সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

ম্যারিনা নাসরীন'এর গল্প : বিমূর্ত একটি শব্দের খোঁজে

বাংলা মোটরের কাছে এসে খানিকটা হতচকিত হয়ে গেলাম। গত পরশু রাতে এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে গিয়েছি। আমার পষ্ট মনে আছে, রূপায়নের ঝকঝকে বিল্ডিঙটি সেদিন এখানে ছিল না। ঠিক এই জায়গায় একটি তালগাছ দেখেছিলাম, আড়ালে কোজাগরী পূর্ণিমা। গাছে দু-একটা বাবুই পাখির বাসাও ঝুলছিল। ওরা ফুকোর সোনালী দোলকের মত দুলছিল আর স্থির দোলনতলে অদৃশ্য রেখা টেনে যাচ্ছিল। খুব অবাক হয়েছিলাম, ভিআইপি সড়কে তালগাছ?

একটু এগিয়ে সাকুরার সামনে অদ্ভুত চেহারার লোকটির সাথে দেখা হলো। হেলেদুলে হাঁটছে। স্ট্রিটের সোডিয়াম আলোয় কিছুটা হলুদাভ। তাকে অবিকল বাবার মত লাগছিল। ভীষণ মাত্রায় মদ্যপ, বেহেড। আমি অবলীলায় তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললাম, ছি, বাবা! এসব কি হচ্ছে? মদ গিলেছ কেন? 

লোকটিও হাত দিয়ে সাঁড়াশির মত আমার গলা পেঁচিয়ে ধরে বলল, চল, বাপে বেটায় গলাগলি করে হাঁটি। 

রমনা পার্কের অরুণোদয় গেটের সামনে গিয়ে মনে পড়ল, বাবা গতকাল ভোরে উত্তরবঙ্গে গিয়েছেন তিনচিল্লায়। মদ খাওয়া দূরে থাকুক, সিগারেটের ধোঁয়া পর্যন্ত তিনি সইতে পারেন না। ইদানিং এমন হচ্ছে। অনেক কথা ভুলে যাচ্ছি। খুব কাছের মানুষকে চিনতে পারছি না। এমনকি নিজেকেও মাঝে মাঝে অচেনা লাগছে। চিৎকার করে বলছি, তুমি কে হে? হু আর ইউ? মাসুদ রোগটির নাম বলেছিল স্মৃতিভ্রংশ। ইংরেজিতে বলে ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমার। সাথে এও বলেছিল, 

এই রোগ তো বুড়োদের হয়রে, তোর কেন? দ্রুত ডাক্তার দেখা, নইলে অচিরেই পেগলে যাবি। 

ডাক্তারের কাছে যাইনি। তবে পাগল হবার ভয়ে টোটকা চিকিৎসা শুরু করেছি। শুনেছি কচি বেলপাতা খাঁটি ঘিয়ে ভেজে কালি জিরা সহযোগে খেতে পারলে স্মরণশক্তি বাড়ে। ধলেশ্বরীর দুই ব্রিজ পেরিয়ে নিমতলির অজ গাঁ বাসাইল থেকে মাকে বেলপাতা এনে দিয়েছিলাম। মা ঘিয়ের বদলে সয়াবিন তেল দিয়ে বেলপাতা ভেজে দিলেন। ঘিয়ের প্রসঙ্গ তুলতেই মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, পাকঘরে ঘিয়ে বলক উঠছে বুঝি? বাজার থেকে গব্য ঘি এনে দাও, বেল পাতা কেন চাইলে বাঁশ পাতাও ভেজে দেব। 

লেখকের স্মরণশক্তি ঢিলে পড়লে খুব মুস্কিল! ব্রেনে শব্দ আর তথ্যের যে ভাণ্ডার ছিল ক্রমেই তা ফুরিয়ে আসছে। নীলক্ষেত থেকে আনা পুরনো প্রত্যেকটা বইয়ের পাতায় পাতায় লাঙ্গল চষে রেখেছি কিন্তু প্রয়োজনীয় মুহূর্তে কোন তথ্য স্মৃতি থেকে নামিয়ে আনা আর বই ঘেঁটে বের করার মধ্যে বিরাট তফাৎ। তার উপর আধুনিক যুগের সাহিত্য সম্পাদকেরা অত্যাধুনিক শব্দ খোঁজেন। 

কয়েকদিন আগে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘অমরাবতী’তে আমার একটা উপন্যাস ছাপা হয়েছিল। কিছু সম্মানী দেবার কথা। আজ একটা বড় গল্পের পাণ্ডুলিপি নিয়ে ‘অমরাবতী’র সম্পাদকের কাছে গিয়েছিলাম। সময়টা অনুকূলে ছিল না। সম্পাদক সাহেব উঠতি কবি প্রভার হাতের রেখায় সম্ভবত ভূত-ভবিষ্যৎ গণনা করছিলেন। আমাকে দেখে তাঁর কপালের সমতলে ছোট খাটো বেশ কয়েকটি গিরি উপত্যকা তৈরি হল। এমন ভাব, চিনতে পারছেন না, স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। ভাবলাম, তিনিও বোধ হয় আমার মত আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত। আমি তাঁর স্মৃতিতে একটু নাড়া দিতে চিনলেন। তবে ভাবে ভঙ্গীতে বুঝিয়ে দিলেন এখন ব্যস্ত আছি বাপু, অতএব বিদেয় হও। কিন্তু আমি নাছোড়ের মত চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। বিনয়ে পানি হয়ে সাথে নেওয়া গল্পের পাণ্ডুলিপিটি তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। তিনি তেরছা চোখে কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে কাগজটি টেবিলে ছুঁড়ে ফেলে বললেন, 

কি সব নেকু নেকু সেকেলে লেখা এনেছেন মিয়া? লেটেস্ট লেখা লিখুন। কঠিন কঠিন শব্দ যোগ করুন। ইংরেজি, জাপানী, ফরাসী যেটা পারেন ঠেসে ভরে দিন। পাঠকের বাপের সাধ্য নেই অর্থ খুঁজে পায়। গল্পের মাথা আর লেজের মধ্যে জগা খিচুড়ি পাকিয়ে গিট্টু লাগিয়ে দিন। পাঠক ভাবুক। আর শুনুন কাহিনীর বর্ণনা হতে হবে স্পাইসি। গরম মশলা যোগ করুন, তবে সাবধানে।এবস্ট্রাক্ট হতে হবে। পড়তে গেলে শরীরের আনাচে কানাচে সুড়সুড়ির ঢেউ আছড়ে পড়বে অথচ মনে হবে না চটি পড়ছি। যান এডিট করে নিয়ে আসবেন। 

আমি বেরিয়ে আসার আগেই তিনি প্রভার ফকফকা হাতের রেখায় পুনরায় মনঃসংযোগ করলেন। 

বাবার কথা বলছিলাম। নির্ভেজাল পরহেজগার মানুষ। বছরের এক তৃতীয়াংশ সময় তিনি দেশের নানা মসজিদে সফর করেন। মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেন। বুঝতে শিখে ধরে দেখছি ঘরের কোণে কালো রঙের একটা কাপড়ের ব্যাগ সবসময় প্রস্তুত থাকে। তার মধ্যে কাঁথা, বালিশ, বিছানার চাদর, একটা ঘটি, একটা প্লেট। হুটহাট করে বাবা সেই ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে যান। তিনদিন, সাতদিন, চল্লিশদিন, কখনো কখনো একশ বিশদিন বাদে ঘরে ফেরেন। 

বাবার সাথে একবার আমিও পাঁচদিনের সফরে ময়মনসিংহে গিয়েছিলাম। মার্কাজ মসজিদ। বালক বয়স। দ্বীনের বিষয়ে ভাল জ্ঞান ছিল না। তবে অঢেল খাবার দাবারের কথা খুব মনে আছে। আশেপাশের বাড়ি থেকে গামলা ভর্তি খাবার আসে। খাসির বিরিয়ানি, রোস্ট, বড় বড় মাছের পেটি। আতেলা পেটে হাপুস হুপুস খেয়ে তিনদিনে পেট নেমে গেল। সেই বয়সে আমার নিশ্চিত ধারণা হয়েছিল বাবা বুঝি ভাল ভাল খাবারের জন্য সফরে যান। আর একটু বড় হয়ে সে ধারণা অবশ্য বদলে গিয়েছিল। 

আমার বাবা মা দুজন দুজনের বিষয়ে জিরো টলারেন্স। খুব সামান্য বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে যখন তখন ধুন্দুমার লেগে যায়। ভাংচুর, পাড়ার লোকের উঁকিঝুঁকি, অবশেষে অপেক্ষায় থাকা কালো ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাবার সফর যাত্রা। তাঁদের যুদ্ধাবস্থায় আমরা ভাই বোনেরা নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করি। কারন দুজনেরই জিনিসপাতি ছোঁড়ার অভ্যাস আছে। এত বৈপরীত্য, তবুও কোথায় যেন মানুষ দুটোর মধ্যে ভীষণ মিল। সম্ভবত সেই অদেখা মিলটাই সংসারটিকে জোড়া দিয়ে রেখেছে। 

আমার পরহেজগার বাবার মনে প্রচন্ড দুঃখ যে তাঁর ছেলেরা কেউ এলেমদার নয়। তবে তিনি চেষ্টার ত্রুটি করেননি। তিনি বাড়িতে থাকলে নিয়মিত তালিম হয়। কারো পক্ষে নামাজ ক্বাযা করার উপায় থাকে না। একবার বাবা তিন চিল্লা শেষে বাড়িতে ফিরে দেখলেন পাড়ার বখাটে ছেলেদের সাথে মারামারিতে শফিক হাত বেশ পাকিয়ে ফেলেছে। আঙুলের ফাঁকে বিড়ির মিহি ধোঁয়াও উড়ছে। বাবা খুব মন খারাপ করলেন এবং একপ্রকার জোর করে ওকে তাবলীগে নিয়ে গেলেন। মা চেষ্টা করেও আঁটকে রাখতে পারলেন না। 

চল্লিশদিন পরে তাবলীগ থেকে ফেরার পর শফিককে চেনা যাচ্ছিল না। একমুখ দাড়ি। মাটি থেকে চোখ উঠতে চায় না। বাবার সুর্মা টানা চোখে আনন্দ ঝিলিক দেয়। মা কটমট করেন। ‘দোযখের আজাব্ বেহেস্তের শান্তি’ নামক একটি বই পড়ে শফিক দুনিয়াদারী একেবারে ছেড়ে দিল। বিছানা বাদ দিয়ে ইটে মাথা রেখে মেঝেতে শুতে লাগলো। কুলুখের ঢেলায় ঘর দোর মাটি মাটি করে ফেলল। মাস তিন এমন অবস্থা ছিল। বাবা পুনরায় সফরে বেরুলেন এবং চল্লিশ দিন পর ফিরে এসে দেখলেন শফিক সেই আগের শফিক। হাতে মিহি ধোঁয়া। বাবা বাৎচিত না করে নিজের দ্বীনের কাজে মগ্ন হয়ে গেলেন। 

রাত অনেক কিন্তু বাসায় ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আজকাল রাতে উপোষ দেবার চলটা আবার শুরু হয়েছে। মাঝে বছরখানেক সময় খুব ভাল কেটেছিল। শফিক দেদারসে আয় করেছে। দুবেলার জায়গায় তিনবেলাই সাত পেটে ভাত হজমের সুযোগ ছিল। মা অবশ্য কয়েকবার খোঁটা দিয়ে আমাকে কথা শুনিয়েছেন, 

কতকাল আর ছোট ভাইয়ের রোজগার খাবি? 

আমার গায়ে বিশেষ লাগতো না। লেখক যদি আয়ের চিন্তা করে তাহলে গল্পের থিম, শব্দ এসব নিয়ে ভাববে কখন? 

লেখালেখির জন্য নির্জন একটি ঘর দরকার এ বাড়ির মানুষ সেটাও বুঝতে চায় না। চার ভাইবোনের শ্বাস নিঃসৃত কার্বনডাই অক্সাইডে আট ফিট বাই দশ ফিট ঘরের বাতাস ভারী হয়ে থাকে। তার উপর রেহানা জাহানার ঝগড়ায় শব্দদূষণের মাত্রা মাঝে মাঝে একশ বিশ ডেসিবল ছাড়িয়ে যায়। রাত নিঝুম হলে আমার লেখক সত্ত্বা জাগতে শুরু করে। কখনো কখনো এমন হয়, মাথার মধ্যে হয়ত নতুন প্লটের চরিত্রগুলো কিলবিল করছে। তারা নিউরন কোষে ঝড় তুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তক্ষুনি খাতা কলম নিয়ে কাহিনী সাজিয়ে ফেলার দরকার। মনে মনে ভাবি এবার নিশ্চয় আমার শক্তিশালী কলম মগজ থেকে এমন কিছু নামিয়ে আনবে যা সাহিত্য জগতে হৈচৈ ফেলে দেবে। পাশের খাটে রেহানা-জাহানা। আমার সাথে রোহন। ছোট্ট খাট। ঘুমানোর কিছুক্ষণ বাদেই রোহণের একখানা পা মেঝেতে ঝুলতে থাকে। ওর পাখানা খাটে তুলে দিয়ে খুব সাবধানে সুইচ অন করি। ষাট পাওয়ারের বাল্বটি আলো পয়দা করল কি করল না, জাহানা ছ্যাত করে ওঠে, 

ভাইয়া আবার লাইট জ্বেলেছিস? কাব্যচর্চার দরকার হলে স্ট্রীট লাইটের নিচে যা। জানিস তো বিদ্যাসাগর রাস্তার আলোয় পড়তেন। বিদ্যাসাগর যদি বিদ্যাসাগর হতে পারেন, তুই পারবি না কেন? 

ওর বাজখাই গলা শুনে প্লটের নাদের, কাদের নামে যারা কিলবিল করছিল তারা নাচতে নাচতে মগজের বাইরে আউট।সাহিত্যে ইতিহাস সৃষ্টি আমার সেখানেই শেষ। 

শফিকের কথায় ফিরি। শফিক আমার তিন বছরের ছোট। ঘরে খুব বেশি থাকতো না। সে নিয়ে আমাদের কারো তেমন মাথা ব্যথাও ছিল না। হুটহাট করে এসে মায়ের হাতে দুই পাঁচশ গুজে দিয়ে যেত। আর কি চাই? এরপর হঠাৎ করেই মনে হয়েছিল ও কোন যাদুর চেরাগ পেয়েছে। মিউনিসিপ্যালিটির পানির পাইপের মত ক্ষণে ক্ষণে ঘরে টাকার ফোয়ারা বইতে লাগলো। মাকে কষ্ট করে কাপড়ের গাঁটটি নিয়ে স্কুলে স্কুলে ঘুরতে হয় না। কালি ঝুলি ভরা, হলুদ মরিচে মাখানো শাড়ির বদলে মায়ের গায়ে পাট পাট ভাজের তাঁতের শাড়ি। মাকে তখন বড় ঘরের গিন্নী বান্নি মনে হতো। দুপুরে বড় মাছের টুকরো, রাতে মুরগির ঝোল। অন্য সবার মত আমিও প্রশ্ন করিনি, শফিক এত টাকা কোথায় পাস? সামনেই ব্যাল্কনি সমেত আলাদা একটা ঘর পাব। বিসমিলাহ খানের সানাই শুনতে শুনতে টেবিলে খাতা টেনে বসব। তুমুল বেগে আমার কলম চলবে। আশায় আশান্বিত হয়ে উঠলাম। ওদিকে জাহানা, রেহানার বিয়ে হবে। রাজু, রোহণ ফ্রি-প্রাইমারী স্কুলের বদলে ভাল স্কুলে পড়বে, ওদের একজন পুলিশ অফিসার হবে, মায়ের কত স্বপ্ন! 

এই তো গেল মাসে গভীর রাতের ফোন। খুব কর্কশ স্বর। লাশ শনাক্ত করতে মিরপুর থানায় যেতে হবে। কার লাশ কেন লাশ কিছুই জানিনা। সেই রাতেই থানায় গেলাম। শফিকের লাশটা মেঝেতে পড়ে ছিল। বুকে রক্তের অনেকগুলো গর্ত। পরদিন দৈনিকের ভেতরের পাতায় ছোট্ট একটা খবর ছাপা হলো, এনকাউন্টারে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী শফিকের মৃত্যু। আলঝেইমার রোগটি আমার এরপর থকেই শুরু। 

কদিন থেকে মা কাপড়ের গাঁটটি নিয়ে আবার স্কুলে স্কুলে ঘুরছেন। গাঁটটির মধ্যে জামালপুর থেকে আনা লাল, নীল, বেগুনী হরেক রঙের নকশী কাঁথা, থ্রিপিচ, শাড়ী। কখনো কখনো মনে হয় গাঁটটিটা মাথায় তুলে নেই। কিন্তু ঐযে, আমি যে লেখক, সংসার ভাবনা আমার জন্য নয়। 

শফিকের মৃত্যুর পর মা একদম শান্ত হয়ে গিয়েছেন। কারো সাথেই তেমন কথা বলেন না। বাবাও চুপচাপ। তালিম শেষে বাবার মোনাজাত দীর্ঘায়িত হয়। আমি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখি চোখ থেকে নেমে আসা পানির ধারা বাবার শ্মশ্রূমণ্ডিত মুখপাড়ার কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে। দুজনের মধ্যে সব ফ্যাসাদ যেনো চিরতরে বন্ধ হয়েছে। সম্ভবত এবারই প্রথমবার মায়ের সাথে ঝগড়া না করেই তিনি কালো ব্যাগটি কাঁধে তুলে নিলেন। যাবার বেলায় কতদিনের সফর বলে যাননি। কখনো বলেন না। 

রেহানা জাহানা এঘর ওঘর নিঃশব্দে বিড়াল পায়ে চলাফেরা করে। এই শব্দহীনতা আমার ভাল লাগে না। কায়মনে চাচ্ছি বাবা মায়ের মধ্যে তুমুল লড়াই হোক, রেহানা- জাহানা শব্দ-দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিক, আমি আলঝেইমার মুক্ত হই। 

আজ ঘর থেকে যখন বেরোই মা মেঝেতে ঘুমুচ্ছিলেন। বেচারি মা, গরম সইতে পারেন না। তালপাতার পাখাটি স্ফীত পেটের উপর। শাড়িতে তেল কালি ঝোল মাখা ছোপ ছোপ দাগ। নিঃশ্বাসের তালে তালে পাখাটি ওঠা-নামা করছে। মায়ের পেটে ছয় নম্বর সন্তান। বাবা বলেন, মুখ দিবেন যিনি আহার দিবেন তিনি। আমি পাখাটি আলগোছে তুলে মায়ের পাশে রেখে এসেছি। আমার অনাগত শরীক ব্যথা না পাক। 

সম্পাদকের ছুঁড়ে ফেলা গল্পের পাণ্ডুলিপিটি ঝোলায় ঝিমুচ্ছে। আমি সম্পাদকের কথামত এবস্ট্রাক্ট শব্দের খোঁজে হাঁটছি তো হাঁটছি। রাত গভীর থেকে গভীরে। পরীবাগ ওভারব্রিজে তৃতীয় লিঙ্গের সাথে প্রথমলিংগ শৃঙ্গাররত। আমি কিছুক্ষণ ওদের পাশে দাঁড়াই। ওরা আবেগ শুন্য চোখে আমাকে দেখে। আমি দেখি, খাটে শুয়ে থাকা রোহণের পা ঝুলছে মেঝেতে, মায়ের স্ফীত পেটের উপর তাল পাতার পাখা, বাবার কাঁধে কালো ঝোলা ব্যাগ, শফিকের বুকে রক্তাক্ত গহ্বর। গহ্বর গুলো ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। সেখান থেকে রক্তের ধারা গড়িয়ে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ ভাসিয়ে নেয়। আমার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে রক্তের উষ্ণ ঢেউ আছড়ে পড়ে। 

অবশেষে আমি জগতের অশ্লীলতম অথচ অতি প্রয়োজনীয় বিমূর্ত সেই শব্দটি আবিস্কার করি! 

৮টি মন্তব্য:

  1. কেমন যেন মর্মে ছুঁয়ে গেলো।

    উত্তরমুছুন
  2. সমুন্নত শৈলী । প্রজ্ঞাশ্রীমান শব্দাহরণ ও বাক্যগঠন । বিষয়বিন্যাসে চিন্তাসন্দীপ্তির বাহার, মা !

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. ধন্যবাদ প্রিয় শ্রদ্ধেয়জন। খুব ভালো থাকুন ।

      মুছুন
  3. চল্লিশদিন পরে তাবলীগ থেকে ফেরার পর শফিককে চেনা যাচ্ছিল না। একমুখ দাড়ি। মাটি থেকে চোখ উঠতে চায় না। বাবার সুর্মা টানা চোখে আনন্দ ঝিলিক দেয়। মা কটমট করেন। ‘দোযখের আজাব্ বেহেস্তের শান্তি’ নামক একটি বই পড়ে শফিক দুনিয়াদারী একেবারে ছেড়ে দিল। বিছানা বাদ দিয়ে ইটে মাথা রেখে মেঝেতে শুতে লাগলো। কুলুখের ঢেলায় ঘর দোর মাটি মাটি করে ফেলল। ..... পঙতিটুকু সমাজ ও তার মানুষকে একটা গভীর সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে

    উত্তরমুছুন
  4. যথার্থ একটি ছোটগল্প। এই গল্পের ভাষা, শব্দচয়ন, বর্ননাভঙ্গী, ঘটনার গতি প্রকৃতি সবকিছু ছিল পাঠকের অনুকূলে। কিছু গল্প আছে প্রথম লাইন পড়েই তার ভেতর প্রবেশ করা যায়। এমন গল্পগুলো পাঠকপ্রিয়তা না পেয়ে যায় না।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. মতামত জানানোর জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। ভালো থাকুন ।

      মুছুন