মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

মিখাইল শলোকফ'এর গল্প : সংসারী মানুষ

ভাষান্তরঃ উৎপল দাশগুপ্ত


একটা স্তানিৎসার (কস্যাক গ্রামের) সীমানা পেরিয়ে মাঠের মধ্যে দিয়ে ডন নদীর খেয়া পারাপারের ঘাটের দিকে এগোচ্ছিলাম। ফসল কাটা সারা। কেটে নেওয়া ফসলের গোড়া মাটি ভেদ করে ফুটে আছে। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সবুজ গোড়ার ওপর সূর্য ঢলে পড়ছে। পায়ের তলার ভিজে বালি থেকে পচা গলা গাছের গন্ধ নাকে আসছে। আলের ভেতর দিয়ে রাস্তাটা খরগোশের চলার পথের মত এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে।

রক্তিম আভা ছড়িয়ে সূর্য ধীরে ধীরে গ্রামের কবরখানার পেছনে নেমে গেল। অন্ধকার গ্রাস করে নিল চরাচরকে। 

ঘাটে বাঁধা একটা খেয়া নৌকো। বেগুনী রঙের জল নৌকোর তলায় ঝাপটা মেরে ছপছপ শব্দ তুলছে। নৌকোটা দুলে উঠছে – ডাইনে বাঁয়ে, সামনে পেছনে। 

মাঝিটা একটা কৌটো দিয়ে নৌকোর শ্যাওলাধরা মেঝে থেকে জমা জল চেঁছে তুলছে। মাথা উঠিয়ে আড়চোখে আমার দিকে তাকাল একবার। হলদে কুতকুতে চোখ। নিরুৎসুক গলায় বলল, “ওপারে যাবেন? তাহলে এখুনি রওনা দিতে হয় – নৌকোর দড়িটা খুলে দিন।” 

“কেবল আমরা দুজন?” 

“এছাড়া উপায় নেই। সন্ধ্যে হয়ে এলো, আর কেউ আসে কি না আসে!” 

চওড়া কস্যাক প্যান্টটা গোটাতে গোটাতে আবার চাইল আমার দিকে। বলল, “এদিককার কেউ নয় বলে মনে হচ্ছে যেন – কোথা থেকে আসছেন?” 

“সেনাবাহিনীর লোক, বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।” 

লোকটা একটানে টুপিটা খুলে ফেলল। মাথা ঝাঁকিয়ে চুলগুলো পেছনে সরালো। ককেশাস অঞ্চলের কালচে পড়া রুপোলি তারের মত চুল। তারপর চোখ টিপে হেসে ফেলতেই ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ল। 

“কিভাবে যাচ্ছেন – যাবার হুকুম আছে না পালাচ্ছেন?” 

“বসিয়ে দিয়েছে। আমার ছুটি হয়ে গেছে।” 

“ঠিক আছে। তাহলে তো চিন্তার কিছু নেই ... ।” 

বৈঠা নিয়ে বসে পড়লাম। নদীর ধারে বেড়ে ওঠা অরণ্যের অর্ধমগ্ন নবীন শাখাপ্রশাখার ভেতর দিয়ে ডন খেলাচ্ছলে আমাদের টেনে নিয়ে চলল। জলের সঙ্গে নৌকোর টক্করে একঘেয়ে ছপছপ আওয়াজ। পায়ের পাতা দিয়ে পেছল তক্তাটা আঁকড়ে ধরে আছে লোকটা। চাপ লেগে আদুড় পায়ের নীল শিরা উপশিরা আর জট পাকানো পেশী স্ফীত হয়ে উঠছে। কৃশ লম্বা হাত, গ্রন্থিল আঙ্গুল। মানুষটা লম্বা; কাঁধ অবশ্য চওড়া নয়; কুঁজো হয়ে কেমন যেন জবুথবু ভাবে দাঁড় টানছে; ঢেউয়ের তালে তালে দাঁড় অবশ্য ঠিকঠাকই জলে পড়ে অতলে চলে যাচ্ছে। 

শ্বাসপ্রশ্বাসের ওঠানামা বিশেষ নেই। কিন্তু মসৃণ। শুনতে পাচ্ছি। গায়ে উলের জামা। সেটা থেকে ঘাম, তামাক আর জলের আঁশটে গন্ধ। দাঁড় ছেড়ে দিয়ে লোকটা আমার দিকে ফিরল। 

“ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে নৌকো বনে গিয়ে ধাক্কা মারবে। রসিকতাটা খুবই বাজে অবশ্য, তবে এর চেয়ে ভাল কিছু কপালে নেই বলেই মনে হচ্ছে !” 

মাঝদরিয়ায় স্রোতের টান বেশি। টলমল করতে করতে নৌকো এগোচ্ছে। একেকবার পাশে কাত হয়ে পড়ছে, আবার কখনও পেছনে। আধ ঘন্টার মত কেটে গেল। জলে ডুবে থাকা একটা উইলো গাছের সঙ্গে নৌকো টক্কর খেল। বৈঠা-বন্ধনী উপড়ে গিয়ে বৈঠাটা হাত থেকে ছিটক গেল। এক টুকরো কাঠের সঙ্গে ফেঁসে যাওয়ায় এই বিপত্তি। ফুটো দিয়ে তোড়ে জল ঢুকে পড়ল। উপায় না দেখে রাত কাটাবার জন্য দুজনে একটা গাছে উঠে পড়লাম। মাঝিটা গাছের ডালে পা রেখে আমার পাশে বসল। পোড়ামাটির পাইপটা টানছে; অন্ধকার ভেদ করে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া হাঁসের ডানার ঝটপটানি। লোকটা বকবক শুরু করল। 

“বাড়ি চললেন তাহলে? মা হয়ত অপেক্ষা করছেন – রোজগেরে ছেলে ফিরে এসে বুড়ি মায়ের দেখভাল করবে! হয়ত আপনাকে কাছে না পেয়ে আপনার মা প্রতিদিন কত কষ্ট পেয়েছেন! হয়ত রাতের পর রাত জেগে চোখের জল ফেলেছেন! আপনি কি ওঁর এই দুঃখটা অনুভব করতে পারেন? বোধহয় পারেন না, তাই না? নিজের ছেলেমেয়ে না হলে কি আর মা-বাবার দূঃখকষ্ট অনুভব করা যায়? মনে তো হয় না! 

“ধরুন, মাছ কাটতে গিয়ে পিত্তিটা হঠাৎ গলে গেল। খেতে গেলে তেতো লাগবেই। তবু ফেলে কি দেওয়া যায়! কি জানেন, ওই তেতো গেলবার জন্যই যেন আমার বেঁচে থাকা! কি আর করি, সয়ে নিতে হয়! মনে মনে বলি, ‘হে ভগবান আরও কত তেতো আমাকে দিয়ে গেলাবে!’ 

“আচ্ছা আপনি তো বাইরে থেকে এসেছেন – মানে এ তল্লাটের কেউ নন। ধরুন, আপনার সামনে দুটো মাত্র পথ – দুটোই ভয়ঙ্কর – যে কোনও একটা বেছে নিতেই হবে, আপনি হলে কি করতেন? আমি কি ভুল পথ বেছে নিয়েছিলাম? একটু ভেবে বলুন তো! 

“নাতাশকা – আমার মেয়ে – সতেরোটা বসন্ত পেরিয়ে এসেছে – বলে কিনা, ‘তোমার সঙ্গে এক টেবিলে বসে খেতে আমার ঘেন্না হয় বাবা! তোমার ওই হাত দিয়ে আমার দুই দাদাকে খুন করেছ! বুকের মধ্যে হাহাকার করে ওঠে আমার!’ 

“কি করে বোঝাই বলুন তো, আমার উপায় যে ছিল না! ওদের জন্যই তো এমন কাজ করতে হয়েছিল। যার লাগি চুরি করে সেই বলে চোর! 

“বেশ অল্প বয়সেই বিয়ে করেছিলাম। ঘন ঘন পোয়াতি হওয়া ছিল আমার বউয়ের স্বভাব! আট আটটা মুখকে খাওয়ানো আর বড় করার বোঝা আমার ওপর চাপিয়ে দিল! তারপর ন’নম্বরকে আনতে গিয়ে টেঁসে গেল। বাচ্চাটা বেঁচে গেল। ওর মা জ্বরে ভুগল পাঁচদিন। ওকে কবরে শুইয়ে দিতে হল। তারপর একেবারে একা পড়ে গেলাম – জলে পড়ে থাকা একটা শোলার মত ভেসে গেলাম! হাত জোড় করে ভগবানের কাছে কত কাকুতি মিনতি করলাম। একজন সন্তানকেও তিনি নিজের কাছে নিয়ে গেলেন না। বড় ছেলের নাম ইভান – আমারই মত দেখতে, কালো চুল, সুন্দর চেহারা। খুব সুপুরুষ – ঠিক একজন কস্যাক। আর খুবই সৎ। আরেকটা ছেলে ছিল আমার ... ইভানের থেকে চার বছরের ছোট। ওর মায়ের আদল পেয়েছিল – বেঁটে, নাদুসনুদুস, কটা চুল – হঠাৎ দেখলে সাদাই লাগত, বাদামী চোখ – আর আমার সব চেয়ে প্রিয় – খুব ভালবাসতাম ওকে। নাম ছিল দানিলা ... তারপর আরও সাতজন ছেলেমেয়ে – নিতান্তই দুধের বাছা। ইভানের বিয়ে দিলাম –গাঁয়ের একটা মেয়ের সঙ্গে –একটা বাচ্চাও হয়ে গেল অল্পদিনের মধ্যে। দানিলার বিয়ে দেবার চেষ্টাও চালাচ্ছিলাম, আর তখনই বিপদ ঘনিয়ে এল। গাঁয়ের কস্যাক সৈন্যদের বিরুদ্ধে একদিন বিদ্রোহ হয়ে গেল! পরের দিনই ইভান দৌড়ে এল আমার কাছে। বলল, ‘বাবা আমাকে ‘লাল’দের সঙ্গে যেতে দাও। আমি করুণাময় যিশুর নাম করে তোমার কাছে মিনতি করছি! ওদের সমর্থন করা উচিত, কারণ ওরা ন্যায্য কথাই বলছে।’ 

“পায়ে পায়ে দানিলাও এল। অনেকক্ষণ ধরে দুজনে মিলে আমাকে দলে টানার চেষ্টা করল। বললাম, ‘তোমাদের ইচ্ছে হয়েছে, যাও। আমি বাধা দেব না। তবে আমি কোথাও যেতে পারব না। আরও সাতজন আছে আমার মুখ চেয়ে। ওরা ভেসে যাবে আমি না থাকলে!’ 

“গ্রাম ছেড়ে ওরা পালিয়ে গেল। আর এলাকার মানুষ – হাতের কাছে যা অস্ত্র পেল, তাই তুলে নিল। আমাকেও জবরদস্তি ‘সাদা’ বাহিনীর অধীনে সম্মুখ যুদ্ধে পাঠিয়ে দিল। 

“গাঁয়ের জমায়েতে বললাম, ‘গাঁ’বুড়োদের সম্মান জানিয়ে বলি, আপনারা সকলেই জানেন আমি একজন সংসারী মানুষ। সাত সাতটা দুধের বাছা আছে ঘরে। ‘ওরা’ যদি আমায় নিকেশ করে দেয়, আমার পরিবারের কি হবে?’ 

“অনেক মিনতি করেছিলাম ... কিন্তু না! আমার কথা কানেই তুলল না! উলটে আমাকে যুদ্ধে একেবারে সামনের সারিতে লড়াই করার জন্য পাঠিয়ে দিল। 

“সামনের সারি – মানে আমাদের গাঁয়ের বাইরেই। ঘটনাটা ঘটল, ইস্টারের আগেই। ন’জনকে বন্দী করে গ্রামে আনা হল। দানিলুশকা – আমার প্রাণের থেকেও প্রিয় দানিলুশকা – সেও একজন বন্দী! বাহিনীর অধিনায়কের সামনে ওদের দাঁড় করিয়ে দিল। কস্যাকরা ভিড় করে দেখতে এসে হট্টগোল বাধিয়ে দিল। 

“‘খতম করে দাও, বেজন্মাগুলোকে। জেরা শেষ করে আমাদের হাতে তুলে দাও ওদের!’ 

ওদের সারিতেই দাঁড়িয়েছিলাম। হাঁটু কাঁপছিল আমার। তবুও ছেলের জন্য – আমার দানিলুশকার জন্য, ব্যথা মনেই চেপে রেখেছিলাম – আর চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। দেখলাম কস্যাকরা আমার দিকে তাকিয়ে গুজগুজ ফুসফুস করছে ... রিসালার মেজর – আরকাশকা – আমার কাছে এসে বলল, ‘কি মিকিশারা তুমি এই ‘কমি’গুলোকে মেরে ফেলতে পারবে তো?’ 

“‘আমি, ওদের – মানে ওই খচ্চরগুলোকে ... !’ 

“‘নাও এই বেয়নেটটা ধর আর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াও।’ বেয়নেটটা হাতে ধরিয়ে দিল, তারপর এক গাল হেসে বলল, ‘তোমার দিকে আমরা নজর রাখব কিন্তু, মিকিশারা – বেগড়বাই কোরো না – নইলে পরে পস্তাতে হবে!’ 

“আমি বারান্দায় অপেক্ষা করতে করতে ভাবতে লাগলাম, ‘হে পবিত্র মা মেরী, সত্যিই কি নিজের হাতে ছেলেকে খুন করতে হবে!’ 

“ক্যাপটেনের হম্বিতম্বি শুনতে পেলাম। বন্দীদের নিয়ে আসা হল। আমার দানিলা একেবারে সামনে – ওর দিকে তাকাতেই রক্ত হিম হয়ে গেল – মাথাটা কলসির মত ফুলে উঠেছে – চামড়া যেন কেউ টেনে ছিঁড়ে নিয়েছে – রক্ত শুকিয়ে জমে আছে – মাথায় একটা উলের দস্তানা জড়ানো, আঘাত থেকে বাঁচবার সামান্য চেষ্টা – দস্তানাটা রক্তে ভিজে গিয়ে লোমের সঙ্গে আটকে গেছে – হয়ত গ্রামে নিয়ে আসার পথে ওকে বেধড়ক ঠেঙিয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে টলমলে পায়ে এল। আমার দিকে তাকিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিল – অল্প হাসবার চেষ্টা। এক চোখে কালশিটে পড়া। অন্য চোখটা রক্তে বোজা। 

“বুঝতে অসুবিধে হল না, আমি ওকে আঘাত না করতে পারলে, গাঁয়ের লোকেরা আমাকেই খুন করে ফেলবে! আমার দুধের বাছারা অনাথ হয়ে যাবে! 

“ছেলে আমার পাশে এসে দাঁড়াল।বলল, ‘আমায় বিদায় দাও বাবা!’ 

“চোখের জলে গাল বেয়ে রক্ত ধুয়ে পড়তে লাগল। মন শক্ত করে হাতটা তুললাম। সারা শরীর অবশ আমার – বেয়নেটটা মুঠোয় ধরা। রাইফেলে যে দিকটা লাগানো থাকে সেদিক দিয়ে একটা আঘাত করলাম। ঠিক এইখানে – দেখুন – এই কানের ওপরে! দু’হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে ‘ওহ্‌’ করে আর্তনাদ করে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল ... কস্যাকরা জোরে জোরে হেসে উঠল। 

“‘নিজেদেরই রক্তে ওদের চুবিয়ে মার, মিকিশারা! বোঝাই যাচ্ছে ওকে তুমি ইচ্ছে করেই আস্তে করে মেরেছ, ওই তোমার দানিলাকে! ... মারো, আবার মারো ... নইলে আমরাই তোমাকে শেষ করে ফেলব!’ 

“ক্যাপটেন গালি দিতে দিতে বারান্দায় এসে হাজির। কিন্তু চোখ দুটো হাসি হাসি। ওরা যখন বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারতে শুরু করল ... আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। একটা ছোট রাস্তা ধরে ছুটতে লাগলাম। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম ওরা আমার দানিলুস্কাকে গড়িয়ে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর সার্জেন্ট বেয়নেটটা ওর গলায় ঢুকিয়ে দিল। একটা খর্‌র্‌র্‌ আওয়াজ বেরোলো কেবল।” 

জলের স্রোতে নৌকোর পাটাতনগুলো মড়মড় করছিল। তোড়ে জল ঢুকছে। আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। একটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ। উইলোটা নৌকোকে ঠেলা মারছিল। একটা পা দিয়ে মিকিশারা নৌকোর পেছনটা চেপে ধরল। জোরে টান মারল পাইপে। পাইপ থেকে আগুনের কণা বেরিয়ে অন্ধকার বাতাসে মিশে গেল। “ডুবে যাচ্ছে নৌকোটা,” হতাশভাবে বলল। “কাল দুপুর পেরিয়ে যাবে উইলোটাকে সরাতে। কি দুর্ভোগ!” 

অনেকক্ষণ কোনও কথা বলল না লোকটা। তারপর গলা খুব নামিয়ে বলল, “জানেন! এই নৃশংস ঘটনার পুরষ্কার হিসেবে ওরা আমাকে প্রোমোশন দিল ...” 

“ডন দিয়ে তারপর কত জল বয়ে গেছে ! এখনও - এখনও রাতে ঘুমোনোর সময় একটা বিষম খাওয়ার শব্দ – একটা কাশির অস্পষ্ট শব্দ আমার কানে ভাসতে থাকে! আমি যখন দৌড়ে পালাচ্ছিলাম তখন দানিলুস্কা বিষম খেয়ে কেশে উঠেছিল। মরে যেতে ইচ্ছে করে আমার ... 

“‘লাল’কে আমরা ঠেকিয়ে রেখেছিলাম বসন্তকাল পর্যন্ত। জেনারাল সেক্রিতিওফের বাহিনীও সেই সময় আমাদের সঙ্গে লড়ছিল। ওদের ডনের ওপারে সারাতফ পর্যন্ত হঠিয়ে দিই। তারপর ছুটি চেয়েছিলাম – পরিবারের জন্য মন কেমন করত। কিন্তু ছুটি দিল না ওরা। আমার ছেলেরা বলশেভিকদের দলে চলে গেছে – এই অপরাধে! বালাশভ শহরে পৌঁছলাম। ইভানের কোনও হদিশ নেই। আমার বড়ছেলে। কস্যাকরা কোথা থেকে যেন খবর পেল ইভান এখন ছত্রিশ নম্বর কস্যাকবাহিনীর হয়ে লড়াই করছে। গাঁয়ের লোক হুমকি দিল, ‘ভানকাকে হাতে পেলে পিটিয়ে মারব!’ 

“যে গ্রাম আমরা দখল নিলাম, ছত্রিশ নম্বর বাহিনী ওখানেই ছিল। 

“ওরা শেষমেশ খুঁজে বের করল আমার ইভানকে। হাতে দড়ি বেঁধে কোম্পানিতে এনে হাজির করল। প্রথমে ওকে নির্দয়ভাবে প্রহার করল। তারপর আমাকে বলল, “বাহিনীর সদর দপ্তরে নিয়ে যাও ওকে!’ 

প্রায় কুড়ি ভার্স্ট দূরে সদর দপ্তর। ক্যাপটেন কাগজপত্র আমার হাতে তুলে দিল। তারপর চোখে চোখ না রেখে বলল, “এগুলো রাখ, মিকিশারা। তোমার ছেলেকে তুমিই নিয়ে যাও সদর দপ্তরে। বাবার কাছ থেকে নিশ্চয়ই ছেলে পালিয়ে যাবে না। এটাই সবচাইতে ভাল বন্দোবস্ত!’ 

“ষড়যন্ত্রটা বুঝে গেলাম। ওকে যদি পালিয়ে যেতে দিই, তাহলে ওরা আমাকে ধরে এনে মেরে ফেলবে! 

“ইভানকে যে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল, সেখানে গিয়ে গার্ডকে কাগজপত্র দেখিয়ে বললাম, ‘বন্দীকে আমার হাতে দিয়ে দাও। ওকে সদর দপ্তরে নিয়ে যেতে হবে।’ 

“‘নিয়ে যাও না ওকে, কে মানা করেছে!’ 

“ইভান ওভারকোটটা কাঁধের ওপর ফেলল। টুপিটা দলা পাকিয়ে বেঞ্চের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। গ্রাম থেকে বেরিয়ে দুজনে টিলার ওপর উঠে পড়লাম। ও কোনও কথা বলল না, আমিও চুপ করে রইলাম। চলতে চলতে পেছন ফিরে দেখে নিচ্ছিলাম, ওরা কেউ পিছু নিয়েছে কিনা। প্রায় অর্ধেক পথ এসে ছোট একটা গির্জা পড়ল। পেছনে কেউ আসছে বলে মনে হল না। আমার দিকে ফিরে খুব করুণ গলায় ইভান বলল, ‘সদর দপ্তরে গেলেই তো ওরা আমাকে মেরে ফেলবে! ছেলেকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? একটুও বিবেক দংশন হচ্ছে না তোমার?’ 

“বললাম, ‘মনের মধ্যে কি চলছে কেমন করে তোকে বোঝাই ভানিয়া!’ 

“‘কষ্ট হচ্ছে না আমার জন্য?’ 

“‘খুব কষ্ট হচ্ছে রে – বুক ফেটে যাচ্ছে ...’ 

“‘তাহলে আমাকে পালিয়ে যেতে দাও না! জীবনে কিছুই তো দেখা হল না আমার!’ 

“রাস্তার মাঝখানেই ও হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। মাটি ছুঁইয়ে মাথায় হাত ঠেকাল। তিনবার। বললাম, ‘সোঁতার কাছে পৌঁছলে, তুই ছুটতে শুরু করিস। লোক দেখানোর জন্য আমাকে হয়ত একবার দুবার গুলি চালাতে হতে পারে ...’ 

“ছোটবেলায় ভানিয়া আমার সঙ্গে ভাল করে কথাই কখনও বলেনি। এখন আমাকে জড়িয়ে ধরে বারবার হাতে চুমু খেতে লাগল! আরও ভার্স্ট দুয়েক পথ এগিয়ে গেলাম। দুজনেই নিশ্চুপ। সোঁতার কাছে পৌঁছে থামল ... 

“‘আসি বাবা। বেঁচে যদি ফিরে আসতে পারি, সারা জীবন তোমার খেয়াল রাখব। একটাও কটু কথা কখনও শুনবে না আমার কাছ থেকে ...’ 

“আমাকে জড়িয়ে ধরল। তোলপাড় চলছে আমার মনের মধ্যে! 

“‘পালা ব্যাটা, পালা!’ ওকে তাড়া দিলাম। 

“পেছন ফিরে হাত নাড়তে নাড়তে ও সোঁতার দিকে দৌড়তে শুরু করল। 

“প্রায় দেড়শো ফুটের মত ওকে যেতে দিলাম। তারপর কাঁধ থেকে রাইফেলটা নিয়ে এক হাঁটু মুড়ে বসে পড়লাম। হাত কাঁপলে চলবে না! গুলি চালিয়ে দিলাম ... ওর পিঠে ......” 

মিকিশারা পাইপে তামাক ভরল। অনেক সময় নিয়ে। তামাকে আগুন জ্বালতেও অনেকটা সময় নিল। পাইপ টানতে টানতে বারবার জিভ দিয়ে ঠোটটা ভিজিয়ে নিতে লাগল। দুহাত মুঠো করে পাইপটা ধরে রেখেছে। আগুনের ফুলকি উঠে এসে বাতাসে মিশে যাচ্ছে। মুখের সব পেশি তিরতির করে কাঁপছে। সেই চোখের চাউনিতে কোনও অনুতাপের আভাস পেলাম কি? কি জানি! 

“হ্যা, কি যেন বলছিলাম ... ইভান দু’হাতে পেট চেপে ধরে লাফ মেরে আরও কিছুটা পথ পাগলের মত দৌড় লাগাল। একবার পেছন ফিরে আমার দিকে তাকাল। ‘এমনটা কেন করলে বাবা?’ তারপর পড়ে গিয়ে ছটফট করতে লাগল। 

“দৌড়ে ওর কাছে গেলাম। মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লাম। চোখ উলটে গেছে। মরে গেছে বেচারা! কিন্তু না! চেষ্টা করে অল্প একটু উঠে বসল! আমার হাতটা চেপে ধরে বলল, ‘বাবা বাড়িতে আমার বউ আছে – একটা বাচ্চা আছে ...’ 

“মাথাটা এক পাশে হেলে পড়ল। আবার শুয়ে পড়ল। জখম জায়গায় আঙ্গুল দিয়ে রক্ত থামানোর চেষ্টা করল। বৃথাই! ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। কিছু একটা বলার চেষ্টা করল। জিভ জড়িয়ে গেছে। শুধু বলল, ‘বাবা – বা – বা!’ দু’চোখ দিয়ে তখন দরদর করে জল পড়ছে আমার! বললাম, ‘ভানিউশকা, ধরে নে আমার হাতেই তুই শহীদ হলি! তোর তো বউ আর একটাই মাত্র বাচ্চা! আমাকে যে সাত সাতটা পেটের কথা ভাবতে হয় রে ... তোকে পালাতে দিলে কস্যাকরা কি আমাকে ছাড়বে? বাচ্চাগুলোকে অনাথ হয়ে দোরে দোরে ভিক্ষে করে বেড়াতে হবে ... পেটের দায়ে ...’ 

“বেশিক্ষণ আর বেঁচে ছিল না! এর মধ্যে নিজের হাত দিয়ে শক্ত করে আমার হাতটা ধরে ছিল! ওভারকোট আর জুতোটা খুলে নিলাম। একটুকরো কাপড় দিয়ে মুখটা ঢেকে দিয়ে গাঁয়ে ফিরে গেলাম। 

“বন্ধু, এবার আপনিই বিচার করুন আমার কি করা উচিত ছিল! সারা জীবন এই অপরাধের বোঝা বয়ে চুল পাকিয়ে ফেললাম! আমার ওই বাচ্চাদের জন্যই তো! এখনও ওদের খাবার জোগাড় আমিই করে চলেছি। অথচ আমার ছিটেফোঁটা শান্তি নেই – না দিনে – না রাতে! তারপরেও নাতাশা বলতে পারে, ‘তোমার সঙ্গে এক টেবিলে বসে খেতে আমার ঘেন্না হয়!’ 

“আর কত সইতে হবে বলুন তো!” 

আমার পানে এক নাগাড়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর মিকিশারার মাথাটা বুকের ওপর ঝুলে পড়ল। দেখলাম ওর পেছনে ধীরে ধীরে এক কুয়াশাচ্ছন্ন নতুন ভোরের সূচনা হচ্ছে। ডানদিকের ঘাটে অন্ধকারে মিশে থাকা পপলারের সারি। হাঁসের প্যাঁক প্যাঁক ধ্বনি। দূর থেকে কেউ কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে বলল, “এই মিকিশারা – শয়তানের বাচ্চা – নৌকো নিয়ে তাড়াতাড়ি ঘাটে ফিরে আয়!” 

লেখক পরিচিতিঃ 
মিখাইল আলেক্সান্দ্রোভিচ শলোকফ (২৪ মে ১৯০৫ – ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৪) 
– সোভিয়েত লেখক। মধ্যবিত্ত কস্যাক পরিবারে জন্ম। মাত্র ১৩ বছর বয়সে রাশিয়ার গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ওঁর লেখায় ডন নদীর ধারে বসবাসকারী কস্যাকদের জীবনচর্যা বারে বারে ফুটে উঠেছে। বিখ্যাত উপন্যাস “ধীরে বহে ডন” (Quiet Flows the Don)। এই উপন্যাসের জন্য তিনি স্তালিন পুরষ্কার এবং ১৯৬৫ সালে নোবেল পুরষ্কার পান। প্রথম উপন্যাস (The Birthmark) লেখেন ১৯ বছর বয়সে। প্রথম প্রকাশিত লেখা “The Test” । প্রথম প্রকাশিত বই “Tales from the Don”।



অনুবাদক পরিচিতি
উৎপল দাশগুপ্ত
অনুবাদক।
ব্যাংকার।
কোলকাতায় থাকেন। 

২টি মন্তব্য:

  1. বহুদিন পর একটা অনুবাদ পড়ে তৃপ্ত হলাম। গল্পপাঠের এই সংখ্যায় আপনার গল্পটিই সেরা অনুবাদ এবং একমাত্র অনুবাদ যে গল্প পড়ে অনুবাদ মনেই হয়নি। যে কোন অনুবাদক আপনাকে আদর্শ হিসেবে নিতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। আপনার কাছ থেকে আরো অনুবাদ পড়ার ইচ্ছে রাখলাম।

    উত্তরমুছুন