শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

মণীন্দ্র গুপ্ত'র আত্মজীবনী : অক্ষয় মালবেরি--১

শত শরদ মানুষের আয়ু। কিন্তু দুঃখী-সুখী-ভ্রষ্টাচারী ততদিন বাঁচে না। মরণের আগে বোকাচোখে তাকিয়ে দেখে: সমস্তই অসম্পূর্ণ, তার রাকাশশী অসংলগ্ন বালি হয়ে উড়ে যায়। তবু এইটুকু জীবনের মধ্যে কত কি যে ঘটেছিল-- কত মুগ্ধতা, সন্তাপ, উল্লাস, দ্রবণ! ভোলা যায় না। তবু তার উপর শান্তি নামে-- সময়ের শান্তি, ক্ষয়ের শান্তি। অক্ষয় মালবেরি গাছকে ঘিরে তীব্র ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ টের পাই, কখন সঙ্গীদের হাত ফসকে গেছে। প্রৌঢ় মুখের উপর ছায়া পড়ে। নিজেকে আর মানুষ বলে মনে হয় না, প্রাণী বলে মনে হয়। নিঃশ্বাস নিই তাই বেঁচে থাকি। ভিতরে একা, সুখী না, দুঃখীও না । দশদিকে অসীম শূন্য এবং চিররহস্য।



।জন্ম। 


শরৎশেষে, কার্তিকের শুরুতে, আমাদের ভাঁড়ারের দেশে পেকে আসা ধানের উপর যখন শেষরাতে শিশির আর সন্ধ্যায় হিম জমে, যখন খালের জল স্বচ্ছ, গাছপালা গাঢ় সবুজ, আবহাওয়ায় একটু একটু শ্লথ বিষণ্ণতা তখন একদিন আমার ঠাকুরদা সুখী মনে তাঁর ডালিম গাছটির পাশে হলুদ রঙের গোগলাপাতা, সবুজ রঙের বাঁশ আর বাদামী রঙের বেত দিয়ে একটি আনকোরা আঁতুড়ঘর একাহাতে বানিয়ে ফেললেন। আমি খুব পৌরাণিক আদরের মধ্যে ভূমিষ্ঠ হলাম। ডাক্তার নেই, দাই নেই, ছুরি-কাঁচি নেই। শুধু একদল পাড়াগেঁয়ে অভিজ্ঞ বর্ষীয়সী যেন হুল্লোড় করে হাতে হাতে আমাকে নামিয়ে নিলেন। ডাক্তারী ছুরির বদলে আমাদের পশ্চিমপুকুরপারের নির্জন বাঁশঝাড় থেকে কেটে আনা কাঁচা বাঁশের চোচ দিয়ে আমার নাড়ী কাটা হয়েছিল, একথা জেনে নিজেকে খুব অন্য রকম লাগে। কাঁচা বাঁশের চোঁচ ব্লেডের চেয়েও ধারালো, তাতে টিটেনাসের বীজ না থাকলেও বনের সবুজ বিষ ছিল। 



।মা । 


আমাদের চেনাশোনা, ভালোবাসা হবার আগেই মা যখন মারা গেলেন তখন তার বয়স উনিশ বছর, আর আমার দশ মাস। মায়ের এই অসমাপ্ত জীবন বা আমার জীবন থেকে তাঁর এই চিরঅপসরণ একটা প্রাকৃতিক ঘটনামাত্র। কিন্তু জন্মমৃত্যুর সঙ্গে স্ত্রীজাতির একটি অতি গহন যোগ আছে, অতএব পড়শী কুটুম্ব স্ত্রীলোকেরা আমাকে সামনে দাঁড় করিয়ে নিরীক্ষণ করতে করতে সখেদে বলতেন, 'হায়, পোড়াকপালিয়া, জন্মাইয়াই মায়রে খাইছ!’ অপেক্ষাকৃত তরুণীরা ভুরুতে দুঃখ এঁকে বলত, “আহা, অর মা নাই।’ কাকে খেয়েছি ? কে নেই?-- এসব কথায় প্রথম দিকে আমার একধরনের নির্বোধ অস্বস্তি হত। কিন্তু ক্রমাগত শুনতে শুনতে শেষে, যে নেই তার না থাকার জন্য একটা আবছা কুয়াশাভরা অপরাধ ভিতরে ছায়া ঘনিয়ে আনত। মনে হত, কোনো দুর্গম কারণে সংসারে আমি অস্বাভাবিক, এবং একা। 

এই নকল দুঃখই বোধ হয় আত্মকরুণা। দুষ্টুমি করে মারধর খেলে আমি ঐ দুঃখকে খুঁজতে বেরুতাম। মুখখানা স্লান ম্লান করে একা একা ঘুরতাম খালপাড়ে অথবা উঁচু ঢিবির উপর বিশাল শিরীষ গাছের তলায় যেখানে কেউ যায় না। সেখান থেকে দেখতাম, দিগন্তে মেঘের মধ্যে কী যেন ঘনিয়ে উঠছে। আমি মুখ নিচু করে দুঃখকে খুঁজতাম, মাটিতে কোথায় সে গেঁথে আছে ভাঙা সবুজ বোতলের টুকরো হয়ে। 

অবশেষে সহজাত পুরুষসংস্কার আমাকে একদিন বলল, এই জোলো হাওয়া ভালো না । তার পর থেকে স্ত্রীলোকদের ঐসব অহেতুক বাষ্পীয় মন্তব্যের সামনে পড়লে— কুমোরের ঘুরন্ত চাকায় একতাল মাটি যেমন আঙুলের চাপে টলতে টলতে শীর্ণ হয়ে ওঠে শূন্যের দিকে তেমনি কাঁচা শরীরের মধ্যে আমার স্নায়ুগুচ্ছের নাল লম্বা হয়ে হয়ে মাথা নীলের দিকে উঠত। এতকাল পরে এখন জানি, আসলে সুখও নেই, দুঃখও নেই। সংসার-সমাজের এজেন্সিগুলো আমাদের মধ্যে সুখ ও দুঃখের ধারণা জন্মিয়ে দেয়, যে ব্যথা ভোগ করার নয় সেই ব্যথা ভোগ করায়। 

পরে, একটু বড় হয়ে, যেদিন মার ছবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম, তাঁকে একমুহূর্তেই প্রত্যাখ্যান করলাম। সোজা দাঁড়ানো একটি ছিপছিপে কিশোরী, নাকে পাথর বাঁধানো নোলক। মাতৃত্ব দূরের কথা, তার ঠোঁটে চোখে চিবুকে তখনো নারীত্বই আসে নি। এই আমার মা! তবু একসময় হয়তো তাকে আমার দরকার ছিল। কিন্তু এখন, এই পঞ্চান্ন বছর বয়সে, যদি সে আমার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ায়, হয়তো তাকে বলব--বোসো, একটু কিছু খাও— বিস্কুট, সন্দেশ ? পারো তো আমার কাঁচাপাকা চুলে একটু বিলি কেটে দাও। যাবার সময় দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে যেয়ো। তুমি গতজন্মে আমার মা ছিলে। 


।প্রথম স্মৃতি। 

মানুষী স্মৃতিই মানুষ। স্মৃতিই জটিলতা। মরণের পরে আমাদের যে নির্বাণ হয় না সে কেবল স্মৃতি আছে বলেই না! পুনর্জন্ম সবচেয়ে বড় ম্যাজিক-- ধুয়ে মুছে সব পরিষ্কার করে দেয়। জাতিস্মর হলে জন্মজন্মের দুঃখ আর জানার ভার বইতে হত। অল্প লইয়া থাকি, তাই বেঁচে থাকি। কিন্তু অনেকদিন বেঁচে থাকার ফলে আমার মধ্যে জাতিস্মর এসে যাচ্ছে। পুরনো রঙ্গমঞ্চে রঙ্গ নিজে নিজেই আবার গাঢ় হয়ে উঠছে। 

জন্মের পরে আমার প্রথম স্মৃতিটি এই রকম মনে পড়ে: দিনের বেলা। দুপুর গড়িয়ে গেছে অথবা তখনও বিকেল হয় নি। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে অথবা সদ্য থেমেছে। রান্নাঘরের পাশের ঘরটিতে মেঝেয় বড় পিড়ি পেতে একগাদা কাঁথা-বালিশের প্যাকিং দিয়ে আমাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। ঘরের মধ্যে ঘন ছায়া, মাটির মেঝের সোঁদা গন্ধ, কাঁথা-বালিশের। স্যাঁতা গন্ধ, বৃষ্টির ভিজে গন্ধ। শাড়িপরা কয়েক জোড়া বিশাল বিশাল পা আমার বিছানার পাশ দিয়ে বার বার আসছে যাচ্ছে, কাছে এসে এক বারও থামছে না। একজোড়া পায়ের আবার নীল পাড় সাদা জমির শাড়ি। আমি ঐ শাড়িঘেরা পায়েদের হাঁটু পর্যন্ত দেখতে পাই, তার উপরে আমার দৃষ্টি ওঠে না। আমি উঠতে পারি না, হাঁটতে পারি না, হামা দিতে পারি না, কথা বলতে পারি না। প্রত্যেক বার ভাবছি কোনো একজোড়া পা এসে আমার কাছে থামবে, আমাকে কোলে তুলে নেবে, আমাকে একা ফেলে রাখবে না। প্রত্যেক বার আশাভঙ্গ। আমি অনেকক্ষণ ধরে ওদের নিজেদের ভিতরে কথাবার্তার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ... হঠাৎ আমার মধ্যে ক্রোধের জন্ম টের পেলাম— রক্তমাংসের পুঁটুলিটার মধ্যে বাজপাখি তীক্ষ্ণ স্বরে ডেকে উঠল। ক্রোধ আমার সমস্ত শরীরকে ছেয়ে ফেলছে। আমি কি করে রাগ দেখাব ? ... ব্যস, এইখানে এসে স্মৃতি ছিড়ে গেছে। তার পর গর্জন করতে গিয়ে আমি কেঁদে উঠেছিলাম কিনা, কেউ আমাকে কোলে তুলে নিয়েছিল কিনা, সে কথা আর মনে নেই। ঘটনাটা সামান্য, কিন্তু ইঙ্গিতময়। পরিত্যক্ত থাকার কষ্ট এবং অসহায় ক্রোধ-- এই দ্বৈতই বোধ হয় আমার সারা জীবনের সারসংকলন। 



।ঠাকুমা ও তাঁর বন্ধুরা। 

এই সংসারজলধিতে পরজীবী শিশু অ্যানিমোনের মতো, যাকে আমি প্রথম আশ্রয় করলাম তিনি আমার ঠাকুমা-- কৃষ্ণবর্ণা, কুরূপা, কিন্তু ব্যক্তিত্বময়ী এক প্রৌঢ়া। তাঁর অযত্নের, অনটনের ছিমছাম শরীর। মস্ত কালো কপালে মস্ত সিঁদুরের ফোঁটা, পিঠের দিকে নেমে যাওয়া সরল কালো চুল, হাতে শুধু শাঁখা আর নোয়া, কষ্টিপাথরে কোথাও একচিলতে সোনার দাগ নেই। ঠাকুমার একমাত্র ব্যসন ছিল ফুরসত পেলেই পান এবং র তামাকপাতা তুষের আগুনে সেঁকে গুঁড়িয়ে খাওয়া। বন্ধুদের সঙ্গে এই পানের আসর জমত খুব। 

প্রান্তদুপুরে বন্ধুরা আসত। ছায়াচ্ছন্ন ঘরে মাটির মেঝেয় চট আর পিঁড়ি বিছিয়ে বসত সবাই । মধ্যিখানে থাকত ডাবরভরতি পানের গোছা, চুন, সুপুরি, খয়ের, জাতি। একপাশে মাটির মালসায় তুষের আগুনে আস্ত তামাকপাতা কুঁকড়ে উঠে কটু গন্ধ ছড়াত। ঠাকুমা সামনের দিকে লম্বা করে পা ছড়িয়ে বসতেন। তার দুই জানুর মধ্যে আমি শুয়ে, বসে, বায়নাক্কা করে এঁটুলির মতো লেগে থাকতাম। তাঁর কত যুগ আগেকার শুকিয়ে যাওয়া স্তন মুখে পুরে টেনে টেনে মিথ্যেদুধ খেতাম। ঠাকুমা বন্ধুদের বলতেন, 'শত্তুর! শত্তুর ! আমার প্রেস্রাব করতে যাবারও উপায় নাই। লগে লগে যাইবে।’ 

ঠাকুমার মধ্যে কোনো শ্রেণীচেতনা ছিল না। তাঁর বেশির ভাগ বন্ধুই প্রতিবেশী কামারবাড়ি, গোয়ালবাড়ির বর্ষীয়সীরা। শেষদুপুর থেকে শেষসায়াহ্ন পর্যন্ত তাদের সুখদুঃখের কথা চলত। আমি গভীর মনোযোগে প্রত্যেককে নিরীক্ষণ করতাম: সবাই প্রৌঢ়ত্বে স্নিগ্ধ, লোলস্তনী, পান এবং তামাকের গুঁড়োয় ঘন ছোপ ধরা দাঁত, তবু কত বৈচিত্র্য তাদের। উন্দি নাম্নী যুবতীর মা, রাধু ঘোষের বউ, শশী কর্মকারের দিদি, সূর্য কর্মকারের মা, মাণিক্য বুড়ী-- দুঃখের এবং বয়সের আলাদা এক এক রূপ। কারো চোখের পাতা ভারী হয়ে নেমে চোখের কোলে ছায়া ফেলেছে, কারো কাঁচাপাকা চুলের গোছায় ঘেরা ধূসর অস্পষ্ট মুখখানা যেন কঠিন বট-অশ্বথের ঝুরি নামা মন্দিরের কবাটভাঙা দুয়ারের অন্ধকার, কারো মুখে অজস্র কাটাকুটি রেখা যেন বিকেলের নদীর চরে পাখিপক্ষীর সারা দিনের পায়ের দাগ, একজনের সামনের দাঁত ক্ষয়ে গিয়ে দুপাশের দাঁতদুটো লম্বা আর বাঁকা হয়ে এমনভাবে নিচের ঠোঁটের উপর চেপে বসেছে যেন মনে হয় সে মানবী না, প্রত্নযুগের বৃহৎদংষ্ট্রা বাঘিনী, এখন বিরক্ত, মন্থর। আর মাণিক্য বুড়ী তো প্রাচীন মাতৃকাগোষ্ঠীর একজন-- ঘন সাদা চুল পুরুষদের মতো ছোট করে ছাঁটা, কঠিন সোজা নাক, কঠিনভাঁজ চিবুক, রোখা সাবলীল দেহ-- সে যে-কোনো যুদ্ধে তলোয়ার হাতে এগিয়ে যেতে পারে, যদিও এখন শুধু ছাগল পোষে এবং সুদ নিয়ে টাকা ধার দেয়। ঐ দলের মধ্যে শুধু সে-ই পান খেত না, তামাকপাতা খেত। 

আমাদের কুটুম্ব মহিলারা, কদাচিৎ হলেও, যখন আসতেন পরিপাটি সেজেই আসতেন। তাঁদের দেহ ও ব্যক্তিত্বে আমি একটা অচেনা রহস্যের আভাস পেতাম। আর একটা উন্মোচনও হত: আমরাও ভদ্রশ্রেণীর। 

ঠাকুমার আরেকজন বন্ধু ছিল বাবুরালি-আমরালি শেখের মা। ওরা দু ভাই ঢুলি সেজে আমাদের দুর্গাপুজো, কালীপুজো, রটন্তীপুজোয় ঢোল বাজাত আর ধুনকর হয়ে শীতকালে লেপ-তোশক তৈরি করে দিত। বাবুরালির মা, যেহেতু মুসলমানী, এলে আমাদের দাওয়ার নিচে ছাঁচতলায় বসত পিড়ি পেতে। ঠাকুমা বসতেন দাওয়ায়। সেখান থেকেই দুই সখীতে আদানপ্রদান হত। আমি ঐ বয়সেই বুঝতে পারতাম, নেহাত ছোঁয়া নিষেধ তাই, নইলে ঠাকুমা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেন। 

একদিন বাবুরালির কাঁধে চেপে ঠাকুমার সঙ্গে তাদের বাড়ি গেলাম। বড় বড় গাছের অপরাহ্নছায়ায় তাদের পাটকাঠির কুঁড়ের বাইরে বাবুরালির মা বসেছিল, বিধবা, সাদা সন্ধ্যামণির হালকা ঝোঁপের মতো। আমি ইতস্তত ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম-- অযত্নে, বন্য গুল্ম-লতা ঘন হয়ে এগিয়ে আসছে চারদিক থেকে। ঘরের মধ্যে অন্ধকার। একটা কানাভাঙা আমানির কলসি এক জায়গায় বসানো। হাঁস মুরগি কিছু নেই, গাছে বনের পাখি ছাড়া আর কোনো জীবজন্তু নেই। ওরা বোধ হয় জীবনেও গোমাংস খায় নি। পাবে কোথেকে ? 

ঠাকুমার সঙ্গে, এবং পরে আমি একা একা, সাঁকো পেরিয়ে কামারবাড়ি, গোয়ালবাড়ির অনেক ঘরে বহুবার গেছি। ওরা আমাদের চেয়ে বর্ধিষ্ণু, কিন্তু জান্তব। সোনারুপোর স্যাকরাদের চেয়ে লোহার কামাররা বেশি শক্তিশালী এবং বেশি জান্তব। ওদের বিয়ের পাট অতি অল্প বয়সেই চুকে যেত। বিয়ের উষা থেকে স্ত্রীলোকেরা একঘেয়ে সুরে বিয়ের গ্রাম্য গান গাইত। বিয়ের পর মেয়ে যখন প্রথম ঋতুমতী হত তখন তাকে নিয়ে রীতিমতো মেয়েলি উৎসব হত। ওরা বলত, অমুক ফল দেখেছে। ফিসফিস করে মেয়েরাই এ পাড়ায় ও পাড়ায় সেই খবর ছড়াত। আমি বুঝতে পারতাম না, ফল দেখা কি। আমাদের মেয়েরা কোনোদিন ফল দেখত না। অথচ কী গভীর ব্যঞ্জনাময় এই লৌকিক শব্দটি ! 

ওদের কিশোরী এবং যুবতী মেয়েরা খুব চ্যাপটা করে মস্ত খোঁপা বেঁধে তাতে গোছা গোছা ঝুমকো ঝোলানো কাঁটা গুজে বিকেলে সাজ করত, পাছাপেড়ে শাড়ি আর ভারী ভারী গোট মল অনন্ত পরে ঝমর ঝ্মর করে এ ঘর ও ঘর করত, বিনবাতাসে হেলেদুলে খালের ঘাটে এসে পোষা হাঁসদের ডাকত--- চৈ চৈ চৈ চৈ চৈ ! 

গোয়ালাদের মেয়েরা কিন্তু কামারদের তুলনায় ছিল সুকুমারী। কামার-রমণীদের দেহে ধাতুর ধার এবং কলঙ্ক, গোয়ালিনীদের শরীরে ক্ষীরের গভীর লাবণি । কিন্তু গোয়ালাদের মেয়েরাও ফল দেখত। 



।কলকাতা । 

মা মারা যাবার বছরখানেক পরে দিদিমা আমাকে দেখতে চাইলেন। ঠাকুমার সঙ্গে আমি সেই প্রথম কলকাতায় এলাম। সেই আধ শতাব্দী আগেকার কয়েকটি নগরদৃশ্য আজও আমার মনে আছে। মিরজাপুর কিংবা অখিল মিস্ত্রি লেনে ছিল সেই বাড়িটা। শানবাঁধানো ছোট উঠোনের একধারে বিরাট চৌবাচ্চা জলে টইটুম্বু, তলাটা নিস্পন্দ সবুজ, রহস্যময়-- আমি নামলে তলিয়ে যেতে পারি। সমস্ত জায়গাটা ছ্যাৎলা পড়া, রোদহীন। বাড়িওলা সোনার বেনে এবং মাতাল। গভীর রাত্রে তার দোতলার মহল থেকে অপ্রকৃতিস্থ চেঁচামেচি শোনা যেত। তাকে দেখি নি। তার যুবতী বোন নীহারকে দেখেছি যখনতখন গল্প করতে নেমে আসত। প্রগাঢ় সুন্দরী এবং প্রগলভা। ঐ রকম চুম্বক রহস্য এর আগে দেখি নি। সে আমাকে বুকে চেপে ধরে চুমু খেলে ভিতরের পাখি ছটফট করে উঠত, কিন্তু আমি নড়তে পারতাম না। দিদিমা তার রূপের সুখ্যাতি করলে অলজ্জভাবে বলত, ‘আপনার ছেলে আমার চে বড় হলে বে দিতেন বুঝি ?’ 

ভিতর-উঠোনের বারান্দায় একটা তক্তপোশ পাতা ছিল। সেখানে আমার তরুণী ছোটমাসি পড়াশোনা করত। তার মুখে সরু দড়ির লাগাম দিয়ে আমি ঘোড়ায় চেপে ছিপটি লাগাতাম। ছোটমাসি চমৎকার মেয়ে। ঐ সংসারের দেনা-পাওনায় জড়িয়ে যাবার জন্য সে আসে নি। কয়েক বছরের মধ্যেই টাইফয়েড হয়ে মরে গেল। অনেক কাল পরে, এক দূরদেশে, ভুলে যাওয়া বাতিল জিনিসের আস্তানায় একটা স্টিল ট্রাংকের মধ্যে আমি তার লম্বা চুলের গোছা এবং গানের খাতা আবিষ্কার করেছিলাম। শুকনো চুলের গোছা হাতে নিয়ে স্তম্ভিত আমি যেন স্পষ্ট দেখলাম: ছোটমাসি দৌঁড়ে চলে যাচ্ছে নাগালের বাইরে— তার দীর্ঘ দীর্ঘ চুলের প্রান্ত এখনও উড়ছে ইহলোকে। ইহজগৎও স্থির পরজগৎও স্থির, মাঝখানে শুধু আমিই কাঁপি। 

সন্ধ্যারাত্রে একদিন হগসাহেবের বাজারে যাওয়া হল। কী আলোর বাহার ! কী অবাক করা জিনিসপত্র ! একটা দোকানে মস্ত শো-উইন্ডো জুড়ে একটা মানুষপ্রমাণ আলুর পুতুল কেবল ডাইনে বাঁয়ে যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়ছিল। আমাকে বোঝানো হল, ওটা মাতাল পুতুল। পুতুলটা উজ্জ্বল, বিরাট এবং অস্বস্তিকর বলেই তাকে মনে আছে। 

একদিন রাত্রির কলকাতায় একটা দোতলা ছাদহীন বাসে সবাই মিলে উঠেছিলাম। মাথার উপর কী সুন্দর কালো তারাভরা আকাশ, আর গ্রীষ্মের গভীর বাতাস। রাস্তায় গ্যাসের মৃদু আলোর সারি। চারদিকের সীটে সুবেশ মানুষ। শহরে যে-সুখ বাস করে এতক্ষণে ঠিক তার গন্ধটি পেলাম। 

গভীর রাত্রে বাড়ির গলি দিয়ে কুলপি বরফ হেঁকে গেলেই একটি আদায় করতাম। অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে সাদা কুলপি থেকে ধোঁয়া উড়ত। মুখে দিলেই যেন জিভ পুড়ে যেত। গরম কুলপি আস্তে আস্তে শীতল হত আর গলত। খুব ঠাণ্ডার স্পর্শানুভূতি যে পোড়ানির তা মনস্তত্ত্বের বই পড়ার বহু আগেই হাতেকলমে জানা হল। 

কলকাতায় এলেই গঙ্গাস্নানে যেতে হয়। একদিন দুই বেয়ান গঙ্গাস্নানে চললেন, সঙ্গে আমি। তাদের বুক পর্যন্ত জলে গঙ্গা ঢেউ দিচ্ছেন। আমাকে ঠাকুমা বুকে জড়িয়ে আছেন ডুব দেওয়াবেন বলে। হঠাৎ সেই অবস্থায়, আমাকে নিয়ে দুই বেয়ানে একটা প্যাক্ট হল: বড় বেয়ানের দেহরক্ষার পর আমি ছোট বেয়ানের কাছে হস্তান্তরিত হব। আমি তখনই আক্ষরিকভাবে ছোট বেয়ানের কাছে হস্তান্তরিত হলাম। আমাকে বুকে নিয়ে দিদিমা ভুস ভুস করে তিন বার গঙ্গায় ডুব দিয়ে ঐ মর্মে তিনসত্য করলেন। দু মিনিটে আমার পরভৃত জীবনের বীজ পত্তন হয়ে গেল। এবং যথাকালে ঐ সত্যের কথা সবারই মনে পড়েছিল। 

এর পর কলকাতার স্বল্পকালীন নবাবী শেষ করে আমি আবার গ্রামের মন্থর এবং গভীর জীবনে ফিরে এলাম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন