শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

ইমতিয়ার শামীম'এর গল্প : ৩০১৮

হতে পারে সেদিন এমনই শুক্রবার, এমনই প্রার্থনার। বা হয়ত রবিবার, এমনই ছুটির, এমনই প্রায় নির্ভাবনার। কিংবা কে জানে, বৃহস্পতি তুঙ্গে ওঠা এমনই এক বৃহস্পতিবার সেই দিন। অথবা মঙ্গলবার, অমঙ্গলতাড়ুয়া টিপ এঁকে দিচ্ছে কেউ শিশুর কপালে বড় করে। আবার শনিবারও হতে পারে সেই দিন, ভয়ে আর বিবর্ণতায় টলোমলো প্রখর রৌদ্রময়... এ ভাবে যে কোনো দিনই হতে পারে সেই দিন। হতে পারে যে কোনও রাত। হতে পারে তখন এক দেশে ছিল যে এক রাজা, তার ছিল এক রাণী; না কি রাজা রাণী কেউ-ই নেই, তাদের একটি মাত্র ছেলে না কি মেয়ে অথবা একজোড়া ছেলেমেয়ে জীবনের ভয়ে আর মনের দুঃখে ত্রস্ত পায়ে ঘুরে ফেরে এ জগতময়, ঘুরে বেড়ায় বনের গহীন।

তবে বার যাই হোক, দিন-রাতই বা হোক যেমন, কিংবা যেমনই হোক রাজ্য আর রাজা-রাণী, রাজকুমার-রাজকুমারী, নিশ্চিত করেই বলা যায়, সময়টা তখন ঠিক দুপুরবেলাই হবে। তা দুপুরবেলা বলেই কি আর ভূতে মারে ঢেলা! তবু সেই দিন তেমনই ঘটে। ইতিহাসের অতল খুঁড়ে দেখিয়ে দিতে হবে, জানিয়ে দিতে হবে, শুনিয়ে দিতে হবে আড়েঠাড়ে কথা বলা সব দুষ্ট লোকগুলোকে, বুঝিয়ে দিতে হবে মাঝেমধ্যেই কলের গান বাজানো ভিন দেশি সব মাইকওয়ালাগুলোকে-- অপরূপবন এখনও আগের মতোই সেই কী অপরূপ সুন্দরই আছে। স্বপ্নপূরণের সহস্র বর্ষ উদ্যাপন হতে চলেছে-- এখনই তো তারস্বরে জানিয়ে দেওয়ার সময়, এখনও অপরূপবনে সুন্দরী গাছ জন্মায়, জন্মায় কেওড়া-গড়ান। গোলপাতার ছাউনিতে নদীর কুলে এখনও নির্ভাবনায় ঘুমায় বাঘ ও কুমীর। সাংবাদিক আলী আজিজুর তাই সেদিন বেরিয়ে পড়েন তার ভারী শরীর নিয়ে অপরূপবনের পথে। যেতে যেতে গাড়ির মধ্যে থেকে বাইরের দিকে তাকান। বাইরে ভয়ঙ্কর গরম। তিনি সেই গরমের ভয়াবহতাকে অনুভব করেন আর আহ্লাদিত হন এই ভেবে যে, এর জন্যে আদৌ সমস্যা হবে না-- রাজ্যের কর্ণধার আর সেবক অন্য সবার মতো তারও রয়েছে একটি গরমনিরোধী ভেস্ট। রাজরাণী নিজের হাতে তাকে এই ভেস্ট পরিয়ে দিয়েছিলেন সেবার বন্ধুরাজ্যে সফরে যাওয়ার সময়। তবে এ তো ঠিক, রাজধানী থেকে সেই অপরুপবনের দিকে যাওয়ার এই পথ তো আর রাজরাণীর আশীর্বাদধন্য সেই সঙ্গীতভবন নয়, যেখানে বসে আরাম করে বাইরের দিকে তাকিয়ে রাজ্যের শিল্পসেবকরা গভীর মন্দ্রিত স্বরে গেয়ে ওঠেন ‘দারুণ অগ্নিবাণে রে, হৃদয় তৃষায় কাঁপে রে’...। 

অবশ্য সেই সঙ্গীতভবনেও ইদানিং নাকি আর কেউ যায় না। সেখানেও নাকি কেবলই গরম লুটোপুটি খায়। রাজরাণীর এক ছ্যাঁচড়া বরকন্দাজ না কি বছর পাঁচেক হয় সেই ভবনের গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের খাজনাই দেয় না। এমন এক ঘটনা থেকেই রাজরাণীর মাথায় বুদ্ধি আসে ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ কার্ড বাজারে ছাড়ার। হাজার বছর আগেও এরকম কার্ড ছিল, তবে তার নাম ছিল তখন ‘প্রি-পেইড কার্ড’; কিন্তু রাজরাণী চলেন ঐতিহ্যের পাশাপাশি, তাই রাজকবি তার নাম রেখেছেন ‘ফেলো কড়ি, মাখো তেল’। আর এই নাম রেখেই তো সেই রাজকবির কপাল খুলে গেল। রাজরাণী নির্দেশ দিলেন, এই নামে যতগুলো অক্ষর রয়েছে, রাজকবিকে তত কোটি মোহর দিতে হবে। তা অক্ষর নিয়েও তখন শুরু হলো মহাবিতর্ক-- ভাও বুঝে রাজকবি নতুন এক ব্যাকরণতত্ত্ব দিলেন। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্যাকরণকে হতে হবে সহজ সরল, ব্যাকরণকে হতে হবে মাটির কাছের, ব্যাকরণকে হতে হবে মানুষেরই হৃদয়-মন আর মুখ দিয়ে বানানো নিয়ম। তো সেই নিয়ম মতে, এ-কার ও-কার এসব আর অক্ষর থেকে আলাদা রাখা যাবে না। কেন ওরা আলাদা হবে? কেন হবে? অপরূপ বাঘের মতো গড়গড়িয়ে উঠেছিলেন রাজকবি সেইদিন-- ওরা কি অক্ষরের মতোই ধ্বনি তৈরি করে না? ওরা কি বোধসৃষ্টির জন্য অপরিহার্য নয়? এ সব কার, ফলা আর যতি চিহ্ন যে সব কঠিন দায়িত্ব পালন করে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ভাষায় তো সেগুলো অক্ষরের চিহ্নের মর্যাদা পেয়েছে। তা হলে কেন তাদের বাংলা ভাষায় অচ্ছুৎ করে রাখা হবে? এইভাবে রাজকবির নতুন ব্যাকরণতত্ত্বের গুণে তার নামকরণের জন্যে সম্মানী এলো আট কোটি টাকার জায়গায় একেবারে কড়কড়ে ১৭ কোটি টাকা। রাজ্যের সভাসদরা এই নিয়ে একটু মৃদু আপত্তি তোলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর কেউ এ নিয়ে মুখ খোলেনি। রাজরাণী বলেছেন, রাজ্যসভার প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান। এইসব ছোটখাটো প্রসঙ্গ তুলে তারা তাই সময় নষ্ট করেনি। 

মাঝেমধ্যে আলী আজিজুরের মনে হয়, বয়স নেহাৎ কম হয় নি, এবার এইসব পুরানো দিনের দু’চারটে কীর্তি-কুকীর্তি সব লিখে রাখা দরকার। কখন মৃত্যু আসে, তা কি বলা যায়! এই যে কার্ডের ব্যাপারটা মনে হলো, হঠাৎ সুরুৎ করে তিনি মারা গেলে এ ঘটনা কে আর লিখবে? কে আর জানে এইসব যে, রাজরাণী খুব কঠোরতার সঙ্গেই ‘ফেলো কড়ি, মাখো তেল’ প্রচলনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আর তা শুধু ওই গ্যাস, পানি কিংবা বিদ্যুতের বেলায় নয়-- সব কিছুর বেলায়। সঙ্গীত ভবনের সেই ছ্যাঁচড়া বরকন্দাজ মহাপরিচালকটার ব্যাপারে অবশ্য রাজরাণী কিছুই করেননি। কেন যে করেননি, আলী আজিজুরের তা মাথাতেই ঢোকে না। 

তবে সেই ছ্যাঁচড়া বরকন্দাজও কম যায় না। ‘ফেলো কড়ি, মাখো তেল’ কার্ড কিনতে গিয়ে নগদের ধার ধারে না সে। ‘প্রতিষ্ঠানের জন্যে কেনা হচ্ছে, বছর শেষে বিল করবে’-- এই তার নীতি। অতএব সেই বিলও আটকে আছে ফাইলে নাকি ইনবক্সে। এইভাবে ধুকে ধুকে কেটেছে আরও বছর তিনেক। কিন্তু এখন সাময়িক বিপর্যয় চলছে, ‘ফেলো কড়ি, মাখো তেল’ কার্ড দিয়ে চেষ্টা করলেও গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ আর মেলে না। তাই শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত সঙ্গীত ভবনের কক্ষে বসে ‘দারুণ অগ্নিবাণে রে’ গাওয়ার মতো কাউকেও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। যদিও সবাই আশাবাদী, এই সাময়িক বিপর্যয় খুব দ্রুতই কাটিয়ে ওঠা যাবে। তখন আবারও তারা সঙ্গীত ভবনে বসে রাজ্যের ঐতিহ্যাশ্রয়ী সব রাগ-রাগিনী আর গান গাইবেন। 

তা চুলোয় যাক সঙ্গীত ভবন। গান গাইলেই কি আর বৃষ্টি নামে না কি! গরম কেটে যায় না কি! তাই যদি হতো, নিশ্চয়ই এই গরম অনেক আগেই দূর হয়ে যেতো। শুষ্ক মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে কত হাজার হাজার কৃষক কত প্রার্থনা করল। কিন্তু কিছুই তো হলো না। রাজরাণী এখন চিন্তা করছেন প্রতিবেশি রাজ্যের সঙ্গে ‘বৃষ্টি বর্ষণ চুক্তি’ করার। এ চুক্তি করা হলে নিশ্চয়ই দেশের বৃষ্টি সমস্যা দূর হয়ে যাবে। খরচ অবশ্য একটু বেশি হবে। কিন্তু তাতে সমস্যা কী! রাজ্যের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, উন্নতি হয়েছে, এরকম খরচ করাই যেতে পারে। চুক্তি হওয়ার সময় নিশ্চয়ই আলী আজিজুরও রাজরাণীর সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে যাবেন। এমনভাবে ভ্রমণ করা তার রক্তে গেঁথে গেছে। তাই অনায়াসেই তিনি রক্ত হতে পেরেছেন সুদূর রাজধানী থেকে এই অপরূপ বনের দিকে। অথচ মানুষ এখন ভুলেও আর অপরূপ বনে যাওয়ার কথা ভাবে না। 

গাড়ির কালো কাচের মধ্যে থেকে আবারও আলী আজিজুর চেষ্টা করেন বাইরের দিকে তাকানোর। কিন্তু কিছুতেই তাকাতে পারেন না। অনেক ক্ষণ ধরেই কাচটা কেমন কড় কড় করছে। এই গরমে অনেকের গাড়ির কাচই নাকি আজকাল চৌচির হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য তার গাড়ির কাচ এখনও ঠিকঠাকই আছে। আর ঠিক না থেকে উপায় আছে! রাজরাণী ভীষণ পছন্দ করেন বলেই না মাগনা-মাগনা এই হাই-ফাই গাড়িটা দিয়েছেন তাকে। অবশ্য অনেককেই তিনি এভাবে হঠাৎ করে বাড়ি-গাড়ি একটা কিছু, দুইটা কিছু দিয়ে বসেন। তার হুকুমে পাঁচ মণী পাথরও কী সুন্দর হাওয়াই পাখার মতো ঘুরতে থাকে; আবার হুকুম পেলে ছটফটে ধুলিকণা পর্যন্ত কেমন থির হয়ে যায়। যার ভাগ্যে গাড়ি জোটে, ঠিক তেমনি ভাবেই জোটে। অবশ্য কারও কারও ক্ষেত্রে ছোটখাটো অলিখিত নির্দেশও থাকে, রাজরাণী আপনাকে বাড়ি দিয়েছেন, গাড়ি দিয়েছেন ঘোষণা শুনেই আপনি সংবাদ সম্মেলন ডাকবেন। বলবেন, আপনি রাজরাণীর মহানুভবতায় কৃতজ্ঞ, কিন্তু আপনি চান না এমন ব্যয়বহুল গাড়ি ব্যবহার করতে। তাই আপনি এ গাড়ি নিতে রাজি নন। বলবেন, আমাকে না দিয়ে এ গাড়ি দেশের অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হোক। 

আলী আজিজুরের তো এত কিছু জানা ছিল না। রাজরাণী তাকে গাড়ি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শুনেই তিনি এক বিরাট সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লিখে পত্রপত্রিকায় পাঠিয়েছিলেন। লিখেছিলেন, এমন ব্যয়বহুল জীবনে আমি অভ্যস্ত নই, কখনো সামান্যতম অভ্যস্ত হতেও চাই না। আমি জানি, আমাদের রাজরাণী মহোদয়া আন্তরিক ভাবেই আমাকে এই উপহার দিয়েছেন। তিনি আমার মঙ্গল কামনাও করেন সব সময়। কিন্তু সে জন্যেই আমার পক্ষে এই উপহার নেয়া সম্ভব নয়। কারণ তা নিলে তারা আমাকে সমালোচনার নামে প্রকারান্তরে রাজরাণীরই সমালোচনা করবেন।... ইত্যাদি, ইত্যাদি কত কথাই না মনের আবেগ মিশিয়ে লিখেছিলেন তিনি। তা পরদিন সেই সংবাদ বিজ্ঞপ্তির সব টুকু না হলেও পত্রপত্রিকায় অনেক যত্ন নিয়ে অনেকটুকুই ছাপানো হয়েছিল। তা ছাড়া একটা টক-শো ছিল গভীর রাতে, তাতেও তিনি দু’চারটা কথাবার্তা বলে নিজেকে বেশ মহীয়ান করেছিলেন। তবে পরদিন নিশ্চিন্তে আর ঘুমাতে পারলেন কই! সকালেই ঘুম ভেঙে গেল মোবাইল ফোনে কল আসার শব্দ যোগ স্ত্রী নামক অতন্দ্র মানুষটির ডাকাডাকিতে। তখন চোখ দুটো সামান্য মেলে জাকিয়াকে দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। তার পর আবারও পাশ ফিরে শুয়েছিলেন অপরূপবনের শ্বাসমূলীয় গাছগুলোর মতো। কিন্তু শোয়া কি আর যায়! মোবাইলটা তৃতীয়বারের মতো বেজে উঠলে জাকিয়া সেটা তার কানের সঙ্গে ঠেসে ধরেছিল। আর তিনি চিৎকার করে উঠে বসেছিলেন। আর ফোনে কিছু বলার আগেই রাজরাণীর চর-অনুচর প্রধানের খনখনে গলা শুনতে পেয়েছিলেন, ভাই, আপনি এইসব আজাইরা কী সব বলে বেড়াচ্ছেন? আপনাকে কি গাড়ি দেয়ার আগে বলা হয়েছিল, রাজরাণী গাড়ি দেয়ার ঘোষণা দিলেও আপনি কিন্তু পত্রপত্রিকা আর টক- শোতে বলবেন ও গাড়ি আমি কিছুতেই নেব না! 

তা সত্যিই বটে-- ওরকম কোনো কথা কেউ সাংবাদিক আলী আজিজুরকে কখনোই বলেনি। কিন্তু বলবেই বা কেন!? তিনি কি আর যদুমদু কেউ না কি? তিনি কি নিজে স্পন্সর জোগাড় করে জন্মদিন পালন করেন নাকি? তাকে এমন কথা কেন বলবে?! 

কেন যে বলবে, তা আলী আজিজুর বেশ ভালো করেই টের পেলেন সেদিন। চর-অনুচর একজন তাকে টানা তিন ঘন্টা ধরে জেরা করে বুঝিয়ে দিল, কেন তাকে চুপ থাকতে হবে। 

সেই দিনও কি এমনই গরম ছিল? নাকি এরও চেয়ে বেশি। শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত অনুচর ভবনের মধ্যেও তিনি ঘামতে ঘামতে জবজবে হয়ে গিয়েছিলেন। তাকে বার বার বলা হচ্ছিল, আপনি তো দেখছেনই স্যাবোটাজ করার জন্যে কত জন কত কিছু বলে-- 

স্যাবোটাজ? মানে নাশকতা? এখনও সম্ভব এইসব? স্বপ্নপূরণের সহস্র বর্ষ উদ্যাপনের মাস ছয়েক আগে সেই প্রথম আলী আজিজুরের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, মানুষজন আক্ষেপের স্বরে উল্টাপাল্টা অনেক কথা বলে বটে। তাই বলে এখনও স্যাবোটাজ? এ কী করে সম্ভব? এ কি আর তিন-চারটা বছর? আরে বাপ রে, কত উন্নতি হয়ে গেছে রাজ্যে, মানুষের গড় আয়ুই তো সেই সাড়ে ৭২ বছর থেকে বেড়ে সাড়ে ৭২ হাজার বছর হয়ে গেছে। এই এক হাজার বছরে বলতে গেলে কেউই আর মারা যায়নি, আর যারা মরেছে, তাদের মৃত্যু আসলে অনিবার্য ছিল। তারা মরেছে, কারণ যেমন ইচ্ছা তেমনের এই রাজ্যে তাদের কোনো প্রয়োজন নেই। রাজরাণী প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, স্বপ্নপূরণের পর সহস্র বর্ষ পূর্তি না করে তিনি কিছুতেই মৃত্যুর মুখ দেখতে রাজি নন। তার বিশ্বস্ত সহযাত্রীদের মৃত্যুও দেখতে রাজি নন তিনি। তা তার পর থেকে সেভাবেই তো বেঁচে রয়েছে তারা। রাজরাণীর আয়ু সাড়ে ৭২ হাজার বছর হয়ে গেছে, তাদের আয়ুও তাই হয়ে গেছে। রাজরাণীর মনে হয় আকাশটা সুন্দর, তাদেরও মনে হয়, সত্যিই তো আকাশটা কত সুন্দর! রাজরাণীর মনে হয়, এ জায়গা তো দেখছি বস্তি হয়ে গেছে, তাদেরও মনে হয়, সত্যিই তো জায়গাটা কেমন ন্যাড়া-ন্যাড়া, কত ময়লা আর দুর্গন্ধে ভরা-- এখানে কি কোনো মানুষ বাস করতে পারে? রাজরাণীর মনে হয়, দেশে সুখের ফল্গুধারা বয়ে চলেছে, অতএব তাদেরও মনে হয় ‘কী আনন্দ আকাশে বাতাসে’। এই রাজ্যের যেখানেই যাওয়া যাক, কী সুন্দর স্তব্ধতা, কী সুন্দর নীরবতা, কী সুন্দর শান্তি। ওই যে কী এক কবি আছে, জীবনানন্দ না কী যেন, তার সেই রূপসী বাংলার চেয়েও সুন্দর নীরব নির্জন এই রাজ্য। এর মধ্যে নাশকতা আসবে কোত্থেকে? 

বিস্মিত আলী আজিজুর বলেছিলেন, তার মানে? আপনার কি মনে হয়, আমার কথাগুলো স্যাবোটাজের মতো? 

তা-ই বইকি-- অনুচরদের একজন তার কথা লুফে নিয়েছিল-- তা সেরকমই বলতে পারেন। আপনি আমাদের রাজরাণীর এত কাছের মানুষ, আপনি যদি বলেন, গাড়ি নেবেন না, তার মানে কী দাঁড়ায়? রাজরাণীকেই অস্বীকার করা না? আর তাকে অস্বীকার করাটা একটা খারাপ বার্তা না? এর মানে কি এরকম ভাবা যায় না যে, আপনার সঙ্গে তা হলে আমাদের রাজসভাসদদের সম্পর্কে চিড় ধরেছে? আপনি তাই রাজ্যসভার সিদ্ধান্তকেও উপেক্ষা করতে চাইছেন। 

তাজ্জব ব্যাপার-- এমন কেন হবে? আবারও মুখ খোলার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। যদিও বুঝতে পারছিলেন, তার গলা শুকিয়ে আসছে। কিন্তু কথা বলার সুযোগ পাননি তিনি। অনুচরপ্রধান বন্ধুর মতো তার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, যান-- বাসায় ফিরে যান। ভালো করে বিশ্রাম নিতে নিতে একটু ভাবুন। যেখানে সেখানে যা তা কথা বলে নিজের হাতের অস্ত্র পরের হাতে তুলে দেবেন না। সভাসদদের মনোবল ভেঙে দেবেন না। আপনি ভালো করেই জানেন, স্বপ্নপূরণের এ রাজ্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রাজরাণীর তাতে কত বড় অবদান রয়েছে। এখন রাজরাণী একটা কথা বললেন, আপনি তা রাখলেন না, অথচ আপনি রাজরাণীর বিশ্বস্ত বার্তাকমী! প্রধান বার্তাসঙ্গী। আপনার এই প্রত্যাখ্যানে রাজ্যের মানুষের কাছে কী বার্তা যাবে বলুন? রাজ্যের মানুষজন কী ধরে নেবে না, আপনি আসলে রাজরাণীর সমালোচনা করছেন? তাতে কী রাজরাণীকে নৈতিকভাবে দুর্বল করা হবে না? রাজরাণী এ রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন, স্বপ্নপূরণের রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর আমরা এখন স্বপ্নসা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চিন্তা করছি? আপনার এই কাজে কি রাজরাণীর মনোবল হোঁচট খাবে না? 

আলী আজিজুর হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন, অনুচরগুলো তাকে কথা বলতেই দিচ্ছে না! গড়গড় করে বলছে তো বলছেই! তিনি যতবারই কথা বলার চেষ্টা করেন, তত বারই অনুচরপ্রধান তার ডান হাতটার তর্জনী একটু তুলে থামিয়ে দেয় তাকে। মুহূর্তেই তিনি একটা চামড়াছেলানো মোরগ হয়ে যান। তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পোড়ানো হতে থাকে, এ নিয়ে আপনি আর কোনো কথাই বলবেন না, একদম চুপ থাকবেন। কেউ যদি কোনো প্রশ্ন করেই ফেলে, কেউ যদি আবারও জানতে চায়, গাড়িটি আপনি নিয়েছেন কি না, তা হলে বলবেন, তিনি আমাদের রাজ্যের কা-ারি। তিনি কোনো কথা বললে আমরা তো আর তার ওপর দিয়ে কোনো কথা বলতে পারি না। 

ধ্বস্তবিধ্বস্ত হয়ে অনুচর ভবন থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন আলী আজিজুর। তা হলে গাড়িটি তাকে নিতেই হবে? কী যেন নাম গাড়িটার? গাড়ির নাম তার মনে থাকে না, কারণ গাড়ির প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই। অবশ্য সাংবাদিক হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী এই গাড়ির নাম জানা না থাকা একটা বড় অপরাধ। কিন্তু মনে না থাকলে তিনি কী করবেন। তিনি সেই নাম মনে করার চেষ্টাও করেন না। নিজেকে খুব ছোট মনে হতে থাকে--একটা গাড়ির ব্যাপারে এই ছিঁচকে অনুচরগুলো তাকে এইভাবে ছয় ঘন্টা আটকে রেখে গ্রিল করল! অথচ এদের জন্যে তিনি কী না করেছেন। কাউকে অনুচর ভবনে নিয়ে যাওয়ার সমালোচনা শুনলে তিনি সম্পাদকীয় উপসম্পাদকীয় লিখতে বসে যেতেন-- জনগণের কাজ রাজ্যের আইনশৃক্সক্ষলা বাহিনীকে সহায়তা করা, জনগণের কাউকে তারা যদি জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন মনে করে, তা হলে তাদের উচিত জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেওয়া, কাউকে ডেকে পাঠানো হলে তার উচিত নিজ উদ্যোগে অনুচর দপ্তরে হাজির হয়ে সহায়তা করা। 

বাসায় ফিরে আলী আজিজুর এই শুনে আশ্চর্য হয়েছিলেন যে, অনুচর ভবনে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে--এটি জানালেও কোনো স্যাটেলাইট চ্যানেলে নাকি খবরটি প্রচার করা হয়নি। বরং বার বার এই সংবাদ প্রচারিত হয়েছে যে, আগামীকাল বিকেলে সাংবাদিক আলী আজিজুর রাজ্যভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রাজরাণীর দেয়া ব্যক্তিগত গাড়িটি গ্রহণ করবেন। জাকিয়া তাকে আরও জানিয়েছিল, আর কেউ নাকি গাড়ি নিতে রাজি হয়নি। তবে আলী আজিজুরের উচিত হবে, কে কী করল সে দিকে না তাকিয়ে চোখকান বুজে গাড়িটা নিয়ে নেওয়া। বিধ্বস্ত আলী আজিজুর তাড়াতাড়ি বাসার টিভি ছেড়েছিলেন, দেখেছিলেন রাজরাণীর রাজ্যসভার সবচেয়ে লোভাতুর মন্ত্রী মশাইও রিপোর্টারদের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন, রাজরাণীর দেয়া গাড়িটা তিনি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাজরাণীর কাছে তিনি সানুনয় কণ্ঠে অনুরোধ করছেন, তিনি এই গাড়ি নিতে চান না। গাড়ি বিক্রি করে বরং তার এলাকায় রাস্তা বানানোর টাকা দেয়া হোক! 

তবে আলী আজিজুরকে গাড়িটা নিতেই হলো। তার নিজের ঘোরতর আপত্তি থাকলেও তার স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা খুশিই হলো। প্রতিমাসে ড্রাইভার আর গাড়ির গ্যাস খরচ বাবদ বেশ মোটা অঙ্কের টাকাও পাচ্ছেন তিনি। অবশ্য ড্রাইভার বাবদ পাওয়া টাকার খানিকটা অংশ বোধহয় তার স্ত্রী কেটেকুটে রেখে দেয়। পরিবারের এসব ব্যাপার-স্যাপারগুলোয় তার কোনো আগ্রহ নেই। সত্যি কথা বলতে গেলে, যতটুকু বা ছিল জাকিয়ার মতিগতি দেখে সেটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন। ঘরের মধ্যে অশান্তি তার ভালো লাগে না। যতটুকু আগ্রহ দেখালে স্ত্রীর ভালো লাগে, আলী আজিজুর ততটুকুই আগ্রহ দেখিয়ে থাকেন তার স্ত্রীর কাছে। 

আজ অবশ্য আলী আজিজুরের নিজেরও মনে হচ্ছে, গাড়িটা নিয়ে ভালোই হয়েছে। রাস্তাঘাটে এত ঝক্কি! এ জন্যেই ড্রাইভার সহজে রাজধানীর বাইরে আসতে চাইছিল না। কিন্তু তার তো আসতেই হবে। আরও তিনশ’ বছর আগে থেকে ভেবেচিন্তে রেখেছেন তিনি, স্বপ্নপূরণের সহস্র বর্ষ পূর্তিতে একটি সিরিজ প্রতিবেদন লিখবেন-- জনগণকে জানাবেন, একহাজার বছর আগের সেই ঘোরতর কঠিন সময়ে কত অপপ্রচার চলেছিল এই রাজরাণীর শাসনামলের শুরুতে। ধারাবাহিক সেই প্রতিবেদনের প্রথমটিই হবে এই অপরূপবন নিয়ে। এক হাজার বছর আগের সেইসব দিনগুলোর কথা ভেবে এখনও শিহরিত হন আলী আজিজুর। রাজরাণী তখন কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন, বলেছিলেন ভিনদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনবেন। আর তাই অনেক হিসেবনিকেশ কষে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানিয়েছিলেন এই অপরূপবনের ধারে। তার পর কত দিন, কত রাত কেটে গেছে। ছিল ২০১৮ সাল আর এখন ৩০১৮। আর সে জন্যেই কি হাজার বছর পরের এইদিনে, স্বপ্নপূরণের সহস্রবর্ষের ইতিহাস উদ্যাপনের এই সময়ে হঠাৎ করেই ঝিকিমিকি তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে তার স্মরণের বালুকাবেলায়? 

অপরূপবন বলে কিছু আর আছে বলে মনে হয় না আলী আজিজুরের। আর তা মনে হতে বুকের মধ্যে ধ্বক করে ওঠে। অসম্ভব, এমন হতেই পারে না। কিন্তু গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। চার দিকে শুধু রাস্তাঘাট আর বিরান এক প্রান্তর। ড্রাইভার মনসুর আলীর দিকে তাকিয়ে বলেন তিনি, আর কত দূর? 

বিভ্রান্ত মনসুর আলী জানায় তাকে, বুঝতে পারছি না। এ তো কিছুই চিনতে পারছি না। শহর তো ফেলে আসছি কত আগে! 

আলী আজিজুর লক্ষ্য করেন, তার মনের মধ্যে কোনও হাহাকার জাগছে না, কোনও কৌতূহলও নয়। মনে হচ্ছে, বড় কোনও নাশকতা ঘটে গেছে-- এত বড় যে, তারা কেউই জানতে পারেননি, রাজরাণীর মুখ ফসকেও কখনও সেই ঘটনা কোথাও বের হয়নি। 

গাড়ি এখন খুবই ধীরে এগুচ্ছে। জানালার দিকে তাকিয়ে আলী আজিজুর ব্যাপারটি বোঝার চেষ্টা করেন। পুরোটা পথই এবড়োখেবড়ো হয়ে পড়েছে। ঝাঁকুনির অনুভূতি কমিয়ে আনার জন্যে চোখ বুজে ফেলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই প্রচণ্ড শব্দ করে শক্ত ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি থেমে যায়। আলী আজিজুর কঁকিয়ে ওঠেন, কী হলো? 

আর যাওয়া যাবে না স্যার। 

আলী আজিজুর দেখেন, হঠাৎ করেই যেন ভঙ্গুর এক জগতে এসে পড়েছেন তিনি। রাস্তা আছে, কিন্তু চলাচল করার মতো নয়। খোলা নিচু প্রান্তরে শক্ত তেলের আস্তরণ জমেছে। 

গাড়ি থেকে নামতেই দাউ দাউ আগুন জাপটে ধরে আলী আজিজুরকে। তিনি লাফ দিয়ে আবারও গাড়ির মধ্যে ঢোকেন এবং তাপনিরোধী ভেস্ট পরে আবারও বাইরে আসেন। মনসুরের মধ্যে বের হওয়ার কোনও আগ্রহ দেখা যায় না। একা একাই এগুতে থাকেন তিনি। মনে হয় না, এর ধারেকাছে কোথাও কোনও সমুদ্র ছিল একদিন; মনে হয় না, এই প্রান্তরের বুকে জালের মতো ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য নদী, ছিল অসংখ্য খাল ও খাঁড়ি। কোনখান দিয়ে বইতো মিঠা পানির স্রোতে, তাই সেখানে ছিল সুন্দরী, গেওয়া ও কেওড়ার দল, কোনখান দিয়ে বইতো নোনা পানির স্রোতে, তাই সেখানে ছিল গরানের দল-- ঠিকঠাক কোনও কিছুই আর মনে পড়ে না। তা হলে কেন এতদূর ছুটে এলেন তিনি সব কাজ হয়ে যাওয়ার পর জেলেদের সঙ্গে বসে সেই পারশে আর শাপলাপাতা মাছ খাওয়ার সুপ্ত ইচ্ছে নিয়ে! কবে এইখানে মিঠা পানি, লোনা পানি সবই শুকিয়ে গেছে, মরে গেছে নদী আর সমুদ্ররা, বদলে গেছে এ মৃত্তিকা, রাজরাণীর প্রধান বার্তাসঙ্গী হওয়ার পরও তিনি তা টের পেলেন না। আলী আজিজুরের মনে হয়, তিনি আসলে কোনও দুঃস্বপ্নের ঘোরে রয়েছেন। স্বপ্নপূরণের সহস্রবর্ষের ইতিহাস উদ্যাপনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে পূর্বস্মৃতি তাকে দুঃস্বপ্নের আভা দেখাচ্ছে। বধির এক অনুভূতিতে তিনি এলোমেলো কেঁপে উঠছেন। 

আলী আজিজুর জোর করে চোখ ঘসেন, জোরে নিঃশ্বাস নেন আর ছাড়তে থাকেন খুব আস্তে। হ্যাঁ, এই তো তিনি তার পুরানো পৃথিবী আবারও ফিরে পাচ্ছেন, এই তো আবারও ভালোভাবে সব কিছু দেখতে পারছেন তিনি; আর রাজরাণীও নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন এসব। কী সুন্দর অপরূপ এই অপরূপবন। একা একা বিচরণ করতে আসা এখানে কত ভয়ঙ্কর! তা হলে তাদের চেয়ে কে আর আছে বড় জাতিশ্বর? তারাই তো বলেছিলেন সহস্র বছর আগে-- বলেছিলেন, ভবিষ্যতেও এমনই থাকবে এই অপরূপবন। ওই যে মিঠা পানির তরঙ্গ, ওই যে নোনা পানির তরঙ্গ-- তার ওপর দিয়ে ভেসে যাবে তাদের চেতনার রঙে রাঙা হাজার হাজার টন কয়লা বোঝাই কার্গো জাহাজ, গর্জন করে ছুটবে তারা, সিটি বাজাবে, তবুও কোনও ক্ষতি হবে না এই অপরূপবনের। এক বিন্দু তেলও চুঁইয়ে পড়বে না নদীর জলের ভেতর। যদি কখনও হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটে, তাতেও কোনও সমস্যা নেই। তেলের আস্তরণ যাতে জোয়ারের পানিতে মাটির ওপর ছড়িয়ে না পড়ে, তার আস্তরনে গাছের শ্বাসমূল দিয়ে শ্বাস নেওয়ার যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, সে জন্যে হাজার হাজার মানুষ নিয়োগ করবেন তারা। এতে দেশের বেকার সমস্যারও সমাধান হবে। আর রাজ্যসভার মন্ত্রী-সামন্তরা কলকারখানা বসানোর জন্যে একটু-আধটু জমিজমা এই অপরূপবনের পাশে কিনেছেন বটে, কিন্তু তাতেই বা ক্ষতি হলো কোনখানে? বড় বড় কলকারখানায় এ বনের আশপাশ বোঝাই হয়ে গেলে বরং লাভই তো হবে। সেরকমই তো হওয়া উচিত-- বিজ্ঞানই তো বলে কলকারখানা থাকবে জনবসতি থেকে দূরে, মানুষের আবাসস্থলকে যেন সেসব দুষিত করতে না পারে। কলকারখানা হওয়া উচিত বড় বড় বনের ধারে। কারণ গাছগাছালি কলকারখানার কার্বন ডাই অক্সাইড টেনে নেবে তার ভেতরে, গিলে খাবে গপগপিয়ে, তার পর ফোঁস ফোঁস করে অক্সিজেন ওগড়াতে থাকবে। মানুষ তাতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাবে। 

আলী আজিজুর জানেন, অনেকেই রাজরাণীর এইসব কথা শুনে হাসাহাসি করেছে। তবে স্বপ্নপূরণের এই সহস্রবর্ষই তাদের মুখে ছাই ছুড়ে দেয়ার উপযুক্ত সময়। তা একটু-আধটু পরিবর্তন ঘটেছে বটে, এই যে তিনি নিজেই তো এখন সেরকম দেখতে পাচ্ছে-- সুন্দরী গাছগুলো মরে গেছে! আহ্ রে, সত্যিই মরে গেছে! আর কোথাও কোথাও পুরো তেলের আস্তর জমেছে। এই তো, মনে হচ্ছে, এইখানে খাঁড়ি ছিল একটা, আর একটা খাল ওইখানে। কিন্তু এখন শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেছে, আর তার মধ্যে জমে আছে বাগদা, গলদা, কাঁকড়া, পারশে, কান মাগুর, দাগী কান মাগুর, শিলং, চেউয়া, ডাহুক কত শত মাছের জীবাশ্ম। অনেকক্ষণ-- না কি অল্পক্ষণই সেখানে অপেক্ষা করেন তিনি গভীর দৃষ্টি নিয়ে, যেন এখনই তার চাউনির স্পর্শে জলের স্রোতে বয়ে যাবে খাল জুড়ে আর তার স্পর্শে লাফাতে থাকবে সব মাছ। কিন্তু সে রকম কিছু ঘটে না। খুব হতাশ হয়ে পড়েন তিনি-- তা হলে শেষ পর্যন্ত মরে শেষ হয়ে গেছে এইসব! তা হলে দু’চারটে পারশে, ডাহুক মাছ এবার আর তার খাওয়া হচ্ছে না! তা হলে এমন হওয়ার কথা যে কেউ কেউ বলেছিল, তা রাজ্যকে অস্থিতিশীল করে তোলার ষড়যন্ত্র ছিল না! অথচ এইসব বলাতে তিনি কি না তার ন্যাংটাকাল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়া এক বন্ধুর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা ঠুকেছিলেন! মাথাটা নিচু হয়ে আসে তার। 

দৃষ্টি ফেরালে এইবার আবারও একটা প্রশস্ত, কিন্তু খরখরে অপ্রয়োজনীয় রাস্তা চোখে পড়ে আলী আজিজুরের। হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন তিনি। যাক, এখন আর হাঁটতে সমস্যা হবে না তবে। সূর্যটা একেবারে পিঠের ওপরে আছে বটে, কিন্তু সমস্যা নেই। তাপনিরোধ ভেস্ট তো তার পরাই আছে। হাঁটতে হাঁটতে মাছগুলোর কংকালে মাংস লাগাতে থাকেন। তাদের আদল ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেন না। তা হলে এ কথাও কি সত্য, অপরূপবনে এখন আর কোনো বাঘ নেই! বছরদশেক আগে বাঘশুমারির আগে এরকমই তো বলেছিল একটা ভিনদেশি দল। তা শুনে রাজরাণী খুব ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। তার পর থেকে প্রতি বছরই রাজরাণী দেশি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে বাঘশুমারী করছেন; আর কী আশ্চর্য, প্রতি বছরই এখন বাঘের সংখ্যা বাড়ছে। গত এক দশক ধরে বাঘ শুধু বেড়েই চলেছে। সাংবাদিক আলী আজিজুরের খুব ভয় লাগে, এই যে তিনি হেঁটে হেঁটে এগুচ্ছেন অপরূপবনের মধ্যে দিয়ে, সঙ্গে কোনো গাইডও নেই, আসার আগে নিজের পরিচয় দিয়ে নানা জায়গায় ধর্ণা দিয়েও কোনো গাইডকে আনতে পারেননি, রাজরাণী পর্যন্ত কোথায় কী জানালেন, তবু কোনও কাজ হলো না-- সেই তাকে একা পেয়ে কোনো বাঘ হঠাৎ গিলে ফেলবে না তো? সেই ২০১৮ সালের ১০৬ টা বাঘের একটাও ছিল না ৩০০৮ সালে, অথচ এ বছর তা টায় টায় ৩০১৮টি বাঘ হয়ে গেছে। 

কী সাংঘাতিক ঘটনা! তা হলে এত বাঘ এই অপরূপবনের কোনখানে আছে? কোনও জঙ্গল নেই, কোনও গোলপাতার দল কিংবা নলখাগড়ার ঝোড়-- বাঘের দল কি তা হলে দূরের ওইসব কলকারখানা আর ঘরবাড়িতেই বসবাস করছে? রাজধানী থেকে আসার পথে যেসব বসতি তার চোখে পড়েছে, সবই তো জনমনুষ্যিশূন্য ছিল। নাকি মানুষ আর বাঘ মিলেমিশেই বাস করছে এই প্রাগৈতিহাসিক হয়ে যাওয়া প্রান্তরে? রাজরাণী তো বলেছিলেন, অপরূপবনকে তিনি মানবিক বাঘস্থান করে তুলবেন, মানুষের ভালোবাসা পেয়ে যেসব বাঘ মানুষখেকো হতে ভুলে যাবে। তা হলে স্বপ্নপূরণের সহস্র বর্ষে এসে রাজরাণী তাকে অবাক করে দেবার জন্যেই কি একবারও বাধা দেননি অপরূপবনে আসতে? শেষ পর্যন্ত মানুষজনকেই তিনি উচ্ছেদ করেছেন এই বনের মধ্যে থেকে, বনের আশপাশ থেকে আর গড়ে তুলেছেন মানবিক বাঘস্থান!? তা হলে এই জন্যেই রাজরাণী বাঘবিশেষজ্ঞ পরিষদ কী এক সম্মেলন করে গেল বছর জানিয়েছে যে, এভাবে বাঘের সংখ্যা বাড়লে লোকালয় বিপর্যস্ত হবে, কারখানা এলাকা বিপণ্ন হবে, বনের পাশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে! 

বিশেষ নিবন্ধ লিখতে সেই সম্মেলনে রাজরাণী আলী আজিজুরকে যেতে বলেছিলেন। রাজরাণী সেই সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন। তাকে তখন বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, নিঃশ্বাস টানতেও বেশ কষ্ট হচ্ছিল। ক্যামেরা, ল্যাপটপ, পড ও মোবাইল ফোন নিয়ে সেই সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। দুষ্ট লোকে এখনও বলে, পরের দিন পত্রপত্রিকায় রাজরাণীর যে ছবিটি ছাপা হয়েছিল, সেটি আসলে আরও বছর দশেক আগের ছবি। তারা আড়েঠাড়ে এখনও বলাবলি করে, কেন, পত্রিকায় শুধু রাজরাণীর ছবি দেওয়া হলো কেন? দেশি-বিদেশী এত মানুষ এসেছিল, তাদের কয়েকজন রাজরাণীর বক্তব্যের সময় মঞ্চেও ছিল, ছবিতে তারা নেই কেন? 

তবে কথা হলো, এই দেশে-- যেমন ইচ্ছা তেমন নামের এই দেশের মানুষজনের স্বভাবচরিত্র বড় অদ্ভূত। অদ্ভূত, নাকি গুণই বলবেন একে আলী আজিজুর? মরে যাওয়া শ্যালা নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবেন তিনি, মনে হয় বড় গুণই বলতে হবে এই ব্যাপারটাকে-- হঠাৎ করেই মাথা কেমন বিগড়ে যেতে পারে এইসব মানুষের! দুষ্ট লোকের কথায় কান দেয় না বটে-- কিন্তু আবার কখন কী যে হয়, কান তখন এমনভাবেই দেয় যে, লংকাকা- ঘটে যায়। 

তা এই মানুষজন এখনও বিশ্বাস করে, একেবারে ষোলো আনাই বিশ্বাস করে, আর সত্যি বলেই তো বিশ্বাস করে যে, এসব পুরোপুরি মিথ্যা, একেবারে ডাহা মিথ্যা কথা, রাজরাণী যা করছেন দেশের ভালোর জন্যেই করছেন। আর ভালোর জন্যেই করছেন বলেই তো তিনি এখনও আগের মতোই তারুণ্যদীপ্ত, উদ্দীপণাময়। দেখো, তার মুখের দিকে তাকালেই বুকে প্রাণ ফিরে আসে। যদিও দুষ্ট লোকেরা এ নিয়েও দুষ্টুমি করে, বলে, হ্যাঁ, প্রাণ ফিরে পাবেন বইকি--অবশ্য যদি প্রাণ চলে গিয়ে থাকে। আমাদের প্রাণ তো এখনও আছে রে বাবা, ধুকে ধুকে হলেও প্রাণটা আছে; তা হলে প্রাণ আর ফিরবে কেমন করে? তবে সবাই তো ওরকম না, বেশির ভাগ মানুষজনই বিশ্বাস করে, তারা ভালো আছে--খুব ভালো আছে। আর তাদের রাজরাণীর অসুস্থতার খবরও গুজব। তিনি যে বলেছিলেন, স্বপ্নপূরণের সহস্রতম বর্ষ উদ্যাপন না করে তিনি কিছুতেই মাটিতে দেহ রাখবেন না, তা তো মিথ্যা হবার নয়। আর এখন তো রাজ্যের মানুষের গড় আয়ুই সাড়ে ৭২ হাজার বছর হয়ে গেছে! হ্যাঁ, একটু আধটু পরিবর্তন ঘটছে বটে; কিন্তু তার মানে এই নয় যে রাজরাণী দেহ রাখবেন। আর একটু-আধটু পরিবর্তন ঘটবে না কেন! অনুচর ভবনের লোকজন হয়তো ঠিকই বলেছিল, স্বপ্নপূরণের সহস্র বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও তো চক্রান্ত অব্যাহত আছে, চক্রান্ত কী আর সহজে থেমে থাকে। নিশ্চয়ই তারা এখনও মাঝেমধ্যেই নাশকতার চেষ্টা করে। 

আলী আজিজুরের নাকের মধ্যে যেন প্রচণ্ড গরম লবণ এসে ঢুকছে। অথচ একটুও বাতাস নেই, কোথাও লবনের পাহাড় নেই, এমন কোনো নদীর ছায়া পর্যন্ত নেই, যাতে কোনো জল আছে, যে জল কেবলই লবণাক্ত, যে জল কেবলই দিশেহারা মাকে প্রলুব্ধ করে জন্মের সঙ্গে সঙ্গে কথিত অবৈধ সন্তানকে মেরে ফেলতে। কিংবা অভাবের সমুদ্রের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বৈধ সন্তানের মাকেও উৎসাহিত করে সেই পথে এগুতে। সাবধানে পা ফেলেন তিনি, খুব ভয় হয়, মনে হয় এখনই একটি বাঘ এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপরে। কোথায় কে জানে লুকিয়ে আছে রাজরাণীর সেই তিন হাজার ১৮ টি বাঘ। যদিও যতদূর চোখ যায়, কোনো কিছু নেই। গাছপালা সব উধাও-- তার বদলে রাজরাণীর প্রচারণায় উৎসাহিত হয়ে মানুষজন এখন রাজধানীতেই ঘরের বারান্দা আর ছাদে এইসবের চাষাবাদ করছে। আর যে ২-৪টা গাছপালা এখনও আছে, সেগুলোও মরে যাবে নিশ্চয়ই তাড়াতাড়ি। তা হলে বাঘগুলো লুকিয়ে আছে কোনখানে! 

নিজের চিন্তাকে আলী আজিজুর অন্য দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন-- তা এইসব গাছপালা যে মরে গেছে, নদী-খাল মরে গেছে, পাখি আর মাছের কোনও অস্তিত্বই আর নেই-- সেসবের কারণও তো আছে। জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে-- আর এমন যে ঘটবে, তা তো রাজরাণী সেই এক হাজার বছর আগেই বলেছিলেন; বড় বড় রাজ্যগুলোর রাজা-রাণীদের মধ্যে দাঁড়িয়ে চড়া গলাতেই বলেছিলেন, ‘আপনাদের কারণেই এইসব পরিবর্তন ঘটছে আর তার জন্যে মাশুল দিতে হচ্ছে আমাদের মতো ছোট ছোট রাজ্যগুলোকে। অতএব আবারও ফিরতে হয় সেই ঐতিহ্যময় কার্ডের ধারণার কাছে, ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’, আমাদের জলবায়ু রক্ষার জন্যে মোহর দিতে হবে।’ ওইসব রাজ্য তো এত বড়, এত শক্তিশালী যে ওদের মন্ত্রী-টন্ত্রীরাই তো এই যেমন ইচ্ছা তেমন দেশের রাজরাণীর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা রাখে; অথচ রাজরাণী কী দিব্যি সাহসের সঙ্গে তাদের রাজা-রাণীদের মুখের সামনে বলে এলেন, ‘আমাদের জলবায়ু আমরা কী করব, কেমন রাখব, সেটা আমাদের ব্যাপার-- কিন্তু আপনাদের মোহর ফেলার কথা মোহর ফেলেন। একেবারে ন্যায্য কথা; জলবায়ুর এই পরিবর্তন, অপরূপবনের এই দুর্দশা, এসবের জন্যে কী আর রাজরাণী দায়ী না কি!’ 

আলী আজিজুর ভেবেছিলেন, দুর্দান্ত একটা সাকসেস স্টোরি লিখবেন তিনি। তাতে উঠে আসবে এইসব সত্য, অপরূপবন জুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলোর ওপর দিয়ে কী সুন্দরভাবে বয়ে চলেছে কয়লা কিংবা তেল বোঝাই জাহাজ! দিন দিন এমন জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে, দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে। তাতে কোনো ক্ষতিই হয়নি নদীর। বরং কয়েকবার তেলবাহী জাহাজ ডুবে গিয়ে নদীগুলোকে আরও সুন্দরী করে তুলেছে। এতদিন বাঘ এসে লোকালয়ে ঢুকে পড়ত। মানুষজনকে গিলে খেত। জলের ধারে কাছে যাওয়া যেত না। কালা হাঙর, ইলশা কামট, ঠুঁটি কামট, কানুয়া কামট মানুষের ঘ্রাণ পেয়ে তীর বেয়ে উঠে আসত আর হামলে পড়ে টেনে হিঁচড়ে পানির মধ্যে নিয়ে যেতো। কোনো কিছুই করার থাকত না। কিন্তু এখন মানুষই কলকারখানা নিয়ে গিয়ে সোজা ঢুকে পড়েছে অপরূপবনের ভেতর, সূচিত হয়েছে নতুন এক যুগের-- প্রতিবছর বেড়ে চলা বাঘের সঙ্গে ক্রমবর্ধনশীল মানুষের কার্যকর এক সহাবস্থান। গড়ে উঠেছে রাজরাণীর স্বপ্নের মানবিক বাঘস্থান। 

কিন্তু যা ভেবেছিলেন, এখন তো আলী আজিজুরের মনে হচ্ছে, একটু অন্যভাবে লিখতে হবে। অন্যভাবে দাঁড় করাতে হবে প্রতিবেদনটাকে। রাজরাণীর এই শাসনামলের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে, এমন কিছু তো তার পক্ষে লেখা সম্ভব নয়। কিন্তু এ ছাড়া কী-ইবা লিখবেন তিনি! তখনই শুকনো, মরোমরো, আবর্জনার তল থেকে একটা গাছের মেলে ধরা পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে আলী আজিজুর আবারও সিদ্ধান্ত পালটানোর চেষ্টা করেন। আছে, এখনও তো প্রাণস্পন্দন আছে অপরূপবনে। আর রাজ্যে বিজ্ঞানের যে অগ্রযাত্রা ঘটেছে, তাতে অপরূপবন যে সত্যিই কোন আদল পেয়েছে, তা তো তার জানা নেই ভালো করে। এমন তো হতেই পারে, এখনও বোধহয় এই অপরূপবনে বংশপরম্পায় বাস করা লোকগুলো টিকে আছে কোনওখানে কোনওভাবে। হয়তো বা আগের চেয়ে অনেক ভালো করে। হয়তো তারা এখনও বাওয়ালী হয়েও দিব্যি বেঁচে আচে, দিব্যি মধু সংগ্রহ করে বিক্রি করছে শহরে নিয়ে গিয়ে। নইলে ওই যে একটা গাছ, সেটার গায়ে গাছিদের পা রাখার জায়গাটুকু এখনও কেন এত স্পষ্ট! 

আচ্ছা, একজন গাছি কিংবা একজন বাওয়ালীর মুখোমুখি হলে আলী আজিজুর নিজেও কি স্পষ্ট চিনে নিতে পারবেন আগের মতো? ভাবতে ভাবতে কী এক করুণ দুঃখবোধে সিক্ত হয়ে ওঠেন তিনি। এই যে এত বার অপরূপবনটায় এসেছেন তিনি, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে, কখনও ক্লাসমেটদের সঙ্গে শিক্ষা সফরে, কখনও বা রাজরাণীর সফরসঙ্গী হয়ে, কিন্তু বনের মধ্যে কোনোবারই তো একটা বাঘ দেখতে পারেননি! এমনকি বাঘের পায়ের ছাপও খুঁজে পাননি কোথাও। কখনোই দেখতে পাননি, প্রচণ্ড গরমের নদীতে শরীর ডুবিয়ে বিপরীত পাড়ের দিকে চলে যাচ্ছে একটি-দুটি বাঘ; কিংবা বিশ্রাম করতে গিয়ে তার পদশব্দ শুনে তাকিয়ে আছে বিরক্তি মেশানো চোখ তুলে। সব কিছুই কি তা হলে শেষ হয়ে গেছে? শেষ হওয়ার পথে? 

ভাবতে ভাবতেই আলী আজিজুর ফের উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন-- এই তো নতুন এক স্টোরি লাইন পাওয়া গেছে; চোখের সামনেই তো ওই জ্বলজ্যান্ত স্বপ্নপূরণের উদাহরণ-- বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুদীর্ঘ চিমনি চোখে পড়ছে এখান থেকেও-- তা বাদে আর যা কিছু ঘটেছে, সে জন্যে দায়ী তো ওই ভিনদেশিরা। ওদের দেশের খারাপ বাতাস এসে এ দেশের বাতাসকে নষ্ট করে দিচ্ছে। রাজরাণী ঠিকই বলেন, দেশের খারাপ বাতাস আর ভালো বাতাস মিলে মিশে থাকতে পারে, দেশের খারাপ জল আর ভালো জল মিলে মিশে থাকতে পারে, দেশের খারাপ মানুষ আর ভালো মানুষও মিলে মিশে থাকতে পারে; কিন্তু ভিনদেশি কোনোটার সঙ্গেই মিলেমিশে থাকা যায় না। 

ভিনদেশীরা অসহযোগিতা করছে, রাজ্যের মধ্যে এখনও অপপ্রচার চলছে,-- তার পরও তো শেষ নেই; আলী আজিজুর হিসেবনিকেশ করে দেখেন, এইবার দেখা যাচ্ছে, হাতে আছে নাশকতা-- তিনি সেই নাশকতার চেহারাটা বোঝার চেষ্টা করেন। তা হলে অনুচর বাহিনী ঠিকই বলেছে সেদিন, নাশকতা যারা করে, তারা নানা উপলক্ষ খোঁজে। অতএব এমন কোনো কথা বলা যাবে না, যা থেকে তারা নাশকতার উপলক্ষ খুঁজে পায়। তার গায়ে হঠাৎ করেই কাঁটা দিয়ে ওঠে, রাজরাণী কত বিশ্বাস করেন তাকে, তার কি উচিত এমন কিছু বলা-- যা থেকে নাশকতাকারীরা আমজনতাকে খেপিয়ে তোলার সুযোগ পায়! আরও-- আরও সতর্ক হতে হবে তাকে। সব সময় সত্যি কথা বলা ঠিক নয়, সব সময় সত্যি বলা যাবে না-- সত্যি আর মিথ্যা হলো একই মুদ্রার এ-পিঠ, ও-পিঠ, প্রয়োজনে সত্যি পিঠটা দেখাতে হবে-- মিথ্যা পিঠটাও মেলে ধরতে হবে প্রয়োজন পড়লে। বিবর্ণ, ধ্বংস হয়ে যাওয়া অপরূপবনের সামনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত এমন একটা সমাধান খুঁজে পেয়ে খুব ভালো লাগে আলী আজিজুরের। আর ইচ্ছে জাগে জাকিয়ার সঙ্গে একটু কথা বলার। কী করছে জাকিয়া এখন? কয়েক মাস হলো ভারী চাপ যাচ্ছে ওর ওপরে-- জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রচারণা নিয়ে ভারী মুশকিলে আছে সে। জন্মনিয়ন্ত্রনের পাট তো কবেই চুকেছে এই রাজ্য থেকে-- এখন আর কারও কোনও ছেলেমেয়ে হয় না, কনডম কিংবা পিলের প্রয়োজন পড়ে না। তবু প্রতি বছর জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রচারণার জন্যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়। জাকিয়ার কাজটা সেখানে কী, তা তিনিও স্পষ্ট জানেন না। 

একদিন অবশ্য বলেছিল জাকিয়া, জন্মনিয়ন্ত্রণ নয়-- তারা আসলে অলিখিতভাবে জন্মবর্ধন প্রকল্প করে চলেছে। যদিও সেখানেও ব্যর্থতা ছাড়া কিছুই মিলছে না, জনসংখ্যা বাড়ছে না কিছুতেই। জাকিয়ার কি তেমন যোগ্যতা আছে এমন সব প্রকল্পের কোনও দায়িত্ব পালন করার? এ ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে আলী আজিজুরের। মুখে যাই বলুন না কেন, তিনি তো জানেন-- তার স্ত্রী বলেই এমন একটা ভালো পদে ও কাজ করছে। সত্যি কথা বলতে গেলে, একটা অযোগ্য মেয়েকেই কাজটা দেয়া হয়েছে। তবে এই নিয়ে তার কোনও ক্ষেদ নেই। কোনও না কোনও অযোগ্য ছেলে বা মেয়েই তো চাকরিটা পেত। তা ছাড়া তিনি তো কাউকে আর বলতে যাননি, তার স্ত্রীর একটা বেশি বেতনের কাজ দরকার। জাকিয়া কী না কী বলেছে, সেটা ওর ব্যাপার। সে যদি তার নাম আর প্রভাব খাটিয়ে থাকে, সেসবের দায়দায়িত্ব কি আলী আজিজুরের? জাকিয়া একজন আলাদা ব্যক্তি, তিনি একজন আলাদা ব্যক্তি। তার অনিয়মের দায় তিনি কেন নিতে যাবেন! এসবের জন্যে জাকিয়া দায়ী, তাকে যারা ওই কাজ দিয়েছে, তারা দায়ী। তিনি এর কিছুই জানেন না। 

অবশ্য এইটা ঠিক, একবার তাদের এক রিপোর্টার অনেক খেটেখুটে একটা রিপোর্ট তৈরি করেছিল-- জন্মনিয়ন্ত্রণের নামে লাখ কোটি টাকার লুটপাট হচ্ছে, কাগজে-কলমে কোটি কোটি কনডম আর পিল উৎপাদন হচ্ছে, আদতে কিছুই হচ্ছে না, প্রতিটি ইউনিয়নে ছয়জন করে মাঠ পরিদর্শক করছে বলা হলেও বাস্তবে কোথাও কোনও পরিদর্শক নেই, তাদের বেতন লোপাট করা হচ্ছে কর্মরত দেখিয়ে! আলী আজিজুর বার বার পড়েছেন ওই রিপোর্ট। মনে হয়েছে পুরো বিদ্বেষে ভরা, রাজরাণীর শাসনামলকে বিতর্কিত করার অপপ্রয়াস; ডকুমেন্টসগুলো ভালো করে দেখার রুচিও হয়নি তার। সঙ্গে সঙ্গে খবরটি তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন ওয়েস্ট বক্সের মধ্যে। আর অফিস থেকেও বিদায় করে দিয়েছেন সেই রিপোর্টারকে। 

খুব ক্লান্ত লাগছে আলী আজিজুরের। মনে হচ্ছে, সামনের অবারিত বিরান প্রান্তর কখনও আর শেষ হবে না। তবে এই বিরান প্রান্তরে প্রচুর আবর্জনা ছড়িয়ে আছে উঁচু-নিচু গ্রীষ্মকালীন এভারেস্ট হয়ে। কোথাও তেলের আস্তরণ জমেছে আর লালচে-হলুদ আভা ছড়াচ্ছে। তবু সেইসব আবর্জনার মধ্যেও উঁকি দিচ্ছে দু’চারটে নতুন গাছের কুড়ি। সে দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শেষ পর্যন্ত তিনি জাকিয়াকে একটা কল দিয়েই ফেলেন। তার পর কী মনে করে কেটেও দেন একটা-দুটো রিং হতে না হতেই। বিয়ের আগে, তাদের প্রেমপর্বে এরকম হতো-- মিসকল দিতেন তিনি, আর জাকিয়াও তাই করত। কে শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে আরেকজনের ব্যালান্স কমাতে পারত তারই প্রতিযোগিতা চলত তাদের ভেতর। শেষ পর্যন্ত হয়তো সে, অথবা জাকিয়াই থাকতে না পেরে কল দিয়ে বলে উঠত, ‘এত ছোটলোক ক্যান তুই? এত ছোটলোকী করিস ক্যান?’ সহস্র বর্ষ পরে আবারও সেই কাজ করার পর আলী আজিজুর কেমন শিহরিত হয়ে ওঠেন। 

কিন্তু জাকিয়া আজ কল দিয়েই কেটে দেয় না। তা ছাড়া এটা তো সত্যি, জাকিয়ার আয়-রোজগার এখন তার চেয়ে অনেক বেশি। কীভাবে বেশি, সেটা জানা নেই আলী আজিজুরের। রাজরাণীর প্রধান বার্তাসঙ্গী হলেও তার আয়-ইনকাম কম, এটা অবশ্য অনেকেই মানে, আর আড়ালে আবডালে তাই ‘বোকচোদ’ বলে হাসাহাসিও করে। তা যাই হোক, জাকিয়ার আয়-রোজগার বেশি, আগের মতো সে আর ‘ছোটলোকী’ করে না। কলব্যাক করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না সে। তাই সহস্র বর্ষ আগের সেই আনন্দ আজ আর তিনি ফিরে পান না। একবার ইচ্ছে করে, কলটা কেটে দিয়ে ওকে একটু আতঙ্কিত করে তুলতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কলটা ধরেন তিনি আর অবাক হয়ে দেখেন, আগের সেই আবেগ এখনও হারিয়ে যায়নি, তার কণ্ঠ যেন আজ হঠাৎ করেই সেই সার্ধসহস্র বছর আগের মতো শোনাচ্ছে, ‘হ্যালো-- তুমি কি জানো, আমি কোথায় এখন!’ 

‘উফ্-- ঢং রাখো। তুমি কোথায় সেটা আমার ভালো করেই জানা আছে।’ 

হা হা করে হেসে ওঠেন আলী আজিজুর। তবে তার হাসিকে জাকিয়া মুহূর্তেই থামিয়ে দেয়, ‘আর হেসো না। তোমাকে বিরক্ত করব না মনে করেছিলাম। কিন্তু তুমিই যখন মনে করলে, ভাবছি, আলাপটা না হয় সেরেই ফেলি।’ 

‘বলো, বলো, আমি না হয় যা বলার তা পরেই বলি।’ 

‘শোনো, ব্যাপারটা ইয়ার্কির না। তুমি নাকি এখন খরচের খাতাতে?’ 

আলী আজিজুর থমকে দাঁড়ান। খরচের খাতা বলতে একটা ব্যাপার আছে বটে। তিনি বা তারা অনেককেই সেই খাতায় উঠতে দেখেছেন। একেকজনের নাম একেক প্রক্রিয়ায় সেই খাতায় ওঠে। কিন্তু তার নাম তো সেখানে ওঠার কথা নয়। এটা ঠিক, তাকে অনুচর ভবনে যেতে হয়েছিল; কিন্তু এরকম অনেককেই তো সেখানে যেতে হয়। অনেককে এমনি-এমনিও নিয়ে যাওয়া হয়, বাজারে তার মূল্য বাড়াতে। তা তার বেলায়ও তো অনেকে এ রকমই মনে করে, দাম বাড়ানোর জন্যই তাকে অনুচর ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মানুষ ভাববে, রাজরাণীর সঙ্গে তার দূরত্ব বেড়েছে-- কিন্তু আসলে তো তেমন কিছুই না। তা কৌশলটা খারাপ না একেবারে। তিনি নিজেই তো সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। তার পর অনুচর ভবন থেকে ছাড়া পেয়ে রাজরাণীর সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি মন খুলে সান্ত¡না দিয়েছেন, সেই সুযোগে আলী আজিজুর তাকে তার এই অ্যাসাইনমেন্টের কথা খুলে বলেছেন। আর তার এই অ্যাসাইন্টমেন্টের কথা শুনে রাজরাণী যত প্রশংসা করেছেন, তিনি তা সারা জীবনেও পাননি। আর এই যে তিনি অপরূপবনে সরেজমিন পরিদর্শনে এসেছেন, রাজরাণী নিজে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মনিটরিং করছেন তাকে। ভাবতে ভাবতে আবারও শিহরিত হন তিনি। অথচ জাকিয়া কি না বলে, তিনি খরচের খাতায় উঠে গেছেন! অপরূপবনের এই প্রান্তে এসে, জাকিয়ার এইসব আনতাবড়ি কথাবার্তায় নিজের মধ্যে অনেকদিন পর লুপ্ত সুপ্ত একটা বাঘকে হঠাৎ করেই অনুভব করেন তিনি। গোঁ গোঁ করে বলে ওঠেন, ‘এইসব আজগুবি কথা তুমি কার কাছ থেকে শোনো? আমি খরচের খাতায় উঠছি, নাকি তুমি ওঠানোর চেষ্টা করছো?’ 

খুবই স্পর্শকাতর ইস্যু। জাকিয়ার সঙ্গে অনুচর ভবনের একজনকে খুবই আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেছেন তিনি। তাও তার নিজের বাসায়! না কি ওটাকে নিজের বাসা বলা যায় না? তিনি তো ওটার মালিক নন। রাজরাণীর ভালো মানুষের তালিকায় তার নাম থাকতে পারে, কিন্তু সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেও এমন বাসা জোটে না। এমন সব ঘটনার প্রেক্ষাপটে খরচের খাতার হিসেবনিকেশ খুব গুরুতরই বটে। তবে ১২ বছর প্রেম করেছেন তারা-- দীর্ঘ এক যুগ, তাও সেই স্বপ্নপূরণের সংগ্রামের দিনগুলোতে, তার পর গড় আয়ু বেড়ে যাওয়াতে তাদের বয়স যতই বাড়–ক, সেই এক যুগের কথা ভুলে যাওয়া কি এতই সহজ। তা হলে ওর কণ্ঠস্বর কি একটু আর্দ্রই লাগছে এখন? কেমন শ্রাবণের ভিজে ওঠা কাঁথা! কেমন করে সে বলে উঠছে, ‘এখন খোঁচাখুচি করার সময় নয় আলী। তুমি কি মনে করো, পুরানো দিন আমার কাছে একেবারেই মূল্যহীন?’ 

‘আমার কাছেও কি মূল্যহীন? মিসকল দিলাম, সে তো পুরানো দিনের কথা মনে হলো বলেই। কিন্তু তুমি আছো বর্তমানে, নতুন স্ট্যাটাসে--’ 

আছি-- সে জন্যেই অনেক কিছু জানি, আর সে জন্যেই তো বলছি। কী বলব, আমার শুনতে পাওয়া, আমার জানতে পারা অনেক কথা আমারই আর ভালো লাগে না। তুমি সাবধানে থেকো।’ 

কানটাই তিঁতা হয়ে গেছে। ‘রাখি’ বলেই ফোন কেটে দিতে যান তিনি। কিন্তু তার আগেই দেখা যায়, জাকিয়া ফোন কেটে দিয়েছে। 

আলী আজিজুর আবারও তার মধ্যে পুরানো বাঘটাকে অনুভব করতে থাকেন। কেমন মোচড় দিচ্ছে, গজরাচ্ছে আর দুরন্ত বেগে লাফ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এহ্, তার শরীরটা কি ক্রমেই নলখাগড়ার বন হয়ে উঠছে? একটা আস্ত নলখাগড়ার বন হয়ে সে কি এখন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছে এই রাস্তার ধারে? আর একটা বাঘ এসে শুয়ে পড়েছে তার শরীর ও মন জুড়ে? নাকি একটা অদ্ভূত আশ্চর্য অপরূপ বাঘের পেছন পেছন তিনি ছুটে চলেছেন!? পৃথিবীকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়া মহাপ্রলয়ের পরও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা সেই অপরূপ বাঘ ছুটে চলেছে তার সামনে দিয়ে। আর তিনিও ছুটছেন তার পেছন পেছন। মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়াচ্ছে ডোরাকাটা সেই অপরূপ বাঘ-- যা নাকি অনেক আগেই লুপ্ত হয়ে গেছে এই পৃথিবী থেকে। যেমন লুপ্ত হয়ে গেছে ইলিশের ঝাঁক। প্রতি বছর তারা আর সমুদ্র থেকে ছুটে আসে না মিঠা পানির নদীর দিকে। আর মিঠা পানির নদীও পৌঁছতে পারে না সমুদ্র অবধি। প্রচণ্ড জিঘাংসা নিয়ে ছুটছে সেই অপরূপ বাঘ-- যাকে কি না মৃত্যুর আগে সব টুকু প্রাণশক্তি দিয়ে গেছে সগোত্রের আর সব বাঘ। সহস্র বছর পরে আজ তার জেগে উঠবার দিন, দেখবার দিন প্রচণ্ড আনন্দ নিয়ে, যারা তাদের ঘরকে ধ্বংস করে তাপ ছড়িয়েছিল ভূম-ল জুড়ে, তাপে তাপে তারা আজ কেমন আছে, তাদের ঘর ধ্বংস করে গড়ে ওঠা কারখানাগুলোই বা কেমন আছে। না-- কিছুই আর আগের মতো নেই। তাপে তাপে সেই মানুষগুলো শুকিয়ে মৃত কাঠ হয়ে গেছে-- যারা একদিন ফিতা কাটতে কাটতে হাততালি দিয়েছিল আর বলেছিল, অপরূপ বাঘের দলকে বড় ভালোবাসে তারা, এমন কিছুই করবে না তারা, যাতে অপরূপ বাঘের একটি লোম ঝরে পড়বে। বরং অপরূপবনে অপরূপ বাঘদের বাসস্থানকেও আলোকিত করবে তারা। অথচ এখন তাদের নিজেদের শুধু লোম কেন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গও ধ্বংস হওয়ার পথে। তারা কেউ আর এখন সন্তান জন্মাতে পারে না, যদি বা জন্মায় সে শিশুর কোনও প্রাণশক্তি থাকে না, অফুরন্ত যৌনতায় উদ্দীপ্ত প্রতিটি নারী ও পুরুষ, অথচ কোনও প্রজনন ক্ষমতা নেই তাদের কারও; অফুরন্ত যৌনতায় ভরপুর তারা, অথচ তাদের উত্থান রহিত পুরো শরীর। অনেক দিন পর আলী আজিজুরের মনে পড়ে যায়, এখনও যথেষ্ট সুন্দর তিনি, যথেষ্ট সুন্দর তার স্ত্রী, কিন্তু তাদের কোনও সন্তান নেই। চোখ তার অবনত হয়ে আসে। তবু তিনি দেখতে পান, আনন্দে মাতোয়ারা সেই অপরূপ বাঘ ঘুরে ঘুরে নাচছে। যে অভিশাপ একদিন তাদের পূর্বপুরুষরা এই মানবজাতির জন্যে রেখে গেছে, শেষ পর্যন্ত তা নেমে এসেছে এই রাজ্যে। স্বপ্নপূরণের খুশিতে সে তাই উদ্দাম, বাঁধনহারা। 

কিন্তু খুশিতে নাচতে নাচতেই অপরূপ বাঘ অকস্মাৎ যেন-বা বিষণ্ণ হয়ে যায়, দুই পায়ে ভর করে বসে আর দুই পা দিয়ে সে নিজের চোখমুখ মুছতে থাকে, খামচাতে থাকে। হঠাৎ করেই তার চোখ যায় স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের পিলারের দিকে। তীব্র আক্রোশে সে দাঁত খিঁচাতে থাকে। আলী আজিজুর দুই পা পিছিয়ে আসেন। আরে বাপ রে, এ কোনখানে এলেন তিনি?! তখনই কোথায় যেন এক শিশুর তীব্র চিৎকার শোনা যায় আর অপরূপ বাঘ এবার ব্যাকুল হয়ে একবার ডান দিকে, আরেকবার বাঁ দিকে ছুটোছুটি করতে থাকে। তার গলা দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ বেরুলেও কী প্রচণ্ড করুণ শোনায়। আলী আজিজুর তার তাপনিরোধী ভেস্টটা আবারও টেনেটুনে ঠিক করে নেন। আরেকটু হলেই সেটা সরে যেত শরীর থেকে আর নিশ্চয়ই তীব্র তাপের সংক্রমণে লুটিয়ে পড়তে হতো তাকে। 

অপরূপ বাঘ এবার রাস্তা থেকে খানিকটা এগিয়ে শ্রমিক কলোনীর দিকে হাঁটতে থাকে। ভয়ঙ্কর স্তব্ধতা সেই কলোনী জুড়ে বাসা বেঁধেছে। প্রচণ্ড দাবদাহে দালানগুলোর দেয়াল খরখরে পোড়াটে দাঁত বের করে যেন ব্যঙ্গ করছে আলী আজিজুরকে। শিশুটার কান্না কি সেখান থেকেই ভেসে আসছে? অপরূপ বাঘের গতি প্রচণ্ড বেড়ে গেছে। আলী আজিজুরের হৃৎকম্পন শুরু হয়। তিনি বুঝতে পারেন, একটা অপরূপ বাঘ এখনও বেঁচে আছে এই পৃথিবীতে। কোনও চিড়িয়াখানায় নয়, কোনো সাফারি পার্কে নয়, কোনও বনবাদাড়ে নয়-- এই মরে যাওয়া ন্যাড়া আর জনশূন্য বস্তিতে পরিণত হওয়া অপরূপ বনটাতেই বাস করে সে। 

কিন্তু মানুষগুলো এখন কোথায় আছে? কোথাও কোনও মানুষের ছায়া দেখতে পান না আলী আজিজুর। তা হলে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলে কেমন করে? তাও তার মাথায় ঢোকে না। তার পরই মনে পড়ে যায়, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র তো কম পক্ষে সাড়ে নয়শ’ বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে কয়লা মেলে না বলে। তবে তাতে কোনো ক্ষতি হয়নি রাজরাণী কিংবা তাদের। উন্নয়ন এই এলাকায় অব্যাহত আছে-- ভালো করেই জানা আছে আলী আজিজুরের। ডিজিটাল উন্নয়ন ঘটেছে, সশরীরে উপস্থিত থাকার কোনও প্রয়োজন নেই। এতক্ষণে বুঝতে পারেন তিনি, কেন এই শ্রমিক কলোনীতে কোনো শ্রমিক নেই, কেন এই লোকালয়ে কোনো মানুষ নেই। তবে যেখানেই থাকুক না কেন তারা, যেখানেই যাক না কেন তারা, ডিজিটাল পদ্ধতিতে অবিরাম কাজ করে চলেছে। 

কিন্তু এই যে এক অপরূপ বাঘ, কী করে সে এইখানে? এই লোকালয়ে? মানুষের ধ্বংসযজ্ঞ দেখার আনন্দে উন্মত্ত বাঘটাকে আলী আজিজুরের গুলি করে মেরে ফেলার ইচ্ছে জাগে। রাজরাণী বেহুদায় এদের জন্য মানবিক বাঘস্থান করতে চেয়েছিলেন! পৃথিবীতে আসলে কোনও বাঘের দরকারই নেই, এইটাকেও গুলি করে মেরে ফেলা দরকার। কিন্তু সঙ্গে তার এমন কোনো হাতিয়ার নেই, যা দিয়ে কাউকে হত্যা করা যায়। ভারী অনুতাপ জাগে তার। অনুতপ্ত হতে হতে তিনি কেবল তার ভেতর জেগে ওঠা বাঘটাকে নিয়ে অপরূপ বাঘের পিছে পিছে হাঁটতে থাকেন। 

কলোনীতে সার বাধা সব ঘর। তারই একটির চৌকাঠ পেরিয়ে তরতরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল অপরূপ বাঘ। কিছুটা ভয়, কিছুটা কৌতূহল নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে পিছু পিছু আলী আজিজুরও দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। কী আছে এই ঘরে! ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড উত্তেজনা বোধ করতে থাকেন তিনি। বুঝতে পারছেন, দারুণ একটা স্টোরির সন্ধান মিলেছে, কিন্তু প্রতিবেদনটা শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করা যাবে কি না, সেটাই মূল ব্যাপার। 

ঘরের ভেতর তাকাতেই চোখ দুটো জুড়িয়ে যায় আলী আজিজুরের, আহ্, এতো রাজরাণীর সেই অপরূপবনের মিনিয়েচার-- যার কথা তিনি বলেছিলেন এইখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার আগে! ঘর জুড়ে যতদূর চোখ যায় নলখাগড়ার ঝাড়। আর তার মধ্যে নির্ভাবনায় পাশাপাশি শুয়ে-বসে খেলা করছে বাঘ আর মানুষের শিশুরা। অপরূপ বাঘ তার চার পা মেলে কী সুন্দর শুয়ে পড়েছে! তার স্তন্যে এর মধ্যেই মুখ লাগিয়ে দুধ নিতে শুরু করেছে ওদের কয়েকজন। 

হঠাৎ আলী আজিজুরের দিকে চোখ পড়তেই অন্ধ রাগে গোঁ গোঁ করে চিৎকার করে দরজার দিকে লাফ দিল সেই অপরূপ বাঘ। ভয়ে আতংকে ঘুরে উঠেই দৌড় দিলেন আলী আজিজুর। দৌড়াতেই লাগলেন তিনি। কয় দিন গেল, কয় রাত গেল, জানা নেই তার। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি এসে থামতে পারলেন তার গাড়ির কাছে। তার তাপনিরোধী ভেস্টটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে, টান দিতে গিয়ে বুঝলেন, একটু ফুটোও হয়ে গেছে। রাজ্যের যাবতীয় গরম এখন জাপটে ধরছে তাকে। যেন এখনই পুড়িয়ে মারবে। মনসুর তাড়াতাড়ি তার গাড়ির দরজাটা খুলে দিলে তিনি তার মধ্যে ঢুকেই সিটের ওপর লুটিয়ে পড়েন। তাড়াতাড়ি নিঃশ্বাস নেন, নাক দিয়ে নিয়ে ছাড়তে থাকেন মুখের মধ্যে দিয়ে-- যেমন করলে নাকি ভারী আরাম লাগে। 

কিন্তু নিঃশ্বাসও ঠিকমতো নেয়ার উপায় নেই, মোবাইল ফোনটা বাজছে ক্রিং ক্রিং করে। আলী আজিজুর মাথাটা একটু উঁচিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে দেখেন, জাকিয়া-- আবারও জাকিয়া ফোন করেছে। এমন একটা দুর্দান্ত ঘটনার পর জাকিয়ার ফোন পেয়ে বিরক্তিই লাগে তার। অন্য কেউ হলে এখনই তিনি রসিয়ে রসিয়ে অপরূপবনের এই অপরূপ বাঘ দেখার গল্প বলতে শুরু করতেন। কিন্তু জাকিয়ার কাছে এই গল্প দুই লাইনেই শেষ হয়ে যাবে। নিজেকে দুর্ভাগা মনে হয় তার। ফোন ধরে নিস্পৃহ কণ্ঠে বলেন, ‘হ্যালো--’ 

‘বাঁইচা আছো? ও আল্লাহ্-- তুমি বাঁইচা আছো-- ’ 

আনন্দে জাকিয়া তার বাপের বাড়ির ভাষায় কথা বলছে। আলী আজিজুরও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, ‘পাগলের মতো কী সব বলছো? বাঁইচা আছি মানে?’ -- আরও কিছু বলতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বোধহয় আরেকটা ফোন এসেছে, কেমন ব্লিপ ব্লিপ শব্দ করছে, তাই মনযোগ কেটে যায়। ওদিকে জাকিয়াও কথা বলতে শুরু করেছে, ‘তুমি কী বুইঝবা! এই দিকে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলায় ব্রেকিং নিউজ দিচ্ছে দেখতাছি, তুমি না কি নাশকতাকারীদের হাতে খুন হইছো ওইখানে? সত্যিই-- সত্যিই আমি পাগল হয়া গেছি...’ 

আবারও ব্লিপ ব্লিপ আওয়াজ হচ্ছে। এবার চোখটা সরু করে ফোনের মনিটরের দিকে তাকান আলী আজিজুর-- ও রে বাপ রে, এ তো রাজরাণীর ব্যক্তিগত সহকারীর ফোন! তড়বড়িয়ে জাকিয়াকে বলেন তিনি, ‘শোনো-- তোমার কথা পরে শুনব। রাজরাণীর পারসোনাল সেক্রেটারি বার বার ফোন দিতেছে। তারটা আগে ধরে নেই--’ 

‘তার ফোন ধরার দরকার নেই। আমি বুঝতে পারতেছি। শোনো, শোনো-- তার ফোন, খবরদার, তার ফোন ধইর না তুমি--’ 

কিন্তু আলী আজিজুর ততক্ষণে জাকিয়ার ফোন কেটে দিয়েছেন, কল লিস্ট দেখছেন ব্যস্ত চোখে, সেখানে ১০-১২ টা মিস কল জমে আছে-- সবই রাজরাণীর অফিসের নাম্বার থেকে। তার মানে তিনি যখন দৌড়াচ্ছিলেন, তখন থেকেই ফোন আসতে শুরু করেছে। 

আবারও ফোন বেজে ওঠে। সাংবাদিক আলী আজিজুরের বুকটা ফুলে ওঠে, এখনই তিনি বার্তা দেবেন রাজরাণীকে, দুর্দান্ত কয়েকটি সাকসেস স্টোরি লিখবেন তিনি রাজরাণীর এতদিনের শাসনামলকে নিয়ে, অনেক অনেক তথ্যই পেয়ে গেছেন তিনি অপরূপ বাঘটাকে দেখার পর। তাই ব্যস্ত হাতে কল রিসিভ করেন তিনি। কিন্তু কিছু আর বলতে পারেন না, কিছু আর শুনতে পারেন না, প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণ গাড়িটাকে লক্ষ কোটি মাইল বেগে কী ভাবে যে লণ্ডভণ্ড করে ফেলে, তা আর তার কিংবা ড্রাইভার মনসুর আলীর কোনও দিনই জানা হয় না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন