মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

আলেকজান্ডার শারিপ্রভ'এর গল্প : ছারপোকাগণ


অনুবাদঃ রঞ্জনা ব্যানার্জী 


একটা ছারপোকা তোষকের ওপর হন্যে হয়ে ছুটছিল। ধূসর সেই তোষকের গা জুড়ে সবুজ ডোরাকাটা এবং তার ওপরে ছুটন্ত এই লাল ধনুক-পায়ের ছারপোকাটির নাম প্রোকোপিচ। 

প্রোকোপিচ, আজও রোজকার মতই সেই কালো দাগটার ধার ঘেঁষে বাম দিকে মোড় নিয়ে, উঁচু ঢিবির মত জায়গাটায় চড়েছিল। এরপর নিচে নামতে গিয়েই অন্য ছারপোকাটার গায়ে প্রায় পড়ে আর কি! এই জনের নাম সিডর কুইযমিচ।

‘আরে ঠিক আছে প্রোকোপিচ। কিন্তু তোমায় ফিরতে হবে যে! কেউ নেই এদিকে। আমাদের খাদ্যবাহক আজ খাদ্য সরবরাহ করছেন না’, সিডর জানালো। 

আঁতকে উঠলো প্রোকোপিচ, ‘কী?!’ 

‘মিথ্যে বললে আমার যেন নরকবাস হয়’, বুকে ক্রুশ এঁকে দিব্যি কাটলো কুইযমিচ। ‘বেড়ার ওধারে সবাই জড়ো হয়েছে। চ’ল দেখে আসি কী ভাবছে অন্যেরা’। 

দুশ্চিন্তাগ্রস্ত প্রোকোপিচ মাথা নিচু করে কুইযমিচের পেছন পেছন চলছিল। পথে ভাসিয়া গুবা’র সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো ওদের। 

‘কী ব্যাপার ব’ল তো, আমাদের রেশন নাকি বন্ধ হয়ে গেছে?’, উদ্বিগ্ন ভাসিয়া জানতে চাইলো। 

প্রোকোপিচ নিজের মনেই বিড়বিড় করলো, ‘গোল্লায় যাক সব’। 

‘ব্যাপারটা খানিকটা তেমনই ভাসিয়া’, কুইযমিচ উত্তর দিল, ‘বেলাগ্রুদভকে পাওয়া যাচ্ছে না। ও ওর বিছানাতে ঘুমাচ্ছিল না আজ’। 

অতঃপর ওরা তিনজন মাথার ওপরে বিষণ্ণতার মেঘ ভাসিয়ে ছারপোকাদের সভাস্থলের উদ্দেশ্যে পা চালালো। 

বেড়ার ওপারে তখন ছারপোকাদের হল্লা, ধোঁয়া, সব মিলে সে এক হুলস্থুল অবস্থা! সমস্ত জায়গা জুড়ে পায়ের ছাপের অগুন্তি রেখা এবং সিগারেটের খোসায় ছেয়ে আছে। 

ওদের দেখতে পেয়েই মিশা চুচিন হাত বাড়ালো, ‘আরে ব’স ব’স প্রোকোপিচ, একটা সিগারেট নাও,’। মিশা এমনভাবে হাঁটুমুড়ে পাছা ঝুলিয়ে দুলেদুলে ধোঁয়া ছাড়ছিল, মনে হচ্ছিলো যেন ‘প্রকৃতির ডাক’ উদ্‌যাপন করছে সে। 

‘কী ঘটছে বলতো’, উদ্বিগ্ন প্রোকোপিচ হাত ছড়িয়ে জানতে চাইলো। 

‘আমিই বলছি’, রোগাপটকা ইভান বুরাকভ চোখ পিটপিটিয়ে শুরু করলো, ‘হয়েছে কি আজকে সবচে’ আগে আমিই বেরিয়েছিলাম। বিছানা ফাঁকা দেখে ভেবেছিলাম ছুঁচোটা বোধহয় ঘুমায়নি এখনো, দেখতে পেলেই টিপে মারবে। কিন্তু ঝুঁকি তো নিতেই হবে। তাছাড়া আমিও বেড়াল পায়ে শব্দ লুকিয়ে হাঁটতে জানি। চারপাশে যাকে বলে পিনপতন নিরবতা। সেই নরম জায়গাটা, যেখানে স্প্রিং থাকে, সেইখানে কান পাতলাম। আশ্চর্য কোনো ক্যাঁচক্যাঁচ নেই! কী একটা ছ্যাড়াব্যাড়া জীবন আমাদের! মাদারচোত, নিশ্চিত কোথাও ঘাপটি মেরে আছে! তাও ঝুঁকিটা নেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। হামা দিয়ে বেরিয়ে এলাম। চোখনাক বন্ধ করে দিলাম ছুট! যদিও পেছনে কিছুই ক্যাঁচক্যাঁচ করছিল না, তাও প্রমাদ গুনছিলাম। আমি জানি ওর কারসাজি, ধর তুমি অবিরাম জপতে জপতে ভাবছো এ যাত্রায় বুঝি রক্ষা পেলে, ঠিক তখুনি ও খপ করে তুলোয় চেপে ধরে তোমায় জ্যান্ত আগুনে পুড়িয়ে মারবে। এটাই নতুন ফন্দি ওর; তুলো দিয়ে টিপে ধরা। সেই আতঙ্কেই বেদম ছুটছিলাম। মাথা নিচু ক’রে তোষকের ফাঁকফোকরে নিজেকে লুকোচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হ’লো, আরে! তোষকের কিনারে ওর গোড়ালি জোড়া দেখলাম না তো! তার মানে ও নেই ওখানে। এই নিয়ে আমার খানিক কুসংস্কার আছে। দেখো, ও বিছানায় শুলেই তোষকের কিনারে কালো সুতোয় সেলাই করা জায়গাটা আছে না, ঠিক সেইখানে ওর গোড়ালি জিরোবেই। আমি ফের ফিরলাম। খুঁটিয়ে দেখলাম ; যা ভেবেছি তাইই, ওর পায়ের পাতাজোড়া নেই ওখানে!’

‘হায় যিশু!’, প্রোকোপিচ হাহাকার করে উঠলো। 

‘সত্যি! ব্যাপারটা আমার মগজেও ঘাই দিয়েছিল। সেই কারণে নিজেকে আর আড়াল করিনি। যতদূর চোখ যায় সবখানে খুঁজেছি। তোষকের খাঁজে, আনাচ-কানাচে, পুরো বিছানার কাঠামোর চারধার- কিস্‌সু বাদ রাখিনি। জীবন বাজি রেখেই বলছি, কোত্থাও নেই বেলগ্রুদভ। এমনকি ওর সেই ড্রেসডেন ড্রাম, সেটাও বাদ দিই নি। বেয়ে উঠেছি। ভাবা যায়? হাঁপ ধরে গেছে আমার! আর তখনই মিশার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো —’ 

‘এই যে সিমন!’ মিশা চুচিনের কান নেই এইদিকে, হাত বাড়িয়ে নতুন একজনকে স্বাগত জানাতে ব্যস্ত সে, ‘আরে সিগারেট নাও একটা। পা তুলে আরাম করে ব’স’। 

‘না না, একটা সিদ্ধান্তে আসুন আপনারা। এরপর কী করার আছে,কী করবো আমরা সেটা বলুন!’, অল্পবয়েসী ছারপোকাটা তড়বড়িয়ে বললো। 

‘আমার স্থির বিশ্বাস ও বিছানার নিচেই আছে’, সালভা পেন গোমড়ামুখে রায় দিল। বেড়ার গায়ে এক কাঁধ ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ও শুনছিল সব। আনকোরা সবুজ টুপিটা মাথার চারধারে অবিরাম ঘোরাচ্ছিলো ; একবার পেছন থেকে সামনে, পরক্ষণেই সামনে থেকে সা্মনে। 

‘সে তো অবশ্যই। কোথাও না কোথাও তো ঘাপটি মেরেই আছে,’ গা চুলকাতে চুলকাতে সায় দিলো প্রোকোপিচ। ‘আচ্ছা ও কি প্যান্ট ছেড়েছিলো?’ 

‘কী বলছো প্রোকোপিচ! আমরা কীভাবে জানবো?’, চোখের পাতা তিরতির করে কাঁপছে ইভান বুরোকভের। ‘ও বাতি নিভিয়েছিল, আমরা সবাই দেখেছি এবং ও ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করেছিল, তাও দেখেছি আমরা। কিন্তু প্যান্ট ছেড়েছিল কিনা তা কীভাবে জানবো?’ 

‘এই বিষয়টাও আমাদের খেয়াল করা উচিত ছিলো,’ প্রোকোপিচ মাথা দোলালো।

‘ও ওর বিছানার তলাতেই সেঁধিয়েছে, আর কোথাও নয়’, স্লাভা পেন ফের টুপি ঘোরাতে ঘোরাতে জোর দিলো। 

‘তবে আমরা এখানে খামাখা বসে আছি কী করতে? এখানে বসে থাকার তো কোন মানে নেই, না?,’ ছোকরা ছারপোকাটার এবার আর তর সইছে না, ‘চল যাই ওর খোঁজে’। 

‘শোনো বাবা, দেখে মনে হচ্ছে তুমিই আমাদের মধ্যে দ্রুততম’, প্রোকোপিচ যুক্তি টানলো, ‘তুমিই বরং দেখে এসো! এই নাক বরাবর গেলেই পেয়ে যাবে কাঠামোটা আর ওটার গা বেয়ে উঠলেই সটান বিছানার ওপরে! যাও ছুট লাগাও!’ 

‘ঠিক আছে, কিন্তু এমনি এমনি তো এ কাজ হবে না। কিছু একটা দাও ফুঁকতে, তবেই যাচ্ছি’। 

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অন্যেরা ওর হাতে দু’দুটো সিগারেট দিলো। ছোকরা অসীম দ্রুততায় তার একটা নিজের কানের পেছনে গুঁজে অন্যটি ঠোঁটের ফাঁকে আঁটকালো এবং উল্কার গতিতে হাওয়া হয়ে গেল। দূর থেকে কেবল ওর প্যান্টের আবছা আভাষ দেখা যাচ্ছিলো। 

‘বাপরে বাপ,’ প্রোকোপিচ বসতে বসতে দম ছাড়লো, ‘ও কে?’।

‘পাম্পকিনের ছেলে’, জানালো মিশা চুচিন। 

‘মনে হয় না ওকে আমি চিনি,’ 

‘অবশ্যই চেনো। ও পাম্পকিনের ছেলে। গত বছর ওর বউকে সুপারফসফেট দিয়ে খুন করা হয়েছিল’। 

‘পাম্পকিনের বউকে?’ 

‘না না পাম্পকিনের বউ নয়। কলিয়ার বউকে। ঐ যে যাকে আমরা ‘লাল ওয়ান্ডা’ বলে ডাকতাম। চড়া গলা, চওড়া পাছাবতী। গারিবল্ডি!’ 

‘ও হো বুঝেছি, ও আফোনিয়া পাম্পকিনের ছেলে কলিয়া’। 

‘ঠিক তাই’ 

‘বাব্বা কেমন ব্যায়ামবীরের মত শরীর পাকিয়েছে!’

‘হুম’ 

‘আমি যখন সেই ৯৭ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম---’ স্লাভা পেন ফের শুরু করলো। 

‘সেখানে তো একটা পরিবারও থাকতো তাই না’---- প্রোকোপিচ দ্রুত মূল বিষয়ে আসতে চাইলো। 

‘ঠিক – তো যখন ওখানে ছিলাম, ওরা মাঝেমধ্যেই বিছানার নিচে সেঁধিয়ে ঘুমাতো যেন ওদের খুঁজে না পাই। কিংবা ধ’র দেরাজের ভেতরে। আরে দাঁড়াও দাঁড়াও’, জরুরী কিছু মনে পড়ে গেলো যেন স্লাভা’র। ‘বিছানার নিচে যদি ওকে পাওয়া না যায় তবে ও নির্ঘাত দেরাজের ভেতরে লুকিয়ে আছে’।

‘এই যে দেরাজপোকাগণ! শুনতে পাচ্ছেন? দেরাজবাসীদের কেউ আছেন এখানে?’, প্রকোপিচ গলা উঁচু করে হাঁক দেয়। 

‘এমনভাবে বলছো যেন ওরা থাকলেই স্বেচ্ছায় বেরিয়ে আসবে। ঠিক আছে তবে বসে থাকো এবং অপেক্ষা কর,’ স্লাভা পেন বিরক্তি লুকালো না। ‘আমি নিশ্চিত; সে দেরাজেই আছে’।

‘হবে হয়তো। কোথাও যখন নেই তখন সেখানে থাকার সম্ভাবনা বাদ দেওয়া যায়না,’ প্রোকোপিচ গা চুলকাতে চুলকাতে শান্ত ভাবে ব্যাখ্যা দিলো। এই দেরাজের ভেতর খোঁজার জন্যে ওকে আবার কত ক্রোশ যে ছুটতে হবে তা ভাবতেই ওর মেজাজের পারা চড়ে যাচ্ছে! 

‘না এই লোক একটা ছুঁচোই’, সমবেত ছারপোকাদের ওপর চোখ বুলিয়ে রায় দিলো ইভান বুরাকভ। ‘আর এই পৃথিবী চিরকাল এই সমস্ত ছুঁচোদের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে চলেছে। এরা আমাদের প্যাঁচে ফেলবার জন্যে করতে পারেনা হেন কাজ নাই!’

‘দাঁড়াও!’ মিশা চুচিন ওর ভ্রূর ওপর হাত ছুঁয়ে দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা বাড়ালো, ‘তোমাদের এই তর্কাতর্কির অবসান করছি শিগগীরই। হুম, ঐ তো আমি একজন দেরাজপোকাকে দেখতে পাচ্ছি!’ গলা চড়িয়ে হাঁক দিলো মিশা চুচিন, ‘আরে ওহে কাযলাভস্কি! শেষ পর্যন্ত ঘুম ভাঙলো? ইদিকে এসো। ব’স। একটা সিগারেট খাও’। 

সবাই দেখল বেড়ার কাছেই ঘুরঘুর করছে পাগলা কিসিমের এক ছারপোকা। মিশার ডাক শুনে দুই কব্জি দিয়ে চোখ রগড়াতে রগড়াতে তাকালো সে। মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি, জামাকাপড় অবিন্যস্ত কিন্তু গলায় তার পরিপাটি টাই বাঁধা। লাজুক গলায় সে সকলকে সম্ভাষণ জানিয়ে জুতো দিয়ে অবিরাম মাটি পিষতে লাগলো।

‘দেখো কাণ্ড! আবার টাই ঝুলিয়েছে গলায়,’ মিশা চুচিন গলা নামিয়ে টিপ্পনী কাটলো । ‘মনে হচ্ছে আজকের অনুষ্ঠানের সঞ্চালক তিনি!,শালা!’, এরপর গলা চড়িয়ে ফের জানতে চাইলো, ‘তো জনাব কাযলাভস্কি আজ ঠিক কীসের উদযাপন করছেন আপনি? জুয়াতে বড় দাও জিতেছেন?’ 

‘মানে? ওহ্‌! না না ওসব কিছু নয় – এই আর কি, সব সময়ের মত,’ বিব্রত কাযলাভস্কি হাত নেড়ে সহজ হতে চাইলো এবং সকলের মুখের দিকে তীব্র দৃষ্টি বুলিয়ে অস্থিরভাবে পায়চারী করতে লাগলো।

‘তার মানে সে তোমার ওখানেও নেই?’ 

‘কী?----’, কাযলাভস্কি কথা না বাড়িয়ে পেছনে সরে গেল। 

‘মাদারচোত’, বিভ্রান্ত মিশা মেজাজ সামলাতে পারলো না এবং গাল দেয়ার জন্যে মুখ খুলতেই ওর মুখের সিগারেট খসে পড়লো নিচে। 

দীর্ঘক্ষণ সবকিছু কেমন নিঝুম হয়ে রইলো। এই গহীন নিরবতায় কেবল মিশা চুচিনের খসে পড়া সিগারেটটি অদ্ভুত আওয়াজ তুলে ফুলকি ফোটাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো যেন সিগারেট নয় কাঠের ছিলকা জ্বলছে – হায়, ওদের এই ছারজীবনও এমনই প্রহসনে ভরা। 

‘কিছু একটা সমস্যা হয়েছে,’ অবশেষে নীরবতা ভাঙলো প্রকোপিচ, ‘কলিয়া এখনও ফিরলো না!’ 

‘ঐ তো কলিয়া!’ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেছনে পাহারায় থাকা ছারপোকাদের একজন জানান দিল। 

‘ভাইয়েরা আমার,’ তরুণ কলিয়ার গলায় খুশি উপচে পড়ছে, ‘দারুণ সুখবর! বেলাগ্রুদভ বিছানার নিচে নেই!’। 

‘ধুত্তোরি’! প্রোপোপিচ সজোরে হাঁটুতে চাপড় মারলো এবং হতাশায় এক থোক থুথু ছুড়ে দিলো মাটিতে। আবারও সেই অনিশ্চিয়তা। সেই দুশ্চিন্তা!

‘আরে শোনো!’ কলিয়া চেঁচিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিলো। ওর ঘামে ভেজা, ধুলো মাখা মুখটি প্রাণপণে উঁচুতে তুলে সমবেত ছারপোকাদের উদ্দেশ্যে বললো, ‘তোমরা স্বপ্নেও ভাবতে পারবেনা কী ঘটেছে!’ এইটুকু বলেই ও অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। সবাই অবাক হয়ে দেখলো কলিয়া নিজেকে জড়িয়ে হাসতে হাসতে প্রায় দুই ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে! বিহ্বলতা কাটিয়ে এবার ক্ষেপে গেলো ছারপোকারা, ‘আশ্চর্য! এত হাসির কী হ’লো! আচ্ছা ফাজিল তো!’ হাসি সামলে এবার কলিয়া রীতিমত চেঁচিয়ে জানালো, ‘ঈশ্বরের দোহাই আমি নিজের চোখে দেখেছি। চিড়িয়াটা ঘরের ছাদে বসে আছে! ভাবতে পারো?’ 

কী বলছে কলিয়া! ছারপোকাদের গুঞ্জন তীব্র হ’ল। প্রোকোপিচ ওর গা চুলকানো শেষ করে একপাশে দাঁড়িয়ে কলিয়াকে গভীর মনোযোগ দিয়ে নিরীক্ষণ করছিল। হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে গেল ওর চোখেমুখে, সঙ্গে সঙ্গে জোরে ধমকে উঠলো, ‘এই ছেলে কী বলছো এসব! ও ছাদে বসতে গেলেই তো নিচে পড়ে যাবে।’ 

সমবেত ছারপোকাদের গুঞ্জন থেমে গেল তৎক্ষণাৎ। 

-‘উফ্‌!’, মিশা চুচিন মাথা ঝাঁকিয়ে হাতের সিগারেটটা দূরে ছুঁড়ে এগিয়ে এলো, ‘কেন বোঝো না, কিছু মানুষের মেধা আমাদের বোধের অতীত!’ 

‘ইনি কিছু মানুষ নন মিশা, ইনি বেলাগ্রুদভ’, প্রোকোপিচ রাগে ফেটে পড়লো, ‘তুমি যখন পেট টিমটিম করে রক্ত চোষ তখন থাকতে পারো অমন সিলিঙে ঝুলে? টুপ করে খসে প’ড় না? কারণ কী? কারণ হলো অভিকর্ষ। এই অভিকর্ষ ব্যাপারটা তোমাকে অমন অনায়াসে উল্টো হয়ে ঝুলে চলতে দেয়না। আর বেলাগ্রুদভ তো মানুষ নয় চর্বির বস্তা। বিছানাতে শুলেই ওর ভারে বিছানা ঝুলে প্রায় মেঝেতে লেগে যায় আর সে কিনা মাথা নিচে ঠ্যাঙ উপরে তুলে বসে আছে! ইয়ার্কি?’ 

‘তো? কী করতে চাও তোমরা’, কলিয়ার খুশি উবে গেছে। রাগে ফুঁসছিল ও। ওর চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে যেন, ‘এ্যাঁ? ব’ল কী করতে চাও?’, তেড়েফুঁড়ে ফের সামনে এগুতে গিয়েই ওর পা ফাঁসলো জ্বলন্ত সিগারেটের খোসায়। তাতেও ওর কথায় ছেদ পড়লো না। ছ্যাঁকা খাওয়া পাটা এক হাতে আল্‌গে অন্য পায়ে লাফাতে লাফাতে চেঁচিয়ে চলেছিল কলিয়া, ‘এ্যাঁ? বল! তোমাদের যখন এতই সন্দেহ তবে চল আমার সঙ্গে। নিজের চোখেই দেখে এসো, আমি ঠিক কি ভুল?’। 

‘ঠিক আছে, চ’ল’, গম্ভীর প্রোকোপিচ উঠে দাঁড়ালো। ওর দেখাদেখি অন্য ছারপোকারাও বিনাবাক্যে ল্যাংচানো কলিয়ার পিছু নিলো। 

‘আমি আসলেই ব্যাপারটার একটা সুষ্ঠু সমাধান চাই, প্রোকোপিচ’, ভাসিয়া গুবা ওর বিশাল জুতো জোড়ায় আওয়াজ তুলে চলছিল, ‘যদি ওকে পাওয়া না যায় তবে আজ আমাকে নিজের বাড়ির রাস্তাই ভুলে যেতে হবে। বউ এবং পাঁচ পাঁচটা বাচ্চা! আমার অবস্থাটা বুঝতে পারছো ?’ ‘হুম। বড়ই কঠিন পরিস্থিতি,’ প্রোকোপিচও গতি না থামিয়েই সাঁয় দিলো। পকেটে হাত পুরে অসীম দ্রুততায় ছুটছিলো সেও। ছারপোকাদের শত শত পায়ের চাপে এক অদ্ভুত গমগম আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছিল চার পাশে। যেন পৃথিবী কাঁপিয়ে যুদ্ধে চলেছে ছারপোকার দল! উত্তেজনায় এ ওর গায়ে ধাক্কা খাচ্ছে, ও তার পা মাড়িয়ে দিচ্ছে সে এক বিতিকিচ্ছিরী অবস্থা! তারটার কাছে পৌঁছুতেই চুড়ান্ত বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো। আবছা আলোয় বিভ্রম হ’ল মিশা চুচিনেরও; পা ফসকে খিস্তি তুলতে তুলতেই অধোমুখে পড়ে গেলো নিচে! 

‘আমরা এসে গেছি,’ প্রোকোপিচ বিষণ্ণ গলায় ঘোষণা দিল। 

‘ঈশ্বরের দিব্যি করে বলছি, আমি এক বর্ণও মিথ্যে বলিনি,’ কৈফিয়ত দিতে শুরু করেছিল কলিয়া। একই সংগে রাগান্বিত এবং সন্ত্রস্ত লাগছিল ওকে। কিন্তু ছারপোকাদের তুমুল গর্জনে ওর কোনো কথাই শোনা যাচ্ছিলো না। 

বিক্ষুব্ধ ছারপোকারা পশুর পালের মতই ধুলো উড়িয়ে ছুটছিল। কিন্তু অকুস্থলে পৌঁছানো মাত্রই আশ্চর্যজনকভাবে ওদের গতি রহিত হ’ল; যেন কেউ পেছন থেকে রাশ টেনে জোর করে থামিয়ে দিয়েছে ওদের! এক অদৃশ্য নিরবতার চাদর নিমেষে সমস্ত শব্দ শুষে নিয়েছে যেন। 

ঠিক তখনই কলিয়া পাম্পকিন, মল্লবীরের মত গড়িয়ে সকলের সামনে চলে এলো। বিশ্রীভাবে খোড়াচ্ছিলো ও। এবং সেভাবেই সামনে পেছনে অবিরাম মাথা ঝাঁকিয়ে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করলো -‘দেখ এবার। নিজের চোখেই দেখো। যদিও আক্ষরিক অর্থে সাধারণ মানুষ যেভাবে বসে থাকে ঠিক সেইভাবে বসে নেই ও। বরং বলা যেতে পারে ছাদে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইয়ে মানে তুমি যদি অভিকর্ষের ব্যাপারটা টেনে আনো আরকি। খেয়াল কর, ওর মাথা কিন্তু প্রকৃত অর্থে নিচেই ঝোলানো! মানে ও নিজের মাথা দড়ি দিয়ে সিলিঙে বেঁধেছে!’ 

সমবেত ছারপোকারা হতবাক হয়ে এই অদ্ভুত দৃশ্য অবলোকন করতে লাগলো। ঘটনার কোনো মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছিল না ওরা। 

‘থামো। সবাই অতি উত্তেজিত হয়ে গেছ!’ কুইযমিচ বিরক্তিভরে এই ঘটনার ব্যাখ্যায় এগিয়ে এলো, ‘ভেবে দেখো আমাদের এই অভিকর্ষের জ্ঞান এখন কোনদিকে যাচ্ছে?’ 

‘ওর ঝোলানো মাথায়, আর কোথায়?’ 

‘তাহলে এবার ভাবো, তোমার নিজের অভিকর্ষ যদি মাথা সিধে রাখে, তবে ওর অভিকর্ষ মাথা নিচে ঝোলাবে এটা কীভাবে সম্ভব?’

‘ইয়ে, সিলিঙে চড়লে অভিকর্ষ মাথাকে নিচেই ঝোলাবে’। 

‘থামো। আবার তাড়াহুড়ো করছো । মাথা ঠাণ্ডা কর। আমরা এই সিদ্ধান্তে কীভাবে এলাম?’ 

‘কীভাবে? ইয়ে প্রোকোপিচ—দড়িটা , বল—এই দড়িটা ছিঁড়লো না যে!’ 

‘দড়িটা,’ প্রোকোপিচ মনে মনে কথা গুছাতে লাগলো। ছারজনতার কাছে নিজের অভিজ্ঞার মান রাখতে মানানসই কিছু একটা বলতেই হবে ওকে, ‘হুম, দড়িটা ছিঁড়েনি কারণ এই দড়ি ব্রিটিশদের তৈরি’। 

‘ওহ্‌ হো তাই তো বলি, ব্রিটিশ--- 

‘তোমার তারিফ করতেই হয় প্রকোপিচ’, ইভান বুরোকভ প্রশস্তি গাইলো। ‘কিন্তু থামো। তাও তো মিলছে না। আমরা এখানে এলাম কীভাবে, এক সেকেন্ড দাঁড়াও— 

ছারপোকারা ব্রিটিশ দড়ির ব্যাখ্যার পরে আর কিছু শুনতে নারাজ। একে অন্যকে মাড়িয়ে সঙটার গা বেয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে সবাই। প্রোকোপিচ একপাশে সরে ওদের যাওয়ার পথ করে দিলো। সবাই ওকে পেরিয়ে চলে গেলে ও দ্রুত চোখ বোলালো চারপাশে এবং তড়িৎগতিতে উলটো ঘুরে বাড়ির পথে ফের হন্যে হয়ে ছুটতে লাগলো।

‘হায় যিশু!’, এতোটা পথ ছুটে চলতে গিয়ে ওর লাল রঙে বেগুনি ছোপ ধরে গেছে। বাড়িতে পা দিয়েই নিজেকেই গাল দিচ্ছিলো প্রোকোপিচ, ‘কুকুরের মত খাটলাম এতক্ষণ। উফ্‌, কী ভয়ানক গর্দভ আমি! ভাগ্যিস চলে এসেছি।আর কিছুক্ষণ থাকলেই রফা হয়ে যেতো আজ। ষণ্ডাগুলোকে পেরিয়ে জীবনেও বাড়ি ফিরতে পারতাম না’। 

‘শুনছো’, দরজাটা দরাম করে বেঁধে বউকে ডাকলো প্রোকোপিচ। কিন্তু কথা শেষ না করেই বউকে পেরিয়ে ঠান্ডা জলের হাতাটা টেনে ঢক ঢক করে বেশ খানিকটা জল গলায় চালান করে দম ছেড়ে বললো, ‘তোমার বাক্স-প্যাটরা, সব গুছিয়ে নাও। এই ডেরা ছেড়ে দিচ্ছি আমরা’। 

‘এত্তা ছোত্ত মাকড়তা 

জলের গায়ে চড়লো

বিত্তি এলো গড়িয়ে

মাকড়তাতা মরলো’, 

ওর গুল্লুগুল্লু বাচ্চাটা আধো বোলে মেঝেতে খেলনা টানতে টানতে ছড়া কেটে খেলছিল একমনে। 

বিষণ্ণ প্রোকোপিচ সেইদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো, ‘কী একটা জীবন!’ 

অতঃপর হাত ঘুরিয়ে হাতার বাকি জল টেবিলের তলায় জোরে ছিটিয়ে দিলো ।

 
লেখক পরিচিতি 

আলেকজান্ডার শারিপ্রভ ১৯৫৭ সনে রাশিয়ার উত্তরের ঐতিহাসিক শহর ‘ভেলিকি উস্ট্যুগ’ এ জন্মগ্রহণ করেন। ভ্লাদিমিরের পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে স্নাতক হওয়ার পরে শারিপ্রভ, একই শহরেই গোলাবারুদ তৈরির এক কারখানায় চাকুরী নেন। এইসময়ে তাঁর লেখালেখিও সমান উদ্যমেই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য দীর্ঘদিন তাঁর লেখা কোনো প্রকাশকেরই আনুকূল্য পায়নি। বারবার প্রত্যাখ্যানের পরে অবশেষে রাশিয়ার বিখ্যাত ম্যাগাজিন ‘সোলো’তে তিনি লেখা পাঠান এবং তাঁর ব্যতিক্রর্মী লেখাগুলো এই ম্যাগাজিনই সর্বপ্রথম কদর করে। পরবর্তিতে তাঁর গল্প মস্কো ভিত্তিক ‘ইয়োনস্ত’ ম্যাগাজিনেও জায়গা করে নেয়। আলেকজান্ডার শারিপ্রভের লেখা দ্য মাদার অফ কখ(The Mother Of Koch ) এবং রেড আন্ডারপ্যান্টস (Red Underpants) শিরোনামের দু’খানি উপন্যাস এখনও প্রকাশের অপেক্ষায়।





অনুবাদক পরিচিতি
রঞ্জনা ব্যানার্জী
চট্টগ্রামে জন্ম।
কানাডায় থাকেন।
গল্পকার। অনুবাদক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন