মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

তেফি'র গল্প : কৃষ্ণধনু

অনুবাদঃ অর্ক চট্টোপাধ্যায় 

“কেন, আবহাওয়া তো তেমন মন্দ না, হ্যাঁ, একটু ঝোড়ো, তবে ছোট একটা ড্রাইভে কোনো সমস্যা হবে না। তুমি বেকার মেজাজ খারাপ করছো!” 

ডাক্তার কাতিশেভ তখন ভেকিনার সঙ্গে যুক্তিতক্ক সাজানোর পথে। ভেকিনা শুনছে আর ভাবছে নিজের দুরবস্থার কথা।

তার অবস্থা সত্যিই বেশ শোচনীয়। 

দিন তিনেক আগে ভেকিনার বর পাঁচদিনের জন্য কাজান গিয়েছিল এক মাসীকে কবর দিতে। ভেকিনাও জীবনের সব আনন্দ এই পাঁচদিনের অতিথি করে রেখেছিল। ভেবেছিল প্রতিদিন সকালে শিল্পী শাতভের সঙ্গে ঘুরতে বেরোবে, তার সঙ্গে জলখাবার, সন্ধ্যাভোজ এবং ডিনার করবে। 

স্বপ্নাভ পাঁচ দিনের ভেতর তিন তিনটে দিন কেটে গেল অথচ তার সঙ্গে একবারও দেখা হল না! প্রথমে ফোনে বলল, প্রদর্শনীর জন্য একটা পেইন্টিং শেষ করছে, তারপর চিঠিপথে জানালো, এক ধনীব্যক্তির পোর্টেট করতে ব্যস্ত, আর এখন কিনা নিজে না এসে ফুল পাঠিয়েছে হতভাগা? একটা নোটও নেই সঙ্গে! 

“কি গাড়ল, এটুকু বোঝে না যে এমন আনন্দ জীবনে বারবার আসে না, মাসী তো একবারই মরে, নাকি! এটা কি ওর মস্করা? আমায় রাগাতে চাইছে? আর সময় পেল না রাগানোর!” 

“কেন, কি হয়েছে? তুমি এতো দুঃখ পাচ্ছ কেন, সুন্দরী? কি নেই তোমার?” ডাক্তার কাতিশেভ জোর করে কথা চালাতে লাগলেন। 

“আবার শুরু করলো জ্বালাতন”, ভেকিনা ভাবল। “শাতভকে রাগানোর জন্য ওর সঙ্গে একটু ফ্লারট করলে কেমন হয়?” 

“কি গো, কি সুন্দর তোমার ঐ ছোট্ট ছোট্ট পা! আরে, অমন সুন্দর ছোট্ট পা নিয়ে কি আর মন খারাপ করতে আছে? আমার যদি অমন পা থাকতো, কি না কি করে...” 

ভেকিনা, মোটা, টেকো ডাক্তারকে রুপোলী জুতো আর চামড়া রঙের মোজা পরা অবস্থায় কল্পনা করে, চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলো। 

“আপনার কি পছন্দ আমার পা?” নিজেকে জোর করে বলালো ভেকিনা, “চুমু খেতে চান পায়ে?” 

“সব তোমার জন্য, সব তোমার জন্য,” মনে মনে শিল্পীকে দুষতে লাগল ভেকিনা। 

“দেখুন তবে, কেমন লাগে দেখুন?” 

“দেখুন ডাক্তার, চুমু খেয়ে দেখুন।” 

ডাক্তার ফ্যাক করে হেসে ফেলল, শোঁ শোঁ করে নিশ্বাস নিলো, হাঁটু ভেঙে বসলো, আর তারপর বাচ্চাদের মত ভেকিনার পা, হাতের তালুতে বসিয়ে, জুতোর ওপর সশব্দে চুমু খেল। 

“পা তো নয়, যেন দই।” 

“কি অসহ্য। ঠিক যেন অপারেশন করছে!” ভেকিনার সারা শরীর জুড়ে কাঁপ ধরল। “তোমার জন্য এইসবও করতে হচ্ছে, যাতা, সব তোমার জন্য। আহা, কি ভালো লাগছে, আবার করুন তাহলে।” 

হঠাৎ লাস্যের হাসি হেসে ও জামার হাতাটা ওপরে তুলে দিল। 

“আমার কনুইয়ের ছোট্ট খাঁজটা দেখেছেন!” 

ডাক্তার ঠোঁটদুটো এক করে সেদিকে এগোতে ভেকিনা হাতাটা জায়গা মতো এনে বললো, “আপনার আবদার বড় বেশি দেখছি।” 

ডাক্তার চোখদুটো হাট করে খুলে ঠোঁট জুড়ে চুমু খাওয়ার অপেক্ষায় বসে রইলো। 

ওর চলে যাওয়ার আধ ঘণ্টা পর শাতভ এলো। 

“না, একদম অজুহাত নয়,” ভেকিনা ঠাণ্ডা গলায় থামিয়ে দিলো শাতভকে। “কোন দরকার নেই। আমার তোমায় কিছু বলার আছে।” 

“...?” 

“আমার অন্য একজনকে পছন্দ হয়ে গেছে।” 

“…?” 

“কিছুক্ষণ আগে আসলে নিজের চোখেই দেখে নিতে পারতে! আমাদের মধ্যে যা ছিল নির্বিঘ্নে মিটে গেছে, এটাই ভালো।” 

ঘাবড়ে গিয়ে শাতভের ঠোঁট একটু কেঁপে উঠলো, ঠিক ততটাই, যতটা ঘাবড়ানো মানুষের ঠোঁট কাঁপে। 

“তোমার মনে হয়, দুজনের দিক থেকেই এটা নির্বিঘ্নে মিটে যাওয়া?” 

এর উত্তরে ভেকিনার হাসিটা কটাক্ষে ভরা ছিল। যতটা বিদ্রূপের হাসি হাসতে পারে, হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। 

ভেকিনা শুনতে পেল শাতভ গাম্বুট পরছে। পরার পর হলে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। দরজা বন্ধ হবার আওয়াজটা হওয়ার ঠিক পরপর ভেকিনা হাতে হাল্কা কামড় বসিয়ে কাঁদতে লাগলো। 

সেদিন সন্ধ্যায় বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে একটা চিঠি লিখতে শুরু করলোঃ 

শুরুটা এরমঃ “শোনো, আমি আমার পোর্টেট ফেরত চাই...” 

তারপর এরকমঃ “আমরা তো যোগাযোগবিচ্ছিন্ন বন্ধু, তাই না? আমার পোর্টেট বরং আমাদের সহজ সরল সম্পর্কের প্রতীক হয়ে থাক...” 

শেষে এসে, “ইভজেনি, ভালোবাসি তোমায়। আমায় তোমার পোর্টেট পাঠিয়ো...” 

এরপর ও ঘুমিয়ে পড়লো। 

সকালবেলা বার্তাবাহক এসে ঘনকৃষ্ণ আইরিস ফুলের তোড়া দিয়ে গেল। 

“চিঠি নেই?” 

“না।” 

ভেকিনা ঠাণ্ডা কালো ফুলের প্রতিটি পাপড়িতে চুমু খেল; ওর হাস্যময় ঠোঁটে হাল্কা কাঁপুনির খেলা চলতে লাগলো। 

“মানুষ কি এভাবে সরে যায় নাকি পরস্পরের থেকে দূরে? না, না, এতো দূরত্বের ফুল নয়! বিচ্ছেদের ফুল নয়। ফুলগুলো কালো, ওরা ওর দুঃখ বহন করছে। বিরহের দুঃখ। ভালোবাসার দুঃখ। স্বাধীনতার আর দুটো মাত্র দিন বাকি রয়েছে, নষ্ট করা চলবে না।” 

“ইভজেনি,” ও ফোনে বলল, “ইভজেনি, ভুল বুঝেছিলাম, চিন্তা করো না। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি না। তোমার ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেকেই নীচে নামিয়েছি। কিন্তু এখন আমার মন বদলেছে। সব তোমার ঐ কালো ফুলের জন্য। ঘনকৃষ্ণ রামধনুর মতো আইরিস ফুলগুলো আমায় ফিসফিস করে বলেছে, তুমি আমায় ভালোবাসো, আমার বিরহে কষ্ট পাচ্ছ। কালো আইরিস। কেবল কালো আইরিস পারে। বুঝতে পারছো তুমি? না, না, আমি পাগল হয়ে যাইনি, শুধু আনন্দ পেয়েছি। ভীষণ আনন্দ পেয়েছি।” 

ও কথা দিল, আসবে। ভেকিনা একটা গোটা ঘণ্টা কাটিয়ে দিল শোবার ঘর আর ড্রয়িং রুমের আয়নাদুটোর মধ্যিখানে, নিজেকে দেখতে দেখতে। আইরিসগুলোকে হলুদ রিবন দিয়ে জড়ালো। 

“হাসো, আইরিস, হাসো!” 

তিনটের সময় কলিং বেল বাজাতে প্রত্যাশায় ভেকিনার চোখ বন্ধ হয়ে এলো। কিন্তু চোখ খুলতেই চোখে পড়লো ডাক্তার কাতিশেভের সদ্য দাড়িকাটা মুখখানা। 

“কি, আজ কেমন বোধ করছ, সুন্দরী? তোমার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়ছিলাম। তাই ভাবলাম, একবার ঘুরে যাই।” 

“মন্দ না, আজ ভালোই আছি। তবে আপাতত খুব ব্যস্ত।” কিছুটা বিরক্তি নিয়েই বললো ভেকিনা। 

কাতিশেভ ঘরের ভেতরটা নজর করে নিল একবার। 

“কি চমৎকার সুন্দর করে ফুলের গায়ে রিবন বেঁধেছো তুমি। কি ভালো টেস্ট তোমার!” 

“প্লিজ হাত দেবেন না।” ত্রস্ত ভেকিনা বলে উঠলো। “এই ফুলগুলো পবিত্র, ছোঁয়ার জন্য নয়। এদের জন্য আমি ঠিক কতটা আনন্দ পেয়েছি তা বলে বোঝাতে পারবো না। এক কথায়, নান অফ ইয়োর বিজনেস।” 

কাতিশেভ যেন হঠাৎ নরম হয়ে গেল। 

“আহা সোনা আমার, আমি কি তোমায় এতোই আনন্দ দিয়েছি!’’ ডাক্তারের গলা দিয়ে মধু ঝরে পড়ছিল। 

ভেকিনার শরীর বরাবর ঠাণ্ডা একটা স্রোত খেলে গেল। 

“কি? কি বলছেনটা কি?” 

“ফুলগুলো পাঠিয়ে যে তোমায় এতোটা আনন্দ দিতে পারবো, এতো আমি ভাবতে পারিনি। কি কাণ্ড দেখো, আমি প্রথমে কালো বলে নিতেই চাইনি। ফুলের দোকানের লোকটা আমায় কনভিন্স করে আরকি।” “এই মরসুমে এই ফুল সবার দারুণ পছন্দ হচ্ছে কিন্তু”, লোকটা বলল, আমি বললাম, “সবার পছন্দ হলে ওরও হবে! দিয়ে দিন। কই, কি হল তোমার? কি ব্যপার?” 

ভেকিনার মুখ পাঁশুটে সাদা হয়ে গেছে, শরীরে শ্বাস নেই যেন। 

“সাহস কি করে হয় তোমার! অপদার্থ লোক কোথাকার! অসহনীয়, অসভ্য। কোন সাহসে কার্ড বা চিঠি ছাড়া ফুল পাঠিয়েছো?” 

“এরকম করছো কেন বলবে?” কাতিশেভ ভয়ে ভয়ে বলল, “আমি তো ভাবলাম, গতকাল যা হয়েছে তারপর তুমি এমনিতেই বুঝতে পারবে। হম...” 

“বেরিয়ে যাও! কি সাহস! আমাকে, একজন মহিলাকে, অপমান করতে এসেছ? বেরিয়ে যাও হতচ্ছাড়া।” 

কাতিশেভ আলতো পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল—পায়ের পুরো পাতাটা ফেলারও সাহস হচ্ছিল না—নীচে আসতে না আসতেই শাতভের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সে তখন ওপরে উঠছে। 

শিল্পী খোশমেজাজে শিস দিচ্ছিল, হাতে কালো আইরিসের তোড়া। 

কাতিশেভ ওকে বলল, “আপনি কি ওর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন? ফুল নিয়ে? ভুলে জান ভাই। বন্ধু হয়ে বলছি, ভুলে জান। উনি যে কি মহিলা!...শাধুসন্ত লোক...যাকে বলে পবিত্রতার পরাকাষ্ঠা। উনি এক বন্যজন্তু। মাথাটা একেবারে খারাপ হয়ে গেছে ওর।” 

কাতিশেভ নিজের কপালে ভুরুর কাছটা আঙুল দিয়ে টোকা মারল। 

“কি বলছেন? সত্যি?” শিল্পী সাবধান হয়ে গেল। একবার পুরো বিষয়টা ভেবে নিল। তারপর ডাক্তারের সঙ্গেই সিঁড়ি বরাবর নীচের পথ ধরল। হাতে ধরা ঘনকৃষ্ণ আইরিস। কৃষ্ণধনু। 


১৯২১
লেখক পরিচিতি
নাদেজা তেফি
জন্ম ১৮৭২ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে। মৃত্যু ১৯৫২ সালে প্যারিসে। 
তিনি একজন রুশ রসসাহিত্যিক। তেফি তার ছদ্মনাম। আসল নাম নাদেদজা আলেক্সান্দ্রেভনা বুচিনস্কায়া। ১৯০৫ সালে তার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। শুরুতেচেকভের প্রভাব পড়েছিল তার গল্পে।শুরুতে অক্টোবর বিপ্লবের সমাররথক হলেও খুব দ্রুত তিনি বলশেভিকদের উপর বিরক্ত হন। ১৯১৯ সালে তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ  ছেড়ে চলে যান। পরে তিনি ইস্তাম্বুলে কোনো ঝামেলা ছাড়াই যেতে পারেন ১৯২০ সালে। সেখান থেকে তিনি প্যারিসে থিতু হন। 
তেফির বইয়ের নাম--
  • A Modest Talent and Diamond Dust (one-act plays), and Talent (story), from A Russian Cultural Revival, University of Tennessee Press, 1981.
  • All About Love (story collection), Ardis Publishers, 1985.
  • The Woman Question (one-act play) and Walled Up (story), from An Anthology of Russian Women's Writing, Oxford, 1994.
  • Time (story), from The Portable Twentieth Century Reader, Penguin Classics, 2003.
  • Love and A Family Journey (stories), from Russian Stories from Pushkin to Buida, Penguin Classics, 2005.
  • When the Crayfish Whistled: A Christmas HorrorA Little Fairy TaleBaba Yaga (text of a picture book), The Dog, and Baba Yaga (essay), from Russian Magic Tales from Pushkin to Platonov, Penguin Classics, 2012.
  • Subtly Worded (stories), Pushkin Press, 2014।

অনুবাদক পরিচিতি
অর্ক চট্টোপাধ্যায়

গল্পকার। সমালোচক। অনুবাদক।
অধ্যাপক।
আই আই টি, গান্ধীনগর। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন