সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায় 'এর গল্প : স্বজন প্রিয়জন

সামনে লম্বা পাকা দালানের টানা বারান্দায় বসে রকিব রঙের তুলিটা মগের জলে ডুবিয়ে রাখে। সামনে, উঠোনে কঞ্চি-বেড়ার ঠেকানোয় হাইব্রিড টম্যাটো গাছগুলো নরম শাখা লকলকিয়ে দোলে। আধ পাকা টম্যাটোয় ভারী ডগা বহুকষ্টে দোল সামলায়। গোটা উঠোনের বাগান সীমানায় পুরোনো ঘরের টালি সাজিয়ে এক ফুট উঁচু ঘেরের ওপারে বাগান। এপারের দিকটা যাতায়াতের পথ।

পথ মাড়িয়ে খুব সাবধানে কালো গণেশ ঢোকে। রকিবের সামনে অঙ্ক শিক্ষার ছাত্রটার নজরে গণেশ। বেগ সাহেব নিজেরই উদ্বিগ্নতায় রেডিও খোলে। চৌখুপি বাক্সটার ফুট ফুট জালের মধ্যে থেকে বাক্য ফোটে, “কলকাতার কতকগুলি উপদ্রুত এলাকা এখন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর আয়ত্তে এসেছে। গতকাল উত্তেজনায় ন'জনের জীবনহানির খবর পাওয়া গেছে। আজ সারা দিন রাত কার্ফু জারি করা হয়েছে।” 

ডিসেম্বরের আকাশে শীতের হাওয়া। আকাশে খানিক রোদ্দুর। গণেশ মোটা চাদর গায়ে জড়িয়ে হাতে চটের ব্যাগটার ভার সামলায়। ছাত্রটা বলে, কাকু কে এসেছে যে? 

রকিব দাওয়া থেকে মুখ বাড়ায়। গ্রিলের ওপারে গণেশ। শীত বলে তার কালো মুখের চামড়ায় টান। ঠোঁটে জাড়ের শুকনো দাগ । ফেটে রক্তমুখো চেরা ভাঁজ। রকিব হাঁক দেয়, ও মিতা এদিকে এসো—গণেশ এসে গেছে......। 

লম্বা দালান ছাড়িয়ে ওপাশে আলাদা রান্নাঘর। ঘরের পাশে চারপাঁচ বছরের নারকেল গাছটা ছাউনি ছাড়িয়ে খানিক উঁচু। রান্নাশালের বাইরে এসে খুঁটি ধরে দাঁড়ালে রঙ্গন ঝাডের পাশ দিয়ে রকিবের দাওয়ার সব কিছু নজরে পড়ে। সেই নজরের সরল রেখায় গণেশ চাদর মুড়ি দিয়ে পিছনে তাকায়। মিতা মণ্ডলও তাকিয়ে হাসে, গণেশশদা–ঘরে বসো।। 

বাপের বাড়ির মজুর মনিশ মানুষ। সব আত্মীয় স্বজনের বাড়ি যাতায়াত যোগাযোগের বাহন পুরুষ। বুকের ভেতর চমকে যায় মিতার। মানুষটাকে বেয়ে বাপের বাড়ির গন্ধ। প্রবাহ। বাবা তো ত্যাজ্য করেছে। মা চাইলেও আসতে পারে না। ছোট ভাইরা খেয়ালে আসে। চার তানা আট আনা পয়সা পেলে খুশি। বড়দা... ! ভেতরটা একদম কেঁপে যায় মিতার। মিলিটারির লোক। পারলে বুকে রাইফেল ঠেকিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট না-হয়ে নিশ্চিন্তে ট্রিগার টানবে! দাদাটা যে কতবার শাড়ি, কানের বড় বড় আদিবাসী মাকড়ি অন্ধ্র থেকে এনে দিয়েছিল। রকিব নামে বন্ধুকে বর হিসেবে পেয়েও এখনও যে কত কি পেতে হচ্ছে করে। ভরাট বুকে ভরা মনে তবুও যে কত ফাঁকা লাগে মাঝে মাঝে! 

রেডিও তখনও বলে যায়, “মহারাষ্ট্রে নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধিতে কেন্দ্র সরকার উদ্বিঘ্ন। আরও সেনাবাহিনী পাঠানোর চিন্তাভাবনা চলছে। সারা দেশে পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অযোধ্যায় সেনা টহলদারি চলছে।” রেডিও শুনতে শুনতে ইয়াকুব বেগের কান গরম হয়ে যায়। প্রায় দেড়’শ ঘর মুসলমান মানুষ নিয়ে এই হাইল্যান্ড। নিজেদের পুকুর ঘাট চাষের জমি তো সরকারি অবাধ বাণিজ্য প্রকল্পের মাটি'তলায়। পাকা প্রাচীরের মধ্যে ক'ঘর হিন্দু যা বড় পুকুরের ওপাশটায়। তারপর চারদিকের গ্রামগুলো হিন্দু পল্লী। ভাবতেই আতঙ্ক...খানিক অবিশ্বাস বুকের মধ্যে জন্ম নিতে চায়।। 

অঙ্কন শিক্ষার ছাত্রটা বলে, কাকু-- 

--বলো? 

—এই ছবিটা এখেনে রঙ করবো ? নাকি বাড়ি থেকে করে আনবো পরশুদিন ? 

রকিব হাসে,—তোর কি খুব ইচ্ছে করছে বাড়িতে চলে যেতে? 

উত্তর না দিয়ে চুপচাপ নির্মল। ক্লাস ফোরের ছাত্র। রেডির খবর শুনে কেমন আবছা আঁধি। খানিক বোঝে, খানিক বুঝতে পারে না। বাড়িতে বাবা কাকারা যে আলোচনা। করে, একটু হোক । বড্ড বাড় বেড়েছে। পাকিস্তানের দরদে--। কোথায় কে পাকিস্তানের...কিসের জন্যে...সে সব স্পষ্ট নয়। তবু নির্মল যেন আর থাকতে চায় না। হঠাৎ বলে ফেলে, কাকু যাই না? পরশুদিন আরও দুটো করে আনবো-- 

সাদা আর্টপেপারে ছেলেটার হাতে আঁকা অতো সুন্দর একখানা গরু! গণেশ অবাক হয়ে দেখে আর ভাবে, মিতার আর দু-দুটো ভগ্নিপতির একজন জমিজমা চাষবাস করে আর একজন তো শুধু দিনরাত চাকরি করে। কেউ তো অমন গোটা দেহ... প্রাণী আঁকতে লিখতে পারে নি। 

ইয়াকুব বেগ লুঙ্গিতে মুখ মুছে শরীরের উত্তেজনা কমায়। কানের দু-পাশে উষ্ণত দমায়। তখনই পাশ দিয়ে রঙিন শাড়িতে মিতা হেঁটে যায়। কাচা কাপড়ের গন্ধ। কব্জি ঘিরে চুড়ির রিন ঠিন বাজনা । রূপোর আঙটের ঝিনিক ঝিনিক সুর সিমেন্টের মেঝেয়। যেমনটি বিয়ের আগে মেয়ে ফতিমা রুক্সানারা হেঁটে যেত! কি করে যে ভাবি, বউমাটা হিন্দু মাহিয্য বাড়ির মেয়ে! আচমকা মনে হয় ইয়াকুব বেগের, এ মেয়েটা তো আমাদের আত্মীয় কুটুম্বদের মধ্যে একেবারে অন্য জাত... ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ! নিজের কাছে ছোট হয়ে দেহের তাপ জুড়িয়ে যায়। বরং ভাবে, বেচারা রান্না করে ভাত বেড়ে দেয়,অসুখ হলে গায়ের কাগজ পড়ে পড়ে কোন ওষুধ কার পরে বলে বলে দেয়... সে মেয়েটা এই মারদাঙ্গা রক্তারক্তির সময় কেমন মনে কাটাচ্ছে? মুসলমান বাড়িতে তো ও একলা হিন্দু মেয়েছেলে! | 

ইয়াকুবের গায়ের কাছ থেকেই সাগ্রহে চেঁচায়, কি গো গণেশদা তুমি এত সকালে? 

--তোমার বাবা, বলেই চেপে যায়, তোমার মা আমাকে সকাল বেলায় তিষ্টাতে দিলে? খালি বলে, যা না- ও গণেশ যা না মিতেটার বাড়ি-- 

বাবার কথায় আঁচড়ে যায় বুকের ভেতর। মায়ের পীড়া-পীড়ির বর্ণনায় চোখের কোণে জলের কুঁচো, ঠোঁটে হাসি খেলে মিতার। ফরসা মুখে গোট গোটা চোখে রকিবের অগাধ জিজ্ঞাসা, শ্বাশুড়ি আসতে চায় নি? এসে কি, কোথাও দাঁড়িয়ে আছে? 

–তোমার চাদরটা বেশ বরকর্তার মতো গো? ঠাট্টায় জেরবার করতে চায় মিতা। বলে, গণেশদা—তোমার বিয়ে করে ফেরার সময় গাড়িটা কি গোলমাল করেছিল গো? 

গণেশ কপটরাগে ধমকে ওঠে, দুস। তুমি বিয়ে থা করে বউ হয়ে গেলে। এখনও কি তুমি ইস্কুলের মেয়ে আছ? সেই কথা শ্বশুর ঘরে তুলে আমাকে বোকা করে দিচ্ছো ? 

রেডিও তখন বন্ধ। শ্বশুর বেগ সাহেব হেসে কাছে আসে, কি ব্যাপার গো গণেশবাবু—? 

গম্ভীর মানুষ শ্বশুর ইয়াকুব বেগ। সেই মানুষও আগ্রহে জানতে চায় ব্যাপারটা। গণেশ আর মনিবের কচি মেয়ে মিতার উপর রাগ পুষে রাখতে পারে না। পারে না বলেই বেগ সাহেবকে সম্মান দিয়ে বলে, ও আপনার বউমার কথা ছেড়ে দিন। বাপের বাড়ি আমাকে জ্বালাতন করতো। এবার আপনার বাড়িতে আমাকে পেয়ে জ্বালাচ্ছে-- 

একটা বড় আসনে বাবু হয়ে বসে গণেশ। একটু তফাতে বেগ সাহেব। খবর শুনে উত্তেজনা আর উষ্মা কমাতে তবু একটা বিষয় পায়। গণেশকে কাছে পেয়ে বেগ সাহেব আশ্বাস দেয়, ঠিক আছে--। আমি তো আছি? 

গায়ের চাদর সরাতে পুরোতন জামাটার শত ভাঁজ দেখা যায়। বেগ সাহেব ফট করে বলে, গণেশবাবুর জন্যে একটু জলখাবার দাও-- 

গণেশ মূল কর্তা বেগা সাহেবের আতিথেয়তার আতিশয্যে খুশি হয়ে বলে, বুঝলেন বাবু— 

হ্যাঁ, বেগ সাহেব সায় দেয় যে মনোযোগী হয়েছে। 

গণেশ একটু নড়ে চড়ে বসে বলে, জানেন বাবু—বে করে সকাল বেলায় ফিরতেছি। এক রিকশায় বউ আর আমি । গাড়ি টানতেছে শালা বাদল পাড়ুই। চওড়া মেটে রাস্তা। বেশ আসতেছি। হঠাৎ কোথাও কিছু নেই দুম করে টায়ার গেল ফেটে! | 

—এই রে! বেগ সাহেবের গলায় উৎকণ্ঠা। 

গণেশ থামিয়ে দেয় বেগ সাহেবকে, শুনুন তারপর। শালার বাদল একটু চালিয়ে বলে, গণেশদা মাইরি রিকশার রিং বেঁকে যাবে। একজন লাব— 

–এই রে? একটু হাসি বেগ সাহেবের মুখে। ...তারপর আমি হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি পাশে পাশে। গলায় ফুলের মালা, মাথায় টোপর, ঝিকিমিকি পাঞ্জাবি। তোমার বউমার বাবা ধুতি পাঞ্জাবি কিনে দেছিল। সেই সব পোষাক পরে আসতেছি। ছ্যাচড়া বাদলটা বলে, মাইরি গণেশদা চাকায় হাওয়া নেই। বউকে ঢেলা রাস্তায় নে যাতে আর একটা টায়ার যদি ফাটে ? ঘরে পৌঁছবি কেমন করে ? 

আমি বলি, তাহলে! 

শালার বাদল বলে, তবে দাদা তুই রিকশাটা ঠেলে ঠেলে চল। আমি চালাই— 

--বাহ, বেশ তো ? তখন রাস্তায় লোক দাঁড়িয়ে যায় নি ? 

—দাঁড়ায় নি আর ? একবার টোপর পড়ে যায় সেটা তুলি তো মালা ছিড়ে যায়।। 

সকলে হেসে ওঠে। মিতার সঙ্গে রকিবও। রকিবের চোখের সামনে ভেসে ওঠে গণেশের সেই বিয়ে করে ফেরার দৃশ্য। আর আমার নিজের বেলায় ? বিয়ের জন্য মেয়েটাকে নিয়ে তো পলাতক। এত বিস্তারিত বলার সহজ গতিটা কোথায়! গুম হয়ে ভাবে রকিব।। 

বেগ সাহেব হাসতে হাসতে বলে, তা হোক— চিরকাল ভার টানতে যখন হবেই, না হয় প্রথম দিন থেকে তুমি শুরু করে দিয়েছ। 

গণেশ সহমর্মী পেয়ে বলে, বাবু তা যা বলেছেন। 

রকিবকে অমন চুপচাপ দেখে গণেশ হাঁক দিয়ে বলে, কইগো জামাই ব্যাগটা খালি করে দাও। তোমার শাউড়ি কি পাঠিয়েছে নাও তাড়াতাড়ি— 

মিতা হাসি মুখে দাঁড়িয়ে দাঁতে নখ কাটে, খবর কি সকলের? 

–খবর আর কি? দেশ শুদ্ধ গোলমাল দাঙ্গা-হাঙ্গামা—তুমি আর জামাই কে কেমন আছো জানতে পাঠালে— 

কথাবার্তা একান্ত জামাই মেয়ে ঘিরে। তাই বেগ সাহেব উঠতে উঠতে বলে গেল, গণেশবাবুকে একটু কিছু করে খাওয়াও টাওয়াও-- 

মিতা হাসে। বাপের বাড়ির উৎকণ্ঠায় আনন্দ পায়। শ্বশুর জায়গাটা ফাঁকা করে দিয়ে যেতেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে ইচ্ছে করে, হা গণেশদা-- কে পাঠালে? বাবা না মা? 

গণেশ মিতার আন্দাজ বুঝে সন্তোষ প্রকাশ করে বলে, তোমার বাপ তো বেশি ছটফট করছে। 

--তাই! মিতার বিস্ময়ে রকিবও খুশি। 

--কী বলেছে? যেন নাড়ির শব্দ শুনতে চায় মিতাটা। 

গণেশ এপাশ ওপাশ দেখে ফিসফিস করে বলে, একলা মেয়ে... চারপাশের লোক কুটুম্ব তো... ভিন জাতের ? 

রকিব উৎসাহে এগিয়ে আসে, তারপর ? 

যাবে আজ তোমার বন্ধুর বাড়ি মিতুকে নিয়ে ? তাহলে, মেয়ের সঙ্গে মা দেখা করবে। দু-চোখ ভরে মেয়েকে...আর জামাইকে দেখবে— 

- -কখন? রকিব শুধোয়। 

–বিকেলে? তিনটে চারটেয়? 

মায়ের আকুতিতে মেয়ে নিজেই ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। রকিব দু-চোখে প্রশ্রয় এনে গণেশকে দেখে মিতার চোখে মুখে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে। মেয়েটা কিশোরী কালের অভিমান ফুটিয়ে গোমড়া। 

বেগ বাড়ির জামাই ব্যস্ত হয়ে গ্রিলের ওপাশ থেকে হাঁকে, ও রকিব? 

—কী বলছে গো সাজাহান ভাই? 

--একটু সময় দিতে পারবে? দশজন লেবার লেগেছে বাণিজ্যকেন্দ্রে। ফাউন্ডেশনের দরমশ পেটাই হচ্ছে। কোম্পানীর সাহেব দু-একদিনের মধ্যে দেখতে আসবে যে? 

—তুমি...মানে তুমি..., জিজ্ঞেস করতে বাধে কোথায় যাবে বাড়ির জামাই। কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কের লাইসেন্সী। মূলধনের যোগানদার বেগ সাহেব। সুতরাং একটু কাজের তদারকি করলে স্টোন চিপসের তাগাদাটা করে আসতে পারে। বেগ বাড়ির জামাই গ্রিলের ওপার থেকে তেমন সাড়া না-পেয়ে নিরুৎসাহ। ফলত গভীর ভাবে বেঁটে-খাটো লোকটা আরও এগিয়ে যায় রান্নাশালের দিকে। মূল কর্তা শ্বশুর ইয়াকুব বেগের খোজে।। 

রকিব একটু অবাক হয় ! ভাবে, লরি টেম্পো পাবে কাল? স্টোন চিপস আনবে কেমন করে? 

কাচের প্লেটে রঙিন সিমুইয়ের উপর কুচো বাদাম পেস্তা চেরিফল ছড়িয়ে মনোরঞ্জক করে আনে। বড় খোলের চামচটায় গরম ভাপে খানিক বাষ্পকণা। রকিবের বোন প্লেটটা ধরে এনে বসিয়ে দেয় গণেশের সামনে। মিতা জলের গ্লাস ধরে বলে, ও গণেশদা হাত ধোও— 

খিদের মুখে অমন রঙদার খাদ্য। গাওয়া ঘিয়ের সেন্ট। ভেতর থেকে লোভ মিলিতভাবে গণেশকে উদ্যোগী করে তোলে। একটু জলে হাত ধুয়ে প্লেট থেকে চামচে সরিয়ে গব গব করে খায়। খেতে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করে। 

নারকেল নাড়, মুড়ির ছাতু আর স্টীলের চকচকে টিফিন কৌটোয় ক্ষীর। জিনিসগুলো রাখতে রাখতে মায়ের হাতে শাঁখার শব্দ কানে আসে। রক্ত নাচে পুরাতন আলোড়নে। নিজের হাত ওল্টাতে মিতার চোখে লাগে, গুচ্ছের কাচের চুড়ি। হঠাৎ মনস্থির করে, এবার হাটে একগাছি শাঁখা পরলে কি রাগ করবে? 

গণেশের হাতে কাচের প্লেট ফাঁকা ! এত দ্রুত মানুষটা সব খেয়ে নিয়েছে। জলের গ্লাস মূহুর্তে নিঃশেষ। একটু উদগার তোলে গণেশ। মিতা বলে, গণেশদা— 

–থাকো না এবেলা আমাদের এখানে? ভাত খেয়ে বাড়ি যাবে। 

–একদম না। একদম না এক্ষুণি ফিরে তোমাদের বিত্তান্ত সব বলতে হবে তোমার মাকে বাবাকে--। যতক্ষণ না ফিরি তারা চান খাওয়া করবে নি— 

শুনে ভালো লাগে আবার অভিমানে চোখ ভারী। মনে ভাবে, এতদিন...এতমাস পরে খোঁজ নেওয়ার ইচ্ছা জাগলো! ভালোবেসে, না ভয়ে, কোথাকার কি অযোধ্যা মযোধ্যা...? তার জন্যে আমাদের হাইল্যান্ডে কিসের কী? ছেলেবেলার বন্ধু, কলেজের সহপাঠী। তাকে আবার এত আতঙ্কের কী আছে বাপটার। মা টার। | 

চটের ব্যাগ নিয়ে গণেশ বলে, টিফিন ডিবেটা তোমার জন্যে গো। ফেরত দিতে হবে নে—তোমার মা বলে দিয়েছে।। 


রকিব এগোয়। পিছনে মিতা। 

বাবা আসেনি ঘর বয়ে। মা আসে নি অন্দরমহলে। বাপ মায়ের আস্থাভাজন লোকটাকে দুই-মানুষে উঠোন, রাস্তা অলিন পরম মমতায় এগিয়ে দেয়া। 

গণেশ দু-এক পা গিয়ে আবার পিছু ফিরে বলে, তোমরা যাও গো—ঘরে যাও । 

চোখ ভর্তি হয়ে রুদ্ধ যাতনা। বিছানো ইটের বাঁকা পথে হারিয়ে আড়ালে মিশে যায় মানুষটা। মিতা আর রকিব গায়ে গায়ে ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জাত হারিয়ে দুই নরনারীর মতো নির্বাক তাকিয়ে থাকে। গণেশটা কোনকালে রক্তের কেউ না। তবুও দু-দুজনের বুকের কোষে টান জাগায়। 


উঁচু পাঁচিল ঘিরে অবাধ বাণিজ্যকেন্দ্রের বিশাল সংরক্ষিত এলাকা। উঁচু উঁচু বাড়ি। মেঝেয় চা প্যাকেজিংয়ের কাজে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা বড়সড় বউ, পুরুষ কর্মীদের সঙ্গে কাজ করে। কথাবার্তায় কলরোল। বিল্ডিংটার সামনে স্টীলবডির কনটেনার নিয়ে লরিটা দাঁড়িয়ে। পেটি বাঁধা হচ্ছে। মাথা মোটে বোঝাই হয়ে জাহাজে করে চলে যাবে মস্কো।। 

রঙচঙে অ্যাডমিনিসট্রেটিভ বিল্ডিংয়ের সেমিনার হলের বারান্দায় রোদুরের ফলক। মাঝ আকাশের সূর্যটা ক্রমশ পশ্চিম মুখো। বেগ সাহেবের বাগানের হাইব্রিড টম্যাটো ঝাড় ডিঙিয়ে রঙ্গনের থোকায় থাবা থাবা লাল।। 

রকিব পয়েন্টেড পেনে মুক্তোর মতো ঝকঝকে বর্ণে বিয়ের কার্ডের উপর লেখে “সুধী”। আগামী ২০ শে ফাল্গুন আমার তৃতীয়া কন্যা শ্রীমতী ডলি রানীর সহিত মাথুর নিবাসীশ্রী..।”কলমের ডগায় নিবিষ্ট মন। অক্ষরগুলো ঝলমল করে। চিঠি পিছু একটাকা পরিশ্রমিক।। এখনও খানকুড়ি বাকি একশ পূরণ হতে। সুতরাং শ্রম পারিশ্রমিক আর শিল্প মগ্নতায় রকিব তলিয়ে গেছে! 

মাথার চুল টেনে টেনে আঁচড়ে নিয়ে চিরুনির চুল ছাড়ায় মিতা। তখন ইলেকট্রনিক ঘড়িতে ঢং ঢং করে তিনটে ঘন্টা পড়ে। ছটফট করে সারা দেহে মিতা। কাছে এসে বলে, তোমার অনেক দেরি? হাতের কলমটা এক গেলাস তুলি পেনসিলের ভিড়ে গেঁথে রেখে বলে রকিব, কেন? 

—ভুলে গেচ ? 

—কী! 

তেলে ময়লায় ঘষে ঘষে ঝাড়নটা কালো। সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঘষে রিং দুটো নাম মাত্র মোছে। একবার টানতে শুকনো ধুলো ঝরে গিয়ে যেন আয়না। বেল 'টার গায়ে বার তিনেক চেপে চেপে ঘষে রকিব। বাহনটার সিটে জোরে চাপড় মারতেই গোটা সাইকেল নেচে ওঠে। বার দুয়েক বেল দেয়। দাওয়ার উপর ক্রিং ক্রিং বাজে। ঘেরা দেওয়াল বারান্দায় আওয়াজটা স্থায়ী হয়। 

ইয়াকুব মুখ বাড়িয়ে দেখে, উঠোন ফাঁকা। কেউ তো আসেনি! যহেতু আসেনি, সংশয়টা জন্মায় দ্রুত। বিছানায় ভাত ঘুম কেটে গেছে। রেডিওর খবর শুনে উশপাশ করেছে বেগ সাহেব। মেটিয়াব্রুজের পর ট্যাংরায় উত্তেজনা হঠাৎ বুদ্ধি পেয়েছে। বোম্বাই শহরে মৃতের সংখ্যা বর্দ্ধিত। নিজেদের বসবাসের স্থানটুকুর বাইরে তো চারদিকে ভিন্ন গাঁ—গ্রাম। ভিন্ন ধর্মের সম্প্রদায়। চাপা আগুন হাওয়া পেলে ছড়িয়ে যেতে কতক্ষণ। সেই আগুন যদি শুকনো পাতানাতা খটখটে ডালপালা পায় ? 

দরজা থেকে আবার মুখ বাড়ায় ইয়াকুব বেগ। বারান্দায় সাইকেলটা মোছামুছি করছে রকিব। পায়ে পায়ে কাছে যায় বেগ সাহেব। জিজ্ঞেস করে, সাইকেল কি করবি? চারদিকে গোলমাল, বাবার কথায় মুখের দিকে তাকায় রকিব। 

বাবা ফিসফিস করে বলে, কোথায় কবে কার সঙ্গে মন কষাকষি আছে...সেটা তোকে একলা পেয়ে যদি শোধ নিতে আসে এই দাঙ্গা হাঙ্গার গরমে! আমরা তো মাত্র ক'ঘর...চারদিকে তাকিয়ে দেখেছিস? 

সাইকেলের সিটে মোটা স্প্রিংয়ের ফাঁকে ন্যাকড়া ঢুকিয়ে মুছতে মুছতে থমকে বাপের কথার মর্মে ঢোকে। সবই তো সত্যি। তারপর গড়ে উঠেছে যে সত্যিটা জন্মস্থানের গাঁ--গ্রাম দেশ এটা। ছেলেবেলা থেকে স্কুল, মাঠে খেলাখেলি, কলেজে এক সঙ্গে যেতে আসতে কত বন্ধু...হাটবারে চা তেলেভাজা মুড়ি নিয়ে খোস গল্প। বাড়িবাড়ি ছাত্রদের হাত ধরে আঁকা শেখানো...তারপরও বোম্বাই কলকাতার দাঙ্গা আমার উপর শোধ নেবে। হয় নাকি তা! বাবাটা এত বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে! 

ফরসা চেহারায় মিতা। ডান হাতে কাঠালি চাপার পাপড়ি রঙের শাড়ি বাঁ-হাতেরটা বেগুনি রঙের সিঙ্ক, কোনটা পরবো বলো তো? 

শ্বশুর বেগ সাহেবকে দেখে অগোছালো আঁচলে বুক ঢাকে, গা ঢাকে মিতা। উৎসাহ নিভে যায়। তাপ থাকে মনে। ইয়াকুব বেগ হঠাৎ বলে, যাবি তো বেলা থাকতে যা। 

ফরসা মুখ বড় বড় চোখ সাদা দাঁতে বউমা মিতা মন্ডল প্রশ্রয়ে মিতা বেগ হয়ে অনুঢ়া ননদ শাকিলার আদলে হাসে। 

ইয়াকুবের চোখে মিতা তখন নিকটজন...পরবর্তী বংশের উৎসধার হয়ে প্রিয়জন। লম্বা ঘর দালানের টানা বারান্দায় বিপন্ন পায়ে ধীরে ধীরে হাঁটে বেগ সাহেব। ধান চালের পুরোনো কারবারী বংশের সন্তান। 

উঠোন ডিঙিয়ে রঙ্গনের পাপড়ি ছেড়ে সূর্যটা এখন রকিবের ছাদ টপকিয়ে একেবারে গাঙের আকাশে। যেহেতু ডিসেম্বরের শেষ বেলা, চারপাশে শীতের আঁচড়। রকিব সাইকেলের পিছনের সিটে মিতাকে বসিয়ে হ্যান্ডেলটা আঁকা বাঁকা ঘুরিয়ে প্যাডেল মারে।। আশ্বাস দেয়, ভয় নেই। ভালো করে ধরবে— 

ব্রিক ব্যাটস বিছিয়ে রোলারটানা রাস্তাটা মিশেছে পাকা রাস্তায়। উঁচু পাঁচিলের মাথায় মোটা পাটির “ওয়াই”মার্কা এ্যাঙ্গেল।। “ওয়াই’’য়ের দুই ডানার ছিদ্র পথ দিয়ে কাটাতার টান টান ঝুলিয়ে বেড়া বা ফেনসিং। যেহেতু ফেনসিংয়ের গা-ধারে পাকা রাস্তা একে বেঁকে চার নম্বর প্রজেক্টের এরিয়ার মধ্যে, নাম ফেনসিং রোড। লোক মুখে ফ্রেঞ্চ রোড। 

কাঁঠালি চাঁপার পাপড়ি রঙের হলুদ সিল্ক শাড়ি। মিতার গায়ের রঙে শাড়িতে বেলা শেষের অস্তমুখী সূর্যটার লালচে আভা ছিটিয়ে ছিটকে লেগেছে। চকচকে হ্যান্ডেলেও সেই দীপ্তি। রকিব একবার পিছনে তাকিয়ে রঙের ছটা সাব্যস্ত করে সম্মুখে তাকায়। তখন পাঁচিলের মধ্যবর্তী মাঠ বাদা পার হয়ে জাহাজ নিশানা স্তম্ভটার দিকে চোখ যায় । নিশানা স্তম্ভটার মাথায় নিটোল সূর্য। সাদা নিশানা। স্তম্ভটার মাথায় দপ দপ আলো জ্বলে আর নেভে সারারাত ধরে। দূরের জাহাজ সিগন্যাল পায়। আলোর কাচ বাঁচাতে লোহার রডের চাকন ঘেরা--। রোদ্দুর হারিয়ে সুর্যটা যেন নিশানা স্তম্ভের চাকনে আটকে গেছে। 

রকিব চলন্ত সাইকেল থেকে দৃশ্যটা দেখে। আকাশ আগলে রেখেছ গোলাকার পিন্ডটাকে। তেজ হারিয়ে ঝিমিয়ে রয়েছে স্তম্ভের মাথায়।। 

দামী শাড়িটাকে ভাঁজ বিধ্বস্ততা থেকে রক্ষা করতে যতটুকু সম্ভব আলগা হয়ে বসেছে মিতা। পিছনের সিটে সরু রড লাগে। অস্বস্তিতে মিতা বলে, কি গো, চালাচ্ছে না। 

রকিব লজ্জা পেয়ে প্যাডেলে জোরে চাপ দেয়। মসৃণ পাকা রাস্তায় সাইকেলটা গতি পায়।। 

--চলো না ? এতদিন পরে খোঁজ ? মাকে যা একচোট নোবো না...! 

সাইকেল হাওয়া কেটে, পাশে আবাদী মাঠ রেখে, পরপর মিশড়া পরশুরামপুর তিলা সুবলবেড়ে গ্রাম, গ্রামগুলোর মধ্যে নিজের হাইল্যান্ড কলোনি রেখে এগোয়। নিজেদের ক'ঘর মানুষ সেখানে! 

দুদিকে বন সৃজনের ঝাউ রাবার আকাশমণি গাছ শাখা-প্রশাখা দুলিয়ে ঝুঁকে আছে পাকা রাস্তায়। গাছের গোড়ায় নতুন চালা বেঁধে চা-দোকান। দোকানের সামনে পাঁচ-ছ'জন মানুষ বুক্ষের মধ্যে দাঁড়িয়ে। যেন বীজ ছড়ালেই অসংখ্য বৃক্ষ চারা জন্ম নেবে চকিতে। 

মানুষগুলোকে দেখে রকিবের মধ্যে অঙ্কুরোদগম হয়। এক গোপন বৃক্ষ জেগে ওঠে! প্যাডেলে জোর কমে। সাইকেলে গতি মন্থর। 

মিতা বলে, কই গো—চালাচ্ছো না? 

মিতার স্বরে ঘনিষ্ঠ আকুতি ! আচমকা মনে হয়, রকিবের, আমাদের পরিবারে এ একলা...। বাপ মা সব ছেড়ে ছুড়ে আজ একলা...। 

সুতরাং জোরে প্যাডেল চালায় সম্মুখের পাঁচ ছ’জন মানুষকে কাটিয়ে হাওয়ায় মিশে যায়। মিতা সিট ছেড়ে রকিবের কোমর পিঠ আঁকড়ে বলে,.. দাঁড়িয়ে থেকে থেকে মা যদি চলে যায়...!

1 টি মন্তব্য: