শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আলব্যের কাম্যু;র বই : প্রথম মানব

গৌতম মিত্র

৫ জানুয়ারি ১৯৬০,আলব্যের কাম্যু ফ্রান্সের পাঁচ নম্বর জাতীয় সড়ক দুর্ঘটায় যখন মারা যান সঙ্গে বহন করছিলেন ১৪৪ পৃষ্ঠার একটি অসমাপ্ত উপন্যাসের পান্ডুলিপি,'ল্য প্রমিয়ের ওম'(প্রথম মানব)।

হঠাৎ মৃত্যু এসে কাম্যুর সেই জীবনের যবনিকা টানল,যাকে তিনি ভাবতেন 'উদ্ভট'।তাছাড়া সেই বাইশ বছর আগে, ডিসেম্বর ১৯৩৮-এর নোটবুকে তো তিনি লিখেই রেখেছিলেন: "Death and a writer's work.Just before dying,he has his last work read over to him."

মৃত্যুর চৌত্রিশ বছর পর,১৯৯৪-এ কাম্যুর মেয়ে কাথরিনের যোগ্য সম্পাদনায় 'প্রথম মানব'(The First Man) উপন্যাসটি প্রকাশিত হতেই চারিদিকে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।কয়েক মাসের মধ্যে উপন্যাসটির এক লক্ষ কপি বিক্রি হয়ে যায়।বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্র-পত্রিকায় সমালোচনার ঝড় ওঠে।উপন্যাসটি প্রকাশের দেড় মাসের মধ্যে 'সোসিয়েতে দে এতুদ কাম্যুজিয়েন' একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে,বিষয়---'প্রথম মানব' পাঠের প্রাথমিক অনুভূতি।উপন্যাসটিকে কেন্দ্র করে জমতে থাকে গবেষণাপত্র।

অনেকে মনে করেন মৃত্যুর কিছুদিন আগে থেকে কাম্যুর প্রেরণার জায়গাটা শুকিয়ে যাচ্ছিল।১৯৫৭-এ সৃষ্টিশীল রচনা 'লেক্সিল এ ল্য রোয়ুম'-এর পর তিনি আর কোনো মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশ করেননি।নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পর থেকে আলজিরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন।রোব্যের গালিমারকে বলেও ছিলেন যে তিনি আর লিখবেন না,শুধু থিয়েটার নিয়ে কাজ করবেন। বামপন্থীদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছিল,'লম রেভোস্তে' প্রকাশের পর সার্ত্রের সঙ্গে মতান্তর তো কিংবদন্তী হয়ে উঠেছিল।পাঁচের দশকে আলজিরিয়ার বিদ্রোহ ফ্রান্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা।ফ্রান্সের কবল থেকে ১৯৬২ তে আলজিরিয়া মুক্ত হওয়ায় সেই সংঘাতের অবসান হয়।

আসলে শৈশব ও যৌবনের দিনগুলি কাম্যুর আলজিরিয়ায় কেটেছে।যখন স্থায়ীভাবে ফ্রান্সে চলে এলেন তখনও বুক পুড়েছে আলজিরিয়ার জন্য।আলজিরিয়ার ভালো-মন্দে তিনি বারবার নিজেকে জড়িয়েছেন।ফ্রন্সের কমিউমিস্টরা এজন্য তাঁকে দেশদ্রোহী আখ্যা অবধি দিয়েছেন।আবার কেউ কেউ 'লেত্রঁজের' উপন্যাসটির মধ্যে জাতিবিদ্বেষের বীজ খুঁজে পেয়েছেন। 

এক অদ্ভুত টানাপোড়েন।এক পরস্পরবিরোধী আততি ও চলৎশক্তি শেষ দিন পর্যন্ত কাম্যুর জীবন ও লিখনকে জড়িয়ে ছিল।দুইটি মহাদেশ, ভূৃৃমধ্যসাগরের এপার আার ওপার, আফ্রিকা ও ইউরোপ, দুইটি দেশ, আলজিরিয়া ও ফ্রান্স, কাম্যুর অস্তিত্বকে তিলতিল করে গড়ে তুলেছে।প্রকৃতিক সৌন্দর্য ও বর্বরতার ইতিহাস, প্রাতিস্বিকতা ও সার্বজনীনতা, ছেলেবেলা ও সাবালকত্ব, সরলতা ও কটিলতা, লিরিসিজম ও মেলাঙ্কলি, একাকীত্ব ও সংহতির দ্বান্দিকতা কাম্যুর সত্তাকে বার বার আলোড়িত করেছে।

কাম্যুর স্ত্রী ফ্রান্সিন যে উপন্যাসটি প্রকাশ করে যাননি তার নেপথ্যে এসব বিষয় নিশ্চয় কাজ করছিল।তাছাড়া তিনি মনে করতেন কাম্যুর যা ধাত এই ধরনের অসমাপ্ত রচনা তিনি নিজে হলে কোনোদিনই প্রকাশের অনুমতি দিতেন না। 'প্রথম মানব' শুধু অসমাপ্ত রচনাই নয়,কিছু অধ্যায় খসড়া পর্যায়ের।জায়গায় জায়গায় নোটস্ ও মন্তব্য, উপন্যাসটিকে পরিমার্যনা করার জন্য।

দুর্ঘটনার পর উদ্ধার করা কাম্যুর কাদামাখা ব্রিফকেসটিতে উপন্যাসটির সঙ্গে পাওয়া যায় একটি নোটবুক যাতে ছিল সম্পূর্ণ উপন্যাসটির পরিকল্পনা।

আর একটি কারণও ছিল।কাম্যুর রচনায় এতদিন মহিলারা ছিলেন অনেকটাই মিথিক্যাল।এই প্রথম ক্যামু ব্যক্তিগত প্রণয়-ঘটিত সম্পর্কের ব্যাপারে সরব।নোটবুকের এক জায়গায় লিখছেন: "J.has four woman at once and therefore leads an empty life." 'প্রথম মানব' উপন্যাসের নায়ক J.বা জাক কোরমেরি বাস্তবে আলব্যের কাম্যু ছাড়া আর কেউ নয়।আর যে চারজন মহিলা কাম্যুর জীবনে এসেছিল--- স্ত্রী ফ্রান্সিস,আবেগপ্রবণ-জেদী-বুদ্ধিমতী স্প্যানিশ অভিনেত্রী মারিয়া কাসারেস,কাম্যুর চেয়ে আাঠারো বছরের ছোটো ফরাসি অভিনেত্রী কাথরিন সেলের এবং তরুণী ডাচ শিল্পী মি।

'প্রথম মানব' প্রকাশিত হলে বিরূপ সমালোচনার ঝড় উঠবে,বামপন্থীরা আবার সক্রিয় হবে,কাম্যুর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে লোকে অপবাদ ছড়াবে,তাছাড়া উপন্যাসটি এতটাই অকাম্যুসুলভ যে কাম্যুর সৃষ্টিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।১৯৭৯-তে কাম্যুর দ্বিতীয় স্ত্রী ফ্রান্সিন কাম্যু মারা যান এসব আশঙ্কা নিয়েই।তবে তিনি একটা বড়ো কাজ করে গিয়েছিলেন।স্বামীর দুর্বোধ্য হাতে লেখা পান্ডুলিপি তিনি টাইপ করে রেখেছিলেন।

মেয়ে ক্যাথরিন যে 'প্রথম মানব' প্রকাশের সময় হিসাবে নব্বই-এর দশক বেছে নিলেন তার আড়ালে কাজ করছিল একটি বিশেষ কারণ।আলজিরিয়ায় যে ন্যাশনাল লিবারেল ফ্রন্টের সঙ্গে একসময় ফ্রান্সের বিরোধ তুঙ্গে ছিল, রাজনৈতিক দশচক্রে ফ্রান্স আজ তাদেরই সখ্যতা চাইছে।আলজিরিয়ার পটভূমিকায় লেখা উপন্যাসটি এসময় তাই প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়াবে।তাছাড়া কাথরিনের মনে হয়েছিল, যেহেতু বাবার পান্ডুলিপি ধ্বংস করার অধিকার তাঁদের নেই, কোনো না কোনো সময় উপন্যাসটি প্রকাশিত হবেই, তার চাইতে নিজের হাতে সম্পাদনা করাই ভালো।

তো কাথরিন সম্পাদনার কাজটি ঠিকঠাক করেছেন।একটি প্রয়োজনীয় ভূমিকা শুধু নয়,প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠায় মূল রচনার নীচে কাম্যুর মন্তব্য বা সংযোজন আর সম্পাদকের টীকা।একটি বর্ণমালা দ্বারা আর অন্যটি সংখা দ্বারা চিহ্নিত।আর শেষে খোলা পৃষ্ঠাগুলো ও নোটবুক।উপন্যাসটি পড়তে পড়তে শিহরণ জাগে,যেন কাম্যুর মৃত্যুর শ্বাস-প্রশ্বাস শুনতে পাই।

একটা নতুন জীবন শুরু করার কথা ভাবছিলেন কাম্যু।সার্জন ড:ওলিভিয়ার মোনোর কাছ থেকে ৯৩,০০,০০০ ফ্রাঁতে লুঁর মার‍্যাঁ অঞ্চলে তিনতলার একটি বাড়ি কিনে ফেললেন।কবি রনে শার মনে হয়েছিল,নোবেল প্রাইজের টাকাটা তবে ব্যবহারযোগ্য হল। লুঁর মার‍্যাঁর গ্রামীণ অঞ্চলের আঙ্গুরখেত কাম্যুকে আলজিরিয়ার স্মৃতি উসকে দিত।পরিচারিকা সুজান জিনোকে বলেছেন: "যখন আমি হাত বাড়াই,অনুভব করি যেন আলজিরিয়া স্পর্শ করে আছি।" মাকে অনুরোধ করছেন,একবার এসে ঘুরে যেতে।

রাজধানী প্যারিস থেকে দূরে এমন একটা পরিবেশে কাম্যু তাঁর 'প্রথম মানব' উপন্যাস লেখা শুরু করেন।১৯৫৯-এর নোটবুকে লিখছেন: " And I must reconstruct a truth after having lived a sort of lie all my life." ১৩ আগস্ট ১৯৫৯-এ লিখছেন : " Absence and painful frustration but my heart is alive,finally alive..." ১৯৫৯-এর সারাটা গ্রীষ্ম জুড়ে কাম্যু তাঁর জীবনের শেষ নায়ক জাক কোরমেরিকে নির্মাণের কাজে ব্যস্ত ছিলেন।এক বছর আগে,১৯৫৮-তে বান্ধবী কাথরিন সেলেরকে লিখছেন : " I'm still not working,but I must say that I feel something working inside me...but I must wait."

১৯৫৯-এ লেখাটি শুরু করলেও 'প্রথম মানব'-এর ভাবনা কাম্যু লালন করেছেন দীর্ঘ ছয় বছর ধরে।আলজিরিয়ার যুদ্ধ শুরু হবার আগে তিনি শার্ল পংক্তকে সমসাময়িক পৃথিবী নিয়ে ফ্রেস্কো লেখার উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা জানাচ্ছেন।আর তা হবে তলস্তয়ের 'যুদ্ধ ও শান্তি'র মতো,তবে তাতে থাকবে কৌতুক,যা 'যুদ্ধ ও শান্তি'তে অনুপস্থিত।ফরাসি সাহিত্যের অধ্যাপক গিওর্গ ব্লাঁকে জানাচ্ছেন 'a pure novel about education'লেখার ভাবনা দ্বারা তিনি এখন আচ্ছন্ন।জঁ-ক্লদ ব্রিভিলকে বলছেন এই প্রথম তিনি উপন্যাসে মহিলাদের কথা বলতে চলেছেন, তারা সব মূখ্য চরিত্র কেননা জীবনেও তারা অপরিহার্য।'First Real Novel'নিয়ে অবশ্য স্ত্রী ফ্রান্সিনের মন্তব্য: "কীভাবে তুমি প্রেম নিয়ে লিখবে,যখন তুমি নিজেই এত অকর্মণ্য?"

চিত্রশিল্পী যেভাবে ফ্রেস্কোর জন্য স্কেচ করে,কাম্যু সেভাবে 'ল্য প্রমিয়ের ওম'-এর জন্য পরিকল্পনা মাফিক কাজ শুরু করলেন।প্রথমিক তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনি উলেদ ফায়েত রওনা দিলেন,যদি সেখানে বাবার কোনো স্মৃতিচিহ্ন পাওয়া যায়।কিন্তু হতাশ হলেন।মায়ের পূর্বপুরুষদের অনেক তথ্য পেলেন, যা ১৮৪৫ থেকে ১৮৭২ সময়কালে বিস্তৃত।পুরোন বন্ধু উরব্যাঁ পোল্পকে কথা প্রসঙ্গে বলছেন: "আমি আমার পরিবার নিয়ে একটি বই লিখছি আর আমি এই কাজে খুব খুশি।"দ্রুত হাতে লেখা প্রথম খসড়ায় কাম্যু কখনও কখনও বাস্তব চরিত্রের নাম বদলাতে ভুলে যাচ্ছেন,ছোটোবেলার জায়গা স্যাঁ-পল হয়ে উঠছে স্যাঁ-অ্যপত।আগস্ট ১৯৫৯-এর মধ্যে তিনি দ্বিতীয় খসড়া লিখতে শুরু করলেন।রোব্যের ম্যলেকে জানাচ্ছেন যে প্রথম খসড়ার অনেক খাতাই তিনি নষ্ট করে ফেলেছেন।

বান্ধবী মিকে লিখছেন: "I have never worked with such dense material,and this afternoon I had the fleeting impression that my characterss had taken on that density and for the first time in the twenty years that I've been searching and working. I have finally arrived at the truth of art." 

১৯৫৯ গ্রীষ্মের শেষে কাম্যুর মনে হল সম্পূর্ণ উপন্যাসটির মাত্র এক তৃতীয়াংশ তিনি শেষ করেছেন।এতটাই মগ্ন থাকতেন লেখায় যে কেউ ফোন করলে কাম্যু নিজেই উত্তর দিতেন: "আমি বাড়ির মালি বলছি, মঁসিয়ে কাম্যু এখন বাড়ি নেই।"

কাম্যুর মৃত্যুর পর তাঁর অপ্রকাশিত রচনা প্রকাশিত হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়।'কাইয়ে'র সাতটি খন্ডের মধ্যে ছয়টিই মৃত্যুর পর প্রকাশিত।প্রথম দিকের উপন্যাস 'লামর অর্হস' প্রকাশিত হয় ১৯৭১-এ।একটি ছোটো গল্পের সংকলন, যার বেশির ভাগটাই অপ্রকাশিত, প্রকাশ পায় ১৯৭৩-এ।'কোম্বা'পত্রিকায় রচনাগুলো সংকলিত হয়।'কালিগুলা'র প্রথম পাঠ গ্রন্থভুক্ত হয়।

তবে 'প্রথম মানব' উপন্যাসটির কথা সব থেকে আলাদা। মৃত্যুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে কাম্যু তাঁর সাতাত্তর বছরের মাকে লিখছেন: "Dear Mama,hope that you will always stay as young and beautiful and that your heart will remain the best in the world..." আর কী আশ্চর্য, 'প্রথম মানব' উপন্যাসটি উৎসর্গ করছেন মাকে: 'তোমাকে যে কখনো এই বই পড়তে পারবে না।" আমাদের চোখ সজল হয়ে ওঠে।

স্টোকে আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত কাম্যুর নিরক্ষর মা কাথরিন এলে সিন্তেস কথা বলতে পারতেন না।আকার-ইঙ্গিতে মনের ভাব ব্যক্ত করতেন।আর মাকে কেন্দ্র করেই 'প্রথম মানব' উপন্যাসটি ডালপালা মেলেছে।

গতানুগতিক জীবন,দুর্দশা ও সৌন্দর্যের প্রতি প্রবল সংরাগ ---এই তিনের মিশেল 'প্রথম মানব'কে অতুলনীয় করেছে।উপন্যাসটিতে আলজিরিয়া ও আলজিরিয়র উপস্থিতি তীব্র ও তাৎপর্যময়: ক্ষণস্থায়ী গোধূলির আলো, ঋতু পরিবর্তন,সোয়ালো পাখির উড়ে যাওয়া,গন্ধবুধুর সরু গিরিখাত, গ্রীষ্মকালীন বর্ণহীন আকাশ।আলজিরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহ নিপুণ শিল্পীর তুলিতে যেন আঁকা হয়েছে।আকাশ দেখতে না পাওয়া গলি,ফেরিওয়ালা ও তাদের পসরা, ফুটপাতের খাওয়ার দোকান,ধার্মিক ও জাত্যাভিমানী মানুষজনের চলাফেরা।

উপন্যাসটি সম্পর্কে কাম্যু তাঁর নোটবুকে সঠিক লিখেছেন: 'heavy with things and flesh'।

"The ritual took place on Sunday afternoon and sometimes on Thursday.The neighborhood movie house was just down tge street from their building and bore the name of a Romantic piet,as did the street alongside it.Before going in,you had to pass an obstacle course of Arab peddlers' stands bearing helter-skelter displays of peanuts,dried salted chick-peas,lupine seeds,barley sugar coated in loud colora,and sticky sourballs." উপন্যাসে এমন বর্ণনাকে প্রুস্তীয় ছাড়া আর কি-ই বা বলা যায়।

'প্রথম মানব'-এর দু'টি অধ্যায়।'রেশার্শ দ্যু পের'(বাবার খোঁজে) ও 'ল্য ফিস'(পুত্র)।প্রথম অধ্যায়ে বাবার খোঁজে নায়ক জাক কোরমেরি সন্তানসম্ভবা স্ত্রীসহ যাত্রা শুরু করে,প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যে বাবার মৃত্যু হয়েছিল।উপন্যাসের প্রতিটি অক্ষরের সাক্ষ্যই বলে দেয় কীভাবে তিনি কাম্যুর বাবা লুসিয়্যাঁ কাম্যু।লুসিয়্যাঁ কাম্যুর জন্ম ১৮৮৫-তে উলেদ-ফায়েত-এ।এক বছর বয়সে মা-বাবা হারানো লুসিয়্যাঁ মানুষ অনাথ আশ্রমে।১৯১০-এ বিয়ে তিন বছরের বড়ো কাথরিন এলেন সিন্তেসের সঙ্গে।আলব্যের কাম্যু দ্বীতিয় সন্তান।জন্ম ৭ নভেম্বর ১৯১৩ মোঁদোভিতে।বাবার খোঁজে এসেছে নায়ক জাক অথচ সম্বল তার খুবই সামান্য।মার‍্যাঁ যুদ্ধে ১১ অক্টোবর ১৯১৪ জার্মান সৈন্যদের হাতে নিহত বাবার একটি সিপিয়া ফটোগ্রাফ শুধু সে জোগাড় করতে পেরেছে।

তবু খুঁজে খঁজে জাক বাবার সমাধিক্ষেত্রে এসে দাঁড়ায়।জাকের মনে হয়, এখন তার বয়স চল্লিশ আর যে এই পাথরের নীচে শুয়ে আছে তার বয়স মাত্র উনতিরিশ,এর অর্থ বাবা তার চেয়ে বয়সে ছোটো।অজান্তে কখন যেন বাবার সঙ্গে তুলনা শুরু হয়ে যায়: "At twentynine,had he himself not been frail, being ailing,tense, stubborn, sensal, dreamy, cynical,and breave?" অনবদ্য এই অনুভূতিমালা।

বাবাকে হরিয়ে জাক দু'জন মানুষের মধ্যে বাবার বিজল্প খুঁজে বেড়াচ্ছে।বাস্তবে তাঁরা কাম্যুর স্কুল শিক্ষক লুই জারম্যাঁ ও লিসের শিক্ষক দার্শনিক জঁ গ্রেনিয়ের।স্কুলের শিক্ষক উপন্যাসের বার্নাড(বাস্তবের জারম্যাঁ) জাককে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা দর্গল্যেসের 'লে ক্রোয়া দ্য বোয়া' পড়তে দেয়। "And on the day at the end of the year when,as they arrived at the end of the book(কাঠের ক্রুশ উপন্যাসটি),M.Bernard read them the death of D.(দানিয়েল,উপন্যাসটির নায়ক) in a subdued voice,when he closed the book in silence,facing his own memories and emotions,then raised his eyes to his silent, overwhelmed class,he saw Jacques in the first row staring at him with his face bathed in tears and shaking." জাকের বাবাকে হারানোর দুঃখ কখন যেন এই গল্পের ভেতরের গল্পে চারিয়ে যায়।

'প্রথম মানব' নামটি আদিরূপাত্মক।এ যেন কাম্যুর আত্মতার অন্বেষণ।বাবার মতো,জাক কোরমেরির মতো, আলজিরিয়ার ইউরোপিয়দের মতো কাম্যুই প্রথম মানব।তাছাড়া আলজিরিয়া তো বিস্মরণের দেশ,যেখানে সবাই প্রথম মানব।

শিকড়হীন,ঐতিহ্যহীন, ইতিহাসবিহীন।লেখক যেন নিজেকেই সজাগ রাখেন: "আমি একজন ভিনদেশীর গল্প বলতে চলেছি।"এ এক ব্যক্তিগত মহান সাগা।যার অনুরণন পাঠক-হৃদয়কে সান্দ্র করে যায়।কিছুই যে সেখানে ব্রাত্য নয়: কৌটায় রাখা কার্তুজের টুকরো যা দিয়ে বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল,দিদিমার বয়স্ক চামড়ার গন্ধ,স্কুল ব্যাগের স্ট্র্যাপ চিবানোর স্বাদ।এ এক গরিব বালকেরও কাহিনী।যার ঘরে গ্যাস নয় অ্যালকোহলের স্টোভ, সংবাদপত্র নেই,কোনে গল্পের বই নেই,এমনকি রেডিও অবধি নেই।আছে একজন কড়া মেজাজের দিদিমা,প্রতিবন্ধী মামা আর হাসিমুখ মা।ভাই অবশ্য আছে যার শব্দভান্ডার ৪০০ থেকে সামান্য বেশি।ছোটো ছোটো বাক্য একেকটা নির্জন দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন,হতাশাগ্রস্ত, অ্যাবসার্ড।কাম্যুর লিখন এভাবেই একদিন যাত্রা শুরু করেছিল।যেমন লেত্রঁজের।'প্রথম মানব'-এ পৌঁছে তা বড়ো বড়ো বাক্য।সংযোগের,সংগীতের, ফ্রেস্কোর।

কাম্যুর কাছে জীবন ও জগতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটির নাম দারিদ্র্য।এক সময় তিনি বলেছিলেন স্বাধীনতা শব্দটি তিনি মার্কসের থেকে শেখেননি,শিখেছেন দারিদ্র্য থেকে।তিনি দারিদ্র্যকে কোনো একরৈখিক অভিজ্ঞতার নিরিখে দেখেননি বরং এমন এক বহুমাত্রিকতায় ধরেছেন যেখানে না-পাওয়া ও অবদমনের অন্ধকারদিকগুলোর কথা বলে দারিদ্র্যকে নিছক রাজনৈতিক ও সামাজিক অসুবিধের জায়গা থেকে দেখার প্রবণতাকে নস্যাৎ করা যায়।

কাম্যুর কাছে মানব অস্তিত্বের একটি প্রধান বিপর্যয় এই দারিদ্র্য। ব্যক্তি ও সমষ্টির মর্যাদা এতে ধ্বংস হয়।যদিও কাম্যু মনে করেন না তিনি দারিদ্র্যের শেষ অবধি দেখেছেন।তবে দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে।'প্রথম মানব'-এর আগে যা কিছু লিখেছেন কাম্যু তা তাঁর দারিদ্র্যকে বাইরে থেকে দেখা। 'প্রথম মানব'-এ 

তিনি দারিদ্র্যের সঙ্গে বসতি পেতেছেন।

যদিও আলজিরিয়ার প্রকৃতি ও জনপদ তাঁকে মাঝে মাঝে নস্টালজিক করে তুলেছে তবু দারিদ্র্যকে বিষয় করে একটি উপন্যাস রচনার জুড়ি বিশ্বসাহিত্যে দুর্লভ। দারিদ্র্য ও সূর্য যেন কাম্যুর কাছে কারুনয়নের দু'টি তারা।অসমাপ্ত ও প্রায় খসড়া পর্যায়ের একটি উপন্যাস থেকে যোগাযোগের এই সূক্ষ্ম এসথেটিকগুলো ছাড়া পাঠকের আর কী-ই বা চাওয়ার থাকতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন