শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

শৈবাল মিত্র'র গল্প : খয়ের খাঁর ইন্তেকাল

অন্ধকার একটু ঘন হতেই তিন হাঁড়ি গুড়জল আর দু কলসি তাড়ি খতম হয়ে গেল। শেষ মাঘের ঠাণ্ডা ভারী হাওয়ায় তাড়ি আর গুড়জলের কড়া গন্ধ। ফাঁকা হাঁড়ি-কলসিগুলো দাওয়ার উঠোনে গড়াগড়ি যাচ্ছিল। কয়েকটা তাড়ি ভর্তি কলসি এখনও মজুত আছে। সবে তো কলির সন্ধ্যে, সামনে এখনও গোটা রাত। বুড়োরা কিন্তু এর মধ্যেই নেশার ধাক্কায় কিছুটা হেদিয়ে পড়েছে। কমবয়সি ছেলে-ছোকরারা মৌজের এই পয়লা চোটে বেমোক্কা হাসাহাসি, খিস্তি আর কথায় টগবগ করে ফুটছে। নেশার ধুনকিতে বয়সের ফারাক কেটে গেছে। ছেলে বুড়ো বাপ বেটা সব এখন একাকার। অন্ধকার দাওয়ায় কে যেন একটা কেরোসিন লম্ফ বসিয়ে দিল। ম্যাটমেটে হলুদ আলোর শিখার ওপর টানা কালো শিস। আবছা হাওয়ায় সাপের জিপের মতো আলোর শিখা হিলহিল করে।

দাওয়ার ওপর গায়ে গায়ে দুটো মেটে ঘর। ডানদিকের পূর্বমুখো ঘরটায় খয়ের খাঁ থাকত। ঘরটা এখন মিশমিশে অন্ধকার। ওই ঘরেই সদ্য তৈরি বাঁশের খাটুলিতে খয়ের খাঁর মৃতদেহ শোয়ানো রয়েছে। খাটুলিতে এখনও কাঁচা বাঁশের তাজা গন্ধ। খাটুলির পাশে এক গোলা নারকেল দড়ি। কবরে নেওয়ার আগে মরা মানুষটাকে ওই দড়ি দিয়ে খাটুলির সঙ্গে জম্পেশ করে বাঁধা হবে। অন্ধকার ঘরে খাটুলি ঘিরে গাঁয়ের যত ছেলেমেয়ে, চুড়ি, বুড়ি আকাশ ফাটিয়ে কাঁদছে। কিছু আগেই ওরা পেটপুরে মাংস, ভাত খেয়েছে। কিন্তু বাড়তি খাবার এখনও পাশের ঘরে আছে। কান্নার ফাঁকে কেউ কেউ হঠাৎ উঠে সেখান থেকে দু-এক টুকরো মাংস মুখে ঢুকিয়ে আসছে। গম্ভীর মুখ, শিবের বাপের সাধ্যি নেই চুরি ধরতে পারে। আসলে কান্নার ধকল তো কম নয়। কাঁদলে যে বেজায় খিদে পায়। 

বুড়ো দেবরদ্দি শেষ হেঁকে বলল, ও হোচেন, মড়াটাকে খাটুলিতে বেঁধে ফেল। মুই যা আনজাদ করছি, এরপর তো কেউ আর সিধে হয়ে দাঁড়াতে পারবেনি। 

হোচেন সাড়া করে না। ব্যাজার মুখে চুপচাপ বসে থাকে। গত দু’দিন তার কম ধকল যায়নি। কবর খোঁড়া, বাঁশঝাড় থেকে আটুলির বাঁশ কাটা বাজার-হাট করা, এবং নানা মানুষের হাজার প্রশ্নের জবাব দিতে সে জেরবার হয়ে গেছে। মাথার মধ্যে ভোঁ ভোঁ ভাব, ভনভন শব্দ। বেমক্কা মরেনি। দুদিন আগেই ভোর রাতে হোচেনকে ঘুম থেকে তুলে বলেছিল, পরশু মোর ইন্তেকাল। গোটা গাঁয়ে লুটিস করে দে। গুড়জল, তাড়ি বানা! অভাব ঝানো না হয়। টাকার কথা ভাবিসনি। 

মাঘের ভোর। গাছ, লতা, আকাশে তখনও ফ্যাকাশে আঁধার জড়িয়ে আছে। খয়ের খাঁর মুখের দিকে ঘুমজড়ানো চোখে হোচেন তাকিয়েছিল। বুক ভাসানো একমুখ সাদা দাড়ি গোঁফ, মাথায় মস্ত টাক, জ্বলজ্বলে দুটো চোখ, খয়ের খাঁ এই শ্রাবণে একশো পাঁচ বছর পেরিয়েছে। বুড়োটার সব কথা হোচেন ধরতে পারে না। তার ভ্যাবাচ্যাকা মুখ দেখে মুচকি হেসে খয়ের খাঁ বলল, খুদার তলব এয়েছে। এবার যাতি হবে। একটু আগে গোর দাদাজান, মোর বাপের বাপ, মোর ঘরে এইচিল। বাঁচলে তেনার আজ আট কুড়ি তিন বছর বয়েস হত। গোড়াতে তো মুই চিনতে পারিনি। পরে তামাকের বাস নাক ঢুকতে মালুম হল, আরে, এ যে দাদাজান! থেলো হুকোর গুড়ুক গুড়ুক শব্দ,আর তামুকের ধোঁয়ায় সে কি খুশবু! 

হোচেনের কাঁধে ঠেলা দিয়ে খয়ের খাঁ বলল, নাক টান, দম নে, হাওয়ায় এখনও তামকের বাস নেগে আছে। দাদাজান বলল, বাপরে, তৈরি থাকিস, পরশু আসব। 

ঘুমের চটকা কাটিয়ে হোচেন সোজা হয়ে বসেছিল। খয়ের খাঁর কথাগুলো বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না। বাইরের আকাশ ফরসা হয়ে আসছিল। দূর-দূরান্তে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল পাখির ডাক। হোচেনের ঘরে একহাতি খোলা জানালা দিয়ে হালকা হাওয়া ছুটে এলে দামি তামাকের মিঠে গন্ধ পেল সে। তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। 

অন্ধকার ঘরে মড়ার পাশে বসে মেয়েরা খেপে খেপে কাঁদছে। রব্বানির বউ-এর চড়া গলা সকলকে ছাপিয়ে যায়। মোল্লারডাঙায় একদল শেয়াল উচু পর্দায় ডেকে ওঠে। মানুষ আর পশুর গলা এখন আলাদা করা মুশকিল। উঠোনে ছোকরাদের জটলা থেকে বেতাল পায়ে রব্বানি উঠে আসে। হোচেনের কানের কাছে মুখ এনে বলে, দু-হাঁড়ি গুড়জল সরিয়ে রাখ। গোর দেওয়ার পর লাগবে। 

হোচেন কি যেন বিড়বিড় করল। রব্বানির শোনার সময় নেই। ভাগের আধভাঁড় মাল তখনও খাওয়া বাকি।। 

উঠোনের অন্ধকার থেকে একিন হেঁকে উঠল, ও হোচেন, মোদের এটু মাংস দে যা। 

একঝাঁক জোনাকি অন্ধকার মাঠ ছেড়ে হঠাৎ উঠোনের মধ্যে উড়ে এল। 

হোচেনের পেছনে দাওয়ার এককোণে জাত বাঁচিয়ে তারিণী মাল, ঋষি বাগ মুখোমুখি বসে আছে। দুজনের হাতে দুটো কলাই-এর গ্লাস। সামনে আধ হাঁড়ি গুড়জল। কলাপাতায় কয়েক টুকরো মাংস। ঋষি এখনও মাংস ছোঁয়নি। তারিণী বলল, খেয়ে দেখ ভালো খাসি। এক লম্বর নয়। 

ঋষির জিভ সুড়সড় করছিল। তারিখী যাই বলুক এক লম্বর, মানে গোমাংস ভেবে, ভরসা পেল না। ঋষি বলল, গুলি মারো মাংস। আমার টাকের কি হবে! 

একমুখ বিশাদ নিয়ে মাথাজোড়া কালো টাকে ঋষি হাত বুলোচ্ছে। ঋষির বয়েস এখনও চৌত্রিশ পেরোয়নি, এর মধ্যেই মাথা ফাঁকা। এ যে কি কালরোগ, ডাক্তার বদ্যি ধরতে পারে না। সাধের ঢেউ খেলানো বাবরি চুল, বছর ঘুরতেই ছিটে কাঁটার বেড়া হয়ে গেল। ঘরে ডবকা বউ। শশুরবাড়িতে একপাল শালি। দুঃখে ঋষির বুক ফাটে। শেষ পর্যন্ত খয়ের খাঁর ঝাড়নে কাজ হচ্ছিল। নতুন চুল না গজালেও পুরোনোগুলো মাথায় আটকে ছিল! গতকালও খাঁ সাহেব তিন ফুঁয়ের ঝাড়ন দিয়েছে। এরপর যে কি হবে। বেজায় দুঃখে ঋষি আধগ্লাস মাল চোঁ-চোঁ করে টেনে নিল। তারিণী বলল, আমার ভায়রাভাই একটা টোটকার কথা বলেছিল। সেই টোটকায় তার কাজও হয়েছিল। এখন মাথাভর্তি চুল। 

উত্তেজনায় ঋষি প্রায় লাফিয়ে উঠল, টোটকাটা কি? ওষুধ, না গাছ-গাছড়া? 

হাতের গ্লাসে সুরুৎ সুরুৎ চুমুক লাগিয়ে তারিণী বিড়ি ধরাল। ঋষিকে জিজ্ঞেস করল, তোর বউ-এর বয়েস কত? 

বাইশ, ঋষি জানাল। 

ফাস্ কেলাস, তারিণী ফুট কাটল, মোক্ষম বয়েস। খুব কাজ হবে। 

তারিণীর হেঁয়ালি ঋষি ধরতে পারে না। বাবার মতো তাকিয়ে থাকে। বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে তারিণী বলল, টাকের সেরা দাওয়াই হল নুনজল। যে সে নুনজল নয়, মেয়ে-মানুষের শরীরের নুনজল, শরীর থেকে যেটা সকালে প্রথম বেরোয়, রোজ তাই দিয়ে টাক ধুতে হবে। দিন সাতেকেই কাজ হবে। 

ঋষি বেদম চটে যায়। বলে, তোর মুখে জুতো মারব। 

তারিণী খুকখুক করে হাসে। তাদের পায়ের তলায় একটা হলো বেড়াল মাংসের লোভে চোখ জ্বেলে বসে থাকে। সদরে হঠাৎ কয়েকজন চেঁচিয়ে উঠল, বড়োবাবু এসতেছে। বড়োবাবু।। 

বড়োবাবুর নামে তারিণী, ঋষি সোজা হয়ে বসল। তারিণী বলল, ফেরার সময় গেলাসদুটোর কথা মনে রাখিস। 

কলাই-এর গ্লাস দুটো তারিণীর। মুসলমান বাড়ির বাসনে খাওয়া বারণ। তাই এ দুটো আনতে হয়েছে। 


সঙ্গী গেনু দাসকে নিয়ে বড়োবাবু,দাশু হালদার গটমট করে দাওয়ার সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়াল। হাতের পাঁচ ব্যাটারির টর্চ মেরে চারপাশে দেখে বলল, আসর জমে উঠেছে দেখছি। 

মজা পালন 

দেঁতো হাসি মুখে ঢেনে দেবরাদ্দি বুড়ো বলে, এজ্ঞে এই এট্টু। 

দাশু হালদার বলল, তোদের কারবারই আলাদা। মানুষ পয়দা করেও আনন্দ, মরে গেলেও আনন্দ! সবেতেই ফুর্তি আর গুড়জল! 

দেবরদ্দি হেঁ-হেঁ করে। বড়োবাবুর গলা শুনে ঘরের ভেতরে মেয়েরা তুমুল কান্না জুড়ে দিতে মোল্লারডাঙায় শেয়ালেরা চমকে চুপ মেরে যায়। 

পাশের ঘরে মেয়েদের দেবরাদ্দি পাঠিয়ে দিতে, মরা মানুষটিকে দেখার জন্যে দাশু হালদার ভেতরে ঢুকল। পাশে গেনু দাস। নতুন কাপড়ে ঢাকা বাঁশের খাটুলিতে খায়ের খাঁ শুয়ে আছে। দেবরদ্দি মুখের ঢাকাটা সরাতে দাশু হালদার টর্চ মারল। পাকা দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে ঢাকা মানুষটার দু-চোখ বোজা, মুখে মুচকি হাসি। দাশুটর্চ মারল।। পাকা দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে ঢাকা মানুষটার দু'চোখ বোজা, মুখে মুচকি হাসি। দাশু টর্চ নিভোয়। ঘরে এখন স্রেফ কুপি জ্বলছে। কাচের শিশির টিনের ঢাকনা ফুটো করে বানানো কুপির ফিকে আলো ঘরে ছড়িয়ে আছে। 

নীচু গলায় দেবরদ্দি জিজ্ঞেস করল, কর্তা এট্টু খাবেন তো? 

দাশু হালদার খেঁকিয়ে উঠল, তোদের কি আক্কেল নেই? মরা মানুষকে নিয়ে মজা মারিস! 

এজ্ঞে এটাই তো মোদের কানুন। বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে চালু আছে, দেবরদ্দি কাঁচামাচু হয়ে বলল। 

একিন একটা মোড়া এনে দিলে হালদার ঘরের মধ্যেই বসল। বেঁটে, মোটা, কালো, বছর পঞ্চাশ বয়স, লুঙ্গি আর গেঞ্জির ওপর কাশ্মীরি শাল জড়ানো হালদারের শরীরের চাপে মোড়াটা মচমচ করে উঠল। শিরদাঁড়া বেঁকিয়ে হালদার বলল, বড়ো ব্যথা! বাইরে। ঠাণ্ডাটাও পড়েছে। 

আর বলতে হয় না। দেবরদ্দি চেঁচায়, ও হোচেন, কর্তাকে এটু গুড়জল দে। 

হোচেনের নাম শুনেই দাশু হালদার রেগে জিজ্ঞেস করল, সে শালা কোথায় ? ওর হাতে খাব না। ও আমায় বিষ দেবে? 

দেবরদ্দি ভড়কে গিয়ে দাশুকে নরম করার জন্যে বলে, কি যে বলেন কর্তা! ওসব পুরোনো দিন ভুলে যান। হোচেন এখন অন্য মানুষ।। 

হাতের রেশন ব্যাগ থেকে গেনু দাস দুটো কাচের গ্লাস বার করে একিনকে দিল। 

দাওয়ার বাঁশে হেলান দিয়ে ভেতরের কথাবার্তা হোচেন শুনছে। তারিণী, ঋষিও শুনছে। হোচেনের দিকে একটু ঝুঁকে তারিণী বলল, হালদারটা একটা শুয়োর। 

হোচেন কথা বলে না। থেকে থেকে ওর মাথায় বিজলি চমকে উঠেছে। ঝিম-ধরা ভাব কেটে গিয়ে রক্ত আর শরীরে অচেনা দুলুনি জাগছে। 

পরশুর সেই সকাল হঠাৎ ওর সামনে জ্যান্ত হয়ে দাড়িয়ে যায়। খয়ের খাঁ বলেছিল, তোর সুদিন আসছে। খুদা তোর মনের সাধ হাসিল করবে। চোখ-কান খোলা রাখিস। 

খয়ের খাঁ হয়তো আরও দু'চার কথা বলত। বাইরে রব্বানি চেঁচাচ্ছিল, দাদাছাহেব। ও দাদাছাহেব! 

কথা শেষ না করে ঘর থেকে খয়ের খাঁ বেরিয়ে গিয়েছিল। আবছা অন্ধকার ঘরে ভুঁয়ে পাতা ছেঁড়া ক্যাঁথার বিছানায় হোচেন আরও কিছু সময় বসে থাকল।লঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল তামাকের বাস। বাইরে অনেক পাখির গলা,ডাকাডাকি। গাছ-গাছালি, মাটি থেকে সকালের আলো বেরোচ্ছে। হোচেন ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। খয়ের খাঁর গরু ছাগল নিয়ে এখন মাঠে যেতে হবে। মুরগির ঘরের ঝাঁপ খোলা দরকার। গেঁতোমি করার সময় নেই। দরজার ঝাঁপ ঠেলে দাওয়ায় পা দিয়ে হোচেন দেখল, খাঁ ছাহেব রব্বানির বিবির মাথায় ফুঁ দিয়ে মন্ত্র পড়ছে। রব্বানির বিবির নাম আমিনা। বছর কুড়ি বয়েস। বিয়ে হয়েছে চার বছর। আমিনার পেটে বাচ্চা থাকছে না। এর মধ্যে বার তিনেক গর্ভ খসে গেছে। বিবির ঠিক পেছনে শরীরে খেঁটো ধুতি আর ময়লা গেঞ্জির ওপর তেলচিটে গামছা জড়িয়ে রব্বানি উবু হয়ে বসেছিল। আমিনার মাথায় তিনবার লম্বা ফুঁ দিয়ে খয়ের খাঁ মন্ত্র পড়ল, 

আনাচে কানাচে ছাঁচতলায় আর নর্দমাতে থাকিস, 
নারীর উদরে ঢুকে সর্বনাশ করিস। 
সোলেমানি জেন্দানে তোকে কয়েদ করিব, 
আফসুন, জাব্বার কাহার নামে তাড়াইব।। 

পূব আকাশের কচি আলোয় খয়ের খাঁর মুখ দাড়ি ভেসে যাচ্ছিল। দুচোখ বোজা মানুষটা এখন পির পয়গম্বর। আরও কিছু রুগিভুগি এর মধ্যে জুটে গেছে। কারও মুখে কথা নেই। অবাক চোখে তারা গুনিনের কাজকর্ম দেখছিল। গুনিন হিসেবে খয়ের খাঁর নামডাক আছে। ছানু মোড়লকে পাশে নিয়ে দাওয়ায় টেকো ঋষি বসেছিল। ছড়ানো মানুষগুলোকে হোচেন চেনে। ছানুর বউয়ের পোয়াতি খাঁচনি রোগ হয়েছে। খাঁ সাহেবকে একবার নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়। মানুষের রোগ-ভোগ, আলাই-বালাই-এর শেষ নেই। তবে খাঁ সাহেব ধন্বন্তরি। ওনার হাতের ছোঁয়া লাগলে সব রোগের নিকেশ হয়। 

মৃত খাঁ সাহেবের ঘরে বসে দাশু হালদার সেই কথা বলছিল, আমার কাঁকবেড়ালি ব্যামোটা আবার চাগাড় দিলে কি হবে কে জানে! 

দেবরদ্দি সান্ত্বনা দেয় ঘাবড়াবেন না কর্তা। খাঁ সাহেব আপনার রোগের গুষ্টির তুষ্টি করে দিয়েছে। ও রোগ আর আপনার কাছে ঘেঁষছে না। 

দাশু হালদারের কুঁচকিতে গুলি পাকানো পুরনো ব্যথা বহুদিন জমাট বেঁধেছিল। অমুন তেজি, 

জাঁদরেল মানুষটা বিছানা ছেড়ে উঠতে পারত না। শেষমেশ খাঁ সাহেবের ঝাড়ফুঁকে রোগ সারে। 

এটা গত সনের ঘটনা। খাঁ সাহেবকে হালদার তাই খুব মান্যিগণ্যি করত। আর হোচেন যে হাজত থেকে ফিরে এল তার কারণও তো খাঁ সাহেব। খাঁ সাহেব না থাকলে হোচেনকে কালাপানি পার করে দিত দাশু হালদার। দাশু হালদার কারও ওপর রাগলে এই খলসেপাতা গাঁয়ে তার করে খাওয়া মুশকিল। 

দেববদ্দি বলছিল, খাঁ সাহেবের মৃত্যুর ঘটনা। গোটা ব্যাপারটা যেন একটা ছবি। নামাজ পড়া শেষ করে খাঁ সাহেব কোরান হাতে মাটিতে মাথা ছোঁয়াল। পিঠের ওপর নতন কাফন। তারপর ধীরে ধীরে মাটিতে বুক দিয়ে শুয়ে পড়ল। নিমেষের মধ্যে সব শেষ। উঁচুদরের লোকেরা এভাবেই মরে। 

দেবরদ্দি কথার ফাঁকে ফাঁকে হোচেনের মাথায় পুরোনো দিনের ঢেউ চলকাচ্ছিল। উঠোনের হিমভেজা অন্ধকারে মানুষগুলো জড়ানো গলায় কথা বলে। কাঁদুনে মেয়েদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধেছে। কারণটা হোচেন বুঝতে পারল না। মাংসের বখরা নিয়ে কাজিয়া শুরু হলে অবাক হবার কিছু নেই। ঋষি, কার্তিক এখন ভূত নিয়ে কথা বলছে। মোচলমান মলে হয়, মামদো ভূত। ঋষি বলল, আর বামুনের ভূতের নাম বেম্মদত্যি। তারিণী জানাল, দু’বেটাই ঘাড় মটকায়। দাওয়ার ওপর ঋষি প্রায় কাত হয়ে পড়েছে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে তারিণী বসা। একটা কুটুরে পেঁচা বেঢপ গলায় ডাকতে ডাকতে অন্ধকার আকাশে উঠে গেল। খয়ের খাঁর লাশ সামনে রেখে হালদার কি-এক রসিকতায় খলখল করে হাসছিল। হোচেন বোঝে, হালদারের নেশা জমে উঠেছে। রাত আরও ভারী হলে হালদারকর্তা হয়তো খয়ের খাঁর পাশে মেঝেতে গড়াগড়ি দেবে। তারপর বেহুশ, অসাড়। গোটা দুনিয়া কড়া গুড়জলের ধুনকিতে তখন বেবাক হজম হয়ে যাবে। ছবিটা মাথায় আসতেই ছলাৎ করে ওঠে হোচেনের বুক। শরীর চমকে সটান হয়ে যায়। নিয়ম রাখতে সেই বিকেলে এক গেলাস তাড়ি খেয়েছিল হোচেন। খালি গেলাসে এখন গুড়জল। মুখের সামনে গেলাসটা তুলেও হোচেন নামিয়ে রাখে। মাথার মধ্যে অচেনা মতলব কেউটে সাপের মতো ফণা তুলে ফুসে উঠল। খয়ের খাঁর কথাগুলো মনে পড়ল। চোখ কান খোলা রাখতে হবে। খুদা এবার ধান্দা হাসিল করবে। আকাশে একটুকরো চাঁদ উঠতে হিজলগাছের ছায়া উঠোনে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই ছায়ায় চিনিবিবিকে হোচেন দেখতে পেল। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ধোঁয়াটে চেহারার চিনিবিবি ক্রমশ রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে যায়। মুখে শুকনো হাসি। হোচেনের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চায়। হোচেন শুনতে পায় না। হিজল গাছের ছায়া তিরতির করে কাঁপে। 

ছ'মাসও হয়নি চিনিবিবি গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে। হালদারদের বরো পুকুরের পাশে লিচুগাছের ডালে ভরসকালে চিনিবিবির ঝুলন্ত শরীরটা প্রথম দেখেছ; গেনুদাস। আষাড়ের বর্ষা তখন নেমেছে। মাঠ ঘাট গাছপালা ভিজে। দিন-রাত বৃষ্টি হচ্ছে। সেই দুর্যোগ মাথায় করে মাঝরাতে চিনিবিবি লিচুগাছের মগডালে চেপে গলায় দড়ি দিয়েছিল। খবরটা শুনে হোচেনের মাথায় বাজ পড়ল। সামনে সপ্তায় চিনিবিবিকে ওর নিকে করার কথা। পলাশপুরের মৌলবিছাহেব কলমা পড়াবে। কথাবার্তা পাকা। বাজার থেকে একটা সস্তার শাড়ি চিনিবিবিকে ও কিনে দিয়েছিল। এবার চালাঘরটা সারাবে। খড় বদলে নতুন মাটি লাগাবে। সবকিছু উলটে গেল। মাঝে সাতদিন হোচেন ঘরে ছিল না। টাকার ধান্দায় আমতলার হাটে রামু ঘরামির সঙ্গে কাজ করেছিল। সাতদিনে যে কি এমন ঘটে গেল, হোচেন ভেবে পেল না।। 

শাড়িটা হোচেনের হাত থেকে নেওয়ার সময় চিনিবিবি বলেছিল, হালদারকর্তা আমাকে কাল জবাব দিয়েছে। 

দাশু হালদারের টেকিশালে প্রায় দেড় বছর কাজ করছিল চিনিবিবি। চিনিবিবির প্রথম স্বামী, ইদ্রিশ ছিল হোচেনের বন্ধু। মাঝির নৌকোয় সুন্দরবনে কাঠ আনতে নিখোঁজ হয়। অনেক খোঁজখবর করে পাত্তা মেলেনি। শুকনো মুখে চিনিবিবি সেদিনও এইভাবে হোচেনের দিকে তাকিয়েছিল। কিছু বলতে চাইছিল, লজ্জায় বলতে পারছিল না। হোচেন খোঁচাল, হালদারকর্তা জবাব দিল কেন? 

মাথার কাপড় সামলে কিছুক্ষণ উশখুশ করে চিনিবিবি বলেছিল, কর্তা চায়, মুই বাজারে ঘর নে থাকি। তোমার সঙ্গে নিকের খবরে উনি চটেছেন। 

হোচেন গুম হয়ে গিয়েছিল। চিনিবিবির ওপর হালদারের নজর পড়বে, সে ভাবেনি। চিনিবিবিকে হালদার বাজারের মেয়েমানুষ বানাতে চায়। হোচেনের মাথায় ধিকধিক করে আগুন জ্বলছিল। হালদারের মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস তার নেই। তবু কিছু করা দরকার। তুই কি বললি, হোচেন জিজ্ঞেস করেছিল। 

মুই বলেছি, তোমার সাথে কথা কইতে, চিনিবিবি জানিয়েছিল। 

দাঁড়াবার সময় হোচেনের ছিল না। রামু ঘরামি তার জন্যে বসে থাকবে। এখনই যেতে হবে। চিনিবিবির মুখ দেখে হোচেনের মনে হয়েছিল, কাল থেকে মেয়েটা উপোস দিচ্ছে। কিছু খায়নি। অথচ তার নিজের কাছে চিনিবিবিকে দেবার মতো একটা টাকা নেই। শাড়ি কিনে হোচেন ফতুর হয়ে গিয়েছিল। 

হোচেন বলেছিল, ঘাবড়াসনি। মুই সাত দিনে ফিরব। তারপর নিকে হবে। 

ঠিক সাতদিন পরে হোচেন ফিরেছিল। চিনিবিবির গলায় দড়ি দেবার খবরটা পেয়েছিল একিনের কাছ থেকে। লিচুগাছে তখনও ঝুলছে চিনিবিবির লাশ। পুলিশ না আসা পর্যন্ত লাশ নামাবার নিয়ম নেই। থানায় খবর পাঠিয়েছে দাশু হালদার। সাতমাইল 

দূরে থানা। সন্ধ্যের আগে পুলিশ আসবে না। একিনের সঙ্গে হোচেন গেল চিনিবিবিকে দেখতে। চিনিবিবির দিকে তাকিয়ে হোচেনের মাথা ঘুরে গিয়েছিল। তার দেওয়া নতুন শাড়ি দু-টুকরো করে, এক টুকরো কোমরে জড়িয়ে, বাকিটা গলায় বেঁধে চিনিবিবি ঝুলছে। চিনিবিবি হয়তো একটা কাপড়ে এসে ঠেকেছিল। তাই মরতে, আর লজ্জা বাঁচাতে, শাড়ি দু-খণ্ড করা ছাড়া উপায় ছিল না। চিরকেলে বোকাসোকা মেয়ে চিনিবিবি জানত না যে মরার পর লজ্জা করে না। লিচুগাছের ডালটা পুকুরের জলের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। জলে দুলছিল চিনিবিবির ছায়া। হোচেন আর দাঁড়াতে পারল না। ফাঁকা মাথা। সরে এল। পুলিশ এল শেষবেলায়। গাঁয়ের বাবুদের সঙ্গে তাদের কথা হল। দাশু হালদারের বৈঠকখানায় বসে চা খেয়ে কালো গাড়িতে চিনিবিবির লাশ তুলে তারা চলে যেতে হাওয়ায় একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ল। হোচেন আর চিনিবিবিকে নিয়ে গুজবটা আসল ছিল এক ভয়ংকর কেচ্ছা। চিনিবিবির পেটে নাকি হোচেনের বাচ্চা ছিল। চব্বিশ ঘণ্টা না-কাটতেই গাঁয়ে আবার পলিশ এসে হোচেনকে তুলে নিয়ে গেল। এক মাসের বেশি পুলিশ হাজত আর জেল খানার ভাত খেতে হয়েছিল হোচেনকে। খয়ের খাঁর দয়াতে হোচেন বেঁচে যায়। চিনিবিবির পেট চিরে আধসেদ্ধ কলমি শাক, আর জল ছাড়া কিছু পাওয়া যায় নি। মানুষের ভ্রুণ ছিল না। থানার অন্ধকার ঘরে, জেলখানায় বসে হোচেন অনেকবার ভেবেছে, চিনিবিবি মরল কেন? 

গাঁয়ে ফিরে শুনেছে, স্রেফ খিদের জ্বালায়। পাঁচ দিন নাকি তার ঘরে চুলো জ্বলেনি। 

হিজলগাছের ঝাঁকড়া ছায়া কখন যেন উঠোন থেকে মুছে গেছে। হোচেনের ঘোর ভাবটা কেটে যায়। গেলাসের গুড়জল উঠোনের ধারে সে ঢেলে দিতে জলের ছরছর শব্দ। অন্ধকারে দলাপাকানো কেউ হেঁকে ওঠে, কোন শালা গায়ে মুতে দিল রে? 

কত রাত হল, হোচেন আন্দাজ করার চেষ্টা করে। মাঝ উঠোন থেকে রব্বানি বলল, ও হোচেন ভাই, এবার খাঁছাহেবকে নে চলো। এরপর আর হেঁটতে পারব না। এখনই মাথায় চক্কর কাটছে। 

খয়ের খাঁর ঘরে বোতলের কুপি নিভে গেছে। ঘর ভর্তি মিশমিশে অন্ধকার। ঘরের ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ আসছে না। দাওয়ার লম্ফটাও নিভু নিভু। সেটা তুলে নিয়ে হোচেন ঘরে ঢোকে। যা ভেবেছিল, তাই। দাশু হালদার, গেনু দাস আর দেবরদ্দি তিনজনেই কুপোকাত। হোচেনের পায়ের ধাক্কা লেগে খালি হাঁড়িটা গড়াতে গড়াতে দেবরদ্দির মাথায় লাগে। দেবরদ্দি জড়ানো গলায় কি যেন বিড় বিড় করল। ঘরের মধ্যে বেজায় ঠাণ্ডা। কাঁপুনি লাগল হোচেনের। তার কানে কেউ ফিসফিস করল, চোখ কান খোলা রাখ। সুদিন এসতেছে। 

হোচেন কাজে লেগে গেল। বাঁশের খাটুলিতে লাশ বাঁধল। নতুন কাপড় ঢাকা দিল। সাদা দাড়ি গোঁফ, পিরের মতো এই মানুষটা গত ছ'মাস নিজের ভিটেতে তাকে জায়গা দিয়েছে। লোকটার সাতকুলে কেউ নেই। গুণী মানুষটার কথা মিথ্যে হয় না। হোচেনের মনের আশ মিটবে। হোচেন ঘেমে যায়। প্রায় মাঝ রাতে গাঁয়ের জনা ছয়েক তাগড়া ছেলে, যারা টলমলে পায়ে তখনও খাড়া ছিল, খয়ের খাঁর খাটুলি কাঁধে তুলে গোরোস্থানে নিয়ে গেল! খাটুলিতে খড়ের বিড়ের ওপর দু’হাঁড়ি গুড়জল। খয়ের খাঁর ভিটে থেকে গোরোস্থান পাঁচ মিনিটের পথ। অন্ধকারে থোকা থোকা জোনাকি জ্বলে।। হাঁটার তালে তালে হাঁড়ির গুড়জল চলকে উঠে মৃতের পা ধুয়ে দেয়। 

কবর খোঁড়া ছিল। কবরের পাশে দুটো কোদাল। লাশটা গর্তে রেখে ওরা দ্রুত হাতে মাটি চাপা দেয়। গোরোস্থানের পাশে মজাহাজা পানাপুকুর থেকে পচা ঝাঁঝি আর পাঁকের গন্ধ বেরোয়। মাটি দেওয়ার পরে কবরে বসেই শুরু হয় আর এক দফা গুড়জলের আসর। মোল্লারডাঙায় শিয়ালেরা ডেকে ওঠে। পুকুর পাড়ে চালতা গাছের ঘন সবুজ পাতায় একটা লিকলিকে লাউডগা সাপ দুলতে থাকে। কবরের জটলা ছেড়ে হোচেন বাইরে এসে দাঁড়ায়। তারপর অন্ধকার আল-পথ ধরে পূর্ব-মুখো হাঁটতে থাকে। কেউ খেয়াল করে না। 

পরদিন সকালে গেনুদাস আর দেবরদ্দির হইচই শুনে দাওয়ায়, উঠোনে ঘুমন্ত মানুষগুলোর নেশা ছুটে গেল। সকালের পাতলা আলোয় চারপাশ ধোঁয়াটে। দেবরদ্দি চেঁচাচ্ছে ও হোচেন, ও একিন, এখনও খাঁছাহেবকে গোর দিলি না? 

গেনুদা জিজ্ঞেস করল, বড়োবাবু কোথায় ? 

একিন, রব্বানি, ফজলেরা ঘরের দরজায় উঁকি দিয়ে দেখল, সাদা দাড়িওলা বুড়ো মানুষটার দেহ ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। খাটুলিতে নেই। সবাই ভয় পেয়ে যায়। এ যে জিন, পরীর খেলা। ভূতুড়ে কাণ্ড! গাঁসুদ্ধুলোক আবার গোযরোস্থানে যায়। খয়ের খাঁর কবর খুঁড়ে দেখা গেল, নতুন কাপড়ে ঢাকা দাশু হালদারের শক্ত কাঠ শরীর। লোকটা অনেকক্ষণ লাশ হয়ে গেছে। রব্বানি জিজ্ঞেস করল, হোচেন কোথায় ? 

খোঁজ খোঁজ পড়ে গেল। কোথায় হোচেন? অন্ধকার রাতে সে একা একা সুদিনের  খোঁজে চলে গেছে।

1 টি মন্তব্য: