শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আফসানা বেগম'এর গল্প : ঠিকানা

হাসপাতালের অপেক্ষা করার জায়গাটাতে বসে মা ঘনঘন চোখ মুছছিলেন। আমার কেন যেন কান্না পাচ্ছিল না। আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম কী হতে যাচ্ছে; আমি বরং অন্য কিছু একটা নিয়ে খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলাম। নানার কাছে শেষ পর্যন্ত জানতে পারিনি কোন দেশটাকে তিনি নিজের দেশ মনে করেন। আসলে নানা কি শেষ পর্যন্তও সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন? জানতে চাইলেও কোনো লাভ হতো বলে মনে হয় না। বহুদিন তাকে এ নিয়ে ভাবতে দেখেছি, চিন্তিত মুখে ধীরে ধীরে বিরক্তি ফুটে উঠতে দেখেছি, তারপর দেখেছি কী করে তা অসহায় থেকে নিরুপায় হয়ে যায়। সেই মুখের সামনে আলোচনাটা সেখানেই থেমে গেছে। একটু পরে ডাক্তার যা বলবেন বলে আমি ধারণা করছিলাম, সত্যি যদি তা-ই হয়, তবে আমার সিদ্ধান্ত নিতে বেশ অসুবিধা হবে। কিন্তু দুশ্চিন্তার ভেতরে বসেও অনেক আগের নানান ঘটনা কেন যেন ছবির মতো চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল।

কি শীত কি গ্রীস্ম, এত বয়সেও নানা ভোরবেলা উঠে আমাদের বাড়ির নীচতলার লম্বা বারান্দায় হনহন করে হাঁটতেন। দেরি করে ঘুম থেকে উঠলে প্রতিদিন একই বকা শুনতে হতো আমাকে। হাঁটতে হাঁটতে নিশ্বাস ছোটো হয়ে যেত বলে তিনি থেমে থেমে বলতেন, ‘কী রে,... তোরা.. আজকালকার ছেলেপেলে,.. কলেজ না থাকলে বুঝি সারাদিনই ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতি!’ কোনো উত্তর না দিয়ে মুচকি হেসে নানার সামনে থেকে সরে যাওয়াই তখন নিরাপদ। কথায় কথা বাড়ত। নানা তার দীর্ঘ জীবনের ছোটোখাটো উদাহরণ টেনে কথা শুরু করতেন। হাঁফাতে থাকলেও তার কথা আর থামত না। শেষে আমার কলেজের দেরি হয়ে যেত। তখন নানাকে পাশ কাটানোই ভালো ভেবে অন্ধকার বারান্দা পেরিয়ে গোসলে চলে যেতাম। তবে বরাবর দিনের বেলায় আমাদের বারান্দা ওরকম অন্ধকার ছিল না। ঝকঝকে সূর্য আমাদের বারান্দায় ভোর হতে না হতেই আছড়ে পড়ত। বাসার ঠিক সামনে সরু বাঁশের একটা বাঁশঝাড় আর তাতে অসংখ্য চড়–ইয়ের আনাগোনা লেগে থাকত। নাস্তার আগ পর্যন্ত লম্বা বারান্দায় নানার পায়চারির শব্দ আর দিনভর চড়–ইদের পাখসাট আমাদের দৈনন্দিন অভ্যস্ততায় মিশে থাকত। তাদের শব্দগুলো আমাদের কানে স্পষ্ট জানান দিত কারণ বাড়ির আশেপাশে তার চেয়ে বড়ো কোনো শব্দ তখনো ছিল না। তারপর একদিন সব বদলে যেতে লাগল, আমাদের সেই বারান্দা আর খোলামেলা থাকল না। বলতে গেলে পুরো বাড়িটা নিয়ে আমরা একটা গর্তে ঢুকে গেলাম। চারদিক থেকে অন্ধকার ধেয়ে এল। মানুষ শুনলে ভাববে ভূমিকম্প হয়েছিল আর সবকিছু তুমুল উলোটপালট হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে তেমন কিছুই না। 

হয়েছিল কী, দেশে সামরিক সরকার এল, আমি তখন স্কুলে। সরকারের সিদ্ধান্ত হলো আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে একটা রাস্তা যাবে। নানা খুশি মনে পেপারের প্রথম পাতা মেলে আমাকে আর মাকে ডেকে বোঝাতে লাগলেন রাস্তাটা কোথা দিয়ে কোথায় যাবে। আঙুল দিয়ে পেপারে আঁকা ম্যাপের ওপরে দেখিয়ে বললেন, ‘ঢাকায় চলাচলের মূল সমস্যা কি জানিস?’ 

‘কী?’ 

‘মূল সমস্যা হলো ঢাকার উত্তর-দক্ষিণে কয়েকটা রাস্তা আছে কিন্তু পূর্ব-পশ্চিমে কোনো বড়ো রাস্তা নেই। তো আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যদি পান্থরোড নামে এই রাস্তাটা হয়ে যায় তবে দেখবি সমস্যাটা অনেকটা কমবে। আর চিন্তা কর আমাদেরকে আর মগবাজারের গলি দিয়ে এগোতে হবে না, বিশাল রাস্তা ঘরের সামনেই!’ 

নানাকে খুশি খুশি দেখাচ্ছিল। পেপারটা মুড়িয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সামনের বাঁশঝাড়ের দিকে তাকিয়ে সেদিকে বিস্তৃত রাস্তার কথা কল্পনা করে বুঝি প্রশান্তির নিশ্বাসও ফেলেছিলেন। নানার কল্পনা অনুসরণ করতে করতে আমিও সেখানে চড়–ইদের দ্রুত চলাফেরার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তাদের চালচলন আমার কাছে ভিডিওতে দেখা ফাস্ট ফরোয়ার্ডের মতো লাগত। স্বাভাবিক গতিতে ওই পাখিগুলো কিছু করতে পারে কি না এ নিয়ে আমি প্রায়ই ভাবতাম। সেদিনও ভাবছিলাম, আমদের জন্য যেটা সাধারণ গতি, মানে, সেকেন্ডে চব্বিশবার নড়াচড়া, পাখিদের জন্য হতে পারে তিরিশ কি বত্রিশটা। 

অল্পবয়সে বিধবা হওয়া আর বরাবর নানান অনিশ্চয়তায় ভোগা আমার মা তখন আমাদের দুজনের পাশে এসে দাঁড়ালেন; দেখলাম নানার কাছে জানতে চাইলেন, ‘রাস্তাটা হলে আমাদের বাড়ির দাম তো অনেক বেড়ে যাবে, তাই না, বাবা?’ 

সিলিন্ডারের মতো মোড়ানো পেপারটা দিয়ে বারান্দার গ্রিলে দুটো বাড়ি দিয়ে বিজয়ের ভঙ্গিতে নানা মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। 

বাবা ছিল না বলেই হয়ত ছোটোবেলা থেকে আমার কাছে নানা ছিল বাবার মতো। জ্ঞান হবার পর থেকে আমি মায়ের সাথে নানা বাড়িতেই। ছোটোবেলা পুরোনো ঢাকায় আর তারপর নানার সিদ্ধান্তে আমরা বড়ো মগবাজারের দিকে চলে এসেছিলাম। তখন আমাদের বাড়িটাই ছিল ওদিকটার শেষ প্রান্ত, তারপর থেকে লেকের শুরু। কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের সাদা দোতলাসহ চোখের সামনে আমরা কী করে যেন কিছু উঁচু বাড়ির মাঝখানে আটকা পড়ে গেলাম। চওড়া রাস্তার পরিবর্তে বাড়িগুলোর ফাঁকফোঁকড়ের সরু গলি দিয়ে আমাদের যাতায়াত করতে হতো। সেসব নিয়ে খনিক আক্ষেপ থাকলেও বাড়ির সামনে দিয়ে বড়ো রাস্তা যাবার কথায় নানাকে বেশ আনন্দিত মনে হচ্ছিল। তবে সে আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। একদিন বাড়িতে এক নোটিস এল আর নানাকে দেখলাম রাগে লাল হয়ে বারান্দায় বসে আছেন। ফরসা মুখটাই এত লাল নাকি আমাদের বারান্দার লাল মেঝের প্রতিফলন তার মুখে, বুঝতে পারিনি। স্কুল থেকে ফিরে নানার রাগ আর মায়ের উৎকণ্ঠিত চেহারা দেখে আমার মতো ক্লাস টেনে পড়া বালকের তেমন কিছু বোঝার উপায় ছিল না। কৌতূহল দমিয়ে রাখাও ছিল কঠিন। ভয়ে ভয়ে নানাকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম ঘটনা কী। মেজাজ খারাপ করে নানা যে কাগজটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন তা ছিল একটা উকিল নোটিস। ভয়ানক বেদনায় কুঁচকে থাকা তার মুখ থেকে কেবল একটাই কথা বেরিয়ে এল, ‘আমার ঠিকানা কি কোনোদিনই স্থায়ী হবে না?’ 

ওই একটামাত্র কথায় নানার মুখে হাজারবার শোনা তার সাতচল্লিশ, তার একাত্তরের কাহিনি আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল। ওই উকিল নোটিসে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, আমি জানতাম আঘাত তার কোথায় লেগেছে। 

‘শুধু এক ধর্মের ভিত্তিতে দেশটা টুকরো টুকরো হয়ে গেল, বুঝলি?’-- এভাবেই নানা গল্পটা শুরু করতেন। তার চোখে থাকত বিস্ময়। আমি গল্প শোনার আনন্দে থাকলেও সেই গল্পের ভয়াবহতাকে স্পর্শ করতে চাইতাম। প্রতিবার বলতেন প্রথম বলার মতো করে। আমিও ছিলাম এমন শ্রোতা যেন এই প্রথম শুনছি; চোখ গোল গোল করে তার কথার ফাঁকে ফাঁকে জানা উত্তর আবারো শোনার জন্য প্রশ্নও করতাম টুকটাক। 

‘খুব গরম সেদিন। শিয়ালদহ থেকে রিপন স্ট্রিটের মোড়ে এসে পেঁছেছি, সারা শরীরে ঘাম, তোর নানি বলল একটা ওষুধ লাগবে তার। তখনই লাগবে। কী আর করব, আবার বেরিয়ে পড়তে হলো। বেরোনোর আগে তিনি নানাভাবে আমাকে সাবধানও করতে লাগলেন। পাশের পাড়ায় রফিকদের বাড়ি আগের দিন সকালে হিন্দুরা ঘিরে ফেলেছিল তো, তাই। বাড়ির লোকজন তখন থেকেই উধাও। কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না তারা বেঁচে আছে কি মেরেই ফেলেছে। আমাদের পাড়াটা ছিল বলতে গেলে মুসলমান পাড়া। একটা মাত্র বিশাল হিন্দু বাড়ি ছিল। যৌথ পরিবার।’ 

‘তো, মুসলমানরা তাদের কিছু করত না?’ 

‘সে তো বিরাট ঘটনা। হামলা হবার খবর পেলে রাতে পাড়ার জোয়ান ছেলেরা দল বেঁধে চিৎকার করে সাবধান করত। একবার তারা যাচ্ছিল সেই বাড়ির পাশ দিয়ে। চেঁচামেচি শুনে বাড়ির লোকেরা ভাবল তাদের বাড়িতে মুসলমানেরা হামলা করেছে। মুসলমানদের হাতে মরার চেয়ে নিজেরাই আগুন জ্বালিয়ে একে একে আটত্রিশজন লোক তাতে ঝাঁপ দিল। বাড়ির বউগুলো তাদের বিয়ের গয়নাগাটি পরে ঝাঁপ দিয়েছিল, চিন্তা করতে পারিস?’ 

‘কেন ওভাবে মরতে গেল?’ 

‘কী করবে, নিজের বাড়ি ছেড়ে কেউ যাবেও না আবার শত্রুর হাতে মরবেও না।’ 

‘এত কিছুর পরেও তুমি ভয় পেতে না?’ 

‘কী করব, বাড়িঘর ফেলে কোথায় যাব? ঠিকানা যে কী জিনিস তা তুই বড়ো হলে বুঝবি। যাই হোক, ওষুধ না আনলে তোর নানি বাতের ব্যথায় তখন এমনিতেই মারা যাবে। আর তাছাড়া আমিও তো রাস্তাঘাটের সেসব গ-গোল নিয়ে তেমন ভাবতাম না, ভাবতাম কী আর এমন হবে, কদিনের মধ্যেই সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। ভাবতাম শত টুকরো হলেও আমার দেশ আমারই আছে, থাকবে। তোর নানিকে টেবিলে খাবার দিতে বলে ঘামে ভেজা ফতুয়াটা বদলে আমি আবার বেরিয়ে গেলাম। বাসার কাছে ছোটো বাজারমতো জায়গাটাতে যেতেই এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয় সিরাজুলের সাথে দেখা। তাদের ওদিককার অবস্থা কেমন, এত মৃত্যুর খবর আর ভালো লাগছে না, এসব নানান কথা বলতে বলতে ফুটপাথ ধরে এগোচ্ছিলাম দু’জনে। হঠাৎ মনে হলো ঠিক পেছনে কেউ নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল। তখনো হাঁটা কিন্তু থামাইনি আমরা। শুধু মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতে যাব, তার আগেই দেখি সিরাজুলের মাথাটা গলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে টুপ করে পড়ল। পড়ে কাত হয়ে থেমে গেল। রক্ত ছড়িয়ে পড়ল শুকনো ধুলোয়। ফোঁটা ফোঁটা রক্তগুলো ধুলা মোড়ানো পোটলার মতো হয়ে থাকল। শুঁষে নিল যেখানে দলা রক্ত। হাঁটার গতিতে আমি যেমন পরের পা ফেলেছিলাম, মাথাবিহীন সিরাজুলের শরীরও কিন্তু আরেকটা পা ফেলেছিল। এমনকি জানিস, তার পরের পা-টাও ফেলতে চাচ্ছিল, পাশে তাকিয়ে আমি দেখেছি, বিশ্বাস কর! মাথা থেকে শরীরে তো নির্দেশ দেয়াই ছিল, মাথা না থাকলেও তাই প্রায় দেড় পা এগিয়েছিল শরীরটা। কিন্তু তারপর কেমন যেন চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো মোচড় খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে যেই পেছনে তাকালাম, দেখি তলোয়ারের দ্বিতীয় কোপটা আমার গলার দিকে ধেয়ে আসছে। আমি প্রাণপণ দৌড় লাগালাম। জানতাম যে একই পরিণতি আমারও হতে যাচ্ছে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। অথচ দৌড়োতে দৌড়োতে হঠাৎ মনে হলো পেছনে কেউ নেই। ফিরে তাকিয়ে দেখি ধুতি আর পাগড়ি পরা লোকটা তলোয়ার উঁচিয়ে তার সঙ্গীদের সঙ্গে রাস্তার উলটো দিকে আরেকজনকে ধাওয়া করতে লেগে গেছে। রাস্তা পেরিয়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে তারা। এদিকে আমি তখন একা। হতভম্বের মতো এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম সেখানে। তারপর খানিক দূরে সিরাজুলের শরীর আর মাথার মধ্যে চার-পাঁচ ফুট রক্তের ¯্রােতের দিকে চোখ পড়তেই ঘোর কেটে গেল। দৌড় লাগালাম। পরে আর পেছনে তাকাইনি। তাকাইনি মানে, নিজের দেশের দিকেও ফিরে তাকাইনি। বাড়ি ফিরে মাত্র তিন ঘণ্টার গোছগাছে তোর নানিসহ সবাইকে নিয়ে ঢাকায়।’ 

‘ঢাকায় কিছু ছিল তখন তোমাদের?’ 

‘না তো! ওটাই আমাদের প্রথম ঢাকায় আসা। পুরোনো ঢাকার র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটে এসে থাকা শুরু করলাম।’ 

‘তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে সঙ্গে করে কিছু নিয়ে আসতে পারলে?’ 

‘কী আর আনা যায় ওইটুকু সময়ের মধ্যে? তোর নানির ছিল এক বাকসো গয়না, সে তো সেই বাকসো কিছুতেই ছাড়বে না। বুকের কাছে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। আমি অনেক মানা করলাম। শুনল না। নিজেদের শরীরটা বাঁচানোই তখন দায়। তার উপরে ওই ভারী বাকসো। রাস্তাও কি সহজ? প্রথমে ট্রেন তারপর নৌকা, তারপর আবার ট্রেন, কিছু পথ হাঁটা, এভাবে কি সঙ্গে মালপত্র নিয়ে চলা যায়? ব্যস, ওই করতে করতে গয়নার বাকসো গেল হারিয়ে।’ 

‘হারিয়েই গেল!’ 

‘হারিয়ে গেল মানে কোথায় ছাড়া পড়ে গেল কে জানে। সেই শোকে তোর নানি তখন উম্মাদ প্রায়।’ 

‘কিন্তু সে যাই হোক, ঢাকায় এসে শান্তি তো পেলে।’ 

‘নিজেদের বাড়ি, মানে, ঠিকানা হলো একটা। কিন্তু শান্তি? সেটা বলতে পারব না। কত আত্মীয়স্বজন ওপারে রয়ে গেল! তা ছাড়া, ওই ঢাকার ঠিকানাটা কি স্থায়ী হয়েছিল আদৌ?’ 

‘হয়নি মানে?’ 

‘সেই ঠিকানা ফেলে একাত্তরে আবার পালিয়ে যেতে হলো যে!’ 

‘হুম। আবার যেতে হলো, না?” 

‘যুদ্ধ লাগার মাস চারেক পরের কথা। বাড়ির মেঝেতে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম আমরা। দরজা-জানালা বন্ধই রাখতাম বরাবর। জুলাইয়ের দিকে গরম পড়ল খুব। ঘরের ভিতরে গুমোট। শেষে একটা জানালা সামান্য খুলে রাখলাম। আর হলো কী, খোলা জানালা পেয়ে হঠাৎ রাস্তা থেকে একটা গুলি এসে ঘরে ঢুকল। পিছন থেকে এসে ঠিক আমার কানের পাশ দিয়ে চলে গেল। দেখলাম সামনের ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল। ভাতের থালা ফেলে সবাই খাটের নীচে আশ্রয় নিলাম। প্রতিদিনই গুলির শব্দ শুনলে আমরা খাটের নীচে ঢুকে যেতাম। কিন্তু খাটের নীচে তো আর আমরা মাসের পর মাস থাকতে পারি না, তাই না? বাইরে বেরোলেই রাস্তায় লাশ পড়ে আছে, এমন অবস্থা তখন। সব দেখেশুনে আবার সবাইকে নিয়ে পালিয়ে গেলাম কোলকাতায়।’ 

‘পরে আবার তো সেই ফিরেই এলে।’ 

‘কী করব, ঢাকায় চাকরি করি আর কোলকাতায় কি তখন আর কিছু নিজেদের ছিল? বাড়িঘর সব হাতছাড়া হয়ে গেছে। ঠিকানা একবার ছেড়ে দিলে আর তা নিজের থাকে না। হৃত সা¤্রাজ্য কখনো ফেরত পাওয়া যায় না।’ 

ঠিকানা হারানোর দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে দিয়ে প্রতিবার নানার গল্প শেষ হতো। 

চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পরে র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিট থেকে বড়ো মগবাজারের দিকটায় চলে এসেছিলেন নানা। ওদিকের গ্যাঞ্জাম এড়িয়ে একটু খোলামেলা থাকবেন বলে। তখন এদিকটা ছিল বলতে গেলে খাল-বিল। অবারিত পানির ওপর দিয়ে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসে বসে নানা কি ভাবতেন যে এটাই তার স্থায়ী ঠিকানা? কোনোদিন ভেবেছিলেন কি এটাই তার দেশ, আমার ঠিক জানা নেই। তিনি কোলকাতাকেই বুকে ধারণ করতেন, বাস্তবে থাকতেন ঢাকায়। মুখে বলতেন, ‘কোনোদিন ছেড়ে যেতে হলে বুঝবি, দেশ কোনো জায়গা নয়, দেশ হলো একরকমের ধারণা। তুই যেখানে যাবি, দেশ তোর সঙ্গে যাবে।’ 

সেদিন নানার হাত থেকে উকিল নোটিসটা হাতে নিয়ে দেখি কতকগুলো সংখ্যার নীচে লাল দাগ দেয়া। ওসব দাগাদাগি থেকে আমি কিছুই উদ্ধার করতে পারিনি। পরে খেতে বসে নানা জানালেন, পান্থরোড নামে রাস্তাটা আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে নয়, যাবে আমাদের বাড়ির ঠিক উপর দিয়ে। মানে, কথা হলো আমাদেরকে খুব দ্রুত সরে যেতে হবে। কয়েক মাসেই। শুনে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, ‘আবার?’ 

‘আমি যাব না।’ 

নানার দৃঢ় কণ্ঠস্বর খাবার ঘর পেরিয়ে লম্বা বারান্দায় গমগম করতে লাগল। সেদিন বিকেল গড়িয়ে এলে বাঁশঝাঁড়ে ফিরে আসা চড়–ইগুলোর গালগল্পেও আমি নানার সেই কথারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম। বাঁশঝাঁড় বলছে সে যাবে না, চড়–ইরা বলছে তারা যাবে না। শুনতে শুনতে বারান্দার গ্রিল ধরে আমি নিজেও চিৎকার করে উঠেছিলাম, ‘আমি যাব না।’ আমার চিৎকার শুনে মা ভেতর থেকে ছুটে এসেছিলেন, ‘তুইও তোর নানার মতো পাগল হলি রে, খোকা?’ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি আর মা জড়াজড়ি করে কাঁদছিলাম। আমি জানি মা-ও তখন মনে মনে বলছিলেন, ‘আমি যাব না।’ 

উকিল নোটিসের তারিখটা ছিল ছয়-সাত মাস পরের। আমাদের চোখের সামনে আশেপাশের উঁচু বাড়িগুলো ছেড়ে মানুষজন চলে গেল। ভেঙে বিক্রি করে অন্তত কিছু পয়সা পাবে এই আশায় একে একে বাড়িগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে দিল। শুধু আমরাই রয়ে গেলাম। নানা বলেছিলেন ক্ষতিপুরণ বলে আসলে কিছু নেই। ট্যাক্স ফাঁকি দেবার জন্য রেজিস্ট্রি অফিসে জমির যে নামমাত্র দাম ধরে রাখা হয়েছে, সেই দামটাই কোনোরকম ধরিয়ে দেয়া হবে। তার চেয়ে বড়ো কথা, তিনি তার নিজের জায়গা ফেলে এক চুলও নড়বেন না। তিনি সরকারি অফিসের সঙ্গে লড়াই শুরু করলেন। বাসা আর সড়ক উন্নয়নের অফিস, এই যাতায়াতে তার শরীর ভেঙে পড়ল। তার লড়াইটা জেদের দিকে চলে গেল। আশেপাশের সব বাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে সোনার গাঁ হোটেলের পাশ দিয়ে নতুন রাস্তার জন্য মাটি ফেলে উঁচু করা হলো। প্রতি রাতে ট্রাকের সারি গর্জন করে সেখানে মাটি ফেলে যেতে লাগল। প্রতিদিন সকাল হলেই সেই উঁচু ঢিবি আমাদের বাড়ির দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। সড়ক ও পরিবহন সংস্থার লোকজন প্রায়ই আমাদের বাড়িতে হানা দিতে লাগল। নানা কখনো তাদের বকাবকি করতেন, কখনো বাড়িতেই ঢুকতে দিতেন না। সেই দৈনন্দিন অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে আমি আর মা নানাকে অনুরোধ করতে লাগলাম, ‘সবাই তো গেল, চলেন, এবারে চলেই যাই আমরা।’ নানা কারো কোনো কথায় কান দিতেন না। 

উঁচু ঢিবিগুলোর ওপরে ইট-পাথর পড়ল, রাস্তা তৈরির সরঞ্জামে আমাদের বাড়ির চারপাশ সয়লাব হয়ে গেল। পান্থরোড এগিয়ে যেখানে টঙ্গি ডাইভার্সন রোডে এসে উঠল, এক সময় আমাদের বাড়িটা পড়ে গেল সেই মিলনের জায়গায়। বাড়ির তিন দিক দিয়ে তিনটা রাস্তা চলে গেল। বাঁশঝাঁড় কাটা পড়েছে অনেক আগেই। ঘরভাঙা চড়–ইয়েরা শব্দ আর ধূলার উৎপাতে কোথায় পালিয়েছে কে জানে। শুধু আমরাই সেখানে পড়ে থাকলাম। আমাদের কোনো প্রতিবেশি নেই। আমরা লোকালয়বিহীন কোনো ধূসরিত জগতে তিন দিকে রাস্তা চলে যাওয়া একটা ত্রিভুজের মধ্যে বাড়িসহ আটকা পড়লাম। রাস্তাগুলো অনেক উঁচু। ত্রিভুজাকৃতি জমির উপরে আমাদের বাড়ির নীচতলাটা তাই তখন গুহার মতো। দোতলার জানালার ওপরের দিক দিয়ে খানিক আলো আসে। সেই জানালার কাচে চোখ রাখলে চার ফুট দূরে একই উচ্চতায় নেভি-ব্লু পিচের রাস্তা। নানার বানানো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে রাস্তা থেকে আমাদের বাড়িতে নামতে হতো। প্রায় অন্ধকার বারান্দায় বসলে চওড়া রাস্তার ওপরে দ্রুতগামী বাস-ট্রাকের ওড়ানো ধুলোয় এক মিনিটেই নিজেকে মাটির মূর্তির মতো লাগত। দরজা জানালা চব্বিশ ঘণ্টা সাধ্যমতো লাগিয়ে রেখেও রাস্তার ধুলোর হাত থেকে কিছুতেই বাঁচা গেল না। মা ঘরবাড়ি পরিস্কার করতে করতে ক্লান্ত-বিরক্ত হয়ে গেলেন। নানাকে বলতে লাগলেন, ‘এখন না-হয় চলছে, কিন্তু বর্ষাকাল এলে আমাদের কী হবে, বাবা? আমাদের বাড়িটা তো বৃষ্টির পানি জমে পুকুর হয়ে যাবে! আমরা পাতালপুরিতে চলে যাব, বাবা।’ নানা মায়ের কথা না শোনার ভান করে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকলেন। শেষে মা আমাকে বললেন নানাকে বোঝাতে। আমি তখন কলেজ ছেড়ে সবে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকেছি। নিজেকে আকস্মিক বিরাট পরিসরে আবিষ্কার করে খানিকটা অহঙ্কার জন্মাতে শুরু করেছে। নানার জেদের কারণে শেষ পর্যন্ত একদিন পুলিশ এসে আমাদের বাড়ির জিনিসপত্র বাইরে ছুঁড়ে ফেলবে, সেটা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না। তাই ঠিক করলাম, যা করার আমাকেই করতে হবে। 

একেবারে শেষে গিয়ে আমি কলাবাগানে এক সরু গলিতে বাড়ি ভাড়া করলাম। পরে সত্যিই ক্ষতিপুরণ বলতে আমাদের তেমন কিছু দেয়া হলো না। উলটো সময়মতো বাড়ি না ছাড়ার জন্য কিছু ফাইন ধরা হলো। শেষ পর্যন্ত নানার স্থায়ী ঠিকানা ছেড়ে চলে গেলাম আমরা। কলাবাগানের ঘিঞ্জির মধ্যে তিন তলার ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টের এক চিলতে বারান্দায় বিরক্ত মুখে বসে থাকতেন নানা। নীরব থাকতে থাকতে কখনো অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলে উঠতেন, ‘এই দেশে এসে শেষ পর্যন্ত আমাকে কিনা ভাড়া বাড়িতে থাকতে হলো!’ মা অবশ্য তখন ঠোঁট উলটে বলতেন, ‘এমনই তো হবে, বাবা। স্বাধীনতার পরপর মাত্র এক হাজার টাকা দিলে ধানমন্ডিতে প্লট পাওয়া যেত, তখন তো তুমি রাজি হলে না। শেষে তোমার সাধের র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিট ছাড়তেই হলো, আর দেখ, ধাক্কা খেতে খেতে মাঝখান থেকে আজ আমাদের এই দশা-- 

নানা একসময় নিশ্চয় পুরোনো ঢাকাকে নিজের বাড়ি ভাবতে শুরু করেছিলেন। তবে তার যাবতীয় আক্ষেপে আমি দেখতাম কী করে জীবনের দ্বিতীয় চল্লিশ বছর প্রথম চল্লিশ বছরের কাছে হেরে যায়। এখানকার কিছুই তার আগের মতো আপন লাগত না। সব কথার শেষে একটাই কথা, ‘আগের মতো কিছু আর হয় না, বুঝলি?’ 

‘কেন হবে না, নানা, কী খারাপ আছি আমরা?’ 

‘কী খারাপ আছি মানে! আমরা কত ভালো ছিলাম তা তুই জানিস? একটার পর একটা জায়গা বদল; এভাবে চলতে থাকলে মানুষের কোনো আইডেন্টিটি থাকে? পরিচয়, পরিচয়ের কথা বলছি, থাকে?’ 

‘থাকবে না কেন, পুরো দেশটাই তো আমাদের! তুমি আসলে এ দেশে এসেছ ঠিকই কিন্তু এদেশটাকে কখনোই নিজের বলে ভাবতে পারনি, সেটাই তোমার সমস্যা।’ 

নানা কিছুক্ষণ চুপ। নৈঃশব্দ্যে আমি অনুশোচনায় ভুগতে লাগলাম। তর্কের খাতিরে তর্ক করতে গিয়ে নানাকে আঘাত করে ফেলেছি, সেটা জানতাম। সামনের বইপত্র গুটিয়ে আমি নানার পাশে গিয়ে বসলাম তখন। 

‘স্যরি, নানা, আমি মুখ ফসকে—” 

‘নাহ্, ঠিকই বলেছিস তুই। এদেশের আলোবাতাসে এতগুলো বছর কাটল, তারপরেও দেশবোধ জন্মানো হয়ত কঠিন। তবে কী জানিস, একেকটা জায়গা থেকে এই যে বারবার উঠে যেতে হচ্ছে, এরপরও তুই আমার কাছে সেই বোধটা আশা করবি কী করে?’ 

নানার মুখ বিষণ্ণ। চেখে অসহায়ত্ব ছাড়া আর কিছু খেলে না। আগের মতো সেই জোরালো কণ্ঠে অভিযোগ জানানোর নেশাটা ঠিকানা বদলাতে বদলাতে পথে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছেন; নানীর গয়নার বাকসের মতো। আজীবনের জমানো সবচেয়ে জরুরি সম্পদ যেন খোয়া গেছে। নানার চোখে আঁকা থাকত শুধু হেরে যাওয়ার ছবি আর হারিয়ে যাওয়ার। সরু চোখ সামান্য পানিতেই উপচে পড়তে চাইত। আমার আর সেদিকে তাকাতে ভালো লাগল না। মেঝের দিকে তাকিয়ে আমি চুপ করে থাকলাম। কে জানে আবার মুখ ফসকে কী বলে ফেলি! নানা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে আবার শুরু করলেন। 

‘আমার মনে হয় আমি সেই সময়টাতেই আটকে আছি।’ 

‘কোন সময়?’ 

‘ওই যে, শত শত মানুষ বর্ডার পেরিয়ে চলে আসছে, তাদের মধ্যে আমিও একজন। কাঁটাতারের বেড়া নেই কিন্তু আমরা জানতাম সীমানা কোথায় শেষ, জানতাম আরেকটা সীমানা কোথায় শুরু। আমার কেবলই মনে হয় যুগযুগ ধরে আমি সেই জায়গাটায় আটকে আছি। চলছি আর চলছি কিন্তু একটা সীমানা শেষ হবার পরে আরেকটা সীমানায় কিছুতেই পৌঁছতে পারছি না --’ 

তাকিয়ে দেখলাম নানার চোখে টলটল করছে পানি। নানা কেঁদে ফেলবেন নাকি! সেরকম হলে আমি বিব্রত হব ভেবে আমার অস্বস্তি লাগল। নানা চোখের পানি শুঁষিয়ে নিয়ে বললেন, ‘ঠিক জানি না আমি মালিকানাবিহীন সে জায়গাটা পেরিয়ে কোনোদিন নিজের দেশের সীমানায় পৌঁছতে পারব কি না।’ 

নানার কথাগুলো আমার কাছে অদ্ভুত লাগছিল। বয়সের ভারে মাখা খারাপ হয়ে গেল নাকি! চটিয়ে লাভ নেই ভেবে চুপ করে থাকলাম। তিনি আরো অদ্ভুত কথা বলতে লাগলেন। বললেন, ‘আচ্ছা, বল তো, মানুষ যেখানে জন্মায়, বেড়ে ওঠে, সেটা তার দেশ হওয়া উচিত নাকি যেখানে তাকে বাধ্য হয়ে থেকে যেতে হয়, সেটা? একসময় সে সেখানে মৃত্যুবরণ করে, যে দেশের মাটিতে তার শরীরের শেষ কণা মিশে যায় সেটাই কি তার দেশ?’ 

আমি বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে থাকলাম। মুচকি হেসে নানা হুট করে জানতে চাইলেন, ‘আমি মরে গেলে আমাকে কোথায় কবর দিবি?’ 

‘কী আশ্চর্য, তুমি মরতে যাবে কেন!’ জেদি গলায় বললাম আমি। 

নানা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কবর কোথায় দেয়া হবে সে প্রসঙ্গে কথা আর আগায়নি। 

কলাবাগানের বাড়িতে আসার পর থেকে নানা কখনোই ভালো ছিলেন না। সেখানেই তার প্রথম স্ট্রোক হলো। হাসপাতালে কদিন থেকে বাড়ি ফিরলেন। রাতে ঘুমানোর আগে প্রায়ই বলতেন, ‘আচ্ছা, আর কতদিন ঢাকার এই ফুফুর বাড়িতে থাকব, নিজের বাড়ি যাব না আমরা?’ মা তখন নানার ওরকম অদ্ভুত কথার কী জবাব দেবেন ভেবে পেতেন না। খানিক চুপ থেকে মশারি ঠিকঠাক করে নিজের ঘরে চলে যেতেন। কোনো রাতে নানা অস্থির হয়ে উঠতেন, ‘বলো না, দেরি যে হয়ে গেল, এবারে আমাদের নিজের বাড়িতে ফেরা উচিত না?’ প্রশ্নের অত্যাচারে মা কোনোদিন বাধ্য হয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে জবাব দিতেন, ‘এই তো, বাবা, কাল-পরশু চলে যাব না-হয়।’ নানা খুশিমনে ঘুমিয়ে পড়তেন। 

হাসপাতালের চেয়ার মোটেও আরামের নয়। আমি উশখুশ করছিলাম। চেয়ারগুলো হয়ত এতক্ষণ বসে থাকার কথা ভেবে বানানো হয়নি। মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম চোখের পাতা ওঠানামা ছাড়া তার আর কোনো নড়াচড়া নেই। আই সি ইউ ইউনিটের বিশাল দরজাটা শেষ পর্যন্ত খুলে গেল। ডিউটি ডাক্তার আমার দিকে এগিয়ে এলেন। ‘সেকেন্ড স্ট্রোকে অনেকেই সারভাইভ করতে পারে না। ক্লিনিক্যালি ডেড বলা যায়। আপনারা বললে লাইফ সাপোর্ট খুলে দেব’, বলে ডাক্তার আর দাঁড়ালেন না। যেন কত সাধারণ আর অবধারিত একটা ব্যাপার, বীজগণিতের সূত্রের মতো! মনে হলো, খেয়েছি তাই খিদে লাগেনি, ঘুমিয়েছি তাই দেখিনি জাতীয় কিছু স্বাভাবিক কথা দ্রুতলয়ে বলে ডাক্তার চলে গেলেন। 

আমি মায়ের দিকে তাকাতে ভুলে গেলাম। তখন কত ভাবনা যে ঠেলেঠুলে আমার মাথায় জায়গা করে নিচ্ছিল! নানার শরীর কি এই দেশেই থাকবে? তিনি কি তাতে খুশি হবেন? আমার আসলেই জানা নেই। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় ব্যথায় নানা সিঁড়ি ভাঙতে পারছিলেন না। টানা সিঁড়ির প্রত্যেক বিরতিতে খানিকটা বসে নেবার জন্য কে যেন একটা মোড়া এগিয়ে দিয়েছিল তখন। কয়েক সিঁড়ি নেমে একবার বসে থাকলেন, আবার কয়েকটা সিঁড়ি নামলেন, এভাবে রাস্তায় নেমেছেন। কথা বলার মতো অবস্থা না থাকলেও তিনি তখন কোনোরকমে বলেছিলেন, ‘মোড়াটা এখানেই রেখো, হসপিটাল থেকে ফিরে এসে ওপরে ওঠার সময়ে লাগবে।’ মোড়াটা কি এখনো সিঁড়ির পাশেই পড়ে আছে? ফিরে গিয়ে কি আমি ওটা ওখানেই দেখতে পাব? দেখলে কি আমার মনে হবে না যে নানা মারা গেলেও তার ঠিকানা খোঁজার চেষ্টা মরেনি? নানাকে কোথায় কবর দেয়া হবে তা তার কাছে জেনে রাখিনি-- এই দুশ্চিন্তা ছাপিয়ে কেন সিঁড়ির মাথায় পড়ে থাকা, জায়গায় জায়গায় দড়ি ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা তুচ্ছ বেতের মোড়াটা নিয়ে তখন ভাবতে শুরু করলাম, আমার জানা নেই।

1 টি মন্তব্য: