সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

সাদিয়া সুলতানা’র গল্প : মিতালি

১.

মিতালির সঙ্গে যখন আমার পরিচয় হয় তখন আমি আপাদমস্তক ভাঙাচোরা একজন মানুষ। উঠে দাঁড়ানোর সামান্যতম শক্তি বা ইচ্ছে আমার ছিল না। গভীর হতাশায় নিমজ্জিত আমি প্রতিমুহূর্তে অনুভব করতাম, এই মধ্যবয়সে বিদেশ বিভূঁইয়ে নারীসঙ্গ বিবর্জিত আমার জীবন অভিশপ্ত। বেঁচে থাকার প্রতি প্রচণ্ড অনীহা এসে পড়েছিল আমার।
অথচ মলি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে শুনে আমার সহকর্মী পিটার, মার্শাল, রিটা আমাকে কেক উপহার দিয়েছিল। রিটা আমার ঠোঁটে কষে চুমু খেয়ে বলেছিল, ‘ডিয়ার, নাউ লিভ লাইক এ বার্ড।’ রিটার চুমুতে আড়ষ্ট আমি বলেছিলাম, ‘ইটস ঠু ডিফিকাল্ট।’

প্রবাসী জীবনের সবরকম ধাক্কা সামলে যখন নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি তখনই মলি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল যা মেনে নেয়া আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। কিন্তু আমাকে ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মলিকে দেখে মনে হয়েছিল, ছয় বছরের দাম্পত্যজীবন ওর মধ্যে কোনো পিছুটান তৈরি করতে পারেনি। অথচ একটা সময়ে আমাদের মধ্যে অনেক বোঝাপড়া ছিল। নিউইয়র্ক প্রবাসী বড় ভাইয়ের কল্যাণে বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে আমরা দুজন এখানে ইমিগ্রান্ট হয়েছিলাম। বিদেশের হালচাল বুঝে উঠতে না উঠতেই আমার বড় ভাই আহাদ যখন জানিয়েছিল, ‘গ্রিনকার্ড আর সোশাল সিকিউরিটি কার্ড হয়ে গেছে, এবার নিজেদের জন্য আলাদা বাসা দেখে নাও’ তখনও বুঝতে পারিনি সামনে কতটা কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে।

সেই সময়ে একটি দিন আরেকটি দিনের চেয়ে কঠিন ছিল। প্রতিমুহূর্তে মনে হতো, ল্যান্ড অব অপরচ্যুনিটিতে এসেও দুটি মানুষ জীবনের সব সম্ভাবনা খুইয়ে বসে আছি। মাথামোটা খিটমিটে মেজাজের একজন বাঙালির কাছ থেকে ৮০০ ডলারে এক রুমের বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা, রুমরেন্ট যোগাড় করা থেকে শুরু করে নিজেদের মাসকাবারি খরচ নির্বাহের দুর্ভোগসহ প্রচণ্ড অর্থকষ্টে থেকেছি। মলি আর আমি এখানে সেখানে খণ্ডকালীন চাকরি করেছি। দেশে থাকলে আত্মসম্মানের কারণে যেসব কাজ করতাম না এখানে এসে সেসব কাজ করেছি। বাঙালি বা ভারতীয় রেস্টুরেন্টে কিচেন হেল্পার, ডিশ ক্লিনার, ওয়েটার থেকে শুরু করে ভেন্ডারি পর্যন্ত করেছি। ধীরে ধীরে আর্থিক দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে উঠতে মলি আর আমি নিউইয়র্ক জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলাম, বছর চারেকের মাথায় নিজেদের একটা বাড়িও কিনেছিলাম। 

তারপর হঠাৎ একদিন কী হলো আমাকে অবাক করে দিয়ে মলি জানালো, ও আমার সাথে থাকবে না। আমি অবশ্য টের পেয়েছিলাম মলি সব ধরনের ট্যাবু ভেঙে ততোদিনে পুরোদস্তুর আমেরিকান হয়ে উঠেছে। উল্টোদিকে ওর স্ফুলিঙ্গের সামনে আমার দ্যুতিহীনতা বারবার প্রকট হয়ে উঠতো। আমি ছিলাম খুব সাধারণ, আটপৌরে। প্রাণে ভরপুর জ্যাকবকেই বরং ওর পাশে বেশি মানানসই লাগতো। মলি তখন একটা রেস্টুরেন্টে কাজ করতো। সহকর্মী জ্যাকবের সাথে মলির প্রেম, লং উইকেন্ডে মলির বাড়িতে না ফেরা, আমাদের দুজনের মধ্যকার দূরত্ব, মলির বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া...হুট করে কত কী যে হয়ে গেল।

এসব স্মৃতি নিঃসঙ্গ আমাকে তীব্রভাবে বিমর্ষ করে তুলতো। হোটেলের একঘেয়ে কর্মঘন্টা শেষ হবার আশায় বারবার হাতঘড়ির দিকে তাকাতাম। প্রাণ আনচান করতো; কখন বারে যাবো, নিজের মতো করে খানিকক্ষণ সময় কাটাবো। তখন আমি সবেমাত্র মদ খেতে শিখেছি। তবু কাজ শেষে পেশাদারের মতো জ্যাকসন হাইটসের দ্যা রেড পেনি বারে ঢুকতাম। এই বারে ভেঙে পড়া মানুষদের আনাগোনাই বেশি, ভবঘুরেও আছে। ওয়েটারদের স্বাগত সম্ভাষণ পাবার সাথে সাথে আমার বুকের ছাতি কয়েক ইঞ্চি ফুলে উঠত, সেই ফাঁকা জায়গায় স্কচ ঢালতে ঢালতে আমি নানান রকম মানুষ দেখতাম। এতে প্রশান্তি মিলতো কিনা বুঝতাম না। তবে তরল পেটে পড়লে নিজেকে বনেদি কোনো মানুষ মনে হতো। এদেশে মদ্যপান সংক্রান্ত ট্যাবু নেই। নিজের ঝুঁকি নিজে নিয়ে যে যেই মাত্রা পর্যন্ত যেতে পারে ততোটুকু পান করে। 

আমাদের দেশে প্রকাশ্যে প্রেমিকাকে চুমু খেলে নতুবা মদ খেলে লোকে যতোটা নিগৃহীত হয়, এখানে বিষয়গুলো ঠিক ততোটাই সাধারণ। বাঙালি সংস্কারবোধ থেকে প্রকাশ্যে মদ পান করতে প্রথম প্রথম আমার বাধো বাধো ঠেকতো। তবে স্বস্তিকর বিষয় হলো, এখানে মদ্যপ ব্যক্তিকে কেউ অচ্ছুত ভাবে না। অচ্ছুতের সংজ্ঞা আমাদের দেশে বড়ই অদ্ভুত। যা কাঁধে-মাথায় করে আমরা বিদেশ বিভূঁইয়েও বয়ে আনি। 

যাহোক আমার জীবনের ক্লান্তিমোচনের নিভুনিভু বাসনার এক শীতের সকালে মিতালির সাথে আমার পরিচয়। আমাদের এখনো দেখা হয়নি, দেখা হবার সম্ভাবনাও শূন্য। মিতালির সাথে আমার পরিচয় ফেসবুকে। পরিচয় না বলে সংযোগ বলা ভালো। আমি কী মিতালিকে আদৌ চিনি বা মিতালি আমাকে? এমনও হতে পারে মিতালি হয়তো মিতালি না, নার্গিস নতুবা শম্পা। আমিও যেমন রবি না, ফরহাদ। তবে আমাদের দুজনের অবস্থান নির্ভুলই আছে। মিতালির বাংলাদেশ, আমার নিউইয়র্ক।

আমি এখন ভালোই আছি। আর্থিক দুরবস্থা কেটে গেছে। আমি একটা আবাসিক হোটেলে কাজ করি, এটা ইউনিয়ন জব। এই চাকরিতে জব সিকিউরিটি আছে। কোনো কারণে আমার চাকরি চলে গেলে ইউনিয়নই দায়িত্ব নিয়ে নতুন চাকরির ব্যবস্থা করে দিবে আর যতদিন চাকরি না হয় নির্দিষ্ট হারে সাপ্তাহিক বেতনও দিবে। আমার বার্ষিক আয়ও এখন ভালো। ডলারের প্রবাহ ভালো থাকলে শরীর-মন চাঙা থাকে, সেই সঙ্গে শরীরের অবদমিত চাহিদাগুলোও নতুনভাবে জেগে ওঠে। বিপরীত লিঙ্গের সাথে কাটানো পুরাতন স্মৃতিগুলো মাঝরাতে কাঁটার মতো শরীরের স্পর্শকাতর অংশে খোঁচা দেয়। মনে পড়ে মলির সাথে উন্মাতাল শরীরী আনন্দে কাটানো দিনগুলোর কথা। 

এখন অবশ্য মিতালির সাথে ফেসবুক মেসেঞ্জারে আড্ডা দেবার অদ্ভুত নেশা হয়েছে। আগে বাড়ি ফিরে একাকিত্ব কাটাতে পর্নোভিডিও বা রগরগে কোনো মুভি দেখতাম। এসব এখন ছেলেমানুষি লাগে। তারচেয়ে মিতালির সাথে আড্ডা দেয়া আমার একাকী জীবনকে বেশ উপভোগ্য করে তোলে। আমাদের দুজনের এই আড্ডাবাজির নির্ধারিত কোনো সময়কাল নেই, বিষয়ও নেই। বাংলাদেশের সাথে সময়ের বেশ ভালো পার্থক্য থাকলেও আমরা দুজন নিশাচর প্রাণি পরস্পরকে সঙ্গ দিই। আমরা প্রেমিকযুগল নই, পরস্পরের প্রতি কোনো আত্মিক বা শারীরিক দায়বদ্ধতাও নেই। 

কাজের ফাঁকে রাত জাগা মিতালির এক একটি মেসেজ আমাকে পরম স্বস্তি দেয়। কী খেয়েছো, কী করছো এসব গতানুগতিক প্রশ্ন শেষে আমরা রোজ কোনো হালকা বিষয় নিয়ে রসিকতা করি, কবিতা বা হারানো দিনের গানের লিংক বা কৌতুক শেয়ার করি। মেসেজ করতে করতে হাসি, অভিমান করি। ফেলে আসা আবেগের কথা বলে পারতপক্ষে আমরা আফসোস করি না। নিজেদের নিঃসঙ্গতা মাড়িয়ে তুমুলভাবে বাঁচার জন্য আমরা ফেসবুক আর ভাইবারের আলাপবাকসো জমজমাট করে রাখি। এভাবে পৃথিবীর দুই প্রান্তে থাকা দুজন নিঃসঙ্গ মানুষ মিতালি পাতিয়ে নিঃসঙ্গতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভালোই আছি। 

মলিও ভালো আছে। সেদিন হোটেলের লবিতে মলিকে দেখেছি, জ্যাকবের গলা জড়িয়ে ধরে গভীরভাবে চুমু খাচ্ছিল। ওকে দেখে আমার বুকের ভেতরে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলেনি, বরং মিতালির কথা মনে পড়ে ওর প্রতি তীব্র শারীরিক আকর্ষণবোধ করছিলাম আমি। দুপুরে লাঞ্চব্রেকে আমার সহকর্মী দীর্ঘাঙ্গী স্বর্ণকেশী ন্যানো যখন অভ্যাসবশত আমাকে হাগ করেছিল তখন ন্যানোর প্রতিও আগ্রহবোধ করছিলাম। পরক্ষণেই আমি আমার সঙ্গমলিপ্সু মনকে তীব্রভাবে ভর্ৎসনা করেছি। যদিও আমি বিশ্বাস করি শরীরতৃষ্ণা পাপ না। আমার সাথে সংসার করেও যখন মলি জ্যাকবের শরীর-সঙ্গে কিশোরী হয়ে উঠেছিল তখনও স্নানস্নিগ্ধ মলিকে দেখে আমি প্রচণ্ড কামার্ত হতাম। এখন যেমন মিতালির সাথে কথোপকথনের বাঁধ ভেঙে গেলে হই।

২.

বিজ্ঞাপনটা দেখে হাসির ধকল সামলাতে আমার পাক্কা দশ মিনিট লেগেছে। এর ভেতরে চায়ের কাপ ছলকে দুবার চা পড়ে টেবিল নষ্ট হয়েছে। অফিস সহায়ক বদরুল টেবিল মুছতে মুছতে আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছিল।

-ম্যাডাম, চা কি বেশি গরম?

-চা তো গরমই হয়, বদরুল।

বলতে বলতে আমি অহেতুক হেসেছি। শব্দ করে। অফিসে সাধারণত আমি শব্দহীন থাকি। একটু আগে আমার হাসির শব্দ শুনে পাশের ডেস্কের সুনীল এসে কৌতূহলে জানতে চেয়েছে, ‘এত হাসছেন কেন? কোনো মজার বিষয় হয়েছে কি?’ জবাব না পেয়ে সে নিজের কাজে চলে গেছে। আমি দেখেছি পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে এসব নিয়ে আলোচনা করার পরিণতি হয় সেধে শাল নেবার মতো। মুখের আগল খুলে গেলে এদের স্পর্ধা বেড়ে যায়, তখন অকারণ শরীরী ইঙ্গিত না দিয়ে এরা কোনো কথাই বলতে চায় না।

আমি নিজেকে সামলে নিয়ে বিজ্ঞাপনটা রবিকে ফরোয়ার্ড করেছি। রবির কাছে এসব শেয়ার করতে আমার বাঁধে না। এটা একটা আজব বিষয়। আমি সব পুরুষ থেকে কেন ওকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করেছি তা আমি জানি না। শুধু জানি কারো কারো কাছে নিয়ম-নীতির বাঁধ ভাঙলে উপচে ওঠে ভালোলাগার জোয়ার। রবির সাথে আমার সম্পর্ক এখন তেমনই। 

রবির ইনবক্সে সবুজ বাতি জ্বলছে। সকালে ও শ্রুতী গোস্বামীর চমৎকার একটা গানের লিংক শেয়ার করেছে। ‘তোমায় দেখবে বলে এ ফুল ফুটেছে, তোমায় দেখাবে বলে সূর্য উঠেছে...ও আমার পাতাঝরা বনানীর পাখি, ও আমার সোনাঝুরি বনের একাকী’ গানটি শুনতে শুনতে আমি ওর মেসেজের অপেক্ষা করি। 

-বিজ্ঞাপনটা দেখো, খুব মজা পাবে।

রবি মেসেজ দেখেছে। ও তবু নিশ্চুপ। আমি উসখুস করি।

-ব্যস্ত নাকি?

-হুম।

-তাহলে থাক। সময় পেলে বিজ্ঞাপনটা দেখো। সকালে এক বন্ধু দিলো ইনবক্সে। দেখে সেই তখন থেকে হাসছি।

-তাই?

-আহা পড়োই না। ব্যস্ত যদি, জবাব তো ঠিকই দিচ্ছো!

‘মনোবিজ্ঞানে এম.এ. বয়স ৪৭, ডিভোর্সি, ফর্সা, সুশ্রী, রামকৃষ্ণ সারদা পূজারী একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই সুপাত্র চাই, সেক্সে অক্ষম হলেও চলবে।’ বিজ্ঞাপনটির ছবির কোণে বুড়ো আঙুল উঁচু করা একটা লাইক ইমো সেঁটে যেতেই আমি আবার হাসিতে ভেঙে পড়ি। যদিও মুখে হাত চেপে হাসিকে শব্দহীন রাখতে হচ্ছে। ওই প্রান্ত থেকে একটা হাসির ইমোটিকন এসে বিজ্ঞাপনের নিচে আছড়ে পড়তেই বোঝা যায় এবার রবিও হাসছে।

-ভালোই তো পাত্র বাবাজির কষ্ট কমে গেল।

-ফাজলামি করো না। অমন স্বামী দিয়ে ভদ্রমহিলা করবে কী বলো তো?

-আহা, আমার তো মনে হচ্ছে মেয়েটা বা তার পরিবার স্বজ্ঞানেই বিজ্ঞাপন দিয়েছে! হাসিঠাট্টার কিছু নেই। এই বিষয়ের জন্য ভদ্রমহিলার শরীর আর বয়স উপযুক্ত নাও থাকতে পারে। 

-তা অবশ্য ঠিক বলেছো। এমনও হতে পারে, প্রথম বিবাহিত জীবনের তিক্ততা তাকে যৌনকর্মে বীতশ্রদ্ধ করেছে। নাহ, হাসিঠাট্টা করা ঠিক হয়নি আমার। 

-হাসি আসা তো স্বাভাবিক, তুমি ঠিক কী কারণে হেসেছো সেটাই আসল বিষয়।

-হুম। আমি মজা পাচ্ছিলাম পাণিপ্রার্থী পুরুষটির কথা ভেবে। বেচারা।

-হাহাহা।

-সত্যি সিরিয়াসলি ভেবে দেখলে, এদেশে বেশিরভাগ মেয়েই বিবাহিত জীবনে শরীরের সুখ পায় না, কেউ তা স্বীকারও করে না। করবে কী, বিবাহিত নারীদের বেশিরভাগই জানে না শরীরে কী করে সুখ পেতে হয়। আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীদের অনেকেই বিবাহিত জীবনের পনের-বিশ বছর পার হবার পরেও জানে না অর্গাজম কী। আর একেবারে রুট লেভেলের নারীদের বেশিরভাগই ভাবে শরীরের সুখ একচেটিয়া তাদের স্বামীর জন্যই। আমি ফিল্ডওয়ার্কে গিয়ে অনেক মেয়েদের এমনই পেয়েছি। 

-সেটাই। যদিও বিজ্ঞাপনটি পড়ে বোঝা যাচ্ছে ভদ্রমহিলা যৌন অক্ষম ব্যক্তিকেও বিয়ে করতে রাজি কিন্তু এমনও হতে পারে, তার পরিবার তার জন্য পুরুষ নামের একজন অভিভাবক খুঁজছে শুধু। আমাদের সমাজে একজন ডিভোর্সি নারীর সমাজে স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকার জন্য যৌনতা, প্রেম-ভালবাসার চেয়েও একজন স্বামী বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। হোক সে ধ্বজভঙ্গ।

রবির সাথে আড্ডা দিতে দিতে ফুরফুরে বাতাসে আমার মন জুড়িয়ে যায়। এ কারণেই রবিকে আমি অকপটে সব বলতে পারি। হয়তো আমাকে খুশি করতেই রবি ওর পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব সুচারুরূপে আমার কাছে গোপন করে, নিজেকে উপস্থাপন করে দারুণ একজন স্বাধীনচেতা মানুষ হিসেবে। তবু আমি এই সত্য-মিথ্যার ধুম্রজালে ঢাকা ভার্চুয়াল জীবনের এই মিতালি উপভোগ করি। আমি মেসেজের প্রতিউত্তর দেবার আগেই টুং করে নতুন মেসেজ আসে। রবিকে আপাতত বিদায় জানিয়ে আমি কাজে মন দিই। যতক্ষণ কাজে ডুবে থাকি একাকিত্ববোধ মাথা চাড়া দেয় না। আমি একটা আই.এন.জি.ও তে কাজ করি। সারাদিন ব্যস্ততায় কাটে আমার। বাড়ি ফিরে দুটো খেয়ে নিয়ে বিছানায় শরীর ছাড়তেই ঘরজুড়ে থাকা নীরবতা তীক্ষ্ম ফলায় আমাকে ঘায়েল করতে মুখিয়ে ওঠে। তখন মোবাইলে থাকা প্রাণভোমরা রবি আমাকে আশ্বস্ত করে। 

আমরা দুজন সেই অর্থে প্রেমিকযুগল নই। দুজন পোড় খাওয়া মানুষ একে অন্যের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে ক্ষণিকের জন্য শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি খুঁজছি। এই যে শারীরিক প্রশান্তি, এই বিষয়টাও বড় গোলমেলে। দুটো শরীর পরস্পর লেপটে থাকলেও তা আসে না, আবার বহুদূরের পৃথক দুই ঠিকানায় বসবাস করা দুজন মানুষ শুধু মুখের কথাতেই শরীরী সুখে ভাসাতে পারে। এই যেমন রবির প্রতিটি মেসেজের এক একটি শব্দে উড়ে আসে সুখানুভূতির রঙিন পরাগ। যার সাতরঙ দিন দিন আমার ভালোবাসার কাতর ইচ্ছে জাগিয়ে তোলে। এই এখন যেমন রবির যৌনতাগন্ধী মেসেজ দেখে আমার কানের লতি লাল হয়ে যাচ্ছে, তলপেটে ব্যাখ্যাহীন শিরশিরে একটা অনুভূতি হচ্ছে। আমি টের পাচ্ছি, আমার মাথার মধ্যে ঝিমঝিম করছে, শরীরের প্রতিটি রোমকূপে আশ্চর্য এক অনুভব লালপিঁপড়ে হয়ে ছোটাছুটি করছে।

এ অনুভূতি আমার অচেনা নয়। এদেশে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানো পাপ হলেও লোকচক্ষুর অন্তরালে পাপীর তালিকায় আমার নাম উঠেছিল। তৌহিদের সাথে আমার সম্পর্কটা টেকেনি। বিয়ে পর্যন্ত গড়ানোর আগেই তৌহিদ বুঝতে পেরেছিল আমাকে ওর আর ভালো লাগছে না, আমাদের দুজনের মধ্যে বিস্তর ফারাক। কী আশ্চর্য! তৌহিদের মেসের চৌকির ওপরে তেল চিটচিটে চাদরের আড়ালে দুটো শরীর সব পার্থক্য ঘুচিয়ে ফেললেও সেই কথা বুঝতে তৌহিদের বছর তিনেক লেগেছিল। নাহ, তৌহিদ সেই অর্থে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। তৌহিদ আমাকে ছুড়ে ফেলার কথা আমার মুখের ওপর বলেই আমাকে প্রত্যাখান করেছে। এরপর ও আমার বান্ধবী নিশিকে বিয়ে করে মেলবোর্ন চলে গেছে। সেদিন নিশির টাইমলাইনে দেখলাম ‘আমার বিড়ালসোনা’ ক্যাপশনে দুজনের ছবি দিয়েছে। 

আমার আর বিয়ে করা হয়নি। এদেশের হিসেবমতে আমি এতটাই দেরি করে ফেলেছি যে এখন লোকে আমাকে দেখিয়ে আঙুল তুলতেও ভুলে গেছে, ‘মিতালি এখনো বিয়ে করেনি।’ তৌহিদের সাথে বিচ্ছিন্নতার পর পুরুষসঙ্গের প্রতি আমার তীব্র অনীহা কাজ করতো, নিজের প্রতি অর্থহীন রাগ হতো। কিন্তু রবির সাথে পরিচয়ের পর অদ্ভুত পরিবর্তন হয়েছে আমার। শুধু নিজের কাছে কেন রবির কাছে স্বীকার করতেও আমার দ্বিধা নেই, দীর্ঘবছর খরায় থাকা আমার এই চল্লিশোর্ধ্ব শরীর আজ কোনো পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করার জন্য নির্লজ্জভাবে উন্মুখ হয়ে আছে। ভেতরে ভেতরে আমি হয়তো বুভুক্ষু ছিলাম এমনই কারো আহ্বানের জন্য, যা রবির সাথে যোগাযোগ শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত টের পাইনি। তাই নিজের মধ্যে বিস্তর পরিবর্তন টের পাচ্ছি। যে আমি ভার্চুয়াল জগতের প্রতি নিরাসক্ত ছিলাম সেই আমি এখন মাদকাসক্তের মতো রবির মেসেজের জন্য অপেক্ষা করি। ভাইবার, ফেসবুক মেসেঞ্জারে লগড্ইন থাকি চব্বিশ ঘন্টা। 

অ্যাকটিভ থাকার সবুজ বাতি জ্বলতে থাকলে নানান বিড়ম্বনাতেও পড়তে হয়। গতকাল আমি হানিফ নামের ফালতু একজন লোককে মেসেঞ্জারে তার অহেতুক আগ্রহের কারণে ব্লক করেছি। প্রতিদিন সকালে অযথাই মেসেঞ্জারে সে আমাকে ডাকাডাকি করবে-‘আপা, আবার প্রোফাইল পিকচার পাল্টাইছেন! আগেরটাই তো সুন্দর ছিল।’ অকারণে উদ্ভট ধরনের কোনো জিআইএফ পাঠিয়ে বলবে, ‘খুব নিঃসঙ্গ লাগে।’ হারামজাদা, আমার ছবি সুন্দর হোক বা কুৎসিত হোক তাতে তোর কী? আর তোর নিঃসঙ্গ লাগলে আমার কী? আমাকে কী তোর নিঃসঙ্গতা কাটাতে তোর গলায় ঝুলে পড়তে হবে! এদের আমি হাড়েহাড়ে চিনি। এই বুড়ো ভামগুলো বাড়িতে স্ত্রী-কন্যার কাছে দেবতা সেজে থাকবে আর অফিসে বসে সেকেন্ডে সেকেন্ডে ফেসবুকে মেয়েদের প্রোফাইলের ওপর নজর রেখে বিকৃত শরীরী তৃষ্ণা মেটাবে।

কয়েকজনের ইনবক্স নোটিফিকেশন আমি শব্দহীন করে রেখেছি। কিন্তু অভ্যাসবশত দশ/পনেরো মিনিট পরপর ইনবক্স চেক করার কারণে এগুলো ঠিকই নাকের ডগায় এসে ঝুলতে থাকে। তখনই মুখ বিস্বাদ হয়ে যায়। উল্টোদিকে রবির উদ্দেশ্যমূলক মেসেজগুলো সময়ে-অসময়ে আরক্ত করে তোলে আমায়, ভাসিয়ে নেয় বয়ঃসন্ধিকালের মতো অকৃত্রিম কোনো মাতাল অনুভবে।

৩.

মলি ফিরে এসেছে। দরজায় দাঁড়ানো মলির মাথার লাল টুপি আর পরনের কালো ওভারকোটের ওপরে তুষারের শুভ্র স্পর্শ। এই সপ্তাহে নিউইয়র্কে মৌসুমের প্রথম তুষারপাত শুরু হয়েছে। গত পরশু তুষারঝড়ও হয়েছে। গতকাল রাত থেকে অবশ্য আবহাওয়া খানিকটা ভালো। রাতভর ঝিরঝিরে বৃষ্টি ফোঁটার মতো মিহি দানার তুষার পড়েছে। সকালে টয়লেটে যাবার সময় জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখেছি, বাড়ির সামনের আঙিনা শাদা ধবধবে। সারারাতের অবিশ্রান্ত তুষারপাতে বরফকণা জমে রাস্তার দুই ধার উঁচু হয়ে গেছে।

তুষারপাতের মৌসুম এখন আমার কাছে বিরক্তিকর লাগে। উটকো ঝামেলা মনে হয়। তাপমাত্রা কমে মাইনাসে নেমে এলে তুষারকণা জমে বরফকঠিন হয়ে যায়। যদিও সিটির গাড়ি এসে রাস্তার বরফ পরিষ্কার করে নিয়ে যায় কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হলে পিচ্ছিল রাস্তায় গাড়িতে বা পায়ে হেঁটে যাতায়াত করা মানুষের পক্ষে বিপদজনক হয়ে পড়ে। তখন লোক এনে ডলার খরচ করে নিজের বাড়ির সামনের বরফ পরিষ্কার করাতে হয়। এতে বাড়তি খরচ, বাড়তি দুর্ভোগ। আর তুষারঝড়ে আবহাওয়া বৈরী হলে তো দুর্ভোগের অন্ত নেই।

আজ আমার ছুটি। সকালের আয়েসি ঘুম নষ্ট করে বিছানা ছাড়তে মন চাইছিল না। অনাকাক্সিক্ষত বেলের শব্দে বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলে দেখি মলি দাঁড়িয়ে আছে। ঘরে ঢুকে শরীরের কয়েকপ্রস্থ কাপড় ঝেড়ে ফেলতেই মলিকে দেখতে অন্যরকম লাগছে। শর্ট স্কার্ট আর ঢোলা লাল গেঞ্জি পরিহিত মলি যেন বাগানের সদ্যতোলা স্ট্রবেরি। পরিচ্ছদের সাথে সাথে ওর চেহারাতেও একটা পশ্চিমা ভাব চলে এসেছে। আমাকে পশ্চিমা ঢঙে ‘হাই হানি’ বলে ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে আলিঙ্গন করে মলি ঘরে ঢুকে পড়েছে। ওর পাশে দাঁড়ানো পেটমোটা ট্রলিব্যাগ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, থাকার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে।

-উফফ, কী কনকনে ঠাণ্ডা! নিউজে দেখলাম এ বছর গতবছরের তুলনায় বেশি স্নোফল হবে।

-হুম। ঠাণ্ডার ভেতরে এই সকালে কী করে এলে?

-কোনো সমস্যা হয়নি। তুমি কেমন আছো?

-ভালো। তুমি?

-মন্দ না।

কথা বলতে বলতে মলি অভ্যস্ত হাতে কফি বানায়। ডার্ক রোস্টেড ব্লাক কফির তেতো স্বাদ নিতে নিতে আমি মলিকে দেখি। কতোদিন পর ও এলো? প্রায় দেড় বছর।

-ফরহাদ, তুমি নিশ্চয়ই ব্রেকফাস্ট করোনি?

আমার না সূচক মাথা নাড়ানো দেখে মলি কিচেনে ঢুকে যায়। ওকে দেখে আমার পুরনো জীবন আমার পায়ের কাছে থমকে দাঁড়ায়। কত কী মনে পড়ে! নিউইয়র্কে আসার পর প্রথম যেবার মলি আর আমি তুষারপাত দেখি, মুগ্ধতায় আমাদের দুজনের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কাজ থেকে ফিরে দুজন রোজ ব্যাকইয়ার্ডে বা বাড়ির আঙিনায় পরস্পরকে আলিঙ্গন করে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ছুটির দিনে চলে যেতাম বাড়ির কাছের পার্কে। শুভ্রতার জাদুঘোরে আচ্ছন্ন নতুন প্রকৃতি, গাছের পাতাহীন শাখা-প্রশাখায় লেপটে থাকা শাদা শাদা কোমল তুষারের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে দুজন মেতে উঠতাম নানান ছেলেমানুষি খেলায়। 

-ফরহাদ, মাশরুম আছে?

হঠাৎ প্রশ্নে আমি চমকে উঠি।

-না।

-থাক, লাগবে না। ফ্রিজে চিকেন কিউব পেয়েছি। অলিভ অয়েলে একটু টস করে খানিকটা চিলি সস দিয়ে দিয়েছি। চলবে না? 

-চলবে।

-ওকে। ডান।

ৈআসার পর থেকে মলি এমনভাবে ঘরের কাজকর্ম করছে যে ওকে দেখে মনেই হচ্ছে না যে, ও কখনো এই বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। পিজা ট্রেতে তেল ব্রাশ করতে করতে মলি কপালের সামনের উড়ো চুল টেনে কানের পাশে গুঁজে নিয়ে আমার দিকে তাকায়। জিজ্ঞাসা করা শোভন হবে না ভাবলেও আমার মুখ ফসকে প্রশ্নটা বেরিয়ে যায়,

-জ্যাকব কোথায়?

-ও চলে গেছে। মিশেল আর জ্যাকব একসাথে থাকছে। মিশেল স্প্যানিশ, চমৎকার মেয়ে। 

এবার মলির গলা সামান্য কেঁপে উঠলো। নাহ, এমনও হতে পারে, আমি ভুল বুঝছি।

-ফরহাদ, আমাকে দেখে তোমার অবাক লাগছে না? নির্লজ্জ মনে হচ্ছে?

কথার প্রসঙ্গান্তরে আমি চমকে গিয়ে কথা খুঁজে পাই না দেখে মলি হাসে। ধূসররঙা হাসিতে মলির মুখটি এই প্রথমবারের মতো ম্লান লাগে। আমি স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করি,

-নির্লজ্জ হবে কেন! এদেশে এসে এটা তো বেশ বুঝেছি, নিজের মনমতো জীবনযাপন করাই ভালো। 

-আসলে কী থেকে যে কী হলো। তোমাকে তো কতবার বলেছি, সবকিছুর পরও ভীষণ একা ছিলাম আমি। আর জ্যাকব...

-থাক, এসব বিষয় বাদ দাও। এখন আর এসব ভালো লাগে না। 

মলি কাঁদছে। আমার কাছে ও নিজেকে লুকানোর আর কোনো চেষ্টা করে না। ও এবার হাল ছেড়ে দেয়া ভঙ্গিতে ডিভানের ওপর বসে পড়ে। কান্নার দমকে ওর শরীর ফুলে ফুলে উঠছে। আমি কাছে গিয়ে মলির হাতে হাত রাখি। 

-কেঁদো না।

আমার মুখে বাড়তি কোনো আবেগের কথা আসে না। মলি জলভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে। 

-তুমি পাল্টাওনি। একই রকম নীরস আছো।

টিস্যুতে চোখ-মুখ মুছে নিয়ে মলি স্বাভাবিক হয়। ওভেনে পিজা ঢুকিয়ে সময় ঠিক করে ও আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। 

-ফরহাদ, তুমি বাসা এত পরিপাটি করে রেখেছো! দেখে মনে হচ্ছে আমার অনুপস্থিতিতে তোমার ঘরে কোনো মেয়ে নিয়মিত আসতো। হাহাহা। 

মলির হাসির শব্দে একটা ফিনফিনে শীতল অনুভব আমার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে যায়। তবু আমি নিজেকে গোপন করি। আমি বলতে পারি না, এখানে...এই ঘরে রোজ চুপিসারে কেউ একজন আসতো, সঙ্গোপনে রেখে যেতো প্রগাঢ় মায়ারেখা, অস্পর্শী সুখের তুষারকোমল অনুভূতি। নিঃশব্দে বলে যেতো কতশত কথা! যে কথার বুদবুদে হয়তো আজও ডুবে যাচ্ছে মোবাইলের অদেখা স্ক্রিন। 

আমাকে আনমনা দেখে মলি আমার কাছে এগিয়ে আসে। পুরনো আতিথেয়তায় আমার মাথা ওর বুকের খাঁজে টেনে নিয়ে চুল এলোমেলো করতে করতে আমার কানের লতিতে মিহি কামড় বসায়। আমি শরীরী তাড়নায় উন্মত্ত হয়ে মলিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলি। মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশনের চিরচেনা শব্দ আমাদের ঘায়েল করার আগেই মলি মোবাইলটা ডিভানের নরম ফোমের আড়ালে গুঁজে দেয়। মলির ভেতরে বুঁদ হতে হতে মিতালির পাঠানো অজস্র শব্দরেখা আমার শরীরের রোমকূপে কামনার সুতীব্র কম্পন তৈরি করতে থাকে।

‘এই যে রক্তাক্ত পাঁজরে উদাসী হাওয়ার কাঁপন, দুঃখের মতো সজোরে জাপটে ধরা বাহুডোর, থরোথরো মায়াতিথি... সব মিলিয়ে তোমাকে ভালোবাসি বলেই লাল-নীল জখমগুলো তাজা রাখি। কেউ জানে না, আমি জানি-শরীরস্লেটে তোমার এঁকে দেওয়া প্রতিটি ক্ষত উপভোগ করতে করতে প্রতিবার আমার খুন হবার ইচ্ছে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, সেই সাথে উদগ্র হতে থাকে রক্তঘ্রাণ পাবার গোপন বাসনা।’ 

৪.

আজও সারাদিন রবির মেসেজ আসেনি। এই মাঝরাত অবধিও না। একটিও না। ইনবক্সের সবুজ টিপ জ্বলজ্বল করছে। জ্বলছে ট্রাফিক সিগন্যালের সবুজ বোতাম, জানান দিচ্ছে-‘আমি আছি আমার মতো, তুমি যাও তোমার পথে।’ যেন আমি মুক্ত শুধু চারপাশে নির্দয় কাঁটাতার। যে তার ডিঙোতে গেলেই রক্তাক্ত হবো। চোখের নোনাপথ গলে তুমুল বিস্ফোরণের আশংকায় বুকের জমিন কাঁপছে। শরীরও কাঁপছে আমার! তবে কী এখানেই শেষ! 

আমাকে নিঃশেষ করে কিশোরী মিতালি বিষের পেয়ালা হাতে পুরনো মেসেজ হাতড়ায়। 

-তুমি এত বিষণ্ন কেন?

-বিষণ্নতা আমার প্রিয়সুখ, আমার বেদনার নোঙ্গর।

-আমার ভালো লাগে না। এই থমথমে গাম্ভীর্য, এই উদাসী দিনযাপন ভালো লাগে না।

-আমার ভালো লাগে। বিষণ্নতা দুর্জয় মেঘের মতো পথের সঙ্গী হয়ে আমার পিছু পিছু হাঁটে। যতদূর যাই, ততদূর মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকে।

-তবে তো অনেক কষ্ট তোমার। সারাক্ষণ বিপন্নতার নদীতে সাঁতরে মরো।

-মরি না। সমুদ্রজলে প্রজাপতি সাঁতার কাটি। 

-হুম। আরেক মাইকেল ফেলপস। হাহাহা।

-আরে না, আমি মিতালি। রবি, রণজিৎ দাশের ‘ডিপ্রেশন’ কবিতাটা পড়েছো? ‘যারা আজীবন ফুর্তিতে থাকে, বা থাকতে চেষ্টা করে, তারা একরকমের ক্লাউন। জীবনের সার্কাস-ক্লাউন। তাদের মুখে চিরস্থায়ী আত্মতৃপ্ত হাসি আসলে এক ড্রাগ-খোর মেক-আপম্যান-এর হাতে ঘন সাদা রঙ দিয়ে আঁকা; তারা এক চাকার সাইকেলে চড়ে কেবলই হুমড়ি খেয়ে পড়ে ট্রাপিজ-কন্যার নগ্ন ঊরুর কাছে।’

-বেশ কবিতা তো। এখন তো আমারও বিষণ্নতাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে।

-সে কী, তুমি বিষণ্ন নও! তোমার প্রোফাইল পিকচারে মেঘের ছায়া ঢাকা চোখজোড়া তবে কার!

আজ আমি বিষণ্ন নই। বিষণ্ন মিতালি বাটারফ্লাই স্ট্রোকে জলের বুকে ভেসে থাকে। আজ আমি ওপড়ানো গাছ। সাগরপাড়ার শেষ মাথার তিনতলা ভবনের পূর্বপাশের অন্ধকার ফ্লাটের একমাত্র জীবিত প্রাণি মিতালি। এই ঘরে একটি টিকটিকিও নেই, ঘুণপোকাও না। শুধু আজ ছুটির দুপুরে পাশের বাড়ির রাজা এসেছিল চুপিচুপি। রাজা এই তল্লাটে নতুন, পাশের বাসার ইন্দিরা ভাবী রাস্তা থেকে ওকে কুড়িয়ে পেয়ে নিজের বাসায় তুলেছেন। রাজাকে নিয়ে ভাবীর ন্যাকামির শেষ নেই। যখনই বারান্দায় যাই দেখি রাজাকে কোলে বা পায়ের কাছে নিয়ে বসে আছেন। ওর গলা-মাথায় হাত বুলাচ্ছেন, মুখে চুকচুক শব্দ করছেন। এটাসেটা মুখে তুলে খাওয়াচ্ছেন। আমাকে দেখলেই ইন্দিরা ভাবী মহা আনন্দে হেসে হেসে রাজার গল্প করেন, 

-বুঝছেন আপা, কে বলবে রাস্তা থেইকা তুলে আনছি, একেবারে পোষ মাইনা গেছে। আমি উঠতে বললে ওঠে, বসতে বললে বসে। আপনার ভাই বলে, রাস্তার বিলাই ফালায় দাও। হাইগা, মুইতা ঘর নষ্ট করবো। আমি অরে দুইদিন টয়লেটে যাওয়ার ট্রেনিং দিছি। ছোট বড় দুই কাজের ডাক আসলেই রাজা এখন আমাদের মতো টয়লেটে যায়। হেহেহে, বুঝছেন আপা, আদর পাইলে মানুষ কন আর কুত্তা-বিলাই কন সবাই মহব্বতের দাম দেয়। 

ইন্দিরা ভাবীর গলার অকৃত্রিম আবেগ আমাকে স্পর্শ করে না। আমি দেখেছি আদরের পোষ্যগুলোই চোর-ছ্যাচ্ছড় হয়; অন্যের বাড়ি ঢুকে চুপিসারে খেয়ে আসে, সে সৃষ্টির সেরা জীবই হোক নতুবা রাজার মতো জীব-জন্তু। এই যে এখন যেমন জানালা খোলা পেলে হুটহাট রাজা আমার ফ্লাটে ঢুকে পড়ে। আজ বজ্জাত হুলোটা ডাইনিং টেবিলে উঠে লাউ-বোয়ালের ঝোল থেকে তুলে মাছ খেয়েছে। আমি হৈহৈ করে তেড়ে গিয়েছি। রাজা ওর তুলতুলে শরীর নিয়ে জানালা গলে পালিয়েছে। বাটি সুদ্ধ তরকারি ময়লার ঝুড়িতে ফেলেছি আমি। বিড়াল আমার চিরশত্রু। দুচোখের বিষ।

তৌহিদ বিড়াল ভালোবাসতো। আমার বুকের ভাঁজে মুখ ঘষে হ্যাংলা বিড়ালের মতো মিউমিউ করতো। সুযোগ পেলে নখের আঁচড় বসাতো গালে-হাতে-বুকে-নাভীমূলে-উরুসন্ধিতে। কোনো পুরুষের শরীরসর্বস্ব আকাক্সক্ষার কথা ভেবে এই মুহূর্তে আমার শরীর-মন জুড়ে তুমুল বিতৃষ্ণা জাগছে। মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীর কাছ থেকে আমি প্রচণ্ডভাবে প্রতারিত হয়েছি। 

আমি তো একাকী ভালোই ছিলাম। রবি আমাকে নতুন করে পুরনো সব অনুভবের চোরাস্রোতে টেনে নামিয়েছে। কিন্তু শরীরের প্রতি অঙ্গে আমার কি কোনো গোপন বাসনা লুকানো ছিল? তাহলে রবিকে কেন একা দোষারোপ করছি? নিজের মনের বিপরীতমুখী অবস্থানে এই মাঝরাতে আমার খুব অসহায় লাগে। সত্যি, রাতের অন্ধকারে বিপুল পৃথিবীতে নিজেকে একা আবিষ্কার করার মতো দুর্বিষহ যন্ত্রণা বোধহয় দ্বিতীয়টি নেই। এই যে বুকের তেপান্তরে দস্যি ঘোড়া ছুটে চলে এলোমেলো; খুরের আঘাতে ক্রমাগত খুঁড়ে চলে বিজন প্রান্তর, যন্ত্রণার তীব্রতায় কেবল মনে হয় কত শতাব্দী ধরে আমি একা আছি! সঙ্গীহীন, স্পর্শহীন। 

আমি টের পাই কদিন ধরে আমার দুর্যোগ বাড়াতে অন্ধকার ফুঁড়ে রাজা আসে। আজও এসেছে। রাজা বড় নিঃশব্দে হাঁটে। আমি ঘরের মেঝেতে রাজার সাবধানী পদচারণা টের পাই। রাজার সবুজাভ চোখ অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে। আমি ‘যা’ ‘যা’ বলে ওকে তাড়াবার চেষ্টা করি। কিন্তু ঘরের সবুজ আলো নেভে না। অন্ধকারে সেই আলো দেখে বড় বিপন্ন লাগে। 

কে? রাজাই তো? না কী তৌহিদ? রবি নয় তো? 

এবার প্রাণিটা এক লাফে আমার বিছানায় উঠে বসে। আমি ধড়ফড় করে উঠতে গিয়ে টের পাই ও আমার বুক পর্যন্ত চলে এসেছে। ওকে টেনে হিঁচড়ে বুকের ওপর থেকে সরাতেই ও আমার জামা খামচে পেট বরাবর নেমে আসে। চারপেয়ে ধূসররঙা রাজা! রাজা আমার নাভীমূল খামচে ধরেছে, আমি যতোই ওকে বাধা দেবার চেষ্টা করছি ও ততোই আমার শরীর খুঁড়ে চলেছে। ওর মুখে আহ্লাদী ঘরঘর শব্দ কানে আসতেই এবার আমি পাগল হয়ে যাই। হৈ হৈ করে উঠে বসে এক ঝটকায় হুলোটাকে অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলি। তারপর বিভ্রমের খোল ভেঙে বের হয়ে আসতেই প্রগাঢ় একটা ভয় আমাকে ঘিরে ধরে। 

আমি ঘেমে একেবারে নেয়ে উঠেছি। বেডসাইড টেবিল থেকে বোতল নিয়ে ঢকঢক করে অনেকটা পানি খেয়ে যান্ত্রিক ভঙ্গিতে মোবাইল হাতে তুলে নিই। রবি কোথায়? ওর সাথে কথা বলার ইচ্ছের তীব্রতা আবার আমাকে রক্তাক্ত করে তোলে। 

রবির মেসেজ এসেছে কিনা চেক করার আগে ফেসবুক নোটিফিকেশনে চোখ যায় আমার। ও প্রোফাইল পিকচার পাল্টেছে। আমি স্থিরদৃষ্টিতে রবির প্রোফাইল পিকচারের দিকে তাকিয়ে থাকি, চমৎকার একটি যুগলছবি। রবি মলি হোসেন নামের একটি মেয়েকে ট্যাগ করে ফটো অ্যালবাম শেয়ার করেছে। ত্রিশটি ছবি। আমি একে একে সব ছবি দেখতে থাকি। রবি আর একটি মেয়ে পরস্পরের দিকে বরফের বল ছুঁড়ছে, দুজনে গালে গাল লাগিয়ে উষ্ণতা ভাগ করে নিচ্ছে, একসাথে বরফের আইসক্রিমে কামড় দেবার ভঙ্গি করছে...অপূর্ব সব স্থিরচিত্র! 

আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি, ঐ ভিনদেশ আসলেই সুন্দর। সেই সুন্দরে দুজন পৃথিবীবিচ্ছিন্ন মানুষ বিভ্রমের ঘোরে বন্দি। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ছবিগুলো দেখতে থাকি। দশ মিনিটের মধ্যে রবির ফটো এ্যালবামে একশো লাইক আর বিশটা কমেন্টস পড়েছে। ছবিগুলো দেখতে দেখতে আমার চোখ জ্বালা করে। আমি টের পাই আমার ঠোঁটের কোণে হাসির ফুলকি। এই হাসি আমার জীবনের মতো নির্জন। সেই নগ্ন নির্জনে মগ্ন হতে হতে আমি কম্পনহীন হাতের স্পর্শে রবিকে আনফ্রেন্ড করে দিই।

1 টি মন্তব্য: