সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

মন্দিরা এষ'এর গল্প : পোকা

১. 

আঁতার এই এক স্বভাব, একটুখানি অবসর পেলেই পায়ের ওপর পা তুলে নাচায়। আমি যে প্রচন্ড বিরক্ত হই সেটি তাকে গত ২৩ বছর ধরে বলে বলে এখন আর বলি না। অবশ্য এতে তার কিছু যায় আসে না। এখনো সে চেয়ারে বসে পা নাচাচ্ছে মনের আনন্দে। ব্যংকিং সেক্টরে বেশ ডাক সাইটে ল’ইয়ার হয়ে গেছে সে। তার টাকার বিস্তারের সাথে সাথে ঘটেছে স্বাস্থ্যের বিস্তার। ওজন সম্ভবত দুশো কিলো ছুঁই ছুঁই করছে। আমি ওকে ডেকেছি একটি বিশেষ কারনে। তার চেম্বার মতিঝিলে হওয়ার কারনে আমাকে মতিঝিল আসতে হয়েছে আড়াই ঘন্টা বাসে ঝুলে। তাই মেজাজটা এমনি গরম হয়ে আছে। তার ওপর এতো গরমে সেদ্ধ হয়ে ঘামতে ঘামতে এসে দেখি তিনি দিব্যি ঐ কাজটি করছেন বসে বসে।

আমি খানিকটা বিরক্ত হয়েই তাকে বললাম- তোর পা নাচানো বন্ধ করবি? সে মুচকি হেসে বললো- ‘দোস্ত, তর জন্যেই অপেক্ষা করতে করতে পা নাচতেসিলো অটোমেটিক। কসম, আমার কোন দোষ নাই।’ 

আমি আর কথা বাড়ালাম না, বসে গেলাম ওর সামনে, একদম দুপ করেই। এই রুফটপ রেস্টুরেন্টে আমরা গ্রীন হেরল্ডের পিচ্চিবেলার বন্ধুরা প্রায়ই আড্ডা দিতাম আগে। এখনও যখনই আমরা দেখা সাক্ষাত করি এখানেই বেশিরভাগ সময় করি। 

আঁতাকে বললাম- ‘আমার একটা গাড়ি লাগবো। একটু পুরানা হইলে বেশি ভালো।’ 

-‘আমি কি গাড়ির দোকান খুলে বসেছি? তর ডিমান্ড দেইখা পিত্তি জ্বইলা যাইতাসে। আমার একটাই গাড়ি, লক্কর-ঝক্কর। নিয়া যাইতে পারোস। আর আমার বউয়ের গাড়িতে আমার হাত দেয়া নিষেধ।’ বলেই সে অগ্নিদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো- -তর ধান্দাটা কি ক’তো?’ 

এবার আমি একটু শিশুসুলভ মুখ করে বললাম-‘কোন ধান্দা নাই দোস্ত। এমনিই একটু ঢাকার বাইরে হাওয়া খাইতে যাবো’। 

-‘তরে আমি রগে রগে চিনি। কানারে হাইকোর্ট দেখাস তুই? আগে ক’তো তর গাড়ি লাগবো ক্যান?’ 

-‘দোস্ত, খিদা লাগছে। খাওয়ার কিছু অর্ডার দিসোস নাকি? বলে আমি খুব গভীর মনযোগ দিয়ে ক্যাটালগ দেখতে শুরু করে দিলাম বিপদজনক পরিস্থিতি এড়াতে। আঁতা সম্ভবত বুঝতে পেরে কিংবা শ্রেফ রাগে থম মেরে গেলো। সেদিকে সেও আর কথা না বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো- ‘কবে লাগবে?’ 

আমি জানালাম বৃহস্পতিবার রাতে। শুনে সে হেসে ফেললো। নরম কন্ঠে বললো- ‘থ্যাংকস।’ 

তৎক্ষণাৎ আমি তাকে বললাম- ‘ভুলেও এরকম কিছু ভাবিস না। তোর মতো বিরক্তিকর মেটেরিয়াল আমি বয়ে নিয়ে বেড়াবো এই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল।’ 

আসলে আমি আগে থেকেই জানি ওর একটা পুরোনো সাদা কোরোলা আছে যেটি নিয়ে ওর বউয়ের সাথে ওর প্রায়ই হেব্বি ঝগড়া হতো। গত রোজার ঈদে সে তার বউকে একটা ব্রেন্ড নিউ কার উপহার দিলে তাদের মাঝে ঝগড়ার আপাত সমাপ্তি ঘটে। 

আঁতার বউ মিলি। হিন্দী সিরিয়ালের নায়িকাদের সকল গুণাগুণই তার মাঝে বিদ্যমান। ওর বিয়ের মাস কয়েক পর যেদিন প্রথম ওর বাসায় গেলাম দরজা খুলে আমার পায়ের ধুলা মাখা দুশো পঞ্চাশ টাকা দামের স্যান্ডেল, এলোমেলো চুল, ঘামে লেপ্টে থাকা ফতুয়া আর মুখে সস্তা সিগারেট দেখে সে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করেছিলো- --‘কী চাই?’ 

আমি গম্ভীর মুখে সিগারেটটি ফেলে ধোঁয়া ছেড়ে বললাম- ‘আপনাকে।’ 

সে সাথে সাথে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলো। আমি দাঁড়িয়েই রইলাম দরজার সামনে। ভেতর থেকে তুমুল চ্যাঁচামেচির আওয়াজ আসছিলো। এর প্রায় দশ মিনিট পর আঁতা এসে দরজা খুলে বলল- ‘ধূর! আমি আগেই বলেছিলাম তুই এসেছিস। মিলি, মিলি এদিকে এসো প্লিজ।’ 

এর অনেকদিন পরেও মিলির ভেতর আমার প্রতি একটা ঘিনঘিন ভাব রয়ে গিয়েছিলো আমি সেটা বুঝতে পারতাম এবং ব্যপারটা এনজয় করতাম। 

যাক। গাড়ির ব্যবস্থা হয়ে গেলো সাথে দুপুরের লাঞ্চটাও। এবার আরামসে রেণুমামার দোকানে গিয়ে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে সুন্দর বিকেলটা কাটিয়ে দেয়া যাবে। আসলে আমার এখন যা অবস্থা, এই পরিস্থিতে আমার কি করা উচিত তা নিয়েও ভাবতে হবে। গত সপ্তাহ থেকেই ভাবছিলাম এব্যপারে একদিন ভাবতে হবে। ভাবারই সময় করে উঠতে পারছিনা। যা ধকল গেলো রেণুমামাকে নিয়ে থানা পুলিশ করতে করতে। পুলিশ তাকে এক কেজি গাঁজা সহ হাতেনাতে ধরেছিলো। কেইস সিরিয়াস না হলেও বিপদের বিষয়, কমসে কম ছয় মাসের জেল হতো আর আমি পরতাম বিপদে। নতুন সোর্স খুঁজে বের করা চাট্টিখানি ব্যপার নাকি! 

রেণুমামাকে চা দিতে বলে আমি গাঁজা বানাতে বানাতে ভাবতে শুরু করলাম ‘এই পরিস্থিতে আমার এখন কি করা উচিত’। 

সমস্যা নম্বর এক- আমি প্রায় বছর ঘুরে এলো বেকার।(প্রথম প্রথম অস্বস্তি হতো টাকা পয়সার টানাটানির ব্যপারটায়, এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি)। 

সমস্যা নম্বর দুই- আমাকে বাসা থেকে সব রেখে বের করে দেয়া হয়েছে ৭ মাসের ভাড়া বাকি পরায়, তো আক্ষরিক অর্থে আমি গৃহহীন-উদ্ধাস্তু (ব্যপার না, এক কোটি সত্তর লাখ ঢাকাবাসীর মধ্যে উদ্ধাস্তুই বেশি, আর তাছাড়া রেণুমামার দোকানে ছোট একটা ফ্যান আছে, রাতে ঘুমোতে কোন সমস্যাই না)। 

সমস্যা নম্বর তিন- বাবা আমার মুখ দেখতে চান না স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। মা আর পাভেল আমাকে নিয়ে লজ্জায় থাকে, তারা চায় না আমি বাড়ি যাই। ( সমস্যায় সমস্যায় কাটাকাটি হয়ে গেলো দেখি! বাবা, মা আর পাভেল তাদের সকলের সমস্যার একটাই সমাধান, ‘আমার তাদের থেকে দূরে থাকতে হবে’)। 

সমস্যা নম্বর চার- ঋতু, সে আমার সাথে মনস্তাত্ত্বিক গেইম খেলা শুরু করেছে। কয়েকমাস আগে একদিন ফোন দিয়ে বললো সে প্রেগনেন্ট। আমি খুবই খুশি হয়ে বললাম- দারুণ ব্যপার! কিন্তু ওর বাবা কে? আমি না ইমরুল? সে ওপাশ থেকে প্রচন্ড চিৎকার দিয়ে বলে- ‘মাদারচোদ! তোর বাপ।’ আমি তাড়াতাড়ি বললাম- ‘আস্তে কথা বলো, বাচ্চাটার ক্ষতি হতে পারে। ওর বাপ যেই হোক ওর তো সুস্থ দেহে এপৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হবার অধিকার আছে।’ সাথে সাথে ফোনটা কেটে গেলো। এর ঠিক দুমাস সতেরোদিন পর, আমি রেণুমামার দোকানেই বসে চা খাচ্ছিলাম আবার ঋতুর ফোন। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে হুড়মুড়িয়ে কান্না, চললো পাঁচ-ছয় মিনিট টানা। আমি নরম গলায় যতোই তাকে বলি- ‘সোনা, কাঁদে না। কি হয়েছে বলবে তো?’ ততোই তার কান্না আরো বেড়ে যায়। পরে খেয়াল করে দেখলাম ওর কান্না শুনতে আমার ভালো লাগছে, মনে হচ্ছে দূরে কোথাও তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। তাই আমি কথা বন্ধ করে ওর কান্না শুনতে শুনতে চা খাচ্ছিলাম। হঠাত সে কান্না থামিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বললো- ‘তোমার উচিত সুইসাইড করা। লজ্জা করেনা বেঁচে থাকতে?’ 

ইদানিং সে যখন তখন রেণুমামার দোকানে চলে আসে ইমরুলকে নিয়ে। ইমরুল ওর ক্লাসমেট কাম ক্লোজ ফ্রেন্ড। তো তারা এসে মামাকে চা দিতে বলে, দুজনে গল্প করতে করতে বেনসন ভাগ করে টানে। আমার দেখতে ভালোই লাগে। কেবল একটাই উৎপাত করে সে, যাবার সময় আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে ইমরুলের সাথে কথা বলতে বলতে কাকে যেনো বস্তির ভাষায় গালাগাল দিয়ে যায়। (এই সমস্যার আপাতত কোন সমাধান দেখছি না, যেহেতু রেণুমামাই এখন আমার আশ্রয়দাতা)। 

সমস্যা পর্যালোচনা সমাপ্ত করে আমি গাঁজায় লম্বা টান দেই রিলেক্স মুডে। ধোঁয়ার কুন্ডলী দেখতে আমার ভীষণই ভালো লাগে। শরীরের রক্তনালীগুলো বাজনা বাজাচ্ছে একসাথে, মাথা ভারে নত হয়ে ঝুঁকে পড়েছে মাটির দিকে। কোথা থেকে এতো জোনাকী এলো! ওরা রোজ আসে। আমার খুব ইচ্ছে করে ওদের মতো জোনাকী হয়ে যেতে। রেণুমামার সাঙ্গ-পাঙ্গরা গান ধরেছে- 

‘সহজ মানুষ ভজে দেখ না রে মন দিব্যজ্ঞানে
পাবি রে অমূল্যনিধি বর্তমানে 
ভজ মানুষের চরণ দুটি 
নিত্য বস্তু পাবে খাঁটি 
মরিলে সব হবে মাটি 
ত্বরায় এ ভেদ লও জেনে 
সহজ মানুষ… ’ 


২. 

রাত গভীর হলে আমি হাঁটি, এলোমেলো, গন্তব্যহীন। তখন মাথার ভেতর অজস্র কথারা বাজতে থাকে। যেনো একটা সেল্যুলয়েড দুনিয়ার ভেতর ঢুকে গেছি। মাঝে মাঝে পুলিশ খুব ডিসটার্ব করে। তখন ইংরেজিতে গালাগাল করলেই আর ঘাটায় না। ইংরেজি স্কুলে পড়ার এই আমার একমাত্র ফায়দা। আমি হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকি বৃহস্পতিবার পোকাকে নিয়ে ঘুরতে যাবো। আমার আনন্দ হয় ভাবতে পোকা আর আমি নদীর ধারে চুপচাপ বসে আছি বিকেলে । পোকা রিজিয়ার ছেলে। রেড এরিয়ার ডাকসাইটে ছেনাল রিজিয়া। 

বছর কয়েক আগের কথা, ফজলুর বিয়ের দুরাত আগে ব্যচেলরস পার্টি চলছিলো। প্রচুর মদ খেয়ে প্রায় সবগুলো বন্ধু মাতাল। আমাদের মধ্যে থেকেই কে একজন বললো- ‘যাবি নাকি?’ আমিও নেশার ঘোরে ‘চল’ বলে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। ফজলু দাঁত বের করে বললো- ‘তুই তো বলদ কিসিমের দোস্ত। তর একটু পাকনা হওয়ার দরকার আছে। নাইলে তর জীবন কিসমিস হয়া যাইবো কইলাম।’ 

আমি বললাম-‘অসুবিধা কি? কিসমিসেরও মজা আছে আলাদা।’ 

ও বললো- ‘বলদের মতো কথা কবি নাতো। কবি বলেছেন যে, এখন যৌবন যার...’ 

আমি কথাটা ওর থেকে কেড়ে নিয়ে বললাম- ‘যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। তো পন্ডিত, আমরা কোন যুদ্ধে যাচ্ছি?’ 

ফজলু মুখ খিচড়ে বলল- ‘তোর জন্য যুদ্ধেই যাওয়া। আর কোন কথা না দোস্ত। গেলেই বুঝবি।’ 

আমি সাথে সাথেই বুঝলাম এবং একটু দমে গেলাম। 

-‘ঋতু জানতে পারলে খুব দুঃখ পাবে।’ 

-‘শোন, এইটা কিন্তু এমন না যে তুই ঋতুরে ঠকাইতেসিস। এইটা একটা অভিজ্ঞতা কইতে পারোস। একদিনইতো। চল, চল।’ 

আমি গেলাম। কারন কৌতুহল আমারো ছিলো। গল্পের বইয়ে যেরকম বর্ণনা পড়েছি তার সাথে মিলিয়ে দেখছিলাম চারপাশ। কেমন একটা অস্বস্তিকর গুমোট পরিবেশ। ধুপ-ধূণো আর সস্তা মদের কটু কড়া গন্ধ কোথা থেকে যেনো ছড়িয়ে পড়েছে সরু আবছা গলির চারপাশে। কেমন একটা অলসতা চারপাশে। কারো যেনো তাড়া নেই কোন। সেই প্রথম রিজিয়ার সাথে দেখা। আমি রিজিয়ার ঘরে গিয়ে দেখি ঘোলাটে আলোর ঘুপচিঘর। সারা ঘর জুড়ে শুধু একটা খাট আর ছোট্ট একটা ড্রেসিং টেবিল। রিজিয়া খাটের কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ! তাকাতেই কী যেনো একটা সম্মোহনে টেনে ধরে ভেতরটা! জড়তা নেই, কিন্তু বিরক্তি আছে। আমাকে দেখেই মুখ কালো করে বললো- ‘তাড়াতাড়ি মিটায়া নেন।’ আমি থতমত খেয়ে বললাম-‘আপনি কি অসুস্থ’? সে এই প্রথম অবাক হয়ে মাত্র কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়েই আবার স্বাভাবিক গলায় বললো- ‘নতুন মনে হয়? আপনে কইরা ডাকতাসেন। আর আমার কুনো অসুখ নাই। এনজিওর স্বাস্থ্য আপারা নিয়মিত আইসা চেক কইরা যায়। আপ্নের ভয় নাই কুনো।’ 

এই বলে সে শাড়ির আঁচল ফেলে ব্লাউজ খুলে ফেলে। তার ভরাট খানিক ঝুলে পড়া স্তনদুটি থেকে ফোঁটা ফোঁটা গাঢ় কষ গড়িয়ে পড়ছে। আমাকে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রিজিয়া একটু ইতস্তত করে বলে- ‘আমার পোলার বয়স ৭ মাস। ওরে বিকালের পরে আর টানাইতে পারি নাই। তাই এরম ফুইল্লা দুধ গড়ায়া পড়তাসে।’ 

আমার কেমন গা গুলিয়ে উঠলো। সে তা স্পষ্টতই বুঝতে পেরে বললো- ‘ইদানিং কাস্টমার আসা কইম্যা গেছে আমার ঘরে, কিন্তু আমারতো দুইডা পেট এহন। অথচ এক সুমায় আমি ছিলাম এই বাবুপুরা বাজারের সব থেইক্কা সুন্দরী মাগি।’ আমার খানিক লজ্জা হলো কেনো যেনো। আমি রিজিয়ার ঘাড়ে আলতো হাত রেখে তার ছেলের নাম জিজ্ঞেস করলাম । সে বললো- ‘পোকা।’ 

আমি অবাক হয়ে বললাম- ‘মানুষের নাম পোকা ! তা কি করে হয়?’ 

সে ঝটকা দিয়ে আমার হাতটা কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে বললো- ‘হয় হয়। আমরা কি আর মানু নি? মানু হইলেন আমনেরা। ভদ্দরলুক। যাগে ঘরে মাইয়ালুক থাকলি পরেও ট্যাকা লিয়ে আসে, আমগোরে চোদে।’ 

আমি সাথে সাথে আর কোনো কথা না বলে ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। পেছন থেকে রিজিয়া ডাকছিলো শুনতে পেলাম। ‘ও সাব, কই যান? আমার কুনু ভুল হইলে মাফ করি দেন। সাব আমার বাইচ্চাডার দুধ কিনবার পারিনা।...’ 

আমি আর একবারও পেছন ফিরে তাকাইনা। সোজা বেড়িয়ে আসি বাবুপুরা ব্যশ্যাপল্লীর সরু গলি থেকে লম্বা লম্বা পা চালিয়ে। নীলক্ষেত মোড়ে এসে জোরে নিশ্বাস নেই মুক্ত বাতাসে। 

এরপর নিয়মিত জীবন ছন্দে অফিস যাই, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেই, বাসায় মা আমার জন্য পাত্রী দেখতে থাকে জোরেশোরে। ঋতু প্রেশার দিতে থাকে বাসায় তার কথা বলার জন্য। এই ব্যস্ত জীবনের মাঝেও আমার থেকে থেকে সেই বাবুপুরা ব্যশ্যাপল্লী, সেই রিজিয়া আর তার স্তন থেকে টপটপ করে গড়িয়ে পরা দুধকষ মনে আসতে থাকে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো করে। আমি এর কারন খুঁজে পাইনা কোন। ভেতরে ভেতরে কেমন যেনো এক অস্থিরতা কাজ করে, কিন্তু তা যৌনাকাঙ্ক্ষা নয়। তবে কেন সে সন্ধ্যাটা আমাকে বারবার বিরক্ত করছে, আমি ভেবে পাই না। আমি ঠিক করি আবার যাবো রিজিয়ার ওখানে। এবার আর ফজলুর সাথে যাইনা, একাই যাই। রিজিয়ার ঘরে খদ্দের ছিলো বলে আমাকে বাইরে বারান্দার মতো সরু প্যাসেজে অপেক্ষা করতে হলো আধঘন্টার মতো। আমি দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলাম চুপচাপ। হঠাত শুনি ভেতরে ধুন্দুমার চিৎকার- চ্যাঁচামেচি, সাথে শিশুর কান্না। খানিক বাদে এক লোক কাঁধে শার্ট আর পেন্টের বেল্ট লাগাতে লাগাতে বেরিয়ে এলো খিস্তি করতে করতে। কয়েক মিনিট পর রিজিয়া নিজেই শাড়ি ঠিক করতে করতে ঘরের থেকে বেরিয়ে এলো। আমাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকে ঝাঁঝের সাথে বললো- ‘ধূর! আইজ বওনি ও ভালা না। দিনডাও দেখতাসি ভালা যাইবো না। কইত্থে কইত্থে পাগল ছাগল সব আমার ঘরে আইবার লাগছে।’ বলেই সে আবার তার ঘরে ঢুকে পরে। আমি কি করবো ভেবে না পেয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে যখন সিঁড়ির দিকে রওনা হয়েছি, পেছন থেকে রিজিয়ার গলা- ‘কই যাইতাসেন? ঘরে আইবেন না সাব?’ আমি পেছন ঘুরে তাকিয়ে দেখি এরই মাঝে রিজিয়া শাড়ি পাল্টেছে, ঠোঁটে কড়া লাল লিপস্টিক লাগিয়েছে, মুখে পাউডার, আর চোখদুটো লাল-ফোলা। আমি কোন কথা না বলে চুপচাপ তাকে অনুস্বরণ করে ঘরে গেলাম। দেখি মেঝেতে চাটাই বিছানো, সেখানে আদুল গায়ে পোকা বসে একটা প্লাস্টিকের বল মুখে দিয়ে কামড়াচ্ছে। শ্যামলা গা আর মুখটা জুড়ে মায়ের মতোই বড়ো বড়ো দুটি মায়ামাখা তীক্ষ্ণ চোখ। 

রিজিয়া আমাকে বলে- ‘সেইদিনকা তো আমনের ট্যাকাগুলা পুরাই নষ্ট হইলো। আইজ কি করতে আইছেন? ট্যাকা উশুল করতে? আমনেরে তো আমি আর যাইবার কই নাইক্কা’। 

আমি তাকে আস্বস্ত করি আগের টাকা উশুল করতে আমি আসিনি আর আজও আমি তার সময়ের দাম মিটিয়েই যাবো। 

এতে সে ক্ষেপে গিয়ে বলে- ‘আমরা ব্যশ্যা হইবার পারি। কিন্তু খাইট্টা খাই, ভিক্ষা লাগবো না। আমনে আর আমার ঘরে আইবেন না কইলাম।’ 

আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম-‘তোমার স্তন। দেখতে চাই আবার।’ সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাতেই আমি তার দুধে ভেজা চটচটে ব্লাউজের সাথে লেপ্টে থাকা স্তন স্পর্শ করি। 

৩. 

আক্ষরিক অর্থে রিজিয়ার জন্যই আমি আমার পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে পান্থপথে একটা এপার্টমেন্ট ভাড়া নিই। একসময় রিজিয়া পোকাকে নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে চলে আসে, আমিই আসতে বলি। তবে তার এই চলে আসাটা মোটেও সহজ ছিলো না। না তার জন্য, না আমার জন্য। বহুত কাঠখড় পুড়িয়ে, মোটা অংকের মাশুল গুনে তবেই তাকে নিয়ে আসা। আমি তখন অদ্ভূত এক সময় কাটাচ্ছিলাম রিজিয়া ও পোকাকে নিয়ে আনন্দ আর পারিপার্শিক বেদনা সব মিলিয়ে। কিন্তু এভাবে বেশিদিন চললো না। ধিরে ধিরে ব্যপারটা চাউর হয়ে যায়। প্রথমেই জানে ঋতু। এটা ঘটতোই তা আমি আগে থেকেই জানতাম। ঋতু আমার ভাই পাভেলের থেকে আমার এই নতুন ঠিকানা উদ্ধার করে একদিন বিনা নোটিশে চলে আসে আমার ফ্ল্যাটে। রিজিয়া দরজা খুলে দিলে ঋতু বুলেটের মতো ড্রয়িং রুমে ঢুকে দেখে পোকা তিন চাকার বেবি সাইকেল চালাচ্ছে। 

ঋতু বেশ ব্যঙ্গ করেই বলে-‘ও, ছেলেকে এখনই ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। বেশ! বড় হয়ে তাকেতো রিক্সাই চালাতে হবে, আফটার অল মায়ের মতো তো আর গতর বেঁচে খেতে পারবে না।’ 

আমি জানি আমি ঋতুর অপরাধী তারজন্য সে আমাকে যা খুশি তাই বলার অধিকারও রাখে। কিন্তু তাই বলে পোকাকে নিয়ে এভাবে ব্যঙ্গ কেনো ? ও তো দুধের বাচ্চা। ও এসবের বোঝেও না কিছু। তাই বললাম- ‘ঋতু, তুমি শুধু শুধু এই শিশুটাকে এভাবে কথা বলছো কেনো? ওতো তোমার কথা কিছু বুঝতেও পারছে না। যা বলার তুমি আমাকে বলতে পারো। যেহেতু আমিই তোমার প্রকৃত অপরাধী।’ 

ঋতু চেঁচিয়ে ওঠে বলে- ‘এই লুইচ্চা ব্যাটা! তুই চুপ কর। চোরের মায়ের আবার বড় গলা! এই খানকি তরে এমন কি দিসে যা আমি দেই নাই? এর মধ্যে কি তুই পাইলি যা আমার নাই? তোর রুচি দেখে আমার বমি পাচ্ছে। ছিঃ!’ 

পোকা এতোক্ষণ খেলা থামিয়ে বড়ো বড়ো চোখ করে অবাক হয়ে দেখছিলো, এখন ঋতুর চিৎকারে চমকে উঠে ত্বার স্বরে কান্না জুড়ে দিয়েছে। আমি ঋতুকে আস্তে কথা বলার অনুরোধ করে পোকাকে কোলে তুলে নিই। এই দেখে ঋতু অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাতই শব্দ করে কেঁদে দৌঁড়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। 


৪. 

এই ঘটনার পর আমিও সেই রাতে কেমন থম মেরে গেলাম। পোকাকে একবারের জন্যও কোলে নিলাম না বা তার কাছে গেলাম না। রিজিয়াকে মদের নেশায় ইচ্ছে মতো পেটালাম। ইচ্ছে মতো মনের ঝাল মিটিয়ে যা খুশি তাই গালাগাল করলাম। ভোরের দিকে একটু তন্দ্রামতো চলে এলো আর আমিও ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। কতো বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েছি কোন হুঁশ নেই। হঠাত ঘুম ভেঙে গেলো পোকার কান্নার আওয়াজে। বিছানা থেকে উঠে রিজিয়াকে আশেপাশে কোথাও দেখতে না পেয়ে পোকাকে কোলে তুলে নিলাম। টেবিলে আমার জন্য নাস্তা সাজিয়ে রাখা আছে, পোকার খাবারও বানিয়ে রাখা। অথচ তাকে বাসার কোথাও খূঁজে পেলাম না। সকাল থেকে রাত অব্দি শহরের সম্ভাব্য অনেক যায়গাতেই তাকে খূঁজে ফিরলাম। এমন কি বাবুপুরা বাজারের ব্যশ্যাপল্লীতেও। কিন্তু রিজিয়াকে খুঁজে আর কোথাও পেলাম না। রাতে ক্লান্ত হতোদ্যোম হয়ে পোকাকে নিয়ে বিছানায় শুতে গেলাম এবং প্রায় সাথে সাথে ঘুমিয়ে গেলাম। এভাবে আরো বেশ কিছুদিন সকাল-সন্ধ্যা এই খোঁজাখুঁজি চললো। এক সময় আমার ভেতরে জানান দিলো রিজিয়া হয়তো আর কখনও ফিরে আসবে না। আমি রিজিয়াকে খোঁজা বন্ধ করে দিলাম কিছুদিন পরই। 

অফিসে যাওয়া বাদ দিয়ে কিছুদিন পোকার সাথেই সারাদিন কাটালাম। এক সময় আমিও চিন্তায় পড়ে গেলাম এভাবে আর কতোদিন, কিন্তু পোকাকে কে দেখাশোনা করবে। ভয়ে ভয়েই পোকাকে সাথে নিয়ে একদিন আমি বাড়ি গেলাম। বাবা ড্রয়িং রুমেই বসে ছিলেন। আমাকে দেখেই সোফা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে চিল চিৎকার শুরু করে দিলেন। 

‘ইয়্যু স্কাউন্ড্রেল! তোমার এতো বড় সাহস! তুমি এই পাপটিকে সাথে নিয়ে আমার বাসায় আসো। বেরিয়ে যাও। না হলে পিতার হাতে আজ পুত্র খুন হবে বলে দিলাম।’ 

বাবার চিৎকারে মা দৌঁড়ে এসে আমাকে দেখতে পায়। 

‘তোর একটুও লজ্জা নেই খোকা? এতোকিছুর পরও তুই একে নিয়ে এ বাড়িতে এলি কি করে?’ 

পাভেল বাড়ি ছিলো না। আমি মাকে বললাম- ‘মা, তুমি বাবাকে শান্ত হতে বলো। আমি চলে যাচ্ছি। আর আসবো না কখনও।’ 

তখনই পোকাকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম, মায়ের চাপাকান্নাকে পেছনে ফেলে। এভাবে চললো বেশকিছু দিন। একদিন অফিস গিয়ে দেখি আমার চাকরি চলে গেছে। যাবারই কথা। আমিও তাই আর কথা না বাড়িয়ে সোজা ফ্ল্যাটে চলে এলাম। বাসা থেকেই বের হতাম না। সারাদিন পোকাকে নিয়ে কাটাতাম আর সারারাত মদে ডুবে থাকতাম। মাঝে মাঝে কোন বন্ধু ডাকলে তাদের সাথে কিছু সময় কাটাতাম। ধীরে ধীরে দেখলাম আমি অতিরিক্ত মদ্যপানে আর পোকাকে দেখাশোনা করতে পারছি না। 

প্রায়ই মনে পড়তো রিজিয়ার কথা। রিজিয়া আমাকে বলতো- ‘আমি যদি কুনো কারনে মইরা যাই বা ধরেন হারায়া যাই, আপনে আমার পোলাডারে কুনো এতিমখানায় দিয়া আইসেন। এই দুনিয়াত ব্যশ্যার পোলা হইয়া বাইচা থাকার চে’ এতিম পোলা হয়া বাইচা থাকাডা অনেক সম্মানের।’ 

আমি তার এইসব খেয়ালি কথায় কখনও হাসতাম, কখনও রেগে গিয়ে বকা দিতাম। 

সিদ্ধান্ত নিলাম, পোকাকে আমি পিতৃপরিচয় দেবো। ও আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই বুক ফুলিয়ে বাঁচবে। একদিন একটা আবাসিক স্কুলে নিয়ে তাকে ভর্তি করিয়ে দিলাম। ব্যংকে কিছু টাকা জমা ছিলো তার ইন্টারেস্ট থেকেই পোকার পড়ার খরচ ভালোই চলে যায়। ছেলেটা খুব চুপচাপ স্বভাবের হয়েছে, দেখলেই মনে হয় ওর বুঝি মন খারাপ। আগে কয়েকদিন পরপরই ওকে দেখতে যেতাম। এখন আর যাই না ঘনঘন। কষ্ট লাগে। আর গেলেই ও বায়না ধরে ‘তোমার সাথে যাবো। যাবো। আমায় তুমি সঙ্গে করে নাও না কেন বাবা?’ আমি নানারকম এটা-সেটা বুঝিয়ে চলে আসি। আমার থাকার কোন যায়গা নেই। ওকে নিয়ে এসে কোথায় রাখি। এর চে এই ভালো ও বন্ধুদের সাথে স্কুলেই থাক। অবশ্য ছুটি-ছাটায় যখন অন্য বন্ধুরা বাড়ী চলে যায় ওকে একা থাকতে হয়। আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম এবার সামার ভেকেশনে আমরা কোথাও ঘুরতে যাবো। আঁতার গাড়িটা নিয়ে বৃহস্পতিবার আমাদের যাত্রা শুরু হবে। জীবন কী বিচিত্র! পোকা আমার সন্তান না হলেও আমি ওর বাবা। আমরা বাপ-বেটা মিলে কোন এক জোনাক জ্বলা সন্ধ্যায় শান্ত নদীর তীরে চুপচাপ পাশাপাশি বসে ঢেউ গুনবো। 



-০- 

লেখক পরিচিতি- 
মন্দিরা এষ 
জন্ম- ২১ ফেব্রিয়ারি 
জন্মস্থান- জামালপুর 
বর্তমান অবস্থা- ঢাকা 
১ম কবিতাগ্রন্থ- ভোরগুলো অন্যরকম (২০১৫) 
২য় কবিতাগ্রন্থ- অরন্য মিথের পৃষ্ঠা (২০১৭) 



২টি মন্তব্য: