সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

ফিউদর সলোগাব'এর গল্প : পশুর আহবায়ক

অনুবাদক :ফারহানা রহমান

পরিবেশটি নীরব ও শান্তিপূর্ণ ছিল, আনন্দদায়কও নয় আবার খারাপও নয়। একটি বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছিল। দেয়ালগুলোকে অবিচ্ছিন্ন লাগছিলো। জানলাটি গাঢ় সবুজ পর্দার পিছনে লুকানো ছিল, ওয়াল পেপারের রঙও একই তবে আরেকটু গাঢ়। পাশের ওয়ালের বড় দরজাটি এবং স্টাডিরুম থেকে ফেরার পথে জানালার বিপরীতের ছোট দরজাটি, দুইটিই শক্ত করে আটকানো ছিল। এবং এগুলোর পিছনে ভীষণ অন্ধকার ও ফাঁকা ছিল। দুটোই প্রশস্ত হলরুমের পথে ও বিষণ্ণ, প্রশস্ত ও ঠাণ্ডা রুমের মধ্যে দুঃখী গাছগুলো তাদের নিজ দেশ থেকে পৃথক হয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছিলো।

গৌরভ সোফাতে হেলান দিয়ে ছিল। @ হাতের বইটি সে পড়ছিল। সে প্রায়ই পড়া বন্ধ করে দিতো। সবসময় একই ব্যাপারে ভাবতো ও দিবাস্বপ্ন দেখত। সবসময় তাদেরকে নিয়েই। 

ওগুলো তার কাছেই ছিল। এখন সে তাদেরকে অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করলো। তারা লুকিয়ে ছিল ও নিরলসভাবে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল। তারা শান্ত ও ঝিরিঝিরি শব্দ করতো। কিন্তু বহুদিন তারা ওর কাছে নিজেদের দেখা দেয়নি। যাইহোক, সম্প্রতি যখন গৌরভ উদাসীন, বিষণ্ণ, ম্লান ও অলসভাবে ঘুম থেকে জেগে উঠলো আর শীতের সকালের ভয়ানক বিষণ্ণতা দূর করতে ইলেকট্রিক বাতিটি জ্বালালো, তখনই হঠাৎ সে তাদের একজনকে দেখতে পেল।

ছোট, ধূসর, আলো এবং স্ফুরিত গুঞ্জন, তার বিছানার মাথার কাছে এটি অস্থির হয়ে কিছু একটা গরর গরর আওয়াজ করতে করতে অদৃশ্য হয়ে গেলো। 

এবং তারপর সকালের কোন কোন সময়ে, সন্ধ্যার কোন কোন সময়ে ছোট ছোট গুঞ্জন বাড়ির প্রফুল্ল আত্মাগুলো গৌরভের সামনেই অতীতের দিকে ধেয়ে যেত। 

এবং এখন সে সুনিশ্চিতভাবে অপেক্ষারত যেন তাদের আজকেই দেখতে পাবে। 

যখন তখন তার হাল্কা মাথা ধরছে। ক্ষনে ক্ষনে সে শীতল ও উত্তপ্ত হচ্ছে। তখন লম্বা-চিকণ লিখোরাধখা 

(সাতচুন্নি) তার বিচ্ছিরী হলুদ মুখ ও রুক্ষ-শুষ্ক হাতগুলো নিয়ে এক কোণায় দৌড়ে গিয়ে তার একেবারে পাশেই শুয়ে পড়লো এবং তাকে জড়িয়ে ধরে হিহি করে হাসতে হাসতে চুমু খেলো।এবং নোংরা শাকচুন্নির ঘনঘন প্রেমময় চুমুগুলোতে হাল্কা মাথাব্যথা ধীরে ধীরে আনন্দের হয়ে উঠলো। 

তার সারাদেহে দুর্বলতা ও ক্লান্তি ছড়িয়ে গেলো। তবু এগুলো আনন্দের ছিল। মনে হচ্ছিল তার জীবনের সমস্ত দুঃখকষ্ট নিবৃত হয়েছে। মানুষকে তার দূরের, নীরস ও অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছিলো। সে এই নীরবতার সাথেই, বাড়িটির এই স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে থাকতে চাচ্ছিলো। 

গৌরভ কিছুদিন ঘর থেকে বের হলো না। বাসাতেই নিজেকে আবদ্ধ করে রাখলো। কাউকে ঢুকতেও দিলো না। একাই থাকলো। সে শুধু তাদের কথাই ভাবতো আর তাদের জন্য অপেক্ষা করতো। 


২. 

তার ক্লান্তিকর অপেক্ষা একটি অদ্ভুত ও অপ্রত্যাশিত উপায়ে বাঁধাগ্রস্ত হলো। দরজার বাইরের বহুদূরের একটি ঠক ঠক আওয়াজে ও নিজের দরজার বাইরের হলঘরে গৌরভ ধীরস্থির একটি পদক্ষেপ শুনতে পেলো। কেউ সেখানে আত্মবিশ্বাসের সাথে আস্তে আস্তে হেঁটে বেড়াচ্ছিল। 

গৌরভ দরজার দিকে তার মাথা ফেরালো। ঠাণ্ডা মৃদুমন্দ বাতাস বয়ে গেলো। খালি পায়ে, অর্ধনগ্ন, লিনেনের হাতাকাটা জামা পরা একটি অদ্ভুত ও অলৌকিক চেহারার বালক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কালো কুচকুচে, রোদে পোড়া শরীর। কালো কোঁকড়ানো চুল, আকর্ষণীয় কালো চোখের ছেলেটি। সাধারণ বৈশিষ্ট্যের অথচ অসাধারণ সুদর্শন মুখের। এতোই সুদর্শন তাকাতেই যে আতঙ্ক হয়। এটি ভালোও নয়, মন্দও নয়। 

গৌরভ আশ্চর্য হয়নি। কিছু একটা অদ্ভুতশক্তি ওর উপর ভর করেছিলো।বাড়ির আত্মাগুলো তাদের লুকিয়ে পড়া বা মুছে যাওয়াটা শুনতে পেতো। 

বালকটি বললো, “আরিস্টোমাখ!” তুমি কি তোমার প্রমিজ ভুলে গেছো? এটা কী কোন বীরপুরুষের ব্যবহার? আমার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে। তুমি প্রমিজ করেছিলে কিন্তু স্পষ্টতই তুমি সেটা রাখনি। আমি এতদিন তোমার জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম। আর আমি দেখলাম তুমি খুব আরাম-আয়েসে দিন কাটাচ্ছ। 

গৌরভ অর্ধনগ্ন ও সুদর্শন বালকটির দিকে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকলো এবং একের পর এক সব অযাচিত স্মৃতি তার মনে ভেসে উঠতে থাকলো। বহুদিন আগে কবর দিয়ে দেওয়া এমন সব স্মৃতি ঝাপসা হয়ে মনের ভেতর জেগে উঠলো যাতে তার মনের শান্তি ছারখার হয়ে গেলো। এই অত্যাশ্চর্য আবির্ভাবের কোন ব্যাখ্যা হতে পারে না যদিও মনে হচ্ছে এর উত্তর খুবই পরিচিত ও খুব কাছেই আছে। 

এই দেয়ালগুলোর অবিনশ্বর স্বভাবটা আসলে কী? সবসময়ই কিছু না কিছু ঘটে চলেছে। প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু গৌরভ তার খুব কাছের অথচ হারিয়ে যাওয়া কিছু পুরাতন স্মৃতির অনমনীয় আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে ব্যর্থ হলো। এমনকি যেটা সে ভাবছে সেটা সম্পর্কেও কোন পরিষ্কার ধারণা পেলো না । সে বিস্ময়কর ছেলেটির কাছে জানতে চাইলো, “প্রিয় বালক অযথা দোষারোপ না করে আমাকে স্পষ্ট ও সরলভাবে বলো, আমি তোমাকে কী প্রমিজ করেছিলাম এবং কখন তোমাকে মৃত্যুর মুখে ফেলে এসেছিলাম? সমস্ত পবিত্রতার প্রতি শপথ করে বলছি যে আমার সম্মান কখনোই আমাকে এমন জঘন্য কাজ করতে অনুমতি দেবে না যাতে তুমি আমাকে এভাবে ভর্ৎসনা করতে পারো।” 

বালকটি মাথা ঝাঁকাল। করুণ রিনরিন স্বরে গজগজ করে বললো, “আরিস্টোমাখ, তুমি সবসময় দক্ষ ছিলে প্রয়োজনীয় ব্যাপারে সতর্ক ও সাহসী হতে। যদি আমি বলি যে তুমি আমাকে মৃত্যুর মুখে ছেঁড়ে এসেছিলে, আমি কিন্তু তোমাকে কোন তিরস্কার করিনি আর আমি এও বুঝতে পারছি না যে কেন তুমি তোমার সম্মানের কথা বলছো? যে কাজটির জন্য আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম সেটা ভীষণ কষ্টকর ও সাঙ্ঘাতিক ঝুঁকির ছিল। কিন্তু এগুলো এখন কে শুনবে? কাকে তুমি এসবের প্রমাণ দেবে? আজকে সূর্যদয়ের আগে কি হয়েছিলো তা তুমি তোমার চাতুর্যপূর্ণ শব্দের বুননে আর বিস্মৃতির কপটকতা দিয়ে ভুলে যাবে আর বলবে যে আমাকে তুমি কোন প্রমিজ করোনি।” 

ইলেকট্রিক ল্যাম্পের আলো আরও মৃদু হয়ে গেলো। সিলিংটা আরও অন্ধকার ও উঁচু দেখাচ্ছিল। সেখানে কোন উৎকট ওষুধের গন্ধ ছিল। কখনো হয়তো এর একটি উপাদেয় ও অত্যুজ্জ্বল নাম ছিল যা এখন বিস্মৃত। বাতাসে শীতলতার ঘ্রাণ মিশে ছিল। গৌরভের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। সে জিজ্ঞেস করলো, “কোন কাজটা আমি তোমার সাথে পরিকল্পনা করেছিলাম? হে প্রিয় বালক, আমি কিছুই অস্বীকার করছি না, আমি সত্যি জানি না তুমি কি ব্যাপারে বলছো? আমার কিছুই মনে নেই।” 

গৌরভের মনে হলো যে ছেলেটি ওর দিকে তাকিয়ে আছে আবার তাকিয়েও নেই। হতো অন্য কোথাও তাকিয়ে আছে। যেন এখানে অন্য কেউ আছে। যেন এই বিস্ময়কর ও রহস্যময় অদ্ভুত নতুন এই আবির্ভূত ছেলেটির মতো। এমন মনে হচ্ছে অদ্ভুত বালকটির কিছু অংশ যেন গৌরভের দেহের সাথে মিশে গেছে। যদিও অন্য একজন ব্যক্তির আদিম আত্মাও গৌরভের ভিতর প্রবেশ করেছে এবং তাকে বসন্তকালীন বিশুদ্ধ অনুভূতির মধ্যে বহুক্ষণ ধরে ঘিরে রাখছে। 

চারিদিকে অন্ধকার হয়ে আসছিলো ও বাতাস ধীরে ধীরে বিশুদ্ধ ও ঠাণ্ডা হয়ে উঠছিল; আনন্দ ও পূর্ব অস্তিত্বের আলো তার হৃদয়ে জেগে উঠছিল। অন্ধকার আকাশে উজ্জ্বল তাঁরা ফুটে উঠছিল। ছেলেটি বললো,“ আমরা পশু হত্যার কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলাম। যাতে কোনভাবে তুমি যদি আবার ভয়ে নিরুৎসাহিত হয়ে পড় সে কারণে স্বর্গ থেকে দেখা অনেকের স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধের মাঝেই আমি তোমাকে এ কথা বলছি। এবং সেখানে কেন ভয় থাকবে না? আমরা একটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর কাজ হাতে নিয়েছিলাম যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে আমাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে ঝলমল করে আলো ঝরায়। 

রাতের নীরবতায় খুব ধীরে একটি ঝরনা একঘেয়েভাবে ও ভীতসন্ত্রস্তভাবে কলকলিয়ে উঠলো। এটা দেখা যাচ্ছিলো না কিন্তু এর আরামদায়ক নৈকট্য ও তরতাজাভাব সান্ত্বনা দিচ্ছেলো। একটি গাছে বড় ছায়ার নীচে ওরা দাঁড়ালো এবং অতীতে শুরু হওয়া কথাটি নিয়ে কথোপকথন চালাতে লাগলো। “কেন তুমি বলছো তোমাকে মৃত্যুমুখে ফেলে দিয়ে আমি পালিয়ে গিয়েছি? আমি কেন এতো ভয় পেয়ে পালিয়ে গেলাম?” 

বালকটি হাসলো। তার হাসিটি সঙ্গীতের মতো শোনালো, তার উত্তরটি সুরেলা শোনালো ও মিষ্টি হাসি দিয়ে পরিবেশ ছেঁদ করে গেলো। 

“এরিস্টোমাখ, কতোই না দক্ষতার সাথে তুমি সবকিছু ভুলে যাওয়ার ভান করছ? আমি বুঝতেই পারছি না কেন তুমি এমন করছো এবং এতো পাণ্ডিত্যের সাথে উচ্চস্বরে অস্বীকৃতি জানাচ্ছো যা কখনো আগে আমার সামনে করনি। তুমি আমাকে মৃত্যুমুখে ফেলে পালিয়েছিলে কারণ এটাই তখন একমাত্র উপায় ছিল এবং তোমার চলে যাওয়া ছাড়া সেসময় আমাকে সাহায্য করার কোন রাস্তা খোলা ছিল না। আর তুমি কি এখনো অস্বীকার করতে থাকবে যে যখন দৈব্যবানীর মাধ্যমে তোমাকে সব কথা মনে করিয়ে দিলাম।

গৌরভের তৎক্ষণাৎ সবকিছু মনে পড়ে গেলো। যেন ভুলে যাওয়ার অন্ধকার রাজত্বে আলো ঝলকে উঠলো। এবং সে তীব্র উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত ও উচ্চস্বরে উল্লাসিত হয়ে উঠলো, “কোনো একজনের জানোয়ারকে মারার কথা ছিল!” 

বালকটি হাসলো, এবং এরিস্টোমাখ জিজ্ঞেস করলো, “ তুমি কি জানোয়ারটিকে মেরেছিলে টিমারিড?” 

“কি দিয়ে? টিমারিড বিস্মিত হলো। আমার হাত যতই শক্ত হোক না কেন আমি তাদের মতো কেউ নই যারা এক ঘুষিতে পশু মেরে ফেলতে পারে।” আমরা সাবধান ছিলাম না এরিস্টোমাখ, এবং আমরা নিরস্ত্র ছিলাম। আমরা বালির উপর তীরে খেলছিলাম। এবং জানোয়ারটি হঠাৎ আমাকে আক্রমণ করলো আর ওর ভারি থাবা দিয়ে আমার উপর চেপে বসলো। আনন্দের সাথে আমার জীবন উৎসর্গ করা আমার জন্য বাধ্যতামূলক হলো যাতে করে আমাদের ভীষণ নায়কোচিত কাজকে আরও উজ্জ্বল করা যায় আর তুমিও তোমার কাজটা শেষ করতে পারো। এবং যখন জানোয়ারটি অরক্ষিত ও অপ্রতিরোধ্যভাবে আমার দেহকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করছিলো, তুমি কিন্তু একটা ব্যবস্থা করতে পারতে, এরিস্টোমাখ তুমি দ্রুতগতিতে তোমার বর্শাটি এনে রক্তচোষা পশুটিকে হত্যা করতে পারতে। কিন্তু জানোয়ারটি আমার এই উৎসর্গ গ্রহণ করলো না। আমি তার সামনে শান্ত ও স্থিরভাবে রক্তাক্ত অবস্থায়, স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে শুয়ে পড়লাম। সে তার ভারি থাবাটা আমার ঘাড়ে রাখল, ওর নিঃশ্বাস গরম ও অশান্ত ছিল, সে ধীরে ধীরে গোঁ গোঁ করতে থাকল। তারপর তার বিরাট, গরম জিভ দিয়ে আমার মুখের উপর থেকে রক্ত চেটে চেটে খেয়ে চলে গেলো।” 

সে কোথায়? এরিস্টোমাখ জানতে চায়। টিমারিড বিস্ময়করভাবে শান্তস্বরে উত্তর দেয় যা স্থির-নীরব আদ্র পরিবেশে আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে, “সে আমাকে অনুসরণ করেছিলো। আমি জানি না তোমাকে খুঁজে পেতে আমাকে কত পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। সে আমাকে অনুসরণ করছিলো। আমি আমার রক্তের ঘ্রাণ দিয়ে তাকে প্রলুব্ধ করেছিলাম। আমি জানি না কেন সে এখন পর্যন্ত আমাকে ছোঁয়নি। কিন্তু আমি তাকে তোমার কাছে পর্যন্ত আকৃষ্ট করে আনতে পেরেছি। সন্তর্পণে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রটি বের করো ও চোখের উপর চোখ রেখে পশুটিতে খুন করো। এবং এর বদলে আমি তোমাকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দিয়ে দূরে চলে যাবো। তোমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হোক এরিস্টোমাখ!” 

কথাটি বলেই টারমারিড দৌড়াতে শুরু করলো। তার শাদা গাউনটি অন্ধকারে মুহূর্তের জন্য দেখা গেলো। তারপরই সে অদৃশ্য হয়ে গেলো। তখনই জানোয়ারটির ভয়ংকর গর্জন ও ভারি পদধ্বনি শোনা গেলো। ঝোপঝাড়ের ভিতর থেকে একটি বিশাল ভয়ানক পশুর মাথা অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো। দুটি বড় বড় অগ্নিশিখার আগুনে ঝলসানো চোখ ভেসে উঠলো। রাতের নির্জন অন্ধকারাচ্ছন্ন গাছের ভেতর থেকে একটি কালো ও হিংস্র পশু এরিস্টোমাখের খুব কাছাকাছি চলে এলো। 

বর্শাটি কোথায় গেলো? হঠাৎ করেই চিন্তাটি মাথায় ঝলকে উঠলো। এরিস্টোমাখের মন আতংকে ভরে উঠলো। এবং সে মুহূর্তে রাতের স্বচ্ছ বাতাস তার মুখের উপর আছড়ে পড়লো। আরিস্টোমাখ অনুভব করলো সে পশুটির কাছ থেকে পালাচ্ছে। পশুটির ভারী পদক্ষেপ ও অবিরাম গর্জন এরিস্টোমাখের খুব কাছাকাছি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এবং পশুটি ওকে ধরে ফেলতেই একটি কান্নার চিৎকার রাতের নীরবতা ছিন্নভিন্ন করে দিলো। এরিস্টোমাখ চিৎকার দিয়ে উঠলো তার মনে পড়ে গেলো সেই ভয়ানক প্রাচীন মন্ত্রগুলো। সে উচ্চস্বরে দেয়ালের দিকে জাদুমন্ত্র ছুঁড়ে দিলো। 
এবং তার চারদিকে মায়ার দেয়াল জেগে উঠলো। 


৩.

মায়াময় দেয়ালটি স্থির ও উজ্জ্বল ছিল। টিপটিপ করে জ্বলা ইলেকট্রিক ল্যাম্পটির নির্জীব আভা তাদের উপর পড়লো। গৌরভকে ঘিরে ছিল সব সাধারণ ও সহজ বিষয়। 

আলোর শাঁকচুন্নি লিখোরাধকা তাকে দেখতে আবারো এলো ও তার শুষ্ক হলুদ ঠোঁট দিয়ে চুমু খেল। এবং নির্জীব হাড়গিলা হাত দিয়ে স্নেহ ভরে আদর করে তার সারাদেহে উত্তাপ ও শীতলতা ছড়াল। শাদা পৃষ্ঠার ছোট, সরু সেই একই বইটা সোফার পাশের ছোট টেবিলটায় ছিল, যার উপড়ে গৌরভ আগের মতোই শুয়ে ছিল ও লিখোরাধকার প্রেমময় আলিঙ্গন উপভোগ করছিলো আর সে তাকে ঘন ঘন চুমু দিয়ে ঢেকে রাখছিল। এবং সেই ছোট আত্মাটা আবারো তার কাছে এসে হাসছিল আর মর্মর আওয়াজ করছিলো। 

গৌরভ চিৎকারকরে ও অনিচ্ছুকভাবে দেয়ালের প্রতি আরেকটি জাদুমন্ত্র ছুঁড়ে দিলো। 

এবং সে চুপ হয়ে গেলো। কিন্তু কি দিয়ে সেই জাদুমন্ত্র তৈরি? সে শব্ধগুলো ভুলে গেলো। অথবা হয়তো সেখানে কোন শব্দই আসলে ছিল না। 



ছোট্ট চটপটে ধূসর আত্মাটা ভয়াবহ শাদা কাগজের সাথে ছোট বইটির চারপাশে নাচতে লাগলো এবং ঘর্ঘরে স্বরে পুনরাবৃত্তি করতে লাগলো, “আমাদের দেয়ালগুলো খুব শক্ত। আমরা দেয়ালের ভিতর আছি। বাইরের অযাচিত সাঙ্ঘাতিক ভয়গুলো ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না।” 

তাদের মধ্যে একইরকম ছোট আরও একজন দাঁড়িয়ে ছিল যদিও সে তাদেরকে পছন্দ করে না। সে কুচকুচে কালো ছিল। তার পোশাকের ভাঁজে ভাঁজে আগুনের ঝলক প্রবাহিত হচ্ছে। তার চোখ থেকে নির্গত হচ্ছে ঝলমলে আলোকচ্ছটা। হঠাৎ করে এগুলো ভয়ানক হয়ে উঠলো আর তারপরে আবারো আনন্দদায়ক। এবং গৌরভ জানতে চাইলো, “তুমি কে?” 

কালো মেহমানটি উত্তর দিলো,“আমি পশুর আহ্বায়ক। অতীতের কোন একটি অভিজ্ঞতায় তুমি টিমারিডের দেহটি ছিন্নভিন্ন হওয়ার জন্য বনের ভিতর ঝরনার তীরে ফেলে এসেছিলে। পশুটি তোমার বন্ধুর সুন্দর দেহটির মাধ্যমে নিজেকে পরিতৃপ্ত করেছিলো। সবসময়ের জন্য অতৃপ্ত পশুটি সেই মাংস গিলে খেলো যা মানবদেহের বিস্ময়কর পরিপূর্ণতায়, পার্থিব সুখের সবকিছু বহন করছিলো; ক্ষুধার সময় এক মুহূর্তে তৃপ্তি দেওয়ার জন্য ধ্বংস হয়ে যেতে মানুষের চেয়ে বেশি আর কেউ পারে না। এবং রক্ত, বিস্ময়কর রক্ত, সে সুখের ও আনন্দের পবিত্র মদ। সেই আশ্চর্যজনক রক্ত কোথায় যাতে মানুষের গভীর আনন্দ ছড়িয়ে আছে সেই চরম সৌভাগ্যের মদ। হায়! তৃষিত, অনন্ত তৃষিত পশু এক মুহূর্তের জন্য এতে মাতাল হলো ও আবারি তৃষিত হলো। তুমি টিমারিডের দেহটি ফেলে আসলে বনের ভিতর ঝরনার তীরে ছিন্নভিন্ন হওয়ার জন্য। তুমি তোমার বীর বন্ধুকে দেওয়া প্রমিজ ভুলে গেলে। আর কোন প্রাচীন অলৌকিক দূত তোমার মনের ভেতর থেকে ভয় মুছে দেয়নি। এবং তুমি ভেবো না যে তুমি নিজেকে বাঁচিয়েছ আর পশুটি তোমাকে খুঁজে পাবে না।” 

তার কথাগুলো খুব নিষ্ঠুর শোনালো। যখন সে কথা বলছিল বাসার নৃত্যরত আত্মাগুলো আস্তে আস্তে স্তব্ধ হয়ে গেলো। ধূসর আত্মাটি চুপ হয়ে গেলো ও পশুর আহ্বায়কের কথা শুনতে লাগলো। এবং গৌরভ বললো, আমি কেন পশুকে পাত্তা দেবো! আমি আমার দেয়ালের উপর জাদুর বান ছুঁড়ে দিয়েছি যা চিরকার থাকবে এবং পশুটি কখনো আমার অবরোধের মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে না।” 

ধূসর ছোট ছোট জিনিসগুলো আবারো আনন্দিত হয়ে উঠলো এবং ঝনঝন করে তাদের শব্দ করতে লাগলো ও হাসতে লাগলো। আবারো তারা আনন্দের সাথে নাচার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে লাগলো ও একে অন্যের হাত ধরে আবার বৃত্ত রচনা করলো, কিন্তু পশুর আহবায়কটিও আবারো তার রুঢ়, কঠিন স্বরে কথা বলতে লাগলো। এবং সে বললো আমি এখানে, আমি এখানে কারণ আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি। আমি এখানে কারণ দেয়ালের জাদুর মন্ত্রটি আর কাজ করবে না, এটি বাতিল হয়ে গেছে। আমি এখানে কারণ টিমারিড তোমার জন্য অপেক্ষা করেছে এবং আমাকে ক্রমাগত উত্যক্ত করেছে। তুমি কি একজন বীর ও বিশ্বাসী যুবকের মৃদু হাসি শুনতে পাও? তুমি কি জানোয়ারটির গর্জনের হুমকি শুনতে পাও? 

নিকটবর্তী পশুটির ভয়াবহ গর্জন দেয়ালের পাশ থেকে শোনা গেলো। 

জানোয়ারটি দেয়ালের পিছন থেকেই গর্জন করছে, অবিনশ্বর দেয়ালের পিছন থেকে। গৌরভ আতঙ্কিত হয়ে বললো, 

“আমার দেয়ালের উপর এমন একটি জাদুমন্ত্র দেওয়া আছে যা চিরকাল কাজ করবে, এই অবরোধ কখনোই ধ্বংস করা যাবে না।” 

এবং সেই কালো বস্তুটি অযৌক্তিকভাবে তার বক্তব্য প্রকাশ করলো; “আমি তোমাকে বলেছি যে তোমার সেই মন্ত্রটির সময় উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। আর তুমি যদি তোমার সেই মন্ত্রটি দিয়ে নিজেকে নিরাপদে রাখতে চাও তাহলে ভালো, ঠিক আছে এটি আমার উপর ব্যবহার করো। একটি ধারালো ঠাণ্ডা বস্তু হঠাৎ গৌরভের সারা দেহে ছড়িয়ে পড়লো। সে মন্ত্রটি উচ্চারণ করার চেষ্টা করলো কিন্তু সে আদি মন্ত্রের কিছুই তার আর মনে নেই। আর এটা কি সত্যি কোন ব্যাপার? আদি মন্ত্রটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে, ব্যাস সেটা এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। 

এবং সবকিছু যা ছিল আসন্ন বক্তব্যের সাথে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে সেটা দেয়ালের আদি জাদুমন্ত্র, সেটাও মেয়াদোত্তীর্ণ 

হয়ে গেছে কারণ দেয়ালটির আলো ও ছায়া সবই নির্জীব ও অস্থির হয়ে গেছে। পশুর আহ্বায়কটি ভয়ংকর সব কথা বলতে লাগলো। এবং গৌরভের মাথা ব্যথা করছিলো ও ঘুরাচ্ছিল। এবং নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রেমাসক্ত লিখোরাধকার উত্তপ্ত চুমুতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। ভয়ানক শব্দগুলো তার চেতনায় পৌঁছানো ছাড়াই প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো ও পশুর আহ্বায়কটি বড় থেকে আরও বড় হয়ে উঠছিলো। তার কাছ থেকে তীব্র উত্তাপ আর ভয় ছড়িয়ে পড়ছিল। তার চোখ থেকে আগুন ঝরছিল এবং যখন সে এতোই লম্বা হয়ে গেলো যে সে আলোকে ঢেকে দিলো, হঠাৎ তখন তার কালো কোটটি কাঁধ থেকে খসে পড়লো। এবং গৌরভ যুবক টিমারিডকে চিনতে পারলো। 

“ তুমি কি পশুটিকে খুন করবে?” টিমারিড চিৎকার করে জানতে চাইল, “আমি তাকে নির্দেশ দিয়েছি আসতে, তোমার কাছে নিয়ে আসতে ও দেয়ালের মন্ত্রটি ধ্বংস করতে বলেছি। দেয়ালের জন্য আদিম জাদুরবান যা শত্রুভাবাপন্ন দেবতার কাছ থেকে পাওয়া মিথ্যা উপহার, সেটা আমার উৎসর্গকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে ও যে নায়কোচিত কাজ তোমার করার কথা ছিল তা থেকে তোমাকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আদিমন্ত্র মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। তোমার তলোয়ারটা নাও এবং পশুটাকে তাড়াতাড়ি জবাই করো। আমি নিছক একটি বালক ছিলাম। এখন আমি পশুর আহ্বায়ক হয়ে গেছি। আমি আমার রক্ত দিয়ে পশুকে তৃপ্ত করেছি এবং সে আবারো তৃষ্ণার্ত। সে আমার মাংস খেয়ে পুরো পরিতৃপ্ত হয়েছিলো কিন্তু এখন সে আবারো ক্ষুধার্ত, সে এক অতৃপ্ত দয়াহীন পশু। আমি তাকে বের হয়ে তোমার কাছে আসতে বলেছি এবং এখন তুমি তোমার প্রমিজ রক্ষা করো ও তাকে কেটে ফেল। অথবা মরো।” 

সে উধাও হয়ে গেলো। একটি ভয়ানক গর্জন দেয়ালটিকে ঝাঁকালো। সেইসাথে একটি স্যাঁতস্যাঁতে হাওয়া বয়ে গেলো। দেয়ালের যে প্রশস্ত স্থানটি গৌরভ খুলে রেখেছিলো তার ঠিক বিপরীতে একটি বিশাল, দৈত্যাকার, বর্বর পশু আবির্ভূত হলো। সে তার ভয়াবহ গর্জনে গৌরভের বুকের উপর তার ভারী থাবা দিয়ে চেপে বসলো। তার নির্দয় নখের থাবা গৌরভের হৃদয় এক লহমায় ছিন্নভিন্ন করে দিলো। এক অসহ্য ব্যথা তার সারা দেহে ছড়িয়ে গেলো। পশুটির রক্তাক্ত চোখগুলো জ্বলজ্বল করছিলো। পশুটি গৌরভের দিকে ঝুঁকে আসলো ও দাঁত দিয়ে মড়মড় করে তার হাড়গুলো চিবাতে শুরু করলো, আর তখনো ধুকধুক করা হৃদয়টিকে দ্রুত কামড়াতে শুরু করলো। 





অনুবাদক পরিচিতি
ফারহানা রহমান

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন