সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

মাসুদা ভাট্টির গল্প: দুঃস্বপ্নের দীর্ঘ বৃত্তান্ত

আকাশে দানোর মতো মেঘেরা ছুটে যাচ্ছে দিক-বিদিক, মাটিতেই বাতাসের ভীষণ বেগ, আকাশে নিশ্চয়ই তারও বেশি। 

খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে ছিলেন সৈয়দ আল-ফাইয়াজ। পেশায় তিনি দেশের অন্যতম বিখ্যাত মনোচিকিৎসক। যিনি মনে করেন, মনোবিজ্ঞান বলে আসলে কিছুই নেই, সবই এ্যানাটমি অথবা সার্জারির বইয়ের মতো অবশ্যপাঠ্য চিকিৎসাশাস্ত্র।
মনোবিজ্ঞানী বলে যাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয় তারা নিতান্তই মূল্যহীন, আর কিছু পড়ার সুযোগ হয়নি বলে সাইকোলজি পড়েছিলেন এবং এখন ছাত্র পড়িয়ে দিন চালাচ্ছেন। তার এই অবস্থানের কথা তিনি প্রকাশ্যেও বলেন, কিছু লোক তাকে এড়িয়ে চলেন, কেউ কেউ তাকে পেছনে গাল দেয় আকাট বলে, কিন্তু কেউই তাকে অগ্রাহ্য করতে পারেন না। কারণ সৈয়দ আল-ফাইয়াজ ডাক্তার হিসেবে খুউব ভালো। 

বরিশালের নদীধোয়া বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ওদের জমিদারি ছিল এককালে। তিনি নিজেও ছোট বেলায় দেখেছেন সেই জমিদারী। তারপর ক্ষয়েবয়ে গেছে সবকিছু। কিন্তু তাও যা থেকে গেছে সেটুকুও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে খাওয়ার জন্য যথেষ্ট, খাচ্ছেও ওদের পরিবারের একাধিক পুরুষ। এই পরিবারে অবশ্য নারীদের কোনো ভাগ নেই, তারা জন্মায়, বড় হয়, তারপর চলে যায় পরের বাড়িতে। যাওয়ার সময় তাদেরকে যথেষ্ট দেওয়া হয়, কিন্তু সেটুকুই, এর বেশি এই পরিবারে আর তাদের কোনো বক্তব্য থাকে না কোনো কিছুতেই। আল-ফাইয়াজ যখন লন্ডনে পড়তে যান, সেই ষাটের দশকে তখন তার চাচাতো বোন কুদরতী নূর তার চেয়েও ভালো ফলাফল করেছিলেন কলেজ ফাইনালে। জেঁদ ধরেছিলেন তিনিও যাবেন ঢাকায় লেখাপড়া করতে কিন্তু সৈয়দ আল-ফাইয়াজই সে পথ বন্ধ করেছিলেন, তখনও তাদের যৌথ পরিবার ছিল। তিনি তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারী পড়ছিলেন, যেখান থেকে পাশ করেই তিনি লন্ডনে যান মনোচিকিৎসক হতে। দীর্ঘদিন সেখানে লেখাপড়া ও কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফেরেন, দেশ তখন স্বাধীন। এসেই জাঁকিয়ে বসতে অসুবিধে হয়নি, তার পরিবারের অনেকেই তখন সরকারী, বেসরকারী বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তিনিও ঢুকে গেলেন সরকারী হাসপাতালে। তারপরতো নিজেই একটি বিশাল মনোরোগের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করলেন। এই যে বরিশালে তাদের সাবেকি বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ ভরা মেঘের ছুটোছুটি দেখতে দেখতে সৈয়দ আল-ফাইয়াজ তার অতীতচারণ করলেন, তাতে কোথাও কোনো ফাঁক নেই, ভুল নেই Ñ সবই নিপাট, দাগহীন। 

এখানে এলে আর ঢাকায় ফিরতে ইচ্ছে করে না তার। তিনি কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলেন না বড়বেশি। তার সার্বক্ষণিক সেবক আছে সরফরাজ, বহুদিন ধরেই তার সঙ্গে আছে। টিকে গেছে কেমন করে সে এক বিস্ময় যদিও। কিন্তু আছে। তার সকল কাজেই সরফরাজকে সব সময় পাওয়া যায়। সে রাত গভীর হোক, কি ঊষাকাল হোক। স্ত্রী আর কন্যার সঙ্গে তার বনিবনা নেই, তারা গুলশানে তার দুই বিঘা জায়গার ওপর বানানো বাড়িটির অর্ধেকে নিজেদের মতো করে তাদের নিবাস গড়ে নিয়েছে। তিনি যেটুকুতে থাকেন, সেটুকু সাবেক আমলের, একটু সাহেবি বাংলা মতোন। ওপরে নীচে দু’জায়গাতেই টানা বারান্দা, বড়সড় বসার ঘর, দৃষ্টির বাইরে থাকা রান্নার জায়গা আর প্রতিটি কামরার সঙ্গে লাগোয়া শৌচাগার। ¯œানের জন্য আলাদা জায়গার সুযোগ পরে তৈরি করতে দিতে হয়েছে, নাহলে চলে না। বাড়ির কাছেই আরেকটি জায়গা তার দখলে আছে সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। ইদানীং মামলা চলছে জায়গাটি নিয়ে, পাকিস্তানীদের ফেলে যাওয়া জায়গা বলে একাধিক ব্যক্তি এই জায়গার দখল চাইছে। কিন্তু তার কাছে পাকা কাগজপত্র আছে, আদালতও সেটা মানতে বাধ্য হয়েছে। তাছাড়া এখানেই তিনি দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে রোগির সেবা দিয়ে চলেছেন। নিজস্ব হাসপাতালের বাইরে এটাও তার রোগি দেখবার জায়গা। এদেশকে মনোরোগ বুঝতে শিখিয়েছেন তিনি, নাহলে এদেশে মনোরোগ বুঝতো কে? একথা ভেবে বহুবার সৈয়দ আল-ফাইয়াজ বাঙালি জাতির চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করেছেন মনে মনে, কারণ বাঙালি সেটা স্বীকার করতে চায় না। রাষ্ট্রীয় পুরষ্কারাদি তাকে দেয়া হয়েছে বটে কিন্তু তাতে কি, স্বীকৃতিরতো শেষ নেই। বয়স হয়েছে তার, সময় ফুরুচ্ছে বটে কিন্তু তার সঙ্গে স্বীকৃতির কোনো সম্পর্ক নেই। 

সরফরাজ তাকে ডাকতে এসেছে, বাজ পড়ছে চারদিকে। আজকাল বাজ পড়ে মৃত্যু হচ্ছে মানুষের আকছার। এতো মৃত্যুর খবর এর আগে কখনও শোনা যায়নি। যদিও এতো খবরের দৌরাত্মও আগে ছিল না। কিছু হতে না হতেই ঘটনাটি খবর হয়ে মানুষের কাছে পৌছে যাওয়াই যে মানুষের মনের ভেতর সবচেয়ে বড় অসুখটি তৈরি করে দিচ্ছে সে ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত সৈয়দ আল-ফাইয়াজ। তিনি যখনই কোনো মিডিয়ার মানুষকে পান তখনই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন কিন্তু কে শোনে কার কথা। এই আরেক সমস্যা, এদেশে কেউ কারো কথা শোনে না। সবাই সবকিছু বোঝে। কিন্তু তাদের আমলটা এমন ছিল না। তিনি সেই পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের কথা বলছেন। সময়টা আরো অনেক বেশি সম্মানজনক ছিল। তখনও ঢাকা অনেক দূরের কোনো শহর ছিল, সেখানে সবাই যেতে পারতো না, যেতে পারলেও টিকে থাকতে পারতো না। শুধু তারাই পারতো যাদের এই বরিশালে কিংবা অন্য কোথাও থেকে ঢাকায় টিকে থাকার মতো রসদ সরবরাহের সংস্থান ছিল। এখনতো ঢাকা কি, লন্ডনেও নাকি মানুষে সপ্তাহে সপ্তাহে যাওয়া আসা করে। অথচ লন্ডনে তিনি যখন পড়তে গিয়েছিলেন তখন ক’জন লন্ডন শহরের নাম জানতো? হ্যাঁ, বিলেত বলে তখন এই দেশের বাইরের যে কোনো দেশকেই মানুষ বোঝাতো। দিন কতো বদলে যায়, এক জীবনেই সেটা দেখলেন সৈয়দ আল-ফাইয়াজ। 


ছুটি শেষ, এবার ফিরে যাওয়ার পালা। না, কেউ তাকে ছুটি দেওয়ার নেই, তিনি নিজেই নিজেকে ছুটি দেন। বরিশালের এই বাড়িতে এসে সপ্তাহখানেক কাটিয়ে ফিরে যান ঢাকায়। আজকাল আর বিদেশে যান না খুব একটা। ডাক্তার দেখাতে অবশ্য যেতেই হয়, এদেশের ডাক্তারদের ওপর তার কোনোই আস্থা নেই। যারা পেটের ভেতর গজ-ফিতে রেখে সেলাই করে দেয় তাদের ডাক্তারিবিদ্যে নিয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কই তাদের আমলেতো এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি? এখন ঘটে কেন? ঘটে কারণ, এখন সবকিছু ভেঙেচুরে গেছে, কেউ এখন আর কাউকে মানে না। সবাই সবাইকে অগ্রাহ্য করে। এ এক অদ্ভ’ত সময়। লঞ্চের কেবিনে শুয়ে শুয়েও সৈয়দ আল-ফাইয়াজের এ কথাটিই মনে হলো বার বার। ঢাকায় এসে আবার সেই পুরোনো রুটিনেই ফিরে গেলেন তিনি, নিজের জীবনে তিনি খুব বেশি অদল-বদল আনেননি কোনোদিন, বদল তার পছন্দ নয়। 

তার কাছে যেসব রোগি আজকাল আসে তাদের প্রত্যেকেই মূলতঃ তার হাসপাতাল কিংবা বড় সরকারী হাসপাতালগুলো থেকে তারই ছাত্রদের রেফার করা। তিনি রোগি দেখেন যতœ করে, সময় নিয়ে। দিনে মাত্র দু’জন কি তিনজন রোগি দেখেন, সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে আটটা। এই দু’ঘন্টা। তার অফিস সহকারী অমলেন্দু সমাদ্দার, বয়স হয়েছে অনেক, যদিও তার চেয়ে একটু ছোটই হবেন অমলেন্দু, কিন্তু তিনি তাকে এখনও ছাড়িয়ে দেননি। ওই যে, তিনি বদলাতে পারেন না কিছুই। প্র্যাকটিস-কার্যালয়ে ঢুকেই তিনি এক গ্লাশ ঠান্ডা পানি পান করেন। তারপর এককাপ চা চেয়ে নেন, ততোক্ষণে সাড়ে ছ’টা বেজে যায়। প্রথম রোগি পাঠিয়ে দেন অমলেন্দু। প্রাথমিক যে সকল তথ্য জানা দরকার সেগুলো অমলেন্দুই জেনে নিয়ে লিখে দেন। এ জন্য ছাপানো প্রশ্নাদি আছে, সেখান থেকেই অমলেন্দু রোগির কাছ থেকে জেনে নিয়ে সেগুলোর উত্তর বসান। অমলেন্দুর হাতের লেখাটি স্পষ্ট। ইংরেজি জ্ঞানও যথেষ্ট ভালো। ঝকঝকে অক্ষরে কোনো রকম কাটাকাটি ছাড়া উত্তরগুলো পাঠে সৈয়দ আল-ফাইয়াজের আনন্দ হয় খুউব। 

নাম: কামালুদ্দিন। 

বয়স: ৫৫

পেশা: ব্যবসায়ী

বৈবাহিক অবস্থা: বিবাহিত, একটি সন্তান 

রোগের বর্ণনা:

প্রতি রাতে একই দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠছেন, গলা শুকিয়ে যায়, কয়েক গ্লাশ পানি পানেও তৃষ্ণা মেটে না। তারপর আর ঘুম আসে না। ঘুমের ওষুধ খেয়েও না। 

ঃ বসুন কামাল সাহেব। কামাল উদ্দিন না লিখে আপনি নিজের নাম কামালুদ্দিন লেখেন কেন?

ঃ আব্বা এভাবেই শিখাইছিলেন। 

ঃ আব্বা বেঁচে নেইতো?

ঃ জ্বি, নাই। 


ঃ বলুন, আপনার স্বপ্নের কথা শুনি। 


ঃ আমি প্রতি রাতে ঘুম আসা মাত্র স্বপ্ন দেখি যে, আমার মুখে কেউ থুতু মারছে আর কেউ আমার মুখে দুই হাত দিয়ে সমানে থাপ্পড় মারতেছে। মিনিট খানেকের মধ্যেই আমার ঘুম ভেঙে যায়, আর ঘুমাইতে পারি না ডরে। 


ঃ কবে থেকে এই স্বপ্ন দেখেন? 


ঃ অনেক দিন হয়ে গ্যালো। বছর সাতেক বা তার বেশি হবে। 


ঃ এতোদিন আসেননি কেন?


ঃ বিভিন্ন জায়গায় গেছি, আপনার কথা জানতাম না। 


ঃ কিসের ব্যবসা করেন?


ঃ গার্মেন্টস আছে। একটা দিয়া শুরু করছিলাম, এখন নিজের দুইটা আর অর্ডার বেশি হলে পার্টনারের কারখানায় কাজ করাই। 


ঃ ব্যাংক লোন আছে?


ঃ জ্বি আছে। 


ঃ সে কারণে কি দুঃশ্চিন্তায় ভোগেন?


ঃ না, লোনতো নিয়েছি অনেক আগেই, কই তখনতো এরকম স্বপ্ন দেখছি বলে মনে পড়ে না। 


ঃ ব্যবসায় এমন কোনো অসুবিধা, যা আপনাকে ঘুমাতে দেয় না?


ঃ না, ব্যবসাতো ভালোই চলছে। 


ঃ স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?


ঃ সম্পর্ক ভালো। দুই ছেলে স্কুলে পড়ে, তাদেরকে সঙ্গে দিয়ে স্ত্রীকে পাঠিয়েছি কানাডায়। বছরে দু’বার ওরা আসে আর আমি সময় পেলেই যাই ওদের দেখতে। 


ঃ যৌন-জীবনতো তাহলে আপনার নিয়মিত নয়। তাই না? 


ঃ আমার সেসব সমস্যা নাই। 


ঃ আপনারতো কোনো সমস্যাই নেই, আপনি বলছেন। তারপরও আপনি দুঃস্বপ্ন দেখছেন। স্ত্রীর বাইরে আর কারো সঙ্গে সম্পর্ক আছে? তাকে নিয়ে পরিবারে অশান্তি হচ্ছে?


ঃ সম্পর্ক আছে কিন্তু পরিবারে তা নিয়ে অশান্তি নেই। কারণ স্ত্রী এ বিষয়ে জানে না। তার এসব বিষয়ে কোনো জিজ্ঞাসা নাই। 


ঃ কেন তিনি আপনার ব্যাপারে নিষ্পৃহ কেন এতো?


ঃ মেয়েছেলের বাচ্চা-কাচ্চা হওয়ার পর তাদের প্রথম প্রায়োরিটি হয় সন্তান, স্বামী গৌণ হয়ে যায়। তাকে আমি অসুখী রাখি নাই। সেও সুখেই আছে। 


ঃ সেটাতো আপনি বলছেন। তার সঙ্গে কথা বলে হয়তো অন্যরকম উত্তর পাওয়া যাবে। 


ঃ আপনি চাইলে কথা বলতে পারেন। এরপর যখন আসবে তখন পাঠায়ে দিবো আপনার কাছে। 


ঃ ঘুমাতে যান কখন?


ঃ বেশি দেরি করি না। ধরেন এগারোটা সাড়ে এগারোটার মধ্যেই ঘুমাইয়া পড়ি। 


ঃ মদ্যপানের অভ্যাস আছে? 


ঃ জ্বি সামান্য। আগে বেশি খাইতাম। এখন কমায়া দিছি। ডাক্তার মানা করছে। শরীর খারাপ হইয়া যায়। ঘুম কম হয়। তাই কমাইছি। তাছাড়া আর খুব বেশি ভালোও লাগতো না। বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পরে খাইতাম। 


ঃ বাহ্, খুউব দ্রুত একটা খারাপ অভ্যেস ছাড়তে পেরেছেন। 


ঃ পুরা ছাড়তে পারি নাই, তবে পারবো ইনশাল্লাহ্। 


ঃ তার মানে আপনার মনের জোর আছে, আপনি সেটা জানেন। 


ঃ জ্বি। আমি মনের জোরেই এতোটা পথ আসতে পারছি। 


ঃ আপনার ভেতর কোনো ভয় কাজ করে? কোনো অন্যায় করেছেন কিংবা অতীতের কোনো কাজ থেকে অনুশোচনা? 


ঃ না, আমি অন্যায় করি নাই। ব্যাবসায় কতোকিছু করতে হয়। সেইগুলারে আমি অন্যায় মনে করি না। লাভের জন্য মানুষ কতো কিছু করে। আমিও করি। সেরকম কোনো কাজের জন্য আমার কোনো সমস্যা হয় নাই এখনও। 


ঃ বেশ। শারীরিক আর কোনো অসুবিধে? ধরুন গিয়ে আপনার স্ত্রী-সঙ্গমে কোনো সমস্যা?


ঃ না, তেমন কোনো সমস্যা হয় না। এই বয়সে যতোটুকু দরকার তার চেয়ে বেশিই ভালো। প্রথমবার অল্পক্ষণ টিকতে পারি, তারপরের বার যতোক্ষণ ইচ্ছা চালায়ে যাইতে পারি। 


ঃ হুম, তার মানে তো আপনি ঠিকই আছেন। 


ঃ স্বপ্নটাকে একটু বিস্তারিত বলুনতো শুনি আবার। 


ঃ এই যে ধরেন, ঘুম আসার ঘন্টা খানেক পরেই স্বপ্নটা আসে মনে হয়, কারণ যদি আমি সাড়ে এগারোটা নাগাদ ঘুমাই, তাইলে স্বপ্ন দেইখা জাইগা উঠলে ঘড়িতে দ্যাখা যায় দেড়টা-দুইটা বাজে। প্রথমে মুখের ওপর হঠাৎ একটা পানির ছিটা মতোন আইসা লাগে। তারপর হাত দিয়া সেইটা মুছতে গেলেই গন্ধটা আইসা নাকে লাগে, ছ্যাপের গন্ধ, নিজের না, অন্যের ছ্যাপের গন্ধ, নিজেরটাতো টের পাওয়া যায় না, অন্যেরটা টের পাওয়া যায়। তারপর আচমকা কেউ সামনে দাঁড়ায়ে সমানে আমার দুই গালে চড় মারে। থামে না, চড় মারতেই থাকে। এ্যাতো তাড়াতাড়ি মারতে থাকে যে আমার হাত দিয়া ঠেকাইতে গেলেও পারা যায় না। এক সময় ঘুমটা ভাইংগা যায়। নাকে তখনও ছ্যাপের গন্ধ টের পাই। 


ঃ কতোক্ষণ থাকে গন্ধটা?


ঃ বেশিক্ষণ না, কিন্তু একটা অস্বস্তি ঠিক থাকে, মনে হয় বার বার গিয়া মুখ ধুই। আর ঘুম আসে না। 


ঃ চড়টা কে মারে? তাকে চিনতে পারেন? কোনো মানুষের অবয়ব দেখতে পান কি?


ঃ না, পাই না। শুধু চটাস চটাস চড় পড়ে দুই গালে। কাউকে সামনে দেখতে পাই না। দেখতে পাইলেতো তারে মারার কথা ভাবতাম, আমি তো শুধু ঠেকাই, দুই হাত দিয়া চড় ঠেকানোর চেষ্টা করি। 


ঃ হুম কখনও ঘুমের ওষুধ খেয়ে দেখেছেন? 


ঃ জ্বি, এমনিতেই ঘুমানোর জন্য ডাক্তার আমারে ঘুমের ওষুধ দিছিলেন। ডাবল ডোজ খাইয়াও দেহি একই ঘটনা ঘটে। 


ঃ ঘাম হয় তখন? 


ঃ সব সময় হয় না। কখনও দেখি ঘাম হচ্ছে না। আবার দেখি ঘামে শরীরটা চুপচুপা হয়া গেছে। 


সৈয়দ আল-ফাইয়াজ কী যেনো ভাবলেন এরপর। সোনার জলে নিজের নাম ছাপানো প্যাড নিয়ে তাতে খস্্খস্্ করে লেখেন কিছু একটা, তিনি এখনও দামি ঝর্ণা কলম ব্যবহার করেন। রোগি দেখার সময় তিনি স্যুট পরে থাকেন। টাই না থাকলেও পকেটে রুমাল গোঁজা থাকে। তিনি কাফলিং লাগানো শার্ট পরেন, সব লন্ডনের একটি বিশেষ দোকান থেকে কেনা। এখন এদেশে এসব পাওয়া গেলেও তিনি সেখান থেকে কেনাটা পছন্দ করেন না। লন্ডনের দোকানে এখন ই-মেইল করে দিলেই ওরা পাঠিয়ে দেয়, তার আগে তারা তাকে ক্যাটালগ পাঠিয়ে দেয়, যাতে তিনি সেখান থেকে পছন্দ করে নিতে পারেন। গত কুড়ি বছরে তার শরীরের মাপের কোনো হেরফের হয়নি। 


ঃ এই নিন। কয়েকটা টেস্ট লিখে দিয়েছি। এগুলো করিয়ে আসবেন আগামি সপ্তাহে। অমলেন্দুর কাছ থেকে তারিখ জেনে নেবেন। 


ঃ কোনো নির্দিষ্ট সেন্টার থেকে করাবো টেস্টগুলো? 


ঃ না, আমি কোনো নির্দিষ্ট টেস্ট সেন্টারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করি না। আপনার যেখান থেকে ইচ্ছে সেখান থেকেই করাবেন। তবে খোঁজ নিয়ে জেনে নেবেন যে, কোন্্টা আজকাল ভালো করছে। 


ঃ তাও আপনি যদি বলে দিতেন, ভালো হতো না?


ঃ আমি সে কাজ করি না। অমলেন্দুকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। ও হয়তো আপনাকে বলে দেবে কোনটা কোনটা থেকে করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে। অমলেন্দুও আপনাকে নির্দিষ্ট কোনো সেন্টারের নাম বলে দেবে না, ওকেও এ ব্যাপারে কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে। ও বড় জোর আপনাকে একটা লিস্ট ধরিয়ে দেবে। যান, লিস্টটা নিয়ে যান। আর দু’টো ওষুধ লিখে দিয়েছি, আপনি একেবারে বিছানায় যাওয়ার আগে একটা খাবেন। আর যদি স্বপ্ন দেখে জেগে উঠে দেখেন যে, আর ঘুম আসছে না, তবে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতে পারেন, ছাদে যেতে পারেন, সেখান থেকে ফিরে এক গ্লাশ ঠান্ডা পানি পান করবেন এবং আবার বিছানায় গিয়ে, বিছানায় বসেই এই ওষুধটা খাবেন। ডোজটা কড়া। একটার বেশি কোনো ভাবেই খাবেন না। ঠিক আছে? 


ঃ জ্বি থ্যাঙ্ক ইউ। আপনার ফিসটা? 


ঃ কেন অমলেন্দু আপনাকে বলে দেয়নি? 


ঃ জ্বি দিয়েছে। তবে আপনাকেও জিজ্ঞেস করে নিলাম। 


ঃ যে কথা আপনাকে বলে দেওয়া হয়েছে সেকথা আবার জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। আমার এখানে দু’রকম ফলাফল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আসুন আপনি। 


ভদ্র্রলোক উঠে যাওয়ার পর, সৈয়দ আল-ফাইয়াজ তার নিজস্ব নোট বই নিয়ে বসেন। ছোট ছোট অক্ষরে ইংরেজিতে লিখে রাখেন অনেকগুলো প্রশ্ন। সেগুলোর পাঠোদ্ধার আমাদের পক্ষে করা সম্ভব নয়। খুউব নিবিষ্ট চোখে তাকালে বোঝা যায়, “হোয়াট ইজ ড্রিম?” প্রশ্নটি এবং সেটা ‘এ’ অক্ষরে নাম্বার দেয়া। কিন্তু এই প্রশ্নটি থেকে একাধিক প্রশ্নের উল্লেখে দেখা যায় নাম্বার দেওয়া হয়েছে রোমান হরফে। একটা বেশ বোধগম্য ডায়াগ্রাম আঁকা হয়েছে। ইংরেজি সংখ্যায় নাম্বার দিয়ে। সেখানে কামালুদ্দিনের মতো অনেক রোগির নাম, বয়সসহ নানা রকম তথ্যাদি দিয়ে পাতার পর পাতা ভরা। আমরা দেখতে পাই যে, তিনি সময় নেন এই লেখালেখিতে। অমলেন্দু এসে জানিয়ে যান যে, পরবর্তী রোগি এসে বসে আছেন। সৈয়দ আল-ফাইয়াজের মধ্যে কোনো তাড়া দেখা যায় না। 


আটটা বেজে গেছে প্রায়। তিনি দীর্ঘ সময় নিয়েছেন কামালুদ্দিনের ক্ষেত্রে। এটা তিনি গত বছরখানেক ধরেই করছেন। রোগি দেখার দিনে প্রথম রোগিকে নিয়েই সময় পার করছেন বেশি। দ্বিতীয় রোগির ক্ষেত্রে সময়টা তার কম লাগছে। কারণ প্রাথমিক প্রশ্নগুলি দেখা যাচ্ছে একই থাকছে। এটা গত বছর কয়েকের কথা। এর আগে এরকম হতো কি না তিনি মনে করতে পারেন না, তিনি ভুলতে শুরু করেছেন সবকিছু। খুউব দ্রুত। তিনি দ্রুত হাতে আরেকটি লাইন লিখলেন, এই লাইনটির পাঠোদ্ধার আমাদের পক্ষে উদ্ধার করা সহজ কারণ এটি কামালুদ্দিনের তথ্যের চেয়ে আকারে বড় অক্ষরে লেখা, যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় এরকম, “ড. রিচমন্ডকে ৮৯-তম রোগির তথ্যাদি পাঠাতে হবে। রোগি ভেদে ড. রিচমন্ডের পাঠানো প্রশ্নগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে”। 


ঘরের ভেতর এমন একটা সৌরভ ছড়ালো যা মূলতঃ আরব-ভূ-খন্ডের মানুষের পছন্দ। খুউব দামি ‘ঊউদ’-এর সুুগন্ধ। এ্যালকোহল ছাড়াও যা তেলের সঙ্গে মেশালে যার গন্ধে কোনো পরিবর্তন আসে না। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই সুগন্ধি ব্যবহার করে থাকে আরবে। চমৎকার কারুকার্যময় কালো বোরখা, লেস লাগানো নেকাবের ভেতর থেকে মিহি ও মিষ্টি একটি আওয়াজ বেরিয়ে এলো, “আসতে পারি?” 


ঃ জ্বি আসুন। বসুন। 


অমলেন্দুর দেয়া কাগজটি হাতে নিলেন সৈয়দ আল-ফাইয়াজ। সেখানে নাম লেখা আছে, নীলোফার হাশেম। বয়সঃ ৪০। বিবাহিত। পেশাঃ হোম মেকার। তিনি এই পেশার পরে লেখা ইংরেজি শব্দ দু’টির নীচে দাগ দিলেন। 


নারীটির গড়ন একহাড়া। কিন্তু বোরখার সরল রেখা থেকে বুকের জায়গাটা চমৎকার একটা উচ্চতা তৈরি করে আবার বোরখা সমান হয়ে পেটের ওপর দিয়ে নীচের দিকে নেমে গেছে। তিনি নারীটির দিকে পুরোপুরি তাকালেন। বুকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শরীরের পেছন দিকেও কোমরের নীচে প্রায় বুকের সমান উচ্চতায় বোরখাটি উঠে আবার ঝর্ণার মতো ঊরু বেয়ে নেমে গেছে। সৈয়দ আল-ফাইয়াজ নারীর মুখ দেখার জন্য উদগ্রীব হলেন। তিনি গলার স্বরে এই দেখতে চাওয়া মনোভাবের কোনো প্রকাশ না এনে বললেন, “জ্বি এবার বলুন। আপনি চাইলে বোরখা খুলেও বসতে পারেন”। উত্তরে ভদ্রমহিলা কী বললেন বোঝা গেলো না। তবে তিনি উঠে বোরখা খোলার কাজটিও করলেন না। 


ঃ আপনার সমস্যা সম্পর্কে বলুন। 


ঃ আমি ভয়ঙ্কর একটি দুঃস্বপ্ন দেখি অনেকদিন ধরেই। দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুম আসে না। 


ঃ কেমন দুঃস্বপ্ন?


ঃ ঘুমানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই টের পাই আমার মুখে কেউ যেনো পানি মতো কিছু একটা ছিটিয়ে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে নাকে তীব্র একটা গন্ধ পাই, অন্যের থুতুর দুর্গন্ধের মতো। তারপর সেটা পরিষ্কার করতে যাওয়ার আগেই হঠাৎ মুখের দু’পাশে কেউ জোরে জোরে চড় মারে বলে মনে হয়। আমি যতোই বাঁধা দিতে যাই ততোই চড় বেশি করে পড়ে। একসময় ঘুম ভেঙে যায় আমার। তারপরও থুতুর গন্ধ পাই কিছুক্ষণ, বার বার মুখ ধুতে ইচ্ছে করে। আর ঘুমুতে পারি না। হাঁটাহাঁটি করি, কিংবা বসে থাকি, কফি খাই। কিছু করার থাকে না। সবাইতো তখন ঘুমিয়ে থাকে। কাজের মেয়েটাকে জাগিয়ে রাখি জোর করে। 


ঃ আপনার স্বামী কী করেন?


ঃ তিনি ব্যবসায়ী। একটা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি আছে আমাদের। নানা রকমের প্রোডাকসান্স। এক্সপোর্ট, ইমপোর্ট। 


ঃ আপনি নিজেও দেখেন কোনোটা? 


ঃ জ্বি আগে বসতাম, এখন আর ভালো লাগে না। ইচ্ছে করে না। বাবার ব্যবসা দেখেছিলাম কিছুদিন যখন ইউনি থেকে ইন্টার্নশীপ করতে হলো তখন। ভেবেছিলাম স্বামীর ব্যবসা ভালো লাগবে। লাগেনি, ছেড়ে দিয়েছি। 


ঃ কেন ভালো লাগেনি? জানেন সেটা?


ঃ আমার কোনো কিছুই বেশিদিন ভালো লাগে না। খুব ধৈর্য্য নিয়ে কিছু করতে পারি না আমি অনেকদিন ধরে। 


ঃ সন্তানাদি?


ঃ এক মেয়ে। আমার যখন পঁচিশ বছর বয়স তখন হয়েছে, এখন ওর বয়েস পনেরো। আর ছেলের বয়স দশ। 


ঃ ওদের সঙ্গে সময় কাটান কতোক্ষণ? 


ঃ ওদের সঙ্গে সময় কাটানোর কিছু নেই। ওদের দেখাশোনার জন্য একাধিক মানুষ রাখা আছে। একটা রুটিনে নিয়ে এসেছি সবকিছু আমি। সবকিছুই ঘড়ি ধরে সময় মতো হয়ে যায়। আমার কিছুই করতে হয় না। যখন আঁটকে যায়, তখনই কেবল আমার প্রয়োজন হয়। 


ঃ স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?


ঃ এই বয়সে যেমন হওয়ার কথা, তেমন। 


ঃ কেমন হওয়ার কথা?


ঃ এই সময়ে এসেইতো মানুষ নিজের জীবনকে নতুন করে দেখে, তাই না? মেয়েরা এক রকম করে আর পুরুষরা আরেক রকম করে। মেয়েরা মনে করে আর কিছুদিনের মধ্যেই সে ফুরিয়ে যাবে। আর পুরুষরা আরো স্বেচ্ছাচারী, ভোগী হয়ে ওঠে। সবক্ষেত্রে না হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। 


ঃ বাহ্্ ভালো লক্ষ্য করেছেনতো। 


ঃ মেয়েদের কাজই লক্ষ্য করে যাওয়া। সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সব মেয়ের পক্ষে সম্ভব হয় না। 


ঃ আপনার ক্ষেত্রে কতোটা হয়েছে?


ঃ আমার ক্ষেত্রে বেশ ভালোই হয়েছে। আমাকে তিনি স্বাধীন করে দিয়েছেন। বলেছেন, আমার যা ইচ্ছে আমি করতে পারি। তিনি সংসারে আছেন, আবার নেইও। তিনি সব বিষয়েই আছেন, আবার কোনো বিষয়েই নেই। 


ঃ আপনাদের শারীরিক সম্পর্ক কতোটা নিয়মিত?


ঃ তার আগ্রহ কমে গিয়েছিল আগেই, আমার আগ্রহ শেষ হয়েছে কিছুদিন হয়। এখন আমাদের শোবার ঘর আলাদা। 


ঃ আপনার আগ্রহ তার প্রতি কমেছে, কিন্তু আগ্রহ কি একেবারেই নেই?


ঃ না, থাকবে না কেন? আছে এবং খুব ভালো ভাবেই আছে। 


ঃ সে ক্ষেত্রে?


ঃ আমি উপায় বের করে নিয়েছি। 


ঃ তাতে তার কোনো আপত্তি নেই? 


ঃ এখনও সে ব্যাপারটা জানে না। জানলে কী করবে বলতে পারবো না। কিন্তু তারও যে আগ্রহ শেষ হয়নি সেটাতো আমি জানি। টেরও পেয়েছি বিভিন্ন জায়গা থেকে। তাই আমার ওপর তার আপত্তি খাটবে কেন?


ঃ আপনাদের বয়সের পার্থক্য কতো?


ঃ প্রায় পনেরবো বছর। বাবাই ঠিক করেছিলেন আমার জন্য। বলেছিলেন এখানেই আমি ভালো থাকবো। তখন উঠতি ব্যবসায়ী ছিল। এখনতো তাকে সকলে চেনে। 


ঃ তাহলে আপনারা এক ছাদের নীচে বসবাস করেও একত্রে নেই আর?


ঃ বলতে পারেন, প্রতিবেশির মতো বসবাস। কিন্তু এতে কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। 


ঃ ছেলেমেয়েরা বুঝতে পারে ব্যাপারটা?


ঃ আমি বুঝিয়েছি ওদেরকে। মেয়ে বুঝেছে আরো আগেই। ছেলেটা আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে। 


ঃ ওরা কোনো অসুবিধে তৈরি করছে না তো? যেমন ওদের মধ্যে কারো ড্রাগ সমস্যা বা মেয়ের দিক থেকে খুব সমস্যার কোনো কারণ মনে করতে পারেন?


ঃ না, বাচ্চা দু’টো আমাদের বেশ লক্ষ্মী হয়েছে। তাছাড়া ওদের বাবা বা আমি, আমরা দু’জনেই বাচ্চাদের জন্য যে কোনো কিছু করতে পারি। নিজেদের মধ্যে নিজেদের জন্য কোনো আগ্রহ অবশিষ্ট নেই সেখানেতো আর কিছুই করার থাকে না, তাই না?


ঃ সে তো বটেই। আপনার স্বামীর এরকম কোনো সমস্যা আছে বলে জানা আছে আপনার?


ঃ আমি বলতে পারবো না। আমাদের একটা সীমারেখা আছে দু’জনের মাঝে। আমরা কখনওই সেটা ক্রস করি না। প্রথম দিকে তিনি আমাকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করতেন, কিন্তু কয়েক বছর পরেই বুঝেছেন যে, সেটা সম্ভব নয়। আমি তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, আমি আমার জায়গা থেকে সরবো না। কিছুদিন চেষ্টা করে তিনি সেই চেষ্টাটাই বাদ দিয়েছেন। বললাম না, আমরা সম্মানজনক একটা দূরত্ব নিয়ে এক বাড়িতে বসবাস করি। আমরা চাইলে দিনের পর দিন দু’জনের মুখ না দেখেও থাকতে পারি। কিন্তু বাচ্চাদের জন্য আমাদের সপ্তাহে দু’একবার দেখা হয়েই যায়। 


ঃ হুম, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, আপনারা দু’জন দু’জনকে জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন। 


ঃ একদম সেটাই। 


ঃ আরেকটু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে চাই। 


ঃ জ্বি করুন। 


ঃ আপনি যে বললেন, আপনার বিকল্প ব্যবস্থা আছে, মানে ওই যে শারীরিক ব্যাপারটার ক্ষেত্রে। সেটা কী রকম? কারো সঙ্গে আপনার কি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে?


ঃ না, সেরকম স্থায়ী কোনো সম্পর্ক নয়। 


ঃ তাহলে? আপনি বলতে না চাইলে আমি জোর করবো না। 


ঃ না আপনি ডাক্তার, আপনাকেতো বলতেই পারি। তবে নিশ্চয়ই ব্যাপারটি কনফিডেনশিয়াল?


ঃ অবশ্যই। এই তথ্যাদি কেবল চিকিৎসার জন্য। 


ঃ আমি আমার পছন্দের পুরুষ ভাড়া করে নিয়ে আসি। তার সঙ্গে অল্পক্ষণের সম্পর্ক তৈরি হয় আমার। তারপর আবার নুতন কোনো ভাড়ার সম্পর্কে চলে যাই। এই শহরে হলে এই শহর, বিদেশে যদিও সুযোগ বেশি। কিন্তু আমার এই শহরের ভাড়াটে পুরুষই বেশি ভালো লাগে। 


ঃ কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি আপনাকে এ জন্য? 


ঃ আগে হতো, এখন এই শহরেও এ ব্যাপারে প্রফেশনালিজম তৈরি হয়েছে। ক্লায়েন্টকে কেউ আর কোনো ভাবে হয়রানি করতে চায় না। এখনতো এজেন্সি রয়েছে এ জন্য। এজেন্সিই ক্লায়েন্টের তথ্য ও গোপনীয়তা সংরক্ষণ করে। 


ঃ বাহ্ বেশতো, এটার কথা আমার জানা ছিল না। আচ্ছা ঘুম ভাঙার পরে কখনও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখেছেন, মুখে কোথাও কোনো দাগ থাকে কি না?


ঃ হুম দেখেছি, দাগ থাকে না কিন্তু অনেক্ষণ মুখটা গরম হয়ে থাকে। বোঝা যায় যে, মুখে কিছু একটা হয়েছে, না আয়নায় দেখে নয়, আপনি শুধু নিজেই বুঝতে পারবেন ব্যাপারটা। 


ঃ আচ্ছা। আমি কিছু টেস্ট লিখে দিচ্ছি। করিয়ে নেবেন। আগামি সপ্তাহে আসুন আপনি। তবে এই সপ্তাহে দু’টো ওষুধ দিচ্ছি খাওয়ার জন। আপনি এর প্রথমটা ঘুমুতে যাওয়ার আগে বিছানায় বসেই খাবেন। আর দ্বিতীয়টা যদি স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যায় এবং আর ঘুম না আসে তখন কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে, দরকার হলে ছাদে গিয়ে কিছুক্ষণ হেঁটে ফিরে এসে তারপর এক গ্লাশ ঠান্ডা পানি পান শেষে বিছানায় বসে তারপর খাবেন। খুব কড়া ডোজের ওষুধ এটি। তাই কোনো ভাবেই একটির বেশি খাবেন না। ঠিক আছে? আসুন আপনি। 


মূল্যবান ‘ঊ-উ-দ’-এর সুুগন্ধ নিয়ে বোরকায় মোড়া মেয়েটি বেরিয়ে গেলেও সুগন্ধি তখনও ঘরটায় স্থির হয়ে থাকে। কিছুক্ষণ এই সুগন্ধের ভেতর ডুবে থাকেন সৈয়দ আল-ফাইয়াজ। তারপর নোটবই খানার যেখানে কামালুদ্দিনের জন্য নোট রেখেছিলেন সেখান থেকে একটি পাতা বাদ দিয়ে পরের পাতায় লেখেন, ইংরেজি ভাষা থেকে তর্জমা করলে যার অর্থ দাঁড়ায় ঃ


রোগী নম্বরঃ ৯০। ত্রিশতম নারী। স্যাম্পল হিসেবে ভিন্ন নয় কিন্তু আচরণের ভিন্নতা রয়েছে। ড. রিচমন্ডকে বিষয়টি জানাতে হবে। 


রাত হয়ে গেছে, ন’টা বেজে গেছে। অমলেন্দু এসে জানতে চাইলেন আর কোনো রোগি দেখবেন কিনা? ইচ্ছে হলো না তার। সৈয়দ আল-ফাইয়াজ কিছুক্ষণ তার নোটবুকটার পাতা ওল্টালেন। তারপর সামনের ল্যাপটপটি টেনে নিয়ে ড. রিচমন্ডকে ই-মেইল লিখলেন। জানিয়ে দিলেন যে, সামাজিক অবস্থানের স্তরভেদে স্বপ্নের ভিন্নতা রয়েছে কিনা সেটি দেখার জন্য ড. রিচমন্ডের নির্দেশ মোতাবেক পরবর্তী রোগি নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ড. রিচমন্ড তাকে এই নির্দেশনাও দিয়েছিলেন যে, তার কাছে আসা রোগি নয়, তার আশেপাশের মানুষ, যাদের সঙ্গে কমবেশি প্রতিদিনই দেখা হয় তাদের দু’একজনকেও তাদের স্বপ্ন সম্পর্কে প্রশ্ন করে জেনে নেয়ার কথা। সৈয়দ আল-ফাইয়াজ কী যেনো ভাবলেন, তারপর অমলেন্দুকে ডাকলেন। 


ঃ জ্বি স্যার? কিছু লাগবে? 


অমলেন্দুর দিকে নতুন করে তাকালেন, এর আগে কখনও ওর দিকে তাকিয়েছেন কি? অমলেন্দুকে তো সেই ছোটোবেলা থেকেই তিনি চেনেন। ওদের বাড়িটাইতো এখন তাদের বাড়ি। অমলেন্দুর সেই কাকীমার কথা মনে পড়ে আল-ফাইয়াজের, সবাই চলে গেলেও ভদ্রমহিলা যেতে চাননি। ছিপছিপে গড়নের মহিলাটি তখন বলতে গেলে তরুণীই ছিলেন। বরিশাল শহরের একজন ডাক্তারবাবুর মেয়ে। চোখের ভেতর বিস্ময় নিয়ে দিনভর অমলেন্দুর কাকা সুখেন্দুদের ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে থাকতো। কখনও কখনও গানও গাইতো বলে মনে পড়ে সৈয়দ আল-ফাইয়াজের। সেইসব ভয়-ভয়ঙ্কর সময়েও এই মেয়েটিকে কখনও জানালা থেকে সরতে দেখা যায়নি, হয়তো জানালাই তার খুউব প্রিয় ছিল। তার কারণেই অমলেন্দুও থেকে গিয়েছিল এদেশে। বরিশালের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে যখন দলে দলে হিন্দুরা যাচ্ছে তখন যে যেভাবে পেরেছে জায়গা-জমি দখল করেছে। কী ভয়ঙ্কর ছিল সময়টা, আল-ফাইয়াজের পরিবারের কিছুই ছিল না তা নয়, কিন্তু এই সময়ের পরে তাদের পরিবারের সবকিছু কয়েক গুণ বেড়েছে। এখনকার বাড়িটাইতো অমলেন্দুদের কাছ থেকে কেনা কি দখল করা তা এখন আর মনে করতে পারেন না আল-ফাইয়াজ, মনে করার কোনো কারণও নেই। এদেশে সে ইতিহাস কেউ মনে করে রাখেনি, তার কি দায় পড়েছে মনে রাখার? তবে তার মনে প্রশ্ন আছে এটা নিয়ে, কেন এতো দ্রুত, মাত্রই ত্রিশ-চল্লিশ বছরের ব্যবধানে এসব সম্পদ-সম্মত্তি প্রায় সবটাই নাই হয়ে গেছে? কিংবা থাকলেও তার জৌলুশ নেই কেন একটুও? এইতো সৈয়দ আল-ফাইয়াজদের বাড়িটা, একেবারেই নিষ্প্রভ, অন্ধকার, মনুষ্যহীন হয়ে গেছে, কেন হলো এমন? 


ঃ অমলেন্দু, বসো ওই চেয়ারে। তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। 


ঃ জ্বি স্যার বলেন। 


ঃ তুমি কি স্বপ্ন দ্যাখো অমলেন্দু? 


প্রশ্নটা করেই সৈয়দ আল-ফাইয়াজ অপেক্ষা করেন, তিনি জানেন যে, উত্তরটা কী হতে পারে। মনে মনে ভাবেন, অমলেন্দু সরাসরি তার জানা স্বপ্নগুলোর কথাই হয়তো বলবে। 


ঃ জ্বি স্যার স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখবো না কেন? 


অমলেন্দু এরপর থেমে থাকে। সৈয়দ আল-ফাইয়াজ অধৈর্য্য হয়ে যান। গলার স্বও একটু চড়ে যায় হয়তো। জানতে চান, “কী স্বপ্ন দ্যাখো সেটা বলো”?


ঃ এই তো দেখি যে, আমি দৌড়াইতেছি, ধান ক্ষেতের আল দিয়ে দৌড়াইতে দৌড়াইতে পাট খেতের আল পার হই, আর তখনই পায়ের নীচে কাটা-পাটের খোঁচা লাগে, সরে দাঁড়ায়ে দেখি পা থেকে রক্ত বের হয়। রক্তের ধারার পাশে শ’য়ে শ’য়ে জোঁক আসে, বড় বড় ছোট ছোট নানা রঙের জোঁক। 


সৈয়দ আল-ফাইয়াজ আরো অধৈর্য্য হয়ে পড়েন, বলেন, “কি বলো এইসব অমলেন্দু? তোমারে স্বপ্নের মধ্যে কেউ থাপ্পড় মারে না?” মুখে থুতু এসে লাগার কথাটা তিনি বলতে পারলেন না। কেন পারলেন না সেটা নিয়ে তিনি ভাবতে চাইলেন না। আরও উত্তেজিত হয়ে অমলেন্দুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। 


ঃ না স্যার, আমি তেমন কোনো স্বপ্ন কোনোদিন দেখি নাই। আমারে ক্যান থাপ্পর মারবে কেউ? আমিতো কারো কোনো ক্ষতি করি নাই। 


সৈয়দ আল-ফাইয়াজ এবার রেগে গেলেন, বললেন, “তুমি যাও অমলেন্দু। আমি এখন কিছুক্ষণ একা থাকবো। তুমি দরকার মনে করলে বাড়ি চলে যাও। আমার যেতে দেরি হবে”। রাগে তার শরীর কাঁপছে, তিনি ধারণা করেছিলেন সকলেই একই রকম স্বপ্ন দেখছে এদেশে। তার কাছে গত প্রায় এক বছর ধরে যারাই আসছে সকলেই একই স্বপ্ন নিয়ে কথা বলছে। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি নিজে? তিনি নিজেওতো স্বপ্ন দেখছেন, কেউ তার মুখে প্রথমে থুতু ছিটিয়ে দিয়েছে, তারপর সজোরে কেউ তাকে থাপ্পড় মারছে। তিনি একথা এমনকি ড. রিচমন্ডকেও লেখেননি। কিন্তু নিজেতো জানেন। আর বলতে গেলে সারাক্ষণ তার পাশে থেকেও অমলেন্দু ভিন্ন আরেকটি স্বপ্ন দেখছে? তিনি এটা মানতেই পারছেন না। 


রাগে, ক্ষোভে, উত্তেজনায় সৈয়দ আল-ফাইয়াজ কাঁপতে থাকেন। আর কাঁপতে কাঁপতেই তার মনে হয় যে, তিনি স্বপ্ন দেখেন, থাপ্পড়ের বেদনা আর থুতুর গন্ধ নিয়ে ঘুম ভেঙে যাবার পর প্রতিবারই তার মনে হয়, এই থুতু অমলেন্দুর কাকীমার, রেখা রাণী সমাদ্দারের। সৈয়দ আল-ফাইয়াজ বাকি কথা আর মনে করতে চাইছেন না এ মুহূর্তে। তার পৃথিবী দুলছে, মনে হচ্ছে একটি প্রবল ভূমিকম্প হচ্ছে চারদিকে। সে ভূমিকম্পের গন্ধও থুতুর মতোই। রেখা সমাদ্দারের থুতুর গন্ধ। রেখা রাণীর চিৎকারটাও সেই ভূমিকম্পের মধ্যে শোনা যায়, ‘তোমরা আমারে বাঁচাও বাবা, আমি এই বাড়ি ছাইড়া দিমু তোমাগো, আমারে তোমরা বাঁচাও’, পৃথিবী তখনও কাঁপে থরথর করে। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন