মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

অনির্বাণ বসুর গল্পঃ অ- এ অজগর আসছে তেড়ে

অ্যাকোরিয়ামের ভিতর বালির উপর সাপটা আপাতত গুটিসুটি, নিস্তেজ। শুধু ওর নিশ্বাসের
শব্দ ভেসে আসছে : হিস্-হিস্। বারো-পনেরোর অ্যাকোরিয়াম আমার। অজগরটা তখন
বাচ্চা; মাস খানেক হবে, নিয়ে এসেছি ওকে। শোনপুরের মেলায় বিক্রি হচ্ছিল খুলে আম।
চকচকে পিচ্ছিল গা দেখে এত লোভ হল, সামলাতে পারলাম না─ক'টা টাকা গচ্চা দিয়ে
কিনেই নিলাম।
ট্রেনে করে কীভাবে নিয়ে আসব জানি না তখনও, লোকটাই সব ব্যবস্থা
করে দিল : কোন ট্রেনে যাব, কোন কম্পার্টমেন্ট─জেনে নিয়ে খানিক দূরের একটা পিসিও
থেকে কয়েকটা টেলিফোন সেরে লুঙ্গির কোঁচড় থেকে একটা ছোট্ট নোটবই টাইপ খাতা
বের করে রদ্দি হয়ে-যাওয়া সেই কাগজের একখানা ছিঁড়ে নিয়ে লিখে দিল একটা ফোন
নম্বর; আশপাশ দেখে নিয়ে জানাল, কোনও বিপদে পড়লে যেন ফোন করি─। যদিও তেমন
কোনও সমস্যায় যে পড়ব না, ইশারায় সেটাও জানিয়েছিল। সত্যি বলছি, নিখাদ সত্যি,
গোটা রাস্তায় সামান্য সমস্যাও হয়নি ওটাকে নিয়ে। কালো ফোলিও ব্যাগটার দিকে,
যেটার দু'দিকেই চারটে করে ফুটো করা ছিল, ড্যাবডেবিয়ে চেয়েছে চেকার, বেশিক্ষণ নয়
অবশ্য, মুখে লোভাতুর হাসি ঝুলিয়ে পরক্ষণেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে অন্যজনের টিকিট
দেখায়।

হাওড়া স্টেশনে নেমে আর কী চাপ! দিব্যি একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিলাম। কালো-হলুদ।
আমার সঙ্গে উনিও দিব্যি পৌঁছে গেলেন আমার আস্তানায়; আমার দু' কামরার পৈতৃক
ফ্ল্যাটবাড়িতে। সেই থেকে আমার সঙ্গে। ওর সঙ্গে মানাতে সমস্যা হচ্ছিল বলে, টাকা-
পয়সা একটু বেশি লাগলেও, যদিও তা ওদেরই জমানো, মা-বাবাকে একটা ওল্ডএজ হোমে
রেখে এসেছি সে-ও বহুদিন হল। প্রথম-প্রথম, অজ, মানে আমার পুষ্যিখানা, ছোটো ছিল,
প্রতি সপ্তাহে দেখতে যেতাম ওদের; ধীরে-ধীরে সেটা কমতে-কমতে মাস পেরিয়ে গেছে।
শেষ সাত-আট মাস একবারের জন্যও যেতে পারিনি। অবশ্য নিয়ম করে যে যেতে হবে, তার
কোনও বাধ্যবাধকতা নেই; টাকা-পয়সার তো কোনও সমস্যা নেই : পৃথিবীর যাবতীয় সুখ-
স্বাচ্ছন্দ্য এখন ওঁদের হাতের মুঠোয়। অজকে নিয়ে আমি দিব্য আছি। যদিও বাবা
বরাবরই দুধ-চা পছন্দ করতেন, তবু আমি বড়ো হয়ে-যাওয়ার পর বাড়িতে দুধ নেওয়া বন্ধ
হয়ে যায়; শুধু চায়ের জন্য প্যাকেট-কে-প্যাকেট দুধের কোনও দরকার ছিল না এবং গুঁড়ো
দুধেই কাজ চলতে থাকে, যে-গুঁড়ো দুধ, মায়ের অজান্তেই, কতবার আমি চেখে
দেখেছি─ইয়ত্তা নেই। অজর জন্যই আবারও বাড়িতে দুধ আসা শুরু হল : মাদার ডেয়ারি
কিংবা মেট্রো ডেয়ারি অথবা আমুল─কাউ মিল্ক ডবল টোন। ওকে নিয়ে বড়ো-একটা
ঝামেলা নেই আমার। ওই চারবেলা শুধু দুধ জ্বাল দেওয়া আর কলার খোসা ছাড়িয়ে বড়ো
জামবাটিটায় গরম দুধে সেটা ফেলে দেওয়া─ব্যস্, ওর পেটপুজোর তোফা বন্দোবস্ত। মা-
বাবা থাকতে এটা-সেটা রান্না হত, তারপর ওরা চলে গেলে প্রথম-প্রথম কুহু আসত
সময়-সুযোগ করে; টুকটাক পদ রেঁধে দিয়ে যেত : কুহু আমার প্রেমিকা।

 মা-বাবা থাকতেই আমাদের আলাপ। ধীরে-ধীরে দুই বাড়িতে জানাজানি। একটা সময় পর মোটামুটি এটা ঠিক হয়ে গেল : আমি কিংবা ও, যে-ই চাকরি পাই-না-কেন, বিয়েটা সেরে ফেলব। তখনও অজ
আসেনি। অজকে যখন নিয়ে এলাম, মা-বাবা আপত্তি করলেও কুহু কিন্তু একদম নারাজ
হয়নি, বরং কিছুটা উল্লাসই ধরা পড়েছিল ওর চোখে-মুখে। ওর বাড়িতে কুকুর-বিড়াল,
পোষ্যের ছড়াছড়ি; বেজিও ছিল একটা, মারা গেছে। স্বভাবতই ওর তরফে কোনও ওজর-
আপত্তি কখনও ছিল না। শুধু একটা বিষয়েই গাঁইগুঁই করেছিল, তা-ও সামান্য : অজ
কোথায় থাকবে, কোথায়ই-বা শোবে ভাবতে-ভাবতে আমার নজর চলে গিয়েছিল ড্রইংরুমে-
রাখা ছোটো শো-কেসের উপরে : কয়েকটি রঙিন মাছের জলকেলি, কৃত্রিম শ্যাওলা, সাদা
পাথরের মৎস্যকন্যার মুখ দিয়ে বেরোনো জলের বুদ্বুদ, সরু-লালচে কেঁচোদের
আকুলিবিকুলি : ছোটোবেলায় বড়ো সাধ করে, প্রায় বায়না করে বাবার থেকে আদায়-করা
অ্যাকোরিয়াম। অ্যাকোরিয়ামখানা দেখে কী মনে হয়েছিল, জানি না, মুহূর্তে সব জল বের
করে দিয়ে দেখেছিলাম উজ্জ্বল মাছগুলোর ফ্যাকাশে হয়ে-যাওয়া; মা-বাবাকে সামলাতে-
সামলাতে তখন, শুধু তখনই, গজগজ করেছিল কুহু। মাছগুলো ওভাবে মরে গেল, দেখতে যে
আমারও খুব ভালো লেগেছিল, তা নয়; তবু একরত্তি একটা সাপ এসে ওদের সরিয়ে নিজের
জায়গা পাকা করে নিল, ভাবনার জগতে ব্যাপারটাকে এমন একটা আদল দিয়ে মনে-মনে
ভেবেছিলাম : যোগ্যতমের উদ্বর্তন। সারভাইভ্যাল ফর দ্য ফিটেস্ট। তারপর জলের
বদলে বালি এনে একটা আস্তর করে শুইয়ে দিয়েছিলাম অজকে।

বেশ কিছুদিন হল, কুহুও আর তেমন আসে না। তেমন বলাটা ভুল হল। আসেই না আর।
মা-বাবা যাওয়ার পরও দিব্যি চলে আসত। নিয়ম করে প্রায় প্রতিদিনই। হঠাৎ করেই সব
যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। এটা হওয়ার বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই, যখন টেলিফোনে
কথা হত, মাঝে-মধ্যে বলত, অজকে নিয়ে আমি নাকি অবসেশড্ হয়ে যাচ্ছি; অবসেশনটা
এতটাই যে, আমি নাকি আর আগের মতো ওকে সময় দিই না, কথা-বলা পর্যন্ত নাকি
কমিয়ে দিয়েছি ইত্যাদি-ইত্যাদি। আমার করার কিছু ছিল না। কেন-না, ও ওভাবে আচমকা
যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার আগে-আগেই, একদিন, অজ কখনও-সখনও বুকে হেঁটে
বেরিয়ে আসে তখন অ্যাকোরিয়াম থেকে, সেরকমই একদিন, বেরিয়ে এসে শো-কেস থেকে
এই টেবিল ওই টেবিল করতে-করতে জড়িয়ে যায় টেলিফোনের তারে : গলায় প্রায় ফাঁস
লেগে-যাওয়ার অবস্থা! কোনওক্রমে সেই জট ছাড়িয়ে ওকে আবার অ্যাকোরিয়ামের ভিতর
ঢুকিয়ে দিই আমি আর পত্রপাঠ টেলিফোনের তার, রিসিভার─সব বিদায় করি। সেই থেকে
কুহুর সঙ্গেও আর কথা নেই। অজ যখন দুধ-কলা খায় সোৎসাহে, ওর সেই পরিতৃপ্ত
মুখের দিকে চেয়ে আমার মনে হয়, কুহু যদি সত্যিই ভালোবাসত আমায়, সত্যিই যদি
যোগাযোগ রাখতে চাইত, একবারও কি বাড়ি চলে আসতে পারত না? বিশেষত যে-বাড়ির
প্রতিটি কোণ ওর নখদর্পণে, যে-বাড়িতে আসার প্রতিটি অলিগলি ওর ঠোঁটস্থ! একটা
পুষ্যি বাড়িতে থাকলে যে কী হ্যাঙ্গাম, তা তো ওর অজানা নয়; জারা আর জিয়া─কুকুর
আর বিড়াল─তো ওর বাড়িতেও আছে! ওর তো তবু বাবা-মা আছে, ভরা সংসার, আমার কে
আছে? এতদিন যেমন আসত, সদিচ্ছা থাকলে তেমনই, সময়-সুযোগ করে, আসতে পারত না
নাকি! হুঁহ্, ওসব জানা আছে আমার। ইচ্ছা থাকলেই হয়। বেশ বুঝে গেছি, একা এসেছি,
একাই যেতে হবে। কেউ ভালোবাসে না আমায়। চাকরি করি না বলেই হয়তো। চেষ্টা তো কম
করি না, না-পেলে কী করতে পারি! একেবারে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে তো বসে নেই আর।
টিউশন পড়িয়ে মাস গেলে হাজার ছয়েকের কাছাকাছিই হাতে আসে। তবু তো চাকরি নেই।

তবু তো বেকার। মাস গেলে বাঁধা মাইনে নেই। অবসরে পেনশন নেই। উইথ পে নেই। কুহু
নেই, কুহুর স্পর্শ নেই, অনুভব নেই। কুহু বলত, আমার মধ্যে তাগিদ নেই। চাকরি পাওয়ার
তাগিদ। কিন্তু তাগিদ তো দেখা যায় না, মুদিখানাতেও মেলে না। আমি কী করে দেখাতাম? তাগিদ?
কুহু আসা বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে অজকে আমি কুহু বলে ডাকি। এতে তেমন
বিশেষ কিছু না-হলেও, অন্তত উচ্চারণে, অন্তত ডাকনামে, কুহু আর আমি এক হয়ে
থাকি। কুহুকে যতটা ভালোবাসতাম─ততটা হয়তো নয়, তবু─অজকেও ভালোবাসি; কিংবা
হয়তো-বা ওর চেয়েও বেশি। জানি না। তবে নামটা তো একই : আমি কুহুকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। অজ যবে থেকে কুহু হয়ে গেল, আমার খাওয়াদাওয়া নিয়ে বায়নাক্কাও কমে এল।
অ্যাকোরিয়াম থেকে বেরিয়ে ও তখন এদিক-সেদিক যেতে শিখেছে। কখনও এ-ঘর, কখনও
ও-ঘর। লুকিয়ে থাকত এদিক-ওদিক। আমি খুঁজে বেড়াতাম। যখন খুঁজে পেতাম না, চোখ
বন্ধ করে ওর নিশ্বাসের শব্দ শোনার চেষ্টা করতাম এবং যেইমাত্র খুঁজে পেয়ে যেতাম,
আনন্দে লেজের কাছটায় ভর দিয়ে সোজা দাঁড়ানোর চেষ্টা করত কুহু আর আমি গিয়ে ওকে
জাপটে ধরতাম─মা-বাবা যখন ঘুরতে গিয়েছিল, তখন এই খেলাটা কুহুই প্রথম শুরু
করেছিল। 

কুহুর ঈষৎ তৈলাক্ত-পিচ্ছিল শরীর জড়িয়ে আমি কুহুর ক্রিম-মাখা নরম
চামড়ার পেলব অনুভব পেতাম তখন। সেই থেকে রোজ রাতে শোওয়ার সময়, আর
অ্যাকোরিয়ামে নয়, আমার কাছেই শুতে শুরু করে কুহু : কুহুকে আমিই বিছানায় নিয়ে আসি।
কুহুর সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়েই হোক অথবা একার-জন্য-আবার-হাত-পুড়িয়ে-রাঁধব
গোছের ভাবনা থেকেই হোক, আমার খাওয়াদাওয়াতেও বদল এসে গেল। ওর সঙ্গে-সঙ্গে
আমারও চারবেলা দুধ আর কলা। অনেকটা সাধু-সন্ত গোছের ব্যাপারস্যাপার হলেও মন্দ
নয়। ঝুটঝামেলার বালাই নেই। দিব্যি কেটে যাচ্ছিল দিনকাল। চারবেলা দুধ-কলা খেয়ে
রাতে ঘুমোনোর সময় কুহুকে পা দিয়ে জড়িয়ে ধরতাম। কুহু তখন পাশবালিশ। তুলনায় নরম,
তুলতুলে। এরকম চলতে-চলতে হঠাৎই একদিন সন্ধের দিকে যখন প্রত্যেক দিনের মতো
জামবাটিটা ভরে দুধ-কলা সাজিয়ে দিয়েছি কুহুকে, দেখি, দুপুরের দুধ-কলা পড়ে আছে
যেমন-কে-তেমন। আমার হাতেও যা, অ্যাকোরিয়ামের সামনে শো-কেসের উপরটাতেও
বিলকুল তাই : জামবাটি ভর্তি দুধ-কলা। অনেক সাধ্য-সাধনা করে, প্যানাসনিকের
পুরোনো মডেলের টেপে 'নাগিন'-এর ক্যাসেট ভরে সাপ-নাচানোর বাঁশির সুর বাজিয়ে, গলা খাদে নামিয়ে ব্যাঙের ডাক ডেকেও খাওয়ানো গেল না ওকে। পরের দিনও একই অবস্থা,
তার পরের দিনও। আর দ্বিরুক্তি না-করে ডাক্তার ডেকে আনলাম। ডাক্তার ভদ্রলোক
রাশভারী, চোখের চশমাখানা খানিক বাদে-বাদেই নাকের কাছে নেমে আসে, দেখে-টেখে
গম্ভীর গলায় জানালেন, খালি চোখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, কয়েকটা টেস্ট করাতে হবে।
ডাক্তারবাবুর কথামতো সব ক'টা টেস্টই, কুহুকে, করিয়ে নিলাম। রিপোর্টগুলোয় চোখ
বুলিয়ে, নাকের কাছে নেমে-আসা চশমাটা ঠেলে আবার জায়গামতো বসিয়ে বললেন, সব
রিপোর্টই নর্মাল; কোনও রিপোর্টেই সন্দেহজনক কিছু ধরা পড়েনি। এদিকে কুহুর
অবস্থা তথৈবচ। সেদিনের পর থেকে একবারের জন্যও কিচ্ছুটি মুখে তোলেনি কুহু। বুঝতে
পারছিলাম, কুহুর কিছু-একটা হয়েছে; কিন্তু কী যে ছাই হয়েছে, বুঝতে পারছি না। কুহু
খাচ্ছে না দেখে ভেবেছিলাম আমিও খাব না। ওই ভাবা অবধিই; কেন-না, মানুষ তো


নিজেকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে; আমিও, যেমন খাওয়াদাওয়া করতাম, তেমনই করতে
থাকলাম। কুহুর যদি সত্যিই কিছু হয়ে থাকে, তাহলে আমায় তো অন্তত সুস্থ থাকতে হবে,
নয়তো ওর জন্য কেই-বা ছুটোছুটি করবে! সেই তো আমি─অগতির গতি। কুহু এদিকে খাচ্ছে
না অথচ, কুহু ভালো নেই। কুহু ভালো না-থাকলে আমিও ভালো থাকি না। কী করব ভেবে না-
পেয়ে দিন দুয়েক পর পাড়ার মুখের পান-বিড়ির দোকান থেকে এক প্যাকেট গোল্ড ফ্লেক
কিনে ফেললাম : বারো টাকা এক প্যাকেট। গোল্ড ফ্লেক হানি ডিউ। আগে কখনও
সিগারেট খাইনি, কলেজে ব্যাচমেটদের দেখেছি, সিগারেটে টান দিয়ে ভিতর দিকে একটা
লম্বা শ্বাস নিত মুখ দিয়ে, তারপর─মুখ দিয়ে, নাক দিয়ে─গলগলিয়ে বের করে দিত ধোঁয়া,
নিকোটিন; চারপাশ ভরে উঠত পোড়া তামাকের কটু গন্ধে। 

ঠিক ওইভাবেই জীবনে প্রথম সিগারেটটা, গ্যাসের আগুন থেকে কোনওমতে ধরিয়ে নিয়ে, চেষ্টা করেছিলাম টানার। খাদ্যনালী না শ্বাসনালী─জানি না, একটা মারাত্মক ধাক্কা লেগেছিল বুকে; সঙ্গে প্রাণ
বের করে-দেওয়া কাশির দমক। এরপর─ঠিক ক'দিন হবে জানি না─কুহুর রকমসকম বুঝতে
না-পেরে, পায়ে-পায়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম কুহুর বাড়ির সদরদরজায়। গিয়ে জানতে পারি, বেশ
কিছুদিন আগে একটা বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে জয়েন করেছে ও। ওর মা দরজা
খুলে দিয়েছিলেন, তারপর বসার ঘরে সোফায় বসতে বলেছিলেন ইশারায়, আমার কোনও
খবরাখবর না-নিয়ে কুহুর স্কুলের কথা বলে ও যে আর খানিকক্ষণ পরেই স্কুল থেকে
ফিরে আসবে─জানিয়ে পর্দা সরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে গিয়েছিলেন দোতলায়। আমার পায়ের
কাছে কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করছিল জিয়া আর জারা : ওরা তো এত প্যাঁচ-পয়জার বোঝে না।
কিছু পরে ওরাও উপরে চলে গেল। মিনিট দশ কিংবা পনেরো পর, বাইরের গেট খোলার
আওয়াজ আর দোতলা থেকে জারার ডাক, উঁকি মেরে দেখি, চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ,
ডান কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, কুহু ঢুকছে। আমি─যেমন বসেছিলাম, তেমনই─বসে থাকি। এরও
খানিক পরে বাইরের পোশাক ছেড়ে একটা ঢিলেঢালা পোশাকে শরীরে সুগন্ধ নিয়ে একতলার
বসার ঘরে─যেখানে আমি অপেক্ষায় ছিলাম এতক্ষণ─এসে ঢোকে। ওর দিকে চেয়ে, ওর
মুখের পেশির কাঠিন্য দেখে, বেশি কথা বলার সাহস পাই না; ভণিতা না-করে কোনওমতে
গোটা ঘটনা উগরে দিই, ও কিন্তু চুপ করে পুরোটা শোনে, মাঝে দু'-একবার নাক টানে,
আমি বুঝতে পারি, ওটার কারণ সর্দি নয়, আমার মুখ থেকে বেরোনো সিগারেটের গন্ধ;
ওইসময়, মাত্র একবারই, ওর ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল। আমি সবটা বলে-ফেলার পর,
কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে চোখ বুজে ভাবে কুহু, তারপর সরাসরি আমার দিকে চেয়ে বলে,
আমার মাথাটা দিন-কে-দিন খারাপ থেকে আরও-খারাপ হচ্ছে, সময় নষ্ট না-করে জলদি
একজন মনোবিদ নাকি দেখানো উচিত আমার। বলাই বাহুল্য, এরপর আমি আর ওই
বাড়িতে এক মুহূর্তও থাকিনি। একপ্রকার ঘাড়ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসে
উদ্দেশ্যহীন এদিক-ওদিক ঘুরেছিলাম কিছুক্ষণ, তারপর বাড়ি ফিরে আসি।
যদিও মাথা থেকে ওই মনোবিদের ব্যাপারটা চলে যায়নি একেবারে; কুহুর বাতলে-
দেওয়া উপায়খানা, আজ সকালে, যখন অ্যাকোরিয়ামের সামনে জামবাটিটা ভরে রোজকার
মতো দুধ-কলা দিয়েছিলাম কুহুকে এবং বলাই বাহুল্য, ও ছুঁয়েও পর্যন্ত দেখেনি, তখনই
চাগাড় দিয়ে ওঠে মাথায়। আমাদের পাড়ায় ঢোকবার ঠিক মুখটায় ওষুধের দোকানে সকাল-
সন্ধে ডাক্তারদের আনাগোনা চলতেই থাকে। আমিও আর বৃথা সময় নষ্ট না-করে সোজা
ওষুধের দোকানে। সাইনবোর্ডে চোখ বুলিয়ে দেখি, মনোবিদ আছেন একজন, তবে তিনি


মাত্র একদিনই বসেন। দোকানদার পাড়ারই ছেলে, গিয়ে ধরলাম তাকে। ওর থেকে
টেলিফোন নম্বর নিয়ে ফোন করলাম। ভদ্রলোক কিছুতেই বাড়ি আসতে চান না। অগত্যা
ভুজুংভাজুং দিয়ে ম্যানেজ করতে হল। একপ্রকার বগলদাবা করেই ভদ্রলোককে নিয়ে
এলাম ফ্ল্যাটে। ভেবেছিলাম, ভোগাবেন। কিন্তু সেসব না-করে উনি খুব যত্ন নিয়ে দেখলেন
কুহুকে। নতুন মানুষ বলেই হয়তো, কিংবা আমাদের দু'জনের মধ্যে তৃতীয় একজনকে দেখে
কুহু গুটিসুটি মেরে ঢুকে যায় অ্যাকোরিয়ামের ভিতর। মনোবিদটিও─দেখলাম─ছাড়বার
পাত্র নন; মুখ দিয়ে নানারকম আওয়াজ করে, আঙুলে টুসকি বাজিয়ে, হাতে তালি দিয়ে,
শিস্ দিয়ে কুহুর সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললেন তিনি; কুহু তখন সবেমাত্র মাথা তুলছে,
লুকিয়ে হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন, আমায় ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে। আমি ঘর ছেড়ে
বারান্দায় এসে একটা সিগারেট ধরালাম; টেনশন হলে ঘন-ঘন সিগারেট খেতে হয় : আমার
টেনশন হচ্ছিল। ভদ্রলোক ডাকছেন না, ঘরের ভিতর থেকে কোনও শব্দও এমন-কি ভেসে
আসছে না, এদিকে আমি দ্বিতীয় সিগারেটখানাও ধরিয়ে ফেললাম। সিগারেটটা যখন শেষ
হয়েছে এসেছে প্রায়, মনোবিদ ভদ্রলোক বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন, বললেন, ওঁকে একটু
এগিয়ে দিতে। আমি টাকা দিতে গেলাম, উনি নিলেন না।

ফ্ল্যাটের দরজা বাইরে থেকে টেনে দিলেই লক্ হয়ে যায়। আমি দরজা টেনে
ভদ্রলোককে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম। রোদ উঠেছে দারুণ। মনে হচ্ছে, একটু-
একটু করে টেনশন কাটছে। সকালে যখন বেরিয়ে ছিলাম, রোদটাকে এত মোলায়েম লাগেনি।
এরই মধ্যে ভদ্রলোক বলে দিয়েছেন, কুহু যদি না-ও খায়, তবু যেন আমি খাবার দিয়ে যেতে
থাকি, কখনও-না-কখনও খেয়ে ফেললেও খেয়ে ফেলতে পারে; হতাশ হলে চলবে না।
ভদ্রলোকের পাশে-পাশে হাঁটছি, ওষুধের দোকানের ছেলেটির দিকে চেয়ে আলতো হাসি ছুঁড়ে
দিলেন, আমরা পেরিয়ে গেলাম মুদিখানার দোকান, লন্ড্রি, গমকল─দু'জনেই নির্বাক;
আচমকা উনি জানতে চাইলেন রাতে আমাদের শোওয়ার বন্দোবস্ত নিয়ে─মানে, কীভাবে
শুই আমরা। মন থেকে তখন দুশ্চিন্তা উধাও, বললাম সবটা, এটাও লুকোলাম না যে, গত
ক'দিন ধরে আর আমি ওকে জড়িয়ে শুই না, বরং ও-ই আমাকে জড়িয়ে শোয়। শুনে আরও-
কিছুটা রাস্তা গম্ভীর মুখে হেঁটে গেলেন মনোবিদ ভদ্রলোক, তারপর নীরবতা ভেঙে
জানালেন : 'শুনুন, আপনার কুহু যে খাচ্ছে না, সেটা ওর কোনও শারীরিক সমস্যাজনিত
কারণ নয়, আসলে ও এবার আপনাকে খাবে বলে প্রস্তুত হচ্ছে। রাতে আপনাকে জড়িয়ে
ধরে ও শুধু আপনার মাপটুকু বুঝে নিচ্ছে। আচ্ছা, নমস্কার।' আমি থতমত খেয়ে
কিংকর্তব্যবিমূঢ়, আমায় কিছু বলবার সুযোগ না-দিয়েই ভদ্রলোক পথচলতি একটা রিকশায় উঠে পড়লেন।

এই মুহূর্তে আমি আমার ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। ফেরবার পথে
মুদিখানা থেকে সবচেয়ে বড়ো আর ধারালো ছুরি কিনেছি একটা। ওটা এখন আমার ডান
হাতে। জোর আনবার জন্য মনে-মনে আওড়াচ্ছি : সারভাইভ্যাল ফর দ্য ফিটেস্ট। বাঁ হাত
তখন কোনওরকমে চাবিতে, চাবি তালার ফুটোয়। ঘোরাতে পারছি না। মনে পড়ছে, কলেজের
দিনগুলোয় দর্শনের এক তন্বী অধ্যাপক একদা বলেছিলেন : মৃত্যু আর কিছুই নয়,
দরজার এপার থেকে ওপারে চলে-যাওয়া মাত্র।

সেই থেকে আমি শুধু দরজার ওপারটা দেখব বলে চেষ্টা করে যাচ্ছি।

৩টি মন্তব্য:

  1. কী চমৎকার গা শিউরে ওঠা একটি গল্প! তবে গল্পটির সম্পাদনায় একটু যত্নবান হওয়া দরকার ছিল।

    উত্তরমুছুন
  2. Ufff!!!! Ki shanghatik....prothom thik ta ki hoy, ki hoy kore seser tuku pore, gaye knata diye uthlo,,..
    Apni amar priyo lekhok hoye uthchhen...😊🙏

    উত্তরমুছুন