শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

মোস্তাক শরীফ'এর গল্প : স্পর্শ

তুলা মিয়া যখন আটপাড়া এসে পৌঁছাল তখন মিশকালো আকাশে ভ্রুকুটি হানছে নীল বিদ্যুৎ। 

বিশাল একটা জামবাটির মতো মাথার ওপর উপুড় হয়ে আছে আকাশ, হঠাৎ দিগন্তরেখা থেকে লাফিয়ে উঠছে বিদ্যুতের চকিত আঙ্গুল, উপড়ে আনা গাছের শেকড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ছে আকাশের এমাথা-ওমাথা। দূরাগত বজ্রপাতের শব্দ ক্রমশ ঘনিয়ে আসা অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে তুলছে।

ফজরের সময় রওনা দিয়েছে তুলা মিয়া, ইকবালপুর বাজারে এসে আটপাড়ার বাসে চেপেছে সাতটার দিকে। বাস হেলতে দুলতে আটপাড়ার দিকে চলেছে, আর আকাশের রঙ কালো থেকে আরো কালো হয়েছে। বাসের জানালা দিয়ে মাঝেমাঝেই আকাশের দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়েছে তুলা মিয়া। বৃষ্টি যদি এসেই যায় তাহলে বাতাকান্দি যে কীভাবে পৌঁছাবে সে চিন্তা কপালে ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। কাল রাত থেকে পেটের কোনাটায় চিনচিন করছে। সকাল নাগাদ ব্যাথাটা বেড়ে পেট-বুক সব জ্বালা করতে শুরু করেছে। আটপাড়া বাস স্ট্যান্ডের পাশেই একটা ফার্মেসি থেকে দুটো অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট কিনল। একটা মুখে ফেলে যেই রাস্তা পেরোতে গিয়েছে অমনি ঝনঝন করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। ফার্মেসির কার্নিশের নিচে আশ্রয় নিতে না নিতেই ভিজে একশা। 

বৃষ্টি থামল ঝাড়া এক ঘণ্টা পর। রাস্তাভর্তি কাদা। সাবধানে পা ফেলে ফেলে এগোলো তুলা মিয়া। জামে মসজিদের কোনা থেকে বাতাকান্দি-আউলিয়াপুরের সিএনজি ছাড়ে। পেছনে তিনজন আর সামনে ড্রাইভারের দুই পাশে দুইজন নিয়ে তুলা মিয়ার সিএনজি ছাড়ল ন’টার দিকে। তুলা মিয়া বসেছে ড্রাইভারের বামপাশে। রাস্তার অবস্থা করুণ। এখানে ওখানে পিচ উঠে গিয়ে নিচের লাল ইট বেরিয়ে পড়েছে। কোথাওবা বড় বড় গর্ত। পনের-ষোল বছর বয়সী চালক অবশ্য এমনভাবে চালাচ্ছে যেন হাইওয়ে দিয়ে চলছে। মাঝে মাঝেই গর্তে পড়ে লাফিয়ে উঠছে সিএনজি। দু-একবার উপরের রডের সাথে মাথা ঠুকে গেল তুলা মিয়ার। অবশ্য সেসব খেয়াল করার অবস্থায় নেই সে। ফ্যাকাসে চোখে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। 

বাতাকান্দি বাজারের ওপর তুলা মিয়া আরো দুই যাত্রীকে নামিয়ে দিয়ে রাস্তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল সিএনজি। আউলিয়াপুরের জনাতিনেক যাত্রী সংগ্রহ করে ফের ছাড়বে। সকালবেলা বাজারে মানুষজন নেই তেমন একটা। আকাশ এখনও কালো। বাজার থেকে ধনাইখালি নদীর পাড় দিয়ে কাঁচা রাস্তা চলে গেছে সরলরেখার মতো। সকালের ম্লান আলোয় মরা মাছের পিঠের মতো অনড় আর রঙহীন সেই রাস্তা ধরে ক্লান্ত পদক্ষেপে হেঁটে চলল তুলা মিয়া। 

অল্প বয়স থেকেই কুঁজো হয়ে হাঁটার অভ্যাস তুলা মিয়ার। মা বলতেন, ‘আমার পোলা অল্প বয়সেই বুড়া হইয়া গ্যাছে।’ কেন কে জানে, যৌবনের রঙ-রূপ তাকে স্পর্শ করার আগেই প্রৌঢ়ত্বের প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছে তুলা মিয়া। কোনো তরুণীর ভ্রুপল্লবের ডাক তাকে কখনো বিচলিত করেনি, এমনকি তরুণ বা যুবক বয়সেও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে ওঠে কোনো অচেনা রূপসীকে নিয়ে ভুলভাল চিন্তা তাকে পীড়িত করেনি। মায়ের তাগাদায় বাইশ বছর বয়সেই বিয়ে করেছিল তুলা মিয়া। দ্রুত দুটো সন্তান জন্ম দিয়ে তার মতোই অকাল বার্ধক্যকে বরণ করেছে তার স্ত্রী হাজেরা। বাপ-দাদার যেমন ছিল, তুলা মিয়ার কাছেও আশরাফপুর গ্রামটাই তাবৎ পৃথিবী। এর বাইরে রঙ-রস-রহস্য আর জটিলতায় ভরা যে বিপুল বিশ্ব তার প্রতি কোনো আকর্ষণ কখনো বোধ করেনি সে। সকালে ঘুম থেকে উঠে নাকেমুখে কয়েকটা ভাত গুঁজে দিয়ে ক্ষেতে যাওয়া, দুপুর বেলা বাড়িতে ফিরে একটুখানি ভাতঘুম, তারপর আবার ক্ষেতখামারি এবং সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে ভাত খেয়ে ফের ঘুম -- এই চক্রের মধ্যেই নিশ্চিন্তে কাটছিল তুলা মিয়ার দিনগুলো -- আজকের আগ পর্যন্ত। 

বৃষ্টির সম্ভাবনাময় কালো আকাশের নিচে বাতাকান্দি গ্রামের নির্জন রাস্তা ধরে চলতে চলতে তুলা মিয়া অনুভব করল, পেটের ব্যাথাটা একটু মিইয়ে এসেছে। এতক্ষণ থম মেরে থাকা বাতাস হঠাৎ শোঁ শোঁ শব্দে ছুটল তুলা মিয়াকে পাশ কাটিয়ে। দ্রুত পা চালাল সে এবং ঝিম মেরে থাকা বিশাল দীঘি আর কৌতূহলী বকের মতো তার পাশে উবু হয়ে থাকা পাকুড় গাছটাকে পাশ কাটিয়ে পৌঁছে গেল ফাতেমার শ্বশুরবাড়িতে। 

তিনদিকে তিনটি চারচালা টিনের ঘর, তার সামনে উঠান আর সে উঠানে একটা খাটিয়া ঘিরে দু-চারজন মানুষ। তুলা মিয়া নিঃশব্দে গিয়ে খাটিয়ার পাশে দাঁড়াল। ঘরের দাওয়ায় গালে হাত দিয়ে বসে ছিল মাঝবয়সী একজন মানুষ। লোকটা যে তার বেয়াই আজগর আলী প্রথমে বুঝতে পারেনি তুলা মিয়া। ধীর পায়ে দাওয়া থেকে নেমে এল আজগর আলী, থুতনিতে শণের মতো দু-চার গাছা দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘ক্যামন আছেন বেয়াই সাব?’ 

তুলা মিয়া একবার কেবল তাকাল আজগর আলীর দিকে, তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে খাটিয়ার দিকে তাকাল। 

‘কাপড়ডা সরা ইউছুপ,’ পাশে দাঁড়ানো একজনকে বলল আজগর আলী, ‘বেয়াই সাবরে এট্টু মাইয়াডারে দেখতে দে।’ 

কাপড় সরানো হলে মনোযোগ দিয়ে খাটিয়ায় শোয়ানো মানুষটির চেহারাটি দেখে তুলা মিয়া। ফাতেমাই, সন্দেহ নেই। চেহারা দেখে মনে হয় প্রবল ক্লান্তির ঘোরে ঘুমিয়ে আছে সে, যেকোনো সময়ই চোখ খুলে সলজ্জ হেসে বলবে, ‘বাজান, কহন আইলা? আমারে জাগাও নাই ক্যান?’ 

ফাতেমার চেহারা একটু ফ্যাকাসে। ঠোঁটের কোণে একটু কি অভিমানের চিহ্ন? তুলা মিয়া বুঝতে পারে না। সে নির্জীব চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে ফাতেমাকে। 

কে যেন একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়েছে। তুলা মিয়া চেয়ারে বসে। খাটিয়াটি আবার ঢেকে দেয়া হয়েছে সাদা কাপড়ে। তুলা মিয়া খুটিয়ে খুটিয়ে কাপড়টি দেখছে। কাপড়ের নিচের দিকটা মাটিতে লগে আছে, কাদা লাগছে, তুলা মিয়া একবার ভাবল কাউকে বলে কাদা থেকে কাপড়ের প্রান্তটা তুলে দেয় উপরের দিকে, নিজেও করতে পারে কাজটা, কিন্তু ক্লান্ত লাগছে তার। সাপ যেভাবে ধীরে ধীরে তার শিকারকে গেলে ঠিক সেভাবে দুর্মর এক ক্লান্তি যেন তার শরীরটাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। 

‘চেয়ারম্যান সাব আহেন আহেন, বেয়াই সাব আইছে,’ আজগর আলী কাউকে খাতির করে এনে বসায় পাশে। চেয়ারে জাঁকিয়ে বসে বিশালবপু লোকটা তুলা মিয়াকে বলে, ‘আচ্ছালামু আলাইকুম।’ 

তুলা মিয়া মাথা ঝাঁকায়। ‘আমি আবদুল লতিফ। তেলিগাতী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। ঘটনাডা অত্যান্ত করুণ। কী আর করা যাইব কন, হায়াত-মউত আল্লার হাতে।’ 

এরপর আরো কী কী যেন বলে আবদুল লতিফ, প্রথম কয়েকটি কথার পর আর কিছুই কানে যায়নি তুলা মিয়ার। তার সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত সাদা কাপড়ে ঢাকা খাটিয়ার দিকে। এদিকে আরো দু-চারজন মানুষ এসে জুটেছে উঠানে, তার মধ্যে ফাতেমার স্বামী মোজাহেদকেও চোখে পড়ে তুলা মিয়ার। দূর থেকেই সালামের ভঙ্গি করে সে। 

‘মাইয়া মাইনষের শইলে রাগ বেশি,’ আবদুল লতিফের একঘেয়ে কণ্ঠস্বর কানে আসে তুলা মিয়ার। ‘সোয়ামি-ইস্তিরির মধ্যে টুকটাক ঝগড়াঝাটি হইয়াই থাকে, তাই বইলা গলায় দড়ি দেওন! আস্তাগফিরুল্লাহ। কবিরা গুনাহ।’ 

তুলা মিয়া ক্লান্ত চোখে তাকায় চারপাশে। মনে হয়, কেউ যদি একগ্লাস পানি দিত। 

‘অহন আপনে কী করতে চাইতাছেন? দাফন এইখানেও হইতে পারে, আপনে চাইলে আপনেগো গেরামেও নিয়া যাইতে পারেন।’ 

‘আমার মাইয়াডারে মাইরা ফালাইছে,’ এতক্ষণে প্রথম কথা বেরিয়ে আসে তুলা মিয়ার মুখ দিয়ে। তবে কণ্ঠস্বরে কোনো অভিযোগ বা অনুযোগ নেই, কেবল ক্লান্তি। 

‘মাইরা ফালাইছে! এইডা কী ধরনের কথা কইলেন! হগলে হুনছে, আফনের মাইয়া কইছে গড়ায় দড়ি দিব। মোজাহেদ পোলাডা খুবই ভালা। সে মারব আফনের মাইয়ারে? এসব কী কথা কন?’ রাগ রাগ বলায় বলল আবদুল লতিফ। 

‘কথায় কথায় আমার মাইয়াডারে মারত। ফোন কইরা কানত মাইয়া। কইত, আমারে লইয়া যাও বাজান। আমারে হ্যারা মাইরা ফালাইব।’ 

‘ঐ মিয়া ফালতু কথা কইবা না,’ দাওয়া থেকে তেড়েফুঁড়ে নেমে আসে আজগর আলী। ‘তোমার মাইয়ারে মারমু ক্যান আমরা? আমার মোজাহেদের মতো পোলা আর আছে এই গেরামে? কোনোদিন একটা ফুলের টোকা দিছে তোমার মাইয়ারে?’ 

আজগর আলীর হিংস্র চেহারার সামনে চুপসে যায় তুলা মিয়া। মাথা নিচু করে বসে থাকে। 

‘রাগারাগি কইরা লাভ নাই,’ নরম গলায় বলে আবদুল লতিফ। ‘আফনে আফনের সন্তান হারাইছেন, এইসময় মাথা ঠিক থাকনেরও কথা না। আমার কথা হইল, যা হইবার তো হইয়াই গ্যাছে। যদি চান লাশ লইয়া চইলা যাইতে পারেন, গাড়িঘোড়ার ব্যবস্থা আমরা করমু। আর যদি এই গেরামেই দাফন করতে চান হেইডাও কোনো সমইস্যা না।’ 

‘আমার মাইয়াডা, বড় নরম মনের আছিল আমার মাইয়া,’ অনেকটা স্বগতোক্তির মতো বলে তুলা মিয়া। ‘ঝগড়া-ফ্যাসাদ এইসবের মইদ্যে কোনোদিন ছিল না। হেই মাইয়া গলায় দড়ি দিব? চেয়ারম্যান সাব,’ আবদুল লতিফের হাত দুটো আঁকড়ে ধরে সে, ‘আফনে মানি মানুষ। আফনের কাছে বিচার দিলাম। আমার মাইয়াডারে মাইরা ফেলাইছে হ্যারা। পরশু রাইতেও মাইয়া মায়েরে ফোন কইরা কইছে, মা আব্বারে কও আমারে লইয়া যাইতে ... চেয়ারম্যান সাব...’ ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে তুলা মিয়া। 

‘মুরুব্বি, শান্ত হন,’ আবদুল লতিফ বলে, ‘কইলামইতো, যা হইবার হইয়া গেছে। রাগের মাথায় মাইয়া একটা কাম কইরা ফালাইছে, এখন আমরা বুঝদার মানুষরাও যদি অবুঝের মতো কাম করি...’ 

চেয়ারম্যানের হাত ছেড়ে দেয় তুলা মিয়া। এদিক ওদিক তাকায়। চারপাশ ঘিরে দাঁড়ানো মানুষগুলো নির্নিমেষ চোখে দেখছে তাকে। সে দৃষ্টিতে সহানুভূতি আছে, তবে তার সঙ্গে জড়াজড়ি করে আছে একধরনের নির্বিকারত্ব। আগ্রহোদ্দীপক কোনো দৃশ্য দেখলে দল বেঁধে মানুষ যেভাবে তামাশা দেখে সেভাবেই তাকে দেখছে সবাই। মনের ভেতর তীব্র একটা রাগ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায় তুলা মিয়ার। জোর করে সেটাকে দমায় সে। কী হবে রাগ করে? কার ওপর রাগ করবে! 

‘একটা কিছুর ব্যবস্তা করেন। মাইয়ারে লইয়া যাইমু।’ 

‘এইতো বুঝদারের মতো কথা,’ আবদুল লতিফের কণ্ঠে স্বস্তি। মুহূর্তেই ব্যস্তসমস্ত হয়ে ওঠে সবাই। আধঘন্টার মধ্যেই লক্করমার্কা একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়ায় বাড়ির সামনে। ধরাধরি করে ফাতেমার লাশ তোলা হয় অ্যাম্বুলেন্সে। তুলা মিয়া মেয়ের সাথে উঠে বসে পেছনে। চেয়ারম্যান আবদুল লতিফের ইশারায় আজগর আলী অ্যাম্বুলেন্স চালকের পকেটে পাঁচশ টাকার চারটা নোট ঢুকিয়ে দেয়। তারপর ফাতেমা আর তুলা মিয়াকে নিয়ে হেলেদুলে রওনা দেয় অ্যাম্বুলেন্স। আর তখনই প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ে কোথাও এবং ঝরঝর করে ঝরতে থাকে শ্রাবণের বৃষ্টি। 
নিশ্চয়ই প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল তুলা মিয়া, ঝিমুনিমতো এসে গিয়েছিল তার। হঠাৎ একটা ঝাঁকি খেয়ে ঘুম ভেঙে যায় এবং সে খেয়াল করে গোঁ গোঁ করে গ্রামের রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে অ্যাম্বুলেন্সটা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় সে। সমানে ঝরে পড়ছে বৃষ্টি। অ্যাম্বুলেন্সের ছাদে টপটপ শব্দ হচ্ছে। পাশ থেকেও ঘাই মারছে বৃষ্টির ফোঁটা। আবার ঝিমুনি এসে যায় তুলা মিয়ার, এবং সেই ঝিমুনির মধ্যেই স্পষ্টভাবেই কণ্ঠস্বরটা শুনতে পায় সে -- ‘বাজান, এমনে এমনে ছাইড়া দিলা অমানুষগুলারে?’ 

ধড়মড় করে উঠে বসে তুলা মিয়া। চোখ বড় বড় করে তাকায় সাদা কাপড়ে ঢাকা খাটিয়াটার দিকে। একটা পাশ সরে গেছে খাটিয়ার, আর সেখান দিয়ে ফাতেমার মুখের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। 

অবিশ্বাসে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া চোখে তাকিয়ে আছে তুলা মিয়া। সরে যাওয়া কাপড়ের ফাঁক থেকে আবার ভেসে এল ফাতেমার কণ্ঠস্বর, ‘বাজান, হুনতাছ আমি কি কইছি?’ 

‘ফা -- ফাতেমা, তুই?’ 

‘হ, কাপড়ডা এট্টু সরাইবা?’ 

কাঁপা কাঁপা হাতে কাপড়টা সরায় তুলা মিয়া, ঐ তো ফাতেমা। ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চেহারায় সামান্য ক্লান্তির ছাপ, এছাড়া আর সবই স্বাভাবিক। যেন বিছানায় শুয়ে বাবার সাথে কথা বলছে। 

‘ফাতেমা, তুই ... বাঁইচা আছস?’ 

‘বাঁইচা থাকলে এইভাবে হুইয়া থাকতাম?’ ফাতেমার গলায় বিদ্রুপ আর বিরক্তি মেশানো। ‘তোমার জামাই আর হ্যার মায়ে-বাপে মিল্লা মাইরা ফালাইছে আমারে।’ 

‘তু ... তুই কথা কইতাছস ক্যামনে?’ 

‘হেইডা তোমার জাননের দরকার নাই। আমি জিগাইতেছিলাম, এমনে এমন ছাইড়া দিলা অমানুষগুলারে?’ 

‘হ্যারা যে কইল তুই গলায় দড়ি দিছস?’ 

‘হ্যারা তো কইবই? তুমি না আমার বাপ? আমারে চিন না তুমি? আমি গলায় দড়ি দেওনের মাইয়া?’ 

‘তাইলে ... তাইলে কী অইছিল?’ 

‘কী আর অইব? মাইরা ফালাইছে আমারে।’ 

‘ক্ক্যা ... ক্যামনে?’ 

‘তোমার জামাইরে চিন না তুমি? হ্যায় একটা মানুষ? বিয়ার পর একদিনও শান্তি দিছে আমারে? উঠতে বসতে ফকিন্নির মাইয়া কইয়া গালাগালি। মাইর খাইয়া কতবার তোমাগো কাছে ছুইটা গেছি কওতো।’ 

তুলা মিয়া নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে মেয়ের দিকে। গল্প করার ভঙ্গিতে কথা বলছে ফাতেমা। কোনো জড়তা নেই কণ্ঠে, নেই কোনো অস্বাভাবিকতা। গড়গড় করে বলে চলল সে, ‘ব্যবসার কথা কইয়া কয়বার ট্যাকা নিছে কওতো? টাকা আইতে দেরি অইলেই মাইর। তাও মুখ বুইজা সহ্য করছি তোমাগো দিকে তাকাইয়া। আমার প্যাটের পোলাডা নষ্ট অইয়া গেল হ্যার মাইরে। তারপরও চুপ কইরা আছিলাম। কিন্তু বাঁচতে পারলাম কই!’ 

চুপ করে থাকে ফাতেমা। তুলা মিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তাকে ছাড়িয়ে দূরে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে দৃষ্টি। কতক্ষণ এভাবেই তাকিয়ে থাকে ফাতেমা। দেখে মনে হয়, ফেলে আসা জীবনের সমস্ত ক্লেদাক্ত অভিজ্ঞতা মনশ্চক্ষে দেখে নিচ্ছে, দেখতে দেখতে শিউরে উঠছে মাঝেমাঝে। তুলা মিয়া নিষ্পলক চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। মৃত মেয়ের হঠাৎ কথা বলতে শুরু করার যে প্রাথমিক ধাক্কা সেটি কাটিয়ে উঠেছে সে। মৃত মানুষ যে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জীবন্ত মানুষের মতো কথা বলছে, এটা যেন খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। 

‘ব্যাডার চরিত্রডাও খারাপ। গেরামের একটা মহিলার লগে সম্পর্ক। হেই মহিলার স্বামী নাই, দুইডা বাচ্চা আছে। ঘটনাডা জানার পর কান্নাকাটি করলাম। তার পাও ধইরা কইলাম এই সব্বনাশা পথ থেইকা ফিইরা আইতে। হুনল না। উল্টা আরো বেশি কইরা মারল আমারে। ঐ মহিলার কাছেও গেছি আমি আমি। তারও পায়ে ধরছি। মহিলা কয়, তুমি তোমার সোয়ামিরে বশ মানাইতে পার না, আমি কী করতে পারি!’ 

‘মোজাহেদের বাপ-মা? হ্যারা জানত না?’ 

‘হগলে জানত বাজান, কারো জাননের বাকি ছিল না। কিন্তু জাইনা কী লাভ? আমারে কি মানুষ বইলা গন্য করে হ্যারা কেউ? আমার শাশুড়ি হাইসা হাইসা কয় -- ব্যাডা মাইনসের গরমে এট্টু বেশি। সহ্য করতে না পারলে বাপের বাড়ি চইলা যা। তুমি কও বাজান, এসব কথা সহ্য করা যায়?’ অনুযোগের গলায় বলে ফাতেমা। 

তুলা মিয়া স্তব্ধ হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। 

‘তারপর একদিন হাতেনাতে ধরলাম দুইডারে। চাইছিলাম দুইডারে জুতাপিটা কইরা জনমের শাস্তি দিয়া দিই। মহিলাডারে দিলামও দুইডা বাড়ি, তারপর ধরলাম তোমার জামাইরে। তয় ব্যাডা মানুষতো, হ্যার লগে কি আমি পারি? উল্টা চুল ধইরা আমারেই দিল কয়েকটা, তারপর টানতে টানতে নিয়া আইল বাড়ি। বাড়ি আইনা ইচ্ছামতো মারল। হ্যায় একা না, হ্যার বাপে আর মায়েও মারল। মাইরের চোটে বেহুঁশ হইয়া গেলাম আমি, তারপরও খায়েশ মিটল না তোমার জামাইর। রাইতের বেলা আমার গলা চাইপা ধরল। বুঝলাম, আর বাঁচতে দিব না আমারে। পায়ে ধইরা মাফ চাইলাম, কইলাম হ্যার যা ইচ্ছা য্যান করে। কিন্তু লাভ হইল না। গলা টিপ্পা মাইরাই ফালাইল আমারে। তারপর একটা রশির লগে বাইন্ধা ঝুলাইয়া দিল ঘরের আড়ার লগে। ব্যস, খেল খতম। তোমার মাইয়া শ্যাষ!’ এই বলে, কৌতুকের ছলে না প্রবল দুঃখে কে জানে, মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসতে লাগল ফাতেমা। হাসতে হাসতে চোখদুটো বড় বড় হয়ে গেল তার, দেখতে না দেখতে রক্তজবার মতো লাল হয়ে গেল দুই চোখ। যেন ভীষণ হাসির কোনো ব্যাপার ঘটেছে, হাসি আর থামাতেই পারছে না ফাতেমা। ফাতেমার খনখনে গলার হাসি যেন তুলা মিয়ার মস্তিষ্কের মধ্যে লোহার গজালের মতো বিঁধতে লাগল। ‘চুপ কর ফাতেমা!’ সহ্য করতে না পেরে ধমকে উঠল তুলা মিয়া। 

ফাতেমা চুপ করল। বিষাদ ভর করেছে এখন তার চেহারায়। ‘হ, আমারে চুপ কইরা দ্যাওন তো সোজাই! আমিতো জন্মের লাইগাই চুপ কইরা গেছি। দ্যাখলাম তো তোমাগো মুরদ। পারবা মোজাহেদ মিয়ারে চুপ করাইতে? তোমার মাইয়াডারে যে মাইরা আড়ার লগে ঝুলাইয়া দিল, পারলা কিছু করতে?’ ফাতেমার গলায় তীব্র শ্লেষ। তার কঠিন দৃষ্টির সামনে চুপসে গেল তুলা মিয়া। 

‘একদিক দিয়া ভালাই হইল,’ ফাতেমা আত্মগত গলায় বলে। ‘মইরা যাওনের থেইকা শান্তির আর কিছু নাই। কী কও বাজান? মাইর-ধর নাই, উঠতে-বসতে গালি-গালাজ নাই। খালি শান্তি আর শান্তি। এই যে আমি মইরা গেলাম আর তোমরা বাইচ্চা থাকলা, কোনটায় শান্তি কওতো দেহি বাজান?’ তুলা মিয়ার জবাবের অপেক্ষায় না থেকেই জবাবটা দিয়ে দেয় ফাতেমা, ‘মরণই হইল শান্তি। মরনের মইদ্যে যে এত শান্তি আছে হেইডা জানলে আরো আগেই মরতাম আমি। তোমাগো মোজাহেদ মিয়া কোনদিন আমারে মারব হেই অপেক্ষায় থাকতাম না। মরনের পর কোনো কষ্ট থাকে না বাজান। খাওন পরনের কোনো চিন্তাও থাকে না। শইলডায় আর কুনো ওজন থাকে না। সে এক তাজ্জব ঘটনা বাজান।’ 

কতক্ষণ চুপ করে থাকে ফাতেমা, তারপর আচমকা জিজ্ঞেস করে, ‘আমারে কই কবর দিবা?’ 

কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না তুলা মিয়া। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে ঠিক ছোটবেলায় খেলনা বা নতুন জামার জন্য যেভাবে আবদার করত সেই সুরে ফাতেমা বলে, ‘পুকুরের পূবদিকে দাদিজানের লগে আমারে কবর দিও বাজান। কও দিবা!’ 

‘হ দিমু,’ তুলা মিয়া বিড়বিড় করে বলে। 

‘দাদিজান আমারে খুব ভালা পাইত বাজান। দাদিজানের লগে হুইয়া থাকতেও শান্তি। আহা, কতদিন শান্তিমত ঘুমাই নাই... 

হঠাৎ চোখ ফেটে কান্না আসে তুলা মিয়ার। তার ইচ্ছে করে মেয়ের মাথাটাকে বুকে চেপে ধরে হাপুস নয়নে কতক্ষণ কাঁদে। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরতে থাকে তার। অশ্রুসিক্ত ঘোলাটে দৃষ্টির ভেতর দিয়ে ফাতেমার চেহারাটাকে ঝাপসা হয়ে যেতে দেখে সে। ফাতেমার দূরাগত গলা ভেসে আসে, ‘কাইন্দো না বাজান। কাইন্দা কী অইব আর কও।’ 

‘যহন ছোট্ট আছিলাম হেই সময়গুলার কথা মনে পড়ে বাজান,’ ফাতেমার কণ্ঠস্বর শুনে মনে হয় বাজানের সেই ছোট্ট ‘ফাতু’ হয়ে গেছে সে ফের, যখন বাবা কখন বাজার থেকে মিঠাই কিংবা পুতুল নিয়ে ফিরবে সেজন্য অধীর আগ্রহে রাস্তার মোড়ে অপেক্ষা করত সে, কিংবা বাবার কাঁধে চড়ে মেলা দেখতে যেত ইকবালপুরে। ‘জীবনডা অনেক শান্তির আছিল। আরেকবার ছোডবেলার হেই জীবনে যদি ফিইর‌্যা যাইতে পারতাম...’ 

হঠাৎ ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে যায় অ্যাম্বুলেন্স, আর মুহূর্তেই চুপ হয়ে যায় ফাতেমা। ঘরঘর শব্দ করে অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে যায়, ভেতরে মুখ ঢুকিয়ে ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে, ‘মুরুব্বি, ইকবালপুর আইসা পড়ছি, এইবার কোনদিকে?’ 

এখনও ঘোর কাটেনি তুলা মিয়ার। বিহ্বলের মতো তাকিয়ে তাকে সে ড্রাইভারের দিকে। 

‘কইতাছি এইবার কোনদিকে যামু।’ 

‘পূব দিকে ... আর মাইলখানিক...।’ 

ফের বন্ধ হয়ে যায় অ্যাম্বুলেন্সের দরজা, বৃষ্টি স্নাত গ্রামের রাস্তা ধরে কঁকাতে কঁকাতে চলতে থাকে যন্ত্রযানটি। সাদা কাপড়ে ঢাকা খাটিয়ার দিকে তৃষিত দৃষ্টিতে তাকায় তুলা মিয়া। আর কি কথা বলবে ফাতেমা? কাঁপা কাঁপা হাতে কাপড়টি সরায় সে। প্রশান্ত চেহারায় ঘুমিয়ে আছে ফাতেমা। চোখের নিচে কালি, ঠোঁটের কোনাটা সামান্য বেঁকে আছে নিচের দিকে, যেন জগতের সমস্ত কিছুর ওপর তীব্র, বিপুল অভিমানে স্তব্ধ হয়ে আছে সে। হাত বাড়িয়ে মেয়ের কপালটি স্পর্শ করে তুলা মিয়া। ঠান্ডা। মাঘ মাসের সকালে ঘাসের বুকে জমে থাকা শিশিরবিন্দুর চেয়েও ঠান্ডা। 

পাকা রাস্তা ছেড়ে ইট বিছানো উঁচুনিচু পথে চলছে এখন অ্যাম্বুলেন্স। বাইরে ঝিরঝির করে ফের ঝরতে শুরু করেছে বৃষ্টি। মেয়ের হিমশীতল কপাল থেকে আঙ্গুলগুলো সরায় না তুলা মিয়া। সে জানে, আর খুব বেশিক্ষণ মেয়েকে স্পর্শ করে থাকার সুযোগ পাবে না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন