শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

ওলগা তোকারচুক'এর গল্প : শেষ গল্পগুলো থেকে

ভাষান্তর : কুলদা রায় 

ইউক্রেনিয়ান পেরেস্কেভিয়ার পোলিশ স্বামী পেত্রো তাদের বাড়ির বাইরে পড়ে মরেছিল। আর তখন সে তাদের দুজনের যৌথ জীবন নিয়ে ভাবছিল। সোভিয়েত বাহিনী সে সময়ে পোলিশ- উইক্রেইন সীমান্ত দখল করেছিল। সেই যুদ্ধের স্মৃতি এই খণ্ড লেখায় আছে। সে আর পেত্রো সেখানে বাস করত। অনেক পোলিশ লোকজনকে সাইবেরিয়ায় তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। 
………… ...................................................................

প্রতি সাত বছর অন্তর আবার তোমার বিয়ের অনুষ্ঠানটি করা উচিত। মারিয়াঙ্কা মাসি একথা প্রায়ই বলতেন--প্রতি সাত বছর পর পর তুমি ভিন্ন মানুষ হয়ে যাও। তাই তোমার বিয়ের চুক্তি, শপথ, ঋণচুক্তি, নথিভুক্ত তথ্য আর ব্যক্তি পরিচয় চিহ্ন--এ-সবই নবায়ণ করা উচিত। নবায়নের আওয়তায় আনা উচিত সব ধরনের কাগজপত্র।

আমি এর মধ্যে এগারোতে পড়েছি। আর পেত্রো তেরোতে। 

আমার স্বপ্নে পেত্রো দ্বিগুণ--তিনগুণ হয়। আবার এক সময় তরুণ হয়ে ওঠে--পরের মুহূর্তেই হয়ে ওঠে বুড়ো। এক সময় আমাকে গালিগালাজ করে তো অন্য সময়ে আমাকে আদর সোহাগে জড়িয়ে ধরে। আজকের স্বপ্নে দেখি, সে চীনা ময়লা কাপে চা খাচ্ছে। চা থেকে গরম বাষ্প উড়ছে। তার চোখের ভ্রুতে ফোঁটায় ফোঁটায় বাষ্প জমছে। তারপরে সেগুলো জমে বরফ হচ্ছে। কানের দুলের মতো ঝুলছে। সেজন্য সে তার চোখ খুলতে পারছে না। ওগুলো তুলে ফেলে দেওয়ার জন্য একজন অন্ধ মানুষের মতো আমার কাছে অনুনয় বিনয় করছে। আশাহীনভাবে আমি ওগুলো তুলে ফেলার মতো কিছু একটা রান্নাঘরে খুঁজি। ‘বরফ তোলা যন্ত্র’ বা এ ধরনের কিছু একটা-- সে বলে। একটা ড্রয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে। তার মানে হলো, চোখের ভ্রু থেকে বরফ তুলে ফেলার মতো একটা যন্ত্র সেখানে আছে--বলতে চায়। যেকোনো কিছুর জন্য সে প্রস্তুত আছে। 

পেত্রো আর আমার মধ্যে আরেকটা পার্থক্য আছে। সেটা মনে মনে অনুভব করে সুখ পাই। শুরুর দিকে  সাধারণত সবাই   অমিলের চেয়ে মিলটাকে বেশি দেখে। সারাদিন ধরে সব ধরনের প্রশ্ন করে করে আবিস্কার করে, ‘আমিও’ শব্দটি। ‘এটা ঠিক আমারই মতো।’ কিন্তু অবশেষে হয়ে ওঠে অমিল। মিলগুলো ছিল আসলে নির্মল প্রতারণা। 

কী করে মজা করা যায় সেটা পেত্রো জানত না। হয়তো এজন্যেই তাকে আমার এতো বুড়ো বুড়ো লাগত। প্রথম দেখা হয়েছিল যেদিন তার সঙ্গে সেদিন পর্যন্ত ৩৫ বছরই হয়নি তার। এমন কি নিজের বিয়ের আসরে নাচতে হয় বলে সে নেচেছিল। এটা তাকে করতে হবে-- বোঝানো হয়েছিল বলেই সে নেচেছিল—আনন্দ পেতে হয় বলেই আনন্দ পেয়েছিল। কিন্তু সেটা ছিল যান্ত্রিক। সে যা করেছিল-- তাই সে করেছে। এর বাইরে অন্য কিছু করেনি। যখন সে বেড়ায় রঙ করে তখন সে বেড়ায়ই রঙ করে। যখন সে পরীক্ষা দেয়--তখন সে পরীক্ষাই দেয়। যখন সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তখন সে একেবারেই চলৎশক্তিশীন হয়ে যায়। এ ব্যাপারে কেউ সন্দেহ করতে পারে না। যখন সে নীরব থাকে তখন সে যেন বোবা মানুষ হয়ে ওঠে। সারাক্ষণ এক জায়গায় পড়ে থাকাটা বেশ কৌতুককর। যেন সে সারাক্ষণই ঘরছাড়া কুকুরের মতো আমার গায়ের সঙ্গে ঘুর ঘুর করে, আমার বিছানা থেকে এক চুল নড়ে না। এবং বাইরে মোটেও তাকায় না। 

আমি ঠিক বিপরীত। নির্দিষ্ট কোনো কিছুতে আমি আটকে থাকতে পারি না। কেউ আমাকে থামাতে পারে না। সব সময়ই আমি মজা করি। ময়লা আবর্জনা ঝাড়ু দেওয়ার সময়টাকে আমি খেলা হিসেবে নেই। আলুর খোসা ছাড়ানোটাও আমার কাছে একটা খেলা। এসব কিছুই আমার কাছে খেলা খেলা সারা বেলা। পেত্রো যে চত্বরে মরে পড়ে আছে, অপেক্ষা করছে ভালো সময়ের জন্য, আমি সেখানে একটি খেলা খেলছি। কোনো কিছুই গুরুত্বে সঙ্গে আমি নেই না। এখন আমি চিঠিগুলোকে পা দিয়ে বরফের নিচে চাপা দিচ্ছি। 

মারিয়াঙ্কা মাসি বলে থাকতেন, প্রতিদিন সূর্য ডোবার পরে সারা দুনিয়াই তিন মিনিটের জন্য আকাশী নীল হয়ে যায়। এই আকাশী নীল রঙের দুনিয়া যদি তোমার চোখে পড়ে, তবে দেরী না করে সে সময়ে যদি তুমি কিছু কামনা করো, তবে তা পুর্ণ হয়। আমি এখন ঠিক এই জানালা দিয়ে আকাশের নীল হয়ে যাওয়াটা দেখতে পারি। আর আমার কোনো কামনা নেই। বেশ নির্ভার লাগে আমার। 

প্রথমে রুশীরা এলো রাতের বেলা। তাদের এক ঘেয়ে ট্রাকের শব্দে নিজেদেরকে আড়াল করেছিল। পেত্রো কানের কাছে রেডিওটা চেপে ধরে কাঁদছিল। 

প্রথম কয়েককদিন ছিল ফিসফাস আলাপে ভরা। লোকজন ফিসফাস ছাড়া কিছুই করছিল না। যেমন করে চিমনি থেকে ধোঁয়া বের হয়, গম ক্ষেতের উপর নিচু হয়ে জমে থাকে সেই ধোঁয়া, ঠিক সে রকমই গ্রামদেশ থেকে ফিসফাস জেগে উঠল। তারপর সব কিছু থেমে গেল। 

রুশীরা শুরুতেই রেডিওগুলো কেড়ে নিয়েছে। তখন ঘরে বসে থেকে অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য কিছু করার উপায় থাকে না কারো। তারা তালিকা বানাতে শুরু করে। তারা মালসামানের নাম লেখে-- লিখে সেগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। দিনের বেলার সৈন্যদের গাড়ি চারদিক চক্কর দেয়। হলুদ ধূলা ওড়ায় গাড়িগুলো। এগুলো সেপ্টেম্বর মাসের ধূলা। 

পেত্রো তার চাকরি হারালো। রাতে স্কুল ঘর থেকে সৈন্যদের হল্লাগল্লা শোনা যেতে লাগল। স্কুলগুলো দখল করে ওরা থাকছে। দেয়ালে গুলি ছুড়তে থাকে তারা। গুলি করতে থাকে দেয়ালে ঝোলানো নিউটন ও কপার্নিকাসের ছবিতে। 

এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে-- তারা পোলিশদের তাড়িয়ে দেবে। মাইরন মূর্তির কাছ থেকে সেটা দেখতে পেয়েছি। কিন্তু সে (পেত্রো) অন্য কিছুর মধ্যে দিয়ে আসলে  বলতে চেয়েছে— 

'ঠিক শাস্তিই পেয়েছ। তুমি বিয়ে করেছ একজন বুড়ো লোককে। এখন তার সঙ্গে মেরু ভল্লুকের দলে যোগ দিতে চলেছ।' অথবা একথাটা মারিয়াঙ্কা মাসিই বলেছিলেন। মাসিই খবর এনেছিলেন। মাসি সে সময় বলেছিলেন, ' কিছু একটা কর। তুই যদি এখান থেকে নিজে নিজে সরে না যাস তবে দুজনকেই ভুগতে হবে।  ধরা যাক, পেত্রো যখন চলে যাবে, তখন দেয়াল থেকে মূর্তি সরিয়ে নেবো। সেখান সংবাদপত্র থেকে স্টালিনের ছবি কেটে সেটে দেবো।' 

এরপর তারা একটি রুশী দম্পতিকে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিল। তারা দুজনেই ডাক্তার। সেদিন থেকে রান্নাঘর ভাগেযোগে ব্যবহার করতে হলো। পেত্রোর জন্য এটা ছিল অসহনীয়। সে আমাদের বিছানার এক প্রান্তে বসে বসে দিন কাটাতে লাগল। ওরা দুজন রান্নাঘর ছেড়ে গেলেই সে বিছানা থেকে উঠে আসত। তাদেরকে দেখতে চাইত না। আসলে কিন্তু তারা ভালো মানুষ ছিল। আমরা পরস্পরকে খুব ভালোভাবে বোঝাতে পারতাম না। তবে যোগাযোগ রক্ষা করতে আর কতো শব্দ লাগে? মেয়েটি ছোটোখাটো ও সুন্দর। তার মুখটি ছিল বড়ো। ছোটো বেজির মতো আর ছিল মুখ জোড়া ঠোঁট। একদিন পোষাক নিয়ে আমরা গল্পগুজব করছিলাম। বুঝতে চেষ্টা করছিলাম আমাদের পরস্পরের স্ক্যার্টের কারুকাজ। ছুঁয়ে দেখছিলাম ব্লাউজের কাঁধের প্যাড। তখন আবিষ্কার করলাম, লিউবা নামের এই ডাক্তার মেয়েটি নিম্নাঙ্গে কোনো অন্তর্বাস বা প্যান্টি পরেনি। যুদ্ধের সময় তারা অনেক অনেক বন্দুক আর দূর পাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র তৈরি করেছে বটে-- তৈরি করেনি কোনো প্যান্টি। যখন আমরা আমাদের পোষাক বদল করি, একে অন্যের পোষাক পরে দেখি, তখন তার নগ্ন নিতম্ব আর অবাক করার মতো সুস্পষ্ট লোমশ ছোটো স্ত্রী অঙ্গও এক ঝালক চোখে পড়েছিল। দেখে খারাপ লেগেছিল। 

প্যান্টি। তারা যতক্ষণ প্যান্টিকে প্রয়োজনীয় মনে করেনি ততক্ষণ তারা এটাকে গুরুত্ব দেয়নি। তারপরও আমরা প্যান্টিগুলোকেই ধন্যবাদ দেই –এরা আমাদেরকে খারাপ সময়ে উদ্ধারের উপায় করেছিল। পেত্রোর বাবা মা আমাকে একটি সেলাই কল উপহার দিয়েছিল। তা দিয়ে আমি অফিসারদের স্ত্রীদের জন্য প্যান্টি বানানো শুরু করলাম। কাগজের নকশা দেখে দেখে কিছু প্যান্টি কাটলাম। প্রতিদিন ডজন ডজন জোড়া প্যান্টি বানাতে থাকলাম। এগুলোর কোনোটি ফুলেল ক্যালিকো কাপড়ের। কোনোটি মসৃণ তেলতেলে। আবার কিছু সাদা কাপড়ের। লিউবার স্বামী ফিউদোর ইভানোভিচ সাদা কাগজে মুড়ে নিয়ে গেল সেগুলো। আমাদের জন্য নিয়ে এলো টাকা। নিয়ে এলো মদ আর চা। নিজের জন্য আর পরিবারের জন্য এটাই ছিল আমার প্রথম রোজগার। আমরা কায়দা করে তার কাছে গেলাম। এই আমিই তাকে আইসক্রিম খাওয়ার নেমতন্ন দিলাম। তিনি সহজেই আমাদের সঙ্গে  মিশলেন। তখনো দোকানগুলো শূন্য হয়নি। তাই আমার জন্য কয়েক জোড়া সুন্দর দেখতে বসন্তের জুতো কিনলাম। আর কিনলাম এক বোতল সুগন্ধি। সুগন্ধি শেষ হয়ে গেলেও বোতলটি এখনো আমার কাছে আছে। এর মানে হলো বোতলটি আমার সঙ্গে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী ঘুরেছে। ড্রেসিং টেবিলে  আরো কিছু জিনিস ছিল। সেগুলো পথে পথে হারিয়ে গেছে। কালো ইবোনাইট রঙের বোতলটি আকারে ছোটো আর পুরু। ইবোনাইট রঙের ছিপি আটা আছে। এই বোতলটি টিকে আছে। আর কিছু টেকেনি।

এই প্যান্টিগুলো আমাদের অনুভূতিগুলোকে নির্জীব করে দিয়েছিল। আমি ভেবে বসেছিলাম এই প্যান্টিগুলোই সব কিছুর চাবিকাঠি। মনে করেছিলাম প্যান্টির ব্যবসাটি চলতে থাকবে-- চলতেই থাকবে। এটাই আমাদেরকে দূর্ভোগ থেকে বাঁচাবে। তখন গুজব রটেছিল পরিবারগুলো উধাও হয়ে যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছিল খুব ভোরে ট্রাক এসে তাদেরকে পূবদিকে নিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের কিছু আমাদের গ্রামে তখনো ঘটেনি। কারণ সৈন্যরা স্কুলে ঘাটি গেড়েছিল। সেটা ছিল বেড়ার অন্যদিকে। কিন্তু এটা বোধ হয় সত্যি—গাছ-গাছালির জন্য অন্যেরা বন দেখতে পায়না। প্রথমত আমি বেড়া বরাবর শয়তানের ঘাটির দিকে চোখ পেতে রইলাম। সে সময় বাগানে কিছু একটা করার ভান ধরেছি। দুটো পামগাছে টানানো তারের উপর কাপড় শুকোতে দিলাম। তাদেরকে ধাপে ধাপে চলতে দেখলাম। দেখলাম তারা বিল্ডিংএর মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আবার খুব তাড়াতাড়িই বেরিয়ে আসছে। লাফ দিয়ে জিপগাড়িতে উঠে বসছে। বসে ধাক্কাধাক্কি করছে। সতর্কভাবে তাদের মুখগুলোকে বোঝার চেষ্টা করলাম। তাদের কাঁধের ব্যাচগুলো থেকে র‍্যাঙ্ক মনে গেঁথে রাখলাম। তারা ছিল খুবই আত্মবিশ্বাসী। ঘুম শব্দটির অর্থ আমি যেরকম বুঝি, এখন সেটাকে মাথায় রেখে বুঝতে পারি, তারা নিজেরা যে ঘুমিয়ে আছে সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত। যেন এসব কিছুই তাদের মাথার মধ্যে ঘটছে, যখন তারা ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া সামরিক পোষাকের বোতামগুলো কাঁধের সঙ্গে কষে বাঁধে, তখনই তারা বুঝতে পারে এসব হলো ঘটনার শুরু এবং শেষটা তাদের স্বপ্নের মধ্যে ঘটছে। কী ঘটবে সেটা যেন তারা আমাকে বলছে। নিজেদের বানানো  স্বপ্নের মধ্যেই যেন তারা খেলা করছে। 

কিন্তু তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজনকে চোখে পড়ল। তাঁর কাঁধে তারাখচিত ব্যাজ আটা। যেন তিনি দুঃস্বপ্নের মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন। প্রথমে ভেবেছিলাম একজন নয়, দুজন অফিসারকে দেখছি। দুজনের হাবভাব একই রকম। আর কালো হাত মোজায় তাদের নকল হাত ঢাকা। 

যখন তিনি সিঁড়ির দিকে আসেন তখন তিনি একজন মানুষ। যখন তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন তখন তিনি ভিন্ন একজন মানুষ। তাকে যখন সামনা সামনি দেখি, অল্প সময়ের জন্য আমাদের চোখাচোখি হয়, আমি কি বুঝতে পারি তার মুখের বাঁ পাশটি প্রাণহীন! সে পাশটি ক্ষত চিহ্নের জন্য বিকৃত হয়ে গেছে। একটা কষ্টকর ভেংচিতে পরিণত হয়েছে। তার বাঁ হাতটি কাঠের তৈরি। বাঁ পাটি টেনে টেনে হাঁটে-- পিছিয়ে পড়ে। ডান পাটির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। তাই তিনি যখন স্কুলের মধ্যে যান তখন তার ডান পাশটি দেখতে পাই। সেটা যুবকের মতো মুখ। উজ্জ্বল চোখ। শক্ত খাড়া নাক। আর ঠোঁটে একটি সিগারেট চেপে ধরে আছে আরেকটি হাত দিয়ে। কিন্তু যেখন স্কুল থেকে বেরিয়ে আসেন তখন যে মুুুখটি দেখি সেটা যেন সে মুখ বেদনায় ভরা। পৃথিবী সব ধ্বংসের মধ্য থেকে অনেক কায়দা করে টিকিয়ে রেখেছে সে মুুখটিকে।    এসব কিছু সত্বেও বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

আমি আমার ফুলেল পোষাক পরেছি। রক্ত লাল করে ঠোঁট রাঙা করেছি। তারপর স্কুলের দিকে পা বাড়িয়েছি। আমাদেরকে নিরাপদে রাখার জন্য এই দুটো-মানুষকে আমি কী করব বা কী করে মোহিত করব-- সেটা আমার জানা নেই। 

এইভাবে ইউরিন লিবারম্যানের মুখোমুখি হতে এসেছি আমি। তিনি বসেছিলেন। আর আমি দাঁড়িয়েছিলাম। টেবিলের উপরে একটি পিস্তল রাখা। তার নলটি মাটির চুলার দিকে তাক করা আছে। তার সামনে এসে আমি তক্ষুণি বললাম, আমার স্বামীর একটি পোলিশ নাম আছে। কিন্তু সে পোলিশ নয়। আমরা দুজনেই পূর্ব ইউরোপের ইউনিয়েট চার্চের অধিভুক্ত। আমরা ভালো আছি। কারণ আমি একজন ভালো গৃহিণী। আর আমার স্বামী একজন কর্মব্যস্ত মানুষ। কিছু কিছু মানুষ আমাদেরকে ঘৃণা করে। তারা আমাদেরকে নিয়ে গুজব ছড়ায়। মানছি-- আমার মধ্যে কিছুটা বালিকা সুলভ চপলতা আছে। এইসব মিথ্যে গুজব জঘন্য। মোটের উপর তারা অপরাধী-- অপরাধী হিসেবে তাদের প্রাপ্ত শাস্তির আদেশপত্র আছে। 

'তোমাদেরকে ঘৃণা করার যথেষ্ট যুক্তি আছে লোকজনের কাছে। তোমরা দূর্বিনীত। ' তিনি বললেন রুশ ভাষায়। আর তার সুস্থ স্বাভাবিক মুখে হাসি দেখা গেল। অন্যপাশটি রইল অনড়-- নিশ্চল। 

এই দুমুখোর কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করছিলাম আমাদের কী ধরনের শাস্তি হতে পারে। কেউ একজন দরোজার করাঘাত করে ঘরে ঢুকল। ফোন বেজে উঠল। কোনো একটা ব্যাপার নিয়ে লেফটেন্যান্ট লিবারম্যান হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। আমার দিকে আর মন দিতে পারলেন না। আত্মবিশ্বাস হারালাম আমি। দরোজা দিয়ে বেরিয়ে এলাম। ফোন হাতে নিয়ে তিনি ঘরের মধ্যে ধীরে ধীরে হাটাহাটি করছিলেন। দেখতে পাচ্ছিলাম একবার মুখের একপাশ-- তারপর অন্যপাশ। তাকে বেশ হতোদ্যম মনে লাগছিল। তিনি আমার জুতা, পা ও পোষাকের দিকে হতভম্বের মতো দেখছিলেন। 

'সন্ধ্যায় এসো। এখন আমার সময় নেই।' তিনি আমাকে বললেন ফোনটি রেখে। 

পেত্রোকে সন্ধ্যায় বলেছি, মারিয়াঙ্কা মাসিকে দেখতে যাছি। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে চুপি চুপি কিছুটা ভদকা পান করে নিলাম। সে তখন রান্না ঘরের মেঝেতে বসে লাল্কা নামের পুতুল নিয়ে খেলছিল। 

চাঁদের আলো যেখানে  যেখানে পড়েনি সেখানে ছায়া আছে। সেই ছায়ার পর ছায়া লাফিয়ে লাফিয়ে গুটি গুটি করে বেড়ার কাছে পৌঁছালাম। বেশ গরম লাগছিল আমার। আমার বগল ভিজে উঠেছিল। পাহারাদার সেন্ট্রি স্কুলে ঢুকতে দিল না। আমার দিকে বন্দুক তাক করল। রুশ ভাষায় বলল, 'চলে যা মাগী'। তাই আমি গাছের ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। পা দুটো বদল করে জানালার দিকে তাকালাম।।আনার বাহুর নিচে পোষাক শুকিয়ে গেছে বলে কাঁপতে শুরু করলাম। 'গোল্লায় যাও। তোমার ধ্বংশ হোক লিবারম্যান, তুমি বলশেভিক।' রাগে বিড়বিড় করতে থাকলাম। 

বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করতেই জানালায় তখন তার মুখের মৃত পাশটি চোখে পড়ল। তিনি আমাকে দেখতে পাননি। চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার জন্যই হয়তো মনে হলো চাঁদটিও আয়না দেখছে-- দুজনেরই যেন দুটি করে মুখ রয়েছে। 

কাঁপতে কাঁপতে সেই ছায়া থেকে চলে এলাম। জানালা থেকে সেই মুখটি সামান্য একটু আমার দিকে ঘুরল। তারপর সরে গেল। অচিরেই তাঁকে সিঁড়িতে দেখা গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। সেন্ট্রি তাকে বলল--এর আগে সে কখনোই আমাকে দেখেনি। লিবারম্যান স্কুলের করিডোরের নিচ দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে আসতে বললেন। সেভাবে তার এপার্টমেন্টে এলাম। এই এপার্টমেন্টেই বিয়ের পরে পেত্রো আর আমি থাকতাম।।স্বপ্নের নববধূর মতো আমাকে লিবারম্যান ঘরে নিয়ে গেলেন। 

এখানে আমাদের পুরনো শোবার ঘরটির মেঝের পরে থাকা প্রতিটি দাগই আমার চেনা। দেয়ালের কাটাকুটিও আবার জানা। এ বাড়িটি খুব বেশি পুরনো হয়ে গিয়েছিল। সেজন্য আমরা নতুন বাড়িতে চলে যাই। এ বাড়িতে আমাদের পুরনো খাটও আছে। তার উপরে তিনি বসতে বললেন তিনি। 

'তোমার নাম কী?' তিনি জিজ্ঞেস করলেন। আর খুব ধীরে ধীরে তার পোষাক খুলতে লাগলেন একটা পরে একটা করে।  খাটের  লম্বা স্ট্যান্ডের উপর সেগুলো ঝুলিয়ে রাখলেন। তার প্রশ্নের উত্তর দিলাম। আর জন্ম তারিখসহ পেত্রোর সব তথ্যই জানালাম। এখন আমি লেফটেন্যান্ট লিবারম্যানের বাম হাতটা দেখতে পেলাম। গোটা হাতটাই নিথর-- তার শরীর থেকে সেটা প্রাণহীনভাবে ঝুলছে। শেষ দিকে রয়েছে একটি নকল পা। একটি শিকলের সঙ্গে পাটি বাঁধা আছে। চাঁদের আলোতে এগুলো দেখতে পেলাম। আমার সামনে তার কোনো জড়তা ছিল না। যেন তার কাছে আমি কোনো মানুষই নই। 

তিনি আমার গায়ের উপর শুয়ে পড়লেন। তখন কল্পনা করছি--আমি তার আধখানা জীবনের সঙ্গে ভাব করছি। তার শরীরটি চটপটে ও আত্মবিশ্বাস। এরপরে তিনি বলেছিলেন, আমি খুব সুন্দর। বলার জন্যই হয়তো এটা তিনি বলেছিলেন। কারণ তিনি আসলে আমার দিকে তিনি তাকাননি।  শিক্ষকের শোবার ঘরের জন্য তৈরি করা  দেয়ালে কোনো অর্থহীন জিনিস ছুড়ে ফেলার দরকার মনে করে যেমন কেউ কেউ, ঠিক যেন লিবারম্যানের এই সুন্দরী বলাটা তার চেয়েও বেশি অর্থহীন। 

যখন আমি বাড়িতে ফিরে এলাম তখন পেত্রো আর শিশুটি ঘুমিয়ে ছিল। বেসিনে পানি ভরলাম। রান্নাঘরে অন্ধকারের মধ্যে নিজেকে ধুয়ে ফেললাম। বিরক্তিতে গা কাঁপছিল। এই স্নান আমার পাপবোধকে কমিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু তখনই আমার মধ্যে এক ধরনের লজ্জা জেগে উঠল। এই লজ্জা ছিল অসহনীয় আর বেদনার। এসব নিয়ে চিন্তা করো না হে লাল পোষাক পরা পাতলা ঠোঁটের পেরেস্কেভিয়া। সীমা ছাড়ানোর আগেই আগুন নিভছে। 

আরো কয়েকবার তার কাছে আমি গিয়েছি। এটাকে এক ধরনের আত্মত্যাগ বলা যায়। তিনি পূর্বদেশীয় একজন বিকালাঙ্গ একনায়ক। তার চাহিদা অনিশ্চিত। তিনি যে কোনো ঘটনার জন্যই প্রস্তুত। তার সঙ্গে যখন এই ব্যাপারটা ঘটছিল তখন আমি চোখ বন্ধ করে ছিলাম। জীর্ণ দেওয়ালে দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তিনি মুখটাকে টেনে ঘুরিয়ে নেন তার দিকে। তার দিকে যেন তাকাই সেটাই তিনি চেয়েছিলেন। পোশাক থেকে সিগারেটের গন্ধ ছুটে আসছিল। সে পোষাক যেন অজানা শত্রুর। এই গন্ধের জন্যই আমি ছটফট করছিলাম। তিনি ছিলেন জ্যান্ত এবং মৃত। স্নেহশীল আর কঠিন। তিনি আমার সঙ্গে শুচ্ছেন। আবার তিনি লোকজনকে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছেন। তার জঘন্য রকম ক্ষমতা ছিল। মনে হয়েছিল এই ক্ষমতার কারণে আমার গতরকে তার কাছে ছেড়ে দিতে হবে। গতরের মাংসকে জমাট বাঁধাতে দিতে হবে। দিতে হবে গলাতে। তারপর কিছু সময় রেখে দিয়ে বানাতে দিতে হবে মাংশের কাবাব। তার মর্জি মোতাবেক আমার গতরকে যেকোনো আকারই দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। 

সেদিন দেখতে পেলাম তিনি সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতে করে এসে পৌঁছেছেন। স্তাদনিকা ও তার বাবা-মা, রুচিনস্কিন ও অন্য কয়েকটি পরিবারকে আজ তাড়িয়ে দেওয়া হবে। এই তাড়ানোর কাজটি তদারকি করতে এসেছেন তিনি। তাকে দেখে একটি মোরগের কথা মনে পড়ে গেল। কারণ তার চোখ ছিল শূন্য। তারা বলল, রাশিয়ানরা আবেগপ্রবণ ও ভাবপ্রবণ। কিন্তু এই লোকটি ছিল অন্যরকম--সম্ভবত তিনি কোনো পর্যায়ে পড়েন না। ‘কে আপনি?’ আমি তাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতাম। অথবা তার বুকের উপরের লম্বা ক্ষতচিহ্ন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলতাম, ‘আপনার কী হয়েছে?’ তিনি হাসতেন। আর একটি সিগারেট ধরাতেন। কখনোই কিছু বলতেন না। 

রান্নাঘরের জানালা দিয়ে আমরা দেখলাম বাক্সপেট্রা নিয়ে লোকজন লম্বা লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে। আশাহীন তাদের মুখ। তখন সবে ভোর হয়েছে। কাঁধের উপর ঘুমানোর লাল্কা পোষাকটি পরে নিলাম। পেত্রো সিগারেট টানছিল। আমাদের দরোজার উপর কি গার্ডিয়ান অঞ্চলের রক্তলাল পরী চিহ্ন পড়েছে? ইউরি লিবারম্যান গাড়ির উপর দাঁড়িয়েছিলেন। তার মৃত মুখটি দেখানোর জন্যই কি সেটা ঘুরিয়ে রেখেছেন? সে মুখটিতে কী ভাব খেলা করছে সেটা বোঝা যায় না। কী হয়েছে? কেনো আমাদেরকে নয়? আগামীকাল সম্ভবত আমাদের পালা। ‘আজ হোক কাল হোক তিনি আমাদের খুঁজে বের করবেন’। ভাবলাম আমি। তারপর হতাশার পর হতাশা বেড়েই চলল। সারাদিন ভরে পেত্রো প্রশ্ন করেই চলল, 'কেনো আমি নই?’ 

অচিরেই বুঝতে পারলাম আমি গর্ভবতী হয়েছে। মারিয়াঙ্কা মাসিকে দেখতে গেলাম। তাকে সব খুলে বললাম। তিনি আমার মুখে চড় মারলেন। তারপর তিনি নিয়ে গেলেন আমাকে পরের গ্রামে। সেখানে ম্যাত্রিয়োনা নামে এক বুড়ি আমার গর্ভপাত করালেন। সে-রাতে মারীয়াঙ্কা মাসির ঘরে কাটালাম। আমার শরীর ভালো নয় এই কথা তিনি পেত্রোকে বলতে গেলেন। প্রায় মাসখানেক আমি অসুস্থ ছিলাম। মারিয়াঙ্কা মাসি আমাকে ছেড়ে কখনোই যাননি। কারণ আমি মরে যেতে চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম আমার উপরে ঈশ্বরের শাস্তি নেমে আসুক। মাসি ভেবেছিলেন আমি বোধ হয় সন্তান হারানোতে দুঃখ পেয়েছি। কিন্তু আমি আকুল হয়ে মরে যেতে চেয়েছিলাম। 

একদিন একজন রাশিয়ান সৈন্য এলো। সে দরোজায় দাঁড়িয়ে মারিয়াঙ্কা মাসির সঙ্গে কথা বলে চলে গেল। সে কী বলেছে তা মাসি আমাকে বলেননি। তিনি কেবল পেত্রোকে নিয়ে কথা বললেন। বললেন, পেত্রোকে অবশ্যই তোর ভালোবাসতে শেখা দরকার। সে তোর চেয়ে দুর্বল। আর তার গায়ে জোর কম। 

এরপর কমান্ডাররা অন্য কোথাও বদলী হয়ে চলে গেল। সেটা কোথায় কেউ জানে না। পরে মারিয়াঙ্কা মাসি আমার ছোটো একটা প্যাকেট দিলেন। সেটা লিবারম্যানের পাঠানো। সেদিন সৈনিকটি দিয়ে গিয়েছিল। এক টুকরো সাদা কাগজে রুশী অক্ষরে একটা ঠিকানা লেখা ছিল। সঙ্গে ছিল সোনার তৈরি ক্রুশচিহ্ন। কয়েকটি আঙটি। আর কয়েকটি জিনিসও ছিল। সেগুলো মনে হয় কোনো সৈন্যের জামা থেকে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে। সেগুলো কাগজে মুড়ে বাগানের একটি পামগাছের নিচে মাটিচাপা দিলাম। এটা ছিল শিশুটির অন্তেষ্ট্যিক্রিয়া। 

আমি এখনো একটি অদ্ভুত ব্যাপার দেখি--সেটা হলো লিবারম্যানের পায়ের বুড়ো আঙুল। তার নখের কিছু অংশ নেই। এখানে, এই বুড়ো আঙ্গুলেই যেন সেই দুই মুখোওয়ালা মানুষটির সব শক্তির পতন হয়েছে। এটা ছিল বাইরের দিককার একটা ব্যাপার। এবং হাস্যকর। এই আঙুলটির জন্য আমি লজ্জিত। তবে সেই কাগজপত্রে ঠাসা টেবিলের উপরে তার সঙ্গে আমার কামোত্তেজিত যৌন মিলনের জন্য লজ্জিত নই। অথবা লজিত নই সেই যৌনমিলন থেকে যে আনন্দের ঢেউ উঠেছিল তার জন্যও। যদিও তার জন্য আমার অন্য কোনো বোধ না এলেও অন্তত বিরক্ত হওয়া উচিত ছিল। সাদা চোখে দেখলে কি এর মধ্যে গোপন কোনো বিষয় চোখে পড়ে? 

পরের পাঁচ মাসে ইউক্রেন নামের দেশটির লোকজন পরিত্যাক্ত ছোটো ছোটো বাড়িতে চলে গেল। এদের কেউ কেউ আমার আত্মীয়স্বজন--যেমন হোরোদিস্কি আর কোজোভিচ। এরা আমাদেরকে সন্দেহ করেছে। এরা অবশ্য সন্দেহবাতিকগ্রস্থ নয়। আসলে হোরোদিস্কির বউ পোলিশ। একজন পোলিশ স্বামীর থাকার চেয়ে এটা অপেক্ষাকৃত ভালো। যেভাবে হোক না কেনো মেয়েরা সব কিছু খুব ভালোভাবে-- খেয়াল করে না। তবে তাদের খেয়াল করা দরকার। কারণ পুরো জাতির জন্মই হয় তাদের পেটে। 

‘বলো, এটা কি সত্যি?’ পেত্রো কঠিন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিল। 

‘না, সত্যি নয়।’ আমি বলেছিলাম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন