শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

তোমাসো ল্যান্ডলফি'র গল্প : গোগলের স্ত্রী

অনুবাদ : এলহাম হোসেন

লেখক পরিচিতি :
তোমাসো ল্যান্ডলফি ইতালির বিখ্যাত লেখক, অনুবাদক ও সাহিত্য সমালোচক। জাদুবাস্তববাদী গল্প, বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ও বাস্তবধর্মী গল্প তিনি লিখেছেন। ১৯০৮ সালে ইতালির ইকো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালের ইতালিতে মারা যান।
রুশ লেখক নিকোলাই গোগোল তাঁর প্রিয় লেখক।    এডগার এলান পো ও গোগলের লেখার প্রভাব তোমাসোর লেখায় পড়েছে বলে কোনো কোনো সমালোচক মনে করেন। তবে কেউ কেউ তার লেখায় লুই হোর্হে বোরহেস  ও আইজাক ডিনসেনের প্রভাবও খুঁজে পেয়েছেন। গোগোলের স্ত্রী গল্পটিতে কাফকার মেটামরফোসিসের মিল আছে।

তাঁর বই-- Gogol's wife and other stories.  Cancerqueen, La Pietra lunare.



এ পর্যায়ে নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচের স্ত্রীর জটিল বিষয়টির সামনে পড়ে আমাকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব পেয়ে বসেছে। যে বিষয়টা আমার অবিস্মৃত বন্ধু দুনিয়ার কাছ থেকে গোপন রেখেছে, তা প্রকাশ করার আমার কি কোনো অধিকার আছে? (গোপন রাখার পেছনে তার অবশ্য যুক্তিও আছে।) আমি নিশ্চিত যে, এতে কেউ কেউ বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে উঠবেন। আবার কেউ কেউ আমাকে ভুলও বুঝবেন। অধিকন্তু, সব নীচ ও ভণ্ড লোকদের এবং কিছু কিছু সৎ লোকেরও, তবে যদি তারা থেকে থাকে, সংবেদনশীলতাকে কি ব্যাপারটা আঘাত করবে? শেষ পর্যন্ত শুরুতেই যে ব্যাপারে আমার মন সায় দেয় না এবং কম বেশি খোলাখুলি অনুমোদন পাই না, সে ব্যাপারে হাটে হাঁড়ি ভাঙ্গা কি আমার অধিকারের মধ্যে পড়ে?

কিন্তু আসল কথাটা হলো, জীবনীকার হিসেবে আমার কিছু শক্ত বাধ্যবাধকতা আছে। এ বিশ্বাসটুকু আমার আছে যে, এমন বড় প্রতিভাধর ব্যক্তির যে কোনো তথ্যই আমাদের এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য মূল্যবান। আমি কিছুই লুকাতে পারব না। এগুলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সঠিক ও জ্ঞানগর্ভভাবে মূল্যায়িত হওয়ার কোনো আশা নেই। আবার, আমাদের নিন্দা করার অধিকারই বা কী আছে। বিরাট প্রতিভাধরের যে ব্যাপারগুলো আমাদের কাজে লাগুক বা আমাদের কাছে শেষ পর্যন্ত খারাপই মনে হোক-- তা কি আমাদের গোচরিভূত হয়েছে? নিশ্চয় নয়, কারণ এই সুবিধাভোগী স্বভাব-চরিত্রের খুব অল্পই আমরা বুঝি। ‘এ কথা সত্য’, একবার এক মহান ব্যক্তি বলেছিলেন, ‘আমারও শৌচাগারে যেতে হয়, তবে তা ভিন্ন ভিন্ন কারণে’।

কিন্তু ধান ভানতে শিবের গীত না গেয়ে আমি সন্দেহাতীতভাবে যা জানি সে বিষয়ে এবং যে বিতর্কিত বিষয়কে প্রশ্নাতীতভাবে আমি প্রমাণ করতে পারব-- যা এখন আর এরূপ থাকবে না বলে আশা করি, সে বিষয়ের অবতারণা করি। যে বিষয়টা ইতোমধ্যে জানা হয়ে গেছে আমি আর তার পুনরাবৃত্তি করছি না। কারণ, গোগলকে নিয়ে পড়াশোনার এ পর্যায়ে আমি এর প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

এক্ষুণি বলে ফেলি, নিকোলাই ভেসিলেভিচের স্ত্রী কিন্তু কোনো মহিলা নয়। মানুষই নয়। সে আদৌ কোনো প্রাণীই নয়। প্রাণীও নয় গাছপালাও নয় (যদিও কখনো কখনো এ রকম কিছুর প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।) সে শুধুই একটা বেলুন। হ্যাঁ, বেলুন। এটা আমাদের দ্বিধাদ্বন্দ্বের একটা ব্যাখ্যা দেবে। এমনকি যে জীবনীকারগণ এই গুরুর ঘনিষ্ঠ শিষ্য ছিলেন এবং যাঁরা প্রায়ই অভিযোগ করেছেন যে, তাঁরা তাঁর বাসায় বার বার গেলেও তাঁর স্ত্রীকে দেখেননি বা ‘কখনো তার কণ্ঠও শোনেননি’, তাঁদেরও একটা ব্যাখ্যা দেবে। এ থেকেই তাঁরা সব ধরনের অস্পষ্টতা ও অসম্মানজনক দূর্বোধ্যতা-- হ্যাঁ যা অপরাধমূলকও বটে, তা বাদ দিয়ে দেবেন।

নাহ্, ভদ্রমহোদয়গণ, সবকিছুই যেমনটা মনে হয় সেগুলো আসলে তারচেয়েও বেশি সহজ-সরল। আপনারা তার কণ্ঠস্বর কখনোই শোনেননি, কারণ সে কথা বলতে পারে না। অথবা আরো ঠিকঠাকভাবে বলতে গেলে, সে শুধু বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে কথা বলতে পারে। এটা অবশ্য দেখতেই পারব। ও সবসময়ই নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচের সঙ্গে নিভৃতে কথা বলে। কাজেই কোনো সস্তা বা ফাঁপা যুক্তি-তর্ক না দিয়ে বরং বর্ণনার ব্যাপারে যতটা সঠিক ও সম্পূর্ণ হওয়া যায় ততোই ভালো।

গোগলের তথাকথিত স্ত্রী একটা সাধারণ পুতুল। ঘন রাবারে তৈরি। সবসময় ও নগ্ন হয়ে থাকে। নাদুস নুদুস। যেমনটা সচরাচর বলা হয়ে থাকে-- একেবারে রক্ত মাংসের রং। যেহেতু সব নারীর গায়ের রং একই রকম হয় না, সেজন্য আমি স্পষ্ট করেই বলতে চাই যে, ওর গায়ের রং হালকা শ্যামলা ও মসৃন ।

তাকে ’এটা’ বলে সম্বোধন করব নাকি ’সে’ বলব। তবে না বললেই চলে যে, সে একটা নারী। এক্ষুণি বরং বলে নিই যে, তার লিঙ্গ পরিবর্তন না করেও সে তার আকার-আকৃতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সে হালকা-পাতলা, লিকলিকে। স্তন নাই। নিতম্বও সরু, তরুণদের মতো। কোনো মহিলার মতো নয়। আবার কখনো কখনোও বেঢপ মোটাসোটা। রাখঢাক না করে বলি--  স্থুলকায়। প্রায়ই তার চুলের রং বদলে যায়। তা সেটা মাথারই হোক বা যেখানকারই হোক, যদিও একই সাথে এমনটা ঘটে না। তবে ছোটখাটো জিনিসের সবকিছুই সে পরিবর্তন করতে পারে, যেমন ধরুন, তার তিলের অবস্থান, লালা গ্রন্থির অবস্থান, এ রকম আরো কত কী। একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সে তার শরীরের রংও পরিবর্তন করতে পারে। যেকেউ এই প্রশ্নটা করতে বাধ্য হবেন যে, সে আসলে কে বা সে আদৌ একজন মানুষ কি-না। আসলে শেষমেশ দেখা যাবে এ ব্যাপারটা নিয়ে চাপাচাপি করা সত্যিই অবিচক্ষণতা।

আমার পাঠকরা ইতোমধ্যে বুঝে ফেলেছেন যে, এই পরিবর্তনগুলোর কারণ নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচের ইচ্ছা ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি তাকে বড় বা ছোট বা চ্যাপ্টা করে যে কোনো আকার দেন। পরচুলা বা চুলের গোছার পরিবর্তন ঘটান। কখনো মলম মেখে পিচ্ছিল করে নানানভাবে স্পর্শ করে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী রূপ দেন। কল্পনাকে সায় দিয়ে কখনো কখনো এর কিম্ভূতকিমাকার বা দানবীয় চেহারাও তৈরি করেন। ঝটপট যে কথাটা বোঝা যায়, তা হলো-- একটা নির্দিষ্ট মাত্রার অতিরিক্ত হাওয়া দিলে অথবা একটা নির্দিষ্ট চাপের নিচে থাকলে তার চেহারার বিকৃতি ঘটে।

তবে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো তাঁর স্ত্রীর জন্য সম্মানজনক নয়, গোগল সেগুলোর ব্যাপারে শীঘ্রই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে ভালোবাসেন তাঁর নিজের মতো করেই। সেটা আমার কাছে বোধগম্য হলেই কি, আর না হলেই বা কি। কোনো চেহারায় তিনি তাঁর স্ত্রীকে ভালোবাসেন--তা নিয়ে আমাদের মনে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটতে পারে। তিনি কি তাঁর স্ত্রীকে আদৌ ভালোবাসতেন? হায়, হায়! আমি তো ইতোমধ্যে আভাস দিয়েছি যে, বর্তমান কাহিনীর শেষে গিয়ে একটা উত্তর আমরা পেয়ে যাব। কীভাবেই বা আমি উপরের আলোচনায় উল্লেখ করতে পারলাম যে, নিকোলাইয়ের ইচ্ছাই ওই মহিলার ওপর প্রভূত্ব করে? একদিক থেকে এটা সত্য। কিন্তু এ কথাও সমানভাবে সত্য যে, তিনি শীঘ্রই তার খাদেম থেকে উৎপীড়কে পরিণত হলেন। একে আপনারা রসাতলে যাওয়াও বলতে পারেন। তবে সে ব্যাপারে আর বেশি কিছু অনুমান না করি।

ইতোমধ্যে বলেছি যে, কম-বেশি এদিক-সেদিক ভাঁজ করে এর স্থিতিস্থাপকতাকে কাজে লাগিয়ে গোগল তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী নানান সময় নানান নারী-মূর্তি ওর ওপর আরোপ করেন। আর একটু বলে নিই, নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচ কালেভদ্রে তাঁর আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একে এমন অবয়ব দেন যে, তিনি নিজেই এর প্রেমে পড়ে যান। যতক্ষণ এর চেহারা স্থির থাকে ততক্ষণই তাঁর প্রেম থাকে। চেহারা বদলে গেলে প্রেমও পালিয়ে যায়। এ-রকম তিন-চারটা প্রচণ্ড আবেগের ঘটনার কথা আমি উল্লেখ করতে পারি। আমার মনে হয়, আজকের দিনে একে মহান কোন লেখকের প্রেমান্ধতা বলা যায় (দাম্পত্য জীবন নিয়ে কিছু বলা কি আমার সাহসে কুলাবে?)। এখানে একটা কথা যোগ করলে সুবিধে হয়, তা হলো তাঁর বিয়ের কয়েক বছর পরে গোগল তাঁর স্ত্রীর একটা নাম দিয়েছিলেন। নামটা হলো ক্যারাকাস। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, এটি ভেনিজুয়েলার রাজধানীর নাম। এর পেছনের কারণ আমি আবিস্কার করতে পারিনি। মহান ব্যক্তিরা সাধারণত খামখেয়ালি হয়ে থাকেন! 

আমি যদি শুধু তাঁর স্বাভাবিক চেহারার ব্যাপারটা বলি, তবে বলতেই হয় যে, কারাকাস সুদর্শণা। সুগঠিত শরীর, প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুপ্রতিসম। যথাস্থানে যথাগুণ তাকে যৌন আবেদনময়ী করে তুলেছে। বিশেষ করে তার যৌন আবেদনময়ী অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো (এই পরিস্থিতিতে বিশেষণ ব্যবহার করার অনুমতি আছে কিনা- তা আমার জানা নেই)। রাবারে নিখুঁত ভাঁজ দিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। কোনো কিছুই বাদ পড়েনি। নানান কৌশলের ব্যবহার করে এর নির্মাতারা তাদের এ-কাজ সহজেই করেছিল, বিশেষ করে ভেতর থেকে বাতাসের চাপ প্রয়োগ করে।

ক্যারাকাসের একটা দেহকাঠামোও ছিল, যদিও সেটা তেমন মজবুত নয়। বিশেষ যত্ন নিয়ে তৈরি করা হয়েছে তার দেহপিঞ্জর, শ্রোণীচক্র এবং মাথার খুলি। চর্বিবহুল বাহ্যিক স্তরের জন্য প্রথম দুটি তন্ত্র দৃশ্যমান এবং এরা চর্বিবহুল বহিঃস্তর তন্ত্র দুটিকে ঢেকে রেখেছে। এটি বড়ই করুণার বিষয়, গোগল আমাকে কখনই এই সুন্দর শিল্পকর্মের স্রষ্টার নাম বলেননি। এই অনীহার মধ্যে যে এক ধরনের একগুয়েমি আছে, তা আমার কাছে কখনই পরিস্কার ঠেকেনি।

নিকোলাই ভ্যাসিলেভিস তাঁর নিজের উদ্ভাবিত পাম্পার দিয়ে তাঁর স্ত্রীকে ফুলিয়ে তোলেন পায়ুপথের মধ্য দিয়ে হাওয়া দিয়ে। ওয়ার্কসপগুলোতে অবশ্য এই কৌশল ব্যবহার করা হয়। তার পায়ুপথে একটা ভাল্ভ বসানো আছে, এর সঠিক প্রযুক্তিনির্ভর বর্ণনা যাই হোক না কেন, এর কাজ হৃদযন্ত্রের ভালভের মতোও হতে পারে। এর সাহায্যে শরীরের ভেতর বেশি করে হাওয়া ঢুকানো যায়, তবে তা আর বের হয় না। হাওয়া ছাড়ার জন্য এর মুখের ভেতরে গলার পেছনের দিকে একটা বোতাম আছে, একে প্যাঁচ দিয়ে খুলতে হয়।

আমার মতে, এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অদ্ভুত বিষয়গুলোর বর্ণনা শেষ। এবার ঝকঝকে দাঁতগুলো যা তার মুখকে সাজিয়েছে, তার কথা না বললেই নয়। কালো চোখ দুটোও নিখুঁতভাবে তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করেছে। আমি কি বলেছি যে, তার দাঁতগুলো নকল? ‘নকল’ শব্দটি যথার্থ নয়। ক্যারাকাসের বর্ণনার ব্যাপারে যে শব্দই ব্যবহার করা হোক না কেন-- তা যথার্থ নয়। এমনকি এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই চোখগুলোর রংও বদলে যেতে পারে। অবশেষে আমি তাঁর কন্ঠের কথা বলি। এটি আমি শুধু একবার শুনেছিলাম। তবে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের গভীরে না গিয়ে আমি তা বলতে পারি না। এক্ষেত্রে কোনো কিছুই আমি নিশ্চিত না হয়ে বর্ণনা দিতে পারি না।

আমি পারি না, কারণ আমার বিবেক ও স্মরণ শক্তির ব্যাপারে আমি সত্যিই দ্বিধান্বিত। এ কথাই আমি এখন বলব। যেটুকু আমার স্মৃতিতে আছে শুধু সেটুকুই বলব।

প্রথমটা হলো, কোন এক সন্ধ্যায় আমি ক্যারাকাসকে নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচের সাথে আলাপচারিতা করতে শুনেছি। অনুমতি পেলে বলতে পারি, আমরা ভদ্রমহিলার থাকার ঘরেই ছিলাম। এই ঘরে প্রবেশ করা সবার জন্য নিষেধ। প্রাচ্যের ঢংয়ে সাজানো, কোনো জানালা নেই, বাড়ির একেবারে অনভিগম্য স্থানে অবস্থিত। আমি জানতাম, সে কথা বলতে পারে। কিন্তু গোগল কখনো আমাকে বলেননি, কোন কোন পরিস্থিতিতে সে কথা বলে। আমরা সেখানে দুই-তিনজন ছিলাম। নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচ আর আমি ভোদকা পান করতে করতে বুদকডের উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আমার মনে পড়ে, আমাদের এই আলোচনার শেষের দিকে তিনি উত্তরাধিকার আইনের মৌলিক সংস্কারের ব্যাপারে কথা বলতে লাগলেন। আমরা তাঁর কথা প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম। ঠিক সেই সময় বিবাহের মে বসা ভেনাসের মত রসকষহীন আজ্ঞানুবর্তী গলায় সে কাউকে উদ্দেশ্য না করেই বলে উঠল, ‘আমি যেতে চাই।’

ভুল শুনেছি ভেবে লাফিয়ে উঠলাম। ওর দিকে তাকালাম। দেয়ালের সঙ্গে হেলান দেয়া কুশনে সে বসে ছিল। ওই সন্ধ্যায় তাকে কোমল ও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল, শরীরে অবশ্য ততোটা আব্রু ছিল না। তার অভিব্যক্তিতে ধূর্ততা, রঙ্গময়তা, বালখিল্যতা ও এক ধরনের উদাসীনতার সমন্বয় ছিল। গোগল তো অগ্নিশর্মা হয়ে লাফিয়ে উঠে দুই আঙ্গুল দিয়ে তার গলা চেপে ধরলেন। সঙ্গে সঙ্গে সে জড়সড় হতে শুরু করলো। ফ্যাকাসে হয়ে গেল। বিস্ময়ে বিমোহিত হয়ে সে আর একবার দম নিয়ে নিল। অযত্ন অবহেলায় তৈরি করা একপি- থলথলে তালগোল পাকানো বস্তুতে রূপান্তরিত হলো। তার মেরুদণ্ডটি বেশ নমনীয় হওয়ার কারণে তাকে প্রায় সমান দুইভাগে ভাঁজ করে গড়াতে গড়াতে মেঝেতে ফেলে দেয়া হলো। সেখান থেকেই চরম অপমান সহ্য করে সারাটা বিকেল সে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

গোগল বললেন, ‘সে আমার সঙ্গে ঠাট্টা করে আর আমাকে বিরক্ত করার জন্য এ কাজ করে, কারণ সত্যি কথা বলতে কি, তার তো এ-রকমটা করার দরকার নেই।’ অন্য লোকের উপস্থিতিতে, যেমন ধরুন, আমার উপস্থিতিতে তিনি সাধারণত ঘৃণাভরে তার সঙ্গে আচরণ করেন।

আমরা মদিরা পান করছিলাম, কথপোকথনও চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচকে খুব বিচলিত ও অন্যমনস্ক মনে হচ্ছিল। এবার হঠাৎ করে কথা বলতে বলতে থেমে গেলেন। আমার হাতটা চেপে ধরে কেঁদে ফেললেন। ‘আমি এখন কী করব?’ অকস্মাাৎ প্রশ্ন করলেন, ‘ফোমা পাসকালোভিচ, আমি যে তাকে ভালোবাসি তা কি আপনি বুঝতে পারছেন?’

বলেই ফেলি, অতিলৌকিক কিছু না ঘটলে ক্যারাকাসের চেহারা-সুরত নিয়ে আক্ষেপ করার কিছু নেই। প্রতি মুহূর্তেই সে ফ্রেস এবং ওর পূর্ববর্তী চেহারা, সঠিক চাপ, সুষম অঙ্গসংগঠন খোঁজার চেষ্টা করা বৃথা। কাজেই সেই বিকেল থেকে সুডৌল সুন্দরী ক্যারাকাস গোগলের কাছ থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল। এটাই গোগলের অন্যতম প্রেমের করুণ পরিণতি। এর কথা আমি উপরে বিধৃত করেছি। তিনি আমাকে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। আমার সান্ত্বনাও তিনি গ্রহণ করলেন না। সেই বিকেলে আমি আগেভাগেই বিদায় নিলাম। কিন্তু দুঃখের বিস্ফোরণে তিনি আমার কাছে তাঁর হৃদয় মেলে ধরলেন। তিনি আর এখন আমার কাছে বাকসংযমী ব্যক্তি নন। ফলে খুব শীঘ্রই তাঁর কিছুই আর গোপন রইল না। কাজেই বন্ধনী মধ্যস্ত মন্তব্য হিসেবে বলতেই পারি যে, ব্যাপারটা আমাকে ভেতরে ভেতরে গর্বিতও করেছিল।

মনে হয়, শুরুর দিকে এই দম্পতির জীবন ভালোই কাটছিল। নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচ ক্যারাকাসকে নিয়ে সন্তুষ্টই ছিলেন এবং একই বিছানায় ঘুমাতেন নিয়মিত। শেষ পর্যন্তই তিনি এভাবে চলতেন। তারপর ভয়মিশ্রিত হাসি দিয়ে বলতেন, তার চেয়ে এত শান্ত ও জেদি আর কেউ হয় না। কিন্তু শীঘ্রই আমার মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধলো। তারপর কয়েক বছর পর ওঁদের সম্পর্কের অদ্ভূতভাবে অবনতি ঘটতে শুরু করে।

আমি একবার, না সবসময়ই বলতে চাই, এগুলো আসলে কিছু একটা ব্যাখ্যার জন্য ছকবদ্ধ চেষ্টা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। ঠিক সেই সময়ই মহিলাটা তার স্বাধীনতা বা স্বেচ্ছাচারিতার লক্ষণগুলো দেখাতে শুরু করে। কেউ কেউ এটাকে ব্যক্তিস্বাধীনতাও বলতে পারেন। নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচের ভালোই জানতেন যে, সে তার দুর্বোধ্য ব্যক্তিত্ব অর্জন করছিল। এটা কিন্তু তাঁর থেকে আলাদা। বলতে পারেন, এটা তিনি ঠিকমত ধরতেই পারছিলেন না। এটা নিশ্চিত যে, তার প্রত্যেকটা অবয়বের মধ্যেই একটা অবিচ্ছিন্নতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। এই অবিচ্ছন্নতা বিরাজমান তার ঘন কালো চুল, উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ, লালচে বাদামি চুল, থলথলে চেহারা, লিকলিকে শরীর ও তুষার শুভ্র বা সোনালী সৌন্দর্যের মধ্যে। এগুলোর মধ্যে নিশ্চয় কমন কিছু একটা আছে। এই অধ্যায়ের শুরুতে ক্যারাকাসের সুষম ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে আমার কিছুটা সন্দেহ ছিল। তবুও যখনই আমি তাকে দেখেছি, তা সেটা যতই অশ্রাব্য হোক না কেন, আমি নিজেকে একটা ধারণা থেকে মুক্ত করেছি। আর তা হলো, সে ছিল মূলত ওই একই মহিলা। আর এ কারণেই গোগলের মনে হয়েছিল যে, তাকে একটা নাম দিতে হবে।

বিভিন্ন অবয়বের মধ্যে সাধারণ যে গুণাবলীগুলো টিকে থাকে সেগুলো প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা অবশ্য অন্য বিষয়। এটা নিকোলাই ভেসিলেভিচের সৃজনশক্তির চেয়ে কমও নয়, বেশিও নয়। কিন্তু না, তিনি যদি নিজের প্রতি এতটা বিতৃষ্ণ হন বা নিজের কাছ থেকেই এতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তবে সেটা হবে এক অদ্ভূত ব্যাপার। কারণ, ব্যাপারটা পরিস্কার করে বলাই শ্রেয় যে, ক্যারাকাস যেই হোক না কেন, তার উপস্থিতি ছিল গোগলের জন্য বিরক্তিকর, জঘন্য। তবে গোগল এবং আমি কেউই পারিনি ক্যারাকাসের স্বভাব-চরিত্রকে কোনো গ্রহণযোগ্য সূত্রে ফেলতে। যখন আমি সংজ্ঞায়নের কথা বলছি তখন কিন্তু আমি যুক্তিযুক্ত ও সব ব্যাপারে বোধগম্য হওয়ার ব্যাপারটাকেই বুঝাচ্ছি। কিন্তু ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক একটা ব্যাপারকে আমি এড়িয়ে যেতে পারি না।

ক্যারাকাসের এক লজ্জাকর রোগ হয়েছিল। গোগলেরও, যদিও তখন অন্য কোনো নারীর সঙ্গে তাঁর কোনো শারীরিক সম্পর্ক ছিল না। কীভাবে এটা ঘটলো অথবা এই নোংরা অভিযোগটা কোত্থেকে করা হলো সেটা বলার আমি কোনো চেষ্টা করব না। সবচেয়ে বড় কথা হলো-- ঘটনা সত্য। আমার মহান ও অসুখী বন্ধু আমাকে বলল, ‘অতএব, ফোমা পাসকালোভিচ, দেখতেই পাচ্ছেন, ক্যারাকাসের ভেতরে কিসের বসবাস, সিফিলিসের জীবাণু।’

কখনো কখনো অদ্ভূতভাবে নিজেকেই তিনি দোষারোপ করেন। নিজের উপর দোষ চাপাতে তিনি ওস্তাদ। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাত্রা যতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত বা নিকোলাই ভেসিলেভিচের বৈরিতা যতদূর পর্যন্ত গড়ায়, তা বিবেচনায় নিলে বিষয়টা কিন্তু বিপর্যয়কর হয়ে ওঠে। এ রোগের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ও কষ্টকর চিকিৎসা নিতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। তবে পরিস্থিতির দিন দিন অবনতিই ঘটছিল। সত্য ব্যাপারটা হলো যে, মহিলাটার এ রোগ সহজে সারছিল না। গোগল তাঁর স্ত্রীকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে নানা অবয়ব দিয়ে তাঁর মধ্যে রোগ প্রতিরোধক শক্তি তৈরি করার চেষ্টা করে নিজেকে প্রভাবিত করছিলেন। কিন্তু যখন কোনো ফলই পাওয়া গেল না, তখন তিনি এ কাজে ক্ষান্ত দিলেন।

পাঠককে ক্লান্ত করে তুলতে চাই না বলে আমি গল্পটা এবার সংক্ষেপে বলি। আর একটা কারণ হলো আমি যা জানি, তা মনে হচ্ছে ধোঁয়াশা তৈরি করছে। অতএব, করুণ রসে সিক্ত উপসংহারে দ্রুতই পৌঁছা যাক। কূলে এসে তরী না ডুবাই। আর একবার আমি পরিস্কার করে বলতে চাই যে, আমার গল্পের বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তির ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কারণ, আমি ছিলাম ঘটনার চাক্ষুস সাক্ষী।

বছরগুলো গড়াতে লাগল। স্ত্রীর প্রতি নিকোলাই ভেসিলেভিচের বিরাগ মজবুত থেকে মজবুততর হতে লাগল। যদিও ওর প্রতি তাঁর ভালোবাসা কমে যাওয়ার কোনো চিহ্ন প্রকাশ পায়নি। শেষের দিকে ঘৃণা এবং ভালোবাসা একে অপরের মধ্যে এমন ধস্তাধস্তি শুরু করলো যে, তিনি প্রায় ভেঙ্গেই পড়লেন। তাঁর যে অস্থির চোখগুলো স্বাভাবিকভাবেই কথোপকথনের নানান পরিস্থিতিতে মধুর মধুর অভিব্যক্তি প্রকাশ করতো, তা যেন এখন জ্বরাক্রান্ত ভোগা ক্লান্তিতে ভুগছে, যেন কোনো মাদকের প্রভাবাসিক্ত। অদ্ভূত সব আবেগের উদ্ভব ঘটেছে তার মধ্যে, সেই সঙ্গে বোধহীন ভয়। আমার সঙ্গে ক্যারাকাসকে নিয়ে তিনি আরো বেশি বেশি আলোচনা করতে লাগলেন। প্রায়ই তাকে নির্বোধ আর উদ্ভট বলে দোষারোপও করেন। এসব ব্যাপারে আমি অবশ্য তাঁর সঙ্গে তাল মিলাতে পারতাম না, কারণ তাঁর স্ত্রীর ব্যাপারে আমার জানাশোনা ছিল ভাসাভাসা, ঘনিষ্ঠতা ছিল না বললেই চলে। সর্বোপরি, তাঁর তুলনায় আমার বোধশক্তিও ছিল অনেক সীমাবদ্ধ। আমার ব্যক্তিগত ধারণাকে সায় না দিয়েই তাকে দোষারোপের ব্যাপারে নিজেকে সামলে চলতাম।

‘ফোমা প্যাসকালোভিচ,’ দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রায়ই তিনি বলতেন, ‘বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, সে বুড়ি হয়ে যাচ্ছে।’ তারপর অব্যক্তভাবে আলোড়িত হয়ে উনি আমার হাতটা চেপে ধরতেন। তাঁর ব্যাপারটা অবশ্য এ রকমই। ক্যারাকাসের নিঃসঙ্গ আমোদ-প্রমোদের ব্যাপারেও তাঁর অভিযোগ ছিল। প্রকাশ্যেই এর বিরোধীতা করতেন। এমনকি তাঁকে প্রতারিত করার অভিযোগেও অভিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু তিনি যে বিষয়গুলো আমাকে বলেছিলেন সেগুলো এতটাই ঘোলাটে যে, আমি সেগুলো নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারিনি।

যে ব্যাপারটা আমার কাছে নিশ্চিত ঠেকে তা হলো, বুড়ি হোক বা না হোক, শেষের দিকে ক্যারাকাস এক বিরক্তিকর, কপট, কলহপ্রিয় মহিলায় পরিণত হয় এবং ধর্মীয় ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে শুরু করে। আমি সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছি না যে, জীবনের শেষের দিকে গোগলের নৈতিক অবস্থানের ওপর সে প্রভাব ফেলতে পারে। এই অবস্থানটা কার না জানা।

মর্মান্তিক ঘটনার চরম মুহূর্ত এসে হাজির হলো এক রাতে। আমি আর নিকোলাই ভেসিলেভিচ একসঙ্গে তাদের বিয়ের রজতজয়ন্তী উদযাপন করছিলাম। যে শেষ সন্ধ্যাগুলো আমরা একত্রে কাটাতাম এটা ছিল সেগুলোর একটা। বলতেও পারি না আবার বলা উচিতও নয় যে, কী নিয়ে তাঁর সঙ্গীনির সাথে তাঁর মুখ দেখাদেখি বন্ধ রয়েছে। জানি না সেদিন কী ঘটনা ঘটেছিল। আমি বিষয়গুলোর মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখব। পাঠকরা বুঝে নেবেন সেগুলো কী হতে পারে।

সেদিন সন্ধ্যায় নিকোলাই ভেসিলেভিচ অস্বাভাবিক রকমের উত্তেজিত ছিলেন। ক্যারাকাসের প্রতি তাঁর তিক্ততা আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল। তাঁর বিখ্যাত ‘অহংকারের চিতা’ বা পাণ্ডুলিপির স্তুপে ইতোমধ্যে আগুন ধরে গিয়েছিল। আমি বলতে চাই না, এটা তাঁর স্ত্রীর প্ররোচনায় হয়েছিল কি-না। তাঁর মনে অন্য কারণেও আগুন জ্বলছিল। তাঁর শরীরের করুণদশা দেখলেই বোঝা যায় তিনি মাদকসেবী।

বেলিনস্কির ব্যাপারেও কম-বেশি স্বাভাবিকভাবেই তিনি কথা বলতে শুরু করলেন। বেলিনস্কি তাঁর সিলেকটেড করেসপন্ডেসকে কড়াভাবে আক্রমণ করে তাঁকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছেন। এরপর হঠাৎ তাঁর চোখ জলে ছলছল করে উঠল। একটু থেমে বলে উঠলেন, ‘না, না, অনেক হয়েছে; অনেক হয়েছে। আমি আর বরদাস্ত করব না।’ সঙ্গে আরো কিছু অস্ফুট ও এলোমেলো শব্দ উচ্চারণ করলেন। ওগুলোর মানে তিনি বললেন না। মনে হলো, তিনি স্বগোক্তি করলেন। হাত মোচড়ালেন, মাথা নাড়লেন, উদ্বিগ্নতায় চার-পাঁচ কদম হাঁটার পর আবার বসে পড়লেন। যখন প্রাচ্যের রসদে সজ্জিত ঘরে বিকেলবেলা ক্যারাকাস এসে হাজির হলো, তখন তিনি বয়সের ভারে নুব্জ মানুষের মতো আচরণ করতে লাগলেন। ভালো করে বুঝাতে পারলে হয়তো বলতাম, তিনি এক অদ্ভূত রকমের ভীমরতিতে ভুগছেন। উদাহরণ স্বরূপ, তিনি আমাকে কনুই দিয়ে টোকা দিয়ে চোখের ইশারায় মনোযোগ আকর্ষণ করে বোধহীনভাবে বার বার বলেই যাচ্ছিলেন, ‘ওই যে, ফোমা পাসকালোভিচ; ওই যে ও।’ ইতোমধ্যে ক্যারাকাস আমাদের দিকে অবজ্ঞাভরে তাকালো। কিন্তু এই ’মুদ্রাদোষের’ বাইরেও গোগলের মধ্যে প্রবল অনীহার উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারেন। এটা এতটাই প্রবল যে, এখন এটা সহনশীলতার মাত্রা অতিক্রম করেছে। নিশ্চয়... 

একটা নির্দিষ্ট সময় পার হলে নিকোলাই ভেসিলেভিচ সাহস সঞ্চয় করেছেন বলে মনে হলো। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। তবে তাঁর মধ্যে কাঁদুনেপনা নেই। আমার হাতটা ধরে কচলাতে লাগলেন। পায়চারি করতে লাগলেন। বিড় বিড় করে বললেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে! আর পারছি না। এটিকে আর কানে নেওয়া যায় না। এ রকম ব্যাপার আমার ক্ষেত্রে ঘটে কীভাবে? কীভাবে আশা করা যায় যে, একজন মানুষ এটা সবসময় সয়ে যাবে?

প্রচণ্ড রাগে লাফ দিয়ে উঠে পাম্পটা হাতে নিলেন। মনে হলো, এই মাত্র ওর উপস্থিতির কথা তাঁর মনে পড়েছে। হাতে নিয়েই ঝড়ের বেগে ক্যারাকাসের দিকে ধেয়ে গেলেন। পায়ুপথে পাম্পটা সেঁটে দিয়ে ফুলাতে শুরু করলেন... কাঁদলেন। যেন ভূতের আছড় হয়েছে। চিৎকার করে উঠলেন, ‘আহ, আমি তাকে কত ভালোবাসি। আমার বেচারা প্রিয়তমা, আহা, আমি ওকে কত ভালোবাসি! কিন্তু সে তো ফাটতে চলেছে! বেচারা ক্যারাকাস, ঈশ্বরের সবচেয়ে বেশি করুণার পাত্রী! কিন্তু তোমাকে অবশ্যই মরতে হবে।’

ক্যারাকাস ফুলছিল। নিকোলাই ভেসিলেভিচ তখন ঘর্মাক্ত, কান্নাও করছেন। হাওয়া ভরেই চলেছেন। মনে হলো, তাঁকে থামাই। কিন্তু কেন জানি পারলাম না। সাহসে কুলালো না। তার চেহারার বিকৃতি ঘটতে লাগলো। শীঘ্রই দানবাকৃতি ধারণ করলো। তবুও ভীতির কোনো চিহ্ন প্রকাশ পেল না। এ ধরনের ফাজলামোর সঙ্গে সে আগে থেকেই অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু যখন তাঁর ভেতরটা বাতাসে অসহনীয়ভাবে ভরে গেল এবং নিকোলাইয়ের মেজাজ-মর্জিও বুঝতে পারলো, তখন সে এক সহজাত বিস্ময় প্রকাশ করলো। খানিকটা অনুরোধও রাখতে চাইলো। কিন্তু সেই অবজ্ঞার অভিব্যক্তিও সে ইতোমধ্যে হারিয়ে ফেলেছে। সে ভয় পেয়ে গেল। তাঁর দয়া ভিক্ষা চাইলো। কিন্তু এখনো সে তার অত্যাসন্ন পরিণতির কথা বিশ্বাস করতেই পারছিল না। সে তার স্বামীর ভীতিকর ধৃষ্টতা বিশ্বাস করতে পারছিল না। গোগল তার মুখটা দেখতে পাচ্ছিলেন না। পারবেন কীভাবে, তিনি তো তার পেছনের দিকে বসেছিলেন। কিন্তু আমি বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এক চুলও নড়তে পারলাম না। 

অবশেষে অভ্যন্তরীণ চাপ তার মাথার খুলির দুর্বল হাড় ঠেলে বেরিয়ে আসতে শুরু করলো। মুখমণ্ডলে এক অবর্ণনীয় বিকৃতি তৈরি হলো। পেট, উরু, ঠোঁট, স্তন আর নিতম্ব অবিশ্বাস্যরূপে ফুলে উঠল। হঠাৎ যেন সে ঢেকুর তুললো। গোঙ্গানীর সঙ্গে ফোঁস ফোঁস শব্দ করলো। ভেতরের চাপ বৃদ্ধির ফলে হঠাৎ তার গলার ভালভের মধ্যে দিয়ে বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিল। চোখ দুটো প্রচণ্ড রকমের ফুলে গিয়ে কোঠর থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিল। পাঁজরের হাঁড়গুলো ছড়িয়ে পড়লো। ওগুলো বক্ষাস্থি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার জোগাড় হয়ে উঠেছে। এক আস্ত গাধাকে গিলে ফেলা অজগর সাপের মতো তাকে দেখাচ্ছিল। গাধার কথা বললাম? নাহ, ষাঁড় হতে পারে! না, না, হাতিও হতে পারে। এ পর্যায়ে আমার মনে হলো ও মরে গেছে। কিন্তু নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচ ঘামছেন; কান্না করছেন আর বার বার বলছেন, ‘আমার প্রিয়তমা, আমার জানের জান, আমার প্রিয়া!’ কিন্তু তখনো হাওয়া দিয়েই চলেছেন।

হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই বিস্ফোরিত হয়ে সে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো। শরীরের শুধু একটা স্থান নয়, পুরো শরীরটাই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। ছিন্নভিন্ন হয়ে শুন্যে উড়তে লাগল। আকার অনুযায়ী টুকরোগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কোনটা আগে, কোনটা পরে। হ্যাঁ, আকার অনুযায়ী। তার গালের একটা টুকরো ঠোঁটের কিছু অংশসহ তাকের এক কোণে আটকে গিয়ে ঝুলতে লাগল। নিকোলাই ভ্যাসেলেভিচ আমার দিকে পাগলের মতো তাকিয়ে রইলেন। এরপর প্রচণ্ড ক্রোধে সংকল্পচিত্তে আবর্জনাগুলো কুড়াতে শুরু করলেন। ওগুলো ক্যারাকাসেরই সুন্দর ত্বকের অংশ বিশেষ।

 তিনি বিড়বিড় করে বলছেন, ‘বিদায়, ক্যারাকাস! বিদায়! তুমি সত্যিই অনুকল্পনীয় ছিলে!’ এরপর হঠাৎ জোরেশোরে বলে উঠলেন, ‘আগুন! হ্যাঁ, আগুন! তোমাকে অবশ্যই আগুনেই শেষ করব!’ বাম হাতে শরীরে ক্রস এঁকে নিলেন। তারপর ছেঁড়া টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিলেন। এমনকি যেগুলো আসবাবপত্রের সঙ্গে ঝুলছিল সেগুলো নিয়ে সোজা চুলোর আগুনে নিক্ষেপ করলেন। ওখানে ওগুলো ধীরে ধীরে কটু গন্ধ ছড়াতে লাগল। সব রাশিয়ানদের মতো নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচের দামি জিনিসপত্র আগুনে ছুঁড়ে ফেলার বাতিক ছিল।

চোখ মুখ লাল করে, হতাশার অপ্রকাশ্য অভিব্যক্তি ছড়িয়ে, কিন্তু এক অশুভ বিজয়োল্লাসে, তাকিয়ে রইলেন ছিন্নভিন্ন টুকরোগুলোর দিকে। আমার হাতটা চেপে ধরে মোচড়াতে লাগলেন। হঠাৎ যেন তাঁর মনে হলো, তিনি কষ্টদায়ক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। স্বম্বিত ফিরে পেয়ে এক লাফে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

কয়েক সেকেন্ড পরে দরজার ওপাশ থেকে ভাঙ্গা-ভাঙ্গা ও করুণ সুরে বলতে শুরু করলেন, ‘ফোমা পাসকালোভিচ, আমি চাই আপনি আর আমার দিকে না তাকান। আমি যখন ভেতরে আসি, আমি চেয়েছি আপনি আমার দিকে না তাকান।’

আমি জানি না, আমি তাকে কী উত্তর দিয়েছিলাম বা কীভাবে তাঁকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তাঁর পীড়াপীড়িতে আমাকেও প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছিল দেয়ালে মুখ লুকিয়ে রাখার জন্য, আর যখন তিনি বললেন, আমার তাঁকে আশ্বস্ত করা উচিত, তখন আমি মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালাম। যেন শিশুর মতো আচরণ করছিলেন। হঠাৎ দরজাটা প্রচণ্ড বেগে খুলে গেল। নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচ দৌঁড়ে ঘরে ঢুকে ফায়ার প্লেসের কাছে চলে গেলেন।

এখানে আমার দুর্বলতা স্বীকার করছি। যদিও আমি মনে করি বিশেষ পরিস্থিতিতে স্বীকার করা দোষের কিছু নয়। নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচ বলার আগেই চারপাশটা তাকিয়ে দেখলাম। চাহুনিটা সচরাচরের চেয়েও বেশী জোরালো ছিল। মোক্ষম সময়েই তাঁকে হাতে করে কিছু একটা নিয়ে যেতে দেখলাম। হঠাৎ ওটাকে তিনি সোজা আগুনে ছুঁড়ে মারলেন। সেই সময় ওই জিনিসটা যে কী, তা দেখার প্রবল ইচ্ছা আমাকে পেয়ে বসলো। দৌঁড় দিলাম দেখার জন্য। কিন্তু নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচ বাধা দিয়ে আমার আর ফায়ার প্লেসের মাঝখানে দাঁড়ালেন। তারপর আমাকে পেছনের দিকে এত জোরে ধাক্কা দিলেন যে, আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে, তাঁর গায়ে এত শক্তি আছে। ইতোমধ্যে জিনিসটা তো ধোঁয়ার মেঘ উড়িয়ে পুড়তে লাগলো। তিনি শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ প্রদর্শনের পূর্বেই এটি পুড়ে একটা ছাইয়ের স্তুপে পরিণত হলো।

কেন আমি ওটা দেখার পর এতটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলাম তা আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। এই সত্যিকারের গল্পে আমার সামান্যতম সংশয়ের প্রশ্রয় নেয়া উচিত নয়। বড় গল্পকে ছোট বানানো মা থেকে ছা এর জন্মের মতই। সেটা রক্ত মাংসের ছা নয়। সেটা রাবারের পুতুল মাত্র। এটা এমন একটা কিছু যাকে চেহারা দিয়ে বিচার করা হয়, সেটা হতে পারে ক্যারাকাসের বাচ্চা।

আমিও পাগল না-কি? জানি না। তবে আমি এটা জানি যে, ঘটনাটা শুধু পরিস্কারভাবেই নয়, বরং নিজের চোখেও দেখেছি। আমি অবাক হই যে, যখন আমি এই গল্পটা লিখছি তখন নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচ ফিরে এসে ঘরে ঢুকে দাঁত কটমটিয়ে বললেন, ‘ওকেও! ওকেও!’

এই হলো নিকোলাই ভ্যাসিলেভিচের স্ত্রীর ব্যাপারে আমার জানাশোনা। পরবর্তীতে তাঁর কী ঘটেছিল সে ব্যাপারে আমি পরের অধ্যায়ে বলব। ওটা হবে ওঁর জীবনের শেষ অধ্যায়। কিন্তু তাঁর স্ত্রীর ব্যাপারে তাঁর আবেগের ব্যাখ্যা দেয়া বা অন্য যেকোনো কিছুর ব্যাপারে ওর রাগ-অনুরাগের ব্যাখ্যা দেয়া একটা ভিন্ন বিষয়, জটিল বিষয়। যদিও আমি এটার চেষ্টা করেছি এই বইয়ের অন্য অধ্যায়ে। আমি আমার পাঠককে একটু কসরত করতে উপরোধ করব। আমার মনে হয়, আমি সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছি। উন্মোচন করেছি। গোগলের না হতে পারে, তবে অবশ্যই তাঁর স্ত্রীর। এটা করতে গিয়ে আমি পরোক্ষভাবে একটু কল্পনার রং মিশিয়ে দিয়েছি ওই ভিত্তিহীন অভিযোগের মধ্যে যে, নিকোলাই তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন, এমনকি প্রহারও করতেন এ রকম আরো কত কি। বর্তমান লেখকের মতো একজন নব্য-ভদ্র জীবনীকারের উদ্দেশ্য একজন মহান প্রতিভাধরের স্মৃতি রোমন্থন করা ছাড়া আর কি-ই বা হতে পারে?






অনুবাদক
এলহাম হোসেন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন