মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

ভ্লাদিমির নবোকভ'এর গল্প : সংগ্রহশালা দর্শন


রূপান্তর: দীপংকর গৌতম

অনেক বছর আগের কথা। তখন আমি প্যারিসে। আমার এক পাগলাটে গোছের বন্ধু জানতে পারলো--পরবর্তী দুটো কি তিনটে দিন আমি মঁতেসার্ত এ কাটাতে যাচ্ছি। সে আমাকে হালকা চালে নিকটবর্তী সংগ্রহশালা দর্শনের আমন্ত্রণ জানালো । সে শুনেছিল--সেই সংগ্রহশালায় লেরয়ের আঁকা তার দাদুর একটি পোর্ট্রেট রয়েছে। হাসিমুখে দু’হাত ছড়িয়ে সে একটা ধোঁয়াটে কাহিনীর জাল বুনে গেলো । স্বীকার করছি, সে কাহিনীতে আমি বেশ খানিক মনোঃসংযোগ করেছিলাম। 

তার আংশিক কারণ , আমি কোন লোকের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাপার-স্যাপার পছন্দ করিনা। তবে আমার বন্ধুরা কেউ এই পর্যায়ের কল্পনার রাজ্যে বাস করতে পারে, এতে আমার সন্দেহ ছিলো । তার কাহিনীটি মোটামুটি এরকম ছিলো : গত রুশ - জাপান যুদ্ধের সময়ে তাদের সেন্ট পিটার্সবুর্গের বাড়িতে তার দাদু মারা যাবার পর , তাঁদের প্যারিসের অ্যাপার্টমেন্টের সমস্ত জিনিসপত্র নিলামে বিক্রি হয়ে যায় । বেশকিছু নাম না জানা স্থানে ঘোরাঘুরির পর পোর্ট্রেটটি লেরয়ের নিজের শহরের সংগ্রহশালা নিয়ে যায়। আমার বন্ধুটি জানতে চাইছিলো, পোর্ট্রেটটি আদৌ ওই সংগ্রহশালায় আছে কি না , যদি থেকে থাকে, তাহলে তার মূল্য নির্ধারিত হয়েছে কি না, যদি হয়ে থাকে , তাহলে কত মূল্য ধার্য্য হয়েছে । আমি যখন জানতে চাইলাম সে কেনো সংগ্রহশালার কর্তৃপক্ষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলে না। উত্তরে সে জানালো-- সে বহুবার এ নিয়ে লেখালিখি করেছে, কিন্তু তাদের তরফ থেকে কখনো কোনো উত্তর পায়নি ।

আমি মনে মনে সঙ্কল্প করলাম, বন্ধুর অনুরোধটি আমি রাখবো না। আমি তাকে সব সময়েই বলি, আমি এইসব জায়গা তা সে সংগ্রহশালাই হোক বা প্রাচীন বাড়িঘর হোক, দেখতে যাবার চিন্তামাত্রেই অসুস্থ বোধ করি, আমার ভ্রমণপথ পরিবর্তন করে ফেলি। এগুলো আমার কাছে বেশ গা ঘিনঘিনে ব্যাপার। তাছাড়া এসব কাজকর্ম নিতান্তই খামখেয়ালিপূর্ণ-- এর কোনো মানে হয়না ।

যাহোক, ঘটনাটা ঘটলো এরকম , মঁতেসার্তের জনবিরল পথে একটি মনিহারী দোকানের খোঁজে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আর সবকটা রাস্তার শেষে ঠিক একইরকমভাবে আচমকা উদয় হতে থাকা পিরামিডের মতো ঘেঁটি লম্বা গীর্জার মাথাগুলোকে অভিশাপ দিচ্ছিলাম। হঠাৎই এসময় আমি ভয়ংকর এক প্রবল বর্ষণের কবলে পড়লাম। বৃষ্টির তোড় সাথে সাথেই খীপ্র গতিতে মেপল গাছের পাতাগুলো ঝরিয়ে দিতে লাগলো। অক্টোবরের চমৎকার দখিন হাওয়াময় আবহাওয়াটা যেন কেবল একটি সূতোর ওপর ঝুলতে থাকলো । আমি একটা আচ্ছাদনের জন্য পড়িমরি ছুটলাম এবং নিজেকে ওই সংগ্রহশালার সিঁড়ির ওপর আবিষ্কার করলাম ।

সংগ্রহশালার বাড়িটির অনেকগুলি ভাগ ছিলো , বিভিন্ন রঙীন পাথর দিয়ে বানানো থাম, সম্মুখভাগের উপরে ত্রিকোণাকৃতি জায়গাটায় সোনার জলের লিপিলেখ , ব্রোঞ্জের দরজাটির দুপাশেই ছিলো সিংহের পায়ের আকৃতিবিশিষ্ট পাথরের বেঞ্চ । দরজার একটি পাল্লা খোলা পড়ে ছিলো, ঝোলানো ছাদ থাকা সত্বেও বৃষ্টিধারার নরম আলোর জন্য অন্দরসজ্জা বেশ অন্ধকার দেখাচ্ছিলো । বেশ কিছুক্ষণ আমি সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে রইলাম , কিন্তু ক্রমে ক্রমে আমার ভেতরের  বাড়তে থাকা  ফটক খেলার ইচ্ছেটাই শেষে জিতে গেলো । দেখে মনে হলো-- বৃষ্টিটা যেন চিরতরে পড়তেই থাকবে। সুতরাং আমি সংগ্রহশালার ভেতরে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। এর চেয়ে করার মতো ভালো কোনো কাজও ছিলোনা। আমি হেঁটে হেঁটে মসৃণ , পরিষ্কার মার্বেল পাথরে মোড়া হলটিতে ঢোকার প্রায় সাথে সাথে দূরের কোণ থেকে ঘূর্ণায়মান টুলটি সরাবার ঝনঝন শব্দ হলো। তত্ত্বাবধায়ক লোকটি এলেন। তিনি একজন সাধারণ বৃদ্ধ। একটি হাতকাটা জামা পরেছেন তিনি। চশমার ওপর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। হাতের খবরের কাগজটি পাশে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে আমার মুখোমুখি হলেন । আমি প্রবেশমূল্যের ফ্রাঁগুলো দিলাম এবং প্রবেশপথের ধারে রাখা মূর্তিগুলোর দিকে তাকানোর  চেষ্টা না করে (ওগুলো ছিলো সার্কাসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মতোই গতানুগতিক ও গুরুত্বহীন) মূল হলঘরটিতে ঢুকলাম।

যেখানে যা থাকার সেখানেই সব ছিলো , হালকা ধূসর রঙের সব নিশ্চল পদার্থ , ভাঙাচোরা । যথারীতি পুরনো, বহু ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু ধাতব পয়সা ভেলভেটের বাক্সে সাজিয়ে রাখা আছে । বাক্সটির ওপরে একজোড়া ঈগল- পেঁচা এবং লম্বা কানের পেঁচা রাখা রয়েছে , ফরাসি ভাষায় অনুবাদে এদের নাম লেখা রয়েছে গ্র্যাণ্ড ডিউক এবং মিডল ডিউক । প্রাচীন মহার্ঘ খনিজ পদার্থগুলো ধূলোমাখা এনগ্রেভ করা কাগজের মণ্ডের ওপর পড়ে ছিলো । এক বিস্ময়কর চকচকে দাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের ছবি রয়েছে। তিনি বিভিন্ন আকৃতির অদ্ভুত কালো কালো গোলাকৃতি প্রাণী আলাদা করে তদারক করছেন। তারা বিপুল পরিমাণে বরফ জমে যাওয়া কাঠের উপর ফুটো করছিলো। অনিচ্ছাকৃতভাবে আমি সেখানে থমকে গেলাম। আমি কিছুতেই তাদের স্বভাব, গঠন, কাজকর্ম বুঝতে পারছিলাম না । তত্ত্বাবধায়কটি নিঃশব্দ পায়ে সবসময়ে সম্মানজনক দূরত্ব থেকে আমাকে অনুসরণ করে যাচ্ছিলো। এবার সে তার একটি হাত পেছনে এবং আরেকটি হাত পকেটে রেখে ঢোঁক গিলতে গিলতে এগিয়ে এলো। তার গলার অ্যাডামস অ্যাপেলের ওঠানামা দেখে বুঝতে পারলাম ।

‘এগুলো কী?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম ।

‘ বিজ্ঞান এখনো সেটা ঠিক করতে পারেনি’ , সে উত্তর দিলো। সন্দেহাতীতভাবে সে একই বুলি আউড়ে চললো , এদের খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।’ সেই এক কৃত্রিম স্বরে সে বলতে লাগলো, ‘ ১৮৯৫ সালে, নাইট অফ দ্য লিজিয়ঁ অঁর পৌরপিতা লুই প্রাদিয়র।’’ তার কাঁপতে থাকা আঙুল ছবিটির দিকে নির্দেশ করছিলো ।

‘বেশ, ভালো’ , আমি বললাম , ‘কিন্তু কে ঠিক করে দিলেন, এবং কেনই বা এরা এই সংগ্রহশালায় ঠাঁই পাবার যোগ্য  হলো?’’

‘এবার আমি এই খুলিটার দিকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি’ , বৃদ্ধ লোকটি প্রবল উৎসাহে চীৎকার করে উঠলো। স্পষ্টতই কথা ঘোরাতে চাইল ।

‘তবু ‘, আমি বাধা দিলাম , ‘আমি জানতে আগ্রহী যে এগুলো কী দিয়ে তৈরি’ !

‘বিজ্ঞান ... , সে নতুন করে বলা শুরু করলো। অল্পসময়েই থেমে গেলো এবং কাঁচের ওপরের ধূলো লেগে থাকা তার আঙুলগুলোর দিকে তীর্যকভাবে চেয়ে রইলো ।

আমি একটি চীনে ফুলদানি পরীক্ষা করতে লাগলাম। সম্ভবত সেটি একজন নেভি অফিসারের আনা । কতকগুলো ঝাঁজরা হয়ে আসা জীবাশ্ম , ঘোলাটে আরকের মধ্যে একটা ফ্যাকাশে কীট , সপ্তদশ শতকের মঁতেসার্তের একটি নকশা। নকশাটি কাল ও সবুজ রঙে আঁকা। আর কফিন বাঁধার ফিতে দিয়ে বাঁধা রয়েছে তিনখানি মরচে ধরা যন্ত্র রয়েছে। তার একখানি কোদাল , একখানি কুড়ুল, আর একখানি বাটালি । আমি অন্যমনস্কভাবে ভাবছিলাম-- এগুলো অতীতে আনা হয়েছিলো খননকার্যের জন্য। কিন্তু তত্ত্বাবধায়কটির কাছে আর কিছু জানতে চাইলাম না । ডিসপ্লে করার বাক্সগুলো ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে সে নিঃশব্দে ও শান্তভাবে আমাকে অনুসরণ করেই যাচ্ছিলো। প্রথম হলটির অন্যধারে আরেকটি হল রয়েছে। স্পষ্টতই সেটিই শেষ ঘর। সেটার ঠিক মাঝখানটায় নোংরা বাথটাবের মতো একটা পাথরের কফিন দাঁড় করানো রয়েছে। দেয়ালগুলোতে রয়েছে ছবি ঝোলানো।

ঠিক তখনই আমার চোখ আটকে গেলো গরু আর ল্যান্ডস্কেপ ছবির মাঝখানে থাকা এক ব্যক্তির পোর্ট্রেটের দিকে । আমি কাছাকাছি এগিয়ে গেলাম। বিপুল বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম সেই বস্তুটি। বস্তুটির অস্তিত্ব এতক্ষণ আমার কাছে ছিলো কেবল অস্থির মনের কল্পনা । অতীব রদ্দি তেলে আঁকা ছবিটির মানুষটি ফ্রক কোট পরে আছেন। চুলগুলো লম্বা। একটি বড়ো চশমা পরে আছেন। চশমার ডাঁটিতে সূতো বাঁধা । তাঁকে খানিকটা অফনবাখের মতো লাগছিলো । দেখে আমার মনে হলো, পুরোপুরি না হলেও এর চেহারার সঙ্গে আমার বন্ধুর চেহারা কিছুটা মিল আছে।একদিকের কোণে একটি হাতের ওপর অতিকষ্টে খুঁজে পাওয়া গেলো--কালো পশ্চাদপটের ওপর গাঢ় লাল রঙে লেরয় নামটি। কালো পশ্চাদপটে উপর লাল রঙে করা হয়েছে স্বাক্ষরটি।

কাঁধের কাছে একটা ঝাঁঝালো টকগন্ধী নিঃশ্বাস টের পেয়ে ঘুরে তাকাতেই তত্ত্বাবধায়কের স্থির দৃষ্টির মুখোমুখি হলাম । তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেউ এই ছবিগুলোর মধ্যে একটা কিনতে চান, কার সাথে দেখা করতে হবে—বলুন তো’?

‘এই সংগ্রহশালার সব সম্পদ এ শহরের গৌরব’ , বৃদ্ধ লোকটি উত্তর দিলো , 'আর গৌরব কখনো বিক্রি হয়না।’

তার লাগাতার কথাবার্তার ভয়ে আমি তাড়াতাড়ি সায় দিলাম। তা সত্ত্বেও আমি সংগ্রহশালার পরিচালকের নাম জানতে চাইলাম। সে পাথরের কফিনটির গল্প বলে আমার মনোযোগ ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু আমি জোর করতে সে এম. গোদার বলে একজনের নাম বললো। আর বুঝিয়ে দিলো কিভাবে তাকে খুঁজে পেতে পারি ।

সত্যি বলতে কি, পোর্ট্রেটটির যে অস্তিত্ব আছে, এটা ভেবেই আমার আনন্দ হচ্ছিলো । যদিও আমার নিজের নয়, তবু , কারোর স্বপ্ন সত্যি হবার সময় উপস্থিত থাকতে পারাটাই আনন্দের । আমি ঠিক করলাম, দেরী না করে বিষয়টা মিটিয়ে ফেলবো। আমি যখন কোনো বিষয়ে পেয়ে যাই, তখন কেউ আর আমাকে পিছনে টেনে ধরে রাখতে পারেনা । আমি তাড়াতাড়ি শব্দ করে হেঁটে সংগ্রহশালা থেকে বেরিয়ে এলাম। আর দেখতে পেলাম--বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশ জুড়ে নীলিমা ছড়িয়ে আছে। কাদামাটি মাখা পোশাক পরা এক মহিলা একটি ঝকমকে রূপোলি সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। আশপাশের পাহাড়গুলোর মাথায় তখনও কেবল মেঘ ঝুলে আছে । আরো একবার গীর্জাটা আমার সাথে লুকোচুরি খেলতে থাকলো, কিন্তু আমি সেটাকে ঠকিয়ে দিলাম । গানবাজনায় মত্ত তরুণ তরুণীদের দলে ঠাসা একটি ক্ষ্যাপা লাল বাসের ধেয়ে আসা চাকার নিচে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলাম। এভাবেই আমি অ্যাসফল্টের একটি রাস্তা পার হলাম ।

মিনিটখানেক পরেই আমি এম. গোদারের বাগানের গেটে নক করলাম । তিনি ঘুরে তাকালেন। রোগামতো চেহারার মধ্যবয়সী ভদ্রলোক তিনি। একটি নকল উঁচু কলার লাগানো শার্ট পরে আছেন। টাইয়ের নটটিতে একটি মুক্তো শোভা পাচ্ছে । আর মুখখানা যেন একেবারে রাশিয়ান নেকড়ে-শিকারী কুকুরের মতো দেখতে। এটাও যেন যথেষ্ট ছিলো না--খামের ওপরে ডাকটিকেট সাঁটার সময়ে তিনি ঠিক কুকুরের মতোই ভাবভঙ্গীতে নিজের মুখখানা চাটছিলেন । আমি তাঁর ছোটো কিন্তু বিলাসবহুল সাজানো গোছানো ঘরখানিতে প্রবেশ করলাম । ডেস্কের ওপর একটি উজ্জ্বল সবুজ খনিজ পদার্থের তৈরি দোয়াত রাখা আছে । তাকের ওপর একটি চীনে ফুলদানি রাখা। সেটাকে অদ্ভুতভাবে আমার খুব পরিচিত লাগছিলো । আয়নায় লোকটির মাথার পেছনটা দেখা যাচ্ছে। সেখানকার চুল সাদা। এখানে সেখানে কয়েকটি যুদ্ধজাহাজের ছবি ঝোলানো আছে। এই ঝকঝকে ছবিগুলো দেয়ালের সবুজ রংকে ম্লান করে দিয়েছে। 

‘আপনার জন্য কী করতে পারি’ ? সদ্য সীল করা খামখানা আবর্জনার ঝুড়িতে ছুঁড়ে ফেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন । কাজটা আমার অস্বাভাবিক মনে হলো। তবুও এটা নিয়ে কথা বলা আমার ঠিক বলে মনে হলো না । আমি আমার আসার কারণ সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম । অর্থমূল্যে দিয়ে ছবিটি কিনতে চায় আমার বন্দ্ধউ সেকথা তাকে বললাম। সংগ্রহশালার নিয়মবিরুদ্ধ বলে তিনি আমাকে সেকথা উল্লেখ করতে বারণ করলেন।

"সবটাই খুব ভালো " , এম. গোদার বললেন, ‘শুধু একটা কথা, আপনি ভুল করছেন , এই সংগ্রহশালায় এরকম কোনো ছবি নেই।’

‘কী বলতে চান আপনি ? এরকম কোনো ছবি নেই! আমি এইমাত্র সেটা দেখে এলাম , গুস্তেভ লেরয়ের আঁকা একজন মহান রুশ ব্যক্তির পোর্ট্রেট’!

‘লেরয়ের কাজ একটা আমাদের আছে’ , বললেন এম. গোদার । তিনি একটি অয়েলক্লথে মলাট দেয়া নোটবুকের পাতা ওল্টালেন। তাঁর কালো নখ একটি এন্ট্রির ওপর স্থির হলো। কিন্তু সেটা পোর্ট্রেট নয়-- একটা গ্রামের দৃশ্য : পশুপালকের প্রত্যাবর্তন । 

‘পাঁচ মিনিট আগে ছবিটা আমি আমার নিজের চোখে দেখে এসেছি’, আমি আবার বললাম। বললাম, ‘পৃথিবীর কোনো শক্তিই ছবিটির অস্তিত্ব সম্পর্কে আমার সংশয় জাগাতে পারবে না।’

‘ মানছি,’ এম. গোদার বললেন , ‘কিন্তু আমার মাথাটা তো খারাপ হয়ে যায়নি ! আমি প্রায় কুড়ি বছর ধরে এই সংগ্রহশালার অধ্যক্ষ। আমি সংগ্রহের এই তালিকাটিকে ঈশ্বরের উপাসনার মতোই জানি। এখানে বলা আছে যে ছবিটির নাম-পশুপালকের প্রত্যাবর্তন। অর্থাৎ পশুপালক বাড়ি ফিরছে। এখন যদি আপনার বন্ধুর দাদুকে মেষপালক হিসেবে ছবিতে আঁকা না হয়ে থাকে, তাহলে তো এই সংগ্রহশালায় তাঁর পোর্ট্রেটের অস্তিত্ব আমি কোনোভাবেই কল্পনা করে নিতে পারবো না ।

‘উনি একটা ফ্রক কোট পরে ছিলেন!’ আমি চীৎকার করে বললাম , ‘আমি শপথ করে বলছি, উনি একটা ফ্রক কোট পরে ছিলেন!’

‘আমাদের সংগ্রহশালাটি সাধারণভাবে আপনার কেমন লাগলো?’ এম. গোদার সন্দেহজনকভাবে প্রশ্ন করলেন। ‘আপনি কি পাথরের কফিনটিকে প্রশংসা করছেন?’

‘শুনুন’, আমি বললাম। মনে হয় আমার কণ্ঠস্বর ইতোমধতেই বেশ কাঁপছিলো। ‘একটা উপকার করুন। এই মুহূর্তে ওই জায়গায় চলুন। যদি ওই ছবিটি ওই জায়গায় থাকে তবে একটি চুক্তিপত্র করুন। আপনি ওটা বিক্রি করবেন।’

‘আর যদি না থাকে?’ এম. গোদার প্রশ্ন করলেন।’

‘তাহলেও আমি টাকাটা আপনাকে দিয়ে দেবো।’

‘ঠিক আছে,’ তিনি বললেন , 'এখান থেকে লাল-নীল পেনসিলটা নিন, এবং লাল রঙ ব্যবহার করুন। ,পেন্সিলের লাল রঙ দিয়ে কথাগুলো লিখে দিন আমাকে , প্লিজ।

উত্তেজনার বশে আমি তাঁর দাবি অনুযায়ী কাজ করলাম । আমার স্বাক্ষরের দিকে তাকিয়ে তিনি দুর্বোধ্য রুশ ভাষায় তাঁর অসন্তোষ ব্যক্ত করলেন । তারপর নিজে স্বাক্ষর করলেন। দ্রুত কাগজটিকে ভাঁজ করে  নিজের ওয়েস্টকোটের পকেটে গুঁজে রাখলেন।

"যাওয়া যাক’ , জামার হাতার শেষ বোতাম খুলে তিনি বললেন ।

যাবার পথে তিনি একটি দোকানে ঢুকলেন। চিটচিটে দেখতে এক থলে ক্যারামেল জাতীয় জিনিস কিনলেন। সেগুলো নিতে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাতে লাগলেন আমাকে। আমি সোজা অস্বীকার করায় তিনি ওগুলোর একজোড়া আমার হাতে গুঁজে দেবার চেষ্টা করলেন । আমি হাতটা টেনে সরিয়ে নেওয়াতে অনেকগুলো ক্যারামেল ফুটপাথের ওপর ছড়িয়ে পড়লো । তিনি ওগুলো তুলে নিতে থামলেন। আর আমার কাছ থেকে এক কদম এগিয়ে গেলেন । সংগ্রহশালার কাছাকাছি এসে আমরা দেখতে পেলাম, একটি লাল রঙের খালি বাস গেটের বআইরে দাঁড়িয়ে আছে ।

‘ওহ্ ‘’ , এম. গোদার খুশি হয়ে বললেন, ‘দেখছি আজ আমাদের সংগ্রহশালায় অনেক দর্শক এসেছে !'

তিনি টুপিটা খুলে সামনের দিকে ধরে মাপা পায়ে হেঁটে চললেন ।

সংগ্রহশালার ভেতরে সব ঠিকঠাক ছিল না । গোলমাল, চীৎকার, অশ্লীল হাসি এমনকী ধ্বস্তাধ্বস্তির শব্দ ভেসে আসছিল । আমরা প্রথম হলটিতে প্রবেশ করলাম। সেখানে সেই বয়স্ক তত্ত্বাবধায়কটি দুটি লোককে ঠেকাতে চেষ্টা করছিল। লোক দুটি পরেছে এক ধরনের উৎসবের পোষাক। কোর্টের বুকের কাছের কলারে রয়েছে এক ধরনের প্রতীকচিহ্ন। তারা পবিত্র ব্যক্তিকে অসম্মান করছিল। তাদের দুজনের মুখ ছিল বেগুনি রঙের। আলমারির কাঁচের ভেতর থেকে ঔষধের আরক বের করে নেবার চেষ্টা করছিলো তারা। এই আরক রেখেছেন পৌরপ্রধান। 

বাকি যুবকরা ছিল কোনো গ্রামীণ শরীরচর্চা প্রতিষ্ঠানের সদস্য। তারা গোলমাল করে মজা করছিল। তাদের মধ্যে কেউ মদে চুর। কারো মস্তিষ্ক উত্তপ্ত। একটি জোকার আবার স্টীম রেডিয়েটরের পাইপ নিয়ে পরমানন্দে মজে আছে। তার ভাবখানা যেন সেটি  দিয়ে একটি কিছু দেখাতে ব্যস্ত আছে। আরেকজন আবার একটি পেঁচার দিকে লক্ষ্য করে কথা বলছিলো তার মুঠি এবং তর্জনী নেড়ে নেড়ে। তারা মোট তিরিশজন সেখানে ছিল। তাদের গতিবিধি এবং কণ্ঠস্বর সেখানে ভীষণ জোরালো হৈ হট্টগোলের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল।

এম. গোদার তাঁর হাতে তালি বাজালেন এবং একটি লেখার দিকে আঙুল দেখালেন। সেখানে লেখা ছিলো, সংগ্রহশালার দর্শকদের বেশভূষা অবশ্যই ভদ্রসভ্য হতে হবে ।

এরপর তিনি দ্বিতীয় হলটির দিকে ঘুরলেন। তার পেছনে আমি । গোটা দলটা সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সাথে চলে এলো । গোদারকে আমি ছবিটার কাছে নিয়ে এলাম । তিনি ছবির সামনে নিশ্চল হয়ে গেলেন। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে সামান্য পিছিয়ে এলেন। যেন এই ছবিটার প্রশংসা করতেই এই পিছিয়ে আসা। তাঁর রমনীয় গোড়ালিটা কারো একটা পায়ের ওপর উঠে গেলো ।

‘চমৎকার ছবি" , খাঁটি বিস্ময়ের সাথে তিনি বললেন , ‘বেশ, এটি নিয়ে ঝামেলা বাদ দেই। আপনিই ঠিক ছিলেন, নিশ্চয়ই তালিকাটায় ভুল ছিলো।’

বলতে বলতেই তাঁর আঙুলগুলো যেন নিজেরাই নড়েচড়ে আমাদের চুক্তিপত্রটি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল। তারপর টুকরোগুলোকে তিনি একটি পিকদানিতে ফেলে দিলো। সেগুলো বরফের কুচির মতো দেখতে লাগছিল ।

‘এই বুড়ো বনমানুষটি কে?’’ ডোরাকাটা জার্সি পরা একজন শুধোলো । যেহেতু আমার বন্ধুর দাদু ছবিতে একটি জ্বলন্ত সিগারেট ধরে ছিলেন, আরেক কৌতুকবাজ একটি সিগারেট নিয়ে তাঁর পোর্ট্রেট থেকে লাইটার ধার করবার ভান করছিলো।

‘বেশ, আমরা দরদামটা ঠিক করে নিই,’’ আমি বললাম, ‘তারপর  এ জায়গাটা থেকে বেরোনো যাক ।’’

‘দয়া করে যাবার রাস্তা দিন,’ অত্যুৎসাহীদের একধারে ঠেলে দিয়ে এম. গোদার চীৎকার করলেন ।

আমি আগে খেয়াল করিনি--হলের শেষদিকে একটা দরজা ছিলো, আমরা সেটা দিয়ে পথ করে বেরিয়ে এলাম।

‘আমি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারিনা,’’ এম. গোদার জোরে চীৎকার করলেন, ‘ সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা খুব ভালো জিনিস। যখন সেটা আইনানুগ হলেই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ভালো বিষয় । আমাকে মেয়রের সাথে প্রথমে আলোচনা করতেই হবে । আগের মেয়র সবে মারা গেছেন এবং নতুন করে এখনো কেউ নির্বাচিত হননি। আপনি পোর্ট্রেটটি কিনতে সক্ষম হবেন কিনা সে ব্যাপারে আনার সন্দেহ আছে। তবু আমি আপনাকে আমাদের অন্যান্য সম্পদ দেখাবো।’’ 

আমরা খানিক দূরে একটি হলের ভেতর ছিলাম । এলোমেলো বিবর্ণ পাতা এবং আধসেদ্ধ খাবারের মতো চেহারা নিয়ে কতকগুলো বাদামী বই একটি লম্বা টেবিলের কাঁচের ভেতর পড়ে আছে । দেয়ালের ধারে কিছু নকল সৈন্য দাঁড় করানো। তাদের পায়ে মিলিটারি বুট।  বুটের উপরটা পুড়ে যাওয়ার মতো লাগে। 

‘আসুন, এটা নিয়ে কথা বলা যাক,’’ আমি মরিয়া হয়ে একটু জোরে বললাম। কোণের দিকে রাখা একটি সিল্কের ঢাকা দেয়া সোফার দিকে এম. গোদারকে আসতে বললাম । কিন্তু এরমধ্যেই  তত্ত্বাবধায়ক আমাদের বাঁধা দিল। সে তার একখানা হাত নাড়তে নাড়তে আমাদের দিকে ছুটে এলো। তার সামনে ছিলো যুবকদের ভীড়। তাদের একজনের মাথায় একটি তামার শিরস্ত্রাণ। রেমব্র্যান্টের রঙের মতো উজ্জ্বল শিরস্ত্রাণের রঙ। 

"খোলো ওটা, খোলো .... ,’’ এম. গোদার চীৎকার করে উঠলেন । হেলমেটটি উন্মত্ত যুবকরা মাথায় পরার চেষ্টা করছিলো, সেটা একজনের মাথা থেকে আরেকজনের মাথায় তাদের যেন উড়ে বেড়াতে লাগল। আর ঝনঝন শব্দ হতে থাকলো ।

"চলুন যাওয়া যাক , এম. গোদার আমার জামার হাতাটি টেনে ধরে বললেন । আমরা প্রাচীন ভাস্কর্যের ঘরটিতে সরে এলাম । 

একমুহূর্তের জন্য প্রচুর মার্বেল পাথরের তৈরি পায়ের মধ্যে আমি পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম। এক দৈত্যের হাঁটুর চারপাশে দুবার দৌৌৌঁড়ে নিলাম। এরমধ্যেই এম. গোদার আমার দিকে তাকালেন। পাশের একটি নারী দৈত্যেরর সাদা গোড়ালির পিছনে আমাকে খুঁজছিলেন। এর মধ্যে একজন উলটো করে টুপি পরা লোক হঠাৎ করে নারী দৈত্যটির গা বেয়ে অনেক কষ্টে উপরে উঠতে চাইছিল। সে হঠাৎ করে অনেকটা উঁচু থেকে পাথরের মেঝেতে পড়ে গেলো । তার কজন সঙ্গী তাকে তোলার চেষ্টা করছিলো। তারা দুজনেই মাতাল ছিলো । হাতের ঝাপটায় তাদের অগ্রাহ্য করে এম. গোদার পরের ঘরটিতে ছুটে গেলেন । সেখানে প্রাচ্যদেশীয় ঝলমলে সুতা দিয়ে তৈরি একটি আকাশনীল রঙের গালিচার ওপর শিকারী কুকুররা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। একটি বাঘছালের ওপর ধনুক এবং তূণীর রাখা রয়েছে । 

অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার হলেও এই চিত্রবিচিত্র ভাড়দের আচরণ আমাকে জ্বালা দিচ্ছিল-- মাথার মধ্যে বোঁ বোঁ করছিল। হয়তো নতুন নতুন দর্শনাথীরা ঠেলাঠেলি করে যাচ্ছিল। হয়তোবা এই অপ্রয়োজনে বাড়িয়ে তোলা জাদুঘরটি থেকে বের হওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম বলে এরকম মনে হচ্ছিল। 

এম. গোদারের সঙ্গে দরাদরি ব্যাপারটা যুক্ত হয়ে স্বস্তি আর স্বাধীনতার মধ্যে আমি এক ধরনের অজানা সতর্কবার্তা পেতে শুরু করেছি। 

এরমধ্যে আরেকটা ঘরে পৌঁছে যাই। বাস্তবতা যাচাই করলে এই ঘরটি অবশ্যই অনেক বড়ো হওয়া দরকার। এই ঘরের পুরোটা জুড়ে এটে রয়েছে একটা যুদ্ধজাহাজের মতো দেখতে আস্ত একটা তিনি মাছের কংকাল। এছাড়া তখনো আরো কয়েকটি ঘর অদেখা রয়ে গেছে। এর মধ্যে তেরছাভাবে লটকানো জেল্লাদার বড়ো বড়ো পেইন্টিংগুলো টানানো আছে। এই পেইন্টিং জুড়ে আঁকা আছে ঝোড়ো হাওয়া আর মেঘ। এর মেঘের মধ্যে ভেসে আছে ধর্মীয় দেব দেবীর মূর্তি। তাদের পরনে নীল ও গোলাপী রঙের লম্বা পোষাক। 

এসবই নিজে নিজে যেন হুট করে অদ্ভুত ঝালরে ঘুরতে ঘুরতে মিশে গেছে। ঝাড়বাতিগুলো উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে। ঝকঝকে দীর্ঘ কাপড়ে আঁকা মাছগুলো যেন এঁকেবেঁকে নেমে এসেছে আলোকিত একুইরিয়ামে। সিঁড়ি দিয়ে ছুটে গিয়ে উপরের গ্যালারি থেকে একদল মানুষকে দেখা গেল। তাদের চুল পাকা। ছাতা হাতে নিয়ে তারা এই মহাবিশ্বের উপহাস পরীক্ষা করে দেখছে। 

শেষে একটি প্রায় অন্ধকার ঘরে এলাম। ঘরটি খুব সুন্দর। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ইতিহাসকে উৎসর্গ করা হয়েছে এই ঘরটি। আমার স্বাধীনচেতা গাইডকে হুট করে থামালাম। 

‘'যথেষ্ট হয়েছে।’’ চেঁচিয়ে বললাম, ‘’ আমি চলে যাচ্ছি। কাল আমরা কথা বলব।’’

এর মধ্যেই সে উবে গেছে। আমি একটু ঘুরতেই বেশি হলে আমার থেকে এক ইঞ্চি দূরে স্যাঁতস্যাঁতে রেলইঞ্জিনের একটি বড় চাকা আমার চোখে পড়ল। দীর্ঘকাল ধরে রেল স্টেশনের মডেলগুলোর মধ্য থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে ফিরছিলাম। স্যাঁতেস্যাঁতে রেললাইনের ম্লান ধারগুলোর নিচে বেগুনি সিগনালগুলো অদ্ভুদভাবে জ্বলে ওঠে। এটাতে আমার দুর্বল হৃদপিণ্ড ধ্বক করে ওঠে। হঠাৎ করে আবার সব কিছু বদলে গেল। চোখের সামনেই একটি পথ চলে এলো। এ পথের শেষ নেই। অসংখ্য অফিস-ফার্নিচার এখানে আছে। আর রয়েছে কিছু প্রায় অদৃশ্য পাগলাটে গোছের মানুষ। খীীীপ্রপ গতিতে একটু ঘুরতেই আমি নিজেকে অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে আবিষ্কার করলাম । আয়না লাগানো দেয়ালগুলোতে একটা বড়ো পিয়ানোর রীডগুলো প্রতিফলিত হচ্ছে । ঠিক মাঝখানে একটি সেতু। এক খণ্ড সবুজ পাথরের ওপর ব্রোঞ্জের তৈরি গ্রিক বংশীবাদক অর্ফিয়ূসের ভাষ্কর্য শোভা পাচ্ছে । এই জলজ বিষয়বস্তু এখানেই শেষ হলোনা , দৌড়ে পিছিয়ে এসে আমি ঝরণা এবং নহরের অংশে পৌঁছুলাম । এই হাওয়া কবলিত, পিচ্ছিল জলের প্রান্ত ধরে হেঁটে যাওয়া ভীষণ কঠিন ছিলো । 

মাঝে মাঝে এক পারে বা দুপারে পাথরের সিঁড়ি আছে। সেখানে পায়ের ছাপ দেখা যায়। এগুলো আমার মনে অদ্ভুদ ভয়ের অনুভ‚তি জাগাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিল খাদের মধ্যে পড়ে যাবো । নীচ থেকে হুইসল বাজার শব্দ, থালাবাসনের ঠোকাঠুকির শব্দ, টাইপরাইটারের খটখট শব্দ, হাতুড়ির ঝনঝনি আরো অনেক শব্দ ভেসে আসছিলো। যেন সেখানে একটা অন্য ধরনের উন্মুক্ত হলঘর আছে। এটা হয়তো ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। অথবা এখনো বন্ধ হতে একটু বাকি আছে। হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। আর আমি অজানা আসবাবপত্রগুলোর ভেতর দিয়ে ছুটতে লাগলাম যতক্ষণ না একটি লাল আলো দেখতে পেলাম এবং হেঁটে বেরিয়ে এসে একটি উঁচু জায়গায় উঠলাম। আমার কানে তখনো যেন জোরালো শব্দ বাজছিলো ।

তাছাড়া হঠাৎ করে সেখানে একটি বৈঠকখানা দেখতে পেলাম। সেটা খুব রুচিসম্মত এবং রাজকীয়ভাবে সাজানো। কিন্তু সেখানে কোনো জীবিত প্রাণী নেই, একটিও জীবিত প্রাণী নেই । এখন আমি বর্ণনাতীতভাবে আতঙ্কিত হলাম । প্রতি পদক্ষেপে আমি ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলাম এবং পুনরায় বেরিয়ে যাবার রাস্তা খুঁজছিলাম। কিন্তু প্রতিবার নিজেকে অজানা জায়গায় খুঁজে পাচ্ছিলাম । ভাঙা জানালার পাল দিয়ে হাইড্রানজা ফুলে ভরা একটি গ্রীনহাউস ছাড়িয়ে কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা রাতের অন্ধকার দেখা যাচ্ছিলো। একদিকে একটি পরিত্যক্ত গবেষণাগারের টেবিলে ধূলোমাখা জারগুলো পড়ে ছিলো । অবশেষে আমি দৌঁড়ে একটি ঘরের মধ্যে এলাম। এখানে কতকগুলো কোটর‌্যাকে অনেকগুলো কালো কোট বিশ্রীভাবে চাপানো রয়েছে এবং কিছু ভেড়ার পশমে বোনা জামাকাপড় রয়েছে । একটি দরজার ওপাশ থেকে হাততালির শব্দ ভেসে আসছিলো কিন্তু যখন আমি দরজাটা খুললাম। সেখানে কোনো থিয়েটার ছিলোনা। কিন্তু শুধু এক নরম অস্বচ্ছতা, চমৎকার রহস্যময় কুয়াশার ঢাকনা পরিপাটিভাবে ছড়িয়ে ছিলো। সেগুল্যকে রাস্তার আলোর সাথে আলাদা করা যায় না। সেগুলো যেন বাস্তবের চেয়েও যেন সত্যি !

অবশেষে একটু এগিয়ে যেতেই অবশেষে , যেসব অবাস্তব হাবিজাবিগুলোর জায়গার মধ্যে এতক্ষণ আমি ইতস্তত দুঃসাহসিক ক্রিয়াকলাপ করে বেড়াচ্ছিলাম তার মধ্যে অবিলম্বে আমার এক সুখকর আর নির্ভুল বাস্তবের অনুভূতি হলো। । আমার পায়ের নীচের পাথরগুলো সত্যিকারের ফুটপথ ছিলো। এটা সদ্য পড়া চমৎকার সুগন্ধী বরফে ঢাকা। এর ওপর ইতোমধ্যেই পথিকরা তাদের পায়ের অনিয়মিত, কালো ছাপ ফেলে গেছে । গায়ে জ্বর আসা এক লক্ষ্যহীন ভ্রমণের পর এই প্রথম, বরফঠাণ্ডা শান্ত এই রাতে আমায় ভীষণ পরিচিত এক সন্তুষ্টির অনুভব দিলো।

ভরসা করে আমি যেখানে বেরিয়ে এসেছিলাম। কেন ওখানে বরফ ছিলো, বাদামী অন্ধকারের মধ্যে অস্ফূটে জ্বলতে থাকা বিশালাকার আলোগুলোই বা কী ছিলো-- ইত্যাদি ব্যাপারগুলোর ইতি টানতে চাইছিলাম সেখানে। আমি নীচু হয়ে একটি তার আটকানো পাথরের চাকা ছুঁয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম। আমার হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে দেখলাম ভেজা ঝুরো বরফে ভরে গেছে। যেন সেখানে কোনো একটি ব্যাখ্যা পড়তে পাবার আশা করছিলাম । আমি লক্ষ্য করলাম আমি ভীষণ হালকা একটা দেশী পোশাক পরে আছি ।

আমি যে সংগ্রহশালার গোলকধাঁধা থেকে পালিয়ে এসেছি এই অনুভব এখনো এতো দৃঢ় ছিলো যে, প্রথম দুই কি তিন মিনিট আমি বিস্ময় বা ভয়--কিছুই অনুভব করতে পারছিলাম না । ধীরস্থীর ভাবে পরীক্ষা চালিয়ে যেতে যেতে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তার পাশের বাড়িটির দিকে তাকালাম এবং চমকে উঠে দেখলাম একটি রেলিং লাগানো লোহার সিঁড়ি ভূগর্ভস্থ ভাঁড়ারের দিকে নেমে গেছে । এক নতুন , বিপজ্জনক কৌতুহলে আমার প্রাণ আঁকুপাকু করতে লাগলো। আমি ফুটপাথের দিকে চাইলাম। চাইলাম তার টানা কালো দাগের সারি ভরা সাদা আবরণের দিকে, রহস্যময় আলো ছড়িয়ে থাকা বাদামী আকাশের দিকে, একটু দূরের নিরেট নীচু দেয়ালটির দিকে ।

আমার মনে হলো নীচে কিছু একটা পড়লো। কিছু একটা সেখানে কড়কড় শব্দ বা কুলকুচোর শব্দ করছিলো । আবার ওই অস্পষ্ট খাদ জুড়ে একটা ঝাপসা আলোর মালা ছড়িয়ে ছিলো । আমার জুতো বরফ শুষে নিচ্ছিলো। ডানদিকের অন্ধকার বাড়িটির দিকে নজর রেখে আমি একটুখানি হেঁটে গেলাম । একটি একপাল্লার জানালার কাঁচের ভেতর সবুজ বাতিদানের আড়ালে একটি বাতি জ্বলছিলো , একটি তালা দেওয়া কাঠের গেট ... একটি ঝাঁপবন্ধ ঘুমন্ত দোকান ... এবং একটি পথবাতির আলো। আলোর আকার দীর্ঘসময় চীৎকার করে আমাকে যেন তার অসম্ভাব্য বার্তা দিতে চাইছিলো । আমি শেষটায় একটা নিশানা তৈরি করলাম , "মেরামত চলছে .... কিন্তু না, বরফ এই শক্ত নিশানাটিকে নিমেষের মধ্যে ধ্বংস করতে পারেনা !

এক মিনিটের মধ্যে আমাকে জেগে উঠতে হবে , আমি চীৎকার করলাম , দুশ্চিন্তা ও উত্তেজনার ধাক্কায় আমার হৎপিণ্ডে ঝাঁকি লাগছিলো, আমি ঘুরে দাঁড়ালাম, হাঁটা লাগালাম, আবার থেমে গেলাম । কোথাও থেকে ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়া ক্ষুরের শব্দ ভেসে আসছিলো । একটা বাঁকানো তার আটকানো পাথরের চাকার ওপর বরফ যেন খুলির মতো বসে গিয়েছিলো এবং বেড়ার অপর পাশে অস্পষ্টভাবে জ্বালানি কাঠের ওপর দেখা যাচ্ছিলো ।

 ইতোমধ্যেই আমি নিশ্চিতভাবে জেনে গিয়েছিলাম, আমি কোথায় আছি । হায়, এটা সেই রাশিয়া নয় যাকে আমি জানি, এ আজকের বাস্তব রাশিয়া, আমার জন্য নিষিদ্ধ, হতাশাজনকভাবে ক্রীতদাসোচিত, হতাশাজনকভাবে আমার নিজভূমি । এক আধিভৌতিক হালকা বিদেশি পোশাকে আমি অক্টোবরের রাতের বিরক্তিকর বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলাম। দাঁড়িয়ে রইলাম ময়কা, ফন্তানকা অথবা অবভোদনি নদী বা খালের কাছাকাছি কোথাও । দৌঁড়োনো অথবা অন্য কোথাও যাওয়া, বেপরোয়াভাবে আমার ভঙ্গুর বেআইনি জীবন রক্ষা করার মতো কিছু একটা আমার করতেই হতো। কতোবার যে ঘুমের মধ্যে আমার এই অনুভূতি হয়েছে ! এখন যদিও এটা বাস্তব, সবকিছুই সত্যি। সত্যি এই বাতাসে মিশে যাওয়া বিক্ষিপ্ত ঝুরো বরফ, এখনো বরফ জমে না যাওয়া নদী, ভেসে ওঠা মাছের ঘর , এবং ওই অদ্ভুত হলুদ অন্ধকার জানালার চতুর্ভুজাকৃতি সত্যি ।

কুয়াশার ভেতর থেকে ব্রিফকেস বগলে নিয়ে পশমের টুপি পরা , একজন লোক আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমার কাছ দিয়ে যেতে যেতে আমার দিকে সচকিত দৃষ্টি দিলেন এবং ঘুরে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালেন। আমি তাঁর অদৃশ্য হওয়া অবধি অপেক্ষা করলাম এবং ভীষণ দ্রুত আমার পকেটে যা ছিলো তা টেনে বের করতে শুরু করলাম। কাগজগুলো ছিঁড়ে বরফের মধ্যে ফেলে সেগুলো পা দিয়ে মাড়াতে লাগলাম । সেখানে কিছু দরকারি দলিলপত্র ছিলো, প্যারিস থেকে আসা আমার ছোটো বোনের চিঠি ছিলো, ছিলো পাঁচহিজার ফ্রাঁ,  একখানা রুমাল, সিগারেট ... যাহোক, নির্বাসিতের বহিরাবরণ আড়াল করতে আমার উচিত ছিলো সব জামাকাপড় ছিঁড়ে ধ্বংস করে ফেলা, আমার জামা জুতো সব ফেলে যথাসম্ভব নগ্ন হয়ে থাকা আমার উচিত ছিল । যদিও ঠাণ্ডা এবং মানসিক যন্ত্রণায় আমি কাঁপছিলাম-- তবুও যতোটা সম্ভব আমি তাই করলাম ।

কিন্তু যথেষ্ট হয়েছে, আমি আর সেসব মনে করবো না।  কিভাবে আমি গ্রেফতার হলাম বা তৎপরবর্তী অসুখকর অভিজ্ঞতার কথা বলবো না । এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে, আমি আমার অবিশ্বাস্য ধৈর্য্যের এবং বিদেশে ফিরে যাবার চেষ্টার মূল্য পেয়েছি । অন্যদের পাগলামির ফলস্বরূপ আমার সঙ্গে কমিশন দ্বারা নিযুক্ত একজনকে বয়ে নিয়ে বেড়াতে আমি অস্বীকার করেছি।




অনুবাদক পরিচিতি
দীপঙ্কর গৌতম
গল্পকার। কবি। প্রবন্ধকার।
গবেষক।
সাংবাদিক।
ঢাকায় থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন