শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

ইউজেনিয়া ডব্লিউ কলিয়ার'এর গল্প : হলুদ -গাঁদা

কৃষ্ণ আমেরিকান গল্প
অনুবাদঃ রঞ্জনা ব্যানার্জী 

লেখক পরিচিতি- 
অ্যাফ্রিকান আমেরিকান লেখক এবং ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ‘ইউজিন ডব্লিউ কোলিয়ার’র জন্ম ১৯২৮ সনে, মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে। ‘মেরিগোল্ডস’ তাঁর লেখা ছোটো গল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই গল্পের জন্য তিনি ১৯৬৯ সনে নিগ্রো ডাইজেস্টের ‘গুয়েন্ডলিন ব্রুকস সাহিত্য পুরস্কার’ অর্জন করেছিলেন।
আমার বেড়ে ওঠার সেই শহরের কথা ভাবলেই কেন জানি না কেবল ধুলোর স্মৃতিই মনে পড়ে; গ্রীষ্মের শেষদিককার খয়েরি ঝুরঝুরে শুকনো, অনুর্বর ধুলো যা চোখে বসলেই জল, গলায় ঢুকলেই গলা শুকিয়ে কাঠ এবং আমাদের খয়েরি খালি পায়ের আঙুলের ফাঁকে যাদের অবিরাম চলাচলের ছাপচিহ্ন। ঠিক কী কারণে সেই সময়ের সঙ্গে এই ধুলো-ওড়ানো ছবিটিই যুক্ত হয়ে আছে জানা নেই আমার। সেই শহরের কোথাও না কোথাও নিশ্চয় নিবিড় সবুজ বনভূমি কিংবা ছায়াবীথি ঘেরা ইটসুরকির বাঁধানো পথও ছিল। আসলে স্মৃতি হ’ল বিমূর্ত ছবির মত; দৃশ্যমানকে নয় বরং দৃশ্যের অনুভবকেই পাকাপাকি ধারণ করে রাখে। এবং সেই কারণেই হয়তোবা যখনই সেই সময় এবং শহরটির কথা ভাবি তখনই সেই ম্যাড়ম্যাড়ে সেপ্টেম্বরের কাঁচা রাস্তা এবং আমাদের বস্তির ঘাসহীন বিরান উঠোনের স্মৃতিই আড় ভাঙে। আরও একটা অসঙ্গতি সেই ধুলিময় স্মৃতিকে জাপটে আছে তা হ’ল সূর্যের মত ঝলমলে একপশলা হলুদ ছটা – মিস লোটির হলুদ-গাঁদার বাগান।

এই গাঁদাগুচ্ছ আমাকে এক অদ্ভুত পিছুটানে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধে এবং তার রঙের আভাস আবছা হলেও সেই নস্ট্যালজিক অনুভূতি আমাকে সহজে ছাড়ে না। বয়ঃসন্ধির ফেলে আসা গোলমেলে ধোঁয়াটে বিভ্রম, টবে লাগানো জেরেনিয়ামের মতই সত্য মনে হয় আমার। বহুকাল আগের চৌদ্দ থেকে সদ্য পনেরতে পা দেওয়া কিশোরীর আনন্দ এবং ক্রোধ, বুনোজন্তুর মত আদিম উল্লাস এবং লজ্জার নানা রঙের জটপাকানো মিশেল অনুভূতি ছাড়াও মিস লোটির উঠোনে হঠাৎ করেই কিশোরীর খোলস ছেড়ে আমার নারীতে রূপান্তরের সেই সঙ্গিন মুহূর্তের প্রতিটি ক্ষণ, আমি যেন স্পষ্ট অনুভব করতে পারি। অদ্ভুত সব সময়ে এই গাঁদাগুচ্ছের ভাবনা আমার মনে আসে ; যেমন এই মুহূর্তে আমি ওদের পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি অথচ আমি এখন মরিয়া হয়ে তোমারই প্রতিক্ষার প্রহর গুনছি, যদিও বিলক্ষণ জানি যে তুমি আর ফিরছ না। 

আমার ধারণা ছেলেবেলার এইসব অর্থহীন অপেক্ষাও ছিল আমাদের মত সংখ্যালঘু হতদরিদ্র সম্প্রদায়ের বিষণ্ণতার আবহসঙ্গীত। সমগ্র জাতিকে টলিয়ে দেওয়া ভয়ঙ্কর সেই অর্থনৈতিক মন্দা আমাদের কাছে নতুন কোনো ঘটনা ছিল না। কেননা মেরিল্যান্ডের সেই প্রান্তিক জনপদের কালো শ্রমিকেরা এমন মন্দার সঙ্গেই আজীবন বসবাস করে আসছিল। তাদেরই একজন হিসেবে আমিও আমাদের অপেক্ষার কোনো যৌক্তিক অর্থ তৈরি করতে পারি না। সাদা মানুষদের ‘অদূরেই সুসময়’ জাতীয় আশ্বাস আমরা কখনই বিশ্বাস করিনি, তাই এমন কিছুর অপেক্ষাও করেনি কেউ। কিংবা ‘কঠিন পরিশ্রম এবং মিতব্যয়ীতা সাফল্যের সোনার হরিণকে বাঁধতে পারে’ মার্কা ‘অ্যামেরিকান স্বপ্নের’ ফাঁকা প্রতিশ্রুতির সার-কথাও আমাদের ইতোমধ্যেই জানা হয়ে গিয়েছিল। খুব সম্ভব আমরা নির্দিষ্ট আকারহীন অলৌকিক কিছু ঘটবার অপেক্ষায় ছিলাম; যাদের আঁধার লেপা ভোরে পেটের তাগিদে ঘর ছাড়তে হয় এবং সূর্য ঢলার অনেক পরে গাঢ় অন্ধকারে দাঁতে দাঁত চেপে সাদা মালিকের আঙুরের বাগানে কাজ করতে হয় কিংবা সেপ্টেম্বরের ধুলো ওড়ানো মওশুমেও এক টুকরো রুটির সংস্থানের জন্য ঘাম ঝরাতে হয়, সেইসব মানুষের জন্য এমন আবছা অলৌকিক কোনো ঘটনার আশাই আসলে বেঁচে থাকার প্রণোদনা। কিন্তু সৃষ্টিকর্তাও অলৌকিক ঘটনা পয়দার ব্যাপারে দারুণ দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন তখন, তাই অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের কোনো গতিও ছিল না। 

আমাদের অভাব যে কতটা প্রকট সেই সম্পর্কে আমাদের অর্থাৎ ছোটোদের কোনো স্বচ্ছ ধারণাই ছিল না। আমাদের বস্তিতে কারও রেডিও ছিল না, গুটিকয়েক খবরের কাগজ অবশ্য ছিল তবে কোনো ম্যাগাজিন ছিল না তাই আমাদের গণ্ডির বাইরের পৃথিবীতে ঠিক কী ঘটছে আমরা জানতামই না। এখনকার সময় হলে আমাদেরকে ‘সাংস্কৃতিক-অধিকার বঞ্চিত’ জনগোষ্ঠি হিসেবে নিশ্চিত চিহ্নিত করা হ’ত এবং আমাদের বিষয় করে বইটই লেখা হ’ত তো বটেই , নানা রকম সম্মেলনের আয়োজনও হ’ত। কিন্তু সেই সময়ে আমাদের চেনা সকলেই আমাদেরই মত ক্ষুধার্ত ছিল। তাদের পোশাক আশাকও ছিল আমাদেরই মত জীর্ণ। দারিদ্র্য নামের খাঁচায় আমরা সকলেই বন্দি ছিলাম। এবং নিজেদের এই দৈন্যের প্রতি বিদ্বেষও অস্বচ্ছ ছিল, অনেকটা সেই ফ্লেমিংগো পাখিটির মতই; চিড়িয়াখানায় জন্ম নিয়েও যে জানত ডানা মেলে ইচ্ছেমত ওড়বার জন্যেই প্রকৃতি তাকে সৃষ্টি করেছে।  
যখনই আমি সেইসব দিনের কথা ভাবি তখনই আমার গ্রীষ্মের শেষ দিকের উজ্জ্বল দিনগুলির কথাই প্রবলভাবে মনে পড়ে, সেই ক্রমশ ছোটো হয়ে আসা দিনগুলি যা আমাদের আসন্ন শীতের ইঙ্গিত দেয়।     
আমি চৌদ্দতে পা দিতে না দিতেই আমাদের বাড়ি প্রায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আমি আর জোয়ি ছাড়া ভাইবোনদের কেউ থাকত না আমাদের সঙ্গে। বড়দের কেউ কেউ কমবয়েসেই বিয়ের টোপ গিলে ফেলেছিল, কেউ কেউ শহরের মোহজালে আটকে পড়েছিল এবং সবার ছোটো দুজনকে স্বচ্ছল স্বজনদের আশ্রয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল কারণ এরা তাদেরকে আমাদের চেয়েও ভালো রাখার ক্ষমতা রাখেন। 

জোয়ি ছিল আমার তিন বছরের ছোটো এবং ছেলে হওয়ায় আমার চোখে অতি নিকৃষ্ট ছিল। প্রতিদিন ভোরে আমাদের মাবাবা সেই ধুলোমাখা পথে ক্লান্ত পা টেনে কাজে বেরোতেন। বাঁকের মুখে পৌঁছে মা চলে যেতেন তাঁর গৃহস্থবাড়ির কাজে আর বাবা প্রতিদিনকার মতো নতুন কাজের সন্ধানে। আমাদের নড়বড়ে বস্তিঘরের ভেতর এবং বাইরের গৎবাঁধা কাজ ক’টি সেরে জোয়ি এবং আমি বস্তির অন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে রোদ মাথায় নিয়ে ইচ্ছেমত ছুটোছুটি করে দিন কাটাতাম। 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমার সেইসব স্মৃতি বড়ই আবছা, সঙ্ঘবদ্ধ নয়, ওরা হঠাৎ একসঙ্গে হুড়মুড়িয়ে ছোটে কিংবা সদ্য জলরঙে আঁকা বৃষ্টিধোয়া ছবির মত একাকার হয়ে লেপ্টে থাকে। মনে আছে একবার রাস্তার মাঝখানে হাঁটুমুড়ে বসে সেই ধুলোর আস্তরে আঙুল চালিয়ে একখানা ছবি এঁকেছিলাম, সেই ছবি জোয়ি মহানন্দে ওর ধুলোমাখা পায়ের এক পোঁচে মুছে দিয়েছিল। আরেকবার খাঁড়ির ঘোলাজলে দুইহাত জোড় করে পোনামাছ ধরার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিলাম আমি এবং ক্ষুব্ধ হয়ে দেখছিলাম মাছেরা কেমন অনায়াসে আমার হাতের বাঁধ গলে পালিয়ে যাচ্ছে, সেইদিনও জোয়ি দম ফাটিয়ে হেসেছিল। সেই বছর আমার শরীর এবং মন জুড়ে চলছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা, এক অচেনা অনুভূতি যা আমাকে ইঙ্গিত দিচ্ছিল পুরোনো এবং অতিচেনা কিছু দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে এবং নতুন ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে যাচ্ছে শিঘ্রই। 

একটা বিশেষ দিন আমার কাছে অদ্ভুত স্বচ্ছতা নিয়ে বারবার ফিরে আসে, এই দিনটিই ব্যাখ্যাতীত কোনো উপায়ে আমার নিষ্পাপ শৈশবের ইতি টেনেছিল। সেই দিন আমাদের বুড়ো ওক গাছের তলায় একা আলসে সময় পার করছিলাম আমি। কিছু একটা নিয়ে দিবাস্বপ্নে বুঁদ হয়েছিলাম, সেটা যে কী এখন আর ঠিকঠাক বলতে পারব না তবে তাতে আমাদের উঠোনের ওধারের ‘হ্যরিস’ ভাইদের কোনো একজনকে নিয়ে গোপন কোনো ভাবনা ছিলনিশ্চিত । জোয়ি এবং ওর বন্ধুরাও ওকের ডাল থেকে ঝোলানো বাতিল টায়ারটা নিয়ে অনেকক্ষণ খেলে হতোদ্যম তখন। 

‘হেই লিজাবেথ’, জোয়ি চেঁচিয়ে ডাকল আমায়। চিৎকার করার সুযোগ পেলে জোয়ি ক্বচিৎ গলা নামিয়ে কথা বলত। 

‘লিজাবেথ, চল কোথাও যাই,’। ওর চিৎকারে অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমাকে আমার সেই একান্ত দুনিয়া ছেড়ে বেরুতেই হ’ল। -‘কোথায় যেতে চাও? কী করতে চাইছ?’ 

সত্যি বলতে কী আমরা সকলেই আমাদের গ্রীষ্মের দিনগুলির লক্ষ্যহীনতায় কেমন যেন হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। বসন্তের ব্যস্ত সময়ে কর্মহীন যে দিনগুলির স্বপ্নে বিভোর থাকতাম আমরা সেই দিনগুলিই ক্রমশ একঘেয়ে হয়ে উঠেছিল আমাদের কাছে, বিশেষত ভরদুপুরের সময়গুলো কিছুতেই যেন নড়তে চাইতো না। 

-‘চল ঢিবির ওদিকটায় বাবলা ফল খুঁজি’, কেউ একজন প্রস্তাব দিল। 

জোয়ি বিরক্তিভরে জানাল, ‘ওখানে কিসসু নেই আর, সবুজ থাকতেই সব পেড়ে ফেলেছি আমরা,’ 

এ নিয়ে অনর্থক তর্ক হ’ল খানিক। এবং ততক্ষণে বাবলা ফল পাড়ার আগ্রহও উবে গিয়েছিল সবার। 

-‘আচ্ছা একটা কাজ করলে কেমন হয়’, শেষতক জোয়িই প্রস্তাব দিল, ওর চোখ জোড়া উত্তেজনায় চকচক করছিল। 

-‘চল মিস লোটির ওখানে যাই’।

সঙ্গে সঙ্গেই সকলে রাজি কারণ মিস লোটিকে খেপানোর চেয়ে মজাদার আর কিছুই হতে পারে না। আমি তখনও ওদের মত শিশুই ছিলাম- ওদের সঙ্গেই দুদ্দাড় ছুটছিলাম। রোগাটে বেড়াগুলো টপকে ঝোপের ভেতর যাওয়ার সময় আমাদের ছেঁড়াখোড়া জামাকাপড় আরও ফাঁসিয়ে মিস লোটির বাড়ির পথে মহা উৎসাহে ছুটছিলাম সকলের সঙ্গে । এখন ভাবি সেদিন আমরা দুখী অথচ মিলনাত্মক সমাপ্তির কোনো চলচিত্রের অংশ বনে গিয়েছিলাম। বিভিন্ন বয়েসী পাঁচ ছ’জন বালক-বালিকা - সকলের পরনে একটিমাত্র পোশাক; মেয়েদের গায়ে অতিদীর্ঘ অথবা অতি খাটো রঙচটা জামা এবং ছেলেদের প্রত্যেকের পরনে তালিমারা প্যান্ট। ওদের উদোম খয়েরী বুক ঘামে ভিজে সুর্যের আলোয় চিকচিক করছিল। আমরা খালি পায়ে বিরান জমি মাড়িয়ে ছুটছিলাম আর আমাদের সরু পায়ের পেছনে ছুটছিল হাল্কা ধুলোর মেঘ। 

মিস লোটির বাড়ি আমাদের দৃষ্টিসীমায় জেগে উঠতেই আমরা থেমে যাই, আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হতে পারে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনার জন্যই আমাদের গতির যতি আসলে কিন্তু তা নয় বরং আমাদের সাহস ফেরানোর জন্যই এই বিরতি। মিস লোটির বাড়িটি আমাদের নিজেদের হতদরিদ্র বাড়িগুলির চেয়েও নিকৃষ্ট। রোদ-বৃষ্টির ঝাপ্টায় বাড়িটির কাঠামোর একদা সাদা রঙ বিষাদময় ধূসরে পালটে গেছে সেই কবে! বাড়ির পাটাতনগুলি পেরেকের জোরে খাড়া নেই বরং কোনো শিশুর হাতে বানানো তাসের ঘরের মতই হেলে যুক্ত হয়ে আছে পরস্পরের সঙ্গে। একটা দমকা হাওয়াতেই এই বাড়ির মুখ থুবড়ে পড়বার কথা অথচ বাড়িটি তার নড়বড়ে কাঠামো নিয়ে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে! এই বাড়ির খাড়া থাকার ঘটনাই যেন বাড়ির হতশ্রীকেই হতবাক করে দিয়েছে। বাড়িটি দীর্ঘদিন এমনই দাঁড়িয়ে ছিল এবং আমার জানা মতে এখনও ঠিক একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে- দাওয়াহীন, ধাপহীন, করাদহীন ধূসর নড়বড়ে সেই স্থাপনা এবং তার এবড়োথেবড়ো উঠোন- যেখানে ঘাস নেই, নেই কোনো আগাছাও – যেন ক্ষয়ে বিলীন হওয়ার জন্যই এই স্মৃতিস্মারক। 

বাড়ির সামনে একটা ক্যাঁচক্যাঁচে দোলনা-চেয়ারে নিত্যদিনের মত দুলছে জন বার্ক, মিস লোটির একমাত্র পুত্র– ক্ষয়ে যাওয়া ছবিটি যেন এইখানে এসে পূর্ণতা পেল। জন বার্ক, যাকে বলে অস্বাভাবিক মেজাজের একজন মানুষ। কুচকুচে কালো এবং গাছপাথরের বয়েস নিয়ে এইখানে একভাবে বসে রাত-দিনকে দোল খাইয়ে পার করে সে। অতি ব্যবহারে ন্যাতানো একটা টুপি ওর আগোছালো মাথাকে রোদ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। জন বার্ক তার একলা দুনিয়ার একক বাসিন্দা। সেই দুনিয়া এমনই আঁট যে বাইরে কী ঘটছে তার কোনো খবরই ঢোকে না তাতে। তবে কেউ যদি ওকে বিরক্ত করে কিংবা ওর সেই নিবিড় রাজ্যে ঢুকে পড়ে তবেই বিপত্তি। বুনো মোষের রাগ নিয়ে জন বার্ক ছুটবে সেই জনের পেছনে কিংবা এমন এক দুর্বোধ্য ভাষায় অনর্গল গাল ছোটাবে যার মানে সে ছাড়া পৃথিবীর আর কারোরই জানা নেই। আমরা বাচ্চারা জন বার্ককে খেপিয়ে তোলার জন্য নিত্যনতুন ফন্দিফিঁকিরের তালাশ করতাম এবং ওর তাড়া খেয়ে দ্রুত পালানোর সেই যে উত্তেজনা, সেটিই ছিল আমাদের সেরা আনন্দ। 

অবশ্য আমাদের আসল আমোদ এবং একইসঙ্গে সত্যিকারের ভীতির উৎস ছিলেন মিস লোটি নিজেই। মিস লোটিকে দেখলে মনে হ’ত কম করে হলেও একশ বছর বয়স ওঁর। কিন্তু এই পড়তি বয়সেও তাঁর দেহের বিশাল কাঠামো দেখে আঁচ করা যায় যে এই ন্যুব্জ এবং শীর্ণ দেহধারিণী এককালে বেশ দীর্ঘাঙ্গী এবং কঠোর ব্যক্তিত্বময়ী ছিলেন। তাঁর গাঢ় লালচে-খয়েরি মসৃণ ত্বক এবং আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের মত মুখের ছাঁচে একধরনের নিঃস্পৃহ ছাপ ছুঁয়ে আছে; যা কেবল আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের মুখেই দেখা যায়। মিস লোটি তাঁর বাড়িতে অনুপ্রবেশকারীদের অপছন্দ করতেন, শিশুদের তো নয়ই। তিনি যেমন নিজে বাড়ির বাইরে বেরুতেন না ঠিক তেমনি কোনো অতিথিও তাঁর বাড়িতে আসতো না। আমাদের কখনও জানার সুযোগ হয়নি কীভাবে মিস লোটি তাঁর নৈমিত্তিক প্রয়োজনগুলির দায় মেটাতেন যা মানুষের সঙ্গ ছাড়া সাধারণত সম্ভব নয় – এই যেমন মিস লোটি কীভাবে খেতেন অথবা আদৌ খাওয়া দাওয়া করতেন কি না। আমরা যখন খুব ছোটো তখন বিশ্বাস করতাম যে মিস লোটি আসলেই ডাইনি এবং তাকে নিয়ে আমরা নানা গল্প ফেঁদেছিলাম যার বেশ-অর্দ্ধেকে তাঁর সম্পৃক্তি নিয়ে আমাদের কোনো দ্বিধাই ছিল না। অবশ্য এরই মধ্যে ডাইনি সংক্রান্ত গল্পগাছায় বিশ্বাস করার মত বোকামির বয়স আমরা সকলেই পেরিয়ে এসেছিলাম। তা সত্ত্বেও পুরোনো ভয় যেন খানিকটা মাকড়শার জালের মত, একবার মজ্জায় ঢুকে গেলে সহজে ছাড়ানো যায় না তাই নড়বড়ে বাড়িটার সামনে এসে আমাদের পাও আটকে গিয়েছিল তখন এবং আমাদের স্নায়ুকে সমর্থ করবার জন্য সেই খানিক বিরতির দরকার ছিল। 

‘ঐ তো উনি!’, আমি ফিসফিস করে বলেছিলাম, ভুলেই গিয়েছিলাম যে অতদূর থেকে মিস লোটির আমাকে শুনতে পাবার কথা নয়। ‘দেখ ফুলগুলি নিয়ে কেমন পাগলের মত মেতে আছে!’ 

‘সত্যি দেখ অবস্থা’। 

মিস লোটির গাঁদা ফুলগুলি আমাদের চোখে তাঁর হাড়জিরজিরে বাড়ির উঠোনে যেন এক বেখাপ্পা সংযোজন। প্রকৃত অর্থেই উঠোনের বাকি অংশের হতদরীদ্র-দশার সঙ্গে এরা একেবারেই যায় না। খয়েরি ধুলোময় উঠোন এবং বিষাদাছন্ন ধূসর বাড়ির সামনে হঠাৎ করেই চোখ ধাঁধানো সোনালি পাতের মত পরস্পরকে নিবিড় আবেগে জড়িয়ে রাখা এই ফুলের সমারোহ, অদ্ভুত উষ্ণতা এবং সূর্যের দীপ্তি নিয়ে চারপাশ মাতিয়ে রেখেছে! এবং কালো ডাইনি-সদৃশ এই বৃদ্ধা সমস্ত গ্রীষ্মকাল জুড়ে, তো বটেই প্রতি গ্রীষ্মেই একইভাবে নিরলস এদের যত্নআত্তি করে চলেছেন । যখনই দেখি তখনই তিনি তাঁর নড়বড়ে হাঁটুমুড়ে হয় এই হলুদ বাগানের আগাছা সাফ করছেন কিংবা নিড়ানি দিচ্ছেন নতুবা নতুন বিন্যাসে এদের সাজাচ্ছেন আর অন্যদিকে ক্ষয়াটে বাড়িটা বিবর্ণ হচ্ছে এবং তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জন বার্ক অবিরাম দুলছে। কোনো এক অজানা মনোবিকারের বলে আমরা ছেলেমেয়ের দল, এই গাঁদার ঝাড়কে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতাম। কদর্য বাড়িটার উঠোনে ওদের উপস্থিতি বিষফোঁড়ার মতো জ্বালাতো আমাদের। যেন এই নান্দনিক ফুলের দল এমন কিছু বলছে যে ভাষা বোঝার সামর্থ্য নেই আমাদের। তাছাড়া এই বৃদ্ধার আগাছা উপড়ানোর তেজোদ্দীপ্ত ভঙ্গিমায় এমন কিছু ছিল যা আমাদের শঙ্কিত করতো। কদমছাট সাদা মাথায় পুরুষের হ্যাট চাপিয়ে এক বৃদ্ধা তাঁর বৃহৎ পশ্চাদ্দেশ বাতাসে ভাসিয়ে ঝুঁকে একমনে আগাছা নিঙড়াচ্ছেন---এই দৃশ্যটি কৌতুককর হওয়ার কথা ছিল অথচ তা না হয়ে এমন এক অস্বস্তিকর অনুভব তৈরি করতো যা আমাদের বোধের অতীত। আমরা কিছু একটা করে তাকে বিরক্ত করবার চেষ্টা করতাম; হয়তো তাঁর সেই ফুলের শোভায় পাথর নিক্ষেপ করতাম কিংবা নোংরা কিছু বলেই আমাদের কাঁচা বয়েসের ফুর্তিতে তাঁর পড়ন্ত বয়সকে ব্যঙ্গ করে শরীরে অদ্ভুত ভঙ্গি তুলে তাঁর নাগালের বাইরে পালাতাম। আসলে মিস লোটি নয় সেই হলুদ রঙা ফুলগুলিই আমরা তছনছ করতে চাইতাম, কিন্তু আমাদের কারুরই সেই সাহস ছিল না। এমনকি জোয়িরও নয় যে কি না নতুন যে কোনো কিছু করতে পিছপা না হওয়ার মতই একরোখা এবং বোকা ছিল। 

‘সবাই ঝটপট পাথর কুড়িয়ে আন,’ জোয়ি আদেশ দিল, অমনি সবাই হাসতে হাসতেই মাটি থেকে নুড়ি কুড়িয়ে জোড়ো করতে লেগে গেল কেবল আমিই দাঁড়িয়ে রইলাম। 

-‘চলে এস লিজাবেথ,’ 

আমি নড়লাম না, ঝোপের ফাঁকে চোখ পেতে দেখতে থাকলাম। আমার এক মন বলছিল এই মজার খেলায় যোগ দাও, আরেক মন সাঁয় দিচ্ছিল না; বলছিল এই সবই অর্থহীন বোকামি। 

-‘তুমি ভয় পেয়েছ লিজাবেথ?’

আমি কষে গাল পাড়লাম এবং মাটিতে এক দলা থুথু ছিটিয়ে নিজের প্রত্যয় প্রকাশ করলাম; এই ভঙ্গি আমার বিশেষ প্রিয়। 

-‘তোমরা পাথর কুড়িয়ে আন। আমিই তোমাদের শেখাব কীভাবে পাথর ছুড়তে হয়’, এগোতে এগোতে বললাম। 

আগেই বলেছি আমাদের চারপাশের যে অদৃশ্য খাঁচায় আমরা বন্দি তার গরাদের পুরুত্ব আমাদের জানা ছিল না। এখন অবশ্য মনে হয়, আমরা কী এবং আমাদের অন্য কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কতটা ক্ষীণ এইসব নিয়ে হয়তো আমাদের একধরনের আবছা ধারণা ছিলই। নইলে আমরাই বা কেন সারাদিনমান কেবল ধ্বংসের খেলায় মেতে থাকতাম? যাই হোক দ্রুত পাথর সংগ্রহ শেষে সকলে নির্দেশের অপেক্ষায় আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। 

‘এস আমার সঙ্গে,’- আমরা হামাগুঁড়ি দিয়ে মিস লোটির বাড়ির সামনের সরু রাস্তা ধরে সীমানা টানা ঝোপটির দিকে এগোলাম। তিনি তখনও হাঁটু মুড়ে নিবিষ্টমনে ফুলের পরিচর্যায় ব্যস্ত। তাঁর কালো হাত সেই সোনালি সমাহারের ভেতরে গোঁজা। হঠাৎ ঝিং আওয়াজ তুলে নিখুঁত নিশানায় ছোঁড়া পাথরের টুকরোটি একটা ফুলের মাথা ছেঁটে দিল। 

‘কে ওখানে’? মিস লোটির পেছন দিকটা ক্রমশ নিচু হতে থাকল এবং তাঁর নোয়ানো মাথা সিধে হ’ল এবং তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে ঝোঁপের দিকটা জরিপ করতে লাগলেন, ‘ভালো চাইলে শিগগীর বেরিয়ে এসো’। আমরা সবাই মাথা নিচু করে তাঁর দৃষ্টির আড়ালে রইলাম এবং প্রাণপনে আমাদের উপচে ওঠা হাসিকে থামানোর চেষ্টা চালাচ্ছিলাম। মিস লোটি আরও কিছুক্ষণ সতর্ক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলেন রাস্তার দিকে তারপর সন্তর্পণে আগাছা সাফাইয়ের কাজে ফের মন দিলেন। ঝিং! জয়ির অব্যর্থ দ্বিতীয় নিশানা ছুটল ফুল তাক করে এবং নিমেষে আরও একটি গাঁদা ফুলের মাথা কাটা পড়লো । 

মিস লোটি এবার খেপে গেলেন। তাঁর দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছিল, সেই সরু লাঠির উপর ভর দিয়ে চেঁচাতে লাগলেন, ‘বদমায়েশের দল, দূর হ’। ততক্ষণে বাকি সকলে এলোপাথাড়ি পাথর ছুঁড়তে শুরু করে দিয়েছিল, ফুলের ঝাড়ে রীতিমত ঝড় তুলে ওরা মিস লোটির নির্বিষ রাগকে তাচ্ছিল্যের হাসিতে উড়িয়ে দিচ্ছিল। মিস লোটি তাঁর লাঠি ঘুরিয়ে কাঁপতে কাঁপতে রাস্তার দিকেই চেঁচাতে চেঁচাতে এগোচ্ছিলেন ‘দূর হ বদমায়েশের দল। জন বার্ক! জন বার্ক! নেমে এস’। 

আমার মধ্যে কী যেন একটা ঘটে গেল!মিস লোটিকে অমন রাগিয়ে দেওয়ার ক্ষমতায় আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম হয়তোবা। সেই পাথরের বৃষ্টির মধ্যেই ঝোপ ছেড়ে তীব্রবেগে ছুটে বেরিয়ে সোজা মিস লোটির মুখোমুখি দাঁড়ালাম। এরপর সুর তুলে ছড়া কেটে নাচতে লাগলাম- 

ডাইনি বুড়ি পা হড়কে 
গর্তে পড়েছে
গর্তে কানা পয়সা ছিল 
কুড়িয়ে পেয়েছে 
ডাইনি ধনী বনেছে 
নিজেকে বাদশাহ ভেবেছে। 

ছেলেমেয়েরা উল্লাসে আমার সঙ্গে গলা মেলালো। হাতের নুড়ি ফেলে আমার এই উদ্দাম নৃত্যে সকলে যোগ দিল। চাক ভাঙা মৌমাছির মত মিস লোটিকে ঘিরে সবাই নাচতে লাগলো সুর কেটে ‘ডাইনি বুড়ি— ডাইনি বুড়ি’, মিস লোটিও অবিরাম গালির তুবড়ি ছোটাচ্ছিলেন। আমাদের এই পাগলপনা কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই থেমে গিয়েছিল কারণ জন বার্কের পৃথিবীতে আমাদের চেঁচামেচি কড়া নেড়েছিল। জন বার্ক লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠতেই আমরা ঝোপের দিকে ছুট লাগিয়েছিলাম, ঠিক তখনই মিস লোটির হাতের লাঠিও আমার মাথা বরাবর সাঁই সাঁই করে ধাওয়া করছিল। 

উত্তেজনাময় এই ঘটনার পরে সবাই ফের আমাদের ন্যাড়া উঠোনের ওক গাছটার নিচে ফুর্তিতে মেতেছিল, আমি আর ওদের দলে ভিড়ি নি। হঠাৎ করে প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভুগছিলাম এবং আমি নিজেকে অপরাধী ভাবাটা আমার বিশেষ অপছন্দের ছিল। আমার ভেতরের সেই শিশু বলছিল, ‘এটা স্রেফ মজাই’, কিন্তু নারী আমিটিও ভ্রূকুটি করছিল এমন ধ্বংসাত্মক ঘটনা আমার নেতৃত্বে হ’ল বলে! এই দ্বিধার টানাপোড়েন সেইদিন সারা দুপুর আমাকে ভাবিয়েছে। সন্ধ্যায় যখন শিম আর ভাত দিয়ে রাতের খাবার সারছিলাম তখন বাবার মৌনতা আমার নজরে আসেনি অবশ্য ইদানিং বাবা চুপচাপই থাকতেন ঠিক একইভাবে মায়ের অনুপস্থিতিও ভাবায়নি আমাকে কেননা মাও সন্ধ্যা পার করেই বাড়ি ফিরছিলেন আজকাল। খাওয়া শেষে জোয়ির সঙ্গে বেশ বাজে রকমের ঝগড়া হয়েছিল আমার, ওর অতি উচ্ছ্বাস আমার কাছে অসহ্য লাগছিল। অবশেষে তক্তপোষে শরীর টানা দিতেই ঝিমুনি এসে গিয়েছিল । 

এরপর রাতের মাঝখানে হঠাৎ আমার ঘুম চটে গিয়েছিল। মা ফিরেছেন। ওদের চাপা কথাবার্তা আমাদের দুই ঘরের মাঝখানের পলকা বেড়া টপকে কানে এসে পৌঁছাচ্ছিল। শুরুতে কোন কথা নয় আমি কেবল ওদের আবছা আওয়াজই শুনছিলাম। মায়ের গলার স্বর যেন গ্রীষ্মের অন্ধকার শীতল ঘরের মত শান্ত, নিবিড়,প্রাণ জুড়ান। এই আওয়াজ আমার বড় প্রিয়, মনে আস্থা আনে; বিশ্বাস করতে উদ্বুদ্ধ করে যে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাবার গলার স্বর সেই শান্তির আবরণ খান খান করে ভেঙে দিয়েছিল। 

-‘বাইশ বছর মেবেল, বা-ই-শ বছর’, বাবা আর্তনাদ করছিলেন, ‘এবং আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারিনি, কিছুই না’। 

-‘সব ঠিক হয়ে যাবে সোনা, নিশ্চয় কিছু একটা জোগাড় হয়ে যাবে। চারদিকে ছাটাই চলছে, তুমি জানো, সকলেরই একই দুরবস্থা’। 

-‘কিছুই ঠিক নেই। কোনো পুরুষই বছরের পর বছর স্ত্রীর রোজগার খেতে চায় না এবং বাচ্চাদের বখে যাওয়া চুপচাপ দেখতেও চায় না’। 

‘সোনা! তুমি আমাদের দেখভাল করেছ যখন তোমার সামর্থ্য ছিল। এখন সবারই হাত খালি’।

-‘আমি সবার কথা বলছি না। আমি আমার কথা বলছি। ঈশ্বর জানেন আমি চেষ্টা করি’। 

মা কিছু একটা বললেন আমি শুনতে পাইনি। উত্তরে বাবা জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আমাকে ব’ল একজন পুরুষের কী করা উচিত?’

-‘দেখ আমরা কিন্তু না খেয়ে নেই। সপ্তাহ শেষে আমি টাকা পাচ্ছি। আর মিসেস ইলিস দরাজদিল কত কিছু দেন আমাকে! এই শীতে তোমার জন্য মিঃ ইলিসের কোট দেবেন বলেছেন---’

-‘গুল্লি মারি মিঃ ইলিসকে । গুল্লি মারি ওর পয়সাকে। তুমি ভাবছ আমি সাদাদের দয়ার দান চাইছি? ছিঃ মেবেল!’

এবং এর পরই তিনি ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন; রাতের বুক চিরে তার হতাশা, বেদনা যেন কান্নায় প্রাণ পাচ্ছিল। আমি কখনও পুরুষ মানুষকে কাঁদতে শুনিনি। পুরুষ মানুষ কাঁদতে পারে এই ধারণাই আমার ছিল না। আমি দুই হাতে প্রাণপণে কান চেপে রেখেছিলাম তাও বাবার সেই বুক ফাঁটা, কর্কশ, নিরাশায় ডুবে যাওয়া কান্নার আওয়াজ ঠিক ঢুকে যাচ্ছিল ভেতরে। আমার বাবা একজন শক্তপোক্ত মানুষ যে কি না এক লহমায় যে কোন বাচ্চাকে কাঁধে তুলে নিতে পারে এবং অনায়াসে সেই বাচ্চা কাঁধে ঘরময় গান গাইতে গাইতে চলাচল করতে পারে। বাবা আমাদের কাঠের টুকরো চেঁছে পুতুল বানিয়ে দিত এবং এমন প্রাণ খুলে হাসতো যে মনে হ’ত যেন বুড়ো ওক গাছটাও হাসছে বাবার সঙ্গে। বাবা আমাদের মাছ ধরতে শিখিয়েছিল, শিখিয়েছিল কীভাবে খরগোশ শিকার করতে হয়। সেই বাবা কাঁদতে কি পারেন? কিন্তু তিনি কেঁদেই চলেছিলেন। অন্তহীন সে কান্না অবশেষে একসময় বন্ধ হয়েছিল এবং ফের মায়ের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল, সেই নিবিড় এবং ভরাট গলায় মা গুনগুন করে গাইছিলেন যেমন করে তিনি তাঁর ভয়ার্ত শিশুদের শান্ত করতেন। 

সেই মুহূর্তেই আমার চেনা পৃথিবীর সীমানা মুছে গিয়েছিল। আমার ছোটোখাটো নরম মা হয়ে গেলেন আমাদের পরিবারের স্তম্ভ আর বাবা যিনি ছিলেন এই পরিবারের ভিত্তিপ্রস্তর তিনি হয়ে গেলেন এক অক্ষম শিশু, কান্নাই যার আশ্রয়। সবকিছু হঠাৎ করেই ভাঙা এ্যাকর্ডিয়ানের মতো বেসুরো বাজছিল। এই গোলমেলে ছবির কোনখানে আমি? এতকাল পরে সেই সময়ের চিন্তা মনে পড়ছে না তবে ভয় মেশানো সেই বিমুঢ় অনুভূতি স্মৃতিতে আজও ম্লান হয়নি। 

বাবার কান্না থেমে যাওয়ার দীর্ঘক্ষণ পরেও আমি তক্তপোষে দুই হাত কানে চেপে পাথরের মত শক্ত হয়ে শুয়ে ছিলাম, মনে মনে আমিও চাইছিলাম কাঁদতে, চাইছিলাম আমাকেও কেউ এমন আদর করে সান্ত্বনা দিক। রাত নিঝুম, কেবল ঝিঁঝিঁদের ডাক আর জোয়ির মৃদু নিঃশ্বাসের আওয়াজ ছাড়া চারপাশ সুনসান। কিন্তু সারা ঘর জুড়ে চাপচাপ ভয় আমাকে ঘিরে ধরেছিল, ঘুমাতে দিচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত ভোর চারটার দিকে সেই ভয়াবহ একাকিত্বকে তাড়াতে আমি জোয়িকেই জাগাবার সিদ্ধান্ত নিই। 

ওকে জাগানোর চেষ্টায় চড় চিমটি দিয়ে যাচ্ছিলাম। বিরক্ত জোয়ি জিজ্ঞেস করল, ‘কী চাও তুমি? কী হয়েছে?’

-‘ঝটপট ওঠো’ 

-‘কেন? যাও এখান থেকে!’ 

যুক্তিযুক্ত কোনো ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ওকে তো আর বলা যায় না যে, ‘ওঠো আমার একা একা ভয় করছে’। তাই আমি খুব সহজ করে বললাম, ‘আমি বাইরে যাচ্ছি, ইচ্ছে হলে আসতে পার’। 

অভিযানের হাতছানি সত্যিই জোয়ির ঘুম ছুটিয়ে দিল। 

-‘এখন বাইরে যাচ্ছ? কোথায় এলিজাবেথ? কী করবে?’ 

আমি মাথার উপর দিয়ে জামা গলাচ্ছিলাম। তখনও পর্যন্ত কোথায় যাব আমি ঠিক করিনি। সংক্ষেপে বললাম, ‘কথা না বলে এস আমার সঙ্গে,’ 

আমি জানালা গলে বাইরে এসে রাস্তার প্রায় মাঝ বরাবর পৌঁছুতেই জোয়ি আমাকে ধরে ফেলল। 

-‘দাঁড়াও এলিজাবেথ। কোথায় যাচ্ছ?’ 

আমি ছুটছিলাম যেন ভয়েরা আমাকে তাড়া করছে অথবা তারা আমার সঙ্গেই জোড় কদমে নিঃশব্দে ছুটছিল যতক্ষণ না আমার অজানা সেই গন্তব্য নজরে আসে। অথচ এই গন্তব্য আমার অজান্তেই জানা ছিল -- মিস লোটির উঠোন। 

ভোরের আবছা আলো নিকষ কালো রাত্রির চেয়েও ভয়ঙ্কর। এবং সেই আবছা আলোয় পুরোনো বাড়িটা আমার ভাঙাচোরা জীবনের মতই নষ্ট এবং গুড়িয়ে যাওয়া বিশাল এক কৌতুক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাড়িটাকে দেখেও অভিশপ্ত মনে হচ্ছিল তবুও আমার ভয় লাগছিল না কেননা আমার নিজের জীবনও এই বাড়ির মতই অভিশপ্ত। 

-‘লিজাবেথ তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?’ জোয়ি হাঁপাতে হাঁপাতে বললো। 

আমি আসলেই পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। সেবারের গ্রীষ্মে আমার নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ছাইচাপা আগুনের মত সমস্ত অনুভূতি হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসছিল যেন – আমি তীব্রভাবে আমার মা’কে চাইছিলাম কিন্তু মা ছিল না কখনই। আমাদের দুর্দশা এবং নিরাশা; আমার না-নারী, না-শিশু এই দুই স্বত্ত্বার বিহ্বলতা, বাবার সেই বেদনা-বিধুর কান্নার আওয়াজ সব মিলেমিশে আমার সেই চেপে রাখা আবেগের বাঁধন কেটে দিয়েছিল। সবকিছু তছনছ করে দেওয়ার অদ্ভুত এক স্বতঃস্ফুর্ত প্রণোদনা তাড়িত করছিল আমাকে। 

-‘লিজাবেথ’! 

আমি পাগলের মত সেই হলুদ গাঁদার বাগান ঝাঁপিয়ে পড়লাম। নির্দয়ভাবে নিটোল সেই ফুলের শোভাকে মাড়িয়ে, উপড়াতে লাগলাম। ভোরের নিজস্ব তাজা গন্ধ এবং গাঁদা ফুলের শিশিভেঁজা বুনো গন্ধ সব মিলিয়ে আমাকে পাগল করে দিয়েছিল। আমি গাঁদার পাপড়ি, পাতা কুটিকুটি করে ছিঁড়ছিলাম আর কাঁদছিলাম। জোয়ি আমাকে কিংবা আমার জামাকে শক্ত করে জড়িয়ে অনুনয় করছিল, ‘লিজাবেথ থাম। দয়া করে থাম লিজাবেথ’। 

অতঃপর আমি সেই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝখানে বসে পড়েছিলাম। আমার চোখের জল থামছিল না কারণ যে ক্ষতি আমি করেছি তাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সময় পেরিয়ে গেছে। ভয়ার্ত জোয়ি আমার পাশে চুপ করে বসেছিল, বুঝতে পারছিল না ঠিক কী বলা উচিত। তারপরেই - ‘লিজাবেথ দেখ!’ 

আমার ফোলা দুই চোখ তুলতেই চোখের সামনে কড়া পড়া এক জোড়া পায়ের পাতা দেখলাম প্রথমে। এরপর আমার দৃষ্টি ক্রমশ পায়ের পাতা ছাড়িয়ে এক জোড়া গোদা পা বেয়ে আঁটসাঁট সুতির পোশাকে ঢাকা ন্যুব্জ শরীরটি পেরিয়ে পাকা চুলের ছায়া ঘেরা আদিবাসি সেই মুখের উপর স্থির হ’ল। সেই মুখে কোনো রাগ ছিল না, বাগানটা আর নেই তাই তাকে রক্ষা করারও কোনো দায়ও যেন নেই আর। 

‘ম-মিস লোটি!’ আমি হামাগুড়ি দিয়ে সিধে হলাম এবং চুপচাপ তাঁকে দেখতে লাগলাম এবং সেই মুহূর্তে আমি আবিষ্কার করলাম আমার মেয়েবেলা আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে এবং আমার নারীজীবন পাপড়ি মেলছে। সেই সর্বনাশা পাগলপনাই ছিল আমার শেষ শিশুতোষ আচরণ। কারণ আমি সেই দুখী বিষণ্ণ অবিচল মুখের দিকে তাকিয়ে ঠিক তখনই আবিষ্কার করেছিলাম এক বাস্তব সত্য যা ছেলেবেলার সরল চোখের দৃষ্টিতে ধরা দেয়নি। আমি দেখছিলাম, আমাদের ডাইনি বুড়ি আসলে কোনো ডাইনি বুড়ি নয়, জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া এক বৃদ্ধা, যিনি অসুন্দর এবং নিষ্ফলা এই জমির উপর সুন্দরের নির্মাণের দুঃসাহস করেছিলেন। এই অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে তাঁর জন্ম এবং এই অসুন্দরের মধ্যেই তিনি জীবন কাটিয়েছেন। জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে তাঁর কাছে সম্পদ বলতে এই হেলে পড়া কুড়েঘর, নিজের বিধ্বস্ত দেহ এবং জন বার্ক নামের ভালোবাসার এক নির্বোধ ফসল। জীবন তাঁর কাছ থেকে সবটুকু নিঙড়ে নেওয়ার পরেও যেটুকু বাকি রেখেছিল সেই নির্যাসের সবটুকুই ঢেলে দিয়ে সাজিয়েছিলেন হলুদ গাঁদার সেই মনোরম সমারোহ। 

আমি অবশ্য মিস লোটির সম্পর্কে আমার এই নতুন আবিষ্কারের কোনো কিছুই প্রকাশ করিনি বরং সমস্ত অপমান এবং লজ্জাকে সাথী করে স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে ছিলাম। সময় ক্রমশ এই অব্যক্ত দৃশ্যকে ভাষা দিয়েছে এবং এখন পেছন ফিরে তাকালেই বুঝতে পারি সেই মুহূর্তটিই ছিল আমার নিষ্পাপ ছেলেবেলার সমাপ্তি। নিষ্পাপ সময়ের অবসান বললেই লোকে ভাবে কুমারিত্বের অবসান, আসলে এটি তার চেয়েও বেশি কিছু। অপাপবিদ্ধ অবস্থার সত্যিকার মানে হ’ল যা দেখা যায় তাকে বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়া এবং এই দেখার বাইরে যেটুকু অদেখা তার গভীরতা মাপতে না জানা। সেদিনের সেই বিশেষ মুহূর্তে আমি নিজেকে ছাড়িয়ে দেখতে পেয়েছিলাম এবং দেখেছিলাম আরও একজনের গভীরেও। আমার সহানুভুতি বোধের শুরু ঠিক সেই ক্ষণ থেকেই; সহানুভূতি এবং সরলতা কখনই একই দেহে বাস করে না। 

ফেলে আসা সেই শৈশব থেকে আমি এখন লক্ষযোজন দূরে, ধুলোময় অপরিচ্ছণ্ন জীবনের সেই এক টুকরো উজ্জ্বল ছবি ঈশ্বরই জানেন কার প্রতি অন্ধ রাগে আমি তছনছ করেছিলাম! 

মিস লোটি অনেককাল আগেই গত হয়েছেন এবং তাঁর সেই নড়বড়ে কুড়েঘরও বিস্মৃতির অতলে এখন। তবে আমার সেদিনের অনুতাপ সত্ত্বেও তিনি তাঁর উঠোনে আর কখনই গাঁদা ফুলের চারা লাগাননি। তারপরেও এমন সব ক্ষণ আসে যখন স্মৃতির অতল থেকে তীব্র বেদনার সুর নিয়ে সেই হলুদের সমারোহ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আসলে আমাদের নিজেদের জীবনও যে সেই ধুলোময় শহরের উঠোনের মতই বিরান তা বুঝতে হলে কাউকে দরিদ্র কিংবা নির্বোধ হতে হয় না, জীবনই তা বুঝিয়ে দেয়। 

এবং মিস লোটির মতই আজকের এই আমারও একটা একান্ত হলুদ-গাঁদার বাগান আছে।




রঞ্জনা ব্যানার্জীর গল্প পরুন



অনুবাদক পরিচিতি
রঞ্জনা ব্যানার্জী 
গল্পকার। অনুবাদক।
বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জন্ম। 
এখন কানাডায় থাকেন।

২টি মন্তব্য: