শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সলিল চৌধুরীর গল্প: ড্রেসিং টেবিল

বিয়ের পর নন্দা আমাকে যত চিঠি লিখত তার প্রায় প্রত্যেকটাতেই শেষে'পুঃ' দিয়ে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা থাকত : 'ঘর যখন নেবে আমারজন্য একটা ভালো ড্রেসিং-টেবিল কিনতে ভুলো না—আর, আরআয়নাটা যেন খুব বড়ো আর ভালো হয়।'

বিয়ের আগে নন্দার বাড়ি যখন যেতুম প্রথমেই নজরে পড়ত দরজারসামনের দেওয়ালে একখানি চটা-ওঠা আয়না। তাতে মুখ দেখলে ওঃযা দেখাত! নাক থেকে কপাল পর্যন্ত পুরো এক হাত লম্বা, আর ঠোঁটথেকে চিবুক মাত্তর এক ইঞ্চি! আবার একটু নড়লে-চড়লেই আয়নায়নানারকম ভঙ্গি করে মুখ ভ্যাংচাত!

রীতিমতো মন খারাপ হয়ে যেত আমার, আর নন্দা হাসত, বলত, 'তোমার কাছে যখন যাব তখন ভালো আয়না কিনে দিও!'

পরবর্তী জীবনে নানা সমালোচকের সম্মুখীন হতে হয়েছে—তাঁদেরসমালোচনায় নিজের প্রতিবিম্বও দেখেছি—দেখে বেশির ভাগ সময়েইমনে পড়েছে নন্দার বাড়ির সেই আয়নার কথা। সে কথা থাক—

বিয়ের ঠিক পরে। তখন আমার দু-তিনটে খবরের কাগজে ভালোচাকরি পাওয়ার কথা হচ্ছে, মানে এই হল বলে আর কি! সেটা না-হওয়াপর্যন্ত কটা দিন নন্দা তার বাবার কাছে থাকবে—ঠিক হল। আর চাকরিহলেই ঘরভাড়া নিয়ে নন্দাকে কলকাতায় নিয়ে আসব। কেমন করে ঘসাজানো হবে, কোন জায়গায় কী থাকবে—সে-সব প্ল্যান দুজনে মিলেআলোচনা করে পুরোপুরি মাথায় নিয়ে কলকাতায় এসে হাজির হলুম।নন্দা রইল গ্রামে তার বাবার কাছে। এর পরে ছ-মাসের কাহিনী যদিআপনারা শোনেন—থাকগে, সে-সব বলে লাভ নেই, কারণ যে-কাহিনীবলতে বসেছি সেটা আমার নিজের কথা নয়। তবু বলে রাখা ভালো যেচাকরি আমি পেয়েছি, নয়তো অনেকে মনে করতে পারেন যে বেকারসমস্যার ওপর আমি কটাক্ষ করছি। অবশ্য যে-চাকরিগুলো পাবারকথা ছিল তার একটাও পাইনি, কিন্তু এমন-একটা পেয়েছি যা ঘুণাক্ষরেমনের ত্রিসীমানাতেও কোনোদিন ঠাঁই পায়নি। এক কথায়, জুতোরদোকানের সেলসম্যান। আর কসবার একেবারে ভেতরের দিকে যে এঁদোপুকুরগুলো আছে তারই একটার পাড়ে দুখানা টিন-দেওয়া ঘর একমামাতো ভাইয়ের সঙ্গে বখরা করে ভাড়া নিয়েছি। নন্দাও চলে এসেছেবাপের বাড়ি থেকে—মানে, বেশ আছি। নন্দার একটা আশ্চর্য প্রতিভাআছে, বোধহয় সব মেয়েদেরই ওটা থাকে; সেটা হচ্ছে, অবস্থার সঙ্গেনিজেদের খাপ খাইয়ে নেবার ক্ষমতা। একদিনের জন্যেও মুখ শুকনোদেখিনি নন্দার—যেন কসবার টিনের ঘর ভাড়া নেওয়াটাই তারআজীবনের স্বপ্ন। কিন্তু একটা ব্যাপার, এ-ঘরে আসার পর থেকেএকবারের জন্যও নন্দা বলেনি ড্রেসিং-টেবিলের কথা। আমিও প্রায়ভুলেই গিয়েছিলাম। এমন সময় এক শনিবারের দুপুরবেলা একটা ঘটনাঘটল। নগদ করকরে ষাট টাকা মাইনে গুনে নিয়ে সেদিন বাড়ি ফিরছিপথের দু-দিকে চাইতে-চাইতে। ইচ্ছে করলেই কত-কী কিনতে পারি, অথচকিছুই কিনছি না, এটা যেন আমার সম্রাটিক খেয়াল। বেশ লাগে পকেটেটাকা থাকলে! হঠাৎ ঠিক কসবার মোড়ে দেখি এক চমৎকার ড্রেসিং-টেবিল রাস্তায় নিলেমে বিক্রি হচ্ছে। আরও কত-কী ফার্নিচার আশ্চর্যশস্তায় যাচ্ছে। ড্রেসিং-টেবিলটার গ্লাসের একটা কোণ কেবল একটু ফাটা, তাছাড়া প্রায় নিখুঁত—দাম উঠল মাত্র তিরিশ টাকা—ভাবুন! হুপেরমাথায় 'যা থাকে বরাতে' বলে কিনে ফেলে মুটের মাথায় চাপিয়ে সটানবাড়ির দিকে পা বাড়ালুম। বাড়িভাড়া যাবে ১৫ টাকা, বাকি ১৫টি টাকায়সারা মাস সংসার চালাতে হবে। নন্দার মুখটা চোখের সামনে ভেসেউঠল—কত আশা কত স্বপ্ন বুকে নিয়ে বেচারি ভালোবাসতে শুরুকরেছিল, তার ত কিছুই মিটল না! তিরিশ টাকা যায় যাক, কুছ পরোয়ানেই।

বাড়ি ঢুকতেই নন্দা প্রথমটা অবাক হয়ে গেল—তারপরে কী যেন ভেবেকী ভীষণ খুশি যে হয়ে উঠল কী বলব। অন্য মেয়ে হলে হয়তো টাকারহিশেব করে এতক্ষণে প্যানপ্যান করতে বসত—কিন্তু দরিয়ার মতো দিলআছে নন্দার—কবি না-হোক, কবি-স্ত্রী হবার সে নিশ্চয় উপযুক্ত। প্রায়সারাক্ষণ নন্দা আয়নার সামনেই বসে কাটাল, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে চুলবাঁধল—কাপড় ছেড়ে কপালে টিপ পরল—মাথার ঘোমটা টেনে অকারণেদু-একবার হাসল। বিছানায় শুয়ে-শুয়ে খুশিতে যেন আবেশ আসছে—কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। বিয়ের আগের দিনগুলো স্বপ্নে ভাসছে—কেমনযেন সার্থক মনে হচ্ছে জীবন। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল—নন্দা ডাকছে।ধড়মড়িয়ে উঠে বসলুম—নন্দার দু-চোখ ফুলে লাল হয়ে উঠেছে—চোখদিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে—সারা শরীর কেঁপে-কেঁপে উঠছে!

'কী হয়েছে নন্দা? কাঁদছ কেন অত?'

'ও আয়না তুমি ফেরত দিয়ে এসো—ও আমার চাই না', বালিশে মুখঢেকে নন্দা কাঁদতে লাগল। হয়তো পুরোনো জিনিশ বুঝতে পেরে ওরঅপমান হয়েছে। কিন্তু নতুনের দাম কত! সে কি আর আমাদের কেনারসাধ্যি! এত অবুঝ হলে কেমন করে চলবে? আর জিনিশটা তো প্রায়নতুনই বলা যেতে পারে।

'ছি! নন্দা শোনো।'

'না, না, না, আমার চাই না। তুমি ফেরত দিয়ে এসো।' স্তম্ভিত হয়েগেলুম। কেবল সংকীর্ণ একটা প্রেসটিজ বড়ো হল নন্দার। আর আমারকোনো দামই নেই ওর কাছে?

'বেশ। তাই হবে। ফেরত দিয়ে আসব।'

নন্দা আস্তে-আস্তে উঠে চলে গেল—খানিক পরে ফিরে এল আবার।আমার কোলের ওপর একতাড়া চিঠি ফেলে দিয়ে বলল—'এইগুলো পড়েদেখো।' নীল খামে মোড়া পরিষ্কার বাংলায় লেখা চারখানা চিঠি।

'কার চিঠি এ? কোথায় ছিল?'

'আয়নার দেরাজের মধ্যে ছিল।'

চিঠিগুলো নিয়ে বসলুম। খুলে পড়তে শুরু করলুম এক-একখানা করে—হাত কাঁপছে—কী ব্যাপার কে জানে? তারিখ হিশেবে পর-পর সাজালেচিঠিগুলো এই :



এক

বাগেরহাট 

প্রিয়তমাসু—

আজ রাত বারোটায় এখানে এসে পৌঁছেছি। মনে হচ্ছে কতদিন যেনছেড়ে এসেছি তোমাকে। ভাবতে অবাক লাগছে কাল এতক্ষণে তুমি কতকাছটিতে ছিলে।

জায়গাটা শহর থেকে কিছুটা দূরে। অমলের কথা মনে আছে তো? সেএখানকার কলেজে প্রোফেসারি করছে। কাল থেকে তার ওখানেই উঠব।শরীর বড়ো ক্লান্ত লাগছে—অবশ্য ট্রেনে বিশেষ কষ্ট হয়নি। ট্রেনে একটাবড়ো মজার ব্যাপার হয়েছে, শোনো : আমার সামনের বেঞ্চেই একটিপ্রৌঢ় ভদ্রলোক, তাঁর স্ত্রী, একটি ছোটো ছেলে আর দুটি মেয়ে আমারসহযাত্রী। সুন্দর ঝকঝকে একটি পরিবার—ছেলেমেয়ের নিটোল-স্বাস্থ্যপ্রৌঢ়ের অমায়িক হাসি-মুখ আর খাঁটি বাংলার মা—ভীষণ ভালোলাগছিল। স্কেচবইটা বের করে মনে রাখার মতো করে সাজিয়েনিচ্ছিলাম। একটি মেয়ের নজরে পড়ল যে আমি ছবি আঁকছি—সে তারবোনকে বলল, বোন মাকে বলল—মা বাবাকে বললেন। প্রৌঢ় ভদ্রলোকভীষণ উৎসাহে একেবারে ফেটে পড়লেন, 'তাই নাকি? দেখি কেমনআঁকলেন আমাদের? আরে! এমন অদ্ভুত মশাই! একেবারে জাদুকরলোক দেখছি আপনি!'

তারপর মহা হৈ-চৈ! যাই কেনেন তাই খেতে দেন আমাকে, কিছুতেইছাড়বেন না।

'আরে মশাই, বাঙালির এত দুর্দশা কেন জানেন? তারা শিল্পীর কদরজানে না। আমারও ওসব শখ ছিল—এককালে নামও ছিল গাইয়ে-বাজিয়ে মহলে। নিন ধরুন—লজ্জা কীসের?'

খেতে হল। ভদ্রলোক যখন বলেন উত্তরের প্রত্যাশা করেন না—মনের ভাবটা যেন এই যে তাঁর ওপরে আর-কোনো কথাই চলতে পারেনা।

'বিয়ে-থা করেননি তো? বেশ! এটি যেন করবেন না—এই দেখুন নাআমার—হেঁ হেঁ—সব চুলোয় যাবে তাহলে'—আমি বলতে যাচ্ছিলুমআমি বিয়ে করেছি—ভদ্রলোক মুখ থেকে কথাটা কেড়ে নিয়ে বললেন :

'আমার মেয়েদের ছবি আঁকা শেখান না আপনি! যা লাগে দেব, কলকাতাতেই তো থাকেন --- আমার বাড়ি হচ্ছে বিডন স্ট্রিট। আসবেননিশ্চই। যাক, তাহলে, ঐ কথাই রইল। হাসি, খুশি। তোরা খুশি তো? দ্যাখ, কেমন মাস্টার পেয়ে গেলি—হেঁ হেঁ—হেঁ।'

কোনো কথার উত্তর দেবারই অবকাশ নেই আমার। বোন দুটি জিজ্ঞেসকরে, 'সত্যি আসবেন তো?'

'হ্যাঁ-হ্যাঁ, আসব।' উপায় নেই।

ইতিমধ্যে ছোটো ভাইটি আমার ব্যাগ হাতড়ে অ্যালবামটা টেনে বেরকরেছে—আঙুলে থুতু লাগিয়ে ছবি উলটে দেখছে।

মা বললেন, 'ছি খোকা, অসভ্যতা কোরো না, রেখে দাও!'

'না, মা! মাস্টারমশাই আমাকে দেখতে বলেছেন, বলুন না আপনি, বলেননি?'

'হ্যাঁ-হ্যাঁ, আমি ওকে দেখতে বলেছি।' এরা সব একজাতের।

ভদ্রলোক রাণাঘাটে নেবে যাবেন। তোমার তৈরি লুচি বের করলুম—'খেতেই হবে।' খোকাকে দিলুম, বোনদের দিলুম। নানা কথা হল—দেশের স্বাস্থ্য, টেন্যান্সি অ্যাক্ট, কমনওয়েলথ। তারপর তাঁরা নেমেগেলেন। গাড়ি ছাড়ে-ছাড়ে, হঠাৎ ভদ্রলোক বললেন : 'আরে ভালো কথা, আপনার নাম-ঠিকানাটা তো জানা হল না। বলুন-বলুন'—তিনিকাগজ-কলম বের করলেন। একবার বললুম --- শুনতে পেলেন না—আবার বললুম—'রহিমুদ্দিন চৌধুরী।'

'অ্যাঁ?'

'রহিমুদ্দিন চৌধুরী।'

'অ।'

লিখে নিলেন কিন্তু হাত কাঁপল। ঢোঁক গিলে বললেন, 'তা বেশ বেশ! কিন্তু ধরার উপায় নেই, দেখলে মনে হয় ঠিক বাঙালি—তাই নয় গো?'

দেখলে মনে হয় ঠিক বাঙালি—তাই নয় গো? আমি চেঁচিয়ে বলতেচাইলাম : 'এখন কী বুঝলেন তবে, পাঞ্জাবি?' কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বেরহল না।

আবহাওয়াটা সহজ করার জন্যে বোন দুটি তেমনি হেসে বলল—'ভুলেযাবেন না, আসবেন ঠিক—বিডন স্ট্রিট।' হাসবার চেষ্টা করলুম।

গাড়ি ছেড়ে দিল। দেখতে পেলাম খোকার হাত থেকে মা ছুঁড়ে ফেলেদিলেন খাবারটা। তোমার হাতের তৈরি সেই খাবারের টুকরোটা প্ল্যাটফর্মেপড়ে রইল। ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল—মনে হল কামরাশুদ্ধলোককে ডেকে বলি : 'দ্যাখো তোমরা—, বড়ো অবিচার হল, দ্যাখো।' কেউ কিছু জানল না। আমি চুপচাপ বসে রইলাম—সমস্ত দিনটাইআমার মাটি।

সব কথা এখন আর মনে নেই—মনে রাখতেও চাইনে, মাঝে-মাঝেবোন দুটির কথা কানে ভাসছে : 'ভুলে যাবেন না—আসবেন ঠিক—বিডন স্ট্রিট।' মনে-মনে বলি :

'না, তোমাদের ভুলব না বোন—তোমরাই নতুন বাংলা—তোমাদেরমুখ চেয়েই যে আমরা বেঁচে আছি—তোমাদের ভুলব না।' চিঠির উত্তরদিও।...

তোমার রহিম

খামের উপরে ঠিকানা লেখা :—

আমিনা চৌধুরী

উজানিপাড়া, হাওড়া



দুই

বাগেরহাট

বৌ—

আজ সকালে অমলের বাসায় এসে উঠেছি। পথে আসতে দেখছি বহুলোক ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে শুরু করেছে। থমথম করছে সমস্তশহরটা—লোকে জোরে কথা পর্যন্ত বলছে না। বুঝতেই পারছ, হঠাৎএকেবারে এর মাঝখানে এসে পড়ে হতভম্ব হয়ে গেছি। ব্যাপারটা ভালোকরে বোধগম্য হওয়ার আগেই শুনি অমল চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছে—মালপত্র বাঁধাছাঁদা হচ্ছে। দু-একদিনের মধ্যেই ওরা পাকিস্তান ছেড়েকলকাতায় রওনা হবে। আমাকে ওরা আশা করেনি—অমলের বৌ একটুফিকে হাসল।

'ব্যাপার কী, অমল? কী খবর, বৌদি? তোমরাও শেষকালে চললে?'

বৌদি হাসবার চেষ্টা করল, 'তোমাদের দেশে তো আর আমাদেরজায়গা হবে না ঠাকুরপো!'

'আমাদের দেশ? আমাদের দেশ মানে? খুলনা তো অমলের দেশ—আমার দেশ ২৪ পরগণা—যাচ্ছ তো আমার দেশেই শুনছি।'

'আজকাল আর তা নয়—এখন মোছলমানের দেশ পাকিস্তান আরহিন্দুর দেশ হিন্দুস্থান।' অমল বলল বৌদিকে : 'তুমি যা করছিলে তাইকরো গিয়ে।' জিনিশপত্র গোছাতে বৌদি চলে গেল। চুপচাপ অমলেরদিকে চেয়ে বসে রইলাম। অমলের বাচ্চাড়া নতুন হামা দিতে শিখেছে—ফুটফুট করছে সুন্দর—সামনে দুটো দাঁত উঠছে। সে তার বাপের পাধরে দাঁড়াতে গিয়ে ধপ করে পড়ে কেঁদে উঠল। অমলের ভ্রূক্ষেপ নেই।

'শোন রহিম, কথা আছে তোর সঙ্গে।'

'বল, শুনছি।' বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলুম।

অমলের কাছে যা-কথা শুনেছি তার মোট কথাগুলো তোমাকেজানাচ্ছি : শহর থেকে কয়েক মাইল দূরে নমশূদ্রের গ্রামে একটা ভীষণকাণ্ড ঘটে গেছে। নমশূদ্ররা বেশির ভাগই চাষী—নয়তো জেলে।স্বভাবতই তারা গরিব। কিছু দিন ধরে জমিদারের অত্যাচারের বিরুদ্ধেতারা একজোট হচ্ছিল। তাদের দুজন নেতাকে ধরবার জন্য পুলিসওয়ারেন্ট বের করে। নেতাদের মধ্যে একজন হিন্দু, একজন মুসলমান।তাদের ধরার জন্য গ্রামে যখন একদল পুলিস ঢোকে চাষীরা তাদেরবলে ফিরে যেতে। তাতে কাজ না-হওয়ায় কিছুটা উত্তম-মধ্যম দিয়ে তারাতাদের বের করে দেয় গ্রাম থেকে। এর পরেই ঘটনার শুরু। বহু আর্মডপুলিস আর বেসরকারি গুণ্ডাবাহিনী গিয়ে হাজির গ্রামে।স্ত্রীপুরুষনির্বিচারে শুরু হয় প্রচণ্ড অত্যাচার। গ্রামকে গ্রাম তারা জ্বালিয়েদেয়—আর যা পায় লুঠ করে নিয়ে আসে। সমস্ত মানুষ গাঁ ছেড়ে পালাতেশুরু করে—আর্ত চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভরে ওঠে। এদিকে জোরপ্রচার চলতে থাকে যে হিন্দুরা হচ্ছে পাকিস্তানের শত্রু—ওদের তাড়াও।এই সুযোগে শহরে গুণ্ডারা হিন্দুদের কয়েকটা দোকান লুঠপাট করে—আগুন দেয়। সদর রাস্তায় ওরা শাসাতে থাকে হিন্দুদের। আনোয়ারকেতোমার মনে আছে? সেই যে-স্কাউন্ড্রেলটা কলেজে একদিন তোমাকেকুৎসিত ইঙ্গিত করেছিল? শুনেছিলাম একজনের সঙ্গে শেয়ারেরবিজনেস করার নাম করে তার যথাসর্বস্ব মেরে দিয়ে পাকিস্তানে চলেএসেছে। এখন শুনি সেই নাকি এখানকার গুণ্ডাবাহিনীর মস্ত বড়ো কর্তা।তিনিই নাকি লীড করছেন।

শুনে পর্যন্ত রক্ত টগবগ করে ফুটছে। রাসকেলটার যদি একবার দেখাপাই তো ওর টুঁটি আমি ছিঁড়ে দেব—এ তুমি দেখে নিও। অমলরা চলেযাচ্ছে—কাল না-গেলে পরশু যাবে—নয়তো তার পরদিন। কী বলবওদের বলো তো? লজ্জায় দুঃখে আমার বুকটা খানখান হয়ে যাচ্ছে। কীযেন আমার একটা করা উচিত, বুঝতে পারছি না। অমলের দেশ ছেড়েযদি অমলকে চলে যেতে হয়, আমার দেশকেই বা আমি আঁকড়ে থাকবকোন যুক্তিতে? ভাবতে খারাপ লাগছে বড়ো। এখানে বিশেষ কাউকেচিনি না। একটি পরিচিত ছাত্রের সঙ্গে দেখা হয়েছে—তারা পীস কমিটিকরছে বলল। সব কাজকর্ম এখানে প্রায় বন্ধ। ভাবছি কাল-পরশু নাগাদঢাকা চলে যাব।সেখানে শুনছি কিছু-কিছু কাজ পাবার সম্ভাবনা আছে।অন্য কিছু ভেব না। আজকের দিনে মানুষকে আর সহজে বেশিদিনবিভ্রান্ত করে রাখা যায় না। মনুষ্যত্ব জয়ী হবেই—এই আশাতেই বুকবাঁধতে হবে। ওখানকার পরিচিতদের কাছে এখানকার সঠিক খবরটাদিও।...

তোমার রহিম



তিন

ঢাকা

বৌ—

তোমার চিঠি পেয়ে আরও ভাবনা বাড়ল। কলকাতার কাগজগুলোখুলনার ব্যাপারকে যদি এইভাবে প্রচার করতে শুরু করে থাকে তাহলেতার সাংঘাতিক ফল ফলবে। যে-পয়সা লাভের আশায় ওরা দানবকেজাগিয়ে তুলছে সেই দানবই ওদের ধ্বংস করবে। তবে ওরা বোধহয়নিশ্চিন্ত যে সময় বুঝে দাঙ্গা বাঁধানো বা থামানো—এটা ওদেরই হাতে! এখানকার কাগজগুলোও ঠিক তাই শুরু করছে। পরস্পরের ওপর সন্দেহআর অবিশ্বাস ক্রমশ বাড়ছে, কখন কী ঘটে সেই আশঙ্কায় সবারচোখেমুখে বিষণ্ণতা দেখছি, এমন যদি কোনো শক্তি থাকত যা এই সমস্তনোংরামিকে পায়ে মাড়িয়ে মনুষ্যত্বের ধ্বজাকে উঁচুতে তুলে ধরবে, শুধুআমি নয় প্রায় সবাই মনেপ্রাণে এই কথাটি অনুভব করছে—কিন্তু সেকই? এখানে সরকারি মহলে কিছু কাজের আশায় ঘোরাঘুরি করতেহচ্ছে। আমি যে বাঙালি, এই কথাটাই প্রায় ভুলে যেতে বসেছি। তুমি তোজানো, আমি পয়সা খরচ করে উর্দু ভাষা শিখেছিলাম। উর্দু সাহিত্যকেআমি ভালোবাসি। কিন্তু যখন সেটা শাসনের দণ্ড হয়ে সোজা ঘাড়েরওপর পড়তে চায়, আমার সংস্কৃতির টুঁটি টিপে ধরে, তখন তাকে বর্জনকরাই মানুষের কাজ। সকলের কথায় সোজা বাংলায় উত্তর দিই—বুঝলেভালো, না-বোঝে পরোয়া নেই। কাজেই কাজ যে জুটবে না বেশি, তাবোধহয় বুঝতে পারো।

তোমার রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করতে হয়েছে জেনে ভারিকষ্ট হচ্ছে। তোমাকে দেখে যারা কথা না-বলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, আমিঅন্তত বিশ্বাস করি তাদের রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখবার কোনো অধিকার নেই, কিন্তু এ-বিশ্বাসও হারিও না যে এরা সবাই ভালো—এদের বাদ দিয়ে একাতুমি যাবে কোথায়? দুর্ভাগ্য দেশের অভিশাপ এখনো কাটেনি, সে-দুর্ভাগ্যথেকে তুমি আমি বাদ যাব কেমন করে বলো, বৌ! মনুষ্যত্বের অপমানযখন দেখি, মনে হয় আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে খাক করে দিই হতভাগাদেশের পচা আবর্জনাগুলোকে।

সেদিন শুনলুম কয়েকটা চ্যাংড়া মিলে সদর রাস্তার ওপরে এখানকারকলেজের পণ্ডিতকে যাচ্ছেতাই অপমান করেছে—টিকি কেটে দিয়েছে, মুখে গোমাংস দিয়েছে জোর করে। ভাবতে পারো? আমি শুনেএখানকার মাতব্বরদের বললুম : 'আপনারা থাকতে চোখের সামনেএইসব অনাচার ঘটছে—আপনারা কি ঠিক জানেন যে আপনারাএখনো বেঁচে আছেন?'

তাঁরা বললেন : কী করব—ওদের হাতে বন্দুক আছে, পেছনে পুলিসআছে। ওরা হুমকি দিয়েছে যে-কেউ ওদের বাধা দেবে তারাই পাকিস্তানেরশত্রু। তাদের ঘরদোর ওরা জ্বালিয়ে দেবে, তাদের খুন করবে—ইত্যাদি।মাঝে-মাঝে সন্দেহ হয় গোটা জাতটারই শিরদাঁড়া বেঁকে গেছে, নইলেকটা আগাছাকে উপড়ে ফেলা যায় না? আগাছাই বোধহয় জন্মাচ্ছে বেশি—বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও স্বীকার করতে হবে।

এখানে আর মোটে ভালো লাগছে না, বৌ। এধারে এসেই বোধহয় ভুলকরেছি—তোমাকে ছেড়ে আর এক দণ্ডও থাকতে পারছি না।...কাজকর্মচুলোয় যাক, দু-একদিনের মধ্যেই পাড়ি দেব। অমলের চিঠি পেয়েছি—ওরা আগামীকাল রওনা হবে। কলকাতায় গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করবেলিখেছে। ওখানেই ওদের ব্যবস্থা করে দিও। কোনোরকম চলে যাবেই।

তোমার রহিম



[এর পরের চিঠিটা প্রায় কুড়িদিন পরে লেখা। মনে হয় এর আগে আরওচিঠি লিখেছিলেন—যে-কোনো কারণেই হোক সেটা নেই]



চার



আমিনা—

আমি বোধহয় শিগগিরিই পাগল হয়ে যাব। গত সাতদিন ধরে একসেকেণ্ডের জন্যও ঘুমোতে পারিনি—পাগলের মতো সারা শহরে ঘুরেবেড়িয়েছি। মনে হচ্ছে মনুষ্যত্ব শেষ হয়ে গেছে—বীভৎস তাণ্ডব চলছেপশুত্বের। চারিদিকে চিৎকার, কান্না আর পৈশাচিক উল্লাস। তার ওপরআজ আট দিন তোমার কোনো চিঠিপত্র নেই। হাজার-হাজার রিফিউজিএসে জড়ো হচ্ছে। তারা বলছে কলকাতায় আর-একজন মুসলমানওবেঁচে নেই। বিশ্বাস করা উচিত কিনা সে-বিচারের বুদ্ধিও আমার লোপপেয়ে গেছে। তুমি কোথায় আছ? তুমি এখনো আছ তো? এ-কথা আজআর কোনো মানুষকে জিজ্ঞেস করি না—জিজ্ঞেস করি সূর্যকে, জিজ্ঞেসকরি গাছপালাকে—আর জিজ্ঞেস করি, আমার আমিনা কেমন আছে? কোথায় আছে?

অমলের একখানা চিঠি এসেছে। বর্ডার থেকে ওদের মারধোর করেসমস্ত লুঠপাট করে নিয়েছে। বৌদিকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেছে—অমলকোনোরকমে বাচ্চাটাকে নিয়ে রাণাঘাটে পৌঁছেছে। অমল লিখেছে—'আমার অবস্থার কথা না-লেখাই ভালো, তবে এটুকু জ্ঞান এখনোআছে যে এ-খবর কলকাতার কাগজওয়ালাদের হাতে পড়া উচিত নয়। যাভালো হয় করিস। আমি দেহমনে সম্পূর্ণ অথর্ব হয়ে গেছি।' আমিএখনই বেরিয়ে পড়ছি। এখানে আর কয়েক ঘণ্টা থাকলে বোধহয়আত্মহত্যা করে বসব। বৌদিকে খুঁজে বের করতেই হবে। তোমার খবরপেলে মনে অনেকটা জোর পেতুম। জানি না আবার কবে তোমায় দেখব—জানি না দেখব কিনা।

আমার অক্ষমতাকে ক্ষমা কোরো। বড়ো অহঙ্কার ছিল তোমারদেশকে আমি চিনে ফেলেছি—সে-অহঙ্কার চূর্ণ হয়েছে। মনুষ্যত্বকে বড়োকরতে গিয়ে পশুত্বকে ছোটো করে দেখেছি—তাই পশুর প্রতিরোধ শুরুহয়েছে। যেখানেই থাকো, যেমন থাকো,—সাবধানে থেকো। তোমাকেআমি হারাতে পারব না বৌ, অমলের মহত্ত্ব আমার আছে কিনা, সে-পরীক্ষা আমি দিতে পারব না। আমি সাধারণ মানুষ।...

তোমার রহিম



চিঠি এই কটাই। পড়ার পর হাওড়া উজানিপাড়ায় গিয়ে খোঁজ করেছিশিল্পী রহিমুদ্দিনের বাড়ি কোনটা। কেউ বলেছে—'জানি না।' কেউবলেছে—'এ-পাড়ায় কোনো নেড়ে-ফেড়ে আর নেই মশাই।' একজনপানওয়ালা শেষ পর্যন্ত দেখিয়ে দিল একটা একতলা বাড়ি—তার দুখানাঘর নিয়ে ওরা থাকত। বাড়িটার শোচনীয় অবস্থা, দরজা-জানালারএকটারও কপাট নেই—মাঝখানে কেবল একটা চট ঝুলছে। ডাকাডাকিকরলে কেউ সাড়া দেয় না। শেষ পর্যন্ত চট সরিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখিঅন্তত বিশজন মেয়েছেলে-বাচ্চাকাচ্চা শুদ্ধ কেউ বসে কেউ শুয়ে রয়েছে। আমাকে ঢুকতে দেখে সবাই যেন চমকে উঠল। বাড়িটার চেয়েও তাদেরঅবস্থা খারাপ। জিজ্ঞাসা করলাম : 'রহিমুদ্দিন চৌধুরী এখানেথাকেন?'

তারা কেউ নাম শোনেনি রহিমুদ্দিনের—সেদিন সকালে খালি ঘরপেয়ে আশ্রয় নিয়েছে—পূর্ব বাংলার উদ্বাস্তু সব। শুনলাম এরই মধ্যেচারবার হুমকি দেওয়া হয়েছে—রাতের মধ্যে উঠে যেতে হবে। একটিমধ্যবয়সী মহিলা ঘরের এককোণে বসে বমি করতে শুরু করলেন, সবাইনির্বিকার। এক ধামা খই-মুড়ি নিয়ে দুটো ছেলে ঢুকল—দেখে মনে হলস্কুলের ছাত্র। তারাই ওদের এ-বাড়িতে জোর করে জায়গা দিয়েছে—দেখাশোনা করছে। তাদের জিজ্ঞাসা করলুম। একজন চিনতরহিমুদ্দিনকে—আমিনাকেও চিনত। তার দিদি রহিমুদ্দিনের কাছে ছবিআঁকা শিখতে আসত—সে-ও আসত দিদির সঙ্গে। তার কাছে সব খবরপেলুম। বলল : 'মাস্টারমশাই শুনেছি পাকিস্তানে আছে—কিন্তু আমিনাদিদি বোধহয় বেঁচে নেই। একদিন রাতদুপুরে এই ঘরটায় শিকল বন্ধ করেআগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমরা অনেক চেষ্টা করেছি আগুননিভিয়ে ওদের উদ্ধার করতে—কিন্তু পারিনি—তখন ভীষণ গুলিচলছিল।' ছেলেটির চোখ ছলছল করতে থাকে। বাড়িটার দিকে চেয়েদেখলাম—সমস্ত দেওয়ালগুলো পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে—পাশেই একটানিমগাছ ঝলসে কুঁকড়ে গেছে। আগুন লেগেছিল সত্যিই। নন্দাকেব্যাপারটা বলিনি—কেননা একটা সন্দেহ আমার হয়েছে, আমিনা যদিপুড়েই মরে থাকে—ড্রেসিং-টেবিলটা অক্ষত রইল কী করে?

ছাত্রটি বলেছিল : টেবিলটা ছিল পাশের ছোটো ঘরটায়। হয়তোআমিনাও সে-ঘরে ছিল। কিন্তু সে গেল কোথায়?

নন্দার বিশ্বাস, কাগজে খবরটা বেরুলে আমিনা এসে নিয়ে যাবে তারড্রেসিং-টেবিলটা, তাই এই কাহিনী লেখা। আয়নাটা নন্দা কাপড় দিয়েমুড়ে রেখে দিয়েছে।



পরিশিষ্ট

কাহিনীর এখানেই শেষ। প্রসঙ্গত একটা ঘটনার উল্লেখ করে চাই পাঠক-পাঠিকার কাছে। হয়তো তার সঙ্গে এই কাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই—কিন্তু সাদৃশ্য রয়েছে। গত পয়লা এপ্রিল একটি বাংলা কাগজে খবরটিপ্রকাশিত হয়েছে :

'হাওড়া স্টেশনের নিকটে গতকাল এক ব্যক্তিকে সন্দেহজনকভাবেঘোরাফেরা করিতে দেখিয়া পুলিস গ্রেপ্তার করে। তাহার কাছে একটাব্যাগের মধ্যে কয়েকটি তুলি ও কিছু স্কেচ ছবি পাওয়া গিয়াছে। সন্দেহ হয়সে হাওড়া স্টেশন ও পুলের প্ল্যান আঁকিয়া নিতেছিল। নাম জিজ্ঞাসাকরিলে সে পাগলের ভাণ করে ও বলে : 'একজন মানুষ।'

খবরের হেডলাইনে লেখা—'পাকিস্তানের গুপ্তচর গ্রেপ্তার।'

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন