সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

শ্রাবণী দাশগুপ্তের গল্প: খোলস

ট্যাক্সি মোড় ঘুরতে শিবনাথের বিরক্তি লাগল। গলিঘুঁজি ঘুপচি। যতই ছাদে জলের ট্যাঙ্ক আর প্রতি বাড়িতে গ্যাস আভেন থাকুক, বাকি অবস্থান অবিচল। টাইমের জল উপচে ফুটপাথ ভেসে যায়, অপচয় এরাজ্যেই সম্ভব। কোনো কানাচে তোলা উনুনের ধোঁয়া ওঠে।


সঙ্ঘশ্রীর মনে হয় পুজোতে আগের মতো ভীড় হয়না।
হকার্স কর্নার-এর ভেতর দিয়ে শর্টকাট গলি ঘুরে ট্যাক্সি ঢুকল। ফুটপাথের বর্ডারে প্রকাণ্ড রাজপথ উন্নয়নের পরাকাষ্ঠা। বুক চিরে এখনো শখের ট্রাম, বাঁদিকে মোড় - রাসবিহারী এভেন্যু। চুয়াল্লিশ বছর আগে স্কুল থেকে ফিরে বাবা মারা যাওয়ার খবরে দশ বছরের শিবনাথ পালিয়ে দেশপ্রিয় পার্কের বেঞ্চে বসেছিল। 

প্রায় বিশবছর সে রাজ্য ছাড়া।

তবু সলিলা যতদিন আছে, কলকাতায় আসতে হয় বছরে পাঁচসাত দিনের জন্যে। গেলবারে ফেরার মাসদুই পর থেকে সলিলা যাওয়ার জন্যে পীড়াপীড়ি আরম্ভ করেছে।

-এদিক্কার অবস্থা দেখে গেলি কিনা! বড়ো ছেলে, দায়িত্ব নেবার ভয়েপালিয়ে বসে আছে দেখ বৌ’র চাকর।

-আজেবাজে বকছ কেন? দায়িত্বপালন তো হচ্ছেই। যাচ্ছি, মাসে মাসে টাকা পাঠাচ্ছি। আর কত? সমুকে বলো, বাবলিকে ডাকো। কাছে থাকে,দেখাশোনা করুক। কবেই বলেছিলাম, আমার কাছে চলো বাড়ি-ফাড়ি বেচে। তুমি নড়বে না। প্রাইম লোকেশনের বাড়ি, লুফে নিত লোকে।টাকাও আসত হাতে।

-মাথা গরম করাস না শিবু। বাড়ি বিক্কিরি! শ্বশুরের ভিটে। তবু যাবনা বলেছিলাম কি তাই? হরবাবুকে নেবার পস্তাব তুললাম, ঘাড় শক্ত করে রইলি। দুজন নিতে পারব না! কেন? তোদের জন্যে সে এত করেছে! ওরে আমি কেওড়াতলাতে চিতেয় উঠব। মুখে আগুন দিতে আসতে হবেনা তোকে। অবশ্যি দেরি আছে। কবে তোর বাপ মরেছে, একটা ঘণ্টা জ্বালায়নি। ইদানি এ লোকটার হাগা-মোতা পরিষ্কার করতে করতে... ।

-খাটনি হচ্ছে তা আয়া রেখে নাও। আমি গিয়ে কোন্‌ উপকার হবে?

-আয়ার খাঁই জানিস?


-এত ছুটি পাওয়া যায় না!

-বলে বিলেত-আমেরিকার লোকও ছুটি পায়, তুই কোন্‌ লাট রে?

শিবনাথ ফোন কেটে দিয়েছিল। মুখে এসেছিল,

আমার জন্যে লোকটা কিচ্ছু করেনি। যা ঘটছে, বেশ হয়েছে। প্রশ্রয় দিয়েছ, নষ্টামি করেছ, আমাদের কথা ভাবোনি। এখন ভুগতে হচ্ছে, ভোগো—।

গলার মধ্যে টকটক লাগে মায়ের কথাবার্তা শুনলে। মুখ বুজে থাকে, পাছে চটাচটির তোড়ে কাদাজল বমির মতো কদর্য সত্যিকথা মুখ থেকেবেরিয়ে যায়।

বাবার অকালমৃত্যুতে নিঃসন্তান ফুলপিসি-পিসে যাতায়াত আরম্ভ করল। বছরখানেকের ভেতরে পাকাপাকি শেকড় গাঁথল তাদের চারজনের সংসারে। আড়াইখানা ঘরের সঙ্গে একটু ভাঁড়ারঘর। ফুলপিসি অসুস্থ, ঝিমন্ত। সলিলা তখন ত্রিশ-বত্রিশের আঁটসাঁট বিধবা। বয়ঃসন্ধির শিবনাথ আবছায়া আবডালে বহুবার পিসেমশাই আর মায়ের ঘেঁষাঘেঁষি দেখে ফেলেছিল। মাথায় খুন চেপে যেত। তিনবছরের মধ্যে ফুলপিসিও গেল। লাগামছাড়া অবস্থা। দখলদারি নিয়ে বসল হরেনবাবু। চতুর্দিকে ঘেঁষাঘেঁষি বাড়ি। প্রতিবেশীরা গালাগাল দিত। বাবার জন্যে খানিক মায়া হত শিবনাথের। শান্ত ভালোমানুষ, মোটামুটি আয় ছিল। সলিলাআজও সেই বিধবা-পেনশন পাচ্ছে।

**

অনুশ্রীই পরামর্শ দিয়েছিল,

-যাও দেখে এসো।

করুণা হয়েছিল। বেশ অসুবিধে করে সাতদিনের ছুটি ম্যানেজ করে এলশিবনাথ। রোগের সূত্রপাত বছরখানেক আগে। উপসর্গগুলো সে দেখেগিয়েছিল। তখনই বেশ টালমাটাল। থম ধরে থাকছে, আপনমনেবিড়বিড় করছে। চিনতে ভুল হচ্ছে, মনে রাখতে পারছে না। সময় গণ্ডগোল করে ফেলছে। ডাক্তার বলেছিল,

-ডেমেনশিয়া, ক্রমশঃ বাড়বে।

তার অতশত ধারণা নেই। গত পাঁচ-ছ’ মাসে অসুস্থতা কোন্‌ পর্যায়ে পৌঁছেছে, আন্দাজ করতে পারেনি। বাইরের ছোটো উঠোন পেরিয়ে সামনের ঘরের দরজা - খোলা। ছোটভাই সোমনাথ বসেছিল। কাছে কোথাও তার বাসা, শিবনাথকে কখনো যেতে বলেনি। না দেখার ভান করে তাড়াতাড়ি উঠে বেরিয়ে গেল। সে আপ্যায়নের আশা করেনি, ভেবেছিল পরিস্থিতির আগাম খবর নেবে। ঘরে বসে রইল পাঁচসাত মিনিট। বাড়িখানার দশা দেখে অস্বস্তি হচ্ছে। সকালেও লাইট জ্বালানো।জীর্ণ, ভাঙাচোরা। মাসখানিক একনাগাড়ে থাকলে অবধারিত ডিপ্রেশন। অথচ এই পরিবেশে পঁয়ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত কাটিয়েছে! পায়ে পায়ে ভেতরে ঢুকে যায়। বারান্দার শেষ মুড়োতে চলটা-খসা ঝুলকালির আদিম রান্নাঘর। সলিলা ব্রহ্মতালুতে ঝুঁটি বেঁধে বসে রান্না করছে। গ্যাসের আভেন মাটিতে। থলথলে শরীরে ময়লা শাড়িপ্যাঁচানো। ভ্যাপসানো দুর্গন্ধ বাড়িময় পাক খাচ্ছে। গলা ঝেড়ে সে ডাক দেয়,

-মা!

-অ, এসেছ! উদ্ধার করেছ। আজ রাঁধুনিটা আসেনি, ছিষ্টির পিণ্ডি রাঁধছি।

-হুঁ, খবর কি?

-মরিনি দেখতে পাচ্ছ।

-আর ওদিকে?

-দ্যাখগে যা। এক্কেবারে চিনতে পারছে না কারুক্ষে। খালি খাইখাই। খেয়ে বলে খেত্‌দিসনি? মারতে ওঠে না দিলে। ভীমরতি, ভীমরতি। বয়েসের গাছপাথর আছে? যমেও তোলেনা রে— তোর বাপের চেয়ে বয়সে বড়ো।ভাজাভাজা হয়ে গেল হাড়মাস। আমি মরলে পথে ফেলে দিসলোকটাকে। ওরে আর সহ্য হয়না রে।

হাঁউমাউ বিলাপ করছে সলিলা। শিবনাথের বিরক্তির মধ্যে আত্মতুষ্টি,হাসি পেয়ে যাচ্ছে। অনুত্তেজিত স্বরে বলে,

-দেখছি।

-সমুর সঙ্গে দেখা হল? এসছিল একটু আগে।

-নাহ্‌।

-অ, চলে গেছে বোধায়। ও-ই তবু যাহোক দেখাশুনোটা করে। বাবলিতো আসেই না। আর তুইও—।

-কোন্‌ ঘরে থাকে?

-ভাঁড়ারে। দোর টেনে রাখি, খোলা দেখলে বেরিয়ে যাওয়ার ধান্দা। হাঁটার ক্ষ্যামতা নেই, পাছা ঘেঁষ্‌টে বেরিয়ে আসে। তুই মাঝের ঘরে থাকিস’খনে।অবশ্যি ভাঁড়ারের ক’খানা জিনিসপত্তর ওখেনেও রাখতে হয়েছে। ক’দিন ছুটি নিয়ে এসেছিস?

-দেখা যাক।

মাঝের ঘরটা বড়। কবেকার রংচটা কাঠের আসবাবগুলো অনড়। জিনিস ঠুসে ঘরখানা গোডাউন। কোণাতে স্যুটকেস রেখে জামাকাপড় বদলে নিল। আগেকার দিনগুলো মনে পড়ছিল। কলকাতা এলে হরেনবাবু আড়েঠারে কথা শোনাত,

-কী শালার-পো, কত কামাচ্ছ? জেল্লা দিনের দিন বাড়ছে দেখচি!

বলার পরে অদ্ভুত চোখমুখের ভঙ্গি করত। জবাব না দিলে বলত,

-বুড়ি-মা যে খেটে খেটে মরতে বসছে। বড়ো ছেলে তুমি, পয়সা-টয়সা এদিকে ঠেকাও।

গা ঘিনঘিন করত শিবনাথের। ভেবে লাভ নেই, মাথা থেকে চিন্তাগুলোসরানোর চেষ্টা করে। অসুস্থ লোক, মাথা ঠাণ্ডা রেখে কথা বলার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।

নামে ভাঁড়ারঘর, বাতিল আস্তাকুঁড়ের পর্যায়ে। ভাঙাচোরা জিনিস, আরশোলা-ইঁদুরের স্বর্গ। দরজার হুড়কো খুলে উঁকি দিয়ে আঁতকে উঠল। একরত্তি জানালার কপাট খুললে অন্য বাড়ির পাঁচিলে ঠেকে। হাওয়ানিরুদ্ধ ঘরে সরু খালি কাঠের তক্তপোশ, চাদর পর্যন্ত নেই। পুরনো খবরের কাগজ বিছানো। হরেন্দ্র দরজার দিকে পেছন ফিরে বসে আছে। সামনে ঝুঁকে কিছু দেখছে। কশেরুকা জেগে-থাকা কঙ্কালে শুধু চামড়া।কামানো মাথা খুলির মতো দেখাচ্ছে। শিবনাথ আন্দাজ করে, সম্ভবত পা’দুটো জোড়া করে বাঁধা। নাইলনের দড়িতে ঝুলন্ত দু’চারটে ময়লা কাপড়। দেওয়ালে ঠেকানো ভাঁজ-করা ফোল্ডিংখাট। ঘুরপাক খাচ্ছে গুয়ের গন্ধ। বাড়ির ভেতরে এসে প্রথমে এরকম গন্ধ পেয়েছিল। দু’তিন মিনিট দাঁড়িয়ে সে ডাকে,

-পিসে, কেমন আছেন? শুনতে পাচ্ছেন?

হরেন্দ্র শব্দানুসরণে মুখ ফিরিয়ে দরজার দিকে তাকিয়েছে, টালুমালুচোখ। তাকে চিনতে পারেনি। ভ্যাবলামুখে হেসে ডানহাত তুলছে, তিনটে আঙুল জড়ো করা। বিড়বিড় করতে করতে নিজের ঊরুর দিকে ইঙ্গিত করছে। গন্ধের উৎস এবার বুঝেছে শিবনাথ। পায়খানা করে পেটে-পায়ে মাখছে। নাকেমুখে রুমাল চেপে বমি সামলে সে বেরিয়ে আসে। দরজা টেনে হুড়কো আটকে দেয়।

অমানুষ সে নয়, প্রতিশোধের তৃপ্তির জায়গায় করুণা হচ্ছে। কী ভয়াবহ আতুর জীবন! কত বছর কাটবে এরকম অবস্থায়?

**
রাতে খাওয়ার পরে ছাতে বসে সিগারেট ধরিয়েছে শিবনাথ। গতকালই এজেন্টকে ফোন করেছে, ফেরার টিকিট এগিয়ে নেওয়া যায় কিনা। টাকা বরবাদ হলে হবে। অনুশ্রী সচরাচর ফোন করেনা। সে নিজে করল,

-থাকা যাচ্ছে না! চারদিক এমন নোংরা আর গন্ধ। গলা দিয়ে খাবার নামছে না।

-চলে এস তাহলে। তবে পাঁচটাই তো দিন মাত্র।

-আরও পাঁচটা দিন টানতে হবে—। টিকিট বদলাতে যদি পারি দেখছি।

-তেমন হলে বাইরে খেয়ে নিও।

-শুধু খাওয়া তো না, কলতলা, বাথরুম-টাথ্রুমও যা তা অবস্থা। যাবতীয় নোংরা কাচাকাচি — মা’র ঘাড়ে পড়েছে। সত্তরের ওপর বয়স হল মা’র। অথচ আমার করারই বা কি আছে এখানে?

-বুঝতে পারছি।

-যাই হোক, দেখি। রাখলাম।

শিবনাথ ফসফস সিগারেট টানছে। সিদ্ধান্ত নিতে না পারার দোনোমনা অশান্তি দিচ্ছে। চারপাশে শৈশবস্মৃতির টুকরো-টাকরা। দমবন্ধ অসহ্য – নিজের জায়গায় পালাতে পারলে বাঁচে। সিঁড়ি দিয়ে ভারী পায়ের থপথপ আভাস, ছাতে উঠে এসেছে সলিলা।

-কিরে শুতে গেলি না? এগারোটা বাজছে।

-খেয়েছ?

-হ্যাঁ গিলে আসলাম। একটু বসি। ওষুদ খাওয়ানো কী ঝক্কি! ঘাটের মড়া মুখ থেকে থুথু করে ছেটায়। পাগল হয়ে গেছে। হ্যাঁরে পাগলাগারদে দেওয়া যায় না?

আবছায়া বলে কেউ কারো মুখ দেখতে পাচ্ছে না। শিবনাথ অন্যমনস্ক হয়ে আলগা উড়িয়ে দিয়েছে,

-পাগলাগারদ? ডাক্তার কি বলছে?

-বলবে আবার কি? খাওয়ানো যায় না, চান করানো যায় না।

-ওষুধ বদলে দিতে বল। ঘুমের ওষুধ, শান্ত থাকার ওষুধ।

বাড়াবাড়ির সময়ে দিয়েছিল। খেয়ে এমন ঘুম, মরণ ঘুম। সাড়াশব্দ নেই। আমি ভয়ে মরি, এই বুঝি হাতকড়া পড়ল।

সলিলার গলা থেকে খুঁকখুঁক করে একরকম আওয়াজ হচ্ছে। মুদ্রাদোষ। আগেও ছিল, এখন বেড়েছে। বলছে,

-তোর সঙ্গে নিয়ে যাবি?

কাকে— শব্দটা গলার কাছে আটকে নিয়ে উত্তর না দিয়ে শ্বাস চেপে আছে শিবনাথ। যাওয়ার আশা করে? সলিলার স্বরে দুঃখ বাজছে।

-আমার কথাই বলছিলাম। থাগ্‌গে যাঃ, তোর বউয়ের সঙ্গে বনবে না, আগেই বনত না। আর এখানেও যে কী হবে!

-সেও প্রচুর ঝামেলাতে থাকে। অনেক কাজ। মেয়েটার কথা জানো তো।

-আর বুড়িটার অবস্থা দেখতে পাসনা? পারলে ফেলেঝেলে বনবাসে চলে যেতাম। এক্কেবারে সাপের ছুঁচো গেলার দশা!

-কী আর করবে? লোক রেখে নাও। হরবাবুরও জমানো টাকা আছে তো! নমিনি করেনি?

-কপালের দোষ, নমনি-টমনি কে খোঁজ নিয়েছে?

-ওঃ, তবে আর কী!

-আয়ারা পয়সা নিয়েও গু-মুত ঘাঁটতে নাক সেঁটকায়, তার ওপরে পাগল। জবরদস্তি ওষুদ খাওয়াতে গেচি, এমন রদ্দা মারল সেদিন, ঘাড়ে কালসিটে হয়ে গেছে। গায়ে মোষের শক্তি। খালি খাই-খাই। মরতে চলেছে, খ্যাঁটনের লোভ গেলনা শয়তানের! ঘাটের মড়া ঘাঘু সেয়ানা রে একখানা। বছর ঘুরতে এল মেথরানীর মতো গু কাচাচ্চি। ক’বছর টানতে হবে কেষ্টরে! যমেরও অরুচি মিন্সে।

আপনমনে বলেই চলেছে সলিলা। মায়াহীন ভাঙা গলায় অকথ্য গালি দিচ্ছে, কাঁদছে, নাক টানছে। ফোঁৎ করে আঁচলে নাক ঝাড়ছে। ঘিনঘিন করছে শিবনাথের। এত বিতৃষ্ণা হলে সম্পর্কে জড়িয়েছিল কেন?

গুছিয়ে ভাবছিল, সকালে বলবে, অফিসের বড়সাহেব এত্তেলা পাঠিয়েছে। দুদিনের মধ্যে ফেরৎ না গেলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেবে। পারবে বলে মনে হচ্ছেনা।

সলিলা থেমে গলা পরিষ্কার করেছে। ছেলের গায়ে ঘেঁষে এসেছে প্রায়, কাপড়চোপড়ে, মুখে বোঁটকা গন্ধ। কানে কানে বলছে,

-তোকে একটা কথা বলছি, সমু-টমু কাউকে বলিস না। একটা কাজ করতে হবে তোকে।

-আমাকে? কী আবার?

সংশয়ে কাঁটা হয়ে গেছে শিবনাথ। গোপন কথা তাকে জানায় কেন? বড়ছেলে বলে! কী ব্যাপার, অবৈধ সন্তান-টন্তান আছে নাকি সলিলা আর হরেন্দ্রর? সে বলেছে,

-চল এখন নিচে। শুয়ে পড় গিয়ে।

-দাঁড়া, শোন্‌ দরকারি কাজ সেরে নিই। শোভাবাজারের ওদিকে একজন তান্ত্রিক আছে—।

-তান্ত্রিক?

-হ্যাঁ। সরু গলি দিয়ে অনেকটা ভেতরে যেতে হয়। আদ্যিকালের পোড়োঝোড়ো বাড়ি, ওখানে। জলপড়া কবচ দেয়, মারণ-উচাটন জানে। আমি কথা বলে এসেচি। ব্যবস্থা করবে বলেছে।

-এখান থেকে শোভাবাজার! এতদূর গেছিলে নাকি একা?

-একা না, একজন নিয়ে গেছিল। পরে ওগল্প শুনিস। সাধুবাবা বলেছে, তোর পিসের প্রাণটা আটকে আছে। বেরুতে পারছে না বলে এরকম কষ্ট পাচ্ছে। মন্তর-পড়া তাবিজ দেবে। এনে বুড়োর হাতে বাঁধতে হবে। তাহলে মুক্তি পাবে। তুই নিয়ে আসবি।

-আমি!

-হ্যাঁ, বেটাছেলে ছাড়া হবেনা। বাঁধতেও হবে তোকে। বলে দিয়েছে, ছেলে না’লে ছেলের মতো কাউকে। কিন্তু সাবধানে করতে হবে। পাঁচকান না হয় যেন!

বিস্তার করে বলছে সলিলা। কী সমস্ত পরিকল্পনা! মুক্তি পাবে, মানে মৃত্যুবাণ! গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে শিবনাথের। সলিলা দৃঢ়সংকল্প। শিবনাথ শঙ্কিত হয়ে উঠেছে,

-কীসব বকছ! আমি কাল ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে ভালো ওষুধ আনব’খন। প্রেসক্রিপশন দিও।

-সেটা কোথায় আছে দেখতে হবে। ডাক্তার কি মরার ওষুধ দেবে?

-আবোলতাবোল কথা বলছ!

-ওরে আমি নিজে মরব এবারে। আর পাচ্ছিনা। চেঁচানি শুনতে পাচ্ছিস?ঘুম-নিদ্রা নেই। বেঁধে রাখলে মাথা ঠুকতে থাকে।

-হুঁ।

জড়ানো গলায় বোবা জানোয়ারের গোঙানি উঠে আসছে নিচ থেকে। বন্ধ দরজায় গুমগুম ধাক্কা। সলিলা উত্তেজিত হয়ে বলে,

-ওই শোন, রাতভর জ্বালিয়ে মারবে। আমি আজ ছাতে পড়ে থাকব। মরে পড়ে থাকব।

অসহায়তার শেষ কিনারে এসে এরা মুখোমুখি হয়েছে। হাজার চিন্তার বিনবিনানি মাথার ওপর দিয়ে। কেউ কাউকে স্পর্শ করছে না। শিবনাথ অন্তত এমুহূর্তে টিকিট বদলানোর কথা ভাবতে পারছে না। চেষ্টা করছে আত্মস্থ হওয়ার,

-প্রেসক্রিপশন বের করে রেখে দিও।

-সে দেব’খন। শোন কাল মঙ্গলবার, সাধুবাবার কাছে যাবি। মোবাইল ফোনের নম্বর আর ঠিকানার কাগজ দিয়ে দেব। ডাক্তারের কাছে সমু যাক।

-ওঃ!

শিবনাথ হাতের মোবাইলে সময় দেখছে। বারোটার কাছাকাছি রাত। সলিলা শ্লথ পা কষ্টে টেনে নামছে সিঁড়ি বেয়ে। মাঝের ঘরের গুমোট আর পচা গন্ধের চেয়ে ছাতে রাত কাটানো ভালো। বেশ মশা আছে যদিও। আরও পাঁচটা রাত কাটবে এভাবে। কাল শেষমেষ হয়ত যেতেই হবে তান্ত্রিকের কাছে, সলিলার মানসিক শান্তির জন্যে।

**
স্টেশন থেকে বাড়ি পৌঁছাতে মাঝরাত হয়ে গিয়েছিল। শোওয়ার পর বাকি রাত বিছানায় দৌড়েছে শিবনাথ। ছেঁড়া ঘুমে গোঙানির মতো অস্ফুট শব্দ করেছে। ভোরে জানালার ফাঁক দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস গা ছুঁয়ে যাচ্ছে। ফলে ঘুম গাঢ় হয়েছে। চায়ের কাপ নিয়ে অভ্যেসমতো অনুশ্রী পাশে এসে দাঁড়াল। দেখছে বরকে। রোজ সকালে স্নান করে সে। খোলা অজস্র চুল কোমর ছাপিয়ে নেমেছে। ঠাণ্ডার কারণে ম্যাক্সির ওপরে চাদর পেঁচিয়েছে। বয়সানুপাতিক ভারী শরীর, নাকচোখ তীক্ষ্ণ। মুখের চেহারায় সংসারের ঘাট-আঘাটায় ঘুরে অভিজ্ঞতার ছাপ। গেঞ্জি আর শর্টস্‌-পরা মধ্যপঞ্চাশের মোটাসোটা মানুষ হাত-পা ছেতরে ঘুমিয়ে কাদা। গায়ের পাতলা লেপ পায়ের দিকে দলামোচা হয়ে আছে। একটু জোর করে টেনে তুলে ঢেকে দিল কোমর পর্যন্ত। শিবনাথ আধখানা চোখ খুলে সন্ত্রস্তভাবে বলল,

-ট্রেন আসেনি?

অনুশ্রী অল্প নিচু হয়ে কপালে ভিজে হাত রেখেছে,

-আরেকটু ঘুমোও। ভেবেছিলাম উঠে পড়েছ, চা এনেছিলাম। দরজা টেনে দিয়ে যাচ্ছি।

-না, বসো।

বাঁহাত তুলে সে অনুশ্রীর চওড়া কোমর জড়িয়ে ধরেছে। চোখ বন্ধ অবস্থাতে চেপে চেপে ঘুরছে অস্থির হাত। ভরসা খুঁজছে। দু’তিন মিনিট পরে অনুশ্রী আস্তে করে হাত নামিয়ে দেয়।

-চা খাও, যাই—।

-একটু বসো, কথা আছে।

-আজ ছুটি না তোমার, শুনব’খন বসে। সেন্টারের গাড়ি আসার টাইম হল, অলিকে রেডি করি।

-যাও যাও। দেখি দাও কাপটা—।

বিরক্তি বুঝেও নির্লিপ্তমুখে বেরিয়ে যাচ্ছে অনুশ্রী। বিধ্বস্ত লাগছে শিবনাথের। অনুশ্রী আপাত-আবেগশূন্য। রাগপ্রকাশ করেনা, আদিখ্যেতা দেখায় না। যেটুকু যার প্রাপ্য, তার জন্যে ততটা বরাদ্দ রাখে। অদ্ভুত লাগে শিবনাথের। বিতৃষ্ণায় মুখ তেতো হয়ে উঠছে। অনুশ্রী দরজার কাছে থেমে ঘুরে দাঁড়িয়েছে,

-কী হয়েছে তোমার?

-কিছু না।

-মুখটাকে ওরকম করে রেখেছ!

-জঘন্য স্বপ্ন দেখলাম।

-আসছি, শুনব।

-শুনে যাও।

-বল তাহলে তাড়াতাড়ি—।

শিবনাথ উত্তর না দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়েছে। পিটপিট করে দেখছে ঘরটা। সিলিং থেকে ঘরের মেঝে তকতক করছে। ধপধপে বিছানা। সারাদিন অনুশ্রী এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাড়ির প্রত্যেক আনাচে-কানাচে পরিচ্ছন্নতার সুগন্ধ। জানালার সঙ্গে লাগানো পাঁচ-বাই-সাত খাট। শৌভিক হস্টেলে যাওয়ার পর থেকে সে একা শোয়। দরজা ভেজানো থাকে অনুশ্রীর জন্যে। পাশের ঘরে অলিভিয়াকে নিয়ে অনুশ্রী থাকে। তাদের এগারো বছরের মেয়ে, স্পেশাল চাইল্ড। চলাফেরা অতিকষ্টে নিজে পারে, আর সব করিয়ে দিতে হয়। একটা ট্রেনিং সেন্টারে যায়। উন্নতি হয়েছে, অনুশ্রী বলে। মেয়ের প্রতি শিবনাথের কোনো টান নেই।

সে শুয়ে শুয়ে স্বপ্নের কথা ভেবে চলেছে। বিশ্রী স্বপ্ন। ভেজা গাছের গুঁড়িতে লেগে-থাকা পেটমোটা আধমরা সাপের গা বেয়ে লাল রঙের কাঠ পিঁপড়ের দলবদ্ধ হাঁটাচলা। চামড়া খুবলে খাচ্ছে।

শিবনাথ সোজা উঠে বসছে।

বিছানা ঠেলে চাদর জড়িয়ে দরজা খুলে সামনের লম্বা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। নিরিবিলি গলির মধ্যে তাদের নিজস্ব ফ্ল্যাট। বড়রাস্তা থেকে হেঁটে মিনিট সাত-আট। সামনে ধোবীর দোকান, দশ-পা এগোলে তরিতরকারি। পাঁচতলা থেকে দেখা যাচ্ছে নিচে অনুশ্রী অলিকে ঠেলে তুলে দিল গাড়িতে। কিছু বলল, গালে চুমু দিল। মেয়েটার দৃষ্টি কোথায় বোঝা যায়না। চোখে মোটা লেন্সের চশমা। বাঁকা দুর্বল হাত ধরে নাড়িয়ে টা-টা করার মতো ভঙ্গি করিয়ে দিল গাড়ির এ্যাটেন্ডেন্ট মহিলা। শিবনাথ দৃশ্য থেকে চোখ সরিয়ে দূরে তাকিয়েছে। ছেলের কথা মনে পড়ছে, চেন্নাইতে আছে। সাবধানে বারান্দার পুরনো চেয়ারে বসল। মচমচ করে দুলে উঠেছে চেয়ার, নড়াচড়া করলে উলটে পড়ার সম্ভাবনা। ল্যাচ খোলার আওয়াজ এল, পায়ের শব্দ। অনুশ্রী সোজা বারান্দায় এসেছে। তারে মেলা কাপড়জামা ভেজা-শুকনো বুঝে ওলটপালট করে টেনে দিচ্ছে। আপনমনে বলছে,

-আজ মেশিন চালাব না। আচ্ছা তোমারগুলো ধুতে হবে, না? মুখ ধুয়েছ?

-যাব। চেয়ারটা ভাঙল কী করে?

-ভাঙেনি। পায়াতে পেরেক খুলে গেছে, লোক ডাকতে হবে। অলিকে ব্যায়াম করাচ্ছিলাম।

শিবনাথ কথা বলছে না। আড়চোখে দেখছে অনুশ্রী। শক্ত হয়ে আছে চোয়াল, মুখে থমথম রাগ। অনুশ্রী শব্দগুলো হাওয়ায় ছেড়ে দিয়েছে,

-ওইটুকু না করালে যতটা পারছে তাও কি আর পারবে?

শিবনাথ জবাব না দিয়ে উঠে যাচ্ছে। অনুশ্রী স্বাভাবিক সুরে বলছে,

-পরোটা ভেজেছি। চা করব। দাঁত মেজে বাথরুম সেরে খাওয়ার টেবিলে এস।

-হুঁ...! যত প্রেশার, যত দুর্ভাগ্য, সব আমার। ওদিকের অবস্থাও যা দেখে এলাম...!

-কেমন আছে?

-কেমন আর থাকবে? জঘন্য।

পা দাপিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে শিবনাথ। অনুশ্রী টুঁশব্দ করছে না। ভেতরের আক্রোশে পুরনো কথা ফেনা হয়ে ওঠে। নিঃশব্দে মেনে নেওয়া ভিন্ন করার কিছু করার থাকে না। তখন কে ভুল, কে ঠিক বলে তর্ক করেও লাভ ছিলনা। ভীষণ অস্থির সময় কেটেছে। অলিভিয়ার অঙ্কুরকে মেরে ফেলার কথা বলেছিল শিবনাথ। শৌভিক তখন ন’বছরের।

-ঊণচল্লিশে বাচ্চা নেবে? এটা একটা ডিসিশন হল? নাহয় হয়ে গেছে এ্যাক্সিডেন্টাল। স্ট্রেট এন্‌ সিম্পল রাস্তা আছে তো, না কি?

-ওসব মাথাতেও এন না। এসে যখন পড়েছে, থাকবে।

-দুটো বাচ্চার হাতীর খরচ! কম্‌প্লিকেশনস্‌ বাড়াচ্ছ।

-হয়ে যাবে।

একেক সময়ে শান্ত মানুষের দারুণ জেদ চেপে যায়। অনুশ্রী মোটামুটি চাকরি করছিল তখন। প্ল্যান করেছিল সংসার-চাকরি দুইই সামলাবে কীভাবে। হিসেব গরমিল হয়ে গেল। চরম বিপর্যয়। বাচ্চার ছ’মাস হতে ক্ষীণ আভাস সে টের পেয়েছিল। আঠেরো মাসে ধরা পড়ল মেয়ে স্পেশাল চাইল্ড। লক্ষণ দেখে ডাক্তার জানিয়ে দিলেন সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নামমাত্র। উইদ-আউট পে-তে ছ’মাস ছুটি নিয়েছিল অনুশ্রী। অবস্থা দেখে চাকরি ছেড়ে দিল। শিবনাথের ভাবভঙ্গি আতঙ্ক তৈরি করেছিল। সুযোগ পেলে যদি মেয়েকে মেরে ফেলে বা অচেনা রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসে। সে ধারণা এতবছরে পুরোপুরি ঘোচেনি। মেয়ে যেন অবৈধ, শিবনাথের নয়। একফোঁটা টান নেই। বাপের স্নেহ মেয়ে বুঝতেও পারল না।

বছরখানেকের শৌভিক আর অনুশ্রীকে নিয়ে এখানে এসেছিল শিবনাথ। বড় হবার পরে ডাক্তারি পড়ার আগ্রহ হয়েছিল, চান্স পায়নি। পরে বুঝেছে চান্স পেলেও পড়া হত না। খরচ করার কেউ ছিল না। অত পাতি কোয়ালিফিকেশনে বিশেষ কিছু হবে এও বুঝেছিল। শুধু কোম্পানিটা ভালো দেখে চাকরি নিয়ে এতদূরে আসার রিস্ক নিয়েছিল। তারপর প্রচণ্ড পরিশ্রম আর হাতযশ।

অফিস থেকে ফিরে লিভিংরুমে বসে একা টিভি দেখে শিবনাথ। অনুশ্রী ব্যস্ত থাকে অলির কাছে। অনুশ্রীর সিদ্ধান্তের গুনহ্‌গার দিয়ে চলেছে তিনজনে - ভাবে সে। এত বিচক্ষণ, যাকে সবচেয়ে বেশি ভরসা করত, তার ভয়ঙ্কর ভুল সিদ্ধান্ত আজ সে মানতে পারে না।

কতবার মুখে এসেছে, “তুমি সুখী তো অনু? কখনো তোমার অনুশোচনা হয়না?” বলতে পারেনি।

**
শিবনাথ ডিভানে ঘুমিয়ে পড়েছে। পাশে হুইস্কির গ্লাস, বোতল। নীট্‌ খেয়েছে, জল ছাড়া? অনুশ্রী নিখুঁত মনোযোগী। কলকাতা থেকে ফেরার পরে পরিবর্তন লক্ষ্য করছে। দুতিনদিন সময় দিতে চেয়েছে, সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেনি। অলিকে ঘুম পাড়িয়ে এসে বসল ডিভানে। ভারী শরীরের হালকা শব্দতরঙ্গে ঘুম শিবনাথের ভাঙল। বেশ জড়ানো গলায়বলে,

-কী?

-ডিনার দেব।

-ও। ক’টা বাজে?

-বেশি না, ঘুমোচ্ছ তাই। খেয়ে শোও। জল ছাড়া খাচ্ছ যে! কতটা খেয়েছ?

-তোমার মেয়ে?

-ঘুম পাড়িয়ে এসেছি।

-হুঁ। একটু পরে খাব।

-কলকাতায় কেমন আছে সব—!

-ভালো না।

-কেন?

-মা ওই রকমই। চেঁচামিচি মেজাজ গালাগালি চালিয়ে যাচ্ছে। প্রচণ্ড পরিশ্রমও যাচ্ছে—।

-শরীরও খারাপ নাকি?

-পায়ে ব্যথা-ট্যথা বলল। হরবাবুকে নিয়ে হিমশিম - নিজের ভুলের মাশুল থেকে কেউ ছাড় পায়না।

এরপর চুপ করে আছে দুজনেই। স্পষ্ট ইঙ্গিতবাহী সময়ের মাঝখান কেটে নিরুচ্চার কথার স্রোত বয়ে যাচ্ছে। ইথারে বয়ে যাচ্ছে অনুক্ত উতোর-চাপান, বরাবরের দোষারোপ। নিঃশব্দে প্রারব্ধ কাজের কারণ বিস্তারিত হচ্ছে। নীরবতা ভেঙে অনুশ্রী বলছে,

-আসলে ওনার ওই রোগ তো সারেনা, বয়সের রোগ। যদ্দিন বাঁচবে টেনে যেতে হবে।

-তুমি মন্ত্রতন্ত্র বিশ্বাস কর? যাগযজ্ঞ, জলপড়া, তাবিজ?

-কি, বুঝতে পারছি না! কী হয়েছে?

-ধর, জীবনটা হিজিবিজি হয়ে গেছে, ভট্‌কে-থাকা আত্মা বেরুচ্ছে না, তাকে হেল্প করা কি ক্রাইম?

-মানে?

-মানে, তাকে সাহায্য করা অবৈধ?

-সাহায্য? কিসের সাহায্য?

-হ্যাঁ সাহায্য মানে আত্মাকে, ধর যদি - মানে যে আত্মা কষ্ট পাচ্ছে বডির খাঁচাতে আটকে – আসলে ঠিক বোঝাতে পারছি না। ওই পিঁপড়েগুলো যেরকম মরণাপন্ন সাপকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারছে, উঁহু বরং বাঁচিয়ে দিচ্ছে।

-কী যে বলছ কে জানে।

অনেকদিন পরে ঈষৎ ভয়-ভয় করছে অনুশ্রীর, মেয়ে জন্মানর পরে যেমন শঙ্কিত হয়ে থাকত শিবনাথের আচরণে। চব্বিশ বছর একসঙ্গে থাকার পরে শিবনাথের ভেতরটা আংশিক দেখতে পায়। কী ঘটেছে খুলে বলছে না শিবনাথ। আর বলবে বলে মনে হচ্ছে না। অনুশ্রী গলা ঝেড়ে সাধারণ গৃহিনীর কর্তৃত্বে জোর দিয়ে বলেছে,

-নীট্‌ খেলে তোমার নেশা হয় জান তো, আর খেওনা। লেবুজল বানিয়ে এনে দিচ্ছি। নেশা কাটলে ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়। আমি কিচেনে গেলাম।

সিলিং-এ চোখ মেলে এলিয়ে আছে শিবনাথ। ডিম-লাইটের জন্যে ধোঁয়াধোঁয়া চারপাশ। কতগুলো সাঙ্কেতিক চিহ্ণ ঘোরাফেরা করছে। প্রশ্নের উত্তর মেলাচ্ছে সে। হরবাবু কি বাঁচতে চায়—? খাওয়ার লোভ আছে,মানে সে বাঁচতে চায়। জড়ভরত হয়েও জান্তবভাবে বাঁচার ইচ্ছে বোঝায়। অথচ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করতে পারেনা। তার মা সলিলা প্রতিদিন অথর্ব হয়ে চলেছে, তবু বাঁচতে চায়। অনেকবছর হরবাবুর সঙ্গে সংসার করেছে। কথাবার্তায় মনে হয় ভালোবাসেনা, আবার নিজের অজ্ঞাতে হয়ত বাসে। সলিলা চাইছে হরবাবু মরুক। কারণ তাহলে নিজে বাঁচবে। সলিলা সক্রিয় চেষ্টা গোপন রাখছে আইন বা লোকলজ্জায়।

হরবাবুর দায়িত্ব শিবনাথ কোনোদিন নেবেনা, সোমনাথেরও না নেওয়ার সম্ভাবনা। তাহলে?

শিবনাথ তড়াং করে সোজা হয়ে উঠে বসে। তান্ত্রিকের তাবিজে বিশ্বাস নেই, তবু সে এনেছে এবং প্রবল ধ্বস্তাধ্বস্তি করে উলঙ্গ লোকটার বাহুতেমন্ত্রপড়া তাবিজ বেঁধে দিয়ে এসেছে। ডাক্তারের কাছে অনুরোধ করে ঘুমের ওষুধের ডোজ বাড়িয়েছে। ফলাফল সে জানে না। ফেরার পর ফোন করেনি। আসার সময়ে সলিলাকে এটুকুমাত্র বলে এসেছে, ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে দিয়ে দিও, দুদিন ঘুমিয়ে থাকবে শান্ত হয়ে।’ এবং ক্রমাগত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে।

হঠাৎ চেঁচিয়ে ডাকছে শিবনাথ,

-অনু, একবার শুনে যাও—।

1 টি মন্তব্য: