শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

অ্যাঞ্জেলিকা ভট্টাচার্য 'এর গল্প : প্রত্যক্ষদর্শী

পীচের রাস্তায় এক খাবলা করে পিচ না থাকলে কি ভাবে পঙ্খিরাজকে ওড়াতে হয় , তা এখন মহিদুল ভালো করে শিখে নিয়েছে । তার সাধের টোটো তো পঙ্খিরাজ, তার থেকে কিছু কম নয় । আগের ভাঙাচোরা অটোটা বেঁচে সঙ্গে কিছু জমানো পুঁজি লাগিয়ে লাল রঙের টোটোটা কিনেছে । আম্মি বলেছিল - এক লাখ কুড়ি ! বড্ড মেহেঙ্গা আছে । তার থেকে ফুটপাথে একটা জামা কাপড়ের দোকান দিলে পারতি ।

আম্মির কথায় আঁতকে উঠেছিল মহিদুল – আমি কি হকার নাকি ? কোন সময় কোন পার্টি হুকুমত করবে আর ফুটপাথ সাফ করে দেবে । সেবার হাসান চাচা পুলিশের তারা খেয়ে মাল গুটিয়ে পালাতে গিয়ে সোজা বাসের তলায় । 

ফতিমা শুধু বলেছিল – আল্লা । 

মহিদুল টোটোর গতিবেগ আস্তে করে দিয়েছে , সামনে দুটো মুরগী । তুলে ফেলতে হবে । নইলে স্ট্যান্ডের অটোগুলো চেঁচাবে । ব্যাটারা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । মুরগী বোঝাই করবে , একটার ঘারে একটাকে চড়াবে তবে ওদের পেট ভরবে ।শালা সরকার আইন করেছিল অটোতে চারজন নিতে হবে । এখন ড্রাইভারের দুপাশেও দুজনকে বসিয়ে নেয় । কনুইয়ের গুঁতো খাওয়ার সাবারিও ঠিক জুটে যায় । 

দুটো মুরগী টক করে উঠে পড়ল মহিদুলের টোটোতে । হারামি ড্রাইভারগুলো জুলজুল চোখে দেখছে । প্রথম প্রথম খুব চেঁচাত । এখন শুধু পিচ করে একদলা থুথু ফেলে ।একদিন হাল্কা কথা কাটাকাটি , ধ্বস্তাধস্তি হয়েছিল । একদিন বড় সরো গণ্ডগোল বাঁধবে । মহিদুল জানে এখন অটোর থেকে টোটো বেশি । তাই তাদের পাল্লা ভারী । 

- এই খেজুরতলা দাঁড়াবি । 

দুটো কয়েন হাতে নিয়ে মহিদুল পান খাওয়া দাঁতে হাত ঘসে বলে- দাদু ভাড়া তো দশ টাকা । আট টাকা দিলেন তো । আর দুটাকা কোথায় ? 

- বাবা দুটাকাও ছাড়তে পারিস না ? প্রায়ই তো যাই । 

- দাদু কোনোদিন দুটাকা বেশি তো দাওনি । ঝড় জলেও তো টোটো করে পৌঁছে দিয়েছি । 

বুড়ো গজগজ করতে করতে হাঁটা দিয়েছে – খুব বেড়েছিস তোরা । তোদের জন্য রাস্তা জ্যাম হয় । একদিন সব টোটো উঠে যাবে । 

এই সব শাপশাপান্ত মহিদুলের গাসওয়া হয়ে গিয়েছে । 

দুপুরবেলায় মহিদুল ঘরে খেতে আসে । আম্মির হাতে ভাত , ডাল তার অমৃত লাগে । আম্মি হেসে গোস্তের বাটিটা রাখতেই । গন্ধেই পেট ভরে যায় মহিদুলের । 

- আম্মি অনেকদিন পরে খেলাম । হাত চাটে মহিদুল । ঠাণ্ডা ফিরনি দেখে এবার সত্যি চমকাবার পালা। 

আম্মির এক মুখ হাসি - পাশের বাড়ি থেকে বরফ চেয়ে নিয়ে এসেছি । ফিরনি ঠাণ্ডা না হলে ভালো লাগে না । 

কিন্তু হঠাৎ এতো আয়োজনের কারন খুঁজতে থাকে । 

আম্মি নতুন একটা সাদা কুর্তা এগিয়ে দিলো তার দিকে , কপালে চুমু খেলো – আজকে তুই তিরিশ বছরের হয়েগেলি । 

- আরে তাজ্জুব কি বাত । আমি ভুলে গেছি আমার জন্মদিন ! 

- সব কিছুই ভুলেছিস । বুড়ি আম্মিকে আর কতদিন খাটাবি ? এবার ঘরে বিবি নিয়ে আয় । 

মহিদুলের সেসব কথা কানে যায়না । আম্মি একটা ছবি পকেটে গুঁজে দেয় । ফুরসত পেলে দেখে নিস। 

মহিদুলের মন আজ বেশ খুশি খুশি । বিকালের দিকে বাসস্টান্ডে খুব ভিড় থাকে । অফিস বাবুদের ঘরে ফেরার তারা । কলেজ পড়ুয়ারাও ঘরে ফেরে । একটার পর একটা অটো , টোটো লোক বোঝাই করে কেটে পড়ছে ।অন্যসময় বাসগুল রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে থাকে । কিন্তু এই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যের সময় বাসগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে । তখন বেশ বাদুর ঝোলা হয়ে সব বাবু বিবিরা ঘাম ঝরাতে ঝরাতে ঘরে ফেরে । 

গগন খৈনি পিটিয়ে ঠোঁটের এক কোনায় রেখে দেয় – এ মহিদুল তোর টোটোটা বেশ ভালোই চলছে । এবার শাদি করে নে একটা । 

গগন অনেক দিনের বাস কন্ডাক্টার । মদের নেশাতেই সব টাকা উড়িয়ে দেয় । সংসার একটা পেতে ছিল কিন্তু টেকে নি । মহিদুলের সবটাই জানা । বিরক্ত হয়ে বলল – নিজে শাদি করে কী সুখ পেয়েছ যে আমায় বলছ ? একদল যাত্রী দৌড়ে বাসে উঠে পড়ে । গগনের আর উত্তর দেওয়া হয়না । বাসের দরজাটা দুবার পিটিয়ে হাঁক দেয় – মহিশিলা , মহিশিলা । 

কতো কতো সুন্দরী তার টোটোতে ওঠে । কিন্তু মহিদুল তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না । অনেক টাকা রোজগার করতে হবে , এটাই মনে হয় । আম্মিকে একবার মক্কাতে নিয়ে যাবে । আম্মির বড় সাধ । 

পকেটে টাকা রাখতে গিয়ে আম্মির দেওয়া ছবিটা হাতে উঠে আসে । - আরে এতো পুরো জন্নতের পরি! মহিদুল একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে । আশেপাশের শোরগোলে হুশ ফেরে । 

মহিদুলের আম্মি ফতিমার চিন্তার শেষ থাকে না । তার সাধের বেটার এখনও শাদি হল না । চাচাজানের বেটি শবনম কে কবে থেকেই মনে ধরেছে ফতিমার । কিন্তু খুব নাক চাচাজানের । টোটো আলার সঙ্গে নাকি তার মেয়ের বিয়ে দেবে না । কথাটা খুব মানে লেগেছে ফতিমার ।সেও তল্লাশি করে মেয়ে যোগার করেছে । আইরিন , বাপ মায়ের এক মেয়ে । পয়সা বেশি নেই । কিন্তু মেয়ে একদম নূর আছে । মহিদুল রাজি হলে এই গরমেই নিকাহ করিয়ে দেবে । 

মেয়ের জায়গা জমিন থাকলে ভালো হত । অবশ্য ওসবের ফিকর করে না ফতিমা । তার কী জায়গা জমিন কম আছে কিছু ? লাহোরে তার বাপ দাদার খানদান আছে । হাভেলি আছে । ফতিমাদের ভিসা পাসপোর্ট নেই , তাই যেতে পারে না । কিন্তু এখনও ফোনে কথা হয় । ভাইজানরা অন্তত দশবছর আগে তো এসেছিল । 

ফতিমার জন্ম লাহোরে ।বিয়ের পর এদেশে এসেছে । আর যায়নি কোনোদিন । মনে মনে লাহোর যাওয়ার স্বপ্ন দেখে ।বিয়ের পর চোরা পথে মরুভূমি পেরিয়ে সেই যে এদেশের মাটিতে এসে পড়ল । তবে থেকে এদেশের । তখন বয়েস কতো হবে তেরা কি চৌদা । পাঁচবার মা হয়েছে । কিন্তু একটাও বেটা , বেটি বাঁচেনি । শেষে পিরবাবার কাছে মানত করে মহিদুল । শেষ বয়েসের সাহারা । মহিদুল না থাকলে ফতিমা বেবা হওয়ার পর লাহোরে চলে যেত । কিন্তু যেত কী ভাবে ? রিফিউজি হয়ে ! 

ফতিমার মাথায় ঢোকে না – কেন একটা মানুষের দুটো দেশ থাকতে পারে না ? 


রাতের আকাশে তারাগুলকে দেখতে ভালোই লাগে । কার্নিশ বিহীন ছাদে মহিদুল খাটিয়া পেতে শুয়ে থাকে । কোথা থেকে পোড়া পীচের গন্ধ আসছে । দূরে কালো ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে ।খেয়াল হয় , রাস্তা তৈরি হচ্ছে । ছাদের থেকে ঝুঁকে বাড়ির সামনে রাখা টোটোটাকে দেখে নেয় – ও মেরে হাওয়াই জাহাজ , আর তোকে খুঁড়িয়ে চলতে হবে না । এবার মাখনের মতো রাস্তা তৈরি হবে । ভোট আসছে । 

শান্ত শহরটা হঠাৎ অশান্ত হয়ে উঠেছে । সবার মনেই ভয় । ফতিমা খাটালে অনেক ঘটনা শুনে এলো । কে কাকে মেরেছে । মিছিল , মিটিং , রক্ত ।কিসসা শুনে সব তালগোল পাকিয়ে গেছে ফতিমার । রাস্তায় দেখা হল সব্জিওয়ালা কিষাণ ভাইয়ার সঙ্গে । রোজকার মতো কথা হল না । শুধু শুনল – ভাবি এমন একা একা বেরবেন না , দিনকাল ভালো না । আগে তো কখনও এমন কথা শোনে নি ।ফতিমা মনে মনে আল্লার নাম করতে থাকে । 

চকচকে টোটোর গায়ে পুলিশের লাঠি এসে পড়ল – কিরে জানিস না একশ চুয়াল্লিশ ধারা চলছে । মহিদুল ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করে- সাহেব ঘরে বসে থাকলে পেট চলবে না তো । 

- চুপ শালা শুয়োরের বাচ্চা । দেখছিস না চারিদিকে কি অবস্থা ! যা বাড়িতে বসে কদিন ঘুমো । 

আলকাতরার গাড়িগুলো রাস্তার পাশে দাঁর করানো । অলিগলির কিছু কাজ হয়েছে । কিন্তু বড় রাস্তার একেকটা গর্ত যেন গিলে খেতে আসছে । এভাবে বেশিদিন গাড়ি চালানো যায়না । রহিম চাচা সেদিন স্কুটার নিয়ে বিচ রাস্তায় উল্টে ছিল । দুদিন হসপিটালে ছিল । মাথায় পাঁচটা সেলাই পড়েছে । সাধের স্কুটারটাও ভেঙ্গে গিয়েছে ।এর হারজানা কে ভরবে ? শালা রাস্তাটা কমাসের বেশি টিকবেই না কোনোদিন । 

মহিদুল বোমের আওয়াজ চেনে । দূরে কোথাও একটা ফাটল । - আরে হারামিগুলো আবার শুরু হয়ে গেল ।শান্তিতে বাঁচতে দেবে না ! টোটোর স্পীড বেড়ে গিয়েছে ।মহিদুল একসময় অনেক বোম বানিয়েছে । অটো চালাত আর সুলতানের হয়ে কাজ করত তখন । কিন্তু চোখের সামনে যখন ইমতিয়াজের হাত দুটো উড়ে যায় ! মহিদুলের বুকের খাঁচার পাখিটা উড়ে গিয়েছিল ।তার পরে পরেই সুলতান এনকাউন্টারে মারা যায় ।ইমতিয়াজ কে দেখেছে স্টেশনে ভিক্ষা করতে । মহিদুল আল্লার কসম নিয়ে ও লাইন ছেড়ে দিয়েছে । 

গলিগুলো একদম শুনশান । সবার দরজা জানলা বন্ধ এই গরমের দিনে । বাড়ির সামনে হর্ন বাজাতেই ফতিমা দৌড়ে এসে দরজা খুলে দিয়েছে । ফতিমার কাঁপা ঠোঁট লক্ষ্য করে মহিদুল হাসে – আম্মি আল্লা আছে , ভয় কিসের ! ফতিমা মহিদুলকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে । 

রাত বাড়তে থাকে । পুলিশের ভ্যানের আওয়াজে ঘুম আসে না ।আজ মহিদুল ঘরেই শুয়েছে । চৌকিতে ফতিমা । মহিদুল সিমেন্টের মেঝেতে চাদর পেতে ।দিনকাল ভালো না । ‘একটা বাস পুড়েছে’- রহিম চাচা সকালেই খবর দিয়েছে । তাই আর সাহস পায়না মহিদুল । টোটোটাকে রহিম চাচার উঠোনে রেখে এসেছে । 

নিস্তব্ধ রাতে শোনা যাচ্ছে পুলিশের গাড়ির আওয়াজ । 

শেষ রাতের দিকে কড়া নাড়ার শব্দ আসে । ফতিমার বুক কাঁপে । রহিম চাচার গলার শব্দ ভেসে আসে। ফতিমা দরজা খুলতেই রহিমচাচা ঘরে ঢোকে – দুলাল বাবুর ফোন আছে – তার বেটির ব্যথা উঠেছে ।বাচ্চা হবে , এখুনি হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে ।কোন গাড়ি এদিকে আস্তে রাজি হচ্ছে না । দুলাল বাবুকে মহিদুলও চেনে । হিন্দু পাড়ার শুরুতেই দুলাল বাবুর বাড়ি ।অনেক সময় মহিদুলের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথাও বলেছে । রহিম চাচার সঙ্গে অবশ্য বেশি ভাব । দুলাল বাবুর মেয়ের বিয়েতে রহিম চাচার নেমন্তন্ন ছিল । 

মেয়েটা ব্যথায় ছটফট করছে । সঙ্গে দুলাল বাবু আর তার বউ । - মা একটু সহ্য কর । এখুনি হাসপাতালে পৌঁছে যাবো ।মেয়েটা মাঝে মাঝেই নিজের পেট খিমচে ধরছে । 

- কিছু চিন্তা নেই বিবিজি। মহিদুল টোটোর গতিবেগ বাড়িয়ে দিয়েছে । আধা খাওয়া রাস্তায় খুব সন্তর্পণে ছুটছে । আর একটু । একটু দূরে একটা পুলিশ ভ্যান দেখা যাচ্ছে । কিন্তু কোন গর্তে চাকা পড়ল মহিদুল বোঝার আগেই টোটো উল্টে গিয়েছে । মেয়েটা পেট নিয়ে উবুড় হয়ে উল্টে পড়েছে । কোন চিৎকার নয় শুধু গোঙাচ্ছে । দুলাল বাবুর মাথা ফেটে গিয়েছে । বউটারও বোধ হয় হাত পা ভেঙ্গেছে । গোঙানির মধ্যেও মেয়ের নাম ধরে ডাকছে – মামনি কোথায় তুই? 

কিন্তু কি আশ্চর্য মহিদুল পড়ে গেলেও তেমন কিছু হয়নি শুধু চোখে ঝাপসা দেখছে । 

পুলিস ভ্যান থেকে কারা যেন নেমে আসছে । সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আসছে । একে একে চ্যাং দোলা করে সবাইকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে । সামনেই হসপিটাল । মেয়েটা হয়ত বেঁচে যাবে । পেটের বাচ্চাটা বাঁচবে তো ? 

মহিদুলের পেটে দুটো লাথি পড়ল – শালা মাল খেয়ে চালাচ্ছিস ? 

আমি মাল খাইনা খুদা কসম ।ভাঙা রাস্তার জন্য উল্টে গেলাম। 

- ও তাহলে রাস্তা আসামী ?পুলিশের তির্যক মন্তব্য ভেসে আসছে । 

মহিদুলের মাথা ঘুরতে থাকে - রাস্তা নাকি সরকার ! না না ইঞ্জিনিয়ার বাবু , নাকি ইটা , বালু ?কে আসামী ? গতবছর বৃষ্টি বেশি হয়েছে । রাস্তার পীচ , বালি ধুয়ে গিয়েছিল । তখন থেকে দাঁত বার করে গিলতে আসে পাথরগুলো । যমদূতের মতো ভারি ওভার লোডেড ট্রাক !যখন স্পীডে ধুলো উড়িয়ে বেড়িয়ে যায় !রাস্তা ভেঙ্গেছে , গর্ত হয়েছে । সে যার জন্যই হোক । রাস্তাই মুজরিম আছে । 

অসংখ্য ক্ষত নিয়ে মুজরিম ঘুমিয়ে আছে ।সকালে অসংখ্য পায়ের চাপে জেগে উঠবে আবার । কিন্তু চশমদিদ গবাহ্ ,প্রত্যক্ষদর্শী একজনকেও পাওয়া গেল না ।

২টি মন্তব্য: