সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

মৌসুমী কাদের'র গল্প : কবরীতে করবী ফুল

১. 
চারদিকে বসন্তের হাওয়া বইছে। আশপাশের বাড়িগুলোতে টিউলিপ ফুটছে। মেপল্‌ গাছের কচি পাতাগুলো সবে গজাতে শুরু করেছে। বিকেল হতেই ছেলেপুলেরা রোলার স্কেট নিয়ে গলির রাস্তায় খেলতে নামছে। এরকম একটা দিনে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই ‘ডাফিস ড্রাইভ-ইন’ পাবের লোকগুলো চেনা আহ্লাদে দুলতে থাকে। দেখে মনে হতে পারে যে ওরা কাঁদছে। কিন্তু এলেহান্দ্রো বোঝাতে চেষ্টা করে যে, ‘ওটা হাসি, কান্না নয়'। মানুষের হাসিও এমন হয়? এলেহান্দ্রো মেক্সিকান খাবারের দোকান ছাড়া অন্য কোথাও সচরাচর তেমন একটা যায় না। আজই প্রথম কি মনে করে যেন সে একটা আইরিশ পাবে নিয়ে এলো আমাকে।
সন্ধ্যা ঘন হবার আগেই উঠোন ঝাড়ু দিয়ে, ময়লার বিনগুলো সরিয়ে, ঝাউয়ের পাতাগুলো ছেঁটে দিয়ে ফুরফুরে মেজাজে এলেহান্দ্রের সাথে বেরিয়ে পড়েছিলাম আমি। আমরা দুজন পৃথিবীর দুই প্রান্ত থেকে উড়ে এসে উত্তর আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডিপার্টমেন্ট অফ ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজে’ পরিচিত হয়েছি। ওর সঙ্গে আমার পছন্দের যেমন কোন মিল নেই তেমনি সম্পর্কের ব্যাপারেও আমাদের কোন আগ্রহ নেই। আমাদের এই পারষ্পরিক সম্পর্কটিকে কিছুটা ‘বন্ধুত্ব’ অথবা ‘কিছুটা পরিচিত’ বলে চালিয়ে দেয়া যায়। তবে ভাষার প্রতি ওর আগ্রহ অপরিসীম। মোট পাঁচটি ভাষায় সে ভাঙা ভাঙা কথা বলতে পারে। তার মধ্যে বাংলা একটি। 

পাবে ঢুকতেই বাইরের ফুরফুরে হাওয়াটা হঠাৎ সরে গেল। একটা কটু মদের গন্ধ নাকে এসে লাগলো। চারদিকে সবাই কথা বলছে। কাঁটাচামচ, প্লেটগ্লাস আর কথার ঝড় একটা গমগমে সুরের মূর্ছনা তৈরী করেছে। আধো-আলোয় শরীরগুলো এদিক ওদিক মাতাল ছায়ার মতন নড়ছে। কিন্তু মানুষ কই? যেন কতগুলো আস্ত জানোয়ার বসে আছে। শেয়ালের চেহারার লোকটা একটা বিয়ারের ক্যান নিয়ে বসে টেলিভিশনে হকি খেলা দেখছে। পাশের টেবিলে চারটা শুকর বসে তাস খেলছে। ওরা কেউই চিৎকার করছেনা। খুবই ভদ্রভাবে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে তৃপ্তির সাথে আলুর চিপস খাচ্ছে। আমার পাশে একজন বৃদ্ধ টনিক নিয়ে বসেছে। আমি যেহেতু কোন খাবার অর্ডার দেইনি তাই সে আমাকে জিন কিনে দেবার প্রস্তাব দেয়। প্রচুর মদ পান করেছে সে। হয়ত জীবনকে ভুলতে চাওয়ার ব্যাপক আয়োজন তার। 

আমি একটা খালি টেবিলে গিয়ে বসলাম। পাবের মালিক এগিয়ে এসে বললো; 'কিছু খাবে?' আমি দেখলাম, লোকটাতো দেখতে মানুষের মতই! তবে ওর গায়ের রঙটা কমলালেবুর খোসার মতন ফ্যাকাসে লাল। চোখের মনিটা একদম শীতল নীল পাথর। কোন আবেগ নেই। খাবারের অর্ডার দেয়ার পর আমি জানালা দিয়ে ফুটপাতের দিকে তাকিয়ে থাকি। ইন্টারসেকশনে ২৩ নম্বর বাসটা ভুউস করে শব্দ তুলে পূব দিকে চলে যায়। এলেহান্দ্রো ততক্ষণে বারে বসে অন্যদের সাথে মদ গিলতে শুরু করেছে। মনে হয় বিচ্ছিন্ন কোন উপগ্রহে বসে আছি দীর্ঘক্ষণ। কাউকেই ঠিক পৃথিবীর মানুষ বলে মনে হচ্ছে না। তারপরও এত ভীড়ের মধ্যেও একটা সুক্ষ আনন্দ তিরতির করে মনে ভাসছে। আজ বাংলাদেশ আর সাউথ আফ্রিকার ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট খেলা। বাঙালী ছেলেগুলো কত ভাল খেলছে...। সাউন্ড বক্সে তখন গান বাজছে; ...বিলি জুয়েলের ‘পিয়ানো ম্যান’। 

‘It's nine o'clock on a Saturday 
The regular crowd shuffles in 
There's an old man sitting next to me 
Making love to his tonic and gin’ 

গানটা আমার ভীষণ প্রিয়। বিলির গান শুনলে কেমন একটা শীত শীত অনুভব হয়। মনে মনে হালকা দুলতে থাকি আমি। স্মৃতিগুলো আঁছড়ে পড়ে। নানা রাগ ধুনতে থাকি গুনগুন করে। ঠিক শৈশবে যেমনটা করতাম। দিদি শিখিয়েছিল। করবীদি। মা যখন বকতেন তখন এই ধুনাভ্যাস বেশ কাজে দিত। প্রতিরাতে কমপক্ষে পাঁচটি স্বর নির্দিষ্ট আরোহন অবরোহনে বসিয়ে তারপর চোখ বন্ধ করে হু.........ম... শব্দ করতে হতো। কঠিন অংশটুকু ছিল একই স্বরের শুদ্ধ ও বিকৃত দুটোই ব্যবহার করা। যেমন কোমল ও কড়ি ‘মা’। এক ‘মা’ থেকে আরেক ‘মা’ তে যেতে গেলেই চোখ বুজে আসতো। বিলি যখন গাইছে, ‘হে সন্তান, তুমি কি আমার সেই স্মৃতিটা বাজিয়ে দিতে পারবে?’ ঠিক তখনই হঠাৎ মৃদু আলোয় চোখে পড়ল পাবের শেষের দিকের একটা টেবিলে স্কার্ফ মাথায় জড়ানো আর লং ড্রেস পড়া প্রায় ষাটোর্ধ একজন বৃদ্ধা আমার দিকে ইশারা করে ডাকছেন। এতক্ষণ সে তীক্ষ্ণ চোখে সরাসরি আমাকেই দেখছিল। চোখগুলো বড় বড়। দৃষ্টি স্পষ্ট। চুলগুলো বেশীরভাগই সাদা। আর বাম গালে একটা ভাঁজ পড়েছে। ঠোটগুলো একটু কুঁচকানো। ধোঁয়াটে আলোয় তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না। কাঁপা কাঁপা আঙ্গুলগুলো চায়ের কাপের উপর যথাসম্ভব স্থির রাখার চেষ্টা চলছিল তাঁর, কিন্তু পারছিল না। সে ফিরে ফিরে আমাকেই দেখছিল। আমার খুব অসস্থি হচ্ছিল। ওকে ঠিক জানোয়ারের দলে ফেলা যাচ্ছিল না। আমার মতই উড়ে এসে জুড়ে বসেছে হয়ত। কিছুক্ষণ পর আবার ইশারা করে ডাকলেন তিনি। বুকের ভেতর ধুকধুকানি বেড়ে গেল। এ আবার কি যন্ত্রণারে বাবা। এই অবাঙালী এলাকাতেও দেখি পরিচিত লোকের ভীড়। মনে মনে খুবই বিরক্ত হচ্ছিলাম আমি। 

হঠাৎই মনে হলো, কোথায় যেন দেখেছি ওকে! কোথায়? ইস্‌ কিছুতেই মনে করতে পারছি না। কার সংগে যেন চেহারাটার ভিষণ মিল! কিছুটা বোধহীনভাবেই তার কাছে হেঁটে গেলাম। 

খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই একটু চাপা স্বরে তিনি খুব স্পষ্ট বাংলায় বলে উঠলেন; ‘তুমি অন্তি না?’ 

আমার কন্ঠ কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল!!!...


২ 
প্রায় বছর চল্লিশ আগের কথা 

খাঁ সাহেব ‘বহুৎ দিন বিতে হুয়ে সাঁইয়া আয়ে’ এই গানটা গাইতে শুরু করলেই করবীদি কেমন যেন পাগল পাগল হয়ে যেত। থোকা থোকা মেঘ ওর মনের মধ্যে হালকা তুলো হয়ে উড়ে বেড়াতো। শান্ত স্নিগ্ধ মানুষটাকে চেনাই যেত না তখন। ঐ সময়ে আমার বড়্‌দি আর ছোড়্‌দি ওদের বাড়িতে যাবার জন্য অস্থির হয়ে থাকতো। কারণ করবীদি তখন একটার পর আরেকটা গান গাইতেই থাকতো। কিছুতেই তাকে থামানো যেত না। যেন কোন ভূত ওকে ভর করতো। কি মধুর সেই কন্ঠ! ‘শিউলী ফুলের মালা দোলে সারদ রাতের বুকে ঐ’ এই গানটা গাওয়ার সময় ওর গলার কারুকাজগুলো ঝন্‌ ঝন্‌ করে বাজতো। 

ওস্তাদজী বলতেন, ‘বেশী অলংকার গায়ে জড়ালে কেমন দেখায় জানিসতো?’ 

করবীদি বলতো, কিন্তু এটাতো চঞ্চল গান; শান্তভাবে গাইবো কি করে? 

তিনি বলতেন, ‘গায়ে বেশী অলংকার জড়ানো আর কন্ঠে বেশী কারুকাজ করা, দুটোই সমান কথা। গাইতে হবে চঞ্চলতাকে এড়িয়ে। যেমন ধর্‌ একটা নৌকা ধীর গতিতে খুব সাবধানতার সাথে ব্রীজের নিচ দিয়ে যাচ্ছে। জল টলমল করছে। জলের নিচে মাছ। উপরে আকাশ। কাউকেই বিরক্ত করা যাবে না। এমন শান্তভাবে গাইতে হবে। সুক্ষ কাজগুলো এমনভাবে দিতে হবে যেন বোধ হয় মোম গলে পড়ছে।‘ করবী’দি গাইবার ক্ষেত্রে এই নৈপুণ্যতাটি সহজেই আয়ত্ব করেছিল। আর সেকারনেই ওর গান শুনলে মনে হতো সুরগুলো শূন্যে ভেসে ভেসে মেঘ থেকে জল হয়ে গলে পড়ছে আকাশ থেকে...... 

কমলাপুর রেলওয়ে কোয়ার্টারে মোট আটটি ছড়ানো ছিটানো পাঁচতলা দালান। ৩০ নম্বর দিয়ে শুরু আর ৩৮ নম্বর দিয়ে শেষ। এর মধ্যে অফিসার আর কর্মচারীদের ফ্লাট আলাদা। করবীদির বাবা অমল রায় ছিলেন রেলওয়ে হাসপাতালের চিকিৎসক। আর আমাদের বাবা আলতাফ রহমান ছিলেন রেলওয়ের প্রধান কার্যালয়ের প্রকৌশলী। দক্ষ প্রযুক্তিবীদ হিসেবে বাবার বেশ সুনাম ছিল। দীর্ঘদিন ধরে আমরা ৩৩ নম্বর ফ্ল্যাটের একতলায় পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকি। ওদের বাড়িতে গান বাজলে আমাদের বাড়িতে শোনা যায়। আমাদের বাড়িতে শুটকি মাছ রান্না হলে ওদের বাড়িতে বাটি চালান হয়। দু-বাড়িতেই সামনে পেছনে বিশাল বাগান। এতকিছু মিলের পরও মায়ের চোখে সবচেয়ে অমিল যেটা ছিল তা হলো, ওরা হিন্দু আর আমরা মুসলমান। 

বড়্‌দি আর ছোড়্‌দিও একদিন ওদের বাড়ি থেকে ফিরে এসে মা’কে বললো, 

- জানো মা, করবীদির কন্ঠে ‘যখন আমার গান ফুরাবে তখন এসো ফিরে, ভাঙবে সভা বসবো একা রেবা নদীর তীরে...’ এই নজরুলগীতিটা যদি একবার শোননা, তাহলে তুমি পাগল হয়ে যাবে।’ 

মা ভুরু কুঁচকে রেগে গিয়ে বলতেন, ‘আমি পাগল হবো কেন? আমার মাথায় কি ছিট আছে, যে পাগল হবো? হলে তোরা হবি, তোদের বাপ হবে…কথায় কথায় বাবার উপর তার রাগ উথলে পড়ত। বাসর রাতে বাবা নাকি ভোঁস ভোঁস করে ঘুমিয়েছিলেন আর মা খোপায় বেলী ফুলের মালা জড়িয়ে সারারাত অপেক্ষায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত বাবার যখন ঘুম ভাঙছিলই না মা তখন বাবার মুখের উপর একগাদা জল ঢেলে দিয়েছিলেন। এই গল্প না হলেও আমরা চল্লিশ বার শুনেছি। আমরা পাঁচ ভাইবোন জন্মাবার পরও মায়ের সেই রাগ যায় না। বাবাকে মা’র নিজের বংশ মর্যাদা অনুযায়ী খুবই অযোগ্য মনে হয়। বাবা নাকি গরীব ঘরে পড়াশুনা করে ‘বংশের বাত্তি’ হয়েছেন। আর মায়েদের ছিল জমিদার বংশ। ধর্ম, বংশ, এগুলো মা খুব গুরুত্ব দিয়ে ভাবতেন। 

করবীদির বাবা ডাক্তার অমল রায় পেশায় চিকিৎসক হলেও যথেষ্ট সঙ্গীতানুরাগী ছিলেন। তিনি তার একমাত্র কন্যাকে খেলাধূলা, সংগীত সব বিষয়েই যথেষ্ট পন্ডিত করে তুলতে চেষ্টা করছিলেন। ওঁদের বাড়িতে গ্রামোফোন রেকর্ড ছিল। সেই রেকর্ডে হেমন্ত, মান্না দে, শ্যামল, কিশোর কুমার, সন্ধ্যা, প্রতিমা, বিখ্যাত সব গায়কদের গানই বাজতো... ওস্তাদজীর ভরাট আর দরাজ কন্ঠ অনেকটা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতন শোনাতো। ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’ আর ‘আয় খুকু আয়’.. এই গান দুটি প্রতিটি জলসাতেই তাঁকে নিয়মিত গাইতে হোতো। 

একদিন বড়দি পাশের বাড়িতে গান শুনে এসে মাকে জিজ্ঞেস করলো... 

- মা, তোমার কি কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘কাজলা দিদি’ কবিতাটার কথা মনে আছে? উনি নাকি আসাম দেশের চা খেতে খেতে ‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ’ এই লাইনটা লিখেছিলেন? 

- হ্যা...লিখেছিলেন। মা বোধহয় কিছুটা আন্দাজেই ঢিল ছুড়লেন। আহা, কি সুন্দর কবিতা...’মাগো আমার শোলোক বলা কাজলা দিদি কই’? 

- এই কাজলাদিদি কে মা? কবি যতীনের কি কোন দিদি ছিল? 

- হয়ত ছিল, হয়ত ছিল না। তাতে কি? কবিতাতো কবিতাই...এটা কল্পনাও হতে পারে.. 

তখন আমি বেশ ছোট ছিলাম। দিদিদের কোলে পিঠে চড়ে বড় হচ্ছি। বড়দি, ছোড়দি, পুরবীদির পর সেই থেকে ‘কাজলাদি’ প্রথম আমার মগজে ঢুকে গেল। কাজলাদি কবিতাটি বড়্‌দিকে খুব উদাস করে দিত। সে খুঁজে খুঁজে বইপত্র ঘেটে বের করল যে কাজলা দিদি কবিতাটিতে সুর দিয়েছেন বিখ্যাত সুরকার সুধীন দাস গুপ্ত, আর প্রতীমা বন্দোপাধ্যায় সেই গানটি গেয়েছেন। 

আসলে আমি যা কিছু বলছি, তা যে সব নিজের কানে শুনে বলছি তা কিন্তু নয়। এসব কথা শুনে মনে রাখার মতন বয়স তখনও আমার হয়নি। এর কিছু কিছু মায়ের কাছে শোনা, কিছু বা বড়দি-ছোড়দি বলেছে। আর বেশ অনেকটাই করবীদি বলেছিল। 

তো যা বলছিলাম, কাজলাদিদি গানটা শোনার পর দিদি তখন সুধীন দাশগুপ্তকে নিয়ে পড়লেন। একদিন বড়্‌দি পড়ছে যে ‘সুধীন দাশগুপ্ত তার প্রিয় ছাত্রী বনশ্রী সেন গুপ্ত’র জন্য একটা গান বেঁধেছেন। গানটা বেশ ঢেউ খেলানো। আর তাতে প্রচুর যন্ত্রসংগীতের সমাহার রয়েছে। বনশ্রী ভয় পেয়ে বললেন; তিনি এই গান গাইতে পারবেন না। সুধীন দাশগুপ্ত তখন করবীদিকে গান গাইতে ডাকলেন। করবীদির তখন কলেজে বড় একটা পরীক্ষা। তাঁর বাবা-মা কেউ রাজী হলেন না। এত বড় সুযোগ পেয়েও তাকে ছেড়ে দিতে হলো। সুধীন দাশগুপ্ত তখন আরতী মুখোপাধায়কে দিয়ে গানটি গাওয়ালেন। 

আরতী গাইলেন... 

‘বন্য বন্য এই অরন্য ভাল...... অন্ধকারে সুর্যসোনা আলো... 
লা লাল্লা...লা...লাল্লা...লা...লাল্লা... 
গানটা সুপারহিট হলো।’ 

এই ঘটনাটি ঘটে যাবার পর করবীদির কদর বেড়ে গেল। রেলওয়ে পাড়ার জাম তলার মাসিক অনুষ্ঠানে প্রায়ই তার ডাক পড়তে লাগলো। বাড়িতে বড়্‌দি ছোড়্‌দি আর করবীদি মিলে বন্য বন্য গানটির সংগে হালকা নাচের প্র্যাকটিসও শুরু করে দিল। বিশেষ করে নাহ্‌ নাহ্‌ নাহ্‌ নাহ্‌... এ জায়গাটি এলেই ছোড়দি পুরো শরীরটাকে দুলিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করে দিত...বাবা-মা বাড়িতে না থাকলেই করবীদির এই টি্ম তুঙে উঠে যেত। ওঁদের একমাত্র দর্শক ছিলাম আমি। অবাক হয়ে দেখতাম...সবাই মিলে বারান্দায় নাচছে...’বন্য বন্য এই অরন্য ভাল’...ছোড়দি হি হি হি করে হাসছে... বারান্দাতে তখন রোদের আলো ঝলমল করে উঠছে...পেছনের উঠোনে কামরাঙা গাছটায় চড়ুই পাখিরা কিচির মিচির শব্দ তুলে আনন্দ প্রকাশ করছে। 

৩. 
এতসব আনন্দের মধ্যে হঠাৎই শহরের অবস্থা থমথমে হতে শুরু করলো। পাকিস্থানীরা চারিদিকে বেপোরোয়াভাবে আগুন দিতে শুরু করেছে। গুলির শব্দে ভয়ংকর আতংকে দিন কাটতে লাগলো আমাদের। গান বাজনা সব বন্ধ। শোনা গেল ঢাকার বাইরে অন্যান্য শহরগুলোতেও নাকি বাঙালী সেনারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। সাই সাই প্লেন উড়ছে আকাশে। আশেপাশের কোয়ার্টারের সবাই একে একে গ্রামদেশে চলে যাচ্ছে। আমরাও পোটলা বাঁধছি। কিন্তু যাবো যাবো করে সবকিছুই পিছিয়ে যাচ্ছিল। 

গত সপ্তাহেই বাবা যখন শেখ মুজিবের বিশাল ছবিটা হাতে নিয়ে কলোনীর মাঠ বরাবর হেঁটে যাচ্ছিলেন তখন আকাশ থেকে পরপর তিনটা গুলি এসে ছবিটাতে লাগলো। বাবা যে কার কৃপায় বেঁচে গেলেন কে জানে! একটা দমকা হাওয়া এসে ছবির শেখ মুজিবকে টুকরো টুকরো করে কাঁচের ফালিগুলো দিয়ে বাবার শরীরটাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। তিনি তখন দৌড়ে গিয়ে কোয়ার্টারের মাঠের শেষ মাথায় বয়স্ক আমগাছটার নিচে গা ঢেকে ছিলেন। ছবিটা মাঠের মাঝখানে একা একা অসহায় পড়ে ছিল। বাতাসে একটা গোঁ গোঁ আওয়াজ ভেসে আসছিল। বাবা শুনতে পেলেন ছবির শেখ সাহেব তাকে ডাকছেন, দুলু.....‘ আমারে ঘরের ভেতর নিয়া যা...দরজার চিপায় ফালায়া রাখ, কেউ দ্যাখতে পাইব না’। ছবিটা তিনি মাঠের ওপারের কলোনীতে রশীদ সাহেবের কাছে অক্ষত অবস্থায় রেখে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেন নি। তার আগেই এই দূর্ঘটনা ঘটে গেল। অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত উনি গাছের গুড়ির সাথেই কাদা-মাটিতে লেপ্টে পড়ে ছিলেন। ভাঙ্গা ফ্রেমের ছবির শেখ সাহেব ঘাসের উপর শুয়ে সারারাত আকাশমুখী তাকিয়ে ছিলেন। সকাল বেলা কোয়ার্টারের মুদি দোকানী নিতাই ঝাপ খুলে দেখে গাছের গুড়ি ধরে বাবা গা থেকে মাটির দলা ঘষে ঘষে তুলছেন। সারারাত উনি ওভাবে গাছের সঙ্গে লেপ্টে ছিলেন। নিতাইকে তিনি আঙুলের ইশারায় শেখ সাহেবের ছবিটা দেখিয়ে বললেন; ওটা শিগগিরি সরা...ওরা আসছে..। নিতাই হন্তদন্ত করে ঝাপি ফেলে ছবিটা কুড়িয়ে নিয়ে লুকিয়ে রেখে দিল ওর দোকানের বেড়ার ছাপড়ায়। আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি, মা জানালা দিয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিলেন এবং উনি সারারাত বাবার জন্য জেগে ছিলেন। 

এই ঘটনার পর কি কারণে যেন ওয়াসার পানি দুদিন বন্ধ ছিল। কোয়ার্টারের লোকেরা অতিষ্ট হয়ে উঠছিল। নাওয়া খাওয়া প্রায় বন্ধ। করবীদিই প্রথম সাহস করে ওড়নাটাকে ঘূর্ণি মেরে কোমরে পেঁচিয়ে আর আ্যলুমিনিয়ামের জগটা হাতে নিয়ে তাঁর দীর্ঘ বেনীদুটো দুলাতে দুলাতে আশপাশের মানুষকে থোরাই তোয়াক্কা করে মাঠের শেষ প্রান্তে রাস্তার ফাটা পাইপ থেকে জল আনতে গেল। তার দেখাদেখি কোয়ার্টারের অন্য মেয়েরাও বের হলো। রেলওয়ের কর্মচারী সৈয়দ মোজাম্মেল হোসেন এবং তার দুই নম্বর যুবক ছেলেটা তখন মাঠের পূব দিকের ৩১ নম্বর বিল্ডিংয়ের তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে করবীদিকে লক্ষ্য করছিল। বাড়ির ছেলেরা ঘরে জল না থাকায় মাঠের পেছনের বড় ড্রে্নটার পাশে দাঁড়িয়ে লাইন ধরে প্যান্টের চেইন খুলে হিসু করছিল। সৈয়দ সাহেব রক্ষণশীল মানুষ। এসব উনার কাছে নাজায়েজ কাজ। হাতের কাছে পেলে হয়ত উনি নির্ঘাত ওদের হাতুরীপেটা করতেন। 

আমাদের ৩৩ নম্ব্বর বিল্ডিং এর পেছনের উঠোনটা ভরে আছে পাকা কামরাঙায়। হালকা শীত পড়েছে। বাগানে কিছু লাল শাক, মূলা আর ফুলকপি অগোছালো এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। কলম দেয়া পেয়ারা গাছটা জলের অভাবে একটু নেতিয়ে পড়েছে। পাখিরা স্বাভাবিক নিয়মেই এগাছ থেকে ওগাছে উড়ে বেড়াচ্ছে। ওদের হয়ত তেষ্টা পেয়েছে। কয়েকদিন নিতাইয়ের দোকান বন্ধ থাকায় কেরোসিন তেলেরও অভাব পড়েছে। চিড়া মুড়ি ছাড়া ঘরে আর কিছু নেই। মা পেয়াজ কুঁচি করছিলেন, সরিষার তেল দিয়ে মুড়ি মাখানো হবে। বড়দা ছোড়দা দুজনেই তখনও ঘুমিয়ে। বাড়িতে খুব টেনশন চলছে। বাবা-মা তখন কোয়ার্টার ছেড়ে সাময়িকভাবে অন্য কোথাও যাবার পরিকল্পনা করছে। 

ডিসেম্বর মাস। একদিন সকালে দেখি, বাবা আর টুলু কাকা লম্বা বারান্দায় অস্থির পায়চারী করছে। ঘরের দরজা জানালা সব আঁটসাঁট বন্ধ। বাইরে থেকে হঠাৎ হঠাৎ ঠুস ঠুস গুলির আওয়াজ ভেসে আসছিল। পশ্চিম দিকের জানালা দিয়ে বাবা দেখতে পেলেন ভারি ভারি মিলিটারীর গাড়ি গুলো কোয়ার্টারের দিকে ঢুকছে। বাবার ডাক শুনে বটিটা ফেলে দিয়ে মা উঠে এলেন, বললেন, যা... বড়্‌দার সাথে কাঁথার নিচে শুয়ে থাক্। আমি মাথা নাড়লাম। যাবো না। তারপর ফ্রকটা দুদিকে তুলে ধরে আবার বললাম...’না...’। সবার ছোট বলে আমার এধরনের আবদারে মা অভ্যস্ত ছিল। কিন্ত সেদিন মায়ের মুখটা ভীষন শক্ত দেখাচ্ছিল; মা বললো,…’অন্তি যা বলছি…’। টুলু কাকুকে কোথায় লুকানো যায় ভেবে পাচ্ছিল না কেউ। শেষ পর্যন্ত তাকে বাথরুমে আটকে রাখা হলো। কদিন ধরেই পাড়ার হিন্দুরা ভারত যাওয়া শুরু করেছে। সেদিনই আরেক রেল কর্মচারী নন্দ কাকুকে বাবা বলছিলেন; জন্মভূমি ছেড়ে কেন অন্য দেশে যাবেন, মশাই? এটাতো হিন্দু মুসলিম সকলেরই দেশ... তারপরও উনারা চলে গেলেন। কিন্তু পাশের বাড়ির অমল রায় ও তার পরিবার রয়ে গেল। ও বাড়িতে একটা বাক্সও গুছানো হলো না। অমল রায় পাড়ার সবাইকে বলতেন, ‘আমরা হিন্দু না, আমরা বাঙালী; আমরা সবাই বাঙালী। মরতে যদি হয় মরবো। তাও এদেশ ছাড়বো না। 


১৪ই ডিসেম্বর। 

থম্‌থমে সকাল। 

আমাদের দরজায় ভারী বুটের আওয়াজ। আর তারপরই কড়া নাড়ার শব্দ। 

...ঠক্‌ ঠক্‌ ঠক্‌... 

আমার গা ছমছম করছিল। বাবার পা দুটো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঠিক তাঁর পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি । মা চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারছিল না আমাকে। আমার ভয় করছিল ভীষণ। ওরা যদি বাবাকে ধরে নিয়ে যায়? দরজার ফাঁক গলে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম আমাদের সামনের বিল্ডিংয়ের সৈয়দ মোজাম্মেল হোসেন সাহেবের সাথে আরো তিনজন পাক মিলিটারী। সৈয়দ সাহেবের কোট আর দাড়ি ছাড়া ঐ মূহুর্তে আর কিছুই আমার চোখে পড়েনি। 

লোকগুলো বাবার দিকে রাইফেল উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো; ‘তুমহারা নাম কেয়া হ্যায়?’ 
বাবার গলার স্বর শুকিয়ে কাঠ। উনি চিঁ চিঁ করে কোনরকমে বললেন; ‘আলতাফ রহমান।’ 
লোকটা কটমট করে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো, তারপর কনুই আর হাত টিপে টিপে বন্দুকের বাট দিয়ে দরজায় সজোরে আঘাত করে বলল, .., ‘হট্‌ যাও; দরওয়াজা বন্ধ্‌ কারো...’। 

তারপর ওরা পাশের বাড়িতে ঠক ঠক কড়া নাড়লো। বাবা তখনও ভয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন। ডাইনিং টেবিলে ফুলদানিতে রাখা বাগানের লাল গোলাপটা তরতাজা ফুটে আছে। আমরা দরজার ওপার থেকে পূরবীদির কন্ঠে হাহাকার চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। বাবা মাকে আর আমাকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন তখনও। আমরা ভেবেছিলাম, ওরা হয়ত দেখতে সুন্দর, একহারা গড়নের করবীদিকে তুলে নিয়ে যাবে। কিন্তু না। বারান্দার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল ওরা করবীদির লম্বা চুল ধরে টেনে হিচড়ে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিয়ে ওর বাবা ডাক্তার অমল রায়কে গাড়িতে তুলে নিয়ে গেল। ওবাড়িতে তখন ভয়ংকর কান্নার রোল। করবীদি ওড়না ফেলে পাগলের মতন বাতাসের গতিতে মিলিটারীর গাড়ির পেছন পেছন ছুটছে...। ওর চিৎকার আকাশ বাতাস ফাটিয়ে কোয়ার্টারের দালানগুলোতে ধাম ধাম করে করে গিয়ে লাগছে। ...বাবা...বাবা...বাবা...!!! আমি দুহাতে কান চেপে হু হু করে কাঁদছিলাম। 

এই ঘটনার দুদিন পরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করল। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলো। দোকানে দোকানে রেডিওতে ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সংগীত বাজতে থাকলো। কিন্তু তবুও আমাদের দিশেহারা অবস্থাটা গেল না। শহরের রাস্তায় দিন-রাত্রি আনন্দ মিছিল চলছে তখন। তারপরও আমরা স্বব্ধ। বাবা ভীড়ের মধ্যে করবীদিকে নিয়ে সারা শহর হন্ন হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। রায়েরবাজারে লাশের স্তুপে ছিন্নভিন্ন শরীরগুলো খুঁচিয়ে খুঁচিয়েও অমল রায়কে পাওয়া গেল না। এর মাস খানেক পরই করবীদিরা কোয়ার্টার ছেড়ে চলে গেল। যাবার আগে করবীদি তার হারমোনিয়ামটা আমাদের তিন বোনকে উপহার দিয়ে গেল। চার অকটেভ হারমোনিয়াম। বেলোতে চাপ দিলেই বাক্স থেকে উঠে আসা ন্যাপথলিনের গন্ধটা ভুর-ভুর করে নাকে লাগতো। সেই থেকে আমরা তিন বোন নিয়্মিত গাইতে শুরু করেছিলাম। বাবা আমাদের ওস্তাদ রেখে দিয়েছিলেন। 

বড়্‌দি খুব মন খারাপ করে গাইতো;...বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ... মাগো আমার শোলক বলা করবী দিদি কই... 


৪ 

‘ডাফিস-ড্রাইভ ইনে’ সেই করবীদির সাথে তিন যুগ পর দেখা। 

পাশে ক্লিন শেভড বেশ বয়স্ক এক ভদ্রলোক ভদ্‌কা পান করছেন। করবীদি পরিচয় করিয়ে দিলেন, ইনি হলেন আমার স্বামী সৈয়দ আফজাল হোসেন। তোর মনে আছে? ৩১ নম্বর বিল্ডিংয়ে ছিল ওরা? 
স্মৃতি হাতড়ে আবিষ্কার করি, ইনি কোয়ার্টারের সেই রেলওয়ের কর্মচারী সৈয়দ মোজাম্মেল হোসেনের দুই নম্বর ছেলে। 
দিদি বললো; ‘শোন্‌ অন্তি, আমার নাম কিন্তু করবী রায় নয়, ‘তাসনীভা আফজাল’, বুঝেছিস?’ 

বারের ভেতরের বাতিগুলো নিভু নিভু আলোয় জ্বলছে। করবীদির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি নরম পানীয়র টেবিলে বসে থাকি। 

টেলিভিশনে হকি খেলা চলছে। এলেহান্দ্রো চিৎকার করে বারটেন্ডারকে বলছে, ‘শো আস ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট ম্যান..., বাংলাদেশ ইজ প্লেয়িং উইথ সাউথ আফ্রিকা’। লোকটা মুচকি হেসে চলে যায়। কোন অনুরোধ শোনেনা। 

এলেহান্দ্রো ভাঙা ভাঙা বাংলায় পিয়ানোতে ‘সহজিয়া’র গান গেয়ে আমার দৃষ্টি কাড়ার চেষ্টা করে... 

‘ছোটপাখি ছোটপাখি সর্বনাশ হয়ে গেছে 
পৃথিবীর পরে আর তোমার-আমার 
ভালোবাসার কেউ নেই, কিছু নেই।...... 

ও পাখি ও পাখি গানটা হেরে গেছে, নদীটা ফিরে গেছে, 
পাহাড়টা সরে গেছে, সাগরটা মরে গেছে 
আদিবাসী শামুকের কোনো ঘর নেই। 

নেই নেই কিছু নেই 
রাস্তার বাম নেই, শ্রমিকের ঘাম নেই, টাকাদের দাম নেই, 
চিঠিটার খাম নেই, 
আমাদের কারো কোনো নাম নেই।’..................... 


এলেহান্দ্রোর আঙ্গুল চুঁইয়ে সেই ন্যাপথলিনের ঘ্রাণটা উড়ে এসে আমার নাকে লাগে... 
-----------------------------------------------------------------------------------------------


টরন্টো, জুন ২০১৯

1 টি মন্তব্য: