শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সায়ন্তনী ভট্টাচার্যের গল্পঃ দেবদূত

খুবই খিদে পেয়েছে বনমালীর। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসতে বসতে ঘাড় তুলে ফ্যাকাশে চাঁদের দিকে চাইল। চাঁদের মধ্যেও কেমন এক খিদে খিদে ভাব। কলকাতা ঝিম ধরে আছে। অনেক রাত। বারোটা বাজে প্রায়। কুয়াশা জড়িয়ে ধরেছে শহরকে।
ল্যাম্পের আলোগুলো ঘুমোতে ঘুমোতে জ্বলছে। সামনেই এম জি রোড মেট্রো। আট-দশ ধাপ সিঁড়ি দিয়ে স্টেশনে উঠে তারপর পাতালে নামতে হয়। অনেকটা জীবনের মতো, ওঠো আর নামো। সামনে বাঁধানো চত্বর। সেখানে ঘুমিয়ে আছে কিছু বুড়ো ভিখিরি, ছ-সাতটা ছানা সমেত কুকুর পরিবার। তিন-চারজন ডবকা মেয়েও আছে। কদিন খুব বর্ষা গেছে। হাওয়া ঠান্ডা। গায়ে হালকা চাদর না রাখলে শীত করে। বুড়ো ভিখিরিরা নিজেদের গায়ে আর কুকুরদের গায়ে পলিথিনের শিট জড়িয়েছে। সার দিয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে সব। ভালো করে না দেখলে কে কুকুর কে মানুষ বোঝা যাচ্ছে না। নেহাত বনমালীর তৈরি চোখ, তাই সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।

মেয়েগুলোর শরীর গরম বোধহয়, চাদর দেয়নি। বনমালী বসেছে একখানা পুরনো বাড়ির দেয়ালে ঠেস দিয়ে। যেখানে বসেছে সেখানে রোজ সকালে একজন আলুকাবলিওয়ালা বসে। পাশেই স্কুল। স্কুলের ছেলেরা আলুকাবলি কিনে খায়। আলুকাবলিওয়ালা নোংরা জলে তেঁতুল গোলে, ময়লা গামছায় হাত মুছে সেই হাতে আলুকাবলি মাখে, ছেলেরা দেখেও দেখে না। অভ্যাস হয়ে গেছে। রসিয়ে রসিয়ে আলুকাবলি খায়। বনমালীর ভালোই লাগে। নরম আলুর কথা ভাবতে ভাবতে চোখ বোজার চেষ্টা করলো বনমালী, যদি ঘুম এসে জাপটে ধরে, যদি খিদে ভুলে থাকা যায়! কিন্তু খিদের পেটে কি আর ঘুম আসে? বনমালীর খিদের কথা বুঝেই হয়তো ফ্যাকাশে চাঁদ এইসময় একটু বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চোখে উপর আলো পড়তেই চোখ জ্বলে গেলো। আহা এমন আলো কি আর সবার সয়? অসহ্য লাগে না? মন আরো ছটফট করে ওঠে না? ছটফটে মন নিয়ে আবার চারপাশে চোখ চালালো বনমালী। দেখলো সে যেখানে বসে আছে তার ডানপাশে এখনো জেগে আছে এক ফুটপাথবাসী পরিবার।


বনমালী কুতকুতে চোখে চায়, বোঝার চেষ্টা করে কি হচ্ছে, এরা এখনও জেগে কেন? কনকলতা বনমালীকে দেখতে পায়। বুঝতে পারে বনমালী দেখার চেষ্টা করছে কনকলতার এই ফুটপাথের পরিবারে ঠিক কি হচ্ছে! কনকলতার তাতে যায় আসে না। সে নীলু-পুলু আর তাদের বাপ ভুটু আর ভুটুর মা মানে কনকলতার শাশুড়ি অবলা হাতিকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে যদি বটুককে বাঁচানো যায়! অথচ একটু আগে পর্যন্তও বটুকের সঙ্গে তেমন চেনাজানা ছিলো না। আর এখন মনে হচ্ছে বটুক তাদের কত আপন! বটুক নামটাও তো এইমাত্র দিলো কনকলতা। বয়েস হবে মনে হয় এই বছর খানেক। সাদা ধবধবে, ফুলো ফুলো রোমগুলো নিস্তেজ হয়ে আছে, গোঁফগুলো তিরতির করে কাঁপছে। আহারে! সামনের দিকের ডান পায়ে বড্ড লেগেছে। কেঁপে কেঁপে উঠছে। রাতের রাস্তায় গাড়িগুলোর হুশ থাকে না, যেমন-তেমন করে চালায়, মানুষ থাকলে তাকেই উড়িয়ে দেবে আর বটুকতো সামান্য একটা বেড়াল। রাস্তা পেরচ্ছিলো, জানে না মেরে পায়ে মেরেছে।

নীলু-পুলু কনকলতার দুই যময ছেলে, দশ বছর বয়েস। দুজনেরই মায়ার প্রাণ। কৌটো থেকে বিস্কুট বের করে ফেলেছে। এবার বিস্কুট গুঁড়ো করে বটুকের মুখের সামনে ধরেছে। বটুক জিভ বের করে একটু একটু করে খাচ্ছে। ভুটুও কিছু কম যায় না, বটুকের পায়ে ঠেকনা দিয়ে বাঁধন দিচ্ছে। অবলার বয়েস হয়েছে, সে বাহাত্তর-চুয়াত্তর হবেই। সে সমানে বটুকের মাথায় হাত বোলাচ্ছে। দেখতে দেখতে কনকলতার চোখে জল আসে। কে বলবে এই অবলাই সারাদিন কনকলতার ওপর চেঁচায়। মুখ খারাপ বুড়ির। লাঠি নিয়ে ঠুকঠুক করে বুড়ি ভিক্ষা করে। যে টাকা পায়, জমায়। বলে নাকি নাতিদের জন্য জমাচ্ছে। অথচ ফুটপাথের সংসার চালাতে কনকলতার শ্বাস উঠে যায়। বুড়ির থেকে টাকা চাও, লাঠি নিয়ে তেড়ে আসবে। সেই বুড়ি কিনা বটুকের মাথায় এমন করে হাত বোলাচ্ছে!

আহা! তারপর ভুটুর কথাই ধরা যাক। স্বামী হিসাবে কোন কর্তব্যটা করে? সারাদিন মাল বওয়ার কাজ করে পোস্তায়। শরীর দুবলা, ভারী মাল তেমন টানতে পারে না। পয়সাও আসে না। যেটুকু পায়, সেটুকুও প্রায়ই মাল খেয়ে উড়িয়ে আসে। জানে কনকলতা মানুষটার মন ভেঙেছে।


বন্যায় ঘর গেলো, চাষের জমি গেলো, নদী গিলে নিলো সব। ব্যাস, মানুষটারও সব গেলো। সেই মানুষটাই বেড়ালের পা ঠিক করতে উঠে- পড়ে লেগেছে। কনকলতার মনে হলো এত সুন্দর বেড়ালের নাম বটুক দেওয়া উচিত হয়নি। ভালো নাম ভাবতে পারতো। তবু যে কেন বটুকটাই মনে এলো? ওহো, বুঝেছে কনকলতা, বিয়ের পর যখন প্রথম স্বামীর ঘর করতে আসে, মানে সেই যখন চাঁদ উঠলেই মনে হতো পূর্ণিমার চাঁদ, অমাবস্যাতেও যেন জ্যোৎস্নার বান, মানে যখন অবলা তার বৌমার থুতনি ধরে বলেছিলো ‘একেবারে লক্ষ্মীপিতিমের মতো মুখ’, মানে যখন ভুটুর মনটা শক্ত ছিলো, ভাবতো যেকোনও যুদ্ধ জিতবে হেলায়, তখন নদীর ধারে গ্রামের বাড়িতে মিউমিউ করে যে বেড়ালটা পায়ে পায়ে ঘুরতো, তার নাম ছিলো বটুক। তখনও নীলু-পুলু পেটে আসেনি। কনকলতার মনে তখন ভরাট শস্যখেত। বটুক কোলে এসে ঘুমিয়ে পড়তো, মাছের কাঁটা খেতো তরিবত করে। আজ কি শহরের এই নোংরা ফুটপাথে পুরনো বটুক ফিরে এলো? সঙ্গে করে পুরনো দিনগুলোকে ফিরিয়ে আনলো? তাই সবাই এমন করে ভিজে আছে! বাস্তবের রুক্ষতা থেকে এই বেড়াল তাদের কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি দিয়েছে? না না, এমনও কি হয়? যে দিন গেছে, তা কি আর ফেরে? কনকলতার চোখদুটো টলটল করে ওঠে। সামান্য যা টাকা ছিলো তাই দিয়ে ওই ইটের উনুনে বসানো লোহার কড়াইতে লটেমাছের ঝাল রেঁধেছিলো। তখন পলিথিনের তলায় শুয়ে বুড়ি শাশুড়ি সুখের দিনের কথা ঘ্যানর ঘ্যানর করছিলো। অসহ্য লাগছিলো কনকলতার। নীলু-পুলু লটে মাছের গন্ধে চনমনে হয়ে ছিলো, রাতের ইস্কুলে পড়তে যাওয়ার ওদের মোটেই ইচ্ছে ছিলো না। তো সেই লটে মাছের ঝাল অল্প আছে। ভাতও আছে। যত্ন করে ভাত দিয়ে লটে মাছের ঝাল মেখে বটুকের মুখের কাছে ধরলো। বটুক ম্যাও করে ডেকে বিস্কুটের গুঁড়ো ছেড়ে মাছ-ভাতে মুখ দিলো। একগাল হেসে ভুটু বললো, যাক, আর চিন্তা নেই কনক, বেড়ালটা বেঁচে গেলো। সত্যিই কাঁপুনি থেমে গেছে। যেন এখন একটু ধাতস্ত হয়েছে বটুক। কনকলতা ফুটপাথে বসা সেই লোকটার দিকে চায়। দেখে লোকটার চোখ যেন

জুড়িয়ে এসেছে। ঘুম এসে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। বনমালীর কুতকুতে চোখ বুজে যায়। ঘুম, আহা, ঘুম।
আরেব্বাস, দিনতো একেবারে অন্যরকম। রাতের শীত, ভেজা ভাব, কুয়াশা উধাও। চচ্চড় করে রোদ উঠেছে। বনমালীর খিদে কোন মগডালে উঠে পড়েছে। আবার মোচড় দিলো। হাঁটতে হাঁটতে কোথায় এসেছে বনমালী? ধর্মতলা। খিদে মেটানোর আয়োজন করতে হবে। সবথেকে ভিড়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো বনমালী। লোকজন ঠেলেঠুলে চলে যাচ্ছে। যাক। বনমালী দ্যাখে বড় হোটেলের সামনে সাহেব-মেম গাড়ি থেকে নামে। দুজনেরই হদ্দ বয়েস। নব্বই-এর কাছে তো হবেই। এ শহরে এসেছে কেন? কী আছে এই শহরে? বনমালী বুঝতে পারে না। মেমবুড়ির এদিকে পায়ে ব্যথা। হাঁটতে পারে না। যে হুইলচেয়ারটা নিয়ে এসেছে হোটেলের কর্মচারী, সেই হুইলচেয়ারে মেমবুড়ি বসতে পারছে না, কেন কে জানে! মানাতে পারছে না বুঝি। ব্যথায় চোখ ফেটে জল আসছে মেমবুড়ির। বুড়োসাহেব তাকে কোলে তুলে নেয়, তার কুঁচকোনো গালে চুমু খায়। চোখ ঝকমক করে ওঠে বুড়োসাহেব আর তার বুড়ি মেমের। বুড়িকে কোলে নিয়েই হোটেলের ভেতর ঢুকে যায়। বনমালীও একগাল হেসে নিজের পকেটে হাত দেয়। টাকা আছে। ভিখিরি ভেবে দিয়েছে লোকজন। সেই টাকা দিয়ে ব নমালী একখানা বাঁশি কিনে ফেলে।


বাঁশি বাজাতে বাজাতে কোথায় যে এলো বনমালী। পরিদের দেশে? ধুর ধুর। এতো ভিক্টোরিয়া। পরিতো মোটে একটা। টঙে বসে আছে। বনমালীকে দেখতে পেয়েই ডানা ঝাপটে নেমে এলো পরি। বললো, ‘বাজাও বাঁশি’।

- আমি কি তেমন করে বাঁশি বাজাতে জানি?

- জানো, জানো, খুব জানো।

- খালি পেটে বাঁশি বাজানো যায়?



- খালি পেট? আবার? এইতো খেলে। এত ঘন ঘন খিদে পায়?

- ঘন ঘন কোথায়? দেখছো না সন্ধে নেমে আসছে ফের। সেই কখন

থেকে না খাওয়া।

- তোমার খিদে বেড়ে গেছে।

- তা একটু বেড়েছে বোধহয়।

- আমি তাহলে যাই, ভিক্টোরিয়ার মাথায় গিয়ে বসি। ওখান থেকে

আমার আর কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। ওখানেই আটকে গেছি।

- যাও। আবার দেখা হবে।

পরি আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসে আর বনমালী দেখে ফুলের গাছের কাছে বসে কাঁদছে চমনলাল। বনমালী চমনলালকে চেনে। পুরনো দিনের মানুষ, মালীর কাজ করতো। বয়েস বাড়তে কাজ গেছে। এখন ছেলে মোহনলালের চায়ের স্টলের পাশে টুল নিয়ে বসে থাকে। মোহন বলে,

‘বাপু তোমার মাথাটাই খারাব হোয়ে গেছে’। বনমালী চমনলালের কাছে যায়, বলে, চমনলাল কাঁদছো কেন? বনমালীকে দেখে চমনলাল খুশি। কতদিন পরে যে দেখা হলো। বলে,

‘কাঁদবো না? এ ফুল দেখছো, পিটুনিয়া। এর রং লাল। এর দোসর ছিলো সাদা পিটুনিয়া। আভি আভি ও সাদা পিটুনিয়াকে ছিঁড়ে নিয়ে গেলো কে এক বেবকুফ টুরিস্ট। তাই লাল পিটুনিয়া কাঁদছে। সাথ সাথ হামিভি কাঁদছি। একটা ফুল মরে গেলো, আর কাঁদবো না’? কথাটা শুনে কী যে হলো বনমালীর। পৃথিবীর সমস্ত ফুলের জন্য, পাখির জন্য, গাছের জন্য, আকাশের জন্য, নদীর জন্য, মাঠের জন্য, চাঁদ- তারা-সূর্যের জন্য কেঁদে ফেললো ঝরঝর করে। চমনলাল বনমালীকে জড়িয়ে ধরে। ফিসফিস করে বলে, ‘কত ফুল ঝড়ে যায়, বাঁচাতে না পারি, উসকে লিয়ে একটু দুখ তো পেতে পারি, কাঁদতে তো পারি। কিঁউ, পারি না’?

বনমালী জবাব দেয় না। আরো খিদে চাগাড় দেয়। আরো খিদে।


এদিকে দিন যায়, রাত যায়, বছর যায়, মাস যায়, বনমালীর খিদে বাড়ে। আরো আরো খিদে। বনমালীকে পাঁউরুটি দাও, ভাত দাও, ডাল দাও, মাছ


দাও, মুড়ি দাও...খাবে না, খাবে না। বড্ড ডাঁট ওর। এসবে ওর খিদে মেটে না। ও শুধু ভালোবাসা খোঁজে, যত্ন খোঁজে, আদর খোঁজে। কুতকুতে চোখে দ্যাখে আর পেট ভরায়। আহা! ফুলের জন্য কাঁদছে মানুষ,মানুষের ব্যথায় কাঁদছে মানুষ! পৌষ মাস, ফাল্গুন মাস, এমন আরো কত মাস, কত ঋতু, বর্ষা, শীত, বসন্ত, কত তীব্র রোদ্দুরের দিন, বনমালী ভালোবাসা খুঁজে ফিরছে। খুঁজে না পেলে যে ওর খিদে মিটবে না। পেট ভরবে না। বাঁচবে কেমন করে বনমালী? বনমালীকে সবাই বুঝি টের পায়? উঁহু। টের পায় ভিক্টোরিয়ার পরি, মাথা খারাপ চমনলাল, টলটলে জলভরা চোখের কনকলতা আর ধর্মতলার সেই বাঁশিওয়ালা। সেই বাঁশিই বাজাচ্ছে বনমালী। বাজাচ্ছে আর হাঁটছে। তারাভরা আকাশের নিচে ঠায় দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে পরি। আরেকটু বেঁচে থাকা জমা হচ্ছে মনের ভিতরে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন