শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

রমেশ গুনেসেকেরা'এর গল্প : সড়কশব

অনুবাদ : আলম খোরশেদ 

কিলিনচ্ছিতে কাটানো প্রথম রাতটায় আমার খানিকটা ভয় ভয় করছিল। শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসকারী আমাদের অধিকাংশেরই ধারণা, এই শহরটা সন্ত্রাসের স্নায়ূকেন্দ্র। আমার প্রথম মালয়েশিয়ান মক্কেল মি. ওয়াহিদ বলেন, ইংরেজিতে তো এমনকি এর নামটাকেও নির্মম শোনায়-- অনেকটা এমন এক শহরের মত, যেখানে ক্লিন্ট ইস্টউডের কোন চরিত্রকে হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে তার রাইফেলের বাঁটে আরও একটি অর্থহীন হত্যাকাণ্ডের হিসাব দাগাতে দেখা যায় হামেশাই।
বাস্তবে, কিলিনচ্ছি বহু বছর ধরেই ছিল লিবারেশন টাইগার্স অভ তামিল ইলম এর রাজধানী। এখানেই ছিল টাইগারদের নগরকেন্দ্র, তাদের সচিবালয় আর সংবাদ সম্মেলনের স্থান। এখান থেকেই টাইগার টিকিট, এলটিটিই ভ্রমণ পারমিট, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, স্থলমাইন আর ডোরাকাটা গ্রেনেড-- সব সরবরাহ করা হত। ইলম ব্যাংকও এখানেই ছিল, অনেকটা সুইস কায়দায়, যেটা গৃহযুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ লালবাতি জ্বালায়। এই সেই স্থান, ২০০৯ সালের জানুয়ারির শেষ যুদ্ধের সময় যেখানে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীকে সারবেঁধে, একটানা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে শহরে ঢুকতে দেখে, টাইগাররা পানির ট্যাংকি উল্টে ফেলে, মিউনিসিপাল বিল্ডিং গুড়িয়ে দিয়ে, শহরটিকে একপ্রকার ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে অবশেষে ক্রমবিলীয়মান অরণ্যে আশ্রয় নিয়েছিল। 

কিন্তু এখন, দুবছর বাদে, আমি সড়ক-সজারু আর পথ-ইঁদুরে ভরা হাইওয়েটা ছেড়ে স্পাইস গার্ডেন ইন এর ঝাঁ চকচকে সম্মুখ উঠোনে প্রবেশ করি, যাকে কিনা সহজেই পূর্ণসাজের কলম্বো হোটেল করপোরেশনের সর্বসাম্প্রতিক সংস্করণ বলা যেতে পারে: রঙিন পতাকা, ফিতা আর ঝালরসজ্জিত তার উত্তুরে ভগ্নিবিশেষ। কাচের দেওয়াল-ঢাকা ক্যাফেটেরিয়াটি চকচক করছিল আর তার অর্ভ্যথনাকেন্দ্র উপচে পড়ছিল নারকেল ফুল আর বাগানবিলাসে। মোমপালিশ, জীবাণুনাশক আর তিলের তেলে ভাজা কারাপিঞ্চা পাতার ঘ্রাণ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া প্রাণিসমূহের গায়ের গন্ধের রেশটুকু ঢেকে দিয়েছিল। হোটেলটি যেন পুরনো এই শহরের নতুন যুগে প্রবেশের ঘোষণা দিচ্ছিল। 

আমার গাড়ির মাঝের আসনে পা ছড়িয়ে বসা সাত মাসের র্গভবতী মিসেস অরুণাচলম, তাঁর এই এগারো ঘণ্টার জাফনাযাত্রার পথটিকে ছোট ছোট পর্বে ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন, অনেকটা গুড়লোভী পিঁপড়েদের মত। যেভাবে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন আর অনুযোগ করছিলেন, তাতে তাঁর একেবারে ভ্রমণ করাটাই উচিত ছিল না, কিন্তু তাঁর স্বামী তাঁকে জাফনার একটা জায়গা দেখাতে আগ্রহী ছিলেন খুব, যেটা কিনে তিনি তাঁদের নতুন পারিবারিক বাড়ি বানানোর কথা ভাবছিলেন, ফলে তাঁকে আসতেই হয়েছিল। 

”বসন্ত, বাঁকগুলোতে তুমি আরেকটু আস্তে যেতে পারো না?” রাজাগিরিয়া থেকে তাঁর এই জীবনের স্মরণীয় যাত্রায় রওনা হবার পর থেকেই তিনি রাগত পুনরাবৃত্তির স্বরে বলতেই থাকেন। 

”হ্যাঁ, মেমসাহেব।” আমি বলি। হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি এরই মধ্যে রক্তপাতের বাঁকখানি ছাড়িয়ে চলে এসেছি। 

তিনি যখন পতাকা ও ঝালরগুলো দেখতে পেলেন তখন উল্লসিত হয়ে উঠলেন। ”এই তো সেই জায়গা। এটাই তো আমরা রাতে থাকার জন্য ঠিক করেছি, কল্লু। খুব সুন্দর না এটা?” 

তার স্বামী সামনে ঝুঁকলেন। ”ঠিক, এখানে তুমি খুব শান্তিতে বিশ্রাম নিতে পারবে।” 

আধঘণ্টার মধ্যেই তাঁরা মুর্গির মাংসের তরকারির পাত্রের সেরা অংশটির ওপর হামলে পড়ে, তাঁদের ওপরতলার ঘরে চলে গেলেন বিবাহপূর্ব অন্তরঙ্গতাগুলো ধীরে উগরে দেবেন বলে। আমি যখন ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে পৌছুঁই তখন সেটা শূন্য হয়ে গেছে, কেবল দেয়ালে হেঁটে বেড়ানো কিছু পোকামাকড় আর ঘাড় টেপারত এক গোমরামুখো পরিচারক ছাড়া। 

”খাবার দেওয়া আছে।” সে তরকারির পাত্র আর সিদ্ধ ভাতের বেসিনটি দেখিয়ে বলে। আমাদের লাল-সবুজ-হলুদ আলোর জন্য মরিয়া আধুনিকায়নের আগে যে একধরনের রোবটসদৃশ ট্রাফিক পুলিশ ছিল, তেমন চাকরিতেই বুঝি তাকে মানাতো ভাল। 

আমি একটা থালা নিয়ে তাতে সর্বশেষ মুর্গির হাড়গুলোর কয়েকটা আর দুচামচ ভাত বেড়ে নিই। আমি এর চেয়েও খারাপ খেয়েছি, তবে এর চেয়ে খুব বেশি নয়। আপনি যখন গাড়ি নিয়ে দেশের এমাথা থেকে ওমাথা যাতায়াত করবেন তখন সিদ্ধ ভাতের মত সাধারণ একটা জিনিসের মধ্যেও যে কত বৈচিত্র্য থাকতে পারে সেটা লক্ষ করতে বাধ্য হবেন। কখনও মনে হবে আপনি নুড়িপাথর চিবুচ্ছেন, অন্য সময় মনে হবে তুলো খাচ্ছেন। স্পাইস গার্ডেন ইন এর ভাতগুলোর আনুগত্য ছিল নিঃসন্দেহে পাথরের প্রতিই। তবে যুদ্ধ আর শহরের প্রতিটি দেওয়াল জুড়ে লড়াইয়ের পর এটা খুব একটা আশ্চর্যের না যে, ভাতও এখানে পাথর হয়ে গেছে। এই জায়গাটিতে বুলেট ও মর্টার ঠিক কী কাণ্ড ঘটিয়েছে সেই ভাবনাটুকুই আমাকে শান্ত করে। আমার তখন একটা বিয়ার দরকার হয়ে পড়ে। 

আমি বেয়ারাকে একটা বিয়ার দিতে বলি, আর অলসমনে ভাবি কী ধরনের বিয়ার আছে তাদের কাছে: আমদানি-- করা নাকি টাইগার বিয়ার? 

সে পেছনে অদৃশ্য হয়ে যায়। যখন ফিরে আসে তখন তার হাতে ধাতব ট্রেতে করে আনা একটি লম্বা, থ্রি কয়েনস এর কালো বোতল, আর পেছন পেছন ধূসর পাতলুন-পরা একজন তরুণী। ঘরের ভেতর অর্ধেক ঢোকার আগেই সে বেয়ারাকে অতিক্রম করে ফেলে, এবং পথ থেকে একটা ধাতব চেয়ারকে ধাক্কা দিয়ে এনে আমার টেবিলের সামনে থিতু হয়। 

”স্বাগতম।” সে হাসি দিয়ে ঠোঁট খোলে তার, যদিও তার মুখের একটি পেশীও নড়ে না। তার চোখজোড়া মনে হয় আমার মাথা, ঘাড় এবং বুকের ঠিকঠাক মাপের হিসাব কষতে ব্যস্ত। সে আমার হাতের অবস্থান এবং আঙুলের নখের অবস্থাও যাচাই করে। ”কলম্বো থেকে?” 

”জাফনা ভ্রমণ।” আমি মাথা নেড়ে বলি। 

”ও, এখানে তাহলে যাত্রাবিরতি।” 

”সেটাই তারা চেয়েছিল। আমার মক্কেলের প্রচুর বিশ্রাম দরকার।” আমি আমার পেটে হাত বুলাই, যেনবা আমিই গর্ভবতী। 

”ড্রাইভারদেরও বিশ্রাম দরকার। সারাদিন গাড়ি চালানো চাট্টিখানি কথা নয়, না?” 

আমি কাঁধ ঝাঁকাই। একবার চালকের আসনে বসার পর চোখ খোলা রাখাটাই আসল কথা। হয়তো পুরোটা নয়, তবে মোদ্দা কথা বটে। উত্তরের দিকে যাওয়া এইসব দীর্ঘ শূন্য রাস্তায় এমনকি আপনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াসমূহের গতিও তেমন জরুরি নয়। আমরা এখন যুদ্ধে নেই। ”জায়গাটা খুব সুন্দরও।” 

সে তখন আমার দিকে তাকায়, যেনবা সে বুঝে নিতে চাইছে আমি সত্যি বলছি কি না। যেনবা তার কোন দাম আছে। ”আমি ম্যানেজারের সহকারী। মিস সরস্বতী। আমার কাজ হচ্ছে এই হোটেলটাকে খুব আপন করে তোলা, যেন জাফনাগামী সব পর্যটকেরই নিয়মিত যাত্রাবিরতির ঠিকানা হয়ে ওঠে তা।” সে থামে। ”সকালের নাস্তা, দুপুরের খাওয়া, নৈশভোজ এমনকি রাত্রে থাকার জন্যও। আমরা সবকিছুই করতে পারি।” 

আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, সে তা পারে। তাকে খুব চৌকসই মনে হলো, যদিও নিশ্চিতভাবেই তার একটি ভাল বাবুর্চি দরকার। 

”আপনি কি কোন হোটেল-স্কুলের ছাত্রী? ক্যাটারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট? জীবনে আমার চেয়ে যারা বেশি সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা সবসময়ই আমাকে মুগ্ধ করে।"

”আমাদের অনেক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।" সে বেয়ারাকে ট্রে নামিয়ে রেখে আমার গ্লাসে অর্ধেকটা বিয়ার ঢালতে দেয়। ”আমাদেরকে সব ধরনের অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হয়। আমরা যদি মনোযোগ ঠিক রাখি তাহলে সব সমস্যার মোকাবিলা করতে পারি।” তার চোখে সেইরকম তিক্ত চাহনি ছিল যখন মেয়েরা বুঝতে পারে তাদের সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। 

ফেনাটা থিতিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করি আমি। ”এখানে এরকম একটা কিছু শুরু করা নিশ্চয়ই খুব কঠিন ছিল। দক্ষিণে ইটিরা এখন পাইপ থেকে সিমেন্ট বেরুনোর মত করে জমা হচ্ছে, কিন্তু এখানে নিশ্চয়ই সব স্থানীয়রাই, না?” 

”সিমেন্ট?” সে ধন্দে পড়ে যায়। ” ইটি?” 

”আমি বিয়ার কিংবা পানির কথাও বলতে পারতাম, কিন্তু আমি চতুর্দিকে তৈরী হওয়া নতুন হোটেলগুলো আর ইউরোপিয়ান টুরিস্টদের কথাই ভাবছিলাম; এমনকি নর্ডিকেরাও খুশিমনে রোদ পোহাচ্ছে এখানকার সমুদ্রসৈকতে।” আমি যখন এটা বলছিলাম, তখন আমার মনে হলো, আমি যে ছবিটা আঁকতে চাইছি সেটা এই বোমার ভাগাড়ে সম্ভব নয়। আমি কিছুটা বিয়ার গিলে, বোতলের বাকিটুকু গ্লাসে ঢেলে নিই, একটু দেরিতেই এটা ভাবতে ভাবতে যে, আমার তাকেও কিছুটা সাধা উচিত ছিল। ”আপনার বাড়ি কি কিলিনচ্ছি?” 

”কাছেই। সে মাথা ঝাঁকায়।” আমি জাফনা যাই, পরে এখানে আসি।” 

”কলেজে?” আমি প্রশংসার স্বরে জিজ্ঞাসা করি। 

”অনেকটা সেরকমই।” 

”যুদ্ধের ---” 

”হ্যাঁ।” শব্দটি দ্রুত ও নির্ভুল ছিল। তার ব্যক্তিত্বে শুধু ভাবগাম্ভীর্য এবং দৃঢ়চিত্ততাই ছিল না, টেলিভিশনের ব্যালেরিনা নাচিয়েদের একজনের মত সে ছিল ধনুকের ছিলার মত টানটান। তার প্রতিটি চাহনি ও চলন ছিল একটি বৃহৎ লক্ষ্যের দিকে ধাবিত। দ্য স্পাইস গার্ডেন ইন তাকে পেয়ে নিশ্চিতই ভাগ্যবান: এখানে সে থাকলে এটা কিছুতেই ব্যর্থ হতে পারে না। 

বেয়ারাটি, যে ঘরের পেছনে গিয়েছিল, সে, ”ইঁদুর” বলে হঠাৎ চিৎকার দিয়ে ওঠে। 

মিস সরস্বতী একটা ঘূর্ণি দিয়ে পেছন ফেরে। একটা বড় বাদামি ইঁদুর মেঝে দিয়ে তড়িঘড়ি করে দূরে কোনার আলমারিটার দিকে ছুটে যাচ্ছিল। সরস্বতী খুব জোরে ও তীক্ষ্ণভাবে হুশ করে উঠলে সেটি মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। পরে আবার সামনে এগুতে চাইলে সে আমার বিয়ারের বোতলটি ঘাড়ে ধরে তার দিকে ছুঁড়ে মারে। বোতলটি ইঁদুরটিকে এত জোরে আঘাত করে যে, বেচারা একেবারে দেয়ালের গায়ে থেঁতলে যায়। বোতলটি না-ভেঙে মেঝেতে গড়িয়ে যেতে থাকে। তার তলাখানি ইঁদুরের মাথাটিকে একেবারে চুরমার করে দিয়েছিল। 

”এটিকে পুড়িয়ে ফেলো,” সে বেয়ারাকে আদেশ করে। ”একটা প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করবে। পরে হাত ধুয়ে ফেলবে।” তারপর আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, ”খুব দুঃখিত। আমি আপনাকে আরেকখানা বোতল এনে দেব।” 

আমি মিস সরস্বতীর দিকে তাকাই। ”আপনি জাফনার হোটেল স্কুলে এসবও শিখেছেন?” 

সে যখন আরেকটা বিয়ারের বোতল আনতে গেল তখন আমি বসে আমার খাবারের প্লেটের দিকে তাকাই। ইঁদুর নিয়ে, কিংবা তাকে মেরে ফেলা নিয়ে, আমার কোন মাথাব্যথা নেই; আমি শুধু তার কীর্তি দেখে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলাম। যে-নিখুঁত নিশানা করে সে বোতলটা ছুঁড়ে মেরেছিল সেটা সত্যি অসাধারণ। 

সে যখন ফিরে এল, তখন তার মুখের বিনম্র হাসিটিুকুও যথাস্থানে ফেরত আসে। ”দুঃখিত,” সে আবার বলে এবং নতুন বোতলটি আমার সামনে রাখে। সে বসে। ”প্লিজ খান।” 

আমি আমার থালাটা ঠেলে দিই। 

”কী? খিদে নেই? ভাববেন না। এটা তো মরেই গেছে, না?” 

”আমি খেয়েছি।” 

”সারা শহরেই তারা রয়েছে, কিন্তু আমরা ওগুলোকে হোটেলে আসতে দিই না। আমি মনে করি অতিথিরও এগুলো দেখা ঠিক নয়।” 

”হ্যাঁ, সত্যি। অতিথিরা এতে সহজেই বিচলিত হয়ে যেতে পারে।” 

”সাধারণত কুকুরেরাই এসবকে দূরে রাখে।” 

”কুকুরেরা ভালো। হ্যাঁ।” আমার একসময় একটা কুকুর ছিল, ছোট টেরিয়ার। এটি ছিল আমি কলম্বোতে যে-এক ড্যানিশ ভদ্রলোকের কাজ করতাম আমি, তাঁর। তাঁর যখন লাওসে পোস্টিং হলো তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এই ছোট বাচ্চাটিকে তার পক্ষে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আমি সেটিকে দেখাশোনার প্রস্তাব দিই, আর যখন বলি যে, আমি একটা ছোট বাগানঅলা বাড়িতে বাস করি, তখন তিনি সম্মতি দেন। কিন্তু এক বছর পরে কুকুরটি মারা যায়। একদিন সে গেট দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যায় এবং বড় রাস্তায় দ্রুতগতির ভিআইপি বহরের জনৈক মন্ত্রীর গাড়িতে ধাক্কা খায়। এটা ঘটেছিল অনেক আগে-- এটা বর্তমান সরকারেরও কোনো দোষ নয়-- আর আমি সেটা তাকে বলতামও না, যদি সে জানতে না চাইত। 

সে মাথা নাড়ে, যেনবা এইসব ছোটখাট হত্যাকাণ্ডগুলো রাজনীতি কিংবা হোটেল ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিক অঙ্গ। সে টেবিলের ওপর ক্রোম ক্লিপে আটকানো দুটো ন্যাপকিনের একটিকে টেনে নিয়ে কফিনের কাপড়ের মত মসৃণ করতে থাকে। ”মৃতকে কবর দিয়ে সামনে এগুতে হবে আপনাকে।” 

”কবর দেওয়া না পুড়িয়ে ফেলা?” 

”তাতে কিছু যায় আসে না। যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে আপনি ভেতরে কী বহন করছেন?” তার মুখ, আমার ধারণা কিছুটা রাগে ও দুঃখে কঠিন হয়ে আসে। সে আর কুকুর কি ইঁদুর নিয়ে কথা বলে না। 

আমি জানতে চাই আমাদের সাগর ছাপিয়ে যে-পৃথিবী, তার কথা। সেইসব দূরবর্তী দেশের কথা যেখানকার মানুষেরা ভিন্নভাবে আচরণ করে। আমি তাদের খাদ্য ও প্রথার কথা জানতে চাই। কীভাবে তারা বৃষ্টি ও শীতের মোকাবিলা করে। রাস্তার অপর পার্শ্ব দিয়ে গাড়ি চালাতে কেমন লাগে। আমি বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করি, কেননা তারা এমনসব জায়গার ছবি মেলে ধরে আমার সামনে, যেগুলো স্পর্শে, স্বাদে, গন্ধে, শব্দে এবং চেহারায় আমি যে-জায়গাটায় আটকা পড়ে গেছি তার থেকে আলাদা। আমি দেখি তারা কীভাবে বসে, হাঁটে, কথা বলে, আমি আরও দেখতে চাই তারা কোথা থেকে পালাতে এবং কোথায় ফিরতে চায়। তারা একটি নতুন জায়গায় গিয়ে কেবল যৌনতাড়না দ্বারাই চালিত হয় না। কেউ কেউ আমাদের ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি এবং আমরা যেভাবে জীবন যাপন করি সে-বিষয়ে জানতে চায়। আমিও তা-ই করি। মাঝেমধ্যে আমার মনে হয় আমরা কীভাবে চলছি! এত কম জানি আমরা, যতটুকুই জানি তাতেও কত বিভ্রান্তি। মিস সরস্বতী আমাকে অবাক করেছে। তাকে মনে হয় অন্য কোনো জায়গা থেকে এসেছে: কিলিনচ্ছি না, জাফনার কোনো হোটল কলেজ নয়, ধারেকাছের কোনো জায়গা নয় বরং কোনো অন্ধকার, গভীর ও ক্ষুধার্ত স্থান থেকে। বাগানের প্রান্তসীমার অন্ধকারের ওপারের কোনো জায়গা থেকে, যেখানে এমনকি চাঁদের আলোও চিমসে যায়। অবশ্যই, আমি তার গাইড নই, বরং সে-ই আমার, মানে মোজাটা আসলে ভুল পায়ে, যদি বুঝে থাকেন আমি কী বলতে চাইছ। কিন্তু তবুও আমি তার সম্পর্কে জানতে চাই। 

”আপনার পরিবার? তারা কি এখানেই?” এটা একটা আলাপের সূত্রপাত হতে পারে, আমি ভাবি। 

”আপনি কি এসব অঞ্চলে আগে এসেছেন, ড্রাইভার মহাশয়?” 

”বসন্ত,” আমি বলি, এবং যোগ করি, "আমি জাফনা পর্যন্ত কয়েকবারই যাতায়াত করেছি।” 

”তাহলে আপনি নিশ্চয়ই জানেন পরিবার সম্পর্কে বেশি কিছু জিজ্ঞাসা না করাই ভাল এখানে। কারও বাবা কিংবা মা কিংবা ভাই কিংবা বোন সম্পর্কে জানতে না চাওয়াটাই উত্তম।” 

”কেন?” 

সে আমার দিকে এমনভাবে তাকায় যেন আমার খুলিতে কিছু নেই। ”একটা যুদ্ধের পর অতীতের কথা জানতে না চাওয়াই ভাল।” 

সেটা ঠিক নয়, আমি ভাবি। এত বড় একটা বিপর্যয়ের পরই তো, কেউ না কেউ তা জানতে চাইবে, নয় কি? তা নইলে আমরা জানব কী করে সত্যি সত্যি কী ঘটেছিল? এবং আমরা যদি তা না জানি, তাহলে কি তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না? অন্তত, আমাদের উচিত হবে না যুদ্ধ ও আধাসিদ্ধ রাজনৈতিক নীতিমালা দিয়ে আমাদের স্বাভাবিক কৌতূহল ও চটজলদি আলাপ জমানোর নিজস্ব সংস্কৃতিকে নষ্ট করা। তবে আমি তার কিছুই বলি না। আগে যেমনটা ছিল, সেরকম আলাপচারিতার মানসিকতায় সে আছে বলে মনে হলো না, তদুপরি সে যেন এখানে থেকেও নেই। আতিথেয়তার শিক্ষা, আমি ভাবি, আপনাকে হাসি দিয়ে আপনার অনুভূতি লুকাতে, কিংবা শ্রীলঙ্কানদের যে-সহজ উষ্ণ মুখভঙ্গি, আমাকে বিদেশি অতিথিরা যেমন বলে থাকে, তাকে আরও চকচকে মসৃণ করে তুলতে সাহায্য করে। তবে মিস সরস্বতীর ক্ষেত্রে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ মনে হলো আমার। সে ঠিক স্বাভাবিক নয়। সে লুকোতে জানে, তবে অন্যটি তেমন পারে না। তার নাম রাখা হয়েছে বিদ্যাদেবীর নামে, কিন্তু সে মনে হয় বিশ্বাস করে অজ্ঞতাই আশীর্বাদ। সে যখন দরজার দিকে যায়, তখন আমি তার ঘাড়ের নিচে যেখানে চামড়াটা একটু ভাঁজ খেয়েছে, সেখানে বড় একটা আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাই। আবার যখন পেছন ফেরে তখন সেটা কলারের নিচে আবারও অদৃশ্য হয়ে যায়। 

ড্রাইভারদের থাকার জায়গায় বরাদ্দ আমার কামরাটার দরজা খুলে আমি বসে ছিলাম। বারান্দায় ক’টা ধূপকাঠি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল মশা তাড়ানোর জন্য। একমাত্র যে-শব্দটি শোনা যাচ্ছিল সেটি আরেকটু দূরে জ্বালানো ফ্লুরোসেন্ট বাতিটির মৃদু গুঞ্জনধ্বনি। আমি যখনই বিদেশিদের নিয়ে রাতের বেলায় এমন গ্রামাঞ্চলের দিকে গেছি তারা অবধারিতভাবে এই গভীর অন্ধকার নিয়ে মন্তব্য করেছে। আমি ভাবতাম, এর অন্যথা আর কীইবা হতে পারত? তবে এই কথা এতবার শুনতে শুনতে আমি এখন নিজেও তাদের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করেছি, এবং এখন আমার চোখেও কলম্বোর বাইরের রাতগুলোকে খুবই অন্ধকারাচ্ছন্ন লাগে। এই অন্ধকার বুঝি কালির মত চোখের ভেতর দিয়ে আপনার মগজে গিয়ে পৌঁছে। আমার ভেতরে যা ঘটছে, তা বাইরে যা হচ্ছে তার চেয়ে আলাদা কিছু নয়। সেটা আমাকে মৃত্যুচিন্তায় আচ্ছন্ন করে, যার কোনো অর্থ নেই, এবং যা কাউকে কোনো সাহায্যও করে না। কিন্তু তখন অন্য কিছু ভাবাটাও কঠিন। যৌনতা, তারুণ্যে যে প্রতিষেধকের জন্য আপনি সর্বদা উন্মুখ, সেটা আপনি যখন এক জনবিরল অঞ্চলের ড্রাইভার কোয়ার্টারের ঘরে বন্দি তখন বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করে না; আর রাজনীতি, আরেক মৌল তাড়না, আজকের দিনে কিছুটা দুঃম্বপ্নের মতই। অপরাধ-- মানে অপরাধের গল্প, খোদ অপরাধ নয়-- এক্ষত্রে সবচেয়ে ভাল কাজ করে, এবং আমি আমেরিকা ইংলন্ডের অপরাধের গল্প খুব পছন্দ করি। বলিউড গানবাজনার দিকে থেকে এগিয়ে থাকলেও, পাইনউড কিংবা হলিউড কিন্তু অপরাধের বিষয়টাকে তাদের কব্জায় নিয়ে ফেলেছে। তাই, চালানোর মত ঠিকঠাক যন্ত্রপাতি থাকলে একটা নিজস্ব ডিভিডিই কিন্তু সবচেয়ে ভাল। আমি কিছুদিন ধরেই তেমন একটি বহনযোগ্য প্লেয়ার নেওয়ার কথা ভাবছি, আমার কেবল এখন বড়সড় কয়টা বখশিশ দরকার, যাতে করে আমি হাত খুলে খরচের অবস্থানে পৌঁছাতে পারি। 

কিন্তু সে-রাতে, কিলিনচ্ছির সেই নিকষ অন্ধকারে, এই সবকিছুই একসাথে মিলে যেতে থাকে: রাজনীতি, ইতিহাস, এমনকি যৌনতা, মিস সরস্বতীর আদলকে কেন্দ্র করে, যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মৃত্যু ও পীড়ন। আমাদের সবারই একটি ব্যক্তিগত অতীত আছে, চিন্তা, অনুভূতি, সংবেদন, হতাশার গুদাম যার দরজা অন্য কেউ কখনও খুলতে পারে না। সেটাই জীবন। কিন্তু মিস সরস্বতীর বেলায়, আমার মনে হয়েছিল, আরও বেশি কিছু যেন সচেতনভাবে লুকোনো রয়েছে। ঘিরে রাখা একটি এলাকা। আমি ধরে নিই, এটাই স্বাভাবিক। কত কিছুই তো আজকাল আমাদের নাগালের বাইরে রাখা। আমরা অনেক কিছুই এখন আর উচ্চারণ করি না, এমন কিছু যা কেবল আমরা মনেই রাখি না, বরং ইচ্ছে করে ভুলে থাকি, এমন কিছু অঞ্চল যেখানে আমরা যেতে চাই না, এমন স্মৃতি যাদের আমরা কবর দিয়ে রাখি অথবা তাদের নতুন রূপ দিই। এভাবেই বাঁচি আমরা আজকাল: বিস্মৃতি ও বিভ্রমের মাঝখান দিয়ে পথচলার মত। যতক্ষণ আপনি চলছেন, ততক্ষণ ঠিক আছেন-- আপনি এক আপাতনিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করেছেন। এটা কেবল যখন এরকম একটা বিরতিতে এসে থামেন আপনি, গভীর রাতে, এমন এক জনহীন অঞ্চলে, তখনই সবকিছু কেমন গুলিয়ে যায়, এবং আপনি পথের উদ্দেশ্য বিষয়ে ভাবতে শুরু করেন। আপনি অন্ধকারে বসে থাকেন, যে-জীবন আপনি যাপন করেছেন এবং যা করতে পারেননি, তার কথা ভেবে ভীত। আপনি কেবল ভাবতে পারেন, দীর্ঘমেয়াদে হয়তো তাতে তেমন আসে যাবে না, কিন্তু সেটা তার নিজের গুণে কোন স্বান্ত¡না হতে পারে না। 

স্পাইস গার্ডের ইন এর কর্মচারী আবাস, নিদেনপক্ষে ড্রাইভারদের ঘরগুলো নিশ্চয়ই একজন মহাপ্রাণ কিন্তু বিভ্রান্ত উৎপীড়ক কর্তৃক নির্মিত হয়েছে। অত্যাবশকীয় সবকিছুই সেখানে ছিল : বিছানা, টেবিল, চেয়ার, জানালা, বিদ্যুৎবাতি, নারকেলছোবড়ার পাটি ইত্যাদি। দেয়ালগুলোও রং করা। আমার ঘরে হলুদ, পাশের কামরায় সবুজ। কিন্তু তারপরেও এর আবহে কেমন যেন একটা কারাগারের অনুভূতি। ঘরগুলোর নকশা করেছেন যিনি, সেই ভদ্রলোক কিংবা মহিলা, নিশ্চয়ই সেখানে থাকার কথা ভাবেননি কখনও। আলাদা করে প্রতিটি উপাদানই নির্দোষ, ফলে এটা বলা দুরূহ খুঁতটা আসলে কোথায়। আমি শুধু এটুকু জানি, আরাম ও বে-আরামের মধ্যেকার পার্থক্যটুকু আমি ঠিকই অনুভব করতে পারছিলাম। আদর্শাবস্থার পাশাপাশি স্বপ্নভঙ্গের বাস্তবতা। আমি শুনেছি, পেরেস্ত্রোইকার আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের বাস্তবতাও নাকি এরকমই ছিল। 

অমি সিগারেট খেতে বাইরে বেরুই। আমি তেমন সিগারেটখোর নই, তবে এমনও সময় আসে যখন বিষ দিয়ে ফুসফুস ভরাট করার একটা তাড়না জাগে আমার। যদি তাতে ক্ষতিকর কিছু থাকে, আমি তাকে আমন্ত্রণ জানাতে চাই। তাকে নিজের করে নিতে চাই, যাতে করে সেটা দিয়ে আমি পাল্টা কিছু করতে পারি। 

চারধারের সীমানা মুছে যাচ্ছিল কেমন যেন। বারান্দার পাশের একটা সরু পথে আলো আঁধারের মধ্যে আমি হাঁটি, তারপর বাগানে প্রবেশ করি, তখন মনে হয় অন্ধকার বুঝি আমাকে গিলে খেয়ে ফেলবে, কিন্তু একটা সরু আলোর রেখা আকাশ থেকে রুপালি ঝালরের মত চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। আর যখন আমি সিগারেট জ্বালি, তখন তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মত আরেকটা কিছুর জন্ম হয়। দুয়েকটা টান দিয়ে আমি তাকে নিভিয়ে ফেলি এবং অপেক্ষা করি। তখনই আমি তাকে দেখতে পাই। সে হোটেলের প্রধান ব্যালকনিতে, অন্ধকারের চেয়েও ঘন তার দেহচ্ছায়া, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তাকে চিনতে পারি আমি। মাঠের দিকে তাকিয়ে সে, যেনবা কোন এক অন্তহীন স্বপ্নের অভিভাবকের মত। সে ধীরে তার জোড়বাঁধা হাতদুটো খুলে নিচের দিকে নুয়ে পড়ে। সে যখন উঠে দাঁড়ায়, তার হাতে তখন কিছু একটা জিনিসের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। সেটাকে রিভলবারের মত মনে হচ্ছিল, কিন্তু ট্রিগার টিপার পর তা থেকে একটি আলোর রেখা বেরোয়। সে তখন বাগানের প্রান্তবর্তী বেড়ার ওপর আলো ফেলে এবং এমাথা ও মাথা দেখে নিয়ে পুকুরের চারধারেও তাকে চালনা করে। সে কোন এক প্রাণীর চোখ দেখতে পায় এবং তার ওপর তখন আলোটাকে স্থির ধরে রাখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য, অনেকটা মিলিটারির সার্চলাইটের মত। তারপর তার সুইচ নিভিয়ে দেয়, রাত্রির অন্ধকার পুনরায় গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ওঠে। 

সকালে আমি কিছু রুটি ও সম্ভার খেয়ে নিই, তারপর অরুণাচলমদের আসার অপেক্ষা করি। আমি চা-পানের পর ফাও নিই একটা, যেটা প্রায় প্রহসনের মত ছিল, এমনকি গত রাতের ডিনারের তুলনাতেও; তারপর বাগান চেয়ারে বসি, যেখান থেকে নাস্তাঘরখানি দেখা যাচ্ছিল। আমি ভাবি কতক্ষণ ধরে মিস সরস্বতী কাল রাতে ব্যালকনি থেকে হোটেল পাহারা দিয়েছিল, এবং কখন সে আবার তার কাজে ফিরবে। 

মিসেস অরুণাচলমকে দেখার আগেই আমি তার গলার আওয়াজ শুনি। তিনি তাঁর স্বামীর নাকডাকা নিয়ে অভিযোগ করছিলেন, যদিও আমি অনুমান করেছিলাম যে, শয়নকক্ষের রাতের চিত্রটি সম্ভবত উল্টোটাই হবে। প্রত্যুত্তরে মি. অরুণাচলম কিছুই বলেন না। আমি তাঁকে শব্দ-বন্ধ করা সেই হেডফোনের উপকারিতা বিষয়ে সচেতন করার কথা ভাবি, যেগুলো আমার সাম্প্রতিক বিদেশি পর্যটক বন্ধুরা আমাকে দেখিয়ে বেড়াতো। শোনার জন্য নির্ধারণ করা হয়নি এমন কিছুই শুনতে হতো না তাদের এবং এভাবে তারা স্থানীয় শব্দদূষণের দ্বারা তাদের অন্তর্জগতকে কলুষিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারতো। কোলাহলময় পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য এটি একটি প্রশংসনীয় প্রযুক্তি। শত হলেও, দূষণ, এখন পৃথিবীর এক নম্বর সমস্যা। এমনকি মালয়েশিয়াতেও নাকি লোকেরা এই সমস্যায় ভোগে। 

দম্পতি বারান্দায় একটা টেবিল নিয়ে বসে। 

“আমি হ্যাম ডিম আর টোস্ট চাই। তোমার মনে হয় তাদের হ্যাম থাকবে?” মিসেস অরুণাচলম তাঁর চেয়ার ঘষটে সামনে ঝুঁকে বলেন। 

“থোসাই হলে কেমন হয়? ভাল হয় না?” 

“আমার এটাই খেতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। তাছাড়া তোমার অই বাজনার জ্বালায় তো কোন ঘুমই হয়নি রাতে।” 

মিস সরস্বতী তাঁদের মাঝখানে এসে কিছু একটা বলে যায়, যা আমি শুনতে পাইনি। সে মনে হয় শূকরের মাংস ছাড়াই মিসেস অরুণাচলমকে শান্ত করতে সক্ষম হয়। তাঁরা যখন নাস্তা সেরে ওপরে উঠে যান টুথব্রাশ, টুইজার ইত্যাদি হাবিজবি গুছিয়ে নিতে, তখন মিস সরস্বতী আমার কাছে এগিয়ে আসে। 

”আপনি দেখছি একজন শান্তিস্থাপনকারীও,” আমি বলি। 

“আমার যেটা করার দরকার পড়ে তা-ই করি।” সে আমাকে একটা কার্ড দেয়। ”আপনার সব ট্যুরিস্টকে এখানে নিয়ে আসবেন। আমরা প্রত্যেককে সেবা দিতে সক্ষম।” 

“আমি সেটা দেখতে পাচ্ছি,” আমি বলি। “ক্যাটারিং কলেজের দুর্দান্ত প্রশিক্ষণ আপনার।” 

সে তার হাত দুটো জোড়া করে, মাথা নিচু করে। এবার তার জামার কলার বোতাম দিয়ে শক্ত করে আঁটা ছিল এবং কিছুই দেখাচ্ছিল না, তবে আমি লক্ষ করি, তার ডান হাতের ট্রিগার চাপার আঙুলখানির চামড়া কেমন অমসৃণ এবং ফ্যাকাসে। 

তখন মিসেস অরুণাচল আমাকে ডাকেন। “ড্রাইভার এদিকে এসো। তুমি এই ব্যাগটি সিটের ওপরে তুলে দিতে পারো? এটাকে আমি আমার ঠিক পাশেই চাই। আর এসিটাও আগেই চালিয়ে দাও, যাতে করে ভেতরটা সুন্দর, শীতল হয়ে থাকে। আমি আবারও গরম হয়ে উঠতে চাই না।” 

মিস সরস্বতী আমার দিকে তাকায়। আমি চেয়েছিলাম সে হাসুক, এমনকি সেই সাজানো হাসিটাই, কিন্তু তার মুখখানি শূন্য দেখাচ্ছিল। তার কালো চোখ যেন কিছুই বলছিল না। আমি মুহূর্তের জন্য ভেবেছিলাম, যদি জানতে পারতাম সে কী ভাবছে, তারপরই আবার স্বস্তি বোধ করছিলাম এই ভেবে যে, আমি তা জানি না। এমন একটা সময় আসে, যখন আপনি কিছুই আর জানতে চান না।





লেখক-পরিচিতি : 
শ্রীলঙ্কার সমকালীন অভিবাসী সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর রমেশ গুনেসেকেরার জন্ম ১৯৫৪ সালে, কলম্বোর এক উচ্চবিত্ত খ্রিস্টান পরিবারে। তিনি বেড়ে ওঠেন শ্রীলঙ্কা ও পিতার কর্মসূত্রে ফিলিপিন্সে। যুবা বয়সেই তিনি বিলেত গমন করেন এবং উচ্চশিক্ষাশেষে সেখানেই স্থায়ী হয়ে, লেখালেখিকেই পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে বেছে নেন। শ্রীলঙ্কার ভ্রাতৃঘাতী, রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধকে অবলম্বন করে রচিত তাঁর প্রথম গল্প সংকলন Monkfish Moon  প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে এবং একাধিক পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস Reef  এমনকি ম্যান বুকার পুরস্কারের ক্ষুদ্র তালিকাতেও স্থান পায়। তিনি পৃথিবীর অসংখ্য সাহিত্য উৎসব ও সম্মেলনের একজন নিয়মিত অংশগ্রহণকারী ও প্রায়শই বিভিন্ন সাহিত্য প্রতিযোগিতায় বিচারকের ভূমিকাও পালন করেন। তাঁর অপর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম The Match| Roadkill  নামের এই অনূদিত গল্পটির বিষয়বস্তুর মতই রমেশ গুনেসেকেরার প্রিয় বিষয় ইতিহাস, রাজনীতি, মানব-মনস্তত্ত্ব এবং অস্তিত্বের নানাবিধ নিগূঢ় জিজ্ঞাসা।








অনুবাদক
আলম খোরশেদ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন