শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প: মা

‘চুপ করে থেকে কোন লাভ নেই । বল এর জন্য কে দায়ী ?’

দেখুন সাধনদা কিভাবে মুখ বন্ধ করে রেখে দিয়েছে । বাইরে থেকে দেখে আমরা কী ধারণা করতাম বলুন !’

‘এক চড় মারলেই গড়গড় করে সব সত্যি বলে দেবে ।’

‘আহ্‌, থামো তুমি জয়ন্ত । গায়ে হাত তুলবে মানে ! এখনো আমরা পাড়ায় বড়রা বেঁচে আছি ।’

বল্‌ তো মা, কে এমন করলো ?’

‘আর আপনার মা বলেছে । পেটে পেটে শয়তান একটা ।’

বাথরুম থেকেই শুনতে পায় সুচন্দ্রা বাইরে কিছু মানুষের উত্তেজিত কথার শব্দ । বেরিয়ে শাড়িটা পরে চুলে টাওয়েলটা কোনরকমে জড়িয়ে রাস্তার দিকে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় । সকাল মাত্র সাড়ে সাতটা । তাও আজ অফিসের দিন । এইসময় অন্যান্য দিন এই পাড়ার মানুষজনেরা যে যার মতো রেডি হয়ে কেউ অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে অথবা কেউ বেরোনোর তোড়জোড় করছে । মূলতঃ চাকুরীজীবি এই পাড়ায় কোন সময় তেমন হইহল্লার আওয়াজ পাওয়া যায় না । বাকি দু-চারজন যারা ব্যবসা করেন তাদেরও যাওয়া-আসার একটা নির্দিষ্ট সময় আছে । যে যার মতো করে জীবন কাটায় । সুচন্দ্রা তার অলস অবসরে মনের পাতায় কখন যেন বিষয়গুলো নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে । 

এই পাড়ার মানুষজনেরা রাস্তাঘাটে একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি ঝুলিয়ে “কেমন আছেন, ভালো তো” গোছের বাক্য বলে কথায় ইতি টানে । তবে একথা ঠিক, যেকোনবিপদে-আপদে পাড়ায় সবাই সবাইকে পাশে পায় । এই নিয়ে এখানকার বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষরা প্রচ্ছন্নভাবে তাদের কর্তৃক প্রদত্ত শিক্ষার অহংকার করে থাকেন । 

অথচ আজ সেই পাড়ায়, এত জোরালো শব্দে আলোচনা, নাহ্‌, আলোচনা বললে ভুল বলা হবে, কাউকে যেন সদলবলে ধমক দিচ্ছে । কিন্তু ধমকের বিপরীতের মানুষটার কোন শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না ।কিন্তু কাকে সবাই মিলে ধমক দিচ্ছে তা অনেক উঁকিঝুঁকি মেরেও সুচন্দ্রা দেখতে পায় না ।

পাড়ায় কী কোন গন্ডগোল হয়েছে ? ভাবে সুচন্দ্রা । কেননা সে আর অনন্ত দিন কুড়ি বাইরে ছিল । রাজস্থান বেড়াতে গিয়েছিল তারা। আজ অবশ্য অনন্ত অফিস যাবে না । কাল তারা অনেক রাতে ফিরেছে । ঘরে জিনিষপত্রও বিশেষ নেই । অনন্ত সেইসব কেনাকাটা করতে বাজারে গেছে । আর সুচন্দ্রা ভোর থেকে উঠে গোটা বাড়িসাফাই করার কাজে হাত লাগিয়েছে । এখন স্নান সেরে ঘরে ঢুকে চেঞ্জ করার সময়ই হইহল্লার শব্দ পেয়েছে সুচন্দ্রা । কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছুই বুঝতে পারে না সে । 

‘আরে কোথায় তুমি ? কলিংবেল বাজালাম, ডাকলাম তোমার কোন সাড়াশব্দ নেই । ভাগ্যিস চাবিটা নিয়ে বাজারে গিয়েছিলাম । নাহলে কতক্ষণ যে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো তার ঠিক নেই । তোমার স্নান এখনো হয়নি !’

সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসা অনন্তর বেশ অধৈর্য গলার কথায় সুচন্দ্রা টের পায় সে এতটাই বাইরের উত্তেজনায় উত্তেজিত ছিল অনন্তরদেওয়া কলিংবেলের আওয়াজ, ডাক কোনকিছু তার কান পর্যন্ত আসেনি । 

‘পাড়ায় এত কিসের গোলমাল চলছে গো ? কী সমস্যা ? সাধনকাকু দেখলাম ভীষণ রেগে গিয়ে উত্তেজিতভাবে কাকে কীসব বলছেন । সেইসঙ্গে মনিদা, সুমনবাবু, জয়ন্ত সমানভাবে সায় দিয়ে যাচ্ছে ।’

‘ও, আচ্ছা । তাহলে এই ব্যাপার । সুচন্দ্রাদেবী পাড়ার সমস্যায় ডুবে গিয়ে তার একটা মাত্র বরকে ভুলে বসে আছে ।’

‘আরে বলো না, কী হয়েছে ?’

‘আর বলো না । সে এক যাচ্ছেতাই কান্ড । গতকাল রমাকাকীমা লক্ষ্য করেছেন আমাদের রামের মায়ের মেয়ে আধপাগলি লক্ষ্মীর চেহারার পরিবর্তন । সেটা গতকাল রাতে কাকুর কানে তুলেছেন । আজ সেই নিয়ে কাকু পাড়ায় জোর শোরগোল তুলেছেন । বলছেন, তাঁরা এখনো জীবিত । তাহলে পাড়ায় এই অনাচার কী করে ঘটল ? কে কালপ্রিট ? কেনই বা কারোর চোখে পড়ল না । আর সেই নিয়ে ধমক-ধামক দিচ্ছিলেন লক্ষ্মীকে ।’

বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল সুচন্দ্রার । চোখটা যেন হঠাৎ করে করকর করে উঠল ।

চোখের জল আড়াল করে সুচন্দ্রা বলে, ‘একথা তো সাধনকাকু আর রমাকাকীমার বেশি ভাল জানার কথা । ওই আধপাগলে মেয়েটা সারাদিনে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়িয়ে এর-তার বাড়ি খেলেও রাতে তো ঠিক ওনাদের বাড়ির সিঁড়ির নীচে শুতে আসে । আর শুধু তাই নয় রাতে দুটো রুটির বিনিময়ে রাতের বাসনগুলোও যে ওনারা লক্ষ্মীকে দিজে মাজিয়ে নেন এ কথা কারোর অজানা নয় । তাহলে এখন পাড়ায় বিচারসভা বসিয়ে ওনারা লক্ষ্মীকে এভাবে দোষী না করলেও পারতেন ।’

‘একটু চা দাও না প্লিজ । গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে ।’ সুচন্দ্রার মনটা অন্যদিকে করার জন্য অনন্ত চায়ের তাগাদা দেয় । সে জানে সুচন্দ্রার ভীষণ দূর্বলতা আছে লক্ষ্মীর ওপর । 

কথা না বাড়িয়ে চা করতে সোজা রান্নাঘরে চলে গেল সুচন্দ্রা । চায়ের সসপ্যানে মেপে চার কাপ জল বসায় । ব্রেকফাস্টও বানাতে হবে । না, সে এখন কাঁদছে না । বরং তার মনে ফেলে আসা অনেকগুলো দিন ভিড় করে আসছে । এক কাপ চা ব্যালকনিতে নিয়ে আসে । অনন্তর হাতে তুলে দেয় । 

‘কী ব্যাপার, তুমি চা খাবে না ?’ অনন্ত জিজ্ঞাসা করে ।

‘না গো, সকাল থেকে কাজ করে বেশ টায়ার্ড লাগছে । কিছুটা রেস্ট করলে হয়ত ভাল বোধ করব । রান্নাঘরে ফ্লাস্কে বাকী চা আর ক্যাসারোলে চাউমিন আছে । প্লেট, ফর্ক, স্পুন পাশেই রেখে দিয়েছি । তুমি প্লিজ একটু নিয়ে নিও ।’


অনন্ত বুঝে যায়, সুচন্দ্রা এখন আর কোন কথা বলবে না । নিজের মতো করে থাকবে । এখন এসব ব্যাপারে অনন্ত অভ্যস্ত হয়ে গেছে । তাই কথা না বাড়িয়ে শুধু মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানায় অনন্ত ।

শোবার ঘরে ঢুকে বিছানার ওপর নিজের ক্লান্ত দেহ আর অবসন্ন মনটাকে অলসভাবে ছেড়ে দেয় সুচন্দ্রা । এই মুহূর্তে তার রামের মায়ের মুখটা খুব মনে পড়ছে । বিয়ের পর নতুন কনে হয়ে যখন এই বাড়িতে পা দিয়েছিল, তখন থেকে দেখেছিল এই বাড়ির ঠিকে কাজের লোক রামের মা । তার আসল নাম কেউ জানে না । দেখে বোঝার উপায় নেই সে সধবা না বিধবা । পরে জেনেছে তার স্বামী মেয়ের জন্মের আগে থেকে নিরুদ্দেশ । একটা মাত্র মেয়ে । নাম লক্ষ্মী । অথচ অদ্ভুতভাবে তার নাম কীভাবে যেন লক্ষ্মীর মা না হয়ে রামের মা হয়ে গেছে ।

যখন কাজ করতে আসত পুঁটলির মতো করে মেয়েকে কোলে করে এনে সিঁড়ির চাতালে বসিয়ে রাখত । একেবারে ছোট্টখাট্টো গোলগাল একটা বাচ্চা । তবে মাথাটা শরীরের তুলনায় কিছুটা বড় । কথা বলত সে, কিন্তু বুঝতে পারত না সুচন্দ্রা । কিন্তু রামের মা কাজ করতে করতে ঠিক বুঝতে পারত মেয়ে কিছু বলছে । মাথা নেড়ে ‘লক্ষ্মী’ বলে বাচ্চাটার কাছে গেলে সে এক অদ্ভুত ভাষায় নানারকম শব্দ তুলে কী যেন বলত আর সে সব তার মা অবলীলায় বুঝে যেত । তখন সে লক্ষ্মীকে কখনো জল খাওয়াতো, কখনো বা বাথরুম করিয়ে আনত, আবার কখনো সুচন্দ্রার থেকে একটা বিস্কুট অথবা একটু মুড়ি নিয়ে মেয়েকে খাইয়ে দিত । সুচন্দ্রা অবাক হয়ে দেখত আর ভাবত, এটা বোধহয় শুধুমাত্র একজন মায়ের পক্ষেই সম্ভব । সুচন্দ্রা মনে তখন থেকেই অনাস্বাদিত মাতৃত্ব বীজ বপন করেছিল ।

একদিন রামের মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল সুচন্দ্রা, ‘হ্যাঁ গো মাসি, লক্ষ্মীর বয়স কত ? এখনো তো ঠিক করে কথা বলতে পারে না ।’


‘বয়স একন দশ । তবে স’বি আমার পোড়া কপালের দোষ গো বউমা । মেয়েটা ছোট থেকে এমনধারা ছেল’নি । য্যাকন ওর তিন বচর, খেলতে খেলতে রতনবাবুদের চোবাচ্চায় পড়ে গেসলো । সে দম বনদো হয়ে কী ভীষণ কান্ডি । সেই তেকে মেয়ে আমার ক্যামনধারা হয়ে গেল ।’

‘তুমি ওকে ডাক্তার দেখাওনি ?’


দেকিয়েছি তো । কিন্তুক কিচুই হয়নি কো ।’ 


পরে অবশ্য অনন্ত আর শাশুড়ী মায়ের মুখে শুনেছে, লক্ষ্মী ছোট থেকে আর পাঁচটা সুস্থ বাচ্চার মতো নয় । সময়ের আগে জন্মেছিল । ছোট থেকে খুব ভুগত । সবাই ভেবেছিল ওই মেয়ে বেশিদিন পৃথিবীতে টিঁকবে না । কিন্তু সবার ভাবনাকে মিথ্যে করে দিয়ে লক্ষ্মী পুরোপুরি না হলেও খানিকটা সুস্থ হলো । কথা দেরীতে বললেও হাঁটতে চলতে শিখল ।

সেই রামের মা একদিন আচমকা কাউকে কোন নোটিস না দিয়ে দুদিনের ধূম জ্বরে মারা গেল । তখন লক্ষ্মীর বয়স ষোল । সে দু-আড়াই বয়সী বাচ্চাদের মতো আধো স্বরে কথা বলে । আজও মনে পড়ে তার বুকের ওপর পড়ে লক্ষ্মী হাপুস নয়নে কেঁদেছিল । কে বলে মেয়েটা আধপাগলে ! কে বলে ওর কোন বোধ-শোধ নেই ! সেদিন লক্ষ্মীর কান্না সুচন্দ্রাকে ভরিয়ে দিয়েছিল । সদ্য মা-হারা মেয়েটা তার অজান্তে সুচন্দ্রার বুকে তিরতির করে বয়ে চলা মাতৃত্বের ফল্গুনদীতে ঢেউ তুলেছিল । 


বিয়ের পর সুচন্দ্রার দশটা বছর কেটে গেছে । আজও তার কোল শূন্য । মন হাহাকার করে বেড়ায় এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে । ডাক্তার থেকে দৈব, কোন কিছুতে কসুর করেনি । ডাক্তারী মতে সমস্যা তার । অনন্ত একেবারে নিঁখুত । যেদিন থেকে এই সত্য জানতে পেরেছে সেদিন থেকে নিজের হাসিখুশি সত্তা, অনন্তর ওপর কারণে অকারণে চোটপাট- হম্বিতম্বি সব শেষ করে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে । অনন্তর ওপর তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই । মৃত্যুর আগে শাশুড়ীমা জেনে গেছেন ত্রুটি সুচন্দ্রার নয়, তার নিজের ছেলের । ভালবাসার সঙ্গে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ হয়েছে অনন্তর সঙ্গে ।

আজ সেই লক্ষ্মী মা হতে চলেছে । সুচন্দ্রার মনে হচ্ছে ছুটে যায় লক্ষ্মীর কাছে । ওকে আজ আবার একবার বুকে জড়িয়ে নেয় । ওর শরীরের মা হবার গন্ধ সে প্রাণমন ভরে নেয় । যতই সবাই লক্ষ্মীকে গালমন্দ করুক, সে ওই অবোধ মেয়েটাকে দোষী কখনোই ভাবতে পারছে না । বরং যে পাষন্ড এই সুযোগ নিলো, ক্ষমতা থাকে তো তাদের ধরুক সাধনকাকু আর তাঁর সঙ্গীসাথীরা ।
এর মাসখানেক পরে একটা রবিবারের অলস দুপুরে অনন্ত নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে । এমন সময় সুচন্দ্রার চিৎকারে অনন্ত ভয় পেয়ে যায় । ঘরের ভিতর থেকে শোনে কাকে যেন বলছে, “ওরে তুই পারবি না, তোর কষ্ট হবে, তোর লেগে যাবে । আমি যাচ্ছি । একটু দাঁড়া ।”

বাইরে এসে সুচন্দ্রাকে দেখতে পায় না । ব্যালকনিতে এসে নিচের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে অনন্তর । হাইড্রেনে একটা কুকুরছানা পড়ে গেছে । দেখেই অনন্তর বুকের ভেতরটা শিরশির করে ওঠে ।

মা-কুকুর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আর মাঝে মাঝে পাটা বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে তোলার চেষ্টা করছে । লক্ষ্মীও হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে তোলার চেষ্টা করছে আর মা-কুকুরকে যেন বোঝাতে চাইছে, সে ঠিক তার বাচ্চাকে তার কাছে ফিরিয়ে দেবে । শরীরের এই অবস্থায় লক্ষ্মীর যাতে কোন ক্ষতি না হয়, তাই সুচন্দ্রা পৌঁছে গেছে ওদের কাছে।

ড্রেন গভীর । জলও আছে অনেক । কিন্তু তার সঙ্গে যেটা আছে তিন মায়ের আর্তি, তাদের ভালবাসা । 

কুকুরছানাটা কী বাঁচবে না ? বাঁচতেই হবে । নাহলে মায়েদের লড়াই মিথ্যে হয়ে যাবে ।


মায়েরা যে কখনো হার মানে না . . .





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন