শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

মৌসুমী কাদের'এর গল্প : সৎকার

এক
শৈত্যপ্রবাহের কারণে হাসপাতালের ভাঙা জানালা দিয়ে শো শো করে বাতাস ঢুকছে। বিছানায় শুয়ে বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলো; ‘জীড়েন রস পাওয়া যাবেরে মা? রস খেলে শরীর গরম হয়।’ 

‘খেজুরের রস, বাবা?’ 

‘হ্যা’। 

আমি বললাম; ‘চেষ্টা করে দেখতে পারি, খেতে চাও?’

একটু হালকা হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে বাবা বললো, ‘হ্যা’।
মোবাইল টিপে যোগেন কাকুকে ফোন দিলাম। উনি আমাদের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর থাকেন। বাবার বন্ধু। তাঁর বাগানে ৬০ টা খেজুর গাছ আর বেশ কয়েকটা চন্দন গাছ আছে। যোগেনকাকু গাছগুলোর খুব যত্নআত্তি করেন। রসের ব্যবসাও মন্দ না। কেউ আজকাল তেমন একটা বাগান করতে চায় না। তার উপর বারোটা খেজুর গাছ মিলে এক হাড়ি রসও হয় না। এসব কারণেই কাকুর ছেলেরা পেশা বদল করে অন্য ব্যবসায় নেমেছে। রতন কাকুই ছিলো শেষ গাছি।  যাদু ছিল ওর হাতে পায়ে।  ফুঁ দিয়ে সে তর তর করে গাছে উঠত আর নামতো। আজকাল এই রকম গাছির বড়ই অভাব। নিতাই-রতন-যোগেন তিন বন্ধু ছিল হরে আত্মা। ওরা সকলেই এখন ষাটের কোঠায়। বন্ধুত্ব আগের মতন নেই। তবে যোগাযোগটা আছে। 

বাবার কাছে গল্প শুনেছি, একবার গাছ থেকে পড়ে গিয়ে রতন কাকুর কোমড় ভেঙেছিল। হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল প্রায় এক মাস। যোগেন মন্ডলই চিকিৎসার খরচ যুগিয়েছিল। বাবা আর রতন কাকু গ্রামের একই স্কুলে প্রাইমারী পড়েছে। খবর দিলে সে রস নিয়ে ছুটে আসবে। কিন্তু যোগেন মন্ডল পাক্কা হিসেবী। স্বার্থ ছাড়া সে এক টাকাও খরচ করবে না। 

মোবাইল থেকে যোগেন কাকুকে যখন ফোন দিলাম, তখন উনি হাটে যাবার আগে গ্রামের চৌরাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। গ্রামের মানুষ এখন আর বাজারের চা ছাড়া কাজ শুরু করে না। 

ফোনে চিৎকার করছি, কাকু...কাকু আমি মৃত্তি বলছি, নিতাই মন্ডলের মেয়ে; চিনতে পারছো? 

-হ্যা...হ্যা..পারছি, পারছি....কেমন আছিসরে মা...? 

-আছি, কাকু...বাবা হাসপাতালে, হার্ট এটাক করেছে। খেজুরের রস খেতে চাইছে। এখানেতো যোগাড় করা মুশকিল। তুমি কি পাঠাতে পারবে? 

-কোন হাসপাতালে? 

- হার্ট ইন্সটিউট, আমি তোমাকে ঠিকানাটা টেক্সট করে দিচ্ছি। যত তাড়াতাড়ি পারো, পাঠাও। 

-আচ্ছা মা, চিন্তা করিস না...সব ঠিক হয়ে যাবে... 

যোগেন মনে মনে ভাবে, এক হাড়ি কাঁচা রস ১০০ টাকা। তিনহাড়িতে মোট ২৪ কেজি। জ্বাল দেয়ার পর সেই রসে ২ কেজি গুড় হবে। গুড়ের দাম না হলেও তিনশ থেকে চারশো টাকা। আসল পাটালী লন্ডন, কাতার, সৌদিআরব, এমনকি আমেরিকা পর্যন্ত যায়। চল্লিশ বছর ধরে তাঁর পাটালীর ব্যবসা। এখন গাছ কমে গেছে বলে ব্যবসা সিকেয় উঠেছে। ঢাকায় রস পাঠানোতো আর কম ঝক্কি না। আসা যাওয়ার খরচ আছে। আর তাছাড়া পাঠাবার লোক কই? রতন ইদানিং আঙুলের দাগে দাগে টাকা গুনে। বাজারে দোকানও দিয়েছে একটা চৌরাস্তার মোড়ে। সেটা ছেড়ে কোথাও সে যাবে না। যোগেন তাঁর খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি চুলকায় আর ভাবে। ছেলেপুলেতো একটাও লেখাপড়া করলো না। এমনকি ধান কেটে ফেলা জমিতে যে শীতের সবজি চাষ শুরু হয়েছে তাতেও ওঁদের মন নেই। একসময় নিতাই আর রতনই ছিল সব। ওরা চাষবাসে সাহায্য করত। নিতাই পড়াশুনা করে ঢাকায় চলে গেল। রতন গুড়ের ব্যবসা আর দোকান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। 

এত সব ঝামেলা নিয়ে কি ঢাকা যাওয়া যায়?

দুই
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ বর্ষে পড়ছি। পলিটিক্যাল সায়েন্সে। মা গত হয়েছে অনেক আগে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারী প্রাইমারী শিক্ষক। নাম নিতাই মন্ডল । তাঁর টাকা-পয়সার অভাব সব কালেই ছিল, এখনও আছে। বাবা আর আমি দুজনেই টিউশনি করে বাড়তি রোজগার করতাম। মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিং এর ছোট্ট একটা ফ্লাটে আমাদের বাসা। পাশের পাড়ার অম্বিকা মাসি একবেলা এসে আমাদের বাড়িতে রান্না করে যায়। সেই খেয়ে বাপ-বেটির সংসারটা ভালই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু এর মধ্যে বাবার হার্ট এটাক হওয়াতে বিরাট একটা বিপদ আমাদের ঘাড়ে এসে পড়লো।

সরকারী হাসপাতাল। বাবার বিছানার পাশে আরো পাঁচ ছয়টি বিছানা। প্রতিটি বিছানার চারপাশ জুড়ে চাদর দিয়ে ঢাকবার ব্যবস্থা আছে। দালাল ছাড়া বা উচ্চপদস্থ সরকারী কেউ না হলে কেবিন পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। সাধারণ মানুষ বারান্দাতেই জায়গা পায় না।  অম্বিকা মাসির সাথে হঠাৎই দেখা হলো বারান্দায়। বেশ কয়েকদিন ধরেই সে বাড়িতে আসছিল না। স্বামীর অসুখ। কোনরকমে তোষক পেতে বারান্দায় শুইয়ে রেখেছে তাঁকে, সিট পায়নি, স্যালাইন চলছে। স্বামীর পাশে বসে পানের পাতায় চুন আর খয়ের ঘসছে। তারপর কৌটা থেকে হাকীমপুরী জর্দা আর সুপারী মিশিয়ে পুরো খিলিটা সে মুখে পুরে দিল। আমাকে দেখেই চোখ বড় বড় করে দৌড়ে এলো। ময়মনসিংহের টানে সুরে সুরে জিজ্ঞেস করলো; ...'এইতা কিতা কও? হেই দিন্‌না বালা মানুষটারে দেইক্যা আইলাম...! কিতা আর কইতাম, আমার স্বামীরও শইলড্যা বালা না'...বলে সে মাথা ঘুরিয়ে বারান্দার শেষ প্রান্তে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। 

আমি বললাম, ‘কিছু জানাও নি কেন? কবে আসছো এখানে? কি হইসে উনার?’ 

‘হার্ট এটাক করসেগো মা...’ বলে আচঁল টেনে মুখের ঘাম মুছলো সে। 

পরিবেশটা একটু গুমোট হয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো মাসি। 

আমার অপেক্ষা করার মত অবস্থা ছিল না। বাবার দেখাশোনা করার ছেলেটাকে বাজারে পাঠাতে হবে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে ছেলেটা আঁশহীন গোপালভোগ আম নিয়ে এলো। বাবা সেই আম খুব তৃপ্তি নিয়ে খেলো। অম্বীকা মাসির স্বামীকেও দেয়া হলো। আম খাওয়ার সময় বাবা হাসিখুশীই ছিল। স্কুলের সহকর্মীরা তাঁকে দেখতে আসছে। ঘুরেফিরে অম্বিকা মাসিও বারবার আসছে। পান খাওয়া লাল ঠোটের গোলগাল অম্বিকা মাসিকে দেখলেই বাবার মুখটা ঝলমল করে উঠছে। খাওয়া শেষ হলে বাবা বাথরুমে গেল। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে সাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরে বিছানায় এলো। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘হ্যারে মা...যোগেন কি রস পাঠাচ্ছে’? 

আমি মাথা নেড়ে ‘হ্যা’ বললাম। 

তারপর হঠাৎই বাবার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। ডাক্তার এসে নেবুলাইজার ঠেসে ধরলো নাকের উপর। বাবা কিছুতেই সেটি নিতে চাইছিল না। অস্থির অস্থির করে আমার ডান হাতটা চেপে ধরে থাকল। আমি রাগ হয়ে বললাম, ‘বাবা, ডাক্তার সাহেবের কথা শোনো’। বাবা কিছুই শুনছিলো না। প্রচন্ড রেগে নাক থেকে নেবুলাইজারটা সরিয়ে দিচ্ছিল বার বার। তারপর হঠাৎ লম্বা একটা টান দিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। সেই শেষ। 

আমি বোঝার চেষ্টা করলাম; দমটা আবার ফিরে আসে কিনা। নাকের কাছে হাত রেখে, বুকের মধ্যে মাথা পেতে দেখলাম। ধুক ধুক শব্দটা কি সত্যিই চলে গেল? ঠিক বুঝতেই পারলাম না একটু আগের সেই জীবন্ত মানুষটা কেমন করে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল! বাবা লাশ হয়ে পড়ে রইল বিছানার উপর। থরথর করে কাঁপতে লাগলো আমার শরীর। ডাক্তাররা এসে নাড়ি ধরে তাঁকে মৃত ঘোষনা করলো। 

আমার শরীরের কাঁপুনিটা যেন বেড়ে গেল। ছুটে বারান্দায় গিয়ে দেখি অম্বিকা মাসির স্বামী বিছানায় 
পেশাব করে দেয়াতে সে মহাবিরক্ত হয়ে বিছানার কাপড় ঝাড়ছে। আমার দিকে তাকাবার সময় নেই তার। বাইরে তখন বিকেলের আলো মরে যাচ্ছে। আকাশে লালচে মেঘগুলো সরে যাচ্ছে দূরে। হাসপাতালের বয় এসে বাবাকে লাশঘরে নিয়ে গেল। অন্ধকার তালাবদ্ধ ঘুপচি ঘরে বাবার লাশ পড়ে থাকলো প্রায় ঘন্টাখানেক। ডাক্তারের সার্টিফিকেট হলে তবে আত্বীয়স্বজনের হাতে তাঁকে তুলে দেয়া হবে। এর মধ্যেই অম্বিকা মাসি হাঁপাতে হাঁপাতে এসে আমাদের গ্রামের বাড়ির ঠিকানাটা নিয়ে গেল।


তিন
খুব ভোরেই আমরা লাশ নিয়ে রওনা হোলাম পিরোজপুর, গ্রামের বাড়িতে। একটু পর পর অ্যাম্বুলেন্সের পেঁপু পেঁপু শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠছিল। আত্মীয়স্বজনদের গুমরে ওঠা কান্নার আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিলনা। শীত এখনও জেঁকে বসেনি। কিন্তু ঘন কুয়াশায় ফেরী বন্ধ। এদিকে পেটেও ক্ষুদা। ড্রাইভার আর আমরা কয়েকজন মিলে ঘাটে গরম রুটি, সব্জি আর মিষ্টি দিয়ে নাস্তা সাড়লাম। এম্বুল্যান্সে লাশ শুয়ে আছে। ফেরীঘাট থেকে ওপার যেতে বড়জোর ২০ কি ৩০ মিনিট লাগে। কিন্তু ঘন কুয়াশায় পার খুঁজে পাওয়া না গেলে ঘন্টা দুয়েকও লেগে যেতে পারে। আজ সেরকম কুয়াশা পড়েছে। হিমেল হাওয়ায় ভিজে যাচ্ছে আমার গায়ের চাদর। রাস্তার দুধারে সারি সারি গাছ। ছনের ঢিপি। নদীর উপর দীর্ঘ ফেরীঘাট পেরিয়ে পরবর্তী গন্তব্য। 

ফেরীতে জায়গা নেই। ওজন কমাবার জন্যে লাশ ড্রাইভারের সাথে একা একা গাড়িতে গেল। আমাদের নৌকোতে উঠতে হবে। আমি কয়েকজনকে নিয়ে ছোট্ট একটা ডিঙি নৌকায় উঠলাম। যেতে যেতে দেখলাম ছোট ছোট নৌকায়  করে মাঝিরা তরিতরকারী কাচা শাকসব্জী বিক্রি করছে। বড় বড় মিষ্টি কুমড়া পাশের ডিঙায় ভেসে ভেসে যাচ্ছে। কৌতুহল আঁটকাতে না পেরে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম; 

-কিনবেন না বেঁচবেন? 

-বেচমু, বলেই সে ‘মেয়েমানুষ এত প্রশ্ন করে’ এমন একটা টিটকারীর ভাব করে তাঁকিয়ে রইল। 

নৌকায় ভাজাপোড়াবিক্রির আয়োজনও আছে। গুড়ের পিঠা, ডালের বড়া, চা সব ব্যবস্থাই আছে। 

আমি জিজ্ঞেস করলাম; ‘ও কাকা, খেজুরের রস আছে’? 

উনি আঙুলের ইশারায় দূরের বাগান দেখিয়ে বললেন হুইযে...যোগেন মন্ডলের বাগানে খেঁজুরের রস পাইবেন। ম্যালা রস! 

আমি দূরে যতদূর তাকানো যায় তাকিয়ে দেখি...খেঁজুর বাগান খোঁজার চেষ্টা করি। যোগেন কাকুকে খুঁজে বের করতেই হবে। বাবার শেষ ইচ্ছাটা সে পূরণ করে নি। রস পাঠায় নি। এলাকার সকলেই দেখছি তাঁকে এক নামে চেনে। কিন্তু কি এক অজানা কারণে কেউ তার সাথে মেশে না। 


চার
বেলা প্রায় পড়ে গেছে। অন্তেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। বাড়ির পেছনে খালপাড়ে শ্বশানঘাটে সব ব্যবস্থা শেষ। গ্রামের লোকেরা বাবাকে এমনভাবে সাজিয়ে গুজিয়ে তৈরী করেছে যেন শোকের কোনো ব্যাপারই নেই। যেন উৎসব লেগেছে, এমন ভাব। আত্মীয় স্বজনরা এসে ভিড় জমিয়েছে বাবাকে শেষবারের মতন দেখবে বলে। এঁর মধ্যে যোগেন মন্ডলও এলো। আমি তাঁকে কাছ থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। লোকটা দেখতে অনেকটা সত্যজিৎ রায়ের প্রফেসর শঙ্কু টাইপ। শুধু একটু মোটাসোটা গাট্টা গোট্টা। মাথায় একটা বিশাল টাক। তাঁর হাতে ধরা ছিল এক হাঁড়ি খেজুরের রস। ভীষণ বিষন্ন আর ভারাক্রান্ত দেখাচ্ছে তাঁকে। ধূতি আর পকেটওয়ালা ঘিয়া রঙের ফতুয়া পরে আছে সে। পায়ে প্লাস্টিকের চটি। ক্ষণে ক্ষণে তাঁর বা হাতটা দিয়ে বেজায়গায় ধূতিটাকে পুটুলি করে রাখছে। চেহারাটা বড্ড উসকো খুসকো। দেখে মনে হচ্ছে দুদিন কিছু খায় নি। ঠিক করেছিলাম অনেক কিছু বলবো তাঁকে। ভর্ৎসনা করবো। আবার ভাবলাম, কীইবা হবে এসব বলে। যে চলে গেছে তাঁকে তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। 

শুধু তাঁকে ডেকে বললাম; ‘কাকু, রসের হাঁড়িটা একটু দূরে সরিয়ে রাখো’। 

উনি খুব গম্ভীর মুখে মিনমিন করে বললো, ‘সৎকারে লাগাবো’। 

আমি কোনদিন সরাসরি চিতায় পোড়ানো দেখিনি। মেয়েদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ না দেওয়ার একটা রেওয়াজ আছে এই এলাকায়। অবশ্য অন্য এলাকার কথা আমার জানা নেই। মা, মাসীরাও দেখেছে বলে শুনিনি। তবে বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান রাজনীতিবিদের দেহ যখন চন্দন কাঠে শুইয়ে পোড়ানো হয়েছিল, তখন ইউটিউবে ভিডিওটা দেখেছিলাম। সে কি ভয়াবহ দৃশ্য! লোহার চত্বরে চন্দন কাঠের উপর মাথাটা উপুত করে দিয়ে শরীরটা নিচের দিকে শুইয়ে দেয়া। তারপর দেখলাম, মুখাগ্নীর  পরই এক এক করে হাত পা মুখ সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

বাবার শরীরটা সেই রকম পট পট শব্দ তুলে জ্বলবে, ভাবতেই প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল। 

আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না যে, জীবিত অবস্থায় যোগেন কাকু বাবাকে রস পান করায়নি, এখন একটা লাশ নিয়ে তাঁর এত আদিখ্যেতা কেন?

রাগ সামলাতে পুকুরপাড়ে মুক্ত জায়গায় একটু হাঁটতে গেলাম। মা গত হয়েছেন অনেক আগে। আমি ওঁদের একমাত্র সন্তান। প্রতিবেশী আর আত্মীয়স্বজনেরা বিলাপ করছে, করুক। সেই শব্দ আমার কানে পৌছোচ্ছে না। এরা কেউ জীবিত অবস্থায় বাবার জন্য কিচ্ছু করেনি। এঁসবে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। সবাই বললো, দাহের আগে ঘি মাখিয়ে বাবাকে স্নান করানো হবে। তারপর চন্দনকাঠে পোড়ানো হবে। চন্দন কাঠ শুনে একটু বিস্ময় প্রকাশ করলাম! বাবা কি এতকিছু চেয়েছিলো? তাহলে চন্দন কাঠ কেন? রতন কাকু আমাকে বললো, যোগেন কাকুর খেজুরের বাগানে দুর্লভ কয়েকটা চন্দন গাছ আছে। এই গাছ চুরির বহু চেষ্টা করেছে প্রতিবেশীরা। কিন্তু মন্ডলের কড়া নজর। কিছুদিন আগেই নাকি দুটো গাছ রাতে চোর এসে কেটে দিয়ে গেছে। কিন্তু সময়মত সরাতে পারেনি। সেই গাছ কেটে টুকরো টুকরো করে যোগেন মন্ডল মাচায় তুলে রেখেছে। কিপটা যোগেনের ঘাড় ভেঙে সেই কাঠ নামাবে গ্রামের লোকেরা।

এসবই যোগেনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে এসব টুকটাক কথা শুনে খুবই বিব্রত বোধ করছিলাম। 

লাশ চিতায় স্থাপন করার অপেক্ষায়। 

হঠাৎ দেখি, যোগেন কাকু লাশের কাছে গিয়ে বাবার মুখ বরাবর মাটির হাড়ি থেকে রস ঢালছেন। খেজুরের রস। 

আমি চিৎকার করে উঠলাম...। 

- সর্বনাশ!!!! কাকু............; কি করছো এসব? কি করছো? 

ততক্ষণে রসের হাড়ি শেষ। বাবার মুখটা হা করা খোলা। রস ঢুকেছে মুখের ভেতরে। লোকজন উত্তেজিত হয়ে রেগেমেগে যোগেন মন্ডলকে তার দুহাত শক্ত করে ধরে শ্বশানঘাট থেকে বের করে দিচ্ছে। আমি দেখছি হৈ চৈ পড়ে গেছে চারদিকে। সকলে মিলে যোগেন কাকুকে টেনে টেনে শশ্মানের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। উনি ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাচ্ছেন পশ্চিম দিক বরাবর। 

এর পর পরই হঠাৎ শুনি চিতার আশেপাশে হৈ চৈ! সবাই বলছে লাশ কই? লাশ কই? আমি ভাল করে তাকিয়ে দেখি বাবা নেই। মানে, বাবার লাশ নেই। এবং এর পর পরই লোকজন ভয়ে ছুটে পালাতে শুরু করলো। কে কোনদিক পালাবে তার হিসেব নেই! সে এক অদ্ভূত দৃশ্য বটে। পুরোহিত মন্ত্র পড়া ফেলে দিল একটা লম্বা ভোঁ... দৌড়! আমি এমন ঘটনা শুনেছি যে, সুন্দরবনের জঙ্গলে ছেলের সামনে মায়ের লাশ তুলে নিয়ে যায় বাঘ। কিন্তু এই বাড়ির আশেপাশেতো একটি কাঁকড়া পর্যন্ত নেই! তাহলে? এটা কি করে হলো? 

পাঁচ
গল্পটা এখানেই শেষ করা যেত। 

কিন্তু বাবা কোথায় হারিয়ে গেল সেসব কিছুই না বললে আপনারা হয়ত নিজেদের মত করেই গল্পের শেষটা সাজিয়ে নিতে পারতেন। 

অথবা গল্পটা আরো দুঃক্ষজনক হোতো যদি লিখতাম, আমি দূরে দাঁড়িয়ে প্রস্তুতি দেখছি। পুরোহিত দূরে নির্লিপ্তভাবে চোখ বুঁজে মন্ত্র পড়ে যাচ্ছে। আমি একটা অদ্ভূত দৃশ্য কল্পনায় দেখছি। দাহের সময় আগুনের উত্তাপে দুমড়ে-মুচড়ে লাশটা বার বার শোয়া থেকে উঠে বসছে, আর অস্থির অস্থির করছে। মনে হচ্ছে, বাবা যেন চিৎকার করে বলছে, ‘আমাকে পোড়াসনে, পোড়াসনে!!! মৃত্তি..... ওদের থামা! থামা!’ বাবার হাতে পূজোর লাল সুতোটা তখনও জ্বলছে! আর পুরোহিত বলছে; ‘মৃতদেহ আগুনে সৎকারই উত্তম। আপনি গতকাল মারা গেছেন। এটা মেনে নিন। এসময়ে কথা বলা অন্যায়।’ 

কিন্তু গল্পটাকে আমি শোক বানাতে চাইনি। এটা শোকের গল্প নয়। 

আসল ঘটনা যা হোলো সেটি না বললে গল্পের প্রতি অন্যায় করা হবে। 

খালপাড়ে শশ্বানঘাটে বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর শেষপর্যন্ত বাবাকে পাওয়া গেল আমাদের মূল বাড়ি থেকে একটু দূরে, উঠোনের কোণায়, রান্নাঘরে। শবের কাপড় পড়ে খালি গায়ে বাবা একটা চকিতে বসে আছে। চোখ দুটো ফুলে ঢোল হয়ে আছে। ল্যাপ্টানো ভেজা চুল। আর পাশেই মাটির চুলোয় শলা ঢুকাতে ঢুকাতে ব্যস্তভাবে মাছ ভাজি করছে অম্বিকা মাসি! 

সর্ষে তেলের উপর মাছ ভাজার শ শ শব্দ ছাড়া ঐ ঘরে আর টু শব্দটি নেই।

আগুনের শিখায় জ্বল জ্বল করছে অম্বিকা মাসির লাল সিঁদূরের চুল!

২টি মন্তব্য:

  1. শেষাংশ দারুণ, বিস্ময়কর ও অভিনব। আরেকটু এদিকে সেদিকে কিছু কথা থাকলে পাঠকের মানসিক চাপ বোধ হয় কম হত! বর্ণনা অসাধারণ, পুরো দৃশ্য গুলো দেখা যায়, লাল সিঁদুরের চুল পর্যন্ত!

    উত্তরমুছুন
  2. ভালো লিখেছেন। পড়তে পড়তে ঘোর এসে গিয়েছিল।

    উত্তরমুছুন