শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

অনির্বাণ বসু'র গল্প : হিমোসায়ানিন কিংবা নিছক অরণ্যদেব

আকাশ অংশত মেঘলা হয়ে-থাকা দিনে দানেশ শেখ লেনের যুবক অভিষেক সরকার কিংবা ওর সমানবয়সী মহেন্দ্রনাথ মুখার্জি সরণির আমারও হতে পারে, পায়ের চামড়ার চটিটা পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি বিধানে ব্যর্থ হয়ে ছিঁড়ে-যাওয়া মাত্র অভিষেক অথবা আমি, যার সঙ্গে এমনটা ঘটবে, সে বুঝে যাবে, তারা এসে দাঁড়িয়েছে, বা বলা ভালো, আমরা, অর্থাৎ অভিষেক উদ্দীপনা মিশা এবং আমি, এসে দাঁড়িয়েছি মোরিগাঙ নামক এক আদিম জনপদে।
যেহেতু আমরা চারজনে পৌঁছোতে চেয়েছিলাম এই মোরিগাঙে এবং এই মুহূর্তে, এই আসন্ন শেষদুপুরে আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি, ফলত আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের মুখের দিকে চেয়ে নিলাম আর দেখলাম, পথের ক্লান্তি, আমার কিংবা অভিষেকের চামড়ার চটির অকস্মাৎ ছিঁড়ে-যাওয়া জনিত বিরক্তি, মিশা অথবা উদ্দীপনার হাঁটার সময় বার দুয়েক পা মচকে যাওয়ার কষ্ট—এমনতর বহুর বিপরীতে সবার মুখেই টুকরো হাসির ঝিলিক।

দীর্ঘদিন আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিকস্ করবার কারণে যেহেতু অভিষেকের মধ্যে আদিবাসীদের নিয়ে একটা পূর্বাভিজ্ঞতা ছিল, স্বাভাবিকভাবে যখন আমাদের ঘুরতে-যাওয়ার প্ল্যান হচ্ছিল আর সেই সূত্রেই একের-পর-এক জায়গার নাম উঠে আসছিল, বাতিলও হয়ে যাচ্ছিল আবার, তখন মোরিগাঙ আসার প্ল্যানটা ও-ই দিয়েছিল। বলা বাহুল্য, একমাত্র ও বাদে আমাদের কেউ আর কস্মিনকালেও জায়গাটার নাম শোনেনি তখনও পর্যন্ত, তাই ও-ই দায়িত্ব নিয়েছিল আমাদের এবারের ট্যুরের মেরিট ও ডিমেরিটগুলো বোঝানোর। তিন মুগ্ধ শ্রোতাকে সামনে পেয়ে অভিষেক বলতে শুরু করেছিল : 'অল্পস্বল্প ইতিহাস স্কুল-কলেজে যা পড়েছিস, তা থেকে এটুকু তো জানা যে, সতেরোশো সাতাত্তর নাগাদ লুই বোনার্ড আমাদের দেশে প্রথম নীলকুঠি নির্মাণ করে। ইউরোপিয়ান মার্কেটে তখন নীলের চাহিদা আকাশছোঁয়া। যদিও নীলচাষে ক্ষতিটার পরিমাণটা বেশি বলে ওদেশে তার চাষ হত না। আমাদের কলোনিয়াল প্রভুদের নজর পড়ল আমাদের মাটির উপর। মোটের উপর এই পারস্পেক্টিভটা আমাদের সবারই জানা। তারপর ইতিহাস বইতে যেমন লেখা থাকে, সেই অকথ্য অত্যাচার, শোষণ, একটা সময় পর সেই নির্যাতন আর সইতে না-পেরে ফাইনালি আউটবার্স্ট।'

'দি ইন্ডিগো রিভোল্ট। আওয়ার ফার্স্ট পীজন মুভমেন্ট। ঠিক?' উদ্দীপনার চোখ চকচক করে উঠেছিল।

উদ্দীপনার দিকে আলতো হাসি ছুঁড়ে দিয়ে ফের শুরু করেছিল অভিষেক : 'তো এই নীলবিদ্রোহ নীলকর সাহেবদের ঘুমের দফারফা করে ছাড়ল, ইংরেজ বিরোধিতার একটা সূত্রপাত হল, দীনবন্ধু মিত্তির নীলদর্পণ লিখে বাজার মাত করে দিল, আর মাইকেল সেটাকে ট্রান্সলেট করতেই আবার ইংরেজরা মারমার-কাটকাট হয়ে উঠল—ব্যাপারটা আদৌ তেমন হয়নি সেদিন। দীনবন্ধু নাটক নামানোর আগেই হরিশ মুখার্জি নিজের মতো করে লিখছিলেন হিন্দু পেট্রিয়টে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ওঁদের শ্রেণি-অবস্থানটা বরাবরই ছিল জমিদার-মধ্যস্বত্বভোগীদের দিকে। বেসিক্যালি যারা শোষণের মূল ভরকেন্দ্রে সেদিন ছিল, তাদের কথা আদতে কোথাও বলা হয়নি। ওই ওয়াজেদ আলি সাহেবই ঠিক কিনা, ট্র্যাডিশন! অ্যাকচুয়ালি, ওই রাজমহল-ছোটোনাগপুর থেকে আদিবাসীদের ধরে-ধরে ইছামতী দিয়ে নিয়ে আসা হত চাষের জন্য। চাষের জন্য বলাটা ভুল হল, আসলে ওদের বেগার খাটানো হত ওই চাষ এবং চাষ-পরবর্তী নীল বের করবার কাজে। মিশা, ওই যে তোরা বলিস না, অহোরাত্র, ওইরকম আটপৌরে খাটুনি। ফলে একটা সময় পর লোকগুলোর কর্মক্ষমতা বলতে আর কিছুই থাকত না। এইসব মহান প্রভুর চ্যালা-চামুণ্ডারা তখন ওদেরকে ধরে আবার জঙ্গলে, মানে কাছাকাছি যেহেতু এই মোরিগাঙ, ছেড়ে দিয়ে আসত সেখানে।'

শ্রোতা হিসেবে মিশা বরাবরই যে-কোনও বক্তার কাছে কাম্য; ও চুপ করে শুনে যাচ্ছিল। বিজ্ঞের মতো ভাব এনে আমি বলেছিলাম : 'তার মানে এই মোরিগাঙ বলে জায়গাটায় নীলকুঠি আছে। ওই ব্যারাকপুরের মতো।' শুনেই কটমট করে আমার দিকে চেয়েছিল অভিষেক : 'সব বিষয়ে মন্তব্য করতেই হবে! ওখানে কোনও নীলকুঠি নেই। কয়েক ঘর আদিবাসী এখনও রয়ে গেছে বলে শুনেছি। আর ছোটো একটা নদী আছে। কেউ বলে ময়ূরী, কেউ-বা মৌরি। মনে হয়, সেখান থেকেই মোরিগাঙ নামটা এসেছে।' মিশা ছিল বলে ওই মুহূর্তে অভিষেকের বাছা-বাছা বিশেষণের হাত থেকে বেঁচে গিয়ে মনে-মনে ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছিলাম।

তারপর তো মোরিগাঙ যাব বলে ঠিক করা আমরা প্রথমে একটা দিন স্থির করি, যেটা অবশ্যই মাসের কোনও-একটা উইকএন্ড হবে কারণ যেহেতু সপ্তাহের অন্য দিনগুলোয় মিশার স্কুল থাকে। ছত্তিশগড় থেকে অভিষেক আর তেজপুর থেকে উদ্দীপনা দু'জনেই মোটের উপর দিনকয়েকের ছুটি জোগাড় করে এসেছে এবার। আমি তো সবসময়ই ঝাড়া হাত-পা। ফুলটাইম পিএইচ.ডি. করার বহু খারাপের মধ্যে, মানে, গাইডের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রেখে-যাওয়ার নিরলস নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা চালু রাখার মনোযোগী চেষ্টা, এখনও পর্যন্ত চাকরি না-জোটার আশঙ্কা, সময়মতো কাজটা গুটিয়ে-আনা নিয়ে দুর্ভাবনা, ডিগ্রিটা হাতে না-পাওয়া পর্যন্ত ক্রমিক দোদুল্যমান দশা সত্ত্বেও এটা ঠিক যে, ওই রিসার্চ ওয়ার্কের দোহাই দিয়ে টুকটাক দিব্য ঘুরে আসা যায় এদিক-ওদিক। তেমনই কোনও-একটা শনিবার ঠিক করা হয়েছিল যাওয়ার দিন হিসেবে। সেই দিনটা যে আজই, তা আপাতত বেশ বোঝা যাচ্ছে।

সকাল-সকাল, মানে, অভিষেকের কাছে যেটাকে সকাল বলা যায়, কেন-না মিশা আসবার পর থেকে ওই অভ্যাসটি আমায় ছেড়ে গেছে, আমরা চারজন দেখা করেছিলাম শিয়ালদহ স্টেশনের জিআরপি বুথের সামনে। তারপর টিকিট কেটে বনগাঁ লোকাল। সকালের দিকে বনগাঁগামী ট্রেনে প্রায় প্রবাদতুল্য ভিড় হয় না বলেই কিনা জানি না, জেনারেল কম্পার্টমেন্টে মনোমতো একখানা জায়গা পেয়ে মিশা আর উদ্দীপনা দু'জনে জানলার ধারের দুটো সিট দখল করে নিয়েছিল। ট্রেন ছাড়ার পর আলতো রোদে হাওয়ার ঝাপটায় মিশার চুল, ক্ল্যাচার দিয়ে বাঁধা, উড়ছিল। দেখেছিলাম। তারপর প্রায় ঘণ্টা দুই কিংবা আড়াই হবে, মিশা আর অভিষেকের গান, সঙ্গে দেদার আড্ডায় ট্রেনযাত্রা শেষ হলে প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে এসে একটা ভ্যানে চেপে বসি; যেহেতু মোরিগাঙে, আদিবাসীদের বসতির কাছ অবধি ভ্যানচালক যাবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন প্রথমেই, ফলত তাঁকে টাকা-পয়সা মিটিয়ে দিয়ে ভদ্রলোকের দেখিয়ে-দেওয়া রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করেছিলাম। যত এগোচ্ছিলাম, চারপাশের গাছের সংখ্যা বাড়ছিল, ঝোপঝাড় ক্রমে ঘন হচ্ছিল। মিশা গুনগুন করতে-করতে হাঁটছিল; পুরোনো দিনের কোনও-একটা হিন্দি গান। গাইতে পারি না বলে সেই সুরটাকে শিস্ দিয়ে ধরবার চেষ্টা করছিলাম আমি, মিশার অপাঙ্গে কঠিন দৃষ্টিতে থেমে গিয়েছিলাম তখনকার মতো। তখন শুধু চার জোড়া পায়ের চাপে শুকনো পাতার মর্মর, পিঠের উপর ছোটো রুকস্যাকের লেস্ দুটোয় উদ্দীপনার নখ ঘষার ক্ষীণ শব্দ, মিশার গুনগুনানি, অভিষেকের প্যান্টের পকেট থেকে কিছুটা-খালি-হয়ে-যাওয়া দেশলাই বাক্সের নড়ানড়ির হালকা শব্দ, মাঝে-মধ্যে পরিচিত কিংবা অপরিচিত কোনও পাখির ডাক। এইভাবে বেশ খানিকটা চলার পরে অভিষেক কিংবা আমার, যে-কারও হতে পারে, পায়ের চামড়ার চটিটা পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি বিধানে ব্যর্থ হয়ে ছিঁড়ে গিয়েছিল আর আমরা বুঝে ফেলেছিলাম, আমরা আমাদের গন্তব্যে এসে পৌঁছেছি।

এমন সময় ভাঙা-ভাঙা হিন্দি আর বাংলা মিশিয়ে উদ্দীপনাই প্রথম বলে ওঠে : 'লেকিন কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে কোই-না-কোই চুপকে সে হমকো ঘুর রহে হ্যায়। আমরা চারজন ছাড়াও কোই হ্যায় ইহা।' একটা হেলানো গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরায় অভিষেক। তারপর পোড়া দেশলাইকাঠিটা আবার ভরে রাখে বাক্সে। চারপাশে শুকনো পাতার স্তূপ, সামান্য অসাবধানতা থেকে বড়ো কিছু হয়ে যেতে পারে; কিন্তু সিগারেটের ছাই কিংবা শেষ মুহূর্তের জ্বলন্ত ফিল্টার কোথায় ফেলবে—যখন আমি এমনটা ভেবে ওকে জিজ্ঞেস করতে যাব, দেখলাম, ব্যাগের সাইড পকেট থেকে একটা ছোট্ট চারচৌকো কৌটো, কাঠখোদাই এবং বার্নিশ, বের করে আবার সাইড পকেটটার চেন এঁটে দিল ও। আমরাও ঈষৎ ক্লান্ত; মিশা নিচু দেখে একটা গাছের ডাল বেছে নিয়ে মোটামুটি একটা হেলান দিয়েছে আর আমি ওই শুকনো পাতার উপরেই বসে পড়েছি পা ছড়িয়ে। সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে অভিষেক বলল : 'ক্ষেপেছিস নাকি! কে ঘুরবে আমাদের! তুইও না উডি—! ছোড়্ ওসব! সিগারেট পিয়েগি—!' দোনোমনা করে উদ্দীপনা হাত বাড়ায়। আমি বুঝি, ও এখনও ওই নজর-রাখার-ব্যাপারটাতেই আটকে আছে। অভিষেক অর্ধেক সিগারেটটা আর কাঠের বাক্সটা ওর হাতে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙে; মাংসপেশিগুলোর সংকোচন-প্রসারণের সঙ্গে-সঙ্গে বহুদিন না-ছাঁটা, ঝুলে-নামা ওর রাবীন্দ্রিক দাড়িও যেন অস্পষ্ট দুলে ওঠে; পরক্ষণেই ক্লান্তি ঝেড়ে বলে ওঠে : 'সো কমরেডস্, লেটস্ গো! আলো থাকতে-থাকতে আমাদের পৌঁছে যেতে হবে। অতএব লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, গেট আপ!’ আমাদের হাঁটা শুরু হয় আবার। আরও-কিছুটা এগোনোর পর মাথার ভিতর একটা অদ্ভুত শব্দ টের পাই আমি; ওরা কেউ সেই আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল কিনা, ওদের চোখ-মুখের হাবভাব দেখে যেহেতু তেমন অস্বাভাবিক কিছু আমার চোখে পড়েনি, আমিও তাই যথাসম্ভব স্বাভাবিক হাঁটতে থাকি; এদিকে মাথার ভিতর কে যেন ক্রমাগত হাতুড়ির বাড়ি মারতে থাকে। গুম্ গুম্...গুম্ গুম্...।

দ্রিমি দ্রিমি দ্রুম...দ্রিমি দ্রিমি দ্রুম...দ্রিমি দ্রিমি দ্রুম...। মাথার ভিতর হাতুড়ি-পেটার আওয়াজটা, কিছু পরে, আমার মনে হতে থাকে, কারা যেন নাগাড়ে ঢাক বাজিয়ে চলেছে। তার শব্দ হচ্ছে : দ্রিমি দ্রিমি দ্রুম...। আওয়াজটা যে অনেকগুলো ঢাকের একসঙ্গে একতালে বেজে-চলার শব্দ, তা সম্পর্কে আমি যখন প্রায় নিঃসন্দেহ হয়ে উঠতে যাচ্ছিলাম, তখনই উদ্দীপনা আর মিশার মাঝখান দিয়ে—কারণ যেহেতু অভিষেক হাঁটছিল একেবারে সামনে, তাই সে স্বভাবতই দেখেনি তার পিছনে কে বা কী দাপাদাপি করে গেল হঠাৎ—যতদূর মনে হল ওদের দু'জনের, একটা বুনো শুয়োর ছুটে গেল এদিক থেকে ওদিক; যদিও আমি ওদের কথাতেই সায় দিয়েছিলাম, কিন্তু আমার ওই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, নাকি আবছা দেখেছিলাম, আবছাই দেখেছিলাম হয়তো, এদিকের ঝোপ থেকে ওদিকের ঝোপে মাথা নিচু করে গোঁতানোর ভঙ্গিতে ছুটে গেল একটা ছোটোখাটো গাঁট্টাগোট্টা মানুষ। চকিতে মনে হয়েছিল, ওই তীব্র গতিতে ছুটে-যাওয়া লোকটাকে আমি আগে দেখেছি ডেঙ্কালির গভীর জঙ্গলে; ওর নাম গুরান। 

ভূমিকম্পের পর কিছুটা সময় জুড়ে মাটি কাঁপতে থাকে, তা স্তিমিত হয়ে এলে চারপাশ শান্ত হয়ে যায়; বুনো শুয়োর কিংবা গুরান, দুইয়ের মধ্যে যে-কেউই হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে, ওভাবে ছুটে-যাওয়ার পরবর্তী কিছুক্ষণ জুড়ে ছিল উদ্দীপনা আর মিশার হার্টবিটের দ্রুত চলন, অভিষেকের জ্ঞান কপচানোর ভরা সুযোগ আর তারপর একটা সময় আবার হাঁটতে-থাকা। এই আবারও হাঁটা শুরু হলে আমি বলেছিলাম : 'জায়গাটা কেমন যেন কমিকসে-পড়া অরণ্যদেবের আস্তানার মতো লাগছে। কাছাকাছি কোথাও খুলিগুহা নজরে পড়লেও আশ্চর্য হব না।' 'খুলিগুহা না-পেলেও গাছবাড়ি পেতেই পারিস। মানে ওই আদলের অনেকটা। আর যদি এতদিন ঝড়-ঝাপটা সামলে টিকে থাকে!' আমার কথা শেষ হল কি হল না, যথারীতি অভিষেক জিভ থেকে উত্তর পেড়ে আনল। মাঝে-মধ্যে মনে হয়, ও এত কেন জানে! কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার সন্দেহ সত্যি হতে চলেছে এমনতর ইঙ্গিতে ওসব না-ভেবে সঙ্গে-সঙ্গে বলি : 'মানে? অরণ্যদেব? চলমান অশরীরী? এই মোরিগাঙে? সত্যি?'

'মিথ্যে। আজকাল সিগারেট-মদ ছেড়ে দেখছি তোর মাথাটা পুরো গেছে। কেউ নেই, কিছু নেই, ফিউজ উড়ে গেছে! মিশা, ছেলেটাকে কী করলি বল তো! বললাম আদল, আর ও মাকড়া অরিজিনাল ভাবছে! শোন, নীলকর সাহেবরা এখানে লোকগুলোকে ছেড়ে দেওয়ার দিনগুলোতে একটা বাড়ি বানিয়েছিল নিজেদের থাকার জন্য। গাছের ফাঁকে-ফোঁকরে। ওটার আদলটা অনেকখানি অরণ্যদেবের গাছবাড়ির কাছাকাছিই। আমি নিজে না-দেখলেও আমার পরিচিত একজনের কাছে ফটোতে দেখেছিলাম। ভদ্রলোক যখন ফটোটা তুলেছিলেন, তখনও ডিজিটাল ক্যামেরার কনসেপ্টটাই আসেনি। তাই বললাম, এখনও আছে কিনা জানি না।' শুরুর দিকের খোঁচা-দেওয়া হালকা চালের কথাগুলো থেকে ফের পাণ্ডিত্যের গাম্ভীর্যে ঢুকতে কোনওই কসরত করতে হয় না অভিষেককে।

জুতোর তলায় শুকনো ঝরাপাতা মাড়িয়ে আমরা আরও-কিছুটা পরে এসে পৌঁছোই আর-এক জঙ্গলে; বটের জঙ্গল। কোনও-এক অতিদূর অতীতে হয়তো একটিই বটগাছ ছিল এখানে, আজ আর কোনওভাবেই সেই প্রথম আকরটিকে চেনা যায় না আলাদা করে। দীর্ঘ ঝুরি নেমে গিয়ে মাটি নিয়েছে তার, বহু শাখায় পল্লবিত হয়ে সেই প্রাথমিক ক্রমশ এক থেকে বহু হয়ে উঠেছে। 'বহুত্ববাদী বট'—আমি ব-এর অনুপ্রাস করে বলি আর রবীন্দ্রনাথ আওড়ায় মিশা : 'দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে!' যেহেতু এমন কোনও দৃশ্যকল্প আমরা দেখিনি কখনও, অভিজ্ঞতায় না-থাকার কারণে যেহেতু কখনও ভেবে ওঠাও সম্ভব হয়নি, ফলত ওই মুহূর্তে অমন বিস্তৃত বটবীথি দেখে আমরা প্রায় প্রত্যেকেই অবাক বিস্ময়ে ঘুরপাক খাচ্ছিলাম নিজেদের চারপাশে আর প্রতি ঘূর্ণনের সঙ্গে বদলে-যাওয়া দৃশ্যে অপরিবর্তিত ধরা পড়ছিল যেন-বা শিল্পীর ইজেলে লগ্ন হয়ে-থাকা বটসর্বস্ব পটচিত্র। প্রশ্নচিহ্নের মতো ঘাড়, সম্পূর্ণ সিধে করে, অনেকটা বিস্ময়চিহ্নের ধাঁচে সোজা রেখে ঘন সবুজ পাতার ফাঁক গলে আকাশের দিকে চেয়ে মিশা তখন নিজের মনে গেয়ে চলেছিল : 'দূরদেশী সেই রাখাল ছেলে...আমার বাটের বটের ছায়ায় সারা বেলা গেল খেলে...গাইল কী গান সেই তা জানে, সুর বাজে তার আমার প্রাণে...'—বুঝতে পারছিলাম, মিশা ধীরে-ধীরে আবারও গুটিয়ে যাচ্ছে নিজেরই ভিতর আর প্রত্যেকবারের মতো অসহায় আমি কষ্ট পেতে শুরু করছি মনে এবং সত্বর সে চলে যাবে নিজস্ব জগতে, বহিরাবরণ প্রকট হয়ে উঠবে; যদিও এবার আর তেমনটা ঘটল না, যেমনটা এর আগে বহুবারই আমি দেখে এসেছি; আর তা যে হল না, তার সবটুকু কৃতিত্বই অভিষেকের। কিছু না-জেনেই ও আচমকা চিৎকার করে উঠেছিল, যাতে সম্বিৎ ফিরে পায় মিশা; আর আমিও বুঝে যাই আগামীদিনে ওর এই মুড স্যুইং আটকানোর অব্যর্থ দাওয়াই কী হতে চলেছে। মিশার দিকে গভীর মনোযোগের কারণে অভিষেক চেঁচিয়ে কিছু বলল, এটুকু বুঝলেও ঠিক কী বলল, তা বুঝতে পারিনি। সিগারেট ধরিয়ে এবার কাছে এল অভিষেক : 'ওই দেখ অরণ্যদেব, তোর গাছবাড়ি! তোমার ডায়না পামার তো তোমার সঙ্গেই আছে! গো অ্যান্ড লেট এনজয়!' কথার শেষটুকু মিশার দিকে তাকিয়ে বলে ও। মিশার চোখ ঈষৎ লজ্জাভ; খানিক ধাতস্থ হয়ে পালটা খোঁচানোর চেষ্টা করি : 'আর তুই বুঝি সম্রাট জুনকার! সদ্যবিবাহিত—', আমি উদ্দীপনার দিকে ইশারা করতে যাই আর তখনই আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে 'না ভাই, কিলাউইয়ের সোনালি সমুদ্রতট আর জেড হাউসের বাড়ি দিতে পারব না তোদের হনিমুনে! অত রেস্ত নেই!' বলে অভিষেক ডান হাতের তর্জনী উপরের দিকে তুলতেই আমি ওইদিকে তাকানো মাত্র দেখি, দু'টি বটগাছ কিংবা নেমে-আসা দু'টি ঝুরির মাঝের ফাঁকা জায়গায় মাটির থেকে উপরে আঁট হয়ে বসে আছে একটি বাড়ি; ঘরে ঢোকার জন্য দড়ির বদলে আছে গাছের গায়ে কেটে-বানানো সিঁড়ির ছাঁদ। উদ্দীপনা, আমাদের চারজনের মধ্যে বয়সে ছোটো, পিঠে রুকস্যাকের বোঝা নিয়েই উঠতে শুরু করে। ওর দেখাদেখি আমরাও এসে জুটি ওর সঙ্গে। প্রায় দেড়শো বছর আগে বানানো হলেও উঠতে খুব-একটা অসুবিধা হয় না আমাদের, শুধু ইতস্তত জমে-থাকা শ্যাওলা দেখে পা ফেলতে হয়। সেইসব সতর্কতা মাথায় রেখে আমরা ধীরেসুস্থে উঠে আসি গাছবাড়ির বারান্দা জাতীয় কাঠের পাটাতনে। ভিতরে দুটো ঘর, পিছন দিকটায় সামনের মতোই একটা বারান্দা; দুটো বারান্দাই কাঠ দিয়ে ঘিরে-দেওয়া, শুধু খানিকটা জায়গায় কোনও ঘেরাও নেই; বোঝা যায়, বাড়িটার দু'দিক দিয়েই প্রবেশের বন্দোবস্ত ছিল একসময়। গাছবাড়ির ভিতর জোলো গন্ধ, স্যাঁতসেঁতে ভাব। জানলা দরজা বারান্দা—যেদিক দিয়েই তাকানো যাক-না-কেন, সবুজের সন্নিবেশ। গাছের এত ঘনিষ্ঠ হয়ে রাতে থাকাটা আদৌ ঠিক কিনা জানতে চেয়েছিলাম মিশার কাছে, ও গাছ ভালোবাসে, নিজের বাড়ির ছাদটাকে মনের আনন্দে গাছ দিয়ে সাজিয়েছে, কিন্তু ও কিছু বলার আগেই অভিষেক পালটা ছুঁড়ে দিল বছর চারেক আগে আমার আর ওর, মানে অভিষেকের, চা-বাগানের ভিতর ছোট্ট তাঁবুতে রাত কাটানোর প্রসঙ্গ। স্বভাবতই ধামাচাপা পড়ে গেল আমার আশঙ্কা এবং অনতিবিলম্বে ঠিক হয়ে গেল : সেই রাতটুকু আমাদের গাছবাড়িতেই কাটবে।

এর কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল, উদ্দীপনা পিছনের বারান্দায় বসে পা ঝুলিয়ে দিয়েছে নিচে, যা ছুঁয়ে যাচ্ছে বারান্দার ঠিক নিচের ডালে প্রায়-গোল পাতাগুলো; মিশা ওর পাশে দাঁড়িয়ে উপরের সরু ডাল ধরে নাড়াচ্ছে আর বৃষ্টিপাতের ফলে গাছের পাতার ধরে-রাখা জলের ফোঁটায় ভিজিয়ে নিচ্ছে মুখ; ন্যাপস্যাক থেকে তিনশো পঁচাত্তর মিলিলিটারের একটা ব্লেন্ডার্স প্রাইডের বোতল, মিনারেল ওয়াটারের বোতল আর ছোটো তোয়ালে দিয়ে সযত্নে মোড়ানো একটা কাচের গ্লাস বের করে নিজস্ব পরিমাপে মদ ঢেলে জল মিশিয়ে আমার দিকে তুলে একগাল হেসে 'উল্লাস' বলে অভিষেক চুমুক দিচ্ছে এবং আমিও পালটা হেসে সামনের বারান্দা, যেদিক দিয়ে আমরা উঠেছিলাম, অর্থাৎ মিশা আর উদ্দীপনা যেদিকটায় আছে তার ঠিক উলটোদিকটায়, চলে আসছি।

এরও কিছু পরে অভিষেক যখন প্রথম পেগটি শেষ করে সবে দ্বিতীয় পেগটি সাজিয়ে বসেছে, উদ্দীপনা আর মিশা ঘরে ঢোকে এবং অভিষেককে ওই অবস্থায় দেখে দু'জনেরই চিল-চিৎকার। উদ্দীপনা একা থাকলে হয়তো অভিষেক অতটা পাত্তা দিত না, কিংবা চুপচাপ একতরফা শুনে নিত না সবটা, কিন্তু ওর সঙ্গে মিশাকে দেখে আর রা কাড়ে না, বরং বিনীতের মতো জানায় যে, ওই দ্বিতীয় পেগটিই আপাতত তার শেষ পেগ এবং সে কোনওভাবেই এখানে শুধু মদ্যপান করতে আসেনি, অন্যদের মতো তারও প্রবল আগ্রহ এই মোরিগাঙকে নিয়ে, এমন-কি, এই পাত্রটি খতম করেই সম্পূর্ণ সুস্থ সে বাকিদের সঙ্গে ঘুরতে বেরোবে : দিনের আলো মরে যাওয়ার আগে যতটা সম্ভব তত্ত্বতালাশ সেরে ফেলতে হবে চারপাশের।

কথামতো অভিষেক গ্লাসের মদটুকু গলায় চালান করে দিয়ে আমাদের সঙ্গেই নেমে আসে গাছবাড়ি থেকে। সবার শেষে যেহেতু আমি নেমেছিলাম, দেখেছিলাম, অভিষেক কিন্তু স্টেডি—পায়ে না-ছিল ন্যূনতম টলোমলো ভাব, না-ছিল কণ্ঠস্বরে সামান্য শৈথিল্য। নিচে নেমে আমরা ঠিক করে নিয়েছিলাম যে, এবার গাছবাড়ির পিছন দিকটা দিয়ে হাঁটব কিছুটা; কারণ যেহেতু অন্যদিকের এবড়োখেবড়ো পথরেখা ধরে হেঁটেই এখানে এসে পৌঁছেছিলাম আমরা।

গাছবাড়ির পিছনে সর্পিল একটি সরু পথ, আলের মতো অনেকটা, ধরে খানিক এগোতেই এতক্ষণের গভীর জঙ্গল ফিকে হতে শুরু করে; যদিও তাতে সবুজের কোনও কমতি নেই। বটের জঙ্গল শেষ হলে পর, তুলনায় কম ঘন গাছগাছালির মধ্যে আমাদের নজরে পড়ে বাঁশ আর তালগাছের ঝালর পাতা দিয়ে তৈরি গুটিকয় জীর্ণ ঘর। ততোধিক মলিন কয়েকটা বাচ্চা ছেলে-মেয়ে, উদোম গা, নিজেদের মধ্যে কোনও-একটা খেলায় মত্ত; যে-খেলা হামাগুড়ি দিয়ে খেলতে হয়, হয়তো, যা আমাদের কাছে অজানা। মিশা আর উদ্দীপনা এগিয়ে যায় ওদের দিকে। জিন্সের পকেট থেকে বের করে দেয় ট্রেনে-কেনা জেলি-লজেন্স। চেষ্টা করে ভাব জমানোর। কিন্তু সম্পূর্ণ অপরিচিত ভাষা দু' তরফেই, ফলে কোনও সংযোগ গড়ে ওঠে না সেভাবে। আমাদের মধ্যে একমাত্র অভিষেক, এনজিওদের সঙ্গে ল্যাঙ্গুয়েজ মিশনে কাজ করার ফলে কিছু-কিছু আদিবাসী ভাষা বোঝে ও বোঝাতে সক্ষম, বাচ্চাদের দেখে একেবারেই উৎসাহ দেখায় না। তখনই একটা ঘরের একদিকের ঝালর পাতা সরিয়ে বেরিয়ে আসে কালো-কুঁদো একটি নারী, হাত দুটো সামনের দিকে ঝুলে প্রায় হাঁটু ছুঁয়েছে, পিঠ আর কোমরের সন্ধিস্থল উটের কুঁজের মতো উঁচু, ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, তুলনায় ছোটো ওই ঝালর পাতা দিয়ে নিম্নাঙ্গ ঢাকা। ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি যেন জেগে ওঠে; সবে দু' টান দিয়েছে-কি-দেয়নি, সিগারেটটা ফেলে পা দিয়ে নিভিয়ে অভিষেক চলে আসে আদিম সেই প্রত্নপ্রতিমার সামনে। দূর থেকে দেখছি, ঘন-ঘন ঘাড় নড়ছে অভিষেকের, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাত দুটোও, একবার ঝুঁকেও পড়ল আদিবাসী ওই মহিলাটির মতো; সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল ব্লেন্ডার্স প্রাইড তাদের নতুন বোতলগুলোকে অমন হেলানো করে দিলে দেখতেও ভালো লাগে, আবার বয়ে নেওয়ারও সুবিধা হয়; আসলে আমার মনে একটা আশঙ্কার জন্ম হচ্ছিল : দু' পেগে মাতাল হওয়ার বান্দা অভিষেক নয়, আমিও এমন-কি খানিক আগে ওকে সুস্থই দেখেছি, যদিও এটাও জানি যে, সব দিন সমান যায় না; কোনওদিন অনেকটা খেয়ে ফেলার পরও নেশা হয় না, কোনওদিন বা অল্পতেই চড়ে যায়। আজ তেমন অল্পেই চাগাড় দিল কিনা, ভেবে একটু ঘাবড়েই গেছিলাম আর তখনই অভিষেক আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে গিয়ে তাকিয়ে ছিল আমাদের দিকে, কাছে ডেকে নিয়েছিল হাতের ইশারায়।

মহিলাটি ওইভাবে ঝুঁকে হাঁটছিল আমাদের সামনে, পিছনে আমরা তিনজন বারবার আকারে-ইঙ্গিতে অভিষেকের কাছে জানতে চাইছিলাম কী কথা হল, আমরা কোথায় চলেছি, ওই মহিলা ওইভাবে হাঁটছেন কেন—ইত্যাদি। আমি আলগা করে এও জানতে চেয়েছিলাম যে, আদৌ অভিষেকের নেশা হয়েছে কিনা। আদিবাসী রমণীটির পিছু-পিছু হাঁটতে-হাঁটতে অভিষেক বলেছিল : 'আমাদের ভাষা ওরা বোঝে না, ওদের ভাষাও আমি বুঝতে পারছি না। কিছু আদিবাসী টিউন আমার জানা, কিন্তু ওতেও কমিউনিকেট করা গেল না, তাই সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়েই কাজ চালাচ্ছিলাম। আর মেয়েটা বিশ্বাস করে, ও আদৌ কুঁজো হয়ে নেই, ট্রাইবাল স্পেশালিস্টরা কী বলবে জানি না, আমার তো পাতি মাথার গোলমাল মনে হল। ওদের আরও লোকজনের কাছে নিয়ে যাচ্ছে আপাতত। খাবারদাবার পাওয়া গেলেও যেতে পারে। চল, চল। গিয়েই দেখা যাক।'

বেশি হাঁটতে হল না, কিছুটা এগোতেই চোখে পড়ল একটি নদী, অভিষেকের ঠোঁট নাড়ার ভঙ্গিমায় আমরা বুঝলাম, এই খরস্রোতাই ময়ূরী কিংবা মৌরি নদী; নদীর ধারে ছোট্ট একচালা একটি ঘর দেখে ওই মুহূর্তে যদিও কিলাউইয়ের সমুদ্রতটের জেড পাথরের বাড়ির কথা মনে পড়েছিল আমার; কিন্তু সেই জীর্ণ কুঁড়ের সামনে বসে-থাকা লাঠি-হাতে বৃদ্ধটিকে যেই-না মজ বুড়ো বলে ভেবে ফেলেছিলাম, অমনি কিলাউইয়ের চিন্তাসূত্রে আঘাত আসে এবং তা ছিঁড়েও যায়। সেই কুঁজো মহিলাকে অনুসরণ করে অতঃপর আমরা এসে দাঁড়াই ওই প্রাচীন পুরুষের সামনে; প্রাচীন বটবৃক্ষ যেন—বয়সের ভারে বুঝি-বা ঈষৎ ন্যুব্জ। সেই প্রৌঢ় ফোকলা মুখে হাসি এনে অভিবাদনের ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াতেই আমাদের অবাক হওয়ার পালা : এই মানুষটিরও পিঠ আর কোমরের মধ্যবর্তী মাংসপিণ্ড, শিরদাঁড়া ঠেলে উঠেছে মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে। নয়ন বিস্ফারে আমি ইঙ্গিত করি পাথরটার দিকে, যাতে এতক্ষণ বসে ছিলেন প্রৌঢ়, সেখানে কাতারে আঁচড়ে-তোলা বাংলা বিরামচিহ্নের পূর্ণচ্ছেদ। প্রত্যাভিবাদন জানিয়ে অভিষেক ওঁর কাছে ইঙ্গিতে বিষয়টি জানতে চাইলে—ভাঙা বাংলা, কিছুটা পূর্ব বাংলার উপভাষা-ঘেঁষা, কিছুটা আদিবাসীদের নিজস্ব—জগাখিচুড়ি এক ভাষায়, যার সব শব্দের অর্থ না-বুঝলেও বক্তব্যবিষয় বুঝতে খুব-একটা অসুবিধা হয় না আমাদের, জানান যে, ওই প্রতিটি আঁচড় আসলে ওঁর জন্মের পর থেকে এখনও পর্যন্ত প্রতি পূর্ণ চাঁদের, অর্থাৎ পূর্ণিমার হিসেব। শুরুর দিকের দাগগুলো যা তুলনায় আবছা হয়ে এসেছে, উনি জানান, সেগুলো ওঁর বাবা কিংবা মা, কেউ-একজন করেছিলেন। উদ্দীপনা পাথরটার সামনে বসে পড়েছে, একমনে গুনে চলেছে জন্মদাগ। অভিষেক বহুবিধ উপায়ে প্রৌঢ়ের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছে। খানিক পরে ভয়ার্ত মুখে এসে অভিষেকের শার্টের খুঁট ধরে টানে উদ্দীপনা; নিচু গলায় যখন কথা বলছিল ওরা, আমি আর মিশা কোনওরকমে হাসি-হাসি মুখে চেয়ে ছিলাম প্রৌঢ়ের দিকে; ওঁর চোখ দুটোর অতলান্ত গভীরতায় না-জানি কত-কত গল্প ঠাসা আছে, চোখে চোখ রাখতেই মনে হয়েছিল আমার। অভিষেক ততক্ষণে মোবাইলের ক্যালকুলেটরে কী-সব হিসেবনিকেশ সেরে এসে দাঁড়িয়েছিল আমাদের সামনে : 'এই বুড়ো মালটার কথা যদি সত্যি হয়, তবে তো নীলবিদ্রোহ এর নিজের চোখে দেখা!' 'মানে?'—চমকে উঠে প্রৌঢ়ের উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আমি বলি। 'উডি যা ক্যালকুলেশন করেছে, তাতে করে মালটার বয়স, কিছু না-হলেও, আড়াইশোর কাছেপিঠে তো হবেই!' 'সে তো হতেই পারে!'—হাসিতে এমনই একটা বিনয়ী ভাব ধরা ছিল আমার মজ বুড়োর; আমিও ভাবি, মজ বুড়ো মানে তো এমনটা হওয়া আশ্চর্যের নয়, বরং এমনটাই তো হওয়ার ছিল : জনপদ আর জঙ্গলের নিয়ম এক নয়; পাহাড় সমুদ্র জঙ্গলের গুহা-কন্দরে কত রহস্যই না সেঁধিয়ে থাকে—বিজ্ঞানের যুক্তিশৃঙ্খলে যার ব্যাখ্যা মেলা ভার। মিশা আর উদ্দীপনার চোখে তখনও বিস্ময় আর অবিশ্বাস একাকার, অভিষেক হয়তো আমার মনের ভাব বুঝতে পেরেছে, প্রৌঢ় ততক্ষণে কুঁজো শরীরটাকে আবার এনে পাথরের উপর রেখেছে, ব্যস্তসমস্ত হয়ে ও গিয়ে বসে পড়ল সামনের ঘাসজমিতে, বুড়োর পায়ের কাছে; ওর দেখাদেখি ধীরে-ধীরে আমরাও অতএব। মজ বুড়ো এবার গল্প শোনাবে : কিট-হেলোয়েজ-রেক্স গল্প শুনবে একমনে; মজ দাদু ডাইনে-বাঁয়ে মাথা দোলাতে-দোলাতে গল্প বলে চলে :

আমরা এখানকার লোক নই, এখানে থাকব ভাবিনি কখনও। আমার জন্ম যদিও এখানেই। প্রথম যখন সূর্য ওঠে, তার দিকে চাইলে ডানদিক আর পিছনদিকের কোণ বরাবর কোনও-এক দূর দেশ থেকে আমার মা-বাবারা এখানে এসেছিল। ঠিক আসেনি, আনা হয়েছিল। ওদের যখন এখানে আনা হয়, তখনও আমি জন্মাইনি। সে আরও পরের গল্প।...

আলো ক্রমে আসতে থাকে। ক্রমে আলো এসে পড়ে আমাদের ইতিহাসে, আমাদের আখ্যানে। সেই তীব্র, উজ্জ্বল, ধাঁধা-লাগা আলোয় পলকে এক নতুন দৃশ্যপট তৈরি হয়ে যায় আমাদের সামনে; মজ বুড়ো আবছা হতে-হতে মিলিয়ে যায় কোথায়, শুধু দূরের কোনও-এক আড়াল থেকে—কথকের আলাপের মতো, পালাগানের সূত্রধরের মতো—মাঝে-মধ্যে ভেসে আসে তার স্বরগ্রাম। আলোকোজ্জ্বল সেই নদীতটে প্রায় তিন মানুষ লম্বা, উঁচু-উঁচু চৌবাচ্চার দেখা মিলে যায়; সুমেরীয় সভ্যতার স্নানাগারের ভিতরের খোপগুলো সরিয়ে নিয়ে যদি পাখির চোখ দিয়ে দেখা যায়, তবে অনেকটাই কাছাকাছি দেখতে লাগবে, এমন-কি, আয়তনেও প্রায় এক। চৌবাচ্চাগুলোর গায়ে সার দিয়ে কাঁচা বাঁশের মই ঠেস দেওয়া। শূন্য চৌবাচ্চারা, একাকী মইগুলি দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়—ভরাট হয়ে যায় সকল শূন্যস্থান। চৌবাচ্চা ভরে ওঠে জলে আর মইয়ে চড়ে গাঢ় তামাটে-কালো-খয়েরি মানুষগুলো নলখাগড়া জাতীয় অমনই কিছুর আঁটি নাগাড়ে আছড়ে চলে ওতে; নিচে লেঠেলের দল, বন্দুকবাজ, হান্টারওয়ালা। চৌবাচ্চার প্রাচীরগাত্রে অবিশ্রান্ত আছড়ে পড়ছে খাগড়ার ঝাড়, মানুষগুলো সর্বশক্তি এক করে আছাড় মারছে, আবার তুলছে, আবার মারছে; সেই জলাধারে ধরে-রাখা জল ধীরে-ধীরে একটা সময় মেঘমুক্ত আকাশের আসমানি রং থেকে বদলে যাচ্ছে গাঢ় নীলে; আর তখনই সাদা ঘোড়ার পিঠে চেপে এসে পৌঁছে যাচ্ছে আপাত নীলাভ পোশাক, কোমরবন্ধে পিস্তল, আংটিতে সরকারি ফরমানের শিলমোহর, সাদা চামড়া এক মুখোশধারী : অরণ্যদেব।

দ্রুত দিন শেষ হয়ে রাত ঘনাচ্ছে, রাত কেটে সকাল হচ্ছে, ফের রাত নামছে—দিনের আলো ফুটতেই মইয়ের উপর প্রায়-উলঙ্গ মানুষগুলোর অনলস কর্মোদ্যম, নিচে চাবুকের আন্দোলন। একটা সময় সাদা ঘোড়ায় চেপে অরণ্যদেব আসছে আর তদারকি করে নিয়ে যাচ্ছে ফলন। গতানুগতিক এই দৃশ্যের ক্রমাগত অভিনয় হয়ে যেতে থাকে, কেটে যায় কত সময়, সূর্য ওঠে, অস্ত যায়, চাঁদ ওঠে, কখনও-বা বৃষ্টি, একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর শোনা যায় অশ্বখুরধ্বনি আর একটানা জলের উপর ভারী কিছু আছড়ানোর উথালপাতাল শব্দ, হঠাৎই শোনা গিয়ে হ্রেষাধ্বনি চকিতে মিলাল : একই ঘটনা পরম্পরা স্থাণুর মতো দেখে-চলার একঘেয়ে অনুশীলন। আচম্বিতে গুলির শব্দ; নদীর জল মচকা ফুলের মতো লাল। ছেতরে বেরোনো রক্তের লাল ক্রমে চৌবাচ্চার নীলের বর্ণ ধারণ করে। গুলি-খাওয়া আদিবাসী মানুষটির ক্ষতস্থান থেকে গলগলিয়ে রক্ত বেরোয়; নীল রক্ত।

অবাক বিস্ময়ে আমরা দেখতে থাকি, গোটা দৃশ্যপট প্রায় একশো বছর পরের কোনিকা ফটোপেপারের মতো নীলিম হয়ে ওঠে; তামাটে-কালো-খয়েরি মানুষগুলোর চোখের দিকে চাইতেই, অক্ষিগোলকের চারপাশের সাদা অংশ, নীল হয়ে উঠেছে, দেখা যায়। মৃত মানুষটার পড়ে আছে নিথর; সেই মৃতশরীরের নখগুলি প্রকট হয়ে ওঠে, যা ইতোমধ্যে তার গোলাপি আভা মুছে ফেলে এই মুহূর্তে নীল ঘনশ্যাম। বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে চাবুকের ক্রমিক উত্থান-পতন, কর্মতৎপরতা প্রথমাবধি বিচ্ছেদবিহীন। আবার সেই একঘেয়ে কর্মযজ্ঞ; নিরুপদ্রব সেই যজ্ঞশালার তন্ত্রধারকদের, কালো-কুঁদো অব্রাহ্মণ মানুষগুলোর শিরদাঁড়া, অবিশ্রান্ত একভাবে চৌবাচ্চার দিকে ঝুঁকে-থাকার কারণে, বেঁকে গিয়ে সামনের দিকে নুয়ে পড়তে থাকে; শরীরে অক্ষম সেই নুয়ে-পড়া মানুষগুলোকে অতঃপর সারিবদ্ধ হাঁটিয়ে নিয়ে আসা হয় আর-এক নদীর তীরে—মোরিগাঙ : প্রথম ক্রন্দনের মধ্যে দিয়ে ভূমিষ্ঠ হয় এক নবজাতক, সন্তানকে কোলে নিয়ে জন্মদাত্রী নদীপারের পাথরের উপর ছুঁচালো একটি পাথরের টুকরো দিয়ে প্রথম আঁচড়টি কাটে আর ঘাড়ের কাছে হাত রেখে শিশুটিকে সূর্যের দিকে তুলে ধরা মাত্র দেখা যায়, জন্মমুহূর্ত থেকেই শিশুটির মেরুদণ্ড বাঁকা, যা যত সময় যাবে, তত সামনের দিকে বেঁকতে-বেঁকতে হাত দুটোকে আজানুপ্রসারিত করে দেবে।

কৌতূহল এই পর্যন্ত অবসিত হলে আমাদের দৃষ্টিপথে ফুটে ওঠে একটি বৃহদাকার চোখের মণি, যা ধীরে-ধীরে তার আয়তন কমিয়ে আনতে থাকে আর তা মানুষের স্বাভাবিক চোখের আকার নিলে দেখা যায়, অক্ষিকোটরে মণির পাশের সাদা অংশে শিরাগুচ্ছের রং নীল এবং ওই গভীর অন্তর্ভেদী চোখ অন্য কারও নয়—আদিবাসী সেই প্রৌঢ়ের; আমাদের কথকঠাকুর মজ বুড়োর। বুড়োর চোখের দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে অস্বস্তি হওয়ায় আমরা উঠে পড়তে চাইছিলাম, প্রাথমিকভাবে ওই চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নদীর দিকে আনতেই দেখেছিলাম, নদীর জল প্রথম প্রাণীর রক্তে নীল হয়ে আছে, এরই মধ্যে রাত কেটে গেছে কখন, অথচ একবারের জন্যও খিদে পায়নি, তেষ্টা পায়নি; রাত পার হয়ে সূর্য উঠছে, সূর্য মানে আলো; কিন্তু সেই আলোতেও কীভাবে যেন নীল মিশে গেছে। আড়াইশো বছরের এক অবদমিত ইতিহাসের প্রায়-বিস্মৃত এক ছিন্নপত্রকে শুকনো মুখে বিদায় জানিয়ে, মেরুদণ্ড টানটান, কিংবা আজানুলম্বিত হাত এবং পিঠে উটের মতো কুঁজ নিয়ে জঙ্গল থেকে জনপদে ফিরে এসেছিলাম আমরা—চারটি মানুষ, অথবা চারটি উট—কাঁটাগাছ খেতে গিয়ে যাদের গলায় কাঁটা বিঁধে গেছে।

রোজকার জীবনে ফিরে আসার পরও কিছু আখ্যান থেকে যায়, কিংবা তৈরি হয় নতুন করে। অভিষেক ফিরে যায় ছত্তিশগড়ে, আদিবাসীদের নিয়ে তার ল্যাঙ্গুয়েজ মিশনের কাজ শেষ করতে; উদ্দীপনা, আগের তুলনায় অনেক শান্ত, সংযত, ফিরে গেছে ইউনিভার্সিটি হস্টেলে তার এক কামরার ঘরে; মিশা আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তার স্কুল, স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে। তবু হয়তো কখনও আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করতে-করতে সিআরপি করিডোর পার করে অভিষেক পৌঁছে যাবে রেড করিডোরে, মাওবাদীদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, কিন্তু তখন আর আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিকস্ নয়, বরং ওদের থেকে চেয়ে নেবে ধারালো একটা ছুরি আর একলব্যের মতো সেটা চেপে ধরবে নিজের বুড়ো আঙুলে, সম্পূর্ণ কাটবে না, কিন্তু রক্ত দেখতে চাইবে। তবু হয়তো কখনও হস্টেলের ঘরে পড়তে-পড়তে একঘেয়েমি এসে-যাওয়া থেকে বেরোতে অভিষেককে ফোন করবে উদ্দীপনা, না-পেয়ে পায়চারি করবে ঘরে, তারপর খোঁপায় গুঁজে-রাখাটা কাঁটাটা তুলে এনে, দাঁতে দাঁত চেপে পায়ের গোড়ালিতে বিঁধিয়ে দেবে, শুধুমাত্র রক্ত দেখবে বলে। ডাউন ক্যানিং লোকাল ধরে, ফের অটোয় চড়ে স্কুলে পৌঁছানো মিশা কোনওদিন অফ্ পিরিয়ডে তলপেটে যন্ত্রণা অনুভব করে বুঝবে, মাসের যে-দিনটিতে সাধারণত সে ঋতুমতী হয়, প্রতিবারের মতো এবারও তা সে ভুলে গেছে বিলকুল, ফলত ব্যাগ থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন বের করে শিক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট শৌচাগারে গিয়ে নিম্নাঙ্গের অন্তর্বাসখানা কোনওমতে খুলে ফেলবে আর তখনই যোনিপথ বেয়ে রক্তস্রোত চুইয়ে নামতে থাকলে, স্যানিটারি ন্যাপকিন কিছুক্ষণের জন্য হলেও, তার হাতেই থেকে যাবে, কেন-না, সে তখন রক্ত দেখবে। কোনও-এক অলস দুপুরে, আমার ঘরে পুরোনো আমলের দেওয়াল-ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে দেখে দম দেওয়ার জন্য ওটাকে দেওয়াল থেকে পেড়ে আনব আমি এবং কেন জানি না, দম দেওয়ার বদলে খুলে ফেলব ঘণ্টা আর মিনিটের কাঁটা দুটো, তারপর যেভাবে পরীক্ষা করা হয় রক্তে শর্করার পরিমাণ, সেভাবে ফুটিয়ে দেব মধ্যমায়; আঙুলের শীর্ষদেশে তখন নীল রক্ত।

যদিও আমরা প্রত্যেকেই আসলে বুঝে নিতে চাইছিলাম যে, আমাদের প্রত্যেকের রক্তে যে-বিষ মিশে গেছে, যে-বিষ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও অবধারিত ছড়িয়ে গিয়ে দূষিত করে তুলবে তাদের বেঁচে-থাকা, তাতে অরণ্যদেব, গুরান, মজ বুড়ো, না পিগমি বান্ডার উপজাতি—কার নীলের ভাগ বেশি।

৪টি মন্তব্য:

  1. এই গল্পটা আমার অন্যতম পছন্দের ও ভালোলাগার।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. আপনাকে চিনি না। তবে আপনি পড়েছেন এবং মন্তব্য করেছেন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

      মুছুন
  2. এর পাঠে এক নির্ভেজাল আদিমতায় পৌঁছে দিলে। যার অভ্যন্তরে লুকিয়ে আছে আমাদের রক্তের সঠিক গ্রুপ নির্ণয়ের এক অজানা যন্ত্র।
    ধন্যবাদ অনির্বাণ।

    উত্তরমুছুন