শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

হারুকি মুরাকামির গল্প : হাওয়া গুহা

ভাষান্তর : কুলদা রায়

আমার পনেরো বছর বয়সে আমার ছোটো বোনটি মারা যায়। হঠাৎ করে এটা ঘটেছিল। তখন তার বয়স বারো। সবে জুনিয়র হাই স্কুলের প্রথম বছরে পড়েছে। হৃদযন্ত্রের সমস্যা নিয়ে সে জন্মেছিল। প্রাথমিক স্কুলের শেষ ক্লাশ পর্যন্ত তার কোনো সমস্যা টের পাওয়া যায়নি। আমাদের পরিবার তাতে একটা ভরসা পেয়েছিল। তার জীবন কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই কেটে যাবে বলে তাদের মনে একটা ক্ষীণ আশা ছিল। কিন্তু সে বছরের মে মাসে তার হৃদস্পন্দন বেশ অস্বাভাবিক হয়ে গেল। সাধারণত শুয়ে পড়লেই তার এ সমস্যা দেখা দিত। আর তার অনেক অনেক রাতই ঘুমহীন কেটে যেতে লাগল। বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তার অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হলো। কিন্তু সে পরীক্ষা নিরীক্ষাগুলো যত বড়ো হোক না কেনো ডাক্তাররা তার স্বাস্থ্যের কোনো পরিবর্তন করতে পারল না। তাই তারা আপাতদৃষ্টিতে অপারেশনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা শেষে হতবুদ্ধি হয়ে গেল।

‘কোনো কায়িক পরিশ্রমের কাজ করো না। একটি রুটিন মেনে চলো। তাড়াতাড়িই সমস্যাগুলো মিটে যাবে।’’ তার ডাক্তার বলেছিলেন। সম্ভবত এগুলোই তার ডাক্তার বলেছিলেন। আর কয়েকটা ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন তিনি। 

কিন্তু তার হৃদযন্ত্রের ঝামেলা ঠিক হলো না। যখন আমি খাবার টেবিলে তার কাছে বসতাম, তখন প্রায়ই তার বুকের দিকে তাকিয়ে দেখতাম। বুকের মধ্যেকার হৃদযন্ত্রটিকে কল্পনায় দেখে নিতাম। তার স্তন চোখে পড়ার মতো বেড়ে উঠতে শুরু করেছিল। তখনো, তার বুকের মধ্যে, আমার বোনটির হৃদযন্ত্রটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ঠিক সমস্যাটি কী তা কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ধরতে পারেনি। এই ঘটনাই একা আমার মাথার মধ্যে স্থায়ী অশান্তি সৃষ্টি করে রেখেছিল। আমার বয়ঃসন্ধি কালটি এই একটি দুশ্চিন্তা নিয়ে কাটিয়েছি। যে কোনো সময় আমার ছোটো বোনটিকে হারানোর ভয়ে আতংকিত ছিলাম। 

তার শরীরটা দিন দিন খারাপ হচ্ছে দেখে আমার বাবামা বোনটিকে চোখে চোখে রাখতে বলেছিলেন। দুজনে একই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছি। তখনকার পুরোটা সময় জুড়েই তাকে চোখে চোখে রেখেছি। তাকে আর তার ছোটো হৃদযন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য দরকার হলে আমি স্বেচ্ছায় আমার জীবন দিতে পারি। কিন্তু সে সুযোগটি নিজ থেকে কখনো আসেনি। 

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে একদিন সে অসাড় হয়ে গেল। সেইবু শিঞ্জুকু স্টেশনে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সে জ্ঞান হারালো। খুব তাড়াতাড়িই এম্বুলেন্সে করে তাকে সবচেয়ে কাছের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। খবরটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি হাসপাতালে ছুটে গেলাম। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই দেখলাম ততক্ষণে তার হৃদযন্ত্র থেমে গেছে। এটা চোখের পলকেই ঘটনাটি ঘটেছিল। সেদিন সকালে এক সঙ্গেই আমরা নাস্তা খেয়েছিলাম। সামনের দরোজায় দুজন দুজনেই বিদায় জানিয়েছিলাম। আমি হাই স্কুলে চলে যাই। আর সে চলে যায় জুনিয়র হাই স্কুলে। পরে যখন তাকে দেখতে পেলাম তখন তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। চিরদিনের জন্যই তার ডাগর চোখ দুটি বুজে গেছে। তার মুখটি সামান্য খোলা। যেন সে কিছু বলতে চেয়েছিল। 

পরে তাকে কফিনের মধ্যে দেখি। তার প্রিয় কালো ভেলভেটের পোষাক পরেছিল সে। মুখে একটু প্রসাধনের ছোঁয়া আছে। সুন্দর করে আচড়ানো ছিল চুল। পায়ে ছিল দামী কালো জুতো। আর সুন্দর করে সাজানো কফিনে মুখ উঁচু করে সে শুয়েছিল। পোষাকটির কলার ছিল সাদা। খুব সাদা বলে সেটা বেশ অস্বাভাবিক লাগছিল। 

সেখানে শোয়া অবস্থায় তাকে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে মনে হয়। একটু টোকা দিলেই তার ঘুম ভেঙ্গে যাবে। মনে হয় জেগে উঠবে। কিন্তু সবই বিভ্রম। তাকে যতই নাড়াচাড়া দাও না কেনো-- সে আর কখনো জেগে উঠবে না। 

আমি কোনোভাবেই চাই না আমার বোনের কোমল ছোট্ট শরীরটাকে ঠেসে একটি কফিনের মতো একটি বাক্সে আটকে রাখা হোক। অপেক্ষাকৃত কোনো একটি দামী স্থানে তার শরীরটাকে শান্তিতে শুইয়ে রাখা হোক। যেমন কোনো তৃণভূমির মাঝখানে রাখা যেতে পারে। সেখানে আমরা সবুজ ঘাসের মধ্যে দিয়ে নিঃশব্দভাবে যেতে পারব। বুনো ফুলের ঘ্রাণ হাওয়ায় ভাসবে। রেণুগুলো উড়বে। রাত নেমে এলে তার উপরের আকাশ ভরে অগণিত রুপোলী মিটি মিটি তারায় ভরে যাবে। সকালে ঘাসের পাতার উপরে নতুন সূর্যের আলো পড়বে শিশির বিন্দুর গায়ে। তারা সে আলোয় হীরের মতো জ্বল জ্বল করতে থাকবে। হাওয়ায় ঘাসগুলোয় নিচু লয়ে মর্মর ধ্বনি উঠবে। 

বাস্তবে কিন্তু তাকে এক বিচ্ছিরি কফিনে ঠেসে ঢোকানো হয়েছে। তার চারপাশে ভৌতিক সাদা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। সেগুলো কাঁচি দিয়ে কাটা। আর সেগুলো রাখা হয়েছে ফুলদানিতে। ছোট্ট একটা ঘরে চোখ ধাঁধানো আলো জ্বলছে। তার মধ্য থেকে নানা রঙ বের হচ্ছে। সিলিংএ ছোটো একটা স্পিকার থেকে অর্গান যন্ত্রের কৃত্রিম ভীতিকর গানের সুর ভেসে আসছে। 

তাকে পুড়িয়ে ফেলা দৃশ্যটি দেখতে পারবো না আমি। কফিনটির ঢাকনা বন্ধ করা হলো। তালা দেওয়া হলো। তখন আমি ঘর‍ ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। আমার পরিবারের লোকজন ধর্মীয় সংস্কার মেনে একটি পাত্রে তার দেহভস্ম রাখল। আমি তাদেরকে কোনো সহযোগিতা করিনি। শ্মশানক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে গেলাম। তারপর নিজে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকলাম। তার এই ছোট্ট জীবনে কখনোই বোনটির কোনো কাজে লাগিনি। এটা ভেবে আমার খুব কষ্ট হলো। 

আমার বোনে মৃত্যুর পর আমাদের পরিবারে একটা পরিবর্তন হলো। বাবা কথা বলা প্রায় ছেড়েই দিল। মায়ের স্নায়ু দূর্বল হয়ে পড়ল। হয়ে পড়ল আতঙ্কগ্রস্থ। প্রকৃতপক্ষে আগের মতোই আমার জীবন চলতে লাগল। স্কুলে পাহাড়ে-চড়া বিদ্যে শেখার ক্লাবে যোগ দিলাম। এটা আমাকে খুব ব্যস্ত রাখল। এই কাজের শেষে শুরু করলাম তেল রঙে ছবি আঁকা। একজন দক্ষ আর্ট শিক্ষককে খুঁজে নিলাম। তিনি সত্যিকারে ছবি আঁকা শেখার পরামর্শ দিলেন। আর্ট ক্লাশে যেতে শুরু করলাম। ছবি আঁকার আগ্রহ প্রবলভাবে বেড়ে গেল।  আমার মৃত বোনটিকে যাতে আমি ভুলে থাকি সেজন্য আমি এভাবে নিজেকে ব্যস্ত রাখছি। 

অনেক দিন ধরে--ঠিক কতো বছর আমি ঠিক নিশ্চিত নই--বোনটির ঘর আগে যেরকম ছিল ঠিক সেরকমই রাখল আমার বাবামা। তার পড়ার টেবিলে ক্লাশের বই, গাইড বই, কলম, ইরেজার, কাগজপত্র তার ডেস্ক টেবিলে গুছিয়ে রাখল। চাদর, কম্বল আর বালিশগুলো বিছানায় সাজিয়ে রাখল। আলমারিতে রাখল তার ধোপ দুরস্ত আর ভাঁজ করা পাজামা, জুনিয়র হাই স্কুলের অব্যবহৃত ইউনিফর্ম সেখানে রাখল ঝুলিয়ে। দেওয়ালে ঝোলানো কাগজের ছকে তখনো তার কার্যপঞ্জি লেখা ছিল। তার মৃত্যুর মাস খানেক পরের কার্যপঞ্জি ওগুলো। যেন সময় এই লেখার মধ্যে বরফের মতো জমে আছে। মনে হতো, যে কোনো সময়ে বাড়ির দরোজা খুলে যেতে পারে। সে ঘরে ঢুকে পড়বে। 

বাড়িতে কেউ যখন থাকত না, তখন মাঝে মাঝে তার ঘরে আমি যেতাম। তার পরিচ্ছন্ন বিছানায় বসতাম। আমার চারিদিক দেখতাম। কিন্তু কখনোই কিছু স্পর্শ করতাম না। তার রেখে যাওয়া জিনিসপত্র, তা সে যতো নগণ্যই হোক না কেনো, সেগুলো এলোমেলো করতে চাই নি। এগুলো নিয়েই তো এক সময় সে বেঁচে ছিল। 

মাঝে মাঝে আমি ভাবতে চেষ্টা করি, বারো বছর বয়সে যদি আমার বোন মারা না যেতো তাহলে কেমন হতো এখন তার জীবন। হায়, এটা জানার কোনো উপায় নেই। ভবিষ্যতে আমার জীবন কেমন হবে সেটাও আমি এঁকে দেখাতে পারি না। সুতরাং তার ভবিষ্যৎ কেমন হতো সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। তবে আমি বলতে পারি, যদি তার হৃদযন্ত্রের একটি ভালব ত্রুটিপূর্ণ না থাকত তবে সে নিশ্চয়ই বড়ো হতো-- হয়ে উঠতো আকর্ষণীয় রূপসী যুবতী। তাকে অনেক মানুষ ভালোবাসত-- সেটা আমি নিশ্চিত। তাকে তারা তাদের বাহুলগ্ন রাখত-- কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই বিস্তারিতভাবে এঁকে দেখাতে পারবো না। আমার কাছে সে চিরকালের সেই ছোটো বোনটি। তিন বছরে ছোটো সেই বোনটিই সে। তাকে দেখেশুনে রাখার দ্বায়িত্ব আমার। 

তার মৃত্যুর পরে কোনো একটা সময়ে একটার পরে একটা তার ছবি আঁকতাম। আমার স্কেচ বইয়ে বিভিন্ন দিক থেকে তার মুখের আঁকা ছবিতে ভরা ছিল। এগুলো আমার স্মৃতি থেকে আঁকা। সুতরাং তাকে ভুলে যাওয়া যাবো না। আমার মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এই ছবি আমার মনে গভীরভাবে আঁকা থাকবে। যে মুখটিকে আমি খুঁজে ফিরছি তাকে কখনোই আমার স্মৃতি থেকে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। সেজন্য আমি আঁকার মধ্য দিয়ে তাকে একটা আকার দিচ্ছিলাম। আমি তখনো সবে পনেরো। আর স্মৃতি, ছবি আঁকা আর সময়ের গতি বিষয়ে খুব বেশি জ্ঞান আমার ছিল না। কিন্তু একটা জিনিস জানতাম-- আমার স্মৃতির সঠিক রেকর্ড রাখার জন্য কিছু একটা করার দরকার ছিল আমার। এটাকে যদি এঁকে না রাখা হয় তাহলে কোথাও না কোথাও তা হারিয়ে যাবে। স্মৃতি যতোই স্পষ্ট হোক না কেনো সময়ের শক্তি অনেক শক্তিশালী। এটা আমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে জানতাম। 

আমি তার ঘরে বিছানার উপর বসে তাকে আঁকতাম। আমার মনের চোখে সে কেমন ছিল সেটা আবার সাদা কাগজে এঁকে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করতাম। আমার অভিজ্ঞতার অভাব ছিল তখন। আর ছিল প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি। তাই এই আঁকাআঁকি কোনো সহজ পদ্ধতি ছিল না। তাকে আঁকতাম। ছিড়ে ফেলতাম। আবার আঁকতাম। আবার ছিড়তাম। এই চেষ্টার কোনো শেষ ছিল না। কিন্তু এখন আমার রেখে দেওয়া ছবিগুলো যখন দেখি, (সে সময়ের স্কেচবুক আমার কাছে বড়ো সম্পদ), দেখতে পারি--এই ছবিগুলো সত্যিকারের দুঃখ দিয়ে ভরা। এগুলো শৈলীর দিক থেকে হয়ত অপরিণত, কিন্তু সেগুলো ছিল আন্তরিক প্রচেষ্টার ফল। আমার আত্মা যেন আমার বোনকে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করছে। এই ছবিগুলোর দিকে তাকালে কান্নার চেষ্টা করতে হয় না। এ পর্যন্ত অগণিত ছবি এঁকেছি। কিন্তু আর কখনোই সেই আঁকা ছবি আমায় কাঁদায় না। 

বোনের মৃত্যুর আরেকটা প্রভাব পড়েছে আমার উপরে। 

তার মৃত্যু আমাকে ভয়ানক ক্লাস্ট্রোফোবিয়ার রোগী বানিয়ে ফেলেছে। যখন তাকে ছোটো কফিনে শোয়ানো দেখেছিলাম, তার ঢাকনাটি আটকে দেওয়া হয়েছিল, শক্তভাবে করা হয়েছিল তালাবদ্ধ, আর তাকে যখন শ্মশানের চুল্লীর দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তারপর থেকে আমি কোনো বদ্ধ, আটকানো জায়গায় যাওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমি লিফটে চড়তে পারিনি। কোনো লিফটের সামনে দাঁড়ালেই মনে হতো ভূমিকম্পে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিফটটি বন্ধ হয়ে যাবে। একটি বদ্ধ জায়গায় আটকে থাকা লিফটি যেন মৃত্যু ফাঁদ। আমি এই ফাঁদের মধ্যে আটকা পড়েছি। আতঙ্কে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য এই ভাবনাটাই যথেষ্ট। 

আমার বোনের মৃত্যুর ঠিক পরেই এই আতঙ্ক-লক্ষ্মণ আসেনি।  মৃত্যুর তিন বছর পরে এটা দেখা দেয়। আর্ট স্কুলে যাওয়া শুরু করার পরপরই প্রথম বারের মতো আমার মধ্যে এই আতঙ্কের আক্রমণ ঘটে। সে সময় একটি আসবাবপত্র পরিবহন কোম্পানীতেও পার্ট টাইম কাজ করতাম। একটি বক্স-ট্রাকের  চালকের সহকারি ছিলাম। আসবাবপত্রগুলো বাক্সে ভরতাম। পরিবহন শেষে বাক্সগুলো খুলে মালামাল বের করতাম।

একদিন ভুলক্রমে একটি কার্গো কম্পার্টমেন্টে আটকা পড়লাম। কম্পার্টমেন্টটি ছিল খালি। সেদিনের মতো কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। ট্রাকের ভেতরে তখনো কেউ আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখতে চালক ভুলে গিয়েছিল। বাইরে থেকে পেছনের দরোজায় তালা দিয়ে আটকে দিল। 

দরোজা খোলার আগে পর্যন্ত আড়াই ঘণ্টা বদ্ধ ট্রাকে আটকা ছিলাম। তখন আমি হামাগুড়ি দিতে সক্ষম ছিলাম। পুরো সময়টা আমি সেই বদ্ধ অন্ধকার জায়গায় আটকা ছিলাম। সেটা হিমায়িত বা এ ধরনের ট্রাক ছিল না। সে কারণে ভেতরে কিছু হাওয়া ঢোকার মতো ছিদ্র ছিল। যদি আমি ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতাম, তাহলে বুঝতে পারতাম-- সেখানে আমার দম বন্ধ হবে না।

কিন্তু, এখনো, একটা ভয়ংকর আতংক আমাকে গ্রাস করে আছে। সেখানে প্রচুর অক্সিজেন আছে। তবু আমি যতই গভীর শ্বাস টানি না কেনো, সেই শ্বাস গ্রহণ করার ক্ষমতা আমার নেই। আমার শ্বাস ঘন থেকে ঘন হতে থাকল।  মাথা ঘুরতে লাগল। ‘সবঠিক আছে। শান্ত হও।’’ নিজেকে বললাম। ‘’ তুমি খুব তাড়াতাড়িই বাইরে বের হতে পারবে। এখানে দম বন্ধ হওয়া অসম্ভব।’’ কিন্তু যুক্তি এখানে খাটে না। আমার মনের মধ্যে তখন আমার ছোটো বোনটি ভেসে উঠছে। যেন একটি ছোট কফিনে তাকে আটকে ফেলা হয়েছে। শ্মশানের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আতংকে ট্রাকের দেওয়াল আচড়াতে লাগলাম।

ট্রাকটি কোম্পানির পার্কিং লটে ছিল। সব কর্মচারির কাজ শেষ হয়ে গেছে। তারা বাড়ি চলে গেছে। আমি যে হাওয়া হয়ে গেছি এটা কেউই খেয়াল করেনি। আমি দেওয়াল আচড়াচ্ছিলাম পাগলের মতো। কিন্তু কেউই সে শব্দ শুনতে পায়নি। আমি জানতাম, যদি কপালের ফের থাকে,তবে এখানে সকাল অব্দি আটকে থাকতে হবে। এটার ভাবার সঙ্গে সঙ্গেই আমার মাংশপেশীগুলো প্রায় অবশ হতে লাগল। 

রাতের বেলায় নিরাপত্তা রক্ষী পার্কিং লটে পাহারা দিতে গিয়ে শেষে আমার আচড়ানোর শব্দ শুনতে পেলো। সে দরজা খুলে দিল। আমাকে ধ্বস্ত ক্লান্ত দেখে কোম্পানির বিশ্রামকক্ষে নিয়ে গেল। সেখানে একটি বিছানায় শোয়ালো। এক কাপ গরম চা খেতে দিল। সেখানে কতক্ষণ শুয়ে ছিলাম জানি না। শেষে আবার আবার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এলো। ভোর হয়ে আসছিল। তাই নিরাপত্তা রক্ষীকে ধন্যবাদ জানালাম। বাড়ি ফেরার জন্য দিনের প্রথম ট্রেনে চেপে বসলাম। বাড়ি ফিরে আমার বিছানার কাছে সুরুৎ করে চলে গেলাম। শুয়ে পড়লাম। অনেক সময় ধরে পাগলের মতো কাঁপছিলাম। 

তারপর থেকেই লিফটে উঠলেও একই আতংক আমার মধ্যে শুরু হয়ে যেতো। আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটা ভয়কে জাগিয়ে তুলতো এই ঘটনা। আমার মৃত বোনের স্মৃতিই আমার মধ্যে এই ভয় বা আতংককে গেঁথে দিয়েছে-- এটা আমার সন্দেহ। আর এছাড়া শুধু লিফটই নয়-- যে কোনো বদ্ধ জাগায় গেলেই আমার এ ধরনের আতংক হয়। এমনকি সাবমেরিন বা ট্যাংক আছে এমন ধরনের সিনেমাও দেখতে পারি না। কোনো বদ্ধ জায়গায় আটকে গেছি এই চিন্তাটাই শুধু আমার মাথার মধ্যে কাজ করে তখন। এর থেকে বের হওয়ার জন্য হাসফাঁস করতে থাকি। আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। প্রায়ই সিনেমা হলে বসে থাকতে পারি না। বের হয়ে বাইরে চলে আসি। একারণে কদাচিৎ অন্য কারো সঙ্গে গিয়ে থাকি। 

আমার বয়স যখন তেরো, আমার বোনের বয়স তখন দশ। গ্রীষ্মের ছুটিতে দুজনে ইয়ামানাসি এলাকায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমাদের মামা ইয়ামানাসির বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে কাজ করতেন। এই মামার কাছেই বেড়াতে গিয়েছিলাম। শিশু বয়সে এটাই ছিল আমাদের দুজনের একাকী বেড়াতে যাওয়া। আমার বোন অন্য সময়ের চেয়ে সে সময়ে অপেক্ষকৃত সুস্থ ছিল। সেজন্য আমাদের বাবামা আমাদের দুজনকে একাকি ভ্রমণের অনুমতি দিয়েছিল। 

সে সময়ে আমাদের মামা একা ছিলেন। এখনও একা-- বিয়েথা করেননি। সবে তিনি তিরিশ বছর বয়সে পড়েছেন। সে সময় তিনি বংশগতি ধারণকারী জিন নিয়ে গবেষণা করতেন। এখনো তাই করেন। সে সময়ে তিনি ছিলেন খুবই শান্ত। এই জগৎ সংসার বিষয়ে উদাসীন। তবু তিনি ছিলেন খোলামনের মানুষ। তার ভাবনা চিন্তা খুব সোজাসাপটা। পড়তে ভালোবাসতেন। প্রকৃতির সব কিছু সম্পর্কে তিনি জানতেন। অন্য যেকোনো কিছুর থেকে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে বেশি পছন্দ করতেন। এই পাহাড়ে চড়ার জন্যই তিনি গ্রামীণ পাহাড়ি এলাকা ইয়ামানাসি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়ে এসেছিলেন। আমার বোন আর আমি দুজনেই আমাদের মামাকে খুব পছন্দ করতাম। 

ব্যাগপ্যাক পিঠে নিয়ে মুৎসুমোতোর উদ্দেশ্যে শিঞ্জুকু স্টেশন থেকে দ্রুতগামী ট্রেনে চেপে বসলাম। কফু স্টেশনে নেমে পড়লাম। কফু স্টেশনে মামা নিতে এলেন। তিনি চোখে পড়ার মতো লম্বা। এমন কি স্টেশনের ভিড়ের মধ্যেও তাকে আমরা দেখতে পেলাম। কফু শহরে এক বন্ধুর সঙ্গে একটি ছোটো বাড়ি ভাড়া করেছিলেন। কিন্তু সে সময়ে তার বন্ধুটি বিদেশে গিয়েছিলেন। সেজন্য আমরা ঘুমানোর জন্য আলাদা ঘর পেয়েছিলাম। সে বাড়িতে সপ্তাহখানেক ছিলাম। আর মামার সঙ্গে প্রতিদিনই কাছাকাছি কোনো না কোনো পাহাড়ে ঘুরতে যেতাম। সব ধরনের ফুলের নাম--পোকামাকড়ের নাম শেখাতেন তিনি। আমাদের সেই গ্রীষ্মের স্মৃতি আমরা মনের মধ্যে পুষে রেখেছিলাম।

একদিন আমরা অন্যান্য দিনের চেয়ে একটি দূরে চলে গিয়েছিলাম। ফুজি পাহাড়ের কাছে একটি হাওয়া-গুহা দেখেছিলাম। ফুজি পাহাড়ের আশেআশে অসংখ্য হাওয়া গুহা আছে। আমারা যেটা দেখতে গিয়েছিলাম সেটা ছিল সবচেয়ে বড়ো। কীভাবে হাওয়া- গুহা সৃষ্টি হয় সেটা বলেছিলে। ব্যাসাল্ট নামে একধরনের আগ্নেয়শিলা দিয়ে গঠিত হয়েছে এই গুহা। সেজন্য গুহার মধ্যে প্রতিধ্বনি শোনা যায় না বলা যায়। মামা বলেছিলেন। এমনকি গ্রীষ্মকালেও সেখানে তাপমাত্রা কম থাকে। আগে লোকজন শীতকালে বরফ কেটে গ্রীষ্মের জন্য গুহার মধ্যে বরফ জমা করে রাখত। তিনি দুধরনের গুহার পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। ফুকেৎসু হলো যথেষ্ট বড়ো গুহা। এর মধ্যে মানুষ যাওয়া আসা করতে পারে। কাজামা গুহা ছোটো। এর মধ্যে ঢোকা যায় না। এ দুটো নাম আসলে চাইনা ভাষায় দুটির শব্দ-- হাওয়া আর গর্ত-- শব্দের সমার্থক। আমাদের মামা সবই জানেন বলে মনে হতো। 

বড়ো হাওয়া গুহায় টিকেট কিনে ঢুকতে হয়। মামা আমাদের সঙ্গে গেলেন না। তিনি এখানে বহুবার এসেছেন।

তাছাড়া গুহার ছাদ নিচু বলে লম্বাকে পিঠ কুক্বজো করে চলতে হয়। ‘'এই গুহাটি ভয়ঙ্কর নয়।’’ মামা বললেন। ‘’ সুতরাং তোরা দুজনে চলে যা। আমি গুহার মুখে বসে বসে বই পড়তে থাকি।’’

গুহার মুখে যেতেই দ্বায়িত্বরত এক লোক আমাদের হাতে টর্চ লাইট দিলেন। আর মাথায় দিলেন হলুদ রঙের হেলমেট। গুহার ছাদে আলোর ব্যবস্থা আছে। তবুও সেখানে অন্ধকার অন্ধকার লাগে। গুহার যতোই ভেতরের দিকে যাচ্ছি, ততোই ছাদ নিচু হয়ে এসেছে। 

অবাক করা ব্যাপার হলো--আমাদের মামা পিছনেই আছেন। 

আমার ছোট্ট বোন আর আমি সামনে এগোতে এগোতে আমাদের পায়ের দিকে টর্চ লাইটের আলো ফেলছি। বাইরে মধ্য গ্রীষ্মকাল। ৯০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রা সেখানে। কিন্তু গুহার ভেতরে বেশ ঠাণ্ডা। তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রী ফারেনহাইটের নিচে। মামার পরামর্শ অনুসারে আমরা দুজনের গরম জামাকাপড় পরেছি। যেন আমি তাকে রক্ষা করতে পারি অথবা সে আমাকে বাঁচাতে পারে এই আশা নিয়ে আমার বোন শক্ত করে আমার হাত ধরে রেখেছে। অথবা আমরা দুজন দুজনকে যেন ছেড়ে যেতে না পারি সেজন্যই সে আমার হাত ধরে রেখেছে। যতোটা সময় আমরা ছোট সেই গুহার ভেতরে ছিলাম, ততোটা সময়ই আমার হাত ছিল উষ্ণ। সেখানে আর দুজনেন দর্শনার্থী ছিলেন। তারা দুজন মধ্য বয়স্ক এক দম্পতি। কিন্তু তারা খুব তাড়াতাড়িই আমাদের ছেড়ে গেল। তারপর আমরা দুজনই সেখানে ছিলাম। 

আমার ছোটো বোনের নাম কিমিচি। কিন্তু পরিবারের সবাই তাকে কমি নামে ডাকে। তার বন্ধুরা তাকে মিচ্ছিজি অথবা মিচ্ছান বলে। আমার জানা মতে কেউ তার পূর্ণ নাম কমিচি বলে ডাকেনি। সে ছোটো আর শুকনো একটি মেয়ে। সোজা কালো চুল তার। কাঁধের কাছে চুলগুলো ছাটা। মুখের তুলনায় তার বড়ো বড়ো চোখ। বড়ো তার চোখের মণি। এজন্য তাকে পরীর মতোই লাগে। সেদিন সে পরেছিল সাদা টিশার্ট, ফিকে রঙের জিন্সের প্যান্ট। আর পায়ে গোলাপী জুতো। 

গুহার আরো গভীরে যাওয়ার পরে আমার বোন ছোট্ট আরেকটি বাড়তি গুহা আবিস্কার করে ফেলল। সেটা গুহার প্রচলিত পথের সামান্য দূরে। একটি পাথরখণ্ডের ছায়ার আড়ালে তার মুখ ঢাকা পড়েছিল। সে এই ছোট্ট গুহাটির প্রতি খুব আকর্ষণ বোধ করল। ‘'এটা কি গল্পের এলিসের খরগোশের গর্তের মতো নয়?’’ সে আমাকে শুধালো। 

লুইস ক্যারলের ‘এলিস’'স এ্যাডভেঞ্চার ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ রূপকথার বইটি খুব ভক্ত আমার বোন। কতোবার যে তাকে এই বইটি পড়ে শোনাতে হয়েছে আমার জানা নেই। অবশ্যই সেটা একশোবার হবে হয়তো। খুব ছোটো থেকেই সে পড়তে পারতো। কিন্তু আমার গলায় উঁচু গলায় পড়ে শুনতে সে পছন্দ করত। পুরো গল্পটি তার মুখস্ত ছিল তখনো। প্রতিবারই তাকে পড়ে শোনানোর সময় সে উদ্দীপ্ত হয়ে যেতো। লবিস্টার কোয়াড্রিল অংশটাই ছিল তার সবচেতে প্রিয়। এখনো আমি গল্পটির প্রতিটি অংশ মনে করতে পারি। বলতে পারি একটার পর একটা শব্দ। 

‘'কোনো খরগোশ নেই, যদিও’ আমি বললাম। 

‘আমি গর্তের ভেতরটা উঁকি দিতে যাচ্ছি।’’ সে বলল। 

‘সাবধান।’’ আমি উত্তর করলাম। 

এটা সত্যিই খুবই ছোটো গর্ত। (আমার কাকার মতে এটা কাজা-আনা)। কিন্তু আমার ছোটো বোন কোনো ঝামেলা ছাড়াই তার মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে সক্ষম। তার শরীরের অনেকটাই গর্তের মধ্যে ঢুকে গেছে। শুধু তার পায়ের নিচের অংশ বাইরে আছে। সে সম্ভবত তার টর্চ লাইটটি জ্বালিয়েছে ছোটো গর্তের মধ্যে। তারপর সে গর্ত থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে থাকল। 

‘'এটা সত্যিই খুব গভীর।’’ সে জানালো। ‘’ গর্তের মেঝেটা হুট করে নিচের দিকে অনেকটা ডেবে গেছে এলিসের গল্পের খরগোশের গর্তের মতো। আমি দূরের চলে যাওয়া শেষটা দেখতে যাচ্ছি।’’

‘ না, ওখানে ঢুকো না । এটা খুবই বিপজ্জনক। ‘’ আমি বললাম। 

‘চিন্তা নেই। আমি খুব ছোটোখাটো। ঠিক ঠিক বের হয়ে আসতে পারবো।’’

সে তার হাল্কা শীতবস্ত্রটি খুলে ফেলল। শুধু টিশার্টটি গায়ে রইল। আর তার হেলমেটসহ শীতবস্ত্রটি আমার হাতে দিল। আমি ঠেকাতে যাওয়ার আগেই সে সুড়ুৎ করে গর্তের মধ্যে ঢুকে গেল। টর্চ লাইট তার হাতে আছে। মুহূর্তের মধ্যেই সে নাই হয়ে গেল। 

অনেক সময় কেটে গেল। কিন্তু তার ফেরার নাম নেই। কোনো শব্দও শুনতে পাচ্ছি না। 

‘'কমি’, গর্তের দিকে তাকে ডাকলাম। ‘'কমি, ঠিকঠাক আছিস তো?’’

কোনো উত্তর এলো না। কোনো প্রতিধ্বনি শোনা গেল না। অন্ধকার আমার কণ্ঠস্বরকে চুষে নিল। আমার উৎকণ্ঠা হতে লাগল। মনে হয় সে গর্তের মধ্যে কোথাও আটকে গেছে। সামনে- পেছনে কোথাও নড়ার ক্ষমতা তার নেই। হয়তো সেখানে তার খিঁচুনি হয়েছে। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। যদি সেটা ঘটে তবে তাকে কোনো সাহায্য করতে পারব না আমি। আমার মাথার মধ্যে সর্বপ্রকার ভয়ঙ্কর ছবি ছুটে আসতে লাগল। আমার চারদিক অন্ধকার হয়ে এলো। শ্বাস কষ্ট হতে লাগল। 

যদি আমার ছোটো বোনটি সত্যি সত্যি গর্তের মধ্যে হারিয়ে যায়, যদি সে এ পৃথিবীতে ফিরে না আসে, তবে কী কৈফিয়ত দেবো বাবামায়ের কাছে? গুহার মুখে বসে থাকা আমার কাকার কাছে কি আমি দৌঁড়ে যাবো? তাকে গিয়ে বলবো? অথবা শক্ত হয়ে গর্তের মধ্যে বসে তার ফেরার জন্য অপেক্ষা করবো? আমি অনেক চেষ্টা করে গর্তের মধ্যে মুখ মাথা ঢুকিয়ে উঁকি মেরে দেখতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার টর্চলাইটের আলো খুব বেশি দূর গেল না। এটা খুবই ছোট গর্ত। আর অন্ধকারও খুব গাঢ়। 

‘'কমি’, আবারও ডাক পাড়লাম। কোনো উত্তর নেই।

‘'কমি’, আরো জোরে চিৎকার করে ডাকলাম। তখনো কোনো উত্তর এলো না। আমার মেরুদণ্ড দিয়ে দিয়ে হীমস্রোত নেমে এলো। আমি বোধ হয় চিরতরে আমার বোনকে হারালাম। সে বোধ হয় এলিসের গর্তের মধ্যে মিশে গেছে। হারিয়ে গেছে বিদ্রুপকারী কাছিমের জগতে। পাকাপাকি পৌঁছে গেছে চেশিয়ার বিড়াল আর ইস্কাবনের রানীর কাছে। এ জায়গায় যুক্তি কাজ করে না৷ এখানে আর কখনোই আমরা আসবো না বলে মনে হলো। 

কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার বোন ফিরে এলো। আগের মতো সে পিছন ফিরে এলো না। হামাগুড়ি দিয়ে এলো। প্রথমে এলো তার মাথাটি। গর্ত থেকে প্রথমে তার কালো চুলগুলো বেরিয়ে এলো। তারপর এলো কাঁধ আর হাত। সবশেষে তার গোলাপী জুতো। সে এসে দাঁড়ালো আমার সামনে। মুখে কোনো কথা নেই। বুকটা প্রসারিত করে ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিল। তার জিন্সের প্যান্ট থেকে ধুলো ঝেড়ে ফেলল। 

আমার হৃদপিণ্ড তখনো ধড়ফড় করছিল। আমি তাকে ধরলাম। তার আগোছালো চুলগুলো পরিপাটি করে দিলাম। টর্চের আলো দুর্বল বলে গর্তের ভেতরটা স্পষ্ট করে দেখতে পারিনি। কিন্তু মনে হয় সেখানে ধুলো, ময়লা আর অন্য কিছু আবর্জনা আছে। এগুলো তার সাদা টিশার্টে আটকে আছে। তার শীতবস্ত্র আর হলুদ হেলমেট তার হাতে দিলাম।
‘আমি ভাবিনি তুমি আর ফিরে আসবে।’ তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম। 

‘তুমি কি দুশ্চিন্তায় ছিলে?’

‘অনেক।’

সে আমার শক্ত করে ধরল। সে খুব উত্তেজিত গলায় বলল, ‘ গর্তের ছোটো অংশের ভেতর দিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেকে কায়দা করে কুচড়ে মুচড়ে করে নিয়েছিলাম। তারপর গর্তের গভীর যেতে লাগলাম। হঠাৎ করে গর্তটি নিচে হয়ে গেল। সেখান থেকে নিচে একটা ছোটো একটা ঘরের মতো ছিল। ঘরটা বলের মতো গোলাকার। ছাদটা গোলাকার। দেওয়ালগুলোও গোলাকার। এমনকি মেঝেটাও গোলাকার। আর সেখানে খুববেশি নিস্তব্ধতা আছে । সে ধরনের নিস্তব্ধতা সারা পৃথিবী খুঁজে কোথাও পাবে না। যেন আমি একটি সমুদ্রের তলায় চলে গেছি। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখো হতে পারে সেটা। সেটা যেন আরো গভীরে চলে গেছে।

আমি টর্চলাইট নিভিয়ে দিলাম। সেখানকার অন্ধকার যেন আলকাতরার মতো কালো। কিন্তু আমি ভয় পাইনি বা নিঃসঙ্গ বোধ করিনি। সেটা হলো একটা বিশেষ ঘর। কেবল আমারই সেখানে যাওয়ার অনুমতি আছে। আমার জন্যই কেবল একটা ঘর। অন্য কেউ সেখানে যেতে পারে না। এমনকি তুমিও যেতে পারো না।'

‘কারণ আমি অনেক বড়ো।’

আমার ছোটো বোন তার মাথা দোলানো। ‘ঠিক, সেখানে যাওয়ার জন্য তুমি বেশ বড়ো। সত্যি বলতে কি এখন অব্দি অন্য কোনো জায়গার চেয়ে সেখানকার অন্ধকার বেশি গাঢ়। এটাই হলো এ জায়গার মজা। সেটা এতো অন্ধকার যে টর্চ লাইট নিভিয়ে দিলে এমন একটা অনুভূতি তোমার হবে যেন দু হাত দিয়ে সেই অন্ধকারকে তুমি আকড়ে ধরতে পারবে। সেখানে মনে হতে থাকবে-- তোমার শরীরের অংশগুলো যেন ক্রমন্বয়ে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। আর এক সময় তা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অন্ধকারের জন্য তুমি এই ঘটনাগুলো চোখে দেখতে পাবে না। তোমার একটা শরীর আছে কি নেই সেটাও তুমি জানতে পারবে না। বলতে পারো--আমার শরীরটা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেলেও কিন্তু সেখানে আমি আছি। যেমন চেশিয়ার বিড়ালটি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পরেও তার দাঁত বের করা হাসিটা ছিল। বেশ অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? কিন্তু সেখানে যখন আমি ছিলাম, তখন কিন্তু মোটেই আমার কাছে অদ্ভুত লাগেনি। সেখানে চিরকাল থাকতে ইচ্ছে করেছিলাম। কিন্তু মনে হলো তুমি দুশ্চিন্তা করবে। তাই ফিরে এসেছি।’

‘চলো, এখান থেকে আগে বের হই, ‘’ আমি বললাম। সে খুব বেশি আত্মমগ্ন হয়ে বলছিল। মনে হলো তার এই কথাবলা চিরকাল ধরে চলতেই থাকবে। তাকে থামানো দরকার। 

‘আমি এখানে ভালো মতো শ্বাস নিতে পারছি না।’’

‘'তুমি কি ঠিক আছ?’’ আমার বোন উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইল।

‘'আমি ঠিক আছি। আমি শুধু বাইরে যেতে চাইছি।’’

হাত ধরে আমরা বেরোবার পথের দিকে এগোলাম। 

‘'তুমি কি জানো?’’ হাঁটতে হাঁটতে বোন ফিসফিস করে বলল যাতে কেউ শুনতে না পারে। কিন্তু সেখানে আর কেউ ছিল না। ‘’ এলিস সত্যিই আছে। তাকে কেউ লিখে বানায়নি। সে বাস্তবের চরিত্র। এখানে মার্চ আছে, ম্যাড হাটার আছে-- আছে চেশিয়ার বিড়াল। আর আছে তাস খেলার সৈন্য। এরা সবাই জীবিত চরিত্র।' 

‘'হতে পারে,’ আমি উত্তর দিলাম। 

গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা। ফিরে এলাম উজ্জ্বল বাস্তব জগতে। সেই দুপুরে একটি হালকা মেঘের স্তর আকাশে ছিল। কিন্তু সেদিন সূর্যের আলোকে কী ভীষণ উজ্জ্বল লাগছিল-- মনে আছে। ঝিঁঝিঁ পোকাদের সমস্বর ডাকাডাকি শুনে মনে হচ্ছিল--জলে ডুবে যাওয়া সব ভয়ংকর চিৎকার ভেসে উঠেছে। গুহার প্রবেশপথের কাছে একটি বেঞ্চে বসে আমাদের মামা মগ্ন হয়ে বই পড়ছিলেন। আমাদের দেখতে পেয়ে দাঁত বের করে হাসলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। 

দু বছর পরে আমার বোন মারা যায়। তাকে একটি ছোট কফিনে রাখা হয়। তাকে পোড়ানো হয়। আমার বয়স তখন পনেরো। আর সে বারো। তাকে পোড়ানোর সময়টিতে হবে তখন আমি চলে আসি। আমাদের পরিবারের অন্যদের ছেড়ে শ্মশান ক্ষেত্রের উঠোনে একটি বেঞ্চে বসে থাকি। তারপর হাওয়া গুহায় কী ঘটেছিল তা চিন্তা করতে থাকি। গর্ত থেকে আমার বোনের ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছিলাম যখন, সেই সময়ের দুঃসহ ভারের কথা মনে পড়ছে। চিঠিলেখার খামের মতো যে অন্ধকার তখন আমাকে ঘিরে ছিল, তার পুরুত্বকে অনুভব করছি। আর টের পাচ্ছি সেই তীক্ষ্ণ ঠাণ্ডা অনুভূতিকে। তার কালো চুল গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছে, তারপর দেখা যাছে তার কাঁধ। মনে পড়ছে তার টিশার্টে এলোমেলো করে লেগে থাকা সেইসব ময়লা আর ধুলাবালিকে। 

তখন একটা ভাবনা আমাকে তাড়া করছিল। ভাবনাটি হলো-- হাসপাতালে ডাক্তার যখন অফিসিয়ালি সুস্পষ্টভাবে তার মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেছিলেন-- সেই ঘোষণা দেওয়ার দু বছর আগেই সেই গর্তের মধ্যে যখন সে ঢুকেছিল তখনই তার জীবন টুকরো টুকরো হয়ে সেখানে থেকে গিয়েছিল। আমি কিন্তু সত্যি সত্যি এটা বিশ্বাস করেছিলাম। সে গর্তের মধ্যে আগেই হারিয়ে গিয়েছিল। ছেড়ে গিয়েছিল এই জগতকে। কিন্তু ভুল করে দুবছর তাকে জীবিত মনে করেছিলাম। মনে করেছিলাম তাকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে উঠেছি। টোকিওতে ফিরিয়ে ফিরিয়ে এনেছি। শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম তার হাত। এরপরও আমরা ভাইবোন হিসেবে আরো দুবছর কাটিয়েছি। সেটা ছিল খুব মধুর সময়। সে সময়টা খুব দ্রুত চলে গেছে। এছাড়া আর কিছু নয়। দু বছর পরে সেই গর্ত থেকে মৃত্যু হামাগুড়ি ফিয়ে বেরিয়ে এলো। এসে আমার বোনের আত্মাকে ধরে নিয়ে গেল। যেন তার সময় শেষ হয়ে গেছে। আমাদের কাছে সে যা গচ্ছিত রেখে গিয়েছিল তা তাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছে।। তার মালিক এসে পড়েছে। তার নিজের জিনিস ফিরিয়ে নিতে এসেছে। 

বহু বছর পরে, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ হিসেবে বুঝতে পেরেছি-- আমার ছোটো বোনটি স্নিগ্ধভাবে আমার মধ্যে একটি কথা গেঁথে দিয়ে গেছে। সেটা হলো-- সেই হাওয়া গুহার ব্যাপারটি ছিল সত্যি। এই পৃথিবীতে এলিসের অস্তিত্ব আছে। মার্চ নামের খরগোশ, ম্যাড হাটার, চেশিয়ার বিড়াল-- এই পৃথিবীতে অস্তিত্ব নিয়ে দিব্যি আছে।






অনুবাদক
কুলদা রায়

৫টি মন্তব্য: