে তার। বিধবা মাহিলাটির একমাত্র ছেলেটি কাজ করে ঢাকায়। সে স্বামীর পোতা পাহারা দেয়।

বকুলের মা নদীর ধারে যে নির্জন বাড়াটিতে থাকে, সেখানেমাঝেমধ্যে কতিপয় অচেনা মানুষের আনাগোণা দেখা যায়। তারা কোথা থেকে আসে আবার কোথায় চলে যায় বিঘাই গ্রামের অনেকের-ই জানা থাকে না। তবে সাধারণ মানুষের মুখে শোনা যায়, পুলিশের তাড়া খাওয়া দূর গ্রামের মানুষ এসে বকুলের মায়ের ধ্যাতরা কাঁথার নিচে ঘুমায়। আবার মাঝেমধ্যে প্রেমিকা নিয়ে মউজ-মাস্তি করতে আসে কেউকেউ। তাদের দেয়া টাকায় বকুলের মায়ের ভালোভাবে দিন চলে যায়। গ্রামের মানুষ হঠাৎ দুপুরে বকুলের মাকে সামনে পেলে প্রশ্ন করে-দুহার রাইতে তোমগো বাড়ি ল্যাম জ্বলে ক্যা? বকুলের মা তখন চওড়া মাড়ি খুলে হাসে। সামনের পাটির দুটো দাঁত নেই তার, কুচি করে কাটা শাকের টুকরো কখনো লেগে থাকে সেই মাড়িরফাঁকে। সেই হাসি মিলিয়ে যাওয়ার আগে সে বড় রাস্তা ধরে হাঁটে দক্ষিণে। পথে দেয়া হয় আরও মানুষের সঙ্গে। তাদের অনেকেই রাত-বিরাতে নদীর ধারের নির্জন বাড়িটিতে তাস পেটাতে আসে। কেউ আবার ঢাকাইয়া অতিথি নিয়ে আসেমাঝেমধ্যে। রাত গভীর হলে রঙিণ পানি খেয়ে টাল হয়ে বকুলের মায়ের ধ্যাতরা কাঁথায় নাক ডুবিয়ে ঘুমায়। ফলে বকুলের মায়ের বাড়িতে রাতের কীর্তি দেখে কথিত সমাজপতিদের কিছু বলার থাকে না।

হাইস্কুল মাঠে ওয়াজের খবর বকুলের মা-ও জানে। সে মীরা বাড়ির মেঝ মীরার ছেলে ছোরাপের কাছে যায়। ছোরাপের সঙ্গেতার বড় খাতির। মাঝেমধ্যে শহর থেকে হোন্ডায় করে কপোত-কপোতী আসে। ছোরাপ তাদের নিয়ে আসে বকুলের মায়ের কাছে। তারপর বকুলের মা রেইনট্রি ডালের পায়ায় বানানো চৌকিটা দেখিয়ে পুরুষ লোকটিকে ইংগিত করে বলে,- আপনের গাল ফেরেন্ডের লগোইত ভালো আছে। এইবার চকিতে হুইয়া সমুদ্দুর পাড়ি দ্যান। তখন ছোরাপ পেছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকে। অতিথির জন্য নিয়ে আসে চা বিস্কিট। ষাট টাকার নাস্তা কিনতে ছোরাপ শ'তিনেক টাকা ঝারতে ভুল করে না। 

সেই ছোরাপ পোয়া মাইল দূরের মাইকের আওয়াজ শুনে কান খাড়া করে। যেন সে আচম্বিতে ইস্রাফিলের বাঁশি শুনতে পায়।নৌকার মত তেরছা টুপিটা অনেকদিন অযত্নে পড়ে ছিল ধানের মাইটের ওপর। ছোরাপ টুপিটা হাতে নিয়ে ধুলা ঝাড়ে আর বলে,- মরণ তো লাগবে একদিন, কি কও চাচী? বকুলের মা মাথা নাড়ে। সে ছোরাপের কানের লতি পর্যন্ত চেপে দেয়া তেরছা টুপিপরা দৃশ্যটি চেয়ে দেখে। তখন তার এক মেঘমেদুর সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে যায়। সেদিন শহরের দুটি সুন্দর ছেলে-মেয়ে এসেছিল তার ঘরে। কী মাখনের মত তুলতুলে চেহারা ওদের! মেয়েটির মায়াবী মুখের দিকে শুধু তাকিয়েই থেকেছে বকুলের মা। সে মনে মনে বলেছিল, আহারে! কোন গিরাস্তঘরের মাইয়া পোয়াডার লচি কতায় কপালডা পোড়ল!ছেলে-মেয়েদুটো বৃষ্টিতে ভিজে ঠুকঠুক করে। বকুলের মা ওদের ধ্যাতরা কাঁথা বিছিয়ে শুতে দিয়েছিল খাটালে। বাইরে রাতের আঁধারের সাথে মেঘের আঁধার মিশে প্রকৃতি হয়েছিল কালি গোলানো জল। মেঘের গুড়িম গুড়িম শব্দে ছেলে-মেয়েদুটো হয়ে পড়েছিল বড় বেসামাল। ওরা সঙ্গধরা সাপের মত পেঁচিয়ে থেকেছিল স্যাঁতস্যাতে খাটালে। বকুলের মা তো বৃষ্টির কারণে বাইরে যেতে পারে না। সে দুহাত দূরে টিনের বেড়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখেছিল কাঁচা বয়সী ছেলে-মেয়েদুটোর এইসব দৃশ্য। বৃষ্টির ফোটার শিরশিরানি নিয়ে বিস্কিটের প্যাকেট হাতে করেতখন ঘরে ঢোকে ছোরাপ। সেই যে ছোরাপের চুল ভেজা জল গড়িয়ে পড়া মুখ; ভাঙা চোয়ালের দুপাশে উঁচু হাড়দুটোতে হাত ছুঁয়েছিল বকুলের মা। তার নয় বছরের বিধবা জীবনের পূর্বের দৃশ্যগুলো ঝাকি দিয়ে উঠেছিল চোখের সামনে। তখন খপ করে ছোরাপের বালকবেলা পেরুনো মুখ আঁচলের তলায় চেপে ধরেছিল বকুলের মা। ছোরাপ তখন নাক বের করে শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলেছিল- চাচী ইট্টু আওয়ালে আও। যুবকের যৌনতাড়না কী যে অদ্ভুত সুন্দর হতে পারে; বকুলের মায়ের আগে জানা ছিল না।

ছোরাপ গোলগলা গেঞ্জির ওপর খাটোহাতার জামাটা গায়ে চেপে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। তখন তেরছাভাবে বাঁকা চাঁদ মিটিমটি করে মাথার ওপর। যেন ওটা ফাল্গুনের আকাশে ঝলসানো ভাঙা আধুলি পয়সা। অপূর্ব প্রশান্ত প্রকৃতির পথে-ঘাটে কুকুর ঘেউঘেউ না, কোনো পাতার মর্মর শোনা যায় নাচারপোশে। শুধু একেক বাড়ি থেকে টুপি-পাঞ্জাবি পরিহিত নানান বয়সী লোক বের হয়ে হাঁটতে শুরু করে বিলের মাঝের ছিলার পথ ধরে দক্ষিনে। পোয়া মাইল দূর থেকে ভেসে আসছে ওয়াজ মাহফিলের বয়ান। ছোরাপ ময়দানের এক কোনে জড়োসড়ো হয়ে বসে। ওয়াজের হুজুর বড় ট্যাডি। কথায় কথায় ছোবানাল্লাহর পরিবর্তে হুজুরের রসের গল্পে উপস্থিত গ্রামবাসী হাসির দলক ছড়ায়। হুজুরের রঙ্গ-রসিকতার সঙ্গে যুক্ত হয় ইসুফ জোলেখার বয়ান। মিশরের অধিপতি আজীজের স্ত্রী জোলেখা অতুলনীয়া সুন্দরী! ইসুফের প্রেমে দেওয়ানা সে। একদিন জোলেখা ছলে-বলে, কৌশলে নবী ইসুফকে নিয়ে যায় সাতকক্ষ বিশিষ্ট ঘরে। নিজের যৌবন উন্মুক্ত করে কাছে টানে ইসুফকে। কী টান টান উত্তেজনা! ছোরাপ ওয়াজের বয়ান থেকে উঠে যায়। পুরনো শিমুল গাছের নিচে মিষ্টি পানের খিলিওয়ালার দোকান থেকে একটা খুশবুয়ালা খিলিপান কেনে। তারপর মাহফিল মাঠের পাশ দিয়ে নদীপাড়ের যে রাস্তাটা গেছে উত্তরে; সেই পথ ধরে হাঁটে।খটখটে সাদা মাটিতে রূপালী চাঁদের আলো; রাস্তার দুধারে গাছের ছায়ার আঁধার। ছোরাপ কিছুদূর গিয়ে হুজুরের বর্ণিত জোলেখার রূপের কথা মনে করে। সে বাড়িমুখী হাঁটতে হাঁটতে বিচলিত হয়। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা খেঁজুর গাছটিরনিচে খানিক্ষণ চুপ করে দাঁড়ায়। খেজুরের চিরল পাতার ফাঁকে জোছনা নড়েচড়ে খেলা করে। পাশের সঠিগাছের ঝোপে কী যেন ছরছর করে। মনে হয় ওটা কডর; মা ছোটবেলা ওই কডরের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়াত ছোরাপকে। মায়ের সেইসব স্মৃতির কথা এ মুহূর্তে ছোরাপের মনে রেখাপাত করে না। সেপাশের নদীটির দিকে চোখ ফিরায়। রাস্তার ঢাল বেয়ে নদীর কিণারে গিয়ে ভরা জোয়ারের স্রোতের দিকে নীরব তাকিয়ে থাকে। তার আবারও মনে পড়ে জোলেখার কথা। সেই যে জোলেখা, নবী ইছুফকে নিয়ে গেছে যৌন ইংগিতময় কারুকার্যেভরা সাত কামরার ঘরে। ভরা নদীর জলে জোছনার কাঁপা কাঁপা দৃশ্য, ছোরাপ লুঙ্গির নিচে ডান হাতটা ঢুকায়। মৃদু তরঙ্গে জোছনার ভেঙেপড়া আলোর তালে সে শরীরটাকে ঝাকাতে থাকে। তারপর সে নেতিয়ে পড়ে, শান্ত হয়। এরপর ভুলে যায় জোলেখার রূপের কথা।

তারপর বিঘাই গ্রামে আকাশ থেকে নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরাবতা! ওয়াজের মজলিশে তাবারক বিতরণের পর থেমেগেছে মাইকের আওয়াজ। নদী থেকে হু হু বাতাস এসে গড়িয়ে চলে ফসলশূন্য বিলের ভেতর। দুটি কুকুর ধূলটের ক্ষেত ধরে শরীর দুলিয়ে হেঁটে যাচ্ছে যেন কোথায়! ছোরাপের চোখে তখন শরীফ বাড়ির জেনারেটরের আলো। উঠানের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঘরটির সবকটা জানালায় আলো জ্বলছে, মানুষের ছায়া কাঁপছে সেই আলোর কাছে। ছোরাপ সরু দরজাটা পার হয়ে উঠানের এককোণে কলা গাছের ঝোপের কাছে ফ্যাচফ্যাচ শব্দ শুনে চুপ করে দাঁড়ায়। সে দেখে, বিয়ে বাড়ির এক মেয়েছেলে কাইওল পাছাটা মেলে পেচ্ছাব করছে কলাগাছের মুথার কাছে। উঠানের কটকটে আলো কলাগাছেরঝোপের আড়ালে আলগোছে পড়ে সেই পাছার ওপর। ফরসা, পুরুষ্টু নিতম্ব দেখে ছোরাপের চোখ চকচক করে। সে শরীফবাড়ি উঠে আর বিয়ের নাচ-গান দেখার তাল খুঁজে পায় না। তার মনে হয়, রামদাও নিয়ে বিয়ে বাড়ির পুরুষগুলোকে কাবু করে কলাগাছের আড়ালে দেখা মেয়েটিকে নিয়ে আসে ঝোপের এপাশে। তার ছোটছোট চোখে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মেয়েটিকে দেখে আবিলাস মিটায়! কিন্তু এসব আদিম ইচ্ছা তার মনের ভেতরেই মুখ থুবরে পড়ে থাকে। বাড়ির পেছনে আলের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তার হঠাৎ কার্ত্তিক মাসের কথা মনে পড়ে। কুকুরগুলো কেমন দল মিলিয়ে রাস্তার তেমাথায় জড়ো হয়। একেক জোড়া মৈথুনে লেগে পড়ে আর ভাগ হয়ে যায়। গরুগুলো বা কম কীসে! ডাক উঠলে সারারাত শরীর খিঁচিয়ে ট্যাডায়। কুকুরের মৈথুনের দৃশ্য, গোরুর ট্যাডানি ইত্যাদি ছোরাপের স্নায়ুর ভেতর কুটকুট করে। সে এতটা বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে; বকুলের মায়ের ঘরের খাটালে রমনরত যুগলকে দেখেও এমনটা কখনো হয়নি। সে একবার ভাবে আরবজানের ডেরায় যাবে। চুপিচুপি হোগলার বেড়া ফাঁক করে আরবজানের মুখটা চেপে ধরে হাতড়াবে কিছুক্ষণ। এর বেশিকিছু নয়-ব্যাস, এটুকুই । তারপর যা হয় হবে।

কী আর এমন হবে! এইসব উৎসবে ফি বছর বিঘাই গ্রামে একেকটা অঘটন ঘটে থাকে। তৃতীয়াবার শিশু বক্তার চমকপ্রদ ওয়াজে সবাই যখন বিভোর তখন গ্রামের ভেতর এহাসারি আলাইম্মার বাড়িতে এক কাণ্ড ঘটেছিল। আলাইম্মা খুলনা শহরের এক হোটেলে বাবুর্চির চাকরি করে। বাড়িতে হোগলা পাতার বেড়ার ঝুপড়িতে বউ আরব জান থাকে একা। দুবছরের শিশুটি পাশে জলের মত ঘুমিয়ে লেপ্টে থাকে হোগলার ওপর। সেই রাতে কোথা থেকে এক গাট্টাগোট্টা মোচওয়ালা চোট্টা ওঠে আরবজানের ঘরে। গলার ওপর চেপে ধরে ফকফকা রামদাও। আঁধারেও রামদাওখান আয়নার প্রতিবিম্বের মত ফরকায়। চিংলা মেয়েমানুষটি আর নড়তে পারে না। দাওখান একপাশে রেখে শরীর হাতাতে গেলে চোট্টার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় আরবজানের। তখন দুবছরের শিশুটি কেঁদে ওঠে, আরবজান গাইল দেয়- ওই, গ্যালে, গ্যালে, গ্যালে। চোট্টা গ্যালে। মাইন্দারের বাচ্চায় মোর কাপুড় ধইর‌্যা টানে। আরেট্টু অইলেই অর সোনাটা কাইট্টা রাকতাম! 

আরবজানের চোট্টা খেদানোর ঘটনা গ্রামের সবাই শুনেছে। সকালে অনুমান করে যে যুবকের কথা আরবজান বলেছে; তার মা-বোন এসে ইচ্ছেমত শাসায়- ও মাতারী, দেও দিহি মোর পোয়ারে চেন্নক? পাড়ার পোঙডা ছেলেটি ফোঁড়ন কাটে, রাইতেরবেলা চোট্টার নঙ্কুর মাপতো আরবজান লইয়া লইছে। পাড়া-প্রতিবেশি বলে অন্ধকারে আরবজান কারো মুখ দেখে নাই। আরবজান তখন বলতে পারে না কীভাবে হাতিয়ে হাতিয়ে অন্ধকারে চোট্টার শরীরের মাপটা সে বুঝে নিয়েছে। অভিযোগকৃত যুবকের মা আড়ালে নিয়ে আরবজানের সঙ্গে পরামিশ করে। আড়াল থেকে ফিরে আরবজান মিনমিনায়। কেমন একটা রফা হয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যে। এই ঘটনার পরথেকে শোনা যায়, আরবজান নাকি নিজেই পরপুরুষ ডেকে আনে নিজের ঘরে। রাত গাঢ় হলে পরপুরুষের হাত ধরে আলের পথ পেরিয়ে যায় নদীর ধারে। সেখানকার প্রশস্ত চরে ফুটিফুটি জোছনা, হোগলা পাতার ঝোপ, শেয়ালের আনাগোণা ছাড়া আর কোনো প্রাণীর স্পন্দন থাকে না। আরবজান হোগলা পাতার বনের ভেতর শয্যা রচনা করে। ঘরে ছেলেটা ঘুমিয়ে জল হয়ে থাকে মাটিতে পাতা বিছানায়। গ্রামের মানুষ রাতের এইসব খবর বাতাসে শুনতে পায়। অথচ, কেউ কখনো এসব নিয়ে কথা তোলে না।

ছোরাপ শরীফ বাড়ির পেছন দিকের ক্ষেতের ওপর স্তুপকরা নাড়ার গাঁদার ওপর শুয়ে থাকে কিছুক্ষণ; নীরবতা শেষে মান্দার গাছের ফাঁক দিয়ে তাকায় উত্তরে, নদীর ধারে। সেখানে টিমটিমে একটি আলোর কাছে কয়েকজন যুবকের পায়চারি। তারপর সে হাঁটতে শুরু করে নাক বরাবর। দক্ষিণের মাতাল হাওয়া ঢুসো মারে ছোরাপের গায়ে, ফাল্গুনের রাতের মাদকতা তাকে আরো উদাস করে দেয়। মগজের গভীরে সুখ সুখ অনুভবে সে বুদ হয়ে থাকে কয়েক মিনিট। মাথার ওপর আধখাওয়া হলদে চাঁদ, কামনার রাত বুঝি ফুরায়ে যায়!ছোরাপ হাঁটে, তার সঙ্গে দূরের তারাটাও হাঁটে। আর হাঁটে দেহের সঙ্গে পথচলা নিজের ছায়া। ছায়াটা তাকে প্রশ্ন করে,ছোরাপ উত্তর দেয়। সে উত্তর দিতে দিতে ঢোক গেলে। সে দিশা হারায়। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে শরীর ঝাকিয়ে যে কাণ্ডটা ছোরাপ করেছে হয়ত আর কেউ দেখে নি; ছোরাপের এই অবান্তর ভাবনা ছায়াটা উড়িয়ে দেয়। ছায়াটা খিলখিল করে হাসে। বিয়ে বাড়ির মেয়েটির কাইওল পাছাটা দেখে সে যে শরীফের গোয়াল ঘরে উঁকি মেরে বকনা বাছুরের দিকে একদৃষ্টে চেয়েছিল ছায়া সে কথাটাও মনে করিয়ে দেয়। ছোরাপ হুশহুশ করে, ছায়াটা চুপ হয়ে যায়। ছোরাপের সঙ্গী হয়ে সে নীরবে হাঁটে, সেই উত্তরের টিমটিমে আলোর বাড়িটির দিকে। বেড়ার ফোকর দিয়ে লাল নীল আলোর রস্মি উঁকি মারে বাড়িটির ভেড়ির ওপর। ছোরাপ মাটির ওপর কান পাতে। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসে চাপাস্বরের মেয়েলী নখরা। শব্দটা আসতেথাকে, খরবেগে। একটির পিঠে আরেকটি শব্দ- ভাঙাভাঙা ঢেউয়ের মতন, ক্রমশ টানটান হয়ে। সেই শব্দটি অন্ধকারে ধাক্কা খেয়ে মিলিয়ে যায় একই অন্ধকারে। মেয়েকণ্ঠের রাত্রিকালীন শব্দটি তার মগজে নাড়া দেয়। ছায়াটা নড়েচড়ে ওঠে, তীরতীর করে কাঁপে। ছায়া ধমক দেয়। ছোরাপ ভেড়ি বেয়ে তৃতীয় উৎসবের বাড়িতে ওঠে। বকুলের মা আমতলায় নতুন বানানো চুলায় চা রাঁধে। বাতাসে উড়ে যায় তেজপাতার সুবাস!

ছোরাপ চুলার পাশে গিয়ে বসে। বকুলের মা গলা বাড়িয়ে বলে, অ ছোরাইপ্যা, তুই মফেল থুইয়া আই পড়লি? অরা নতুন ফিলিম আনছে। বেটারি দিয়া শিডি চালায়। চুলার তিন ঝিকার ফাঁক বেয়ে লালচে আগুন উঁকি মারে। সেই লালে লাল হয় বকুলের মায়ের ব্লাউজহীন বগলের নিচ। খরখরা চামড়ায় লাল আলো দপদপ করে, ছোরাপের পলক পড়ে না। ঘরের ভেতর থেকে ডাক আসে- অই চাচী, চা অইচে? বকুলের মা গলা বাড়ায় না। বারংবার ডাকে বিরক্তি উগরে দেয়- ও শুয়ার বাচ্চা, দোমন অ। ছোরাইপ্যা আইচে। কেউ একজন বেড়ার ফাঁক দিয়ে বকপাখির মত গলাটানা দিয়ে রঙ্গ করে বলে- অ ছোরাইপ্যা, বিস্কুট লইয়াছ নি? আয়, আয় গরম মশলার শো দেইহা যা...

ছোরাপ বেড়াটা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। রাতের এই শীতল উৎসবে যেন আর জমে না তার। সে দুলালের কানের কাছেফিসফিস করে- অয় দুলাইল্যা, ডাইরেক আনো নাই? দুলাল ফ্যাচফ্যাচ করে হাসে। বাজারি ব্যাগ থেকে নগ্ন ছবির মোড়কের ভেতর থেকে সিডি বের করে দেখায়। ছোরাপ বলে- এইডা চালা না ব্যাডা। দুলাল ধমক মারে। মাথার ইশারায় বাইরের দিকে ইংগিত করে- অই হালা, চাচী ঘুমাই লউক। চাচী আর ঘুমায় না। নেশায় বুঁদ হয়ে চাঁদ ঢলে পড়ে পশ্চিমের শেষ সীমানায়। নদীতে ঠাঠা শব্দে একটি ট্রলার চলে যায় যেনকোথায় ! হয় আঙুলকাটা হাটের উদ্দেশে নয়ত পায়রার ওপার সুন্দ্রা কালিকাপুর।

পোলাপাইন তেজপাতার কালো রঙের চা খাওয়ার জন্য কাপে ফুঁ দিয়ে চুমুক মারে, বকুলের মা ধ্যাতরা কাঁথার ভাঁজ থেকে এক পোটলা পোতানো মুড়ি বের করে দেয়। পোলাপাইন ধ্যাতলা মুড়িগুলো দাঁতের তলে পিষে ফেলে। রাত আরোগভীর হয়, মাঝেমধ্যে এক ঝলক বাতাসে গাছের পাতা নড়ে। দুএকটা পাতা টুপ করে ঝরে পড়ে মাটিতে। দুলাল গরম মশলার সিডি পাল্টায়। 

বকুলের মা বারান্দায় শুয়ে মৃদু শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে পারে। সে চুপ করে দেহটা ভাঁজ করে চোখ বন্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু নিদ আর তার চোখে আসে না। একটা পাতলা টিনের বেড়ার আড়ালে চুপ থাকাও বড় দায়। নীলচোখা মেয়েটি ভেল্কি দেখায়, নিগ্র লোকটি কুকুরের মত কুইঁকুইঁ করে। পোলাপাইন বড় বেসামাল হয়ে পড়ে। দেহের শিরাগুলো নীল কেঁচোর মত ভেসে ওঠে শরীরের আনাচে-কানাচে। সিডির মনিটর কাঁপতে থাকে। দুএকমিনিটে মনিটরের আলো নিভে যায়। পোলাপাইনরা বলে- হালার বেটারি যাওয়ার সোমায় পাইল না। হঠাৎ ঝনঝন শব্দে টিনের বেড়াটা আলগা হয়ে যায়, বকুলের মা চুপ করে থাকে। পোলাপাইন বারান্দার ধুলার সাথে গড়াগড়ি খায়। তারপর বকুলের মায়ের আঁচল ধরে টানতে শুরু করে, একেবারে বিবস্ত্র! বকুলের মা ফোঁকলা মাড়ি বের করে হাসে। সে হাসি এতটা বিবর্ণ- কুপির আলোয় তার নাকের ওপর ছুলির দাগগুলো আরো কালো হয়ে ভেসে ওঠে।তার ধামার মত পেটটা সামনের দিকে চেয়ে থাকে, চুপসে যাওয়া বেলুনের মত স্তনদুটি নেমে যায় নাভীর কাছে। আলোর স্বল্পতায় এর বেশি দেখা যায় না। তারপর সে আমতলার নিচ দিয়ে হাঁটতে শুরু করে ওয়াপদার রাস্তার দিকে। বকুলের মা হাঁটে, কোমড়ে তার ঝুনঝুন করে কাইতুমে বাঁধা ছোরানি। উঠানে আকাশ থেকে তারার আলোর রেখা নামে।পোলাপাইন খলবল করতে করতে তার পেছন পেছন যায়। বকুলের মা রাস্তায় উঠে বলে,-ও শুয়াবাচ্চা, ও শুয়াবাচ্চা,ওরোম হরো ক্যা? বকুলের মায়ের বহুদিনের ঢেকে রাখা দেহ থেকে যে বিভৎস, আঁশটে গন্ধ বের হয়, পোলাপাইন নাক উঁচিয়ে সেই গন্ধে ডুবে গিয়ে নিথর হয়ে পড়ে। রুগ্ন নক্ষত্রখচিত মখমলের আকাশের দিকে রেইন-ট্রি শাখারকালোকালো রেখা। পাগলা আঁধার তুড়ি মেরে নামতে থাকে মাটির বুকে। ঘন-কালো শূন্যের কোন গভীরে, কোন অতিদূর নক্ষত্রজগৎ থেকে ঝরে পড়ে রহস্যময় অবিশ্রান্ত ধারা। ছোরাপের করটিতে তখন ভর করে একজন নারী অথবা কার্ত্তিকের মাদি কুকুর কিংবা শরীফ বাড়ির বকনা বাছুর। সে নদীর দিকে ফিরে রাস্তার একধারে আবার দাঁড়িয়ে প্রস্তুত হয়।পৃথিবীর সমস্ত স্ত্রীজাতি দেখে কিংবা কল্পনা করে-ই যেন তার সুখ। সে শরীরবৃত্তীয় আদিম চাহিদাটি নিবারণের জন্য যে পথ বেছে নিয়েছে তা মিশে আছে তার মজ্জায়। হয়ত এর ধারা অব্যাহত থাকবে আরও কত কত দিন! বকুলের মা আজকের উৎসবের পরিস্থিতি নিয়ে হয়ত বিচলিত! হয়ত আজকেরঘটনাটি রাতের আঁধারের সাথে মিশে হারিয়ে যাবে আগত প্রভাতের আগে। তবু বিঘাই গ্রামে বারবার ফিরে আসবে নতুন উৎসব।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন