সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

অভিজিৎ সেনের গল্প : কাক

পঞ্চাশ বছর বয়সে আমার জীবনে একটা আশ্চর্য এবং চল্লিশ বছর ধরে আকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেল। দশ বছর বয়সে পূর্ববঙ্গের যে-জায়গা ছেড়ে আমি কলকাতা চলে এসেছিলাম, চল্লিশ বছর পরে সেই জায়গায় আবার পা ফেলার একটা সুযোগ পেয়ে আমার জীবন একেবারে ধন্য হয়ে গেল।

কিন্তু এ-গল্প ঠিক সেই অর্থে সেই আশ্চর্য অভিজ্ঞতার গল্প নয়। এ হল দাসমশায়ের গল্প । দাসমশায়ের সঙ্গে আমার এই চল্লিশ বছর পরেই দেখা হয়েছিল। না একথা বোধহয় ঠিক নয়। আমরা যখন পঞ্চাশের দশকে কলকাতায় পড়াশুনা করি, তখনও বাবা-মা ছোট ভাইবোনদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতেই থাকতেন। দাসমশায় সে সময় যেন বার দুই-তিন বিভিন্ন প্রয়োজনে কলকাতায় এসেছিলেন বলে আমার মনে পড়ছে। তবে সে-ও তো তিরিশ-পঁয়তিরিশ বছর আগের কথা। 

‘দাসমশায়'কে আমি ‘দাসমশাই’ করতে চাই না। কেননা, আমরা শৈশবে আমাদের মা-জেঠিমাদের দেখাদেখি তাকে ওই নামেই ডাকতাম। তিনি আমাদের একান্নবর্তী সংসারে ম্যানেজারের চাকরি করতেন। জমিজমার হিসেব, আদায়-উশুল, বেচাকেনা এইসবই তাঁর কাজ ছিল। ভারি রসিক মানুষ ছিলেন। যতদূর মনে আছে শৈশবে তাঁর বয়স পঁচিশ তিরিশের মধ্যেই ছিল। সুপুরুষ চেহারা ছিল তাঁর। আমাদের সঙ্গে তার বন্ধুসুলভ মজার সম্পর্ক ছিল। আমাদের শৈশবে বাবা-জ্যাঠামশায়দের সামনে হাসা কিংবা উচ্ছলতা দেখানো বেআদবি বলে গণ্য হতো। দাসমশায়ের একটা মজা ছিল এই ব্যাপারটা নিয়েই। বাবা-জ্যাঠামশায়দের সামনে একটু আড়াল করে তিনি হয়তো আমার দিকে তাকিয়ে আচমকা একটা বিচিত্র মুখভঙ্গি করলেন; তখন যে অবস্থা কী অসহনীয় হতো, তা আর বলার নয়। আমরা না-পারতাম হাসতে, আবার চুপচাপ বসে থাকাও প্রাণান্তকর হতো। দাসমশায় পরক্ষণেই আমাদের দিকে তাকিয়ে ফিকফিক করে হাসতেন। এইরকম সব মজা তাঁর ভাণ্ডারে অঢেল ছিল। তাঁর প্রসঙ্গ উঠিয়েছিল আমার ভাই শংকর। আমরা পিঠোপিঠি ভাই। এই বয়সে ভ্রাতৃসম্পর্ক কতখানি থাকে তা গবেষণার বিষয়। কাজেই আমার সঙ্গে শংকরের যা সম্পর্ক তা বোধহয় প্রচলিত ধারণাকে ছাড়িয়ে অন্য কিছু। বস্তুত, তারই আগ্রহে আমার এতকাল পরে এদেশে আসা সম্ভব হল। 

আমাদের সেই ছোট সুন্দর বন্দর শহরটিতে আমি আর শংকর একদিন রাত প্রায়-নটা নাগাদ এসে নামলাম। প্রায় তিনঘণ্টা মোটরচালিত দিশি নৌকার যাত্রা। তার আগে ভোর থেকে বাস, রিকশা, খেয়া নৌকায় একটা ঠাসা দৌঁড়। শংকরের ভায়রা এই বন্দর-শহরে একটা স্কুলে শিক্ষকতা করে। আমরা উঠলাম তার বাড়িতেই। পরদিন ভোর ভোর থাকতে ঘুম ভাঙতেই শংকর বলল, ওঠ, আমরা যাব একজায়গায়। আর দিনের বেলা দেশের চেহারা দ্যাখ।’ বললাম, ‘এত সকালে কোথায় যাবি!' সে বলল, 'দাসমশায়কে মনে আছে তোর? সেই দাসমশায়ের বাড়িতে যাব আমরা।' 

আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়লাম। দাসমশায়ের কথা উঠতেই সেই রঙ্গপ্রিয় সুপুরুষ মানুষটি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। নদীর ধার ধরে এগোচ্ছিলাম। নদীর নাম সুগন্ধা। 

সেই নামে শহরের দোকান, রেস্টহাউস, বাড়ি ইত্যাদি পিছনে ফেলে হাঁটছিলাম আমরা। আমাদের ছোটবেলার সোন্দার বিল, সোন্দার খাল ইত্যাদি নামের আড়ালে যে সুগন্ধা নামটা ছিল, কে জানত! নভেম্বরের হিমেল হাওয়া তেমন কনকনে নয়, কেননা সমুদ্র খুব কাছেই। 

বন্দরের এলাকাটুকু ছেড়ে মাটি আর টিনের ঘরের গেরস্থালি। আমরা একেবারে নদীর পাড় ধরেই এগোচ্ছি। নদীতে শেষ রাতের জোয়ারে এখন সবে টান ধরেছে। ঘোলাজলে অজস্র কচুরিপানা, কোথাও কোথাও কচুরিপানার জঙ্গল যেন। নদীপথে নৌকাও অনেক। আমাদের কেমন বিহ্বল লাগছিল। 

মাইলখানেক এগোলে বাঁ-হাতে একটা ঘন ঝোপঝাড়ের বৃদ্ধি। লকলকে বেতের জঙ্গল, কালো-কালো বেতের করাত ঝোপের উপরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আশ-শ্যাওড়া আর কচু গাছের দুর্ভেদ্য জঙ্গল। এসবের উপরে একটা উঁচু এবং বেশ বিস্তারি ছইলা গাছ তার বটের মতো ছড় নামিয়ে মাটিতে ভর রেখে ডালপালা পোক্ত করছে। এসবের ওপারে একটা গ্রামের আভাস। সেখান থেকে প্রচুর কাকের সমস্বর চিৎকার শোনা যাচ্ছে। শংকর বলল, ‘কাকের ডাক শুনতে পাচ্ছিস? মজা দেখবি চল, আমরা ঠিক সময়েই এসেছি।’ 

জঙ্গলটা পেরিয়েই চোখে পড়ল কাফিলা গাছের ডাল কেটে বেড়া দেওয়া একখানা গেরস্ত বাড়ি। কাফিলা অমর উদ্ভিদ। বেড়ার মাঝে-মাঝে বহু ডাল থেকে ঝাপড়া হয়ে পাতা 

বেরিয়েছে। একটু এগিয়ে একখানা বড় ভিটা চোখে পড়ে। তার দুই প্রান্তে দুখানা বাড়ি। বাড়ির 

দুই উঠানে দুই বৃদ্ধ কাকদের ডেকে-ডেকে খাওয়াচ্ছে। যত তারা ‘আয়-আয়’ করছে,কাকদের কা-কা ধ্বনিতে উৎসাহ যেন তত বাড়ছে। বন্দরের যত পাতিকাক সব যেন এসে ভিড় করেছে এ-বাড়িতে। 

দুই বৃদ্ধের বয়স প্রায় একই। একজনের চোখে উঁচু পাওয়ারের চশমা। দুজনে যেন প্রতিযোগিতা করে ‘আয় আয়' রবে চিৎকার করছে। কার গলা কত উঁচুতে ওঠে তারই 

প্রতিযোগিতা। যেন একে অন্যের কাক ভাগিয়ে নিজের উঠোনে নিয়ে ভেড়াবে। দুজনেরই প্রবল উৎসাহ। আমরা যে দুটো মানুষ উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছি, কারও খেয়াল নেই। 

আমরা বেশ খানিকক্ষণ ধরে মজা দেখলাম। তারপর শংকর চিৎকার করে বলল, 'এই কাউয়া ক্যাচকেচি কি থামবে, না কি ? আমরা দুইটা অতিথ্‌ যে উঠানে খাড়ইয়া রইছি, তানি কেও দ্যাখ্‌ফে !' 

সুদর্শন বৃদ্ধের, যাকে আমি দাসমশায় বলে আগেই শনাক্ত করতে পেরেছিলাম, এবারে খেয়াল হয়। তিনি হাতের চাল একেবারে ছড়িয়ে দিয়ে একটু এগিয়ে এসে বললেন, ‘কে তুমি?’ 

শংকর এগিয়ে গিয়ে তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। বলল, ‘আমি শংকর, দাসমশায়।‘ 

‘শংকর ? আরে শোন্‌ছে অ্যাই মানিক, আরে আমাগো শংকর আস্‌ছে—আরে লেদুদার পোলা—‘ 

অন্য বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন ততক্ষণে। বোঝা গেল তিনি কানেও একটু খাটো। ভারী চশমার নিচে তার বিস্ফারিত চোখে নির্বোধ অন্বেষণ আমার মুখের উপরে। শংকর তাঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, ‘আমি শংকর, মানিক ভাই।’ 

‘শংকর, আমাগো শংকরইয়া? তোমার লগে ও কে, ও শংকর ?’ 

শংকর বলল, ‘লগে আমার সেজদা, আমাদের সাইঝ্যা ভাই। দাসমশায়ের কি মনে আছে, যার নাম বিনু?' 

দাসমশায় বললেন, ‘মনে আবার নাই ! সেবার আমিই না কইলকাতার বাসায় রাইখ্যা আসলাম। আ-হা কতটুকু পোলা, মা-বাপরে ছাইর‍্যা--। ও দেখি বুড়া হইয়া গ্যাছে। মাথায় দেখি চুলই নাই। 

ব্যাপারটা আমার ভালো না লাগলেও শংকরের দেখাদেখি দুই বৃদ্ধের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। কেমন আপ্লুত লাগছিল। 

ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বৃদ্ধের ঘরের ভেতর থেকে আট-দশ বছরের একটি বালক বেরিয়ে এলে শংকর চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ওরে ও হালার পো হালা, তুই এত বড় হইয়া গ্যাছো? তোমার নানুরে যাইয়া কও তার ভাই আছে ইনডিয়া থিকা।’ 

শংকর যেন এখানেই স্বাভাবিক। আমাকে তাক লাগিয়ে দিয়ে প্রতিমুহূর্তে সে বদলে যাচ্ছিল। 

ঘরের ভেতর থেকে বালকের নানি বেরিয়ে এল। বোঝা যায়, একসময় সুন্দরী ছিল। আমাদের থেকে আট-দশ বছরের বয়সে বড় হবে মহিলা। 

মাথায় আঁচল টেনে এগিয়ে এসে একমুহূর্ত শংকরের সামনে থমকে দাঁড়ায়। তারপর তাকে জড়িয়ে ধরে হঠাৎ কেঁদে ফেলে। একেবারে হাউহাউ করে কান্না। শংকরও তাকে ধরে বোকা-বোকা মুখে এবং ছলছল চোখে বলতে লাগল, 'অ্যাই-অ্যাই জন্যই তো আসি ...আরে...আরে এই রাঙাদি।’ 

মহিলা অল্পসময়ের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘একলা আসছো? রানিরে আর পোলাপান্‌রে আনো নাই ?’ 

আমরা দুজনই এসেছিলাম। সুতরাং, শংকরকে একপ্রস্থ গলাগাল খেতে হয়। যে-কারণে শংকরের এখনও এদেশের সঙ্গে যোগাযোগ, সে হলো তার স্ত্রী রানি। রানির মা ও ভাইয়েরা এখনও এদেশেরই বাসিন্দা; শেষপর্যন্ত এদেশেই থেকে যাওয়ার ইচ্ছা তাদের। 

শংকর বলে, ‘সামনের পূজার সময় আসুম ওদের নিয়া। শুনছি রানির মায়ের শরীর ভালো যাইতে আছে না। আর বয়সও তো হইছে।’ 

রাঙাদি বলল, “হ,তাইলেই খালাস,তারপর তো এ দ্যাশে না আসলেই চলবে।' 

শংকর হেসে বলল, ‘ব্যাস আরম্ভ হইল ঝগড়া।’ 

প্রাথমিক উচ্ছ্বাস শেষ হলে আমরা দাওয়ায় বসলাম। কাকেরা তাদের খাওয়া শেষ করে উড়ে চলে গেছে। দ্বিতীয় বৃদ্ধকে শংকর মানিকভাই বলে ডাকছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম সম্পর্কটা তার স্ত্রীর সূত্র ধরে। গম্ভীর লোকটির মুখের চেহারা একটু বিরক্ত যেন। শংকর কিছু একটা কথা তোলার উদ্দেশ্যে বলল, ‘বলেন, মানিক ভাই, আপনাগো কাউয়াগ্যো খবর কী।' 

মানিক জানালেন, এখনও তিনিই ‘ফার্স্ট'। তার দখলে এখনও সাড়ে তিনশো কাক এবং তার প্রতিপক্ষের দখলে শ'খানেকের বেশি হবে না। 

দাসমশায় সরোষে বললেন, 'অর কথা বিশ্বাস করিস না শংকর। এক নম্বরের মিথ্যুক। আর ওর কাউয়াগুলাও নিপিত্‌ইয়া কাউয়া। এই উঠানের চাউল খাইয়া ওই উঠনে গিয়, মুসলমানের ভাত খায়।‘ 

মানিক বললেন, ‘ঠিক ওরই মতো খাইবে হাগবে এই দ্যাশে, আর মন পইড়্যা থাকে ওই দ্যাশে। গেছিলো তো কইলকাতায় ভাইগনাদের কাছে, খাওয়ায় নাই হ্যারা! দ্যায় নাই থাকার জায়গা।’ 

পরে শংকর বলেছিল, আশ্চর্য দুই বৃদ্ধ। শিশু বয়স থেকে দুজনে একত্রে। যত মিল তত ঝগড়া। এখন এই বয়সে ঝগড়ার যখন কোনো বিষয় থাকেই না, এই বিচিত্র মেকি বিষয় তারা তৈরি করে নিয়েছে খেলার ছলে। কিন্তু খেলার আইন তারা কেউ ভাঙে না। দুজনেই প্রবল ঐকান্তিক গম্ভীর। কাক নিয়ে রেষারেষি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কার উঠানে কাক যায় বেশি, এই হল হার-জিতের বিষয়, অহংকার। 

দাসমশায়ের আরও বক্তব্য, তিনি তো আর মুসলমানের মতো সারা বাড়িতে ভাত ছড়াতে পারেন না। তার তো একটা ধর্মাধর্ম আছে। আর “ভাত ছড়াইলে তো কাউয়া বেশিই যাইবেই।” 

সুযোগ পেয়ে আমি বলেছিলাম, ‘ওই কাকেদের মধ্যেও হিন্দু-মুসলমান আছে নাকি, দাসমশায়?" 

দাসমশায় আমার দিকে তাকিয়ে মুখখানা বিচিত্র রকমের গম্ভীর করে বলল, ‘থাকতে পারে, আশ্চর্য কী! না-হলে ঔইরকম নৃশংস মারামারি করে ? কাউয়াদের মারামারি তুমি দ্যাখছ ? একেবারে একে অন্যকে শ্যাষ কই্র্যা ফ্যালতে চায়। হিন্দু-মুসলমান না থাকলে এই রকম হয়?’ 

তার মুখভঙ্গিতে আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ল। কিন্তু কথা শুনে কেমন বিচলিত ‘হলাম মনের মধ্যে।’ 

আড়ালে শংকর বলল,’এর আগেরবার যখন এসেছিলাম দাসমশায়ের তখন মন উঠে গেছে এদেশ থেকে। আমায় বললেন, কলকাতায় বাগুইআটির দিকে কোথায় নাকি ভাগ্নেরা থাকে। তাদের কাছে গিয়ে উঠবেন। আমি না-ই করেছিলাম। শুনলেন না, কোথাও একটা আঘাত পেয়েছিলেন বড়রকমের মনে হয়।’ 

শংকর এখানে তার পুরো মানানসই পরিবেশ এবং মেজাজে। এক গোছা জাল কোথেকে টেনে বের করে বাচ্চাটাকে বলল, ‘চল মন্‌সুইরা, পিছারার পুষ্কর্নিতে জাল খেওয়াইয়া আসি।’ 

আমি এতক্ষণে খানিকটা ধাতস্থ হয়েছি, পুরো ব্যাপারটা না-হলেও, বেশ কিছুটা আন্দাজ করেছি। একই ভিটের দুইদিকে দুই বাড়ি। দাসমশায় অকৃতদার। এদের সঙ্গেই তার সারাজীবনের সম্পর্ক। শরিকেরা দেশভাগ হতে-না-হতে ওপারে সরে পড়েছিল। তিনি যাননি। হালে কোনোও গভীর কারণে কলকাতায় ভাগ্নেদের সংসারে গিয়ে পড়ে সম্মান খুইয়ে ফের ফেরত এসেছেন। অন্যদিকে, মানিক মিয়ার সংসারে তার স্ত্রী, তিন পুত্র এবং চারটি নাতি-নাতনি। বড়ছেলে তার দুই সন্তান এবং স্ত্রী নিয়ে বরিশাল শহরে থাকে। সেখানে সে চাকরি করে। ছোটছেলে বি.এ. পাশ করে ঢাকায় একটা কিছু করবার চেষ্টায় আছে। মেজছেলে, মনসুর এবং বেবির বাপ, জাহেদ গ্রামেই থাকে। জাহেদ তার স্ত্রী, সন্তান  নিয়ে পৃথগ্নন।। মানিক মিয়া এবং রাঙাদির সংসদে দাসমশায় তৃতীয় ব্যক্তি। 

এই সম্পর্কের বৃত্তে আমার ভাই শংকরেরও অবদান আজে। দাসমশায়ের বন্ধু হিসাবে মানিক মিয়া তার পিতৃব্যস্থানীয়, আবার তার স্ত্রী জামিলা তার রাঙাদি। কেননা জামিলার ভাই নাসির তার সহপাঠী ছিল। আমাদের বাবার জমিজমার রোজগার পাকিস্তানি আমলেবন্ধ হয়ে গেলে সংসারে বিপর্যয় নেমে আসে। গ্রাম থেকে পাঁচ মাইল দূরে বন্দরের স্কুলে ভর্তি হয় শংকর, কেননা হিন্দুপ্রধান গ্রামে স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই সুবাদে দাসমশায়ের আশ্রয়ে থাকা। নাসিরের সঙ্গে কার্যত সেও রাঙাদিরই আশ্রয়, কেননা দাসমশায় নিজেই তখন আশ্রিত। শংকর জামিলাকে ডাকে রাঙাদি। এক আশ্চর্য স্নেহ, প্রীতি ও বন্ধুত্ব তাদের মধ্যে। লাগেজ খুলে শংকর একের পর এক এদেশে দুষ্প্রাপ্য সামগ্রী বার করে, যা সে বর্ডারে অসম্ভব ধূর্ততা, মিথ্যে কথা এবং ঘুষের বিনিময়ে বহুকষ্টে নিয়ে আসতে পেরেছে। মনসুরের চকচকে চোখের সামনে এক এক করে সে বার করে সেসব।। 

'এইখান তোমার নান্নুর জন্য, এইখান তোমার আম্মুর, আর তোমার বাফে কই। হে হালার পো হালারে তো এখন পর্যন্ত দ্যাখলামই না। আর এই পিরাউনগা তোমার। গায়ে দ্যাও দেহি মনা। এইখান তোমার বাফের পাঞ্জাবি।’ 

শাল, শাড়ি, জামাকাপড় এইসব নিয়ে আসে শংকর। যত ইচ্ছা, সাধ্য তত নয়। আবার বর্ডারে সব কেড়েকুড়ে রাখতে চায়। 

নাশতাপানি হতে-হতে বেলা এগারোটা। তখন নভেম্বরের আকাশে ছাড়াছাড়া কিছু সন্দেহজনক মেঘ কোথা থেকে এসে জড়ো হতে শুরু করেছে। সেদিকে তাকিয়ে দাসমশয় মুখের একটা বিচিত্র ভঙ্গি করলেন। তার উদ্দেশ্য ছিলাম আমি। কিন্তু যে কথাটা বলবেন তার লক্ষ্য অন্যত্র। বললেন, ‘আসমান আর মুসলমান—এক্কেবারে বিশ্বাস নাই--'বলে মানিক মিয়ার দিকে একটা চোরা চাউনি ছুড়লেন।। 

আমি হেসে উঠলাম। শৈশবের গুরুজনেরা সামনে নেই। কাজেই বেশ উচ্চস্বরে হাসলাম। মানিক ভাইয়ের স্টকে কোনো তৈরি উত্তর ছিল না বোধহয়। তাই পুরোনো একটা খোঁচা নিয়ে একেবারে তড়বড় করে উঠলেন। বললেন, নাই তো নাই। গেছিলি তো হিন্দুগো কাছে, হিন্দুরা তোরে রাখল না? হালার বেইমান!’ 

আমি বললাম, 'দাসমশায়, মানিকভাই তো ঠিকই বলেছেন। গেলেনই যখন, ফের ফিরে এলেন কেন ?’ 

দাসমশায় একটু গম্ভীর হলেন। বললেন, ‘আরে তোমাগো হিন্দুস্থানে তো ব্যাবাক মুসলমান। সেখানে তো দেখলাম হিন্দুগুলাও মুসলমান হইয়া গ্যাছে।‘ 

একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললাম, কীরকম?’ 

দাসমশায় যা বললেন তার সারমর্ম এইরকম : দাসমশায়ের ধারণা হয়েছে হিন্দুস্থানের হিন্দুরা আর আগের মতো হিন্দু নেই। মানিক মিয়া যেমন সারাজীবন তার সঙ্গে একত্রে থেকেও পরামর্শ নেওয়ার বেলায় অন্য কোনো মুসলমান মুরুব্বির কাছে যাবে, ইদানীং হিন্দুরাও সেরকমই হয়েছে। হিন্দুস্থানে নাকি হিন্দুদেরও মক্কার মতো একটা তীর্থস্থান হয়েছে। তারা সব এককাট্টা। আচ্ছা আমি কি কোনোদিন হিন্দুদের এককাট্টা হওয়ার কথা শুনেছি? এতকাল হিন্দুরা দলাদলি করে বেঁচেবর্তে থাকল। কেউ তুলসীগাছে, কে মনসাগছে, বট অশ্বথের তলায় তারা ধর্মকর্ম করছে। এখন তারা সর্বত্র একটা করে আখড়া বানাচ্ছে। 

সেখানে ঢাকঢোল বাজিয়ে একত্রে ত্রিশুল নিয়ে নাচে, সবাই মিলে একরকম পূজা অর্চনা করে, সেইসঙ্গে এরা ভোটেও নানাভাবে অংশগ্রহণ করে! কী ভয়ংকর কথা! হিন্দুরা এককাট্টা হয়ে ধর্মকর্ম করে! এর থেকে অধর্মের আর কি আছে? এইসব বলে উদ্ভ্রান্তের মতো 

নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন তিনি। 

দাসমশায়ের কথাটা ভাববার মতো। আমি জানি আমার থেকেও এ ব্যাপারে শংকর বেশি বিব্রত। সে যে রাঙাদির আশ্রয়ে মানুষ হয়েছে। সে আর নাসির এক থালা থেকে ভাত খেয়েছে। যে কারণে সে বারবার ঘুরে-ফিরে আসে এই দেশের জল, হাওয়া আর মাটির স্পর্শ নিতে, এই বয়সেও। 

শংকর এতক্ষণ রান্নাঘরে রাঙাদির সঙ্গে নীচুস্বরে কী সব আলাপ করছিল। উঠে এসে বলল, ‘দাসমশায়ের সব কথা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। ভাগ্নেদের দুর্ব্যবহারে, না অন্য কোনো কারণে ওদেশ থেকে ফিরে এসেছেন, তার হদিশ জানলে একমাত্র রাঙাদিই জানে। আমি গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে আসানসোল থেকে ফিরে রানির কাছে শুনলাম, দাসমশায় এসেছিলেন। বললেন, ‘কিছু টাকা দাও তো, বাড়ি যাব।’ টাকা নিয়ে ওখান থেকেই 

সোজা চলে এসেছেন, ভাগ্নেদের সঙ্গে আর দেখা করতেও যাননি। তার আগেই রাঙাদির চিঠি পেয়েছিলাম—মানিকভাই শয্যাশায়ী। চিঠি নিশ্চয়ই দাসমশায়ও পেয়েছিলেন।’ 

খানিক পরে জাহেদ আসে। তার হাতে একখানা বৈঠা। বোঝা যায় সে সোজা নদী একে উঠে এসেছে নৌকা রেখে। বৈঠাখানা একপাশে রেখে সে একটু হেসে শংকরের কাছে গিয়ে বলল, ‘মামায় কখন আসছেন?’ 

শংকর তার হাবভাব লক্ষ্য করছিল। তাতে একধরনের ক্রোধ ও হতাশা মেশানো ছিল। সে কারণে আমি লক্ষ্য করছিলাম শংকরকে। 

জাহেদের মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। মুখমণ্ডলে গোঁফ চাঁছা দাড়ি। লুঙ্গির উপরে ই কাটের লম্বায় হাঁটুর নীচ পর্যন্ত ঝুল পাঞ্জাবি। একটা বিশেষ প্রবণতা তার সর্বাঙ্গে। 

শংকর একটু চেষ্টা করে স্বাভাবিক হয়ে নিজের ডান-পা খানা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘লাথি দ্যাখছ, হারামজাদা?' 

জাহেদ নিরাসক্ত গলায় একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, ‘মামায় আগের মতোই আছেন।’ শংকর বলল, 'আছি, তোমার মতো মুছুল্লি হই নাই।' 

আমার তখন মনে হল, এই দুজনের মধ্যে একটা কিসের যেন সংঘর্ষ হচ্ছে। মনে পড়ল, কাল রাতে শংকরের সঙ্গে তার ভায়রার যে সমস্ত খবর আদান-প্রদান হচ্ছিল, তার মধ্যে 

এই জাহেদই ছিল প্রধান। জাহেদ সম্প্রতি একটা বিশেষ ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনে যোগ দিয়েছে ,যা এরা কেউ পছন্দ করছে না। জেলাগুলোতে ভোট সামনেই। ক্ষমতা দখল ছাড়া বেঁচে থাকা খুবই মুশকিল এই গ্রামাঞ্চলে। এখানে কে কোন পার্টি করে সেটা বড় কথা নয়। ভোটে যে জিতবে কেন্দ্রীয় শাসকদলের ক্ষমতার অংশীদার সে-ই। কাল রাতের আলোচনা কানে যাওয়াতে বুঝেছিলাম যে এ বাড়ির শিক্ষা এবং ঐতিহ্যে অন্য কিছু ছিল। জাহেদ সেখানে আঘাত করেছে। 

শংকর বলল, 'তা তুই হঠাৎ মোল্লাগো দলে গিয়া ভিড়লি, কারণটা কি?’ 

আমি প্রতিমুহূর্তে বুঝতে পারছিলাম, শংকর শুধু এ বাড়ির আশ্রিতই নয়, অনেকখানি কর্তৃত্বেও ছিল। তাছাড়া তার আত্মবিশ্বাসও ছিল প্রবল। সে তার ভায়রাকে বলেছিল, “যাঃ, পাগল নাকি? আচ্ছা আমি জাহেদের সঙ্গে কথা বলব। 

এখন জাহেদের চোখেমুখে অস্বস্তি। 

সে বলল, ‘ছাড়েন তো ওসব কথা। খবর বলেন। মামী ভালো আছে? পোলাপান ? একলা আসছেন? এ মুরুব্বিরে তো চেনলাম না?' 

শংকর কোনো জবাব দিল না। খানিকক্ষণ তীব্রদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আমি আর নাসির তোর গুয়ামুতা কাথাও ধুইছি, হে খেয়াল রাখো ?’ 

শংকর স্পষ্টতই হেরে যাচ্ছে। আমি দেখলাম তার অহংকার ভেঙে যাচ্ছে, তাই তার শেষ আবেদনটি মর্মান্তিক। জাহেদ বিরক্ত হয়ে উঠে চলে গেল। 

রাঙাদি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ‘তোরে কইছিলাম না ওর লগে কথা কইয়া লাভ নাই?’ 

শংকর বলল, 'জাহেদের এইরকম পরিবর্তন--' বাধা দিয়ে রাঙাদি বলল, ‘জাহেদ না, জাহেদ না, ছাহেদ। জাহেদ কইয়া ডাকলে এখন আর সাড়া দেয় না।’ 

আমি জ’ এবং স’ এর বদলে ‘ছ’-অর মাহাত্ম্য বুঝতে শিখেছিলাম। 

শংকর বলল, 'ভাল্লাগতেছে না, আইজ আমি যাই। ফেরার আগে না হয়--। সেজদারে একবার নিজেদের বাড়ি দেখাইয়া আনতে হবে।' 

অন্য দাওয়া থেকে দুই বৃদ্ধ এবং এই দাওয়া থেকে রাঙাদি একসঙ্গে আঁতকে উঠল। বলল, ‘এর মানেডা কী? তুই কি পাগল হইছ? ও এ বাড়ির কেডা? তুই বাড়ি আসছ আর রাত্রিবাস না করইয়া চইল্যা যাবি!’ 

গাছপালার ফাঁক দিয়ে সুগন্ধার একটি ফালি এখান থেকেও দেখা যায়। সেদিকে তাকিয়ে শংকর বলল, 'ভাল্লাগতেছেনা রাঙাদি। জাহেদইয়ারে না আমি ঠ্যাঙের উপর বসাইয়া হাগাইছিও।’ 

যাওয়া হল না। রাত্রিবাসের প্রস্তুতি নিয়ে আমরা আশপাশ ঘুরে দেখতে বেরোলাম। শংকর এখানে ঘরের ছেলের মতোই। সবাই তাকে চেনে, সবাই তার কুশল জানতে চায়। নদীর ধার ধরে আমরা মাইলখানেক হেঁটে গ্রামের শেষপ্রান্তে এলাম। সুগন্ধা এখানে বেঁকেছে। এ-পাড়টা উঁচু। একটা নারকেল গাছের বন যেন। ওপারে বাঁকের কোন ধরে বিস্তীর্ণ নাবাল জমি জলমগ্ন। সেদিকে আঙুল দেখিয়ে শংকর বলল, ‘সোনদার হাওর। না হোক পনেরো-বিশ মাইল জায়গা জুড়ে জলাভূমি এবং আগাছার জঙ্গল। বর্ষার সময়ে দুর্ভেদ্য। একাত্তরের গণহত্যার সময়ে এরা সবাই এই হাওরে লুকিয়ে থেকেছে। রানিরাও ছিল ওদের সঙ্গে মাসের পর মাস।' 

আমি আমার জন্মভূমির রূপ দেখছিলাম প্রকৃতিতে। গ্রাম তো লক্ষ্মীছাড়া, শহর ময়ূরপুচ্ছধারী, বনগাঁ থেকে এ পর্যন্ত আসার সারাদিনের অভিজ্ঞতায় তা বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু প্রকৃতি এখনও বিস্ময়করভাবে আদিম। বিশাল, ব্যাপ্ত নদী, বিল আর মাঠ। মানুষের অহংকারকে একেবারে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো সেই বিশালতা। আকাশে ছাড়া-ছাড়া সন্দেহজনক মেঘ আরও বেড়েছে। হাওয়ার গতিও নভেম্বরের তুলনায় একটু বেশি। আমার কেন জানি হঠাৎ দাসমশায়ের উপমাটা মনে পড়ল। 

সন্ধ্যার পর আকাশের চেহারা আরও খারাপ হয়ে গেল এবং জোরালো হাওয়ার সঙ্গে  ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হল। আমার স্মৃতিতে শৈশবের ঝড়ের অভিজ্ঞতা ফিঁকে হয়ে গেলেও ইদানীংকার টেলিভিশনে দেখা ভয়াবহতা জোরালো। শংকর অবশ্য আমাকে অভয় দিয়ে বলল, 'না, নভেম্বরে তেমন কিছু আর হবে না।‘ 

শুনে দাসমশায় আরেকবার বিড়বিড় করে উঠলেন, ‘আসমান আর মুসলমান—’। 

কাশির চাল উঠতে কথাটা আর শেষ করতে পারলেন না তিনি। অনেকক্ষণ ধরে হাঁপানির কাশি তাকে বিধ্বস্ত করতে লাগল। রাঙাদি বলল, ‘সন্ধ্যা হইলেই বাড়ে, হের লাইগ্যা ওই বাড়িতে আর শুইতে দিই না।’ 

মানিক মিয়া রাত হলে চোখে কিছুই দেখেন না। রাঙাদি তাকে হাত ধরে বিছানায় এনে বসিয়ে একটা ডাবর খাটের নীচে রেখে গেল। কাঠের ফ্রেমের উপর টিনের বেড়া, চালা এবং মেঝে-পাকা-বাড়িটার অন্য একটি অংশে আমার আর শংকরের শয্যা। খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা যখন ঘরে এলাম কনকনে হাওয়ার বেগ তখন পুরোপুরি ঝড়ের চেহারা রয়েছে। দুরের হাওরের দিক থেকে কান্নার মতো আওয়াজ করে হাওয়া ছুটে আসছে। বিছানায় ঢুকে আমি ঘুমোবার চেষ্টা করতে লাগলাম আর ঘরের অন্যপাশে একটা। তক্তপোশের ওপর বসে শংকর আর রাঙাদি তাদের স্মৃতিতর্পন করতে থাকে। বিছানার লেপ অপেক্ষা সান্নিধ্য তাদের কাছে বেশি উষ্ণ ছিল বোধহয়। কেননা তাদের আলাপের ভঙ্গিতে কথার থেকে সান্নিধ্যের আকাঙক্ষাই ছিল বেশি। আমি মাঝে মাঝে তাদের টুকরো কথা শুনছিলাম, আবার মাঝে-মাঝে দীর্ঘ সময়ের বিরতি। কেউ একজন খুন হয়েছে, সে নাসিরের খুব অন্তরঙ্গ ছিল। সেই খুনের পিছনে জাহেদের হাত আছে, এরকম একটা কথা খুব নীচুস্বরে আলোচনা করলেও আমার কান এড়ায় না। সকাল থেকে এ-বাড়িতে শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো নাসিরের নাম শুনে আসছি আমি। কিন্তু তাকে দেখতে পাইনি এখনও পর্যন্ত। সে অন্যত্র কোথাও থাকে কিনা, তাও শুনিনি। ওপাশের ঘর থেকে দাসমশায়ের কাশির দমক আবার শুরু হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই বিপর্যয়ের সীমায় চলে গেল। রাঙাদি উঠে শংকরকে কিছু বলে বাইরে গেল। হাওয়ার কান্না শুনতে-শুনতে আমি তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার তন্দ্রা ভেঙে গেল। বন্ধ ঘরে শংকরের সিগারেটের কড়া গন্ধকে ছাপিয়ে একটা বোটকা গন্ধ বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। রাঙাদি অস্ফুটে গলল, ‘গুঠইয়ার ত্যাল, বুকে মালিশ করলে একটু য্যান স্থির হয়।’ আবার সব চুপচাপ। বেশ কিছু সময়। তারপর তন্দ্রার মধ্যেও শংকরের গলা আমি অস্পষ্ট শুনলাম। তার সঙ্গে রাঙাদির গলাও। 

‘তুই দাসমশায়রে আসতে লিখছিলি?' 

‘না, সে নিজেই আসছে।’ 

‘রাঙাদি একটা সত্য কথা কবি আমার কাছে?’ 

‘কী কথা? 

‘কবি, ক?’' 

‘জানি না যাঃ।’ 

‘নাসিরের কিড়া, সত্য কবি?' 

‘শংকর!’ 

‘জাহেদের বাপ কে রাঙাদি?' 

‘হা-আল্লা, তুই কি পাগল হইছ?’ 

‘তুই কি ভাবতি আমি আর নাসির চোখে ঠুলি দিয়া থাকি?’ 

তারা ভেবেছিল আমি ঘুমন্ত। কিন্তু এরকম সংলাপ শুনলে কোন মানুষটা ঘুমিয়ে থাকতে পারে? শংকরের শেষ কথার উত্তরে রাঙাদি চুপ করে থাকে। শেষে বলে, একথা জাইন্যা তুই করবি কী?’ 

শংকর বলল, ‘আমার একটা হিসাব মিলাব।‘ 

রাঙাদির কণ্ঠস্বর তখন অশরীরীর মতো শোনায়। সে বলল, ‘পাগল, কারু কোনো হিসাব মেলে না, কোনোদিন মেলেও নাই। তার থিকা তুই একটা গল্প শোন। গৌরদা আর নিতাই দাসের গল্প। আগে কোনোদিন শুনছিলি?’ 

শংকর বলল, ‘না।’ 

রাঙাদি বলল, 'তবে শোন। গৌর দাস আর নিতাই দাস আছিল দুই ভাই। নিতাই দাস একদিন সোনদার হাওরে মাছ ধরতে গেল। মাছ ধরতে খুব ওস্তাদ আছিল মানুষটা। তো ডুব দিয়া ধরছে একটা কাছিম। হেই কাছিম দুইহাত দিয়া জলের উপর তোলাতে দ্যাখে কাছিম না, একটা মরার মাথার খুলি! নিতাই দাস অবাক। জলের নীচে হাতের মধ্যে না খলবল কইয়া উঠল। নিতাই দাস দুইহাতে খুলি ধইয়া চাইয়া আছে। তখন খুলির মুখের ফুটা দিয়া “আল্লা-আল্লা” আওয়াজ বাইর হইতে আরম্ভ হইল! কি তাজ্জব!’ 

রাঙাদি একটু চুপ করে বসে থেকে আবার বলল, ‘এই তুই যেখানে বইয়া আছ, এই হইল নিতাই দাসের ঘর, আর ওই যেটা এখন দাসমশায়ের ঘর, ওটা হইল গৌর দাসের। বেশিদিনের কথা তো না, একই গুষ্টির চাইর-পাঁচ পুরুষ আগের কথা। পাগল তুই, শংকরইয়া, তুই অ্যাক্কেরে পাগল। ঘুমা তুই, আমি যাই।' 

অন্ধকারের মধ্যে বসে শংকর একটার পর একটা সিগারেট খায়। আমি বুঝতে পারছিলাম না জাহেদের পরিবর্তন তাকে কেন এত বিচলিত করছে। আমি একটু গলা খাকার দিলাম। শংকর বলল, ‘ঘুমোসনি তুই?'। 

‘হা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, আমি বললাম। 

সে বলল, 'মানুষের সম্পর্কের কোনো টাইপ নেই, প্রত্যেকটি সম্পর্কই বোধহয় স্বতন্ত্র। বিধান শুধু বিধানই। কিন্তু আমি কেন মিল খুঁজি? এমন নিটোল মিল? দাসমশায়ের মতো এমন উদার হৃদয়বান পুরুষ, রাঙাদির মতো এমন মহিলা, নাঃ।’ 

সে বলল, 'আমার সন্দেহ ছিল জাহেদের পিতৃত্ব নিয়ে। আজ সেই সন্দেহ নিরসন হল। ব্যাপারটা যেন আমারও আকাঙিক্ষত ছিল। কিরকম সব গোলমেলে না? সেই জাহেদ--- রানির কাছে শুনেছি একাত্তরে ওর এগারো বারো বছর বয়স, রাইফেল নিয়ে—সেই জাহেদ। আর কি চমৎকার ছেলে—পাঁচ বছর আগেও আমি যখন ওকে দেখি-হাঃ—’। 

ঠিক গুছিয়ে বলতে পারছে না বলেই বোধহয় শংকর থেমে গেল। অনেকক্ষণ পরে কাঁপা কাঁপা গলায় আর্তনাদের মতো বলে ওঠে, 'হায় নাসির-হায়—।’ 

নদীর উপরের কান্নার মত বাতাস তার আর্তকণ্ঠকে বয়ে নিয়ে গেল। অনেকদূরে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিন্তু নাসির কোথায় ?’ 

শংকর বলল, ‘নেই। ওই হাওরের ওখানে আরও পঁয়ত্রিশ জনের সঙ্গে তাকে পাকিস্তানীরা একাত্তরে গুলি করে নদীতে ফেলেছে। সে এ অঞ্চলের প্রতিরোধ বাহিনীর প্রধান ছিল। সেই পঁয়ত্রিশ জনের মধ্যে রানির ভাই সুজনও ছিল। আমি আর কোনো কথা বললাম না। বাতাসের শব্দ ক্রমে উচ্চগ্রামে উঠেছে। তার সঙ্গে বৃষ্টি শুরু হয়েছে জোরে। হাওরের দিক থেকে অশরীরী কান্নার মতো বাতাস ধেয়ে আসছে। আর তার সঙ্গে ঝড়ে শাখাচ্যূত কোনো পাখি “আ-হা-হাহা’ করে বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠল। ঝড়ের বড় কোনো একটা ঝাপটায় একসঙ্গে অনেকগুলো কাক কাছের কোনো গাছের আশ্রয় হারিয়ে ছড়িয়ে পড়ল। ভারী বিপন্ন তাদের কণ্ঠস্বর। তারা দাসমশায়ের কাক, না, মানিক ভাইয়ের, একরাশ হিসেবের প্রশ্ন আমার মগজে জুড়ে বসে বাকি রাতের ঘুমটুকু কেড়ে নিল। 



হেমন্ত, ১৩৯৯

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন