শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

অলোক গোস্বামী'এর গল্প : মায়াসরনি

খবরটা কয়েকদিন ধরেই বাতাসে ভাসছিল।অবশ্য কত কিছুই তো বাতাসে ভাসে! বিশেষ করে সেই বস্তুর যদি ওজন না থাকে তাহলেতো সামান্য এক ফুঁতেই মাইল পেরিয়ে যায় এবং হাওয়ার প্রশ্রয় শেষ হওয়া মাত্র সে বেচারির ওড়ার ক্ষমতাও শেষ। সুতরাং বাওয়ের আগত ছোটা দিনমোহনের সোমায় কোটে আংসাং কাথাত কান দিবার? বাতাসেরও ক্ষমতা হয়নি আরও জোরে ছুটে দিনমোহনের কানে খবরটা তুলে দেয়ার। ঘটনাটা ঘটল গতকাল, নিশিগঞ্জের হাটে।অবশ্য হাটে বলাটা ঠিক হবেনা, তাহলে দিনমোহন খবরটা হয়ত শুনত কিন্তু বিশ্বাস করত না।হাটুয়া মানষির ফাকুয়া কাথা।
হাটে হাটে ঘুরে বেরানো মানুষগুলো কোথায় কী একতিল শুনলো কী ব্যস, সেই তিলটুকু থেকেই বানিয়ে ফেলবে মস্ত তাল। শুধু বানালেই তো হবে না, সেটা তো ছড়িয়েও দিতে হবে। যারা ছড়ানোর দায়িত্ব নেয় তারা আবার তালটাকে সোনার বিস্কুট বানিয়ে তারপর ছাড়ে। কথাই তো আছে--ইত্তি গেনু,উত্তি গেনু,গেনু বলাইয়ের হাট/ এ্যাক চেঙরিক দেখি আসিনু প্যাটের উপরা দাত। 

এই শোলোকটাও দিনমোহনের বিলকুল জানা, কিন্তু খবরটার উৎস তো হাট নয়,নারু সাহার দোকান। এবং দোকানটা হাটের ভেতরে নয়। হোতে পারে হাটের পথে তাবলে সপ্তাহে একবার তো খোলে না, রীতিমত ‘পারমেন্ট’ দোকান। হাটের দিন বাইরের লোক জড়ো হয় ঠিকই কিন্তু সেখানে গুজব ছড়ানোর মতলবে কেউ থাকে না। কম খরচে মৌজটুকু জমিয়ে কত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা যায় সেই চিন্তাতেই সবাই উদ্বিগ্ন থাকে। ফাইকসা কাথা কওয়া শোনার সোমায় কোটে! 

নিশিগঞ্জের হাটে সচরাচর যায় না দিনমোহন। গেরস্থালির কাজে যেটুকু জিনিস প্রয়োজন সেটুকু তো মোহন জোতেই পাওয়া যায়, ফালতু এতটা পথ হাঁটতে যাবে কেন! কাল বাড়তি কিছু রোজগার হওয়ায় এসেছিল এবং সওদাপাতি শেষেও পকেটে পঞ্চাশ টাকার একটা পাত্তি পড়ে থাকতে দেখে শরীরটা আচমকা ম্যাজম্যাজ করে উঠেছিল।মনে হয়েছিল,আজি শুখা ধোঁয়াত কাম হবা নহে। ইনজিনত জল দ্যাওয়া নাগিবেই। 

শরীরের আর দোষ কী! না হোক ষাট সত্তর বছর তো বয়স হলোই। রোদে জলে ঝড়ে কম তো চক্কর খেতে হয় না। শরীরে গিরি বংশের রক্ত না থাকলে কবেই অক্কা পেতে হোত। কাল সকালের কথাই ধরা যাক। আলো ফুটতে না ফুটতেই আন্দারু, বাতারু দু ভাই এসে হাজির। হাতজোড় করে বলেছিল,“হামা আলাদা হমো। তমা আসি সোম্পাত্তির বাট বাখেরাটা দেখি দাও কাকা।” 

প্রস্তাবে যথেষ্ট সম্মান থাকা সত্বেও চট করে রাজী হয়নি দিনমোহন। 

--মোক ডাকাচিস ক্যান? মুই তো ফেকলু মানষি। প্যাঙকাটুর নগদ যা। অয় তো পোরধান।” 

নড়েনি আন্দারু বাতারু। বলেছে,“কী যে কও কাকা! তমাই হামরালার পোরধান।” 

কথাটা মনে ধরেছিল দিনমোহনের।প্যাঙকাটু যতই পঞ্চায়েত প্রধান হোক, আসলে তো বাগালের ব্যাটা। গিরি বংশের পায়ের নখের যোগ্য নয়। সেটা যারা স্বীকার করে তারা ডাকলে না গিয়ে থাকা যায়! বংশগরিমার কাছে বৈশাখের রোদ তুচ্ছ। 

খুবই খাতির করেছিল দুভাই।গাছের ছায়ায় মাদুর পেতে দিয়ে বলেছিল, “ ওদোত যাবার দোরকার নাই কাকা। এইঠে বসি বসি দ্যাখেন।” 

দিনমোহন রাজী হোতে পারেনি। রাজী হওয়া যায় নাকি! সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ারা কি যে সে কাজ? সরেজমিনে দাঁড়িয়ে চুলচেরা চোখে নজর না দিলে ভুলচুক হোতে বাধ্য। আর ভুলচুক মানে দুভাইয়ের একজনকে ঠকানো। কাকে ঠকাবে দিনমোহন? দুজনেই তো তার সন্তানের মতো। ওসব ফাঁকিবাজি কাজ প্যাঙকাটুর মানায়। 

সারাদিন পরিশ্রমের পর যখন হাতে টাকা গুঁজে দিতে এলো দুভাই, রেগে উঠেছিল দিনমোহন। 

--পোঙার চাম কি মোটা হয়া গিসে নাকি? মোক টাকার গোরোম দিস! 

সঙ্গে সঙ্গে পায়ে পড়ে গিয়েছিল দু ভাই। 

-- কী যে কন কাকা! হামরালা তো গিরি বংশের পোরজা। এইটা হইল খাজনা। 

খাজনায় যেহেতু দোষ নেই এবং বহুদিন নিশিগঞ্জের হাটে আসাও হয় না তাই কথা না বাড়িয়ে টাকাটা পকেটে পুরে হাটের দিকে রওনা দিয়েছিল দিনমোহন। ইচ্ছে ছিল কেনাকাটা পর্ব শেষে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কিন্তু বাদ সাধলো উদ্বৃত্ত পঞ্চাশ টাকাটা। এরপর নারু সাহার দোকানে না গিয়ে থাকা যায়! 

যতই ভিড় থাকুক মানী লোককে খাতির করতে কার্পণ্য করেনি নারুও। 

--আরে কী সইভাগ্য! আসেন আসেন। আপনে ক্যান চাষাভুষাদের মতন উঠানে বসে খাবেন! যান, ঘরে বসেন। টেবুল ফ্যানের হাওয়ায় মাল খাওনের মজাই আলেদা। 

উঠোন জুড়ে যারা বসেছিল তারা আশপাশের গ্রামের মানুষজন। দিনমোহন তাদের ঠিকঠাক চিনে উঠতে না পারলেও তারা যে সবাই দিনমোহনকে চিনতে পেরেছিল সেটা বোঝা গিয়েছিল উঁচুস্বরগুলো আচমকা নিচে নেমে যাওয়ায়। এটা কি কম তৃপ্তিদায়ক! এর কাছে দাঁড়াতে পারে টেবিল ফ্যান? 

তাই নারুর প্রস্তাবে রাজী হয়নি দিনমোহন। 

--ঘাড় কেনো কাতি/ সগায় এক জাতি। মুই এইঠেই বসিমো। আঙসাঙ কাথা বাদ্দিয়া বোতল আন। ফেরেশ মাল দিবু কিন্তু। 

ভালো জিনিসই দিয়েছিল নারু। এক বোতলেই কাজ হয়ে গিয়েছিল। শেষ ফোঁটাটুকুও গিলে দিনমোহন যখন উঠবে উঠবে করছে ঠিক তখনই বগলে বোতল গ্লাস নিয়ে এক ছোকরা হাজির। 

--আররে দেউনিয়া, তমা এই ঘিনাত বসিচেন! মর তো পাপ নাগিবে। এ্যাই শালা নারুদা… 

ছেলেটার হাবভাবে প্রমাদ গণেছিল দিনমোহন। একেই তো পরিচিত নয় তার ওপর আবার ছেলের বয়সী। এই বয়সটা বড় বিপজ্জনক। এদের লঘু গুরু জ্ঞান থাকে না। জানেও না কাকে সম্মান দিতে হয়। শুরু করে মিষ্টি মিষ্টি কথার তোষামোদ দিয়ে তারপর শুরু হয় দশজনকে শুনিয়ে অপমান করার পালা। 

--অমোনীমোহন কয় ফুট নাম্বা ছিল কাকা, দশ না পোনচাশ? বোন্ধুকটার কয়টা নল? কয়টা য্যান মাগী ছিল অমনীমোহনের? জিতমোহনের বউটা ছিনাল ছিল? 

বংশ তুলে অপমানটা যে কোনো পুরুষের কাছেই অসহনীয়। সে যদি আবার রমনীমোহন গিরির বংশধর হয় তাহলে কেসটা তো রক্তারক্তি পর্যায়ে পৌঁছতেই পারে। কিন্তু সে কথা বোঝে কে! তেমন কিছু ঘটলেই প্যাঙকাটু বলবে,“ তিনটিয়ার মাথাত চড়িবার দিন আসি গেইল রে দিনুদা, এইবার তো সোমসারের রীতিটা বুঝা নাগে!” 

সে না হয় বাগালের ব্যাটা যা বলে বলুক কিন্তু সঙ্গে নিজের বউটাও পোঁ ধরে বলবে,“ মানষিটা পুরা পাগেলা হয়া গিসে। ঘরত বান্ধি রাখা নাগে।” 

এরপর বাখারি হাতে তেড়ে যেতেই হবে দিনমোহনকে। 

--শালীর বেটি শালী, মোক বান্ধিবু? যার ডৌলত শাখা সেন্দুর/ তাকই কইস খালের এন্দুর! 

সুতরাং সেই বিশ্রি ঘটনাক্রম এড়াতে একটু রূঢ়ই হোতে হয়েছিল দিনমোহনকে। 

--নারুক ডাকা করার পোয়োজন নাই। মুই নিজের ইচ্ছাত এইঠে বসিছু। 

কিন্তু ছোকরা সে কথা শুনলে তো। নারুকে ডেকে এনে বোতলের অর্ডার দিয়েছিল,সঙ্গে চিকেন। 

দিনমোহন তো ভিখিরির জাত নয় যে অল্পেই নোলা সকসকিয়ে উঠবে! ঘাড় নেড়ে বলতেই হয়েছিল, “আর খামো না। নিশা হয়া গিসে। এখন ঘরত যামো।” 

কে শোনে কার কথা। পায়ে উপুড় হয়ে পড়ে ছেলেটা। 

--মর বাপের ভাইগ্য, তমার দেখা পাছু।এইলা সুযুগ হারাবার না হো।পোসাদ করি দেয়াই নাগিবে। 

এরপর নিজেকে আটকানোর যেহেতু কোনো মানে হয় না তাই লাগাম ছেড়ে দিয়েছিল দিনমোহন। শুধু তাই নয়, ঋণ শোধ করতে ছেলেটা কিছুই না জিজ্ঞেস করা সত্বেও আগবাড়িয়ে খুলে বসেছিল গল্পের ঝুড়ি। 

--তমা জানো অমোনীমোহনের কাথা? কাঁয় ছিল? 

ততক্ষণে মাথা হেলে পড়ায় সায় দিতে পারেনি ছোকরা। 

--কও তো, ক্যাং করি হামার গেরামের নাম মোহন জোত হইল্? 

এবারও উত্তর আসেনি। না আসুক। তাবলে প্রকৃত রসিককে তো রস থেকে বঞ্চিত করা যায়না। সেটা পাপের কাজ। সুতরাং বিস্তৃত ইতিহাসের বেশ খানিকটা খোলসা করতেই হয়েছিল। শুধু তাই নয়, পুরোন গল্পের সঙ্গে বাড়তি গল্প জুড়ে দিয়েছিল, একদম টাটকা একটা গল্প, যেটা এর আগে কেউ শোনেনি। 

--পোতি আমাবইস্যায় মানষিটা আসিয়া হাজির হয়। মুই বাদে কাঁয়ো ট্যার পাও না। মুই ঘাপটি মারি বিছানাত পড়ি থাকি। অঁয় মোর ঘরত ঢুকিয়া সিন্ধুক থিকা বোন্ধুক কোনা বাইর করিয়া গটা এ্যালাকায় টহল মারে। আলো ফুটিবার আগত যেইখানের জিনিস সেইঠে রাখিয়া চলি যায়। 

ছেলেটা চোখ পিটপিট করতে করতে গল্পগুলো শুনেছে। ঠাট্টা মশকরা করেনি। গল্প এবং নেশা পর্ব শেষ হওয়ার পর দিনমোহন যখন উঠে দাঁড়িয়েছিল বাড়ি ফেরার জন্য ঠিক তখনই ছেলেটাও উঠে দাঁড়িয়ে দিনমোহনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে খবরটা দিয়েছিলো। 

--শীগ্গই নড়াই হোবে কাকা। পোস্তুত থাকেন। হামরালার আলেদা রাইজ্য নাগিবে। দেখিবেন, সোরকার বাপ বাপ করি দাবী মানি নিবে। সেই রাইজ্যের রাজা হবেন তমা।” 

কথাটা শুনে দিনমোহনের নেশাগ্রস্ত শরীরটা দ্বিগুন দুলে উঠেছিল। 

--কি করা নাগিবে মোক? 

পিঠ চাপড়ে দিয়ে ছেলেটা বলে,“ কিসো না। রাজা মানষি আবার কি করিবে? করিবে তো তমার পোরজা। তমা শুদু একদিন মিছিলত বোন্ধুকটা ধরি আনিবেন।অইটা ফুটায়া মিছিল স্টাট দেওয়া হোবে।” 

বহুদিন ধরে দেখে চলা স্বপ্নটা সত্যি হবে জেনে উত্তেজনায় শিউরে উঠেছিল দিনমোহন। 

-- কবে আনিমো? 

অন্ধকারে মিশে যেতে যেতে ছেলেটা বলেছিল,“ ধইরজ রাখেন। খোবোর ঠিকেই পায়া যাইবেন।” 



(দুই) 

বহুদিন পর জম্পেশ নেশা হওয়ায় রাতে জবরদস্ত একটা ঘুম হয়েছিল দিনমোহনের। এমন কী ঘুম ভাঙার পরও বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। শুয়ে শুয়েই শুনছে বউয়ের সুর করে শোলোক কাটা--আলসিয়া রে আলসিয়া/ খোলোই যাছে তোর ভাসিয়া/যাক না কেনে ভাসিয়া/ আরো গেরাইম বসিয়া। 

শোলোকের তাৎপর্য না বোঝার কথা নয়, তবু মনে রাগ জমাতে পারলো না দিনমোহনের, বরং স্ত্রীর কন্ঠ মাধুর্য উপভোগই করলো। কিন্তু ‘খোলই’ শব্দটা মাথায় গেঁথে যেতেই আচমকা মনে পড়ে গেল, আজ পুকুরে জাল ফেলার কথা না বনমালী সরকারের? 

সাত সকালে স্বামীকে বের হোতে দেখে বউ যথারীতি ফোড়ন কাটলো,“কোটে যাও আজা সাহেব?” 

দিনমোহন হাসিমুখে জানালো,“ রাইজ্য দেখিবার।” 

ভাগ্যিস এরপর কথা বাড়ালো না বউ, তাহলে মেজাজ আর ঠান্ডা রাখা যেত না। সাত সকালেই ঝামেলা বাঁধতো।এবং শুরু করতো বউই। 

--দুইটা পোচা মাছের জইন্য ভিখ মাগিবার যাছো? ক্যামোন গিরি বঙশো হে তমরালার! মুই হালুয়া চাষীর বেটি হবা পারি কিন্তু অইলা মাছের মুখত মুতি দেং। 

কথাটা মিথ্যে নয়। অনেক ঝগড়াঝাটির পর বনমালীর কাছ থেকে যে মাছ আদায় করা যাবে অবধারিত ভাবেই সেসব হবে ভাঙাচোরা, হাড় সর্বস্ব। বেড়ালেও সেসব মুখে দেবে কিনা সন্দেহ! কিন্তু লড়াইটা তো মাছের নয়, অধিকার রক্ষার। 

মোহনজোতের সবাই জানে দেড় বিঘার পুকুরটা ছিল গিরি বংশেরই সম্পত্তি। রমনীমোহনের কাটানো। দিনমোহনের ঠাকুর্দা নিশিমোহন একবার দায়ে পড়ে বন্ধক রেখেছিল বনমালী সরকারের বাবার কাছে। কারো কাছে ঋণ রাখার বান্দা ছিল না নিশিমোহন।পাই পয়সা চুকিয়েও দিয়েছিল কিন্তু পুকুরটা ফিরে পায়নি। কোচবিহার টাউনের নামজাদা উকিল প্রভাত রায় দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের এহেন দুর্দশার কথা শুনে কেস করার পরামর্শ দিয়েছিল। 

--তুই শুদু ঠুকি দে, বাকি মুই দেখি নিমো। 

প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কেস ঠুকে দেয়ার সাতদিনের মধ্যে পুকুরের মালিকানা ফিরিয়ে দেয়ার। কিন্তু মামলা গড়িয়েছিল অনেক দূর। তবু প্রভাত উকিল প্রায় ফয়সালা করেই এনেছিল কিন্তু ততদিনে প্রায় দেউলিয়া হোতে বসা নিশিমোহনের পক্ষে সম্ভব হয়নি ধৈর্য বজায় রাখা। বাদীর আচমকা মৃত্যু হলে জেতা কেসও তো ধামা চাপা পড়ে যাবেই। 

তবু হয়ত শেষরক্ষা করা যেত যদি রাধামোহন হালটা শুধু চেপে ধরতো, কিন্তু তার সময় কোথায় কোর্টে দৌড়নোর!গান বাজনা যাত্রা নিয়ে মেতে থাকা মানুষটা কোর্টের পথই মারায়নি। সেটাই স্বাভাবিক, গান করে, বাজেনা বায়, নাচে/ তার মতোন ব্যাহেয়া কে আছে! 

শুদু ঘুকলুং বুদ্ধি যার/ কাইরয্য সিদ্ধি তার।বাপ ঠাকুর্দার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করেছিল একমাত্র দিনমোহন কিন্তু ততদিনে প্রভাত উকিলও পরপারে। প্রভাতের ছেলেও উকিল কিন্তু কেসটা চালানোর ব্যাপারে সে কোনো আগ্রহই দেখায়নি। আত্মীয়তার কথা শুনে বিনামূল্যে শুধু একটা উপদেশ দিয়েছিল, “ যখনই পুকুরে জাল ফেলা হবে তক্ষুনি হাজির হয়ে মাছের ভাগ চাবি। 

--তাতে কী হবি! 

--তাতে প্রমাণ হবে পুকুরে তোমাদেরও ভাগ আছে। 

--তাতে কী হবি! 

--সেটা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। 

হ্যাঁ, ভবিষ্যত বলে যে একটা বস্তু আছে এবং সেটা যে সোনায় মোড়া, সে ব্যাপারে দিনমোহন যতই নিশ্চিন্ত থাকুক বউ তো বোঝে না!উল্টোপাল্টা বকবক করে মেজাজ বিগড়ে দেয়। 

গামছাটা মাথায় জড়িয়ে যখন প্রায় বেরিয়েই পড়েছে দিনমোহন তখনই ফের বাধা। এবং ফের একই প্রশ্ন,“কোটে যাছো?” 

এবারের প্রশ্নকর্তা হরিমোহন।ছেলের দুঃসাহস দেখে রাগে জ্বলে ওঠে দিনমোহন। ইচ্ছে হয় পা থেকে চটিটা খুলে ঝাঁপিয়ে পড়ার কিন্তু দুটো ফিতেই বহুদিন সেফটিপিনের ওপর নির্ভরশীল থাকায় ইচ্ছেটাকে কার্যকর করা যায় না। 

--ক্যান? কোলৎ উঠিবু? 

কোলে চড়ার কথা শুনে লজ্জা পায় বটে হরিমোহন তাবলে পিছিয়ে যায় না। 

--একোটা কাথা ছিল। 

--কী কাথা? 

--বোন্ধুকটা নাগিবে মোর। দিবা? 

প্রস্তাবটা শুনে অবাক হয়ে যায় দিনমোহন। বলে কী মেনিমুখো ছেলেটা! গিরি বংশের উত্তর পুরুষ হওয়া সত্বেও যার মধ্যে গর্বের লেশ মাত্র নেই, চব্বিশ ঘন্টা মায়ের আঁচল ধরে পড়ে থাকে, বাপের কাছে ঘেঁষে না, সে কিনা আজ রমনীমোহনের বন্দুকটা চাইছে! এতদিন পর রক্ত কথা কয়ে উঠল নাকি! কি করবে বন্দুকটা দিয়ে, আশপাশের গ্রামে ডাকাতি? করে যদি করুক না। আটকাবে না দিনমোহন। পারে যদি ফিরিয়ে আনুক গিরি বংশের দোর্দন্ড প্রতাপ। 

--কি করিবু বোন্ধুক দিয়া? 

--এস্টার ছিকুরিটি কোম্পনিত নোক নিবে। মোর নগদ বোন্দুক আছে শুনিয়া মোক কহছে ধরি আনিবার। 

বরাবর ছিটগ্রস্ত বাপকে এড়িয়ে চলা হরিমোহনের জিভে আজ যেন কে ভর করে! এক নাগাড়ে বলে যেতে থাকে, স্টার সিকিউরিটি কত বড় কোম্পানী, কী কী সুযোগ সুবিধা কর্মচারীদের দেয়া হয়। বন্দুক থাকার সুবাদে শুরুতেই কত টাকা বেতন পাওয়া যাবে সে তথ্যও জানাতে ভোলেনা। 

সবটা না শুনেই দৌড় দেয় দিনমোহন। একেই তো দেরী হয়ে যাচ্ছে তারপর এক নাগাড়ে এসব নোংরা কথা শুনলে, বলা যায় না, জিতমোহনের ভুতটা কাঁধে চেপে বসতে পারে। 

যাত্রার শুরুতে এমন ভজঘট বাঁধলেও পরিণতিটা কিন্তু ভালোই হয়। রীতিমত এগিয়ে এসে আপ্যায়ন করে বনমালী। 

--তর কথাই ভাবতেসিলাম। কী বেপার, দিনুকে খপোর দিলাম অছথ এখনো আসে না! 

হতভম্ব হয়ে দিনমোহন জানায়,“ মোক তো কাঁয়ো খপোর দ্যায় নাই!” 

তৎক্ষণাৎ চটে ওঠে বনমালী। তবে রাগের লক্ষ্য দিনমোহন নয়, খাস চাকর ঘাগরা বর্মন। 

--খপোর দিস নাই? হারামজাদা, আমার কথার অমাইন্য করিস! জুতায়া মুখ ছিড়ি দিমু। 

এইটুকুতেই ধন্য হয় দিনমোহন, এরপর যখন মস্তু দুটো কাতলা মাছ দড়িতে বেঁধে হাতে ঝুলিয়ে দিলো তখন তো রীতিমত বনমালীর পায়ে পড়ে যাবার দশা। 

পরিস্থিতিটা উপভোগ করতে করতে হাসে বনমালী। 

--নে নে। আরে, এই পুকুরে তো তোরও ভাগ আছে। যহনই জাল মারবো তহনই আইসা ভাগ নিয়া যাবি, কেমুন? 

মাথা নেড়ে চলেই আসছিল দিনমোহন, পেছন থেকে ডাকলো বনমালী। 

--একটা কথা শুইন্যা যা। 

ফিরে আসে দিনমোহন। ইয়ারদোস্তের মতো কাঁধে হাত রেখে বনমালী বলে,“ দ্যাখ ভাই, যে-ই রাজা হোক,আমি পোরজা মানুষ, পোরজাই থাকপো। এহনও চান্দা দেই, তহনও দিবো। কিন্তু এইভাবে যুদি মা বাপ তুইল্যা গালি দ্যায়, খুন করার ভয় দ্যাখায় তাইলে বাচি ক্যামনে, ক? তুই একটু লুকগুলারে বুঝা ভাই। আমার জন্ম, আমার বাপের জন্ম এইখানে। আমি কেমনে ভাটিয়া হই, তুই ক!” 

ঠিক তখনই এতক্ষণ ভুলে থাকা কাল রাতের ঘটনাটা মনে পড়ে যায় দিনমোহনের। বনমালীর কথাগুলো বুঝতে অসুবিধে হয় না। যেটা বুঝতে পারে না তাহলো এত তাড়াতাড়ি কাজ শুরু হওয়ার তো কথা নয়! প্রথমে তো মিছিল হওয়ার কথা। সেই মিছিলের পুরোভাগে বন্দুক হাতে দিনমোহনের দাঁড়ানোর কথা। তারপর গুলী ছোঁড়া পর্ব এবং সবশেষে রাজ্য বানানোর লড়াই। রাতারাতি প্ল্যানটা বদলে দিলো কে? দিনমোহনকে না জানিয়ে এতবড় সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো সাহস কার হলো? 

এসব ঘরোয়া আলোচনা যেহেতু বনমালীর সঙ্গে করা যায় না তাই বন্ধুর হাতটা চেপে ধরে আশ্বস্ত করে দিনমোহন, “ কুন চেংড়া পেংড়া আসি কী কয়া গেইল আর তুই ভয় পায়া গেলু বোনোমালী! মোক একোটা খোবর দিবা পাল্লু না। বোন্ধুকটা আনিয়া অই চেংড়া পেংড়ার পোঙাত ঢুকি দিলুং হয়। 

এতটা বাড়াবাড়ি যদিও চায় না বনমালী তবু দিনমোহনের আশ্বাসে শান্তি পায়। 

--জানি রে। সুখে দুক্খে তোরাই তো আমার ভরোসা। 

‘তোরা’ শব্দটার ব্যবহার যদিও পছন্দ হয় না দিনমোহনের তবু কথা না বাড়িয়ে বাড়ির পথ ধরে। হাতে ঝোলানো থাকে জয়ের স্মারক। 

কিন্তু চিরশান্তি কি দিনমোহনের কপালে আছে। মাছ দুটো দেখে বউ কোথায় হইচই করবে তা নয়, মুখ কালো করে খবর দিলো,“ পুলিশ আসিয়া থানাত দেখা করার কাথা কয়া গেইসে।” 

--ক্যান! 

--মোক কয় নাই। 

ওফ, মেয়েছেলে একটা জুটেছে বটে দিনমোহনের কপালে। পুলিশ কি সবকথা জানায় নাকি! জেনে নিতে হয়। তবে যত খুশী ডাক পাঠাক পুলিশ, মাছের ঝোল দিয়ে এক থালা ভাত না খেয়ে কোথাও যাবে না সে। পুলিশের প্রয়োজন পুলিশ বুঝে নিক। 

খাওয়ার পর সবে যখন বিছানায় একটু গড়িয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দিনমোহন, তখনই বউ এসে হাজির। 

--থানাত যাবা না? 

কথাটা শুনেই লাফিয়ে উঠে বউয়ের চুলের মুঠি ধরে কয়েক ঘা দেয়ার ইচ্ছে হয় দিনমোহনের। 

--মাগী, পুলিশ কি তর নাং? মোক ফাঁসীত চড়ানোর সদা করচিত? 

অপমানের চে’ও ফাঁসীর প্রসঙ্গ ওঠায় ভয় পেয়ে যায় দিনমোহনের স্ত্রী। যে ভঙ্গীতে পুলিশ হুকুমটা জানিয়ে গিয়েছে তাতে অমন কিছু ঘটা অস্বাভাবিক নয়। সুতরাং হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। 

বউকে শান্ত করতে দিনমোহনকে জানাতে হয় থানার ওসি তার বিশেষ বন্ধু। বহুদিন দেখা হয় না তাই ডেকে পাঠিয়েছে। 

তবুও তথ্যটা বোধহয় বিশ্বাস হয়না দিনমোহনের বউয়ের। স্বামীর চটে ওঠার সম্ভাবনা থাকা সত্বেও প্যাঙকাটু বর্মনকে সঙ্গে নিয়ে যাবার পরামর্শ দেয়। যতই বাগালের ব্যাটা হোক, পঞ্চায়েত প্রধান তো বটে। অনেক ক্ষমতা। 

প্যাঙকাটু যে আদৌ সঙ্গে যাবে না সেটা জানা থাকা সত্বেও মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় দিনমোহন। 



(তিন) 

--কে ওখানে? 

জানলা দিয়ে মাত্র একবার উঁকি দিয়েই মাথাটা সরিয়ে নিয়েছিল দিনমোহন কিন্তু ওসির নজর এড়ানো যায় না। 

--মুই দিনোমোহন গিরি। 

--কে দিনমোহন! ভেতরে এসো। 

এরপর ভেতরে না ঢুকে উপায় কী! 

ওসি ফের জিজ্ঞেস করে, “ কী চাই!” 

কথাটা শুনে হাসিই পায় দিনমোহনের। থানাটা যাদের জমির ওপর তাদের উত্তরাধিকারীকেই কিনা প্রশ্ন করা হচ্ছে কী চায়! কি দিতে পারে পুলিশ রমনীমোহনের বংশধরকে? 

ওসি তো এদিককার লোক নয় তাই জানেনা গিরি বংশের গৌরব। বাধ্য হয়ে জানানোর দায়িত্বটা নিজেকেই নিতে হয়। চেয়ারে গুছিয়ে বসে শুরু করে,“মুই মোহন জোতের দিনমোহন গিরি। অমনীমোহনের বংশোধর। তমা মোক দেখা করিবার...।” 

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই গর্জে ওঠে ওসি। 

--অ, তুইই সেই মাল? আবার না বলে চেয়ারে বসেছিস! ওঠ। দাঁড়া। 

উঠে দাঁড়ায় বটে দিনমোহন কিন্তু ওসির পরিবর্তে নিজের পোশাকের দিকে তাকায়। পুরোন হলেও মোটামুটি পরিষ্কারই। শুধু ঝুলের দিকটায় সামান্য একটু ময়লা লেগে আছে। ওইটুকুর জন্য সরাসরি ‘তুই’! ধড়মড়িয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় দিনমোহন। 

--তোর বাড়িতে নাকি বন্দুক আছে? কী করিস বন্দুক দিয়ে! 

ওসির কথায় অবাক হয়ে যায় দিনমোহন। এইটা ক্যাম্বা পুলিশ! কায় দিসে এটাক চাকরি? বোন্দুকের কাথা জানে, কিচ্চা জানে না! যদি না জানে তো শুনে নিক। তখন এদিকে থানা বলতে সেই কোচবিহারে।ডাকাতের দল রাত বিরেতে হানা দিয়ে শুধু সর্বস্ব লুট নয়, দু চারজনকে খুন করে যেত। খবর পেয়ে পুলিশ আসতে আসতে মাস পেরিয়ে যেত। বাধ্য হয়ে পুলিশ সাহেব রমনীমোহনকে অনুমতি দিয়েছিল বন্দুক কেনার। প্রজাকে রক্ষা করার প্রাথমিক দায়িত্ব তো রাজারই। 

দায়িত্ব পালনে কোনো ত্রুটি রাখেনি রমনীমোহন। একবার দশ, না একশো, নাকি এক হাজার ডাকাতের একটা দলকে এমন ভাবে মোকাবিলা করেছিল যে একজনও প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারেনি। খবর পেয়ে পুলিশ সাহেব ছুটে এসে সবার সামনে রমনীমোহনকে বুকে জড়িয়ে ধরিয়েছিল। 

যে দায়িত্ব পালনে কোনদিন অবহেলা করেনি রমনীমোহন, সেটাকেই কিনা কোনো গুরুত্ব দিল না তার নাতি জিতমোহন!ডাকাতের বদলে গুলী চালিয়ে বসলো কিনা নিজের বউয়ের বুকে। বউয়ের অপরাধটা কি ছিল, সে গল্প জানে না দিনমোহন। কেউ বলেছে বউটা দুশ্চরিত্র ছিল, কারো বক্তব্য জিতমোহনের মাথার দোষ ছিল।তবে সঠিক কারণটা না জানা গেলেও এটুকু জেনেছে যে সেবারও পুলিশ এসেছিল, বুকে জড়িয়ে ধরতে নয়, জিতমোহনকে জেলে নিয়ে যেতে।রমনীমোহন বেঁচে থাকলে পুলিশ নিশ্চয়ই অতটা সাহস পেত না। তবে বন্দুকটা বাজেয়াপ্ত করতে পারেনি পুলিশ। যদিও সেটা ততক্ষণে সিন্দুকের ভেতর লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ ইচ্ছে করলে কি খুঁজে বের করতে পারত না? সাহস পায়নি। মরা হাতিও তো লাখ টাকা। 

অবশ্য বাজেয়াপ্ত করলেই বা কী ক্ষতি ছিল! জিনিসটা তো আর কোনদিনই আলোর মুখ দেখলো না। পরবর্তী পুরুষদের সাহসই হলো না সিন্দুক থেকে যন্ত্রটা বের করে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানোর। 

না থাকুক ওদের সে মুরোদ, দিনমোহনের আছে। সে রমনীমোহনের কততম বংশধর সেটা জানা জানা না থাকলেও, বংশধর তো বটেই। একই তো রক্ত। দিক না এই পুলিশ সাহেবও অনুমতি, তারপর দিনমোহনও দেখিয়ে দেবে কী করতে হয় বন্দুক দিয়ে। 

কিন্তু এই পুলিশ যে সেই পুলিশ নয়, দুজনের রক্ত যে বিলকুল আলাদা সেটা দিনমোহন বুঝতে পারে পরবর্তী হুকুমে। 

--বন্দুকটা থানায় জমা করে যাবি। মনে থাকবে? নাহলে কিন্তু সোজা চালান করে দেব। 



(তিন) 

পাশে শুয়ে নাক ডাকছে বউ অথচ দিনমোহনের চোখে ঘুমের ছিঁটেফোঁটা নেই। থাকার কথাও নয়। জমি জমা পুকুর তো সেই কবেই হাতছাড়া এখন যদি বন্দুকটাও থানায় জমা দিতে হয় তাহলে আর কী রইলো গিরিবংশের? পরবর্তী প্রজন্ম তো মাথা তুলেই দাঁড়াতে পারবে না! লোকে তো থুতু দেবে। পরের কথা না হয় পরে ভাবা যাবে, সামনেই তো অমাবস্যা।নির্ঘাত গ্রাম পাহারা দিতে আসবে রমনীমোহন, কিন্তু সিন্দুক খুলে যদি প্রিয় জিনিসটা না পায়, তখন? কি করবে রমনীমোহন? পরিস্থিতিটা বুঝতে চাইবে? নাকি পরিবারের সবাইকে গলা টিপে নিকেশ করে দেবে একেবারে? 

ছটফট করতে করতে এক সময় বিছানা ছেড়ে ওঠে দিনমোহন। চৌকির নীচ থেকে কাঠের বাক্সটা টেনে বের করে। ঢাকনা খুলতেই কর্পূরের গন্ধে ম ম করে ওঠে। কর্পূর নাকি খুব প্রিয় ছিল রমনীমোহনের! শরীরটা শিউরে ওঠে দিনমোহনের। জন্ম ইস্তক শুধু বন্দুকটার কথা শোনা বলা হয়েছে। কখনো দেখা হয়নি। সাহস হয়নি দেখার। শুধু দিনমোহন কেন, গিরিবংশের অনেকেই দেখেনি। রক্তখোর জিনিস নিয়ে নাড়াচাড়া করাটা কি সহজ কথা! সামান্য অযত্ন হলে কী ঘটে যায়, কে বলতে পারে! 

দিনমোহন কি লন্ঠনটা জ্বালিয়ে নেবে? অন্ধকারে তো কিছুই বোঝা যাবে না। অবশ্য বোঝার জন্য একমাত্র চোখ দুটোই গুরুত্বপূর্ণ নয়, হাত দুটোও যথেষ্ট। 

ছেঁড়া কাপড়ের স্তূপের ভেতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দেয় দিনমোহন। বহু পুরনো কাপড়ের ভেতর থেকে জেগে ওঠা শীতভাপে কেঁপে ওঠা হাতটা সাপের মতো পথ খুঁড়ে খুঁড়ে এগিয়ে চলে ঊষ্ণতার সন্ধানে। কোথায় সেই বস্তু! পাতাল ছুঁয়ে ফেলা সত্বেও অমৃতের সন্ধান মেলে না। ফের চেষ্টা করে দিনমোহন, ফের ব্যর্থ হয়। 

এরপর লন্ঠন জ্বালিয়ে কাপড়ের জঞ্জাল মেঝেতে নামায় দিনমোহন। শূন্য বাক্সে লন্ঠনের আলোটা তিরতির করে কাঁপে। কোথায় গেল বন্দুকটা! বউকে ঘুম থেকে তুলে জিজ্ঞেস করবে নাকি! 

উঠে দাঁড়ায় দিনমোহন। যতটা সম্ভব নিঃশব্দে দরজা খুলে পা রাখে উঠোনে। উঠোনের ওপারে ছেলের ঘর। বন্ধ দরজার কড়া নাড়তে গিয়ে হাত ঠেকে যায় মস্ত তালায়। 



(চার) 

‘স্টার সিকিউরিটি’ যত বড় কোম্পানিই হোক এবং তার ম্যানেজারের যত ক্ষমতাই থাকুক, তবু গিরি বংশের মাহাত্ম বোঝার ক্ষমতা যে নেই সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারে হরিমোহন। নাহলে প্রাণে ভয় ডর থাকত। বুঝত, যে যন্ত্রটা হাতে নিয়ে ব্যঙ্গে ফেটে পড়ছে তার মালিকের অভিশাপ যদি গায়ে লাগে তাহলে ঝাড়ে বংশে নির্বংশ হয়ে যেতে হবে। 

যেহেতু কারও মুখের ওপর শাপ শাপান্ত করার মতো ছেলে হরিমোহন নয় তাই বন্দুকটা ফের কাপড়ে জড়িয়ে নিঃশব্দে ফিরে আসে। এমন কী মর্চের গুঁড়োকেও অবহেলা করে ফেলে আসে না মেঝেতে। সব শুদ্ধ রেখে দেয় যথাস্থানে। 

প্রায় একই রকম অনুভূতি হয় দিনমোহনেরও যখন কিনা ওসি হাসিতে গলে পড়তে পড়তে বলে, “এর নাম বন্দুক! গাড়ল কাঁহা কা। যা, পালা।” 

এরপর দিনমোহনও একই ভাবে জঙের গুঁড়ো সহ বন্দুকটাকে কাপড়ে জড়িয়ে বাড়ির পথ ধরে বটে কিন্তু বাপ ব্যাটার আচরণের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে যায়। হরিমোহনের মন ভরা ছিল দুঃখ অপমান। আর দিনমোহনের মন আনন্দে টইটুম্বুর। টগবগিয়ে ফুটতে ফুটতে বাড়ির পথে ছোটে। মুখে জয়ের হাসি। যাক, সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার লজ্জায় গিরিবংশের উত্তর পুরুষকে মাথা হেঁট করে বেঁচে থাকতে হবে না। 

ঈস এখন যদি কেউ একজন দিনমোহনকে জিজ্ঞেস করতো,“ কোটে গেছিলু রে দিনুকাকা? নাচিস ক্যান! হাতোত অইটা কী!” 

ব্যস, তারপর দিনমোহন তাকে বুঝিয়ে ছাড়তো কাক কয় বংশো, কাক কয় অক্ত! 





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন