শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

রুখসানা কাজলের গল্প : টান

পেয়ারার ডালে ধুতি চাদর রেখে বাঁধানো ঘাট বেয়ে জলে নামে গদাধর চক্রবর্তী। ঘাটের অবস্থা যা তা । ভেঙ্গে চুরে সাপ খোপের বাসা হয়ে গেছে এখানে সেখানে। কিছু মেরামত এবার করতেই হবে। নইলে আসছে বর্ষায় আর নামাই যাবে না পুকুরে। কিন্তু দু বেলা দু মুঠো খাবার জোটানোই যেখানে আকাশ কুসুম সেখানে কি করে এই খর্চা করবে ভাবতে গা শিউরে ওঠে পূজারী ব্রাহ্মণের। 

হাত মুঠি করে নাকে মাথায় গলায় জল ছিটিয়ে উর্ধ্বমুখী হয়ে কয়েক সেকেন্ড আকাশ দেখে গদা চক্রবর্তী।

হলুদিয়া সবুজ নিম আমড়া গাছগুলোর মাথার উপর হেলান দিয়ে বসে আছে নীল আকাশ। কি মায়াবী মনোরম দৃশ্য। মন ভাল করা অনুভব নিয়ে পুকুরের ওপারে জলের শব্দ শুনে তাকায় সে। 

ইন্তাজউদ্দীন শেখ অজু করেতে নেমেছে ওপারে। ওদের ঘাটটা তাল খেজুরের গাছ পেতে বানানো। কাঁচা ঘাট। বেশ মজবুত। তবে সিঁড়ি বেয়ে বাতের ব্যথায় কাহিল ইন্তাজের নামা ওঠায় খুবই কষ্ট হয়। তাছাড়া শীতকাল এলেই বাতের ব্যাথা চাগাড় দিয়ে ওঠে। প্রায় দিন কাজকর্ম বাদ দিয়ে শুয়ে থাকতে হয় ইন্তাজকে। মাঝে মাঝে গিয়ে সে দেখে আসে । তখন অনেক করে অনেক বার বলেছে, ঘাটটা এবার বাঁধা ইন্তাজ। কোন দিন হাতপা ভেঙ্গে পুকুরে পড়বি আর বেঘোরে মরে থাকবি। কিন্তু কে শোনে এসব কথা ! দিন দিন গাড়োল হয়ে যাচ্ছে ইন্তাজ । 

কিছুতেই ঘাট বাঁধাবে না। ঘাট নিয়ে কিছু বললেই গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে বলবে, পুর্ব পুরুষদের কাটা পুকুর। লগ্ন দেখে একটাই বাঁধানো ঘাট করেছিল ওরা। যেমন আছে থাকুক না হয় তেমন একটাই বাঁধানো ঘাট। আর অসুবিধে্র কি ! সাবধানেই ত নামি আমি। 

কুলকুচি করতে করতে হাসে গদাধর, জাত গেছে যুগ যুগ আগে । তবু জিদ ছাড়েনি এখনও। কে জানে ব্যাথা কমানোর ওষুধটা ইন্তাজ খেয়েছে কিনা। কবিরাজি্তে শূয়োরটার বিশ্বাস নেই এক ফোঁটা। অথচ কত যত্ন করে দুর্যোধনকাকুর কাছ থেকে সে ওষুধ বানিয়ে এনেছে। 

কষ্ট করেই অজু করে ইন্তাজউদ্দীন শেখ। অমাবস্যা পুর্ণিমায় আজকাল বড় কষ্ট পাচ্ছে ব্যাথায়। ঠান্ডাও পড়েছে জাঁকিয়ে। ওপারে জল কাটার শব্দে চোখ তুলে তাকায়। কোমর জলে দাঁড়িয়ে সুর্য প্রণাম সেরে নিচ্ছে পুজারী ঠাকুর। খালি গায়ে কেবল পৈতে জড়ানো। তেল মাখানো গা চকচক করছে জল আর রোদ্দুরের ছিটেফোটায় । 

মহা গাড়োল গদাদা। এবার শীতে আবার বুকে ঠান্ডা জমে গেলে বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে। তা ছাড়া খাওয়া দাওয়া ত নেই বললেই চলে। ভাঁড়ারে মা ভাবানী কেঁদে যাচ্ছে ঢিকসি তুলে । তাছাড়া আজ কালকার দিনে কজনই বা পুজা করে বা দেয় ! অই পূজা ছাড়া আর কিছু তো জানে না বা পারে না গদাদা। বছরে দুর্গা আর কালীপূজোয় যা হোক কিছু মোটা প্রণামী পায়। তাই ভেঙ্গে দুজনের সংসার চলে। আজ সুবহে সাদিকের আগে মন্দিরের বারান্দায় বস্তা ভরে চাল, ডাল, তেল, আলু, কপি রেখে এসেছি। গাড়োলটা দেখেছে কিনা কে জানে ! 

ভাঙ্গা সিঁড়িতে সাবধানে পা ফেলে উপরে উঠে যায় গদা চক্রবর্তী। ঠাণ্ডায় টন টন করছে কোমর। পা দুটোতে বেশ ব্যাথা ছিল । দুর্যোধন কবিরাজের ওষুধে ব্যাথাটা কম মনে হচ্ছে কিছুদিন ধরে। সেই ওষুধই কাল সাঁঝ বেলা ইন্তাজের জন্য দিয়ে এসেছে বড় বউমার হাতে । এই ঠান্ডায় সেই কোন ভোরে উঠে অজু করে ইন্তাজ । বাতের ব্যাথা তাতে আরও কামড় বসায় শরীরে। 

আস্তে আস্তে কাঁচা ঘাট বেয়ে উপরে উঠে ইন্তাজ শেখ। সর্ষে তেলটা এবার একটু বেশী দিয়েছে। ঠাণ্ডা সিমেন্টে নাম মাত্র একটা পাতলা আসন। তাতে বসে পূজা করে গদাধর দাদা। গায়ে নামাবলী ছাড়া একটা পাতলা হাতাওলা গেঞ্জি। তার উপর ফিনফিনে এক চাদর জড়িয়ে থাকে। গেল শীতে যমের হাত থেকে কোন রকমে বেঁচে ফিরেছে । গরম তেলে রসুন ফেলে বুকে ডলে নিলে খুব আরাম পাবে। গেঞ্জি ধুতির সাথে খদ্দরের চাদরও দিয়েছে একটা। ভালো মনে করে গায়ে জড়ালে হয় এখন ! 

ইন্তাজ শেখ ঘরে যাওয়ার আগে কি মনে করে ঘুরে তাকায়। এদিকেই তাকিয়ে আছে গদাধর চক্রবর্তী। ওর দেওয়া শুকনো ধুতি গেঞ্জির উপর খদ্দরের চাদর জড়িয়ে স্নেহ আদর আর ভালবাসায় টলটল করছে দুটি চোখ। যেন অনুজের প্রতি অগ্রজের দৃস্টি সন্মোহিত হয়েছে। ইন্তাজ শেখের দৃষ্টিতেও অনুজের শ্রদ্ধা, সন্মান,সম্ভ্রম আর মান্যতার টলটলে আবেগ। গদাধরের কোন ওজর আপত্তিতে কান দিবে না সে। ঘাট এবার মেরামত করে দিবে ইন্তাজ। 

ধর্ম বদলেছে পুরুষ পুরুষ আগে। তাতে কি ? রক্তের রঙ যে লাল !

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন