শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

শ্রাবণী দাশগুপ্ত'এর গল্প : মানুষের গল্প

(এক) 

সাদা খামের কোণে ‘গঙ্গা’, ইংরেজিতে প্রভাসকুমার ঘোষ-- ঘোষ বানান আলাদা করেছে। পদ্ম পড়তে না জানলেও লক্ষ্য তুখোড়। চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বলল, 

দ্যাখেন আপনের চিঠি, না মেশো? কে মরল? আপনজন? 

জা-নিনা। দেখি খুলে। 

“সবিনয়ে নিবেদন, 
আমাদের পরমারাধ্য পিতৃদেব নবজীবনকান্তি লাহিড়ী বৈকাল ৫টা৫৮মিনিটে সজ্ঞানে অমৃতধামে যাত্রা করিয়াছেন। ইত্যাদি.......। ইতি ভাগ্যহীন তিলককুমার লাহিড়ী, পুলককুমার লাহিড়ী।”

সোনারপুরের বাড়ির ঠিকানা লেখা। প্রভাসের জ্যাঠতুতো ভাই রি-ডাইরেক্ট করেছেন। শ্রীরামপুরের চিঠি। প্রভাস নাম তিনটের একটিও চিনতে না পেরে ভুল চিঠি, যাক্‌- ভেবে টেবিলে রাখলেন। চিরকুট-গোছের ভাঁজকরা কাগজ পড়ল কোলে। বাংলাতে লেখা-- ‘শ্রদ্ধেয় কাকাবাবু, আপনি আমাকে চিনবেন না। আপনারা বিডন স্ট্রিটে একসঙ্গে থাকতেন, বাবার কাছে শুনেছিলাম। বাবা আপনাদের প্রিয় নবুদা। বাবা চলে গেলেন। আমাদের ইচ্ছা বাবার জীবনের কিছু মানুষকে একত্র করা। আপনার ঠিকানা বাবার বহু পুরনো খাতায় পেলাম। যদি ওইদিন আমাদের বাসাতে আসেন, সকলে কৃতজ্ঞ থাকব। জানিনা এতবছরে আপনার ঠিকানা বদল হয়েছে কিনা। তাহলে অবশ্য চিঠি পাবার কোনো আশা নেই। চিঠি পৌঁছলে অনুগ্রহ করে জবাব দেবেন। বিনীত তিলক।’ 


প্রিয় মানুষ! নবুদা? এতবড়ো নাম? ধন্দে পড়লেন। সরু পাঁচিলে ঘুমন্ত বেড়াল আড়মোড়া ভেঙে ক্যাটওয়াক করে হেঁটে গেল। কাক মুখে কী নিয়ে উড়ছে। পিছু পিছু আরও কয়েকটা। ক’যুগ যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। গ্র্যাজুয়েশনের রেজাল্টের আগেই রেজিস্ট্রি-বিয়ে সেরে নবুদা সম্ভবত এ-জি বেঙ্গল না কোথায় চাকরি ম্যানেজ করে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে অজ্ঞাতবাসে। পুত্রসন্তান জন্মের খবর কি পাঠিয়েছিল? 

পদ্ম কাজ সেরে বেরল। প্রভাস গেটে তালা লাগিয়ে বারান্দায় চেয়ারে। ভারতী এসময়ে স্নানের ঘরে, দেরি হবে। চারপাশ বছরদশেক আগেও ফাঁকা ছিল। ভাগ-করা প্লটে বাড়িঘর গজায়নি। গাছপালা পুকুর ডোবা ক্রমশ ইঁটের পাঁজাতে ঠেসে যাচ্ছে। শুধু লোহার গ্রিল। জানালার পর্দা। ভেজা জামাকাপড়। এ-সির মেশিন। পায়খানার ডাক্ট। শ্রাবণের শেষ। আনাচকানাচে মেঘ। বৃষ্টি আরো ঢালবে। লাগোয়া পেয়ারাগাছের পাতাদুচার উড়ে তাঁর পায়ের কাছে। সামনের রঙচটা শ্যাওলা দেওয়ালে আশ্চর্যসব অপ্রাকৃত ছবি প্রভাসের নিবিষ্ট দৃষ্টির সামনে। নবজীবনকান্তির জ্যেষ্ঠপুত্র তিলক শ্রাদ্ধে নিমন্ত্রণ করেছে। বাঁশদ্রোনি থেকে শ্রীরামপুর! এ্যাটাকের পরে দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার ক্ষমতা প্রভাসের গেছে। বাঁ-পা, বাঁ-হাত দুর্বল। যাবার ইচ্ছাপ্রকাশ পর্যন্ত ভারতীর অনুমতিসাপেক্ষ। বরং সৌজন্যসূচক শোকজ্ঞাপন ফোনেই—একটা মোবাইল নম্বর পেলেন কার্ডে। রিংটোন বাজছিল। 

হ্যালো প্রভাস ঘোষ বলছি। তিলকবাবুর সঙ্গে কথা বলতে চাই। 

চিঠি পেয়েছিলেন? আমিই তিলক। আপনি এলেন না! আশা করেছিলাম। 

প্রভাস ইতস্তত, সামান্য গলা ঝাড়লেন। রুমালে মুখ মুছলেন। চটচটে ঘাম অল্প গরমেই, অস্বস্তি। কী বলা সমীচীন? 

ইয়ে মানে, তোমাদের কাজ মিটে যাওয়ার বেশ ক’দিন পরে চিঠি এল। তাছাড়া কোথাও আমার যাওয়া সম্ভব হয়না। আমি নবুদা’র আত্মার শান্তি-- 

আসলে আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল। জানার ছিল। আসতে পারবেন না? 

আমি সেভেন্টি-টু, চলাফেরায় অসুবিধে আছে। বরং তুমি একদিন চলে আসতে পার। ঠিকানা বলে দিচ্ছি। 


‘তিনকোণা ছোট্ট টেবিলের আকার। পায়ার জায়গায় চাকাগুলো সবদিকে ঘুরতে পারে। ঠিক মাঝখানে কলম বা পেন্সিল ঢোকে এরকম ছিদ্র। ছুতোর খুঁজে বানিয়ে এনেছিল শিবেনদা। ডিজাইন দিয়েছিল নবুদা। নবুদার মাথায় উদ্ভট চিন্তা ঘোরাফেরা করত, থৈ পেতাম না। আমার চেয়ে বছর দুতিনের কিম্বা আরও বড়ো ছিল। লেখাপড়াতে মন দিতনা। বলেছিল মেডিকেলে চান্স পেয়ে ছেড়ে দিয়েছে। শুনতাম অবস্থাপন্ন পরিবার, শ্রীরামপুরে পৈতৃক জায়গাজমি। উড়নচণ্ডী বলে বাড়ির সঙ্গে বোধহয় সুসম্পর্ক ছিলনা। আমাদের মেসটা কবেকার বাতিল দোতলা। বাইরে নোটিশ টাঙানো বিপজ্জনক বাড়ি-- ভাঙা হইবে। বাড়িওলা অন্য জায়গায় প্রাসাদ হাঁকিয়েছিল। পড়ো বাড়িখানা থেকে ভাড়া ছাড়া কিছুর প্রত্যাশা করত না। আমাদের রাঁধুনি পঞ্চু বাড়িওলার গুপ্তচর ছিল। খোঁজখবর পাচার করত। আমি আর নবুদা একই কামরায় থাকতাম। হয়ত রাত জেগে পরীক্ষার পড়া ঘষটাচ্ছি, নবুদা ফিরল। নিঃশব্দে কাঁধের ঝোলা থেকে কাগজে মোড়া বড়সাইজের কিসের হাড় কিম্বা ডিমের খোলা অথবা লালশালুর কাপড় বের করে, নিজের টিনের বাক্সটার ভেতরে ভরে তালা দিল। জিজ্ঞেস করলে বলত, 

জানতে না চাইলে খুশি হই। একজন তন্ত্রসিদ্ধ লোকের সন্ধান পেয়েছি। শিখছি। 

তাই জানতে চাইতাম না। বলবে না মনে করলে, নবুদার কাছ থেকে উদ্ধার করা অসম্ভব ব্যাপার। আমাদের কেবল অনুমাননির্ভর কল্পনা ছিল।’ 

কচুরিপানার জলাবন ঘেঁটে ক্লান্ত প্রভাস। ডায়েরি-পেন গুছিয়ে রাখলেন। লেখাটেখা অভ্যেস তেমন নেই। ইতস্তত টুকরো-টাকরা। অবসরান্তে অল্পবিস্তর ধর্মগ্রন্থ কিম্বা ভ্রমণকাহিনী, বেড়ানোর শখ মেটানো। ডায়েরিতে অনিয়মিত চারলাইন ভালোলাগা, মন্দলাগা— এইই। আপাতত ভারতী গভীর ঘুমে। ঘণ্টাদুই ভাতঘুম অল্পবয়সের অভ্যাস, বিয়ের পর থেকে। জানালার ফাঁকে অপরিষ্কার আকাশ। ভ্যাপসা থমথমে গুমোট। প্রভাস নিঃশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে শুলেন। হাতদুখানা সটান মাথার ওপরে। ঘুম ভীষণ কম। দীর্ঘজীবনে পুরনোবেলার প্রায় বিস্মৃত অল্পক্ষণ আজ— ছেঁড়া ছেঁড়া। ভারতী নেমন্তন্ন আর চিঠি দুইই পড়েছেন। বলেছেন, 

ঐ সেই কলেজ-লাইফের প্ল্যাঞ্চেট বন্ধু? তোমার কিন্তু যাওয়া নেই। জানিয়ে দিও। প্ল্যাঞ্চেটে ডেকে নাও না--? 

চোখ বুজেও ঘোরঘোর অস্বস্তি। ভারতী ঈষৎ আভাস পেলে ডক্টর দত্তকে ফোনে ডাকবেন। দত্ত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নির্দেশ দেবে-- প্রেশার চেক, ইসিজি, ওষুধ বদল। ঘুমের ওষুধের ডোজ বাড়াবে। প্রভাস বোঝাতে পারবেন না, শারীরিক অসুবিধাবোধ নয়। নিঝুম শেষরাতে ঠাণ্ডাজল দুহাতে কাটিয়ে ডুবসাঁতার— আরামদায়ক নয়। জানালা-দরজার ঢেউতোলা অশরীরী প্রিন্টের দীর্ঘ পর্দাগুলো ফ্যানের হাওয়ায় নাচছে, ফুলছে। হঠাৎ রাগ হল-- এসমস্ত অন্দরসজ্জা না হলেই নয়? কতবার যে বলেছেন, ভারতী গ্রাহ্য করেন না। অগত্যা নিজেকে শুনিয়ে চেঁচালেন, ভয়ের কী আছে? এ্যাঁ? বুজরুকি সব! সন্তর্পণে পাশে দেখলেন-- মহিলার ঘুম ভাঙেনি। 

‘নবুদা পুরুষালি নাহলেও সুদর্শন ছিল মনে পড়ে। উচ্চতা, স্বাস্থ্য, বর্ণ আলাদা করে চোখে পড়ার মতো ছিলনা। একরকমের আকর্ষণ ছিল। ঐটুকু ছাড়া আর কিছু মনে পড়েনা। ঘাড়ের ওপরে ব্যাকব্রাশ চুল, সরু গোঁফ, অল্প দাড়ি-- ভুলিনি। চোখদুটো জ্বলত। অদ্ভুত ক্রিয়াকলাপ সংযুক্ত থাকতে থাকতে ক্রমশ রহস্যময় হয়ে উঠছিল। প্ল্যাঞ্চেটের বিশেষ মেটালিক টেবিলখানা পাতা হত নবুদার বিছানায়। ভালোমতো সেট্‌ হতনা। আত্মবিশ্বাসী নবুদা বলত, 

হতেই হবে। একটা কাঠের সমান টেবিল পেতে হবে, বুঝলে? 

আমার তখন কীই বা সামর্থ্য? শয়ন বেঞ্চির মতো তক্তপোষে, তথৈবচ সতরঞ্চি, বাড়ি থেকে আনা কাঁথাটাথা দিয়ে বিছানাপাতা। যেমন তেমন জংধরা টিনের ট্রাঙ্ক। তিনম্বর সাকরেদ নবুদার বন্ধু শিবেনদা বরং স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে। দেখতে মোটাসোটা, সাধাসিধে, দরাজ হাত। উত্তর কোলকাতারই ছেলে, মেসে থাকত না। নবুদার ক্রিয়াকলাপে অংশ নিত, কিন্তু সম্ভবত বিশ্বাস করত না। মনে আছে আমি সামান্য টাকা দিয়েছিলাম অতিকষ্টে, বাকিটা শিবেনদা আর নবুদা। আমাদের সোনারপুরে গ্রামের বাড়িতে তখন অসুখবিসুখ, অভাব। আমার মুখ চেয়ে বসে আছে সকলে। যাহোক্‌, দুদিনের মধ্যে ব্যবহারোপযোগী কাঁঠালকাঠের জলচৌকি ঘরের কোণে মজুত হল। আমাদের আর কে পায়? প্রায়ই লেখাপড়া শিকেয় তুলে অধিক রাতে তিনজনে বসা শুরু করলাম। মূল মিডিয়া নবুদা। বসার আগে বিড়বিড় করে মন্ত্র আওড়াত। কপালে সিঁদুরের টীকা। শস্তা অগুরুধূপ আর মেঝেতে সরু মোমবাতি জ্বলত। শিখা দুলত। প্রকাণ্ড সমস্ত ছায়া দেওয়াল জুড়ে কাঁপত। জলচৌকিতে রাখার জন্যে সাদা বা রুলটানা কাগজ কলেজস্ট্রিটের কোন্‌ রদ্দিওয়ালার কাছ থেকে নিজে ফ্রিতে জোগাড় করে আনত। ওপরে সেই বিশেষ টেবিল। সকলে চোখ বন্ধ রাখতাম। পেন্সিলে নবুদা আঙ্গুল থাকত। কোণাগুলো আমাদের আলগোছে ছুঁয়ে থাকতে বলত। বারেবারে সাবধান করত, তোমরা কিন্তু চাপ দিওনা। তাহলে সব ভণ্ডুল হয়ে যাবে। 

বিনা প্রশ্নে মেনে নিতাম। মনোসংযোগ করে ধ্যান করতাম। খানিক পরে যন্ত্র চলত, পেন্সিল নড়ে উঠত। কাগজে দাগ পড়ত। 

নবুদা কারো নাম ধরে বলত, 
অমুক এসেছেন? 
কাগজে লেখা হয়ে যেত, এসেছি। কি চাও? 
দেশের এই দুরবস্থা কেন? কী করলে উদ্ধার পাব? 

ফিসফিস করে প্রশ্ন করত নবুদা। গম্ভীর কিছু প্রশ্ন। রবিঠাকুর, শরৎবাবু, মার্ক্স, সুভাষ বোস, গান্ধীজী, বিবেকানন্দ— কাকে না ডাকা হত? বোধহয় আমাদের অর্বাচীনতার সুযোগ নিয়ে এঁরা কাগজের ওপরে কখানা দাগ কেটে অদৃশ্য হতেন। পরে ধাতস্থ হয়ে পাঠোদ্ধার করত, আমাদের পড়ে শোনাত। তারপর নিচে কলতলায় গিয়ে স্নান করে নিজের বিছানায় অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ত। ঘরটা ধূপের উগ্র গন্ধে ছমছম করত। চারপাশে অশরীরী কারা ভীড় করে ফিসফিস কথা বলত। আমি জেগে সারারাত জানালা দিয়ে দেখতাম-- ছায়াছায়া কারা যেন ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ছাদে পায়চারির মসমস শোনা যেত। পরের কয়েকদিন অস্বস্তির মধ্যে কাটত। মায়ের দেওয়া কাগজেমোড়া ঠাকুরের ফুল মাথার নিচে দিয়ে শুতে যেতাম।’ 

লুকিয়ে ফেলেছেন ডায়েরি। ভারতী এই নির্দোষ ডায়েরি-লেখার খবর জানেন। কিন্তু বিস্মৃতির ইতিহাস গোপন রাখছেন প্রভাস। কারন অস্পষ্ট। মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে স্মৃতি-আত্মা-বিভ্রম নামের ঘূর্ণিপাক ধীরেধীরে অতি সক্রিয় হয়ে উঠলে কী হবে, জানেন না। বারবার ফিসফিস করছেন, ভয়ের কী আছে? যত বুজরুকি। 

সকালে ওষুধ-জল দিতে গিয়ে ভারতী বললেন, 

কী হয়েছে তোমার? রাতে ঘুম হচ্ছেনা, তাই না? টের পেয়েছি এপাশওপাশ করেছ কালও। চোখ বসা, লাল! 

প্রভাস খড়কুটো দিয়ে প্রশ্নবানে সাময়িক বাঁধ দিলেন। অবশ্য তিনি ভারতীর সতর্কতায় নিজস্ব দৈহিক নিরাপত্তা বিষয়ে চিন্তামুক্ত। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন, 

আরে কিছু না, নাথিং। ডোন্ট ওয়ারি। 

দেখো, মিথ্যে বলো না যেন! 

‘বি-এ পরীক্ষার অব্যবহিত পরে আমাদের ফনীভূষণ বাথরুমের কড়িকাঠ থেকে গলায় গামছা বেঁধে আত্মহত্যা করল। মেসের নিচের তলায় তার ঘর-লাগোয়া বাথরুম। ফণীভূষণ চক্রবর্তী-- ইন্ট্রোভার্ট নিরীহ মেধাবী উদাসীন। গরীবঘরের ছেলে। তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতাম না। নবুদার সঙ্গে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে অনুমান করতাম। কোনো গুহ্য বিষয় নিয়ে দুজনের চাপা আলোচনা হতে দেখেছি। আমি নিরেট বলে ধরতে পারতাম না। ওরাও বুঝি তাই ভাবত। আভাসে মনে হত, মহিলাসংক্রান্ত এবং বাড়ির সঙ্গে মতান্তর ইত্যাদি নিয়ে কথা। ফণীর রুমমেট ছিল অমিয়। অমিয়কে বারদুয়েক জিজ্ঞেস করেছিলাম মনে পড়ে। পাত্তা দেয়নি। অমিয়র দুনিয়া ফুটবলকেন্দ্রিক। দারুণ খেলত। অন্য কিছু নিয়ে চিন্তাভাবনাও ছিল না। অবকাশে অমিয়, আমি এবং শিবেনদা যে যার বাড়ি গিয়েছিলাম। নবুদাও সম্ভবত মেসে ছিলনা— ঠিক স্মরণ নেই। ফিরে গিয়ে আকস্মিক ঘটনা শুনে আমি হতভম্ব। কী জানি কেন, ভয়ানক অস্বস্তি-- সর্বদা আশেপাশে কে ঘুরছে, কথা বলতে চাইছে। দেখতে পাচ্ছি না। মনের ভ্রম? জানিনা। যাই হোক, দেহমনে অস্বাভাবিক চিন্তা ভর করেছিল। নিজের ছায়া দেখে ভয় পেতাম। মনে হত পাশ থেকে নীরবে কেউ সরে গেল। ক্ষুধা-ঘুমের ওপরে প্রভাব পড়ছিল। ভাবছিলাম আর কিছুদিন বাড়িতে গিয়ে কাটিয়ে আসব। আগের টিউশনিটা ছেড়ে দিয়েছি। দুখানা সদ্য আরম্ভ করেছি, এমতাবস্থায় ছুটি পাওয়া সমস্যা। একটা জাঁতির মাঝখানে আটকে পড়েছিলাম। নবুদা ইতিমধ্যে একদিন জানাল, প্ল্যানচেটে বসবে-- ফণীকে ডাকবে। ঠিক এই আশঙ্কা করছিলাম। আমার অন্তরে প্রবল বাধা-- অথচ নবুদাকে সরাসরি বারন করতে পারছিলাম না। আমতা করে বোধকরি বলেওছিলাম, নবুদা গুরুত্ব দেয়নি। তিনজন না হলে তার কাজ হবেনা। 

সেই বিশেষ রাত পরিষ্কার মনে পড়ে। যোগাড়যন্ত্র গুছিয়ে শান্ত হয়ে বসলাম নবুদার পাশে-- শিবেনদা আর আমি। মধ্যরাতে দরজা এঁটে দিল নবুদা। অশ্রুতস্বরে বলল, ধ্যান কর, ফণীকে ডাক। আর যতক্ষণ আমি না বলব চোখ খুলবে না। 

মনোসংযোগ করতে গিয়ে ভয়ানক শিউরে উঠছিলাম আপাদমস্তক। আগে এমন কখনো হয়নি। বাইরে মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছিল। কপাটভাঙা দড়িবাঁধা জানালার ফাঁক গলে জলীয় বাতাস ঢুকে হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। মোমবাতির ছায়া দপদপ করে সিলিং ছুঁয়ে ফেলছিল। ঘরে অদ্ভুত গন্ধ ঘুরছিল। কিসের বুঝতে পারছিলাম না। থরথর কাঁপছি আর স্থির থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। অনবরত বলছি— ভয়ের কী আছে? যত বুজরুকি! দরজায় যেন ঠুকঠুক আওয়াজ? হঠাৎ অনুভব করলাম সজোরে প্ল্যাঞ্চেট-টেবিল নড়তে শুরু করেছে। আমি নিষেধ ভুলে সভয়ে চোখ খুললাম। আবছায়াতে দেখলাম সামনে দেওয়ালের প্লাস্টার-খসা জায়গাটায় ফণীর উদাস বিষণ্ণ মুখ। মৃত মনিষীদের ছবিতে দেখা মুখ নয়, ভীষণ কাছ থেকে দেখা চেনা মানুষের মুখ। কতদিন আড্ডা দিয়েছি ফুটপাথে দাঁড়িয়ে, চায়ের ভাঁড় শেয়ার করেছি। নবুদা ধীরে প্রশ্ন করল, 

ফণী এসেছ? 

ঘর জুড়ে নিস্তব্ধতা গ্রাস করে বসে আছে। নবুদা সামান্য জোরে আবার প্রশ্ন করল, 
আত্মহত্যা করলে কেন, জানতে চাই! 

পেন্সিল পুর্বের মতো স্থির হয়ে আছে। কিছুক্ষণ সময় দিয়ে নবুদা আরো দুবার সেই এক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল। আচমকা নড়ে উঠল টেবিলখানা। ক্ষিপ্র পেন্সিল দ্রুত ঘষতে লাগল কাগজে। কয়েকমুহূর্ত এইরকম। নবুদা গম্ভীর গলায় বলল, 

বুঝলাম। তার কী ব্যবস্থা করেছ? সে খবর পেয়েছে? 

তরতর করে ঘুরছিল পেন্সিল। নিজের ওপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছিল। ভয় হচ্ছিল জ্ঞান হারিয়ে ফেলব। অসাড় যন্ত্রচালিত আঙুল নবুদার আঙুলের টানে চলছিল। মিনিটখানেক নড়াচড়ার পরে সব থেমে গেল। নবুদা ফিসফিস করল, 

অন্যায় করেছ। এই অবস্থায় সে কোথায় যাবে? দায়িত্ব কে নেবে? 

পেন্সিল অস্থিরভাবে লিখতে লাগল, এবং থেমে গেল। চোখ খুললাম। নবুদার মাথা যথারীতি টেবিলের ওপরে ঢলে পড়ে আছে। শিবেনদা উঠে সুইচ টিপে আলো জ্বালাল। ভোল্টেজ ডাউন হবার দরুন টিমটিমে বাল্ব। অসহ্য লাগছিল। ঝুঁকে দেখি কাগজখানার লেখাগুলো সেদিন কেমন করে জানিনা অন্যদিনের তুলনায় স্পষ্ট। আমিও পড়তে পারছিলাম। 

প্রথম উত্তর ছিল— মনের যন্ত্রণায়... 
দ্বিতীয় উত্তর— জানি না... হয়ত... জানবে... 

তৃতীয় উত্তর এবং হস্তাক্ষর যথেষ্ট দুর্বোধ্য। অনেক চেষ্টা করে পড়লাম— তোমার... ভরসাতে... বাকি... জীবন... ও... আমি... ঋণী... দুজনেই... 

কার কথা, কিসের ঋণ, একবর্ণ বুঝতে পারলাম না। কেন জানিনা সমগ্র ব্যাপারটায় সেইদিন ওই মুহূর্তে দৃঢ় অবিশ্বাস জন্মাল! এর মধ্যে অবধারিত কারচুপি আছে। মনে জোর আনলাম, ঝোঁক দিয়ে অস্বস্তি তাড়ালাম— ভয়ের কী আছে? সমস্ত বুজরুকি!’ 

প্রভাসের কলম তরতর ক্ষীণস্রোতে ঘূণধরা কাঠামো থেকে জীবন তুলে আনার প্রয়াসে। অযাচিত স্মরণ অসুখ। শ্রান্তি ভীষণ। আঙুলের ডগা টনটন করছিল। কলম থামল। খানিক বিশ্রামের পর বাকি অংশ, ভারতীর অগোচরে। 

‘এরপর আর আমাদের বসা হয়নি। আমার ইচ্ছেও ছিলনা। অদ্ভুত বিতৃষ্ণা জন্মেছিল। নবুদাকেও দেখতাম কেমন উৎসাহহীন, চিন্তাগ্রস্ত, অন্যমনস্ক। ব্যস্ততা আর চাপে আমারও দিন কেটে যাচ্ছিল। ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট আসন্ন। লাইব্রেরি যাচ্ছি। একখানা যাহোক চাকরি ভীষণ দরকার, খোঁজ করছি। টিউশনিদুখানা চালিয়ে যাচ্ছি। কিছুতে উৎসাহ পাইনা। ক্লান্ত হয়ে ফিরি রাত সাড়ে ন’টা দশটা। জীবনের দাবী অনেক জোরালো, ভয়টয় চাপা পড়ে যাচ্ছে। কবে যেন পরিশ্রান্ত রাতে অন্ধকার ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে দেখি, আমাদের ঘরের দরজা ভেজানো। ভয় পেলাম, অবাক হলাম। সাধারণত দরজা তালাবন্ধ থাকে, দুটো চাবি আমাদের। নাহলে হাট করে খোলা থাকে। সামান্য ফাঁক করে দেখলাম, নবুদার শতছিন্ন নোংরা বিছানায় বসে আছে একটি মেয়ে। টিমটিমে আলোতে তার উজ্জ্বলতা বোঝা যাচ্ছিল। আঁচলে চোখের জল মুছছিল। নবুদা পাশে দাঁড়িয়ে মেয়েটির কাঁধে-পিঠে হাত বুলিয়ে কথা বলছিল। আমি সাবধানে সরে গেলাম। পা টিপে একতলায় নেমে অজান্তে এসে দাঁড়িয়েছিলাম ফণীভূষণ আর অমিয়র ঘরের সামনে। কেউ টেনে আনল, অথবা নিজে এলাম কে জানে? ঘর তালাবন্ধ রাখা হয়েছিল। অমিয় সেঘরে থাকতে না পেরে অন্যত্র চলে গেছে। কিছুক্ষণ পরে চমকে উঠলাম। দেখি বিদ্যুৎ ঝলকের মতো মেয়েটি ওঘরের সামনে। কয়েকমুহূর্ত নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ মুছছিল। নাকটানার শব্দ পেলাম। কাঁদছে মনে হল। কখন নিঃশব্দে নেমে এসেছিল খেয়াল করিনি। মুখ দেখতে পাইনি, সোনার চুড়ি চিকচিক করে উঠল। হন্তদন্ত হয়ে দরজার বাইরে অন্ধকার গলিতে বেরিয়ে গেল।’ 


(দুই) 

শীত পড়লে তড়িঘড়ি সন্ধ্যে। বিকেল না ফুরোতে আস্তে প্রভাসকে ডেকে তুললেন ভারতী। 

ওঠ। মিনিট পনেরো আগে তোমার সেই নবুদার ছেলে তিলক এসেছে। চা বিস্কিট দিয়েছি। পদ্মকে কার্তিকের দোকানে সিঙারামিষ্টি আনতে পাঠালাম। ভদ্রলোককে বলেছি তোমার শরীর ভালো নয়। 

প্রভাসের জ্বরের গেল ভোগান্তি শীতের মুখেই। ইমিউনিটি প্রায় গেছে। উপরি এন্টিবায়োটিক খাওয়ার দুর্বলতা-- মাথা ঘোরা, মুখের তেতোভাব। চোখমুখ ধুলেন। ভারতী চা-বিস্কিট ড্রইংরুমে দিলেন। তিলক বই দেখছিল। উঠে প্রণাম করল। মুখোমুখি সোফায় প্রভাস। ভারতী বাকসংযমের সঙ্কেত দিয়ে গেলেন অন্দরে। প্রভাস গভীর অভিনিবেশে দেখছিলেন-- পঞ্চাশের ধারেকাছে বয়স। হাতকাটা সোয়েটার-পরা রোগা চেহারা। নির্লিপ্ত চোখ। বেশ ফর্সা। মুণ্ডনের পর গজালেও স্বল্পকেশ। চোয়ালে, মুখের বিন্যাসে বিতৃষ্ণা। প্রভাস অনাবশ্যক সাদৃশ্য খুঁজছিলেন-- সেসময়ের কারো ফোটো নেই। সমুদ্রের ভেজা বালিতে ঢেউয়ের ছাপের অস্পষ্ট আদল ছাড়া খুঁটিনাটি বিলীন। 

তিলক কথা খুঁজছিল, প্রভাসও। একটু কাশলেন, 

বাড়ি চিনতে অসুবিধে হয়নি তো? 

নাহ্‌। আপনি আসতে বলেছিলেন! তবে অনেকখানি দূর। 

ভালো করেছ। দূর ঠিকই। আমার পক্ষে আরো অসুবিধা, বুঝলে কিনা? ফেরা-টেরা--। 

বুঝতে পারছি। গড়িয়ার দিকে আমার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় থাকে। রাতটা ওখানে থেকে যাব, বলা আছে। 

তাহলে ভালো। তোমাদের বাড়ি প্রপার শ্রীরামপুরে? নবুদা করে রেখে গেছেন? 

তিনকাঠা বাবার নামে রেখেছিলেন দাদু, প্রপার্টির অল্প অংশ। বাবা লোন নিয়ে মাথাগোঁজা আস্তানা করেছিলেন। পরে আমরা দুভাই বাড়িয়ে নিয়েছি। 

বেশ বেশ। নবুদা আমার চেয়ে হয়ত বছরদুয়েকের বড়ো! কি হয়েছিল? 

বাবার পঁচাত্তর। ক্যান্সার— লাংসে হয়েছিল। মাসছয়েকের মতো ভুগল। খুব কষ্ট পেল। 

ভেরি স্যাড। আমার কাছে কিছু জানার ছিল, ফোনে বলেছিলে? 

হ্যাঁ। বাবার কলেজজীবন। আসলে ঠাকুর্দা বাবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন নি। এ্যাডাল্ট হবার পর কারন অনুমান করি। বাবা যদিও নিজে কিছু বলেনি কখনো। 

মা জীবিত আছেন? 

না। 

ন’টা নাগাদ উঠল তিলক। প্রভাসের সঙ্গত ইচ্ছেতে ভারতী স্পষ্টত অসম্মত। তিনি প্রতিবাদী নন। একান্ত স্ত্রীনির্ভরতা ছাড়াও তাঁর সহজাত ষষ্ঠেন্দ্রিয়-ক্ষমতা প্রভাস টের পান। শুতে রাত হল। বালিশে মাথা কম্বল গায়ে নিস্তব্ধ নিশি। কাঁচ আর পর্দার ফাঁক থেকে স্ট্রিটলাইটের চৌকিদারি ঘরের কোণে। মশারির বাইরে দলবদ্ধ মশাদের রক্তচোষার সুযোগ না পেয়ে বিদ্রোহী গুণগুণ। তন্দ্রা কেটে গেল। ঠাণ্ডা ঘরখানা আচমকা মর্গ, নিজে কফিনবন্দী শব। দানাদানা ঘাম কপালে। মাথা ঝিমঝিম। রক্তচাপের অস্থিরতা। মশারির চালে নবুদার ভুলে যাওয়া বিদেহী মুখ? এবং আরও অনেকের? আবার অকারণ মানসিক বিকলন! শরীরের জন্য? প্রভাস চিন্তা করছিলেন। তিলক যা বলল, সেই কাহিনিতে ছিটেফোঁটা অন্ধকার নেই। অনন্য আলো। শেষরাতের হিমহিম ছুঁল। ক্রমে শান্ত হলেন। পাশ ফিরলেন, দুর্বল হাত ভারতীর বাহুতে। আধোঘুমে ভারতী অস্ফুটে বললেন, 

ঘুমনোর চেষ্টা কর দেখি। এমনিতেই জ্বরজ্বালায় কাবু হয়েছ। 

প্রভাসের মনে পড়ল, ডায়েরির পৃষ্ঠাগুলো নিয়ে গেছে তিলক। সামান্যই জানা, অসমাপ্ত লেখা। উত্তর না-মেলা ধাঁধাঁ। কে জানে ছেলেটির কিসের সন্ধান! বাবার অন্য বন্ধুদের নাকি খোঁজ পায়নি। সম্ভবত তাদের ঠিকানায় বদল, যেমন বদলায়। 

নবজীবনকান্তি লাহিড়ী বিবাহের পর কর্মস্থান বিহারে গেলেন স্বেচ্ছানির্বাসনে। তিলক বলল-- মায়ের নাম সবিতা সাহা। মামাবাড়ি স্বচ্ছল সোনার বেনে, নবুদার পরিবারে প্রচণ্ড অমতের কারন স্পষ্ট। সমকালীন ওই আপত্তি যে স্বাভাবিক, তিলক বুঝেছিল। প্রভাসের জানা বিয়ের সালতারিখের সঙ্গে তিলকের জন্মের মাসপাঁচেকের তফাৎ। নবুদার রেজিস্ট্রির দিন অনুরোধ সত্বেও তিনি যাননি। সন্দেহের স্লুইসগেট খুলে কালো স্রোতে তণ্বী তরুণীর না-দেখা মুখ। চুড়ির সোনালি ঝিলিক। আঁচলে চোখমোছা ফণীভূষণের বন্ধ দরজায় দাঁড়িয়ে। অনুমানে ভর করে অর্ধশতক পিছিয়ে ফের কনকনে জলে নেমে চোরাগোপ্তা খোঁজ! শ্যাওলা আর পানাভর্তি কুচকুচে জল কাটিয়ে মরেহেজে যাওয়া কাঠামো— নবুদা’র আর ফণীর। গর্হিত, গর্হিত এই চিন্তা! প্রভাসের ভালো লাগছিল না। 

তিলক স্বতঃই বলল, 
জানেন, মা আমার খুব সুন্দরী ছিল মনে পড়ে। চারবছর পরে আমার ভাই জন্মাল। 

ও! বিহারে? রাঁচিতেই? 

হ্যাঁ। এখন ঝারখণ্ড। ওখানে আমাদের বাড়ি আছে। প্রথমে বাবার অফিসের কাছাকাছি একটা জায়গাতে বাড়িভাড়া করে থাকতাম। ভায়ের জন্মের অল্প পরে আমার মায়ের টিবি হয়। 

টিবি? সেকী! চিকিৎসা? তোমরাও বাচ্চা ছিলে সেই সময়ে! 

ওখানে রামকৃষ্ণ মিশনের স্যানিটোরিয়াম আছে। মাকে ভর্তি করল বাবা। যাতায়াতে প্রচুর সমস্যা হত। বাবা কাছাকাছি অল্প জমি কিনে বাড়ি করল। ট্রাইব্যাল এরিয়ার মাইলের পর মাইল অঢেল জমি। জলের দর তখন--। পাঁচইঞ্চি ইঁটের বাড়ি, দেড়খানা ঘর। টালির ছাউনি। কুয়ো। অনেকটা দূরত্ব সাইকেল চালিয়ে বাবাকে অফিস যেতে হত। মাকে অবশ্য বাঁচান গেলনা। আমাদের দুভাই, বাড়ির কাজ, অফিস— একা করতে গিয়ে বাবা হিমশিম খাচ্ছিল। ভাইয়ের যখন তিনবছর, আমাদের দুজনকে নিয়ে শ্রীরামপুরে চলে এল। 

রাঁচির সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হল? বাড়িটা? 

না। নতুন স্টেট হবার পরে অনেক বদলে গেছে রাঁচি। আগের তুলনায় অনেক ডেভেলপড্‌। চেনা যায়না। 

হুঁ, তা শুনেছি। নবুদার প্রসঙ্গে কী বলার ছিল যেন! 

হ্যাঁ, বলছি। আসলে বাড়িটা নিয়ে ভাবছি--। 

তিলক থামল। অনেক কথার বিনিময় হয়েছে। নোনতা আর মিষ্টি খাবারগুলো চিবিয়ে মুখ রুমালে মুছল। প্রভাসের তীব্র কোনো কৌতূহল নয়, তবু জানার বাসনা। নবজীবনকান্তি রামকৃষ্ণ মিশনের কর্মকাণ্ডে? হেঁটে অথবা সাইকেলে রোদ-জলে মালভূমির ধূসর উতার-চড়াও পেরিয়ে গরীব আদিবাসী আতুরসেবা—? শুনতে আশ্চর্য লাগছিল প্রভাসের। স্ত্রীর অসুখ, অসময়ে মৃত্যু এসমস্তর প্রভাব হতে পারে। 

বাবা ওখানে খুব আনন্দে থাকত। অফিস ছুটি থাকলে সাইকেল নিয়ে চলে যেত— নেশার মতো। 

চমৎকার নেশা! 

হ্যাঁ। অন্য কোনো নেশা-টেশা, পান-বিড়ি-সিগারেট... করতে দেখিনি কখনো। অবশ্য কলেজ-লাইফের কথা জানিনা। 

মিশনে দীক্ষা নিয়েছিল? ধর্মের বইটই পড়ত? 

দীক্ষার কথা বলেনি, জানিনা। বই পড়তেও দেখতাম না। শুধু ওই আদিবাসী লোকগুলোর জন্যে কী টান! 

তারপর? তোমরা শ্রীরামপুরে চলে এলে—। নবুদার চাকরি ছেড়ে--? 

ছেড়ে প্রেসে জয়েন করল। মাইনে কম। যাহোক আমরা অন্তত নিয়মে ঢুকলাম। কাছাকাছি স্কুলে ভর্তি হলাম। বাবা কিন্তু ছুটি পেলেই পড়িমরি করে চলে যেত রাঁচিতে-- বছরে কতবার করে। 

এত টান? তোমরা বেশ ছোটো-- একা থাকতে? 

থাকতাম। পাশে কাকাজ্যাঠারা সামান্য খোঁজখবর করত। আসলে আমরা দুভাই প্রায় একলা বড়ো হলাম। 

মনোরম বিচ্যুতি নবুদার। বিচ্যুতি বা কেন? পরোপকারী জিন ছিল নিশ্চয়। নাহলে বছরপঞ্চাশ আগে ফণীভূষণের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে—! যদিও একশভাগ নিশ্চিত হওয়া মুশকিল। তিলকের গলার উপচানো ভারী অভিমান। এলোমেলো শৈশব। আজন্ম যাকে বাবা বলে জেনেছে, প্রাপ্তবয়সে ধন্দে পড়েছিল। বোঝা যায়, ভালোবাসত উদাসীন মানুষটিকে। সত্য জানার ভরসা হয়নি। নিজের মতো বুঝে নিয়েছে। আন্তরিক দুঃখিত হলেন প্রভাস। রিটায়ারমেন্ট নিলেন নবজীবনকান্তি। স্বেচ্ছাবসর-- মুক্ত। বেড়ি নেই, দায় নেই। তিলক সদ্য হাইস্কুলের চাকরিতে, পুলক মামাদের ব্যবসায়। কোনোদিন ওদের গন্তব্য বলে যেতেন না। অবশ্য অধিকাংশ সময়ে ঠিকানা রাঁচির ওই কাঁচা বাসাখানা আর মিশনের কাজ। অপূর্ব রূপান্তর। 

বছরখানেক আগে বাবা রাঁচি গিয়ে থাকল একটানা প্রায় মাসতিনেক। ফোন করে হয়রান আমরা। কোথায় যে চলে যেত--! সেসব জায়গায় মোবাইলের টাওয়ার অবধি নেই। একদিন রাত্তিরে ফোন পেলাম। গলা খসখস করছে। যেন নিঃশ্বাস নিতে কথা বলতে কষ্ট। বললাম— তোমার কী হয়েছে? ঠাণ্ডা লেগেছে? জ্বর নাকি? 

রাঁচিতে নাকি প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়ে শীতে? 

হ্যাঁ। বাবা বলল— তেমন কিছু না। গতকাল সাইকেল থেকে পড়ে গেছি। তুই কি আসতে পারবি? 

ওহো। এবয়সে একা এভাবে চলাফেরা! 

বাবা কিন্তু পাক্কা ফিট্‌ ছিল। কখনো কিছু হতে দেখিনি। তাড়াতাড়ি দুদিনের ছুটি নিয়ে গিয়ে দেখি বাবা শয্যাশায়ী। পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা। ভোলুমুণ্ডা, ওর বৌ সুনেরী দেখাশোনা করত। বলল, লেচ্‌কে ডগদর দিখা। বাবাসাব বহুত বেমার। কী জানি কী ভেবে হাওড়ার ট্রেনে দুটো টিকিট বুক করে গিয়েছিলাম। নিয়ে এলাম বাবাকে। ট্রেনে বসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সুস্থ হলে আবার রেখে আসব। বাবা অদ্ভুতভাবে তাকিয়েছিল আমার দিকে। হয়ত কিছু বুঝতে পেরেছিল, কিছু বলতে চেয়েছিল। আর তো--। 

ছেলেটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রভাসের চোখ ফাঁকা দেওয়ালে। ডিজিটাল দুনিয়ায় অবকাশহীন কল্পনার দরজায় ভারি তালা। ছকবাঁধা কেঠো, সব প্রাক্‌নির্দিষ্ট। বিডনস্ট্রিটের মেসবাড়ি, নবুদা, ফণী, অমিয়রা ধূসর অনস্তিত্বে। প্রভাস জানতে চাইলেন, তারপর? তিলক আলতো দম নিল, 

তারপর কলকাতায় এসে টেস্ট হল। ধরা পড়ল। ডাক্তার বলেও দিলেন যা বলার। ছ’সাত মাসের ডেডলাইন দিলেন। বাবাকে আর চেনা যেতনা প্রায়। গলার আওয়াজ ক্রমশ বসে যাচ্ছিল। মৃত্যুর দিনদশেক আগে তখন বাড়িতে, বরং একটু সুস্থই। সেদিনও ভাবিনি এত তাড়াতাড়ি--। সকালে আমায় ডাকল। পাশে বসলাম। অনেক কথা বলল খুব ধীরে, কষ্ট করে। হয়ত বলার আরো ছিল, পারছিল না। তারপর থেকে কথাই বন্ধ। কবেকার পাতলা খাতা একটা দিল, ভেতরে দুটো ফোটো, একটা মায়ের অল্পবয়সের। মা সত্যি সুন্দর ছিল। আরেকটা-! খাতাটায় আপনার ঠিকানা পেয়েছি। এই দেখুন--। 

দুখানা ছবি প্রভাসের হাতে দিল। চমকে উঠলেন। ঝিরঝির বিদ্যুৎধারা উপশিরায়। চেনা নয়, অচেনাও কী? ছায়াময় ছবি মগজে ঘাই দিল। দ্বিতীয়টি দেখলেন। ব্রহ্মতালু পর্যন্ত কাঁপন! এছবি প্রভাস দেখেছেন, বইয়ের মধ্যে ছাপা ফোটোতে। তিলক ধীরে ধীরে ফেরৎ নিল ছবি। কষ্ট হচ্ছিল তার। নিষ্প্রভ স্বর, 

শ্রীশ্রীঠাকুরের একেবারে শেষ অবস্থার ছবি। আসল। পাওয়া যায়না কোথাও। 

সেকী! তুমি কোথা থেকে? এই ছবি--? 

বাবা দিয়ে গেছে। বলেছিল মিশনে দিয়ে দিতে। 

নবজীবনকান্তি জীবনে সেই শেষবার রাঁচিতে। দুপুরে খাওয়ার পরে দাওয়ায় পাতা খাটিয়ায় বিশ্রাম অবেলার কমজোরি রোদে। আমগাছের ছায়ায় হন্তদন্ত মানুষটি দাঁড়ালেন। আধময়লা সাদা লুঙ্গি আর ফতুয়া। মাথা ন্যাড়া। কাঁধে ঝোলা। জল চাইলেন। ঘরে রাখা ঠেকুয়া কয়েকখানা আর ফলটল যা ছিল- আপ্যায়ন গ্রহন করলেন। ফোটোটা বের করলেন, 

ফোটোটা আপনি যদি রাখেন— আমি ভবঘুরে। কোথায় থাকি ঠিক নেই। আপনি ভক্ত, সাত্বিক সেবক। এই অতি দুষ্প্রাপ্য দুর্মূল্য ছবি আপনার কাছে থাক। কিন্তু হস্তান্তর করবেন না। নিষেধ আছে। 

নবজীবনকান্তি নিলেন পোস্টকার্ড সাইজের ফোটোখানা, বসালেন ঠাকুরাসনে। ফিরে এসে দেখলেন তাঁর অতিথি নেই, যেন উবে গেছেন! অজ্ঞাত, অপরিচিত-- সেখানকার মিশনের কেউ নন। পক্ষকালের মধ্যে নবজীবন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। 

থামল তিলক। অস্বাভাবিক ঘটনা। সত্যি বলছে? অতীন্দ্রিয় ভয় থাবা বাড়াচ্ছিল। তিলক ওই ফোটো তাঁর কাছে কেন এনেছে? কে তিলক? ঠগ-জোচ্চর? কী উদ্দেশ্য? ব্ল্যাকমেইলিং? ওর গল্প মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে কেন শুনছেন? 

বিবর্ণ আতঙ্কিত মুখ লক্ষ্য করে তিলক সামান্য হাসল। বলল, 
ভয় নেই। ফোটো আপনাকে দিতে আসিনি। আমি অলরেডি মঠে কথা বলেছি। ওঁরা বারবার বলেছেন, আসল ফোটোর এই কপিও কোনো গৃহীভক্ত যেন ঘরে না রাখেন। স্বামীজীর নাকি নির্দেশ ছিল। মঠে ফিরিয়ে দেব। আপনাকে শুধু দেখাতে এনেছিলাম। আজকের দিনে এঘটনা হয়ত কাকতালীয়, বিশ্বাসযোগ্য নয়, কিন্তু বাবা যে--। 

তিলক আবার তার মায়ের ছবিটা এগিয়ে দিয়ে সহজ হাসল, 
চিনতেন নাকি আমাদের মাকে? দেখেছিলেন কখনও? 

চারদিকে ঝড়ো হাওয়া। অশরীরী স্মৃতির কাটা খাদ। সত্য কাকে বলে প্রভাস নিজেও জানেন কী? তিনি হ্যাঁ-না কিছু বলতে পারছিলেন না। তিলক অপেক্ষা করল। সতর্ক গলায় বলল, 

বাবা প্ল্যাঞ্চেট করত শুনেছি। আপনি সঙ্গী ছিলেন--। কিছু আভাস দিতে পারেন? 

একটু বসো, আমি আসছি। 

ঠিক আছে। কিন্তু রাত হচ্ছে, আমি উঠব। 

শোবার ঘর থেকে ডায়েরিখানা নিলেন প্রভাস। যত্ন করে মাঝখানের লেখা পাতাগুলো ছিঁড়ে, ভাঁজ করে দিলেন তিলকের হাতে। হাল্কা বাতাসে স্নিগ্ধ আরাম। নবজীবনকান্তি আলোকিত হয়ে উঠেছেন। সকলকে ছাপিয়ে শোকযন্ত্রণাশূন্য ঊর্ধ্বলোকে চলে গেছেন। প্রভাস কল্পনা করতে পারেন না অন্যের ভুলের দায় কাঁধে নিয়ে সারাজীবন! সেই শেষ প্ল্যানচেট তাঁদের-- ঝুঁকি, কারচুপি বা বুজরুকি যাহোক, ছন্নছাড়া নবুদা অন্যমাত্রিক, আলাদা। 

প্রভাসের অদ্ভুত আফশোষ হল, একবার যদি দেখা হত? তিনিও মিশনে দীক্ষিত। জোড়হাতে বিড়বিড় করতে লাগলেন, 

নিত্যং শুদ্ধং নিরাকারং নিরাভাসং নিরঞ্জনম্‌।/নিত্যবোধং চিদানন্দং তস্মৈ শ্রী গুরবে নমঃ।। 

তাঁর খোঁজা শেষ। তিলক অনুসন্ধান করে চলেছে— দীর্ঘপথ ধরে চলবে হয়ত। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন