মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

তাতিয়ানা তলস্তয়ের গল্প : ২০/২০

ভাষান্তর : সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত 

আমার দাদু – বিখ্যাত রুশ-লেখক, আলেক্সা তলস্তয় প্রথম জীবনে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। সময়টা ১৯০১ সালের প্রথমদিকে, দাদু তখন কিশোর। সাধ ছিল ইঞ্জিনিয়ার হবেন, যদিও তা তিনি হতে পারেননি। গল্পটা বলেছিলেন আমার বাবাকে। কী সমস্যাতেই যে পড়েছিলেন ওই কলেজের ক্লাসে!

অধ্যাপক ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ছাত্রদের উদ্দেশে বলছেন – “চুরুটের মতো একটা বস্তু আঁকা যাক – এই যে এইরকম - ” । অধ্যাপক বলছেন চুরুটসদৃশ এক বস্তুর কথা, আমার দাদুর চোখের সামনে কিন্তু সত্যিই একটা চুরুট ভেসে এলো। 

“ নিচের দিকটা একটু চাপা – ঠিক এরকম দেখতে হবে ছেলেরা”।

দাদু তখন কল্পনার চুরুটে মাথার দিকের খয়েরি পাতা সোনালী ছুড়ি দিয়ে সাবধানে ছেঁটে নিচ্ছেন, আহ! হাভানা তামাকের সুগন্ধে চারিদিক ম ম করছে – কোথা থেকে জানি এক আগুনরঙা পানপাত্র উদয় হলো – ভরা কনিয়্যাকের সোনালী আভায় যেন সেই পাত্র আরো রঙিন হয়ে উঠল-

পানপাত্র হাতের ছোঁয়ায় উষ্ণতা পায় – সোনালী তরঙ্গ – নীল ধোঁয়া – আরেকবার দাদু সুঘ্রাণ পেলেন –হালকা আঙ্গুলের দোলায় চুরুটের আগায় বেড়ে ওঠা ছাই ঝারলেন । জানলার ভারি পর্দা দুদিকে সরিয়ে দেওয়া হলো – বাইরে তখন সন্ধ্যে আঁধারের ঘোমটা তুলেছে মাথায় – রাস্তায় হুশ করে একটা স্লেজগাড়ি চলে গেল । কে যাচ্ছে ? কোথায় যাচ্ছে? নাটক দেখতে নাকি অভিসারে? 

‘ঘরররর’ শব্দে চমকে ওঠেন দাদু। অধ্যপকের চেয়ার সরানোর আওয়াজে বাস্তবে ফিরে আসেন। ওঁর সামনে ক্লাসরুম। ছাত্রদের জরুরি এবং চমকপ্রদ কিছু ফর্মুলা বুঝিয়ে অধ্যাপক বলছেন – আচ্ছা ছেলেরা - আবার পরের ক্লাসে দেখা হবে। 

ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে দাদুর আর কোনদিনই পড়া হলোনা। তিনি নিজেকে ডুবিয়ে দেন সাহিত্যে। নানা বিষয়ের ভেতর ঐতিহাসিক রচনাগুলি তাঁকে বিখ্যাত করে তোলে। যে সমস্ত লেখককুল দাদুকে অন্তরঙ্গ ভাবে জানতেন তাঁরা পরবর্তিতে বলেছেন যে দাদু নাকি এক অলৌকিক ক্ষমতায় তাঁর কল্পনাশক্তির সাহায্যে অসাধারণ সব রচনা করতে পারতেন। জটিল সব সংলাপগুলোও ভাসিয়ে দিতেন এক বিজ্ঞ মনোবিদের মতো, ছড়িয়ে দিতেন যুক্তিপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্যগুলো। অতীতকে তিনি দেখতেন এতটাই পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে যে জ্যাকেটের একেকটা বোতাম, প্রতিটা খাঁজ কিছুই তাঁর চোখ এড়িয়ে যেত না। 

দিবাস্বপ্ন দেখার এই ক্ষমতা আমার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। অবশ্যই অতটা মাত্রায় নয়। লেখালেখি আমি প্রথমে শুরু করিনি। ভাবিওনি কখনো যে লেখক হবো। কোনো পরিকল্পনা ছিল না। 

তারপর একদিন – আমার তখন ৩২ বছর বয়েস। আমার যে চোখের অসুখ ছিল – মায়োপিয়া, সেটা এত বাড়াবাড়ি হলো যে ঠিক করি শহরের বিখ্যাত চক্ষু-বিশারদ ডাঃ ভেদোভের’র আই-ক্লিনিকে চোখের অপারেশনটা করিয়েই নি। সালটা ১৯৮৩, এখনকার মতো আধুনিক প্রথায় লেজার-চিকিৎসার চল তখনও আসেনি। দাড়ি-কামানোর ব্লেডের সাহায্যে কর্নিয়ার প্রতিস্থাপন করা হতো সেইসময়। আর সেই ক্ষত সারতে সময় লাগত পুরো তিনটে মাস। এই তিনমাস কাল চোখে প্রায় কিছুই দেখা যেতো না। জানলায় বৃষ্টি পড়ার মতো অবিরাম চোখ দিয়ে জল গড়াতো। এই দুর্গতির দিন অবশ্যই একদিন শেষ হবে। তোমার দৃষ্টি আবার স্বাভাবিক হবে একেবারে ২০/২০। কিন্তু যতদিন তা না হচ্ছে এ এক নরক যন্ত্রণা!

এসময় তোমার জগৎ কালো, অন্ধকারময়। সামান্য আলো চোখে পড়লেই চোখের যন্ত্রণা দ্বিগুণ হয়ে পড়ে। প্রথম ৩/৪ দিন ব্যথা এত মারাত্মক থাকে যে কোনো ব্যথা বা ঘুমের ওষুধও কাজ করে না। ক’দিন গেলে একটু যন্ত্রণা প্রশমিত হয়, তবু এখনো দিনের আলো পড়ে এলেও, চোখ জ্বালা কমে না। এমন কি রাত্তিরে আকাশের তারার ঝলকানিও আগুনের ফলার মতো চোখে এসে বেঁধে। শেষপর্যন্ত নিভৃতে ঘরের কোনে, ভারি পর্দার আড়ালে রোদচশমা পরে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার উপায় থাকলো না। অন্ধকার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো, জীবন বেঁচে থাকলো শুধু স্পর্শানুভূতিতে। এই অন্ধ-কারাবাসে একটা হাতে লেখা বা ছাপার অক্ষর নিজের চোখ দিয়ে দেখার আর কোনো উপায়ই থাকল না। এই অন্ধ-সময়ে আমাকে বাঁচিয়ে রাখল কেবল সঙ্গীতের মূর্ছণা। একমাত্র সুরই পারল অদৃশ্য থেকে নিজেকে মুখরিত করতে, আঁধারে প্রাণের অস্তিত্ব জাগিয়ে রাখতে। জীবন জুড়ে থাকল দুটি অনুভূতি – সুর ও যন্ত্রণা।

ধীরে ধীরে এক অচেনা বোধের উদয় হয় আমার চেতনায়। চোখে তখনও জ্যোতি ফেরেনি। কালো চশমা খুলে বাইরের দিকে তাকাতেও সাহস হয় না। এরকম যখন চলছে ঠিক তখন আমার অন্তরে যেন আরেকটি চোখের জন্ম হয়। যে চোখ দিয়ে আমি অতীতকে পরিষ্কার দেখতে শুরু করি। যেভাবে আগে নিজের স্মৃতি হাতড়ে অতীতের কোনো ঘটনা মনে পড়ে যেত এ দেখা কিন্তু সেরকম নয়। স্বপ্নের মতো ? না, তাও না। কেউ যেন আমার মস্তিষ্কে জেগে উঠে অতীতের শব্দ , বাক্য , বলা কথা, প্লট সব পরের পর গুছিয়ে দিচ্ছে। আমারই মধ্যে যেন অন্য আরেক আমি, এতদিন যে ঘুমিয়ে ছি্‌ল, সে জেগে উঠে অতীতে দেখা নানা ঘটনাগুলো ধারাবাহিক বর্ণনা সমেত আমার চোখে ধরা দিতে লাগল। পুরনো ঘটে যাওয়া ঘটনার দৃশ্য আর কথোপকথন তো আসলে একে অন্যেরই পরিপূরক। কথা যদি দৃশ্যের সাথে খাপ না খায় তাহলে সেই দেখা হয়ে যায় অস্পষ্ট, ভাসা ভাসা। যথাযথ কথাই সে দৃশ্যের ধোঁয়াশা কাটাতে পারে। 

আমার মনে পড়ছিল শৈশব, ভুল বললাম, আমি দেখতে পাচ্ছিলাম আমার ছোটবেলা। বেড়া ডিঙিয়ে ওদিকে আমাদের যে প্রতিবেশী ছিলেন, যাঁকে কি না আমি বেমালুম ভুলে গেছিলাম তাঁকে দেখছিলাম। আমার যখন বছর ছয় তখনই তিনি ষাটের কোঠায়। তাঁর প্রতি আমার কোনোদিনই কোনো আগ্রহ ছিল না। আর হঠাৎ তিনিই বা কেন ? এর কোনো উত্তর নেই। হঠাৎই আমি তাঁকে দেখলাম। তাঁর জীবনের কথা আমি উপলব্ধি করতে পারছিলাম, তাঁর দুশ্চিন্তা তাঁর খুশি। আমার চোখের সামনে ভেসে আসে তাঁর বাড়ি, সামনের বাগান, সুন্দরী বয়স্ক ও তেজী স্বভাবের তাঁর স্ত্রী । আর এই আদলের সাথেই তাতে বুলিও ফুটতে থাকে, যার জন্য তাঁরা আমার সামনে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠেন। তৈরি হয় এক একটা অর্থবহ দৃশ্যপট। অপ্রত্যাশিত ভাবে একটা যেন তাৎপর্যপূর্ণ বইয়ের পাঠ, যাতে ভবিষ্যতে লেখার সম্পূর্ণ এক কাহিনী। স্বর্গ থেকে নেমে আসা এ এক চিরন্তন রূপক। 

আমার মুখমণ্ডলে যে একজোড়া চোখ, তারা অধীর অপেক্ষায় আছে বাইরের সূর্যোদয় দেখার কিন্তু আমার অন্তরের চোখ বা অন্তর্দৃষ্টি ঘুরপাক খাচ্ছে চারদিকে, খুঁজে ফিরছে সমস্ত ঘটনা-প্রবাহ। যেমন এটা, যেমন ওইযে ওটা। একটার পর একটা কত ঘটনা, ঘটনাগুচ্ছ। যেদিনই আমি একটু সুস্থ হয়ে টেবিলল্যাম্পের ঢিমে আলো সহ্য করতে পারলাম সেইদিনই আমি তাড়াতাড়ি আমার প্রথম ছোটগল্পটি টাইপ করে ফেললাম। আমি এইমাত্র যেন শিখলাম কীভাবে এই গল্প লিখতে হয়। লেখায় কি রাখতে হয় কি বাদ দিতে হয়, সবটাই। আমি বুঝলাম যেটুকু কথা লেখায় অব্যক্ত থাকল সেটুকুও আসলে থাকল বাঙময় হয়ে। এইটাই গল্পের আশ্চর্য এক চুম্বকীয় শক্তি যা পাঠককে গল্পের সাথে ধরে রাখবে কোথাও হর্ষে কোথাও বিমর্ষে। যে শক্তিকে আমরা সরাসরি দেখতে পাবো না কিন্তু তা ভীষণভাবেই বিদ্যমান। 

এতদিনকার অদৃশ্য, লুকোনো জগৎ এখন আমার হাতের মুঠোয়। যে কোনো মুহূর্তে আমি ভেতরে ঢুকে পড়তে পারি। যদিও এই জগতের নির্দিষ্ট এক দরজা আছে --- তাতে শব্দের চাবিকাঠি --- এবং ঠিক ধ্বনির ব্যঞ্জনাতেই তালা খোলে। দরজা খোলে ভালোবাসায়, খোলে চোখের জলে। 

এরমধ্যে হঠাৎ একদিন অপারেশন করা আমার চোখ আবার দেখতে পায়। চোখের জ্যোতি পুরোপুরি ফিরে পেলাম। চোখ পরিক্ষার রিপোর্ট এলো ২০/২০, ঠিক যেমনটি ডাক্তারবাবু বলেছিলেন। আহ বড় মধুর এই আশীর্বাদ! পাশাপাশি আমি অনুভব করলাম আমার সেই দ্বিতীয় যে দৃষ্টি, যার জন্ম আমার অন্ধকার-জীবনে সেই চোখও আমায় ছেড়ে যায়নি, আছে। যা থেকে আড়ালে লুকিয়ে থাকা নানাধরনের জীবনকে আমি দেখতে পাই। যে গুহাতে ঢুকলে খুঁজে পাই অজস্র মণি-মানিক্য। আয়নার প্রতিফলনে যা ঝাপসা, এমন এক সব পাওয়ার ঠিকানা যেখানে ঠিক নাম দিলেই যোগাযোগ অব্যর্থ। আমি এর ভূগোল জানি না, এর পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র কিচ্ছু না। এটা এত বড় , একটা জগৎ না কি অনেকগুলো। আগের থেকে যা বোঝা যায় না। ঐ অজানা জগৎ কখনো তোমার কাছে ধরা দিতে কখনো বা নাও দিতে পারে। কোনোদিন হয়ত সে বলল – আজ ফিরে যাও বাপু, আজ আমরা ছুটিতে। কিন্তু ধৈর্য্য ধরে লেগে থাকলে শেষ পর্যন্ত ওরা তোমার কাছে ধরা না দিয়ে পারবে না। নিজেকে মেলে ধরবে তোমার সামনে যার ভেতরে না ঢুকলে তুমি বুঝতেই পারবে না যে সেখানে কী রহস্য আছে!

ইংরাজি অনুবাদঃ অ্যানা মিগ্ডেল। গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় গ্রান্টা’তে)
লেখক পরিচিতিঃ তাতিয়ানা তলোস্তয়া’র জন্ম হয়েছিল ১৯৫১ সালে লেনিনগ্রাদ(অধুনা সেন্ট পিটার্সবার্গ) শহরে। তলস্তয় পরিবারের কন্যা। সোভিয়েত পরবর্তী সময়ের অন্যতম লেখিকা, ঔপন্যাসিক, শিক্ষয়িত্রী, টিভি-সঞ্চালিকা। 
প্রথম ছোটগল্প – অন দ্য গোল্ডেন পর্চ।
বিখ্যাত উপন্যাস – দ্য স্লিংগস।



অনুবাদক
সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত
গল্পকার। আবৃত্তিকার।
কোলকাতায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন