শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

নিবেদিতা ঘোষ মার্জিতের গল্প ঃ মহাশোক গাথা


বৃষ্টি হয়নি বহুদিন। যদিও মেঘের সঞ্চার দিন কয়েকের মধ্যেই হবে। মাটি রুক্ষ।অশ্বক্ষুরের আঘাতে চারিদিকে ধোঁয়ার মত আবরণ তৈরি হয়েছে। বেনুব্রত আর সুমালী উভয়েই মহাসেনাপতির প্রধান সহায়ক। তারা সেনাবাহিনীকে সামনে থেকে নির্দেশ দিচ্ছে বলে ধূলার আস্তরণের কষ্ট তাদের কম সহ্য করতে হচ্ছে। বেনুব্রত বুদ্ধিমান, সে পথ না চিনলেও,দ্রুত সিধান্ত নেবার ক্ষমতা রাখে। মহাসেনাপতি তাই তাঁকে সামনে পাঠিয়েছেন। সুমালীর এই পথ নখদর্পণে। তাঁদের গন্তব্য কলিঙ্গ।
বেনুব্রত কথা কম বলে।সুমালী যুদ্ধ সংক্রান্ত নানান পরিকল্পনা বলে চলেছে। বেনুব্রত সব কথা শুনছে তাও নয়। তার মনের মধ্যে অদ্ভুত দোলাচল। বিশ্রাম নেবার সময় হল। সামনে একটি প্রান্তর পার হলেই নিজেদের সুরক্ষিত সীমারেখা থেকে বাইরে যেতে হবে। তারপর যে গহনবন, ঢালু উপত্যকা,আর তার শেষে নদীর তীরবর্তী অঞ্চল অধিকার করতে হবে। পথে কি বিপদ লুকিয়ে আছে কে জানে।সুমালী ঠিক তার পেছনে পদাতিক ছেলেটিকে নির্দেশ দিল। সে যেন চিৎকার করে বিশ্রামের আদেশ দেয়।
ছেলেটির গলা প্রায় শেষ অবধি শোনা যায়। এবার যুদ্ধে তালবাদ্য নিয়ে আসা হয়নি। কারণ বৃষ্টি হলে সে গুলি ভালো বাজে না। পদাতিক সেনারা আর অশ্বগুলি তাপ প্রবাহের জন্যে খুব ক্লান্ত।একটি সরোবরের ধারের তৃনভূমিতে বিশ্রামের স্থান নেওয়া হল। সম্রাট আর মহাসেনাপতির বড় আমলকী বৃক্ষের নীচে বিশ্রামের স্থান স্থির করা হল। একটি উঁচু ঢিবির ওপর বসে সম্রাট জলপান করতে লাগলেন। সম্রাটের সামনে বেনুব্রত আর সুমালী এসে অভিবাদন জানাল। 
বেনুব্রত সম্রাটের চেয়েও লম্বা।সে, সব সময় বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখে দাঁড়ায়। সুমালী গিয়ে মৃদুস্বরে পরবর্তী পরিকল্পনা জানাতে থাকে। সন্ধ্যে নামার আগে নদীর ধার ঘেঁসে একটি সুবিধে জনক স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। ভোররাতে অতর্কিতে আক্রমণ করতে হবে। ওরা যদি না জানতে পারে খুব দ্রুত জয় লাভ সম্ভব। মহাসেনাপতি বেনুব্রত কে স্নেহ করেন। তিনি তার দিকে তাকিয়ে বললেন,  তুমি কিছু বলবে না বেনুব্রত? তোমার পরিকল্পনা কি? 
সম্রাট বীর দক্ষ এই সেনাপতির দিকে সাগ্রহে তাকালেন। বেনুব্রত শান্ত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল,“একটি নিবেদন ছিল সম্রাট”। সম্রাট সম্মতি দিলেন। এ যুদ্ধের আদৌ কি প্রয়োজন আছে? একবার শান্তিদূত পাঠিয়ে দেখলে হত হয়ত ওরা সমুদ্রবন্দর... 
কথা শেষ হয় না বেনুব্রতর। পাটলিপুত্রের সম্রাট অশোক পা দাপিয়ে ভয়ঙ্কর চিৎকার করে বলে ওঠেন,“ তোমাদের এই শান্তি তে আমার অরুচি ধরেছে।সুভদ্রক এই লোকটাকে আমার চোখের সামনে থেকে দূরে নিয়ে যাও।আর কখনো যেন এ আমার সামনে না আসে”।
সুভদ্রক প্রধান দেহরক্ষী। সে অতি দ্রুততার সাথে বেনুব্রত কে ঐ স্থান থেকে নিয়ে চলে যায়। যেখানে অশ্বদের জলপান করানো হচ্ছে সেখানে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায়। শান্ত বেনুব্রত হতচকিত ও বিব্রত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সুভদ্রক একটা ফিচেল হাসি হেসে বলে,  অভ্যেস হয়ে যাবে, জানো তো সব সময় ওঁর মাথায় আগুন জ্বলে। 
কান্‌হ অশ্বগুলো কে কাছ থেকে দেখছিল। হঠাৎ দেখল রাজদেহরক্ষী বিশাল লম্বা সেই সেনাপতি কে হির হির করে টেনে নিয়ে এসে অর্জুন বৃক্ষের নীচে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। সেনাপতি মুহ্যমান হয়ে বাক্যহীন। কান্‌হ এই প্রথম যুদ্ধে এলো। তার মার ইচ্ছে ছিল না সে যুদ্ধে আসে।সে শক্তিশালী নয়। সে সাঁতার দিতে পারে না। কোন অস্ত্রেও পারদর্শী সে নয়। কেবল বৃদ্ধ পিতামহের শেখানো গান সে গাইতে পারে। তার কণ্ঠস্বরে গ্রামের গবাদি পশুরা মুগ্ধ হয়ে থাকে। সন্ধ্যাকালে মাঠের উঁচু ঢিপির উপরে উঠে গান ধরলেই তারা একে একে এসে দাঁড়ায়। তারপর কান্‌হ আর তার সাথীরা তাদের নিয়ে ঘরে ফিরে আসে। তার পিতা উজ্জয়ীনি তে বিদ্রোহ দমনের সময় গিয়ে আহত হন। খুব কষ্ট পেয়ে মারা গেছেন । পিতার এক যোদ্ধা সাথী কান্‌হ কে নিয়ে আসেন। যোদ্ধার ছেলে যোদ্ধা হবে। কিন্তু তার গলার আওয়াজ দেখে তাকে এই বিশেষ কাজে নিযুক্ত করা হয়। 
প্রথম যুদ্ধে আসার জন্যে কান্‌হ যতোটা উত্তেজিত ছিল এখন একটু দমে গেছে। সেনাদের যুদ্ধ করার অস্ত্রগুলো দেখে বুক দুর্‌দুর্‌ করছে তার।তার বয়সী আর কাউকে সে এই সেনাদলে এখনো দেখেনি। তাই খুব একা লাগছে। অর্জুন গাছের নীচে বেনুব্রত কে দেখে সে অবাক হল। এই সেনাপতি কে তার খুব পছন্দ হয়েছে। কেমন উদাস উদাস । দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। নিজের তৃষ্ণা মিটিয়ে কচুপাতা ভাঁজ করে তাতে জল নিয়ে অনেক দ্বিধা বুকে, কান্‌হ পা বাড়াল। 
বেনুব্রত অবাক হলেন, এক সদ্য কিশোর তার জন্যে জল অঞ্জলিতে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মধ্যরাত শেষ হতেই আক্রমন হলো। কলিঙ্গের সেনারা কোন ভাবেই প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু নিজের ঘর,পরিবার বাঁচাতে তারা মরিয়া হয়ে প্রতিরোধ করতে থাকে। সাধারণ মানুষের হাতে অস্ত্র না থাকলেও তারা তাদের কাছে যা ছিল তাই নিয়ে লড়াই করতে থাকে। কিন্তু তাদের সামনে যে পাটলিপুত্রের সম্রাটের সবচেয়ে দক্ষ সেনা দল। আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গেছে ধানেরগোলা আর সাধারণ মানুষের আশ্রয়গুলি। মৃতদেহ আর রক্তের গন্ধে জঙ্গল থেকে শ্বাপদ বার হয়ে আসছে। আকাশে চিল শকুনরা ঘূর্ণাকারে উড়ে বেড়াচ্ছে।সুমালীর দক্ষ সেনাদল কলিঙ্গের শাসক কে বেঁধে নিয়ে এসেছে সম্রাট অশোকের সামনে। সূর্য আকাশের মধ্যেখানে আসার আগেই বিজয় সমাপ্ত হল। বেনুব্রতর অধীনে যে সেনাদল ছিল তাদের এই যুদ্ধে নাবার সুযোগ হয়নি। তারা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল আদেশের অপেক্ষায়। সুমালীর পদাতিক সেনারা চরম হিংস্রতার সাথে যুদ্ধ জয় করেছে। সাধারণ জনপদ টিতে নানান স্থানে এক যোগে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে কিছু মানুষ তৎক্ষনাৎ মারা গিয়েছে। আর যারা পালাতে শুরু করেছিল তারা সেনাদের হস্তগত হয়েছে। প্রতিরোধ করছিল যারা তারা মারা গিয়েছে। বহু বিদ্রোহ আর যুদ্ধ জয়ের অভিজ্ঞতা ছিল এই সেনাদলের। নারীদের কে সেনাদলের রিরংসা মেটানোর জন্যে, আর শিশুদের কে দাস করার সারিবদ্ধ করে দাঁড় করানো হল। কান্না আর আহতের আর্তনাদে একটা ভয়াবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। যারা বহু যুদ্ধ দেখে এসেছে তারা সাগ্রহে ব্যাপারটা উপভোগ করছে। কিন্তু কান্‌হ ? 
সে সওয়ারীহীন একটি অশ্বের উপরে উঠে বসলো। সামনে অগণিত সাধারণ মানুষের মৃতদেহ।কেউ কেউ প্রচুর রক্তক্ষরনের মধ্যে বেঁচে আছে। কান্‌হর বমি পেল। তার গ্রামে যদি এইভাবে আক্রমন হয়। মার কি হবে? সে গান গাইবে, বাঁশী বাজাবে। এই কাজ আর করবে না। সোনার মুদ্রার তার প্রয়োজন নাই। ক্লান্ত অশ্বটি কে নিয়ে নদীর দিকে যাত্রা করলো কান্‌হ। 
মহাসেনাপতির শরীর টি স্থুল। আজকাল যুদ্ধ হলে একটু দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যান।একটি ছাতার নীচে বসে হাঁপাচ্ছেন। তাঁর ব্যাক্তিগত সেবক তাঁর বর্ম খুলে দিচ্ছে।ধীর পায়ে বেনুব্রত এসে দাঁড়ায়। বেনুব্রতকে আর আগের মত বিশেষ নজরে দেখার দরকার নেই।“একটি অনুমতি চাইছি মহাসেনাপতি” বেনুব্রত বলে।তাছিল্যের সাথে তিনি বলেন, তোমার তো সব উদ্ভট আবেদন বল কি বলবে ? 
নিজের বিরাটকায় অসি, সেনাপতির বিশেষ শিরস্ত্রান খুলে মহাসেনাপতির পায়ের কাছে রাখে বেনুব্রত।নতজানু হয়ে বলে, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একটি দল দক্ষিন সাগরের দিকে যাত্রা করা শুরু করেছে। আমি তাদের সাথে যোগ দেবো।
নদীর ধারে এসে কান্‌হ দেখল নদীর জল রক্তবর্ণ। প্রচুর শবদেহ ভাসছে। এবার কেঁদে ফেলল সে। নদীটি গভীর কিন্তু চওড়া নয়। ওপাড়ের গহন জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে অবাক হল। বেশ কিছু মুণ্ডিত মস্তক মানুষ। তারা হলুদ রঙের কাপড় করে আছে।তারা খুব মনোযোগ দিয়ে এই যুদ্ধভুমির দিকে তাকিয়ে আছে। দুপুর শেষ হয়ে আসছে। অবাক হয়ে কান্‌হ দেখে তার সেই দীর্ঘকায় সেনাপতি কটি মাত্র বস্ত্রে নদীর জলে নেমে গেলেন। রক্তনদী পার হয়ে অন্য পাড়ে চলে গেলেন। হলুদ কাপড় পরা সেই মানুষরা তাঁর অভ্যর্থনায় এগিয়ে এলো। নদী পার হয়ে সেনাপতির সাথে কান্‌হ কি তবে চলে যাবে? মার জন্যে বুকের মধ্যেটা কেঁপে ওঠে। না না, সে মায়ের কাছে ফিরবে। 
সন্ধ্যাকালে কান্‌হ বীভৎস রণক্ষেত্র ছেড়ে যখন চুপিসারে বার হয়ে গেল, তখন সৈন্যরা নারী, সুরা আর স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে আনন্দ করছে। মহাসেনাপতি কে সুভদ্রক ডেকে পাঠিয়েছে। সম্রাটের ব্যাপারে কিছু জরুরী সংবাদ। নিষ্প্রদীপ শিবিকাতে সম্রাট একা বসে আছেন। পূর্ণিমার রাত হলেও আকাশে গহন নব বর্ষার মেঘ। মহাসেনাপতি অভিবাদন করে জিজ্ঞেস করলেন,  কি হয়েছে সম্রাট?
নিথর স্তব্ধতা ভেঙে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সম্রাট অশোক বললেন,  এ আমি কি করলাম !  

বাইরে বৃষ্টি শুরু হল। 

------------------------------

1 টি মন্তব্য: