সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

ভ্লাদিমির তুচকভ'এর গল্প : স্তেপের ঈশ্বর

অনুবাদ: হামীম কামরুল হক

ভ্লাদিমির তুচকভ: জন্ম-২৬ এপ্রিল ১৯৪৯। বর্তমান বয়স ৭০ বছর। কবি ও কথাসাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতিমান। তাঁর এই গল্পটি ‘ফিফটি রাইটার্স: অ্যান অ্যানথোলজি অব টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি রাশান শর্ট স্টোরিস’ থেকে নেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। বইটি সম্পাদনা করেছেন মার্ক লিপোভেস্টকি এবং ভ্যালেন্টিনা ব্রউগার। গল্পগুলির অনুবাদ ও টীকা তৈরি করেছেন মার্ক লিপোভেস্টকির সহযোগে ভ্যালেন্টিনা ব্রউগার এবং ফ্রাঙ্ক মিলার।  মূল রুশ থেকে ইংরেজি গল্পটি নাম ছিল ‘দ্যা লর্ড অব দ্যা স্তেপস’।
নব্বইয়ের দশকের পরও সোভিয়েত-উত্তর রাশিয়ায় সামন্ততন্ত্র ও ভূমিদাস প্রথার জের কতটা রয়ে গেছে তাঁর ভয়াবহ ও শিল্পিত রূপ এই গল্পটি।]


 স্তেপের ঈশ্বর  

দিমিত্রি গড়ে উঠেছিল মহান রুশ সাহিত্যের ভেতর থেকে। তার শৈশব, বয়ঃসন্ধিকাল এবং তার বড় হয়ে ওঠার সময়টা লালিতপালিত হয়েছিল এই সাহিত্যের ভেতর দিয়ে। যাই হোক, তার চরিত্র সেই সব আধ্যাত্মিকচেতনার দিঙনির্দেশনার যোগফলে তৈরি হয়নি, যেটাতে আমাদের উশিশতকের উপন্যাসগুলি নিষিক্ত, বরং সে ঠিক তার  উল্টোটাই। সেইসব লেখক তাঁদের পাঠকদের জাগাতে চাইতেন, তাঁদের জন্য তাঁরা নৈতিক দায়বোধ করতেন, এইসব গুণ ছিল অনুশোচনার মতো, তারা অনুভূতিকে যুক্তির ওপরে স্থান দিয়েছিলেন, নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁদের কল্যাণবোধ ছিল প্রখর, দয়া ছিল অপার, বিত্তবানদের প্রতি ছিল ঘৃণা এবং  ক্ষমতাপ্রতিপত্তির প্রতি ছিল বিরক্তি, নৈতিক দৃঢ়তা, তাঁদের ছিল উদারতায়ভরা আধ্যাত্মিকতা এবং তাঁদের মন ছিল দয়াকরুণায় পরিপূর্ণ।

দিমিত্রি সবচেয়ে পছন্দ করত ডস্টয়েভস্কি ও লিও টলস্টয়ের লেখাগুলি পড়তে, যেগুলির বেশিরভাগ সে মনে গেঁথে রেখেছিল; উচ্চস্তরের বর্ণনায়ম দৃশ্যগুলি পড়তে গিয়ে তার ভীষণ হাসি পেত এবং ভারী মজা পেত নিম্নস্তরের জায়গাগুলিতে--যেখানে অশুভের জয় হতো শুভবোধের ওপরে। ফলে সে তার চেয়ে সামাজিকভাবে নিম্নস্তরের  লোকজনের ব্যাপারে ছিল একেবারেই আলাদা ধাঁচের বিবেকহীন, হিসেবি, দুষ্ট, এবং নিষ্ঠুর; সে ছিল স্বার্থপর এবং ক্ষমতালোভী, অধ্যাত্মচেতনায় গরিব এবং হতভাগাদের প্রতি নির্দয়।
চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যাগুলি অর্থপ্রতিপত্তিতে দিমিত্রির দ্রুত উন্নতির পেছনে দারুণ ভূমিকা পালন করেছে। তারপরও, তার কায়কারবার মাত্র দুটো তাড়নার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা--নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং প্রচ- ক্ষমতা লিপ্সা। এছাড়া অন্য সমস্ত অনুভব ও অভিজ্ঞতা যেগুলি তীব্রভাবে জরুরি--দিমিত্রির প্রাণশক্তিময় স্বভাব সেসব জোগাড় করত প্রতিদিনের জীবন থেকে।

এবং এজন্য, যেমাত্র কোনো সুযোগ তৈরি হলো, সে কোনোমাত্র দেরি না করে মস্কো থেকে দেড়শো কিলোমিটার দূরে একটি জমি খরিদ করে ফেলল। খাসা জমি, এবং সেটি মোটেও কোনো ফালতু টুকরা জমি নয়, কারণ  এই জমিটি অনেকটাই তিনশো হেক্টর থেকে পাওয়া। সে তার এই মূল্যবান জমিটির চারপাশ বেশ খরচাটরটচা করে বেড়া দিয়ে ঘিরে দিল এবং সেখানে দালান তুলতে শুরু করল। সবার আগে তৈরি করা হলো কাছারি--যার সঙ্গে লাগোয়া ভৃত্যদের জন্য থাকার ঘর। অল্পসময়ের ভেতরেই কুকুর-রাখার ঘর, একটি ফসলের গোলা, এবং আস্তাবল এর সঙ্গে যোগ হলো। এর পর, শামিয়ান খাটানো পার্ক, একটি পুকুর এবং একটি স্নানঘর তৈরির বদলে দিমিত্রি হুকুমজারি করল যে, পঁচিশটি জরাজীর্ণ কুটির তৈরি করতে হবে--একটু দূরবর্তী কোণে, যার খুব কাছেই আছে একটি জলভূমি। ঠিকঠাকমতো ভগ্নপ্রায় বাড়ি, এমন একটি দৃশ্য তৈরি করল মিস্ত্রিরা যেগুলির দেওয়াল ফাটলওয়ালা এবং এবড়োথেবড়ো কাঠের জটিল টুকরা দিয়ে তৈরি, এবং জানালার কাঁচগুলি অভ্রর পাত দিয়ে তৈরি যাতে আলোর তীব্রতার বেশিভাগটাই ঠেকানো যায়।

যখন সব কিছু তৈরি হয়ে গেল, দিমিত্রি তার নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিতদের প্রধানের সাহায্যে স্থানীয় গ্রামগুলি থেকে ভূমিদাসদের সেখানে আনা শুরু করল। একটি চুক্তিপত্র, দুই কপি লেজার প্রিন্টারে ছাপানো, সবার সঙ্গে থাকল-- যারা  কাজ করার ইচ্ছা দেখিয়ে এখানে প্রবেশ করেছে।  চুক্তিপত্রের মূল বিষয়গুলি সংক্ষেপে নিচে দেওয়া হলো: কৃষক ভূমিদাসেরা কুটিরগুলিতে অস্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে, একটা চাষযোগ্য জমি পাবে, সঙ্গে  পাবে গবাদি পশু, চাষের যন্ত্রপাতি, এবং প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড়: রুশ শার্ট১, সারাফান২, হাতেবোনা কোট, ভারী কাপড়ের কোট, ইত্যাদি। এবং চুক্তিকারীকে অবশ্যই গ্রামে বাস করতে হবে, কোনোভাবেই হুট করে চলে যাওয়া চলবে না, তার নিজের চাষ কর ফল থেকেই সে তার খাবারদাবার জোগাড় করবে এবং নিজের ফলানো ফসলের অর্ধেকটা সে তার ভূমিমালিককে দেবে। এজন্য ভূমিদাসটি বছরে তার পরিবারের প্রত্যেকের জন্য, এবং নিজের জন্যও, দু হাজার রুবল পাবে।

সবার প্রভু হিসেবে, এবং ক্ষমতাবলে, ভূমিদাসরা তার যেকোনো কাজে ডাকামাত্র হাজির হবে, সে যেমতো বলবে সেমতো কাজ করবে; কাজ করবে এই জমিদারি এস্টেটের সৌন্দর্যবর্ধন কি রক্ষণাবেক্ষণে; কাজে কোনো রকমের গাফিলতির কি কোনো রকমের অবহেলার জন্য তাদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার অধিকার তার আছে, ভূমিদাসদের মধ্যেকার বিয়েশাদির অনুমোদন কি নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষমতাও তার,  তাদের ভেতরে কোনোরকম সংঘাত তৈরির আভাস পেলে সে এক হাতে সেটা দমন করবে... আর শেষ শর্তটি হলো, একমাত্র সেন্ট জর্জ ডে৩-তে কোনো ভূমিদাস এই চুক্তিপত্র থেকে অব্যহতি গ্রহণ করতে পারবে।

শেষপর্যন্ত ছোট্ট গ্রামটি ভূমিদাসে পুরো ঠেসে ভরে উঠল। উঁচু বেড়ার ওপরের জীবন বুকভাঙাবেদনায়, বিবর্তনবিরোধীরা সেই মাত্রায় ক্ষুদ্ধ হতে থাকল।

ভূস্বামী হিসেবে, নিষ্ঠুরতার স্বাদ পেতে তার অন্তর জ্বলছিল না-নেভানো এক প্রচ- তাড়নায়, আর সেটা চাই তক্ষুনি, সেই নতুন যুগের দ্বিতীয় দিনে, রিক্রুটদের জন্য রক্ত-স্নানের আয়োজন করা হলো। সমস্ত কৃষকদের একসঙ্গে জড়ো করার পর, সঙ্গে ছিল অবুঝ বাচ্চারা আর নাজুক বুড়োরা, সে একটা পুকুর খোঁড়ার হুকুম দিল। কিন্তু এসময় একটা কণ্ঠস্বর কানে এল, যেটা আবেদন জানালো-- ভূস্বামীর অগাধ বিবেচনার জন্য, বলল,‘‘দু সপ্তাহ ধরে এখানে যথেষ্ট পরিমাণ খোঁড়ার কাজ হলো, কিন্তু আমরা এখন অব্দি আমাদের গেরস্থালির কাজকর্ম কিছুই সেরে উঠতে পারিনি, এবং এখন তো এখানে বিশৃঙ্খলা চলছে। যদি আমরা উপযুক্ত সময়টা হেলায় চলে যেতে দিই, তাহলে আগামী শীতে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।’’

দিমিত্রি খুব আগ্রহ নিয়ে, এবং দেখে মনে হলো--বিষয়টা ভালো করে বুঝে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠা কৃষকটিকের জিজ্ঞাস্য ব্যাপারে জানতে চাইল,‘‘কারা এমনটা ভাবছে বলোতো দেখি?” প্রত্যেকেই এটাই ভাবছে। এবং তারপর, হাতে একটা লম্বা শিকারি চাবুক নিয়ে,  ভূস্বামী প্রত্যেককে চাবকালো, সেই সঙ্গে মার খেল তাদের সমর্থন করা চারজন চামড়ার বেল্টধারী গার্ডও। শুরুতে এই পেটানোর কাজটি তাকে এতটাই উদ্দীপনা দিয়েছিল যে, সামর্থ্যে সে যায় নয়--তার চেয়ে বেশি নিজেকে ভেবে বসেছিল, এবং শেষ দিকের কটা কৃষককে সে তাদের উদোম পাছায় কিছু হালকা বাড়ি দেওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারল না।

ভূস্বামী হিসেবে সে তার জীবনে সীমাহীন ক্ষমতার যে অভিজ্ঞতা লাভ করছিল, দিমিত্রি অনুভব করছিল যতই সে নিজের হাতে চাবকাচ্ছিল--সেটাই কেবল তার জন্য সবচেয়ে উপভোগ্য ছিল না। তাই সে সুযোগ পেলেই গার্ডদের পেটাতে লাগল, যারা এ দিক থেকে অনেক বেশি পেশাদার ছিল।
বেশ কিছু বিবেচনায়, দিমিত্রির এই বর্বরোচিত আনন্দ-উপভোগ তার পড়া মহান রুশ সাহিত্যের সঙ্গে একটা যোগ তৈরি করেছিল; মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে যেটা তার মতো বেখাপ্পা লোকের ওপর অশুভ প্রভাব ফেলেছিল।  সে এবং তার পনেরো বছর বয়সী পুত্র, গ্রেগরি, ধুমসে ঘোড়া চড়ে, খরগোশ শিকার করত-- যে খরগোশগুলি তারা স্থানীয় শিকাররক্ষক থেকে কিনত যতটুকু দরকার সেই পরিমাণে। তাদের শিকারের সময় আশেপাশে এলাকাজুড়ে এটা ভয়ের রাজত্ব তৈরি হতো--যার সঙ্গে যোগ হতো গ্রেহাউন্ডের প্রচ- ঘেউ ঘেউ শব্দ, সেখানে বাস করা সমস্ত জীবিত প্রাণে এবং যাদের চিন্তা করার ক্ষমতা আছে তারাসহ, তাদের চেষ্টা থাকত নিজেদের খরগোশগুলিকে তাড়িয়ে নিয়ে নিজেরদের জমির ভেতরে নিয়ে যাওয়ার--যাতে বাপবেটা তাদের ফসল ও সবজির বাগান দলে পিষে যেত তাদের মনের খুশিমতো এবং সেই উত্তেজনার উপশম ঘটল তাদের দুটি বন্দুকের গুলিতে কারো হড্ডিসার গরু মেরে ফেলে।

সুতরাং এর পরে, তার নিজের পড়ার ঘরে বসে গ্রিজের দাগওয়ালা, গোসল করতে যাওয়ার আগে পরে থাকা আলখাল্লার ভেতরে, এবং নিজের লোমশ বুকে তার পাঁচ আঙুলে আঁচড় কাটতে কাটতে সে তার সামনে থাকা বেচারা গবির মানুষটিকে প্রশ্ন করত--যে লোকটি তখন চিনার গাছের পাতার মতো থর থর করে কাঁপছে-- তাদের বকেয়ার বিষয়ে, ধীরে তার জমেদা খাতায় থাকা নোটগুলি দেখতে দেখতে, ধন্দের পড়া নামধাম ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে কথা বলত, এবং গরিবটি তার খেদোক্তিময় আমতা আমতা কণ্ঠস্বরের ভেতরে কেবল ‘‘হে মালিক, আপনি প্রভু, আপনি সব  হে প্রভু, হে প্রভু...’’ এবং শেষাবধি সে এর একটা শাস্তির ব্যবস্থা দিতে, সেটা হলো,  যে টেবিলে বসে সে চিন্তা করছে সেটা তুলে ধরবে, তারওপর থাকবে চল্লিশ পাউন্ড ওজনের পোডস*( *ভারী ওজনের দলা/বাটখারা) সেই সঙ্গে চলবে চাকুবের বাড়ি।

মাঝে মাঝে সে তার উঠানে দরবার বসাত, তাদের ভেতরে নৈতিক শিক্ষার প্রভাব ছড়ানোর জন্য, মূল কথা বলার আগের হম্বিতম্বি দেখিয়ে,‘‘তোমরা কী বলো, নোংরা সব চোরের দল, তোমাদের এখানে আনা হয়েছে কেবল একটা বিচারের জন্য?!” সে বেছে নিতে বেশি পেশীবহুল কাউকেÑ যাতে সে শাস্তিদানের যন্ত্রণাটা সইতে পারে এবং সমস্ত আত্মার৪ সামনে প্রশ্ন করতে ধীর লয়ে, যে, সে যে চাষ করে তা কতটা গভীর করে করে, এবং কী সার সে ব্যবহার করে, কতটা রাই সরিষা সে বপন করেছে, কতটা গমের চারা, তার হিসাব আছে কিনা যে কত বার বৃষ্টি হলো, পাকা ফসলের মাঠ থেকে সে কাকগুলিকে ঠিক মতো দূরে রাখতে পারে কিনা।

এই যন্ত্রণার হাত থেকে নারীদেরও কম ভোগান্তি ছিল না। এবং যদিও কৃষক নারীরা অপেক্ষাকৃত কম মার খেত এবং খেলেও অতটা কড়াভাবে নয়,  যতটা তাদের স্বামীদের ভাগ্যে জুটতÑ তিক্ততা তৈরি হতো তাদের হীননীচ করায়Ñ রুশ নারীদের সমস্ত কিছুর জন্য সবই একশগুণে পরিশোধ করা হতো--যেটা প্রভু চোখের বিবেচনায়। এটা এমনকি আরো বাজে হতো--সেই তাদের জন্য যারা ছিল বাড়িঘরে ভূমিদাস-- যেমন রাঁধুনী, ঘরের কাজের লোক, গৃহপরিচারিকা, এবং সেই বাচ্চাকাচ্চা দেখাশোনা করা, পাঁচ বছর বয়সী ভাসিলি এবং তিন বছরের নাতালিয়ার কাছে যারা ন্যানি। যৌননির্যাতন শারীরিক দিক থেকে আরো বড়ো চাপ। যাইহোক, এই ভুলভ্রান্তিগুলির আরো বেশি খেসারত দিতে হতো নৈতিক ভ্রষ্টতার জন্য, কারণ জমিদারের রক্ষিতা, লুদমিলা সেরগেইয়েভনা, তার স্বামী হাতে চরমভাবে নষ্ট হয়েছিল, সেটা এই কর্মকা-ে হাজির থাকত। প্রভু যখন তার লালসা চরিতার্থ করে তার ওপর থেকে উঠে যেত,  তখন সে  আবার ইন্দ্রিয়কারতভাবে বাড়ির কাজের মেয়েটির ওপর উপগত হয়ে তাকে চাবকাত।

এই দুনিয়ায় সমস্ত কাজের ভেতরে দিমিত্রির অবসরের বুদ্ধিবৃত্তিক বিনোদন ছিল ঘরোয়া নাট্যানুষ্ঠান বা থিয়েটার দেখা, যেখানে দর্শক বলতে সে, তার স্ত্রী, তার বড় ছেলে এবং নিরাপত্তারক্ষীদের প্রধান। আর ঘুরে ফিরে বাড়ির চাকরবাকরের অভিনয় করতো, পুরো ন্যাংটা হয়ে। আর সেখানে ওই একটি নাটকই অভিনীত হতো সংগ্রহিত-- গ্রিবয়েডভ-এর ‘মৌজ থেকে মর্মবেদনা’৫। তাছাড়া, পুরুষদের ভূমিকাতেও নারীরাই অভিনয় করত,  চুলো থেকে পাওয়া কয়লা দিয়ে তাদের দাড়ি গোঁফ আঁকানো থাকত। নাট্য প্রযোজনার বিশেষ দিক হলো অভিনয়ের সময় সংলাপ বলতে গিয়ে অভিনয়কারী নারীরা একে অন্যকে প্রাণভরে সজোরে চাপড় মারত। এতে কোনো রকমের ফাঁকি ছলচাতুরি বরদাস্ত করা হতো না; প্রভু নিজে এটা গভীর অভিনিবেশসহকারে খেয়াল করতেন। চূড়ান্ত দৃশ্যে  সমস্ত নারী মারামারি করত একে অন্যতে তাড়িয়ে দেওয়ার মতো করে-- তাতে মুখে আঁচড় দেওয়া থেকে রক্ত বেরুনো, চুল উৎপাটন,  এবং সঙ্গে থাকত বিকট আর্তচিৎকার আর খিস্তি। প্রভু নিজে পুরো পরিতৃপ্ত হলে তার  নিজের হাতে ধরা ঘণ্টায় টুংটাং শব্দের ভেতর দিয়ে পরিশেষে পর্দা নেমে আসত। প্রভুর ভালোবাসা, কোনো রকম ফোঁপানি ছাড়া বোঝা যেত এবং সেদিনের সেরা অভিনেত্রীর জন্য অপেক্ষা করত রং করা পাথরের সস্তা আংটি।

এই গল্পের সবচেয়ে অস্থির বিষয়টি হলো আদতে, যদিও তা তার ব্যক্তিত্বের ক্রম ক্ষীয়মাণতায় অগ্রগতির স্মারক, দিমিত্রি তার ব্যবসাবাণিজ্যের লাগাম শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করত। যে ব্যাংকে সে সপ্তাহে তিনদিন যেত,  সেটি আর্থিকভাবে দারুণ সফলতা পাচ্ছিল, একাধিক জমাখাতে অর্থ বৃদ্ধি পাচ্ছিল,  লোন থেকে দারুণভাবে সুদ পাওয়া যাচ্ছিল, এবং স্টক মার্কেটেও অবিরাম লাভের দেখা মিলছিল। দিমিত্রি সব কিছ সত্ত্বেও দিনে দিনে বড়লোক হয়ে উঠছিল।

বাদ বাকি সপ্তাহের চার দিনে সে করে চলত সব অচিন্ত্যনীয় কাজ। ব্যাপারটা পৌঁছালো একদা সেই মাত্রায় যে, এক গ্রীষ্মকালের প্রায় শেষ দিকে, রাগে মদমত্ত হয়ে সে এক কৃষকের কুটিরে আগুন লাগিয়ে দিলÑ কারণ কৃষকটি তাকে দেখে টুপি খুলে নত হয়নি। এবং সে আর সবার মতো কোনো কৃষক ছিল না। সেছিল এক আধা অন্ধ বুড়ো মানুষ। আর কুটিরটাও তার নিজের ছিল না, কিন্তু সেটা ছিল প্রথম কোনো ঘর যার সমানে দিয়ে দিমিত্রি তার রাগে মদমত্ত দশায় পার হচ্ছিল। দিনটিও ছিল প্রবল হাওয়ার দিন, পুরো গ্রাম আগুনে পুড়ে গেল। ফলে কৃষকদের শীতটা কাটাতে হলো মাটির ঘর তৈরি করে। তারপরও, এতে সবাই টিকে থাকতে না পারলেও, তারা তাদের কুটিরগুলি বসন্তের ভেতরে তৈরি করে ফেলল।

স্পষ্টতই কড়া বিচার-আচার রুশ মানুষদের জীবন এমন একমাত্রায় উপনীত হয়েছিল যে তা সে সবচেয়ে জঘন্য রকমের অমানবিক স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। এটা সব সময়ই এ-ই ছিল: যখন তাতারদের শাসন ছিল, ইভান দ্যা টেরিবলের সময়ে, পিটার দ্যা গ্রেটের সময়ে, এবং স্ট্যালিনের সময়ে। দিমিত্রি আদতে সেসবেরই স্বঘোষিত উত্তরাধিকার।

দিমিত্রি বিপুল কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করছিল সেন্ট জর্জ ডে-দিনটির জন্য, যেটা কিছু কারণে গ্রীষ্মকালের মধ্যে পড়ে। অবশেষে দিনটি এল। এবড়োথেবড়ে কাঠে তৈরি লম্বা টেবিলগুলি একসঙ্গে রাখা হলো তৃণভূমিতে। তিন বালতি সস্তা ভডকা রাখা হলো--‘‘সাদা চোলাই’’, যেমনটা লোকে বলে থাকে এগুলিকে--রাখা হলো ওইখানে।  সঙ্গে দেওয়া হলো দুই বালতি পোর্ট ওয়াইন নারীদের জন্য-- ‘‘লাল চোলাই।’’
প্রভু ভূস্বামী, বাহারি ফ্রক-কোটে, তার খাতা দেখে দেখে কৃষকদের নাম ধরে ডাকছিল এবং মাইনে দিচ্ছিল প্রত্যেক কৃষককে  ও তার পরিবারের প্রত্যেকের জন্য। এর পর, সেই পরিবারের প্রত্যেকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে প্রভু ও তার রক্ষিতার হস্তচুম্বন করছিল এবং তারা জায়গা নিচ্ছিল  টেবিলের ধারে গিয়ে সেখানে থাকা অ্যাপায়নদ্রব্যাদি নিয়ে। যখন বালতির চোলাই শেষ হলো, লোকগুলি দারুণ সুখী ও উৎফুল্ল হয়ে উঠল। এক বর্ণিল বৃত্তাকার নৃত্য শুরু হলো এবং রগরগে চাস্তুশকা৬ করতে করতে। প্রদক্ষিণরত গার্ডরা হৈ হল্লা খিস্তি ক্যাচাল বন্ধ করে দিল--কারণ মদ খেয়ে ঈর্ষায়র সঙ্গে কেউ বলছিল,‘‘ আমি তোমার চেয়ে বেশি চাবুক খেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি এবং আমি মদ খেতে পেলাম একই পরিমাণে।’’ মাতালটিকে স্থান দেওয়া হলো খড়ের ওপর যেটা আগে থাকতেই তৈরি করা হয়েছিল। প্রভু সেদিন দয়াশীল ও প্রফুল্ল এবং তিনি লোকজনের সেই উৎসবমুখর সময়ে কোনোমাত্র নিষ্ঠুর আচরণের ধার দিয়েও গেলেন না।

পরের দিন সকালে সব ভূমিদাস আগামী আরো এক বছরের জন্য তাদের চুক্তিনামার সময় বাড়াল। তারা মূলত এই বাস্তবতায় পরিচালিত হলো যে, প্রভু প্রায়শই ক্ষ্যাপাটে আচরণ করলেও, এখানে তাদের মতো লোকজন ভালোমতোই বেঁচে থাকতে পারে। আর পাঁচ বছর পর, যখন তুমি এটা জানবে, যখন তোমার অবসর নেওয়া সময় আসবে-- কারণ তুমি ততদিনে তোমার বাকি জীবন কাটানোর জন্য মোটামুটি প্রয়োজনীয় টাকাকড়ি জোগাড় করে ফেলেছো।

যাইহোক, বেঁচে থাকাবার জন্য, এটা খুব সহজ নয় যা এসব পদদলিত কৃষক ভেবে নিয়েছিল। তিন বছরের ভেতরে দিমিত্রি, দৃঢ় ও নিঠুরভাবে তার ব্যবসা চালালো, সে ভূমিদাসদের ভেতরে সঞ্চার করল নতুন আত্ম-সচেতনতা, এক নতুন নৈতিকবোধ, এবং নতুন বিধিবিধান। তারা তাদের প্রভু সঙ্গে কেবল এক প্রচণ্ড ধনী মানুষ হিসেবেই সম্পর্ক তৈরি করল না, বর  সে  হয়ে উঠল তাদের পিতৃতুল্য মানুষ, কঠিন কিন্তু ন্যায়বান, অবিরাম তাদের ভালোর জন্য চেষ্টা করা এক মানুষ। তাদের সকলেই হৃদয়ের গভীরে অনুভব করল-- প্রভু ছাড়া তারা জমি চাষ করতে পারত না, বা যেতে পারত না গির্জায়, তার বদলে নিজেরা নিজেরা নিজেদের মধ্যেই মারামারি করে শেষ হয়ে যেত। এরই ভেতরে, দিমিত্রি একটি গির্জা তৈরি করল, একজন পাদ্রি খুঁজে আনল, যে পুরোপুরি সততায়পূর্ণ, এবং সমকালীন নাগরিকমানুষদের থেকে মোহমুক্ত।

চূড়ান্তভাবে সেই মাত্রায় বিষয়টি কৃষকরা বুঝল, তা মিলে গেল এবং গ্রহণযোগ্যও হলো সেই অনিবার্য দুটো খুনের সঙ্গে--একটি সেই শিকারের সময়, অন্যটি প্রভুপুত্রের সঙ্গে লড়াই করার শাস্তির সময় ঘটা। ফলে ভূমিদাসরা, যাদের মনোভূমি এতটাই সাংঘাতিকভাবে পুনগর্ঠিত, গণ্যতাপ্রাপ্ত হলো যে সমকালীনসমাজে ফিরে আসার যে সম্ভবনা-- তা রীতিমতো শূন্য হয়ে গেল। তারা এর ভেতরে এসে বরং বাঁচতেই পারত না; বরং আধুনিক সমাজের আইনকানুনগুলিই তাদের কাছে রীতিমতো বর্বর ও অমানবিকই মনে হতো।

দিমিত্রি বেশ থিতু হওয়ার পর--হয় সে তার পার হওয়া বছরগুলি অনুভব করছিল, অথবা সে তার লাগামহীন তাড়নায় আচ্ছন্ন লীলা সম্পন্ন করতে চাইল। সে এমনকি কিছুর চিন্তার পুনর্গঠনও করতে চাইল। যেমন, অবরক৭  সে পঞ্চাশ থেকে ত্রিশ ভাগ কমিয়ে আনল। এই সময়ে তার বড় ছেলে, গ্রেগরি, যে তার পিতার ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত হলো, ক্রমে ক্ষমতা অর্জন করল। আর জীবন সেই ছোট গ্রামটিতে শেকড় গাড়ল দারুণ করে, যে ভূমিদাসরা সন্তানদের জন্মদিতে লাগল যাদের নিখুঁতভাবে মিল ছিল গ্রেগরির চেহারা সঙ্গে।


রচনা
১৯৯৮


টীকা:
রুশ শার্ট: একধরনের কলারওয়ালা শার্ট যেটা আটকানো হয় একদিক থেকে।
সারাফান: কৃষক নারীদের হাতাকাটা জামা বা জাম্পার যেটির বোতাম সামনে থাকে।
সেন্ট জর্জ ডে: ২৬ নভেম্বর (জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী), যেটা সংযুক্ত কৃষকের অধিকারের সঙ্গে, যে চাইলে ওইদিন এক জমিদারের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে অন্য জমিদারের কাছে সমর্পিত হতে পারে।
‘সমস্ত আত্মার সামনে’ এই বাক্যাংটি মনে করায় নিকোলাই গোগলের প্রহসনমূলক উপন্যাস, ডেড সৌলস(১৮৪২)। ১৮৬২ সালের পূর্বে ভূমিদাসেরা ছিল জমিদারের একেবারে নিজস্ব সম্পত্তি, তিনি এদের অন্য যেকোনো সম্পত্তির সঙ্গে বিনিময় করতে পারেন, কিনতে পারেন, মর্টগেজ রাখতে পারেন। ‘আত্মা’ শব্দটি সাধারণ ব্যবহৃত হতো ভূমিদাসদের গণনার জন্য।
গ্রিবয়েডভ, আলেকসান্দ্রা: (১৭৯৫-১৮২৯): মস্কোর নাট্যকার, যার ‘মৌজ থেকে মর্মবেদনা’ (প্রথম মঞ্চায়ন হয় ১৮৩১ সালে) যাতে মস্কোর সমাজের ধোঁকাবাজি, ক্ষুদ্রত্ব ও নীচতা নিয়ে খোঁচা আর ঠাট্টা মস্করা ছিল।
চাস্তুশকা: ঐতিহ্যবাহী লোকজ ছড়া, এতে দুই বা চারটি পংক্তি থাকে, যাতে কৌতুক, ঠাট্টা, বা যা মূলত বক্রঘাত/আইরনিমূলক এবং একে যুক্ত হয় সংগীত ও গান।
অবরক: ভূমিদাসদের ভূস্বামীকে দেওয়া ভূমির খাজনা, যা অর্থমূল্যে বা অন্য কিছুর বিনিময় দিতে হয়।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন