শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

শাহাব আহমেদ: আর্দ্রা নক্ষত্রের রাত

স্বপ্ন দেখছিলাম। প্রথমে বুঝে উঠতে পারিনি কোথায় আমি। একটা তুমুল হৈ হৈ রৈ রৈ করা জলপ্রপাতের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। খুব উঁচু নয়। একটা পাহাড়ি নদী খুব ত্রস্ত ব্যস্ত দৌড়াতে দৌড়াতে এক জায়গায় এসে লাফ দিয়ে পড়েছে যেখানে, সেখানে তৈরী হয়েছে খরস্রোতা একটি পুকুরের মত। খুব বড় নয়। রাত, কিন্তু অন্ধকার নেই বললেই চলে, লেনিনগ্রাদের জুন মাসের রাতের মত। জলের উপরে সাদা ফেনা দেখা যায়। চিনতে পারলাম। কারেলিয়ার কীভাচ জলপ্রপাত, পেত্রোজাভোদস্ক শহরের অদূরে। মনে পড়ল একজন মানুষের কথা। আর্দ্রা নক্ষত্রের আর্দ্র আঁখি বেয়ে ঝরে পড়লো কয়েক ফোটা অশ্রু কীভাচের জলে।


অনেক দিন আগের কোন এক গ্রীষ্ম। জার্মান বন্ধুদ্বয় মার্ক এবং অ্যাক্সেল জলে ঝাপ দিয়েছে। পেত্রা ও গ্যাব্রিয়েলা দুই রূপসি সহ সারা গ্রুপ তীরের থেকে উৎসাহ দিচ্ছে তাদের। সাথে মেয়েদের আরও একদঙল। দুপুরের গরম যেন খাণ্ডব অরণ্য বহ্নি। পদ্মা নদীতে সাঁতরিয়ে অভ্যস্ত, আমারও বীরত্ব দেখানোর প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে ঐ মেয়েদের একজনকে।

ঝাপ দিলাম। বরফ ঠান্ডা জল। স্রোত ঠেলে আছড়াতে চায় পাথরে পাথরে, খাবি খেতে লাগলাম।
ভুল ধারণা করেছি, পদ্মার স্রোত কীভাচের স্রোতের মত এত বন্য নয়।

মার্ক অ্যাক্সেল ছিল তীরের কাছাকাছি, সেখানে স্রোত ছিল কম। আমি একেবারে মাঝখানে যেখানে জাহান্নামের উথাল পাতাল ঘুর্ণি। হাতে পায়ে ঠান্ডায় খিচ লাগার দশা। ডুবছিলাম।ইতিমধ্যেই নাকে মুখে প্রচুর জল পথ খুঁজে নিয়েছে পাকস্থলী পর্যন্ত। অ্যাক্সেল লক্ষ্য করেছিল কী ঘটছে ।

ওর সাহায্য নিয়ে রক্ষা পেলাম। উঠে ঠক ঠক করে কাঁপছিলাম শীতে। যে বীরত্ব না দেখালেও চলতো, তা দেখাতে গিয়ে মরণদশা হয়েছিল।বখাটে বয়েসের অর্বাচীন ঔদ্ধত্ব।যেখানে অগ্নি দেবীর এতগুলো কন্যা দাঁড়িয়ে আছে বিস্ময়ের দৃষ্টি নিয়ে, সেখানে পিছিয়ে কি থাকা যায়?

যৌবনের অপমান হয় না?


পরের দিন তুমুল জ্বর এল। পেত্রোজাভোদস্ক ইউনিভার্সিটি হোস্টেলে আমাদের গ্রীষ্ম ক্লিনিকাল রোটেশনের গ্রুপটির থাকার বন্দোবস্ত হয়েছিল। বিশাল ফাঁকা বিল্ডিং। সব ছাত্র ছাত্রি গ্রীষ্মের ছুটিতে। হোস্টেলের যে দিকটায় আমার থাকার বন্দোবস্ত সেখানে আমার দলের আর কেউ ছিল না।

কারেলিয়ার মাঠ যেন দীর্ঘ করিডোর।

শূণ্যতা হু হু করে।

জ্বর,মাথা ব্যথা, গলা ব্যথায় কাবু, চোখ জবা ফুলের মত লাল।

অস্বস্থির সীমা ছিল না। বিছানা ছেড়ে জলের কেটলি হাতে কিচেনে গেলাম। সেই প্রাচীন হোস্টেলগুলোতে প্রতি উইং এ থাকতো কমন কিচেন। এক উইং এ থাকতো ছেলেদের রেস্টরুম, অন্য উইংএ মেয়েদের । স্নানঘর ব্যাজমেন্টে, ছেলেদের মেয়েদের আলাদা। স্টোভের সামনে জল গরম করছিল এক মেয়ে, সারা হোস্টেলে সম্ভবত একমাত্র জীবিত প্রাণি। অসম্ভব উজ্জ্বল দুটি চোখ, হাল্কা নীল রংয়ের; সোজা লম্বা নাক, কাঁধ পর্যন্ত সাদা ও বাদামির মিশেল চুল, হাল্কা-পাতলা শরীর এবং শরীরের মাপের সাথে খাপ খাইয়ে বুকের বন্ধুরতা। না-বেখাপ্পা ধরনের বড়, না-চোখ এড়িয়ে যাবার মত ছোট। হাল্কা নীল টি-শার্ট চোখের সাথে মিল রেখে ও ডার্ক ব্লু জিন্সের প্যান্ট ।

মুখে অনাবিল কম্রতা।

"প্রিভেত "

"প্রিভেত" হাসলো ও, চমৎকার ছোঁয়াচে, ঠিক গায়ে লাগার মত হাসি। ফুল যেমন গন্ধ ছড়ায় স্বতস্ফুর্ত, রামধনু ছড়ায় বর্ণাভা, আছে কিছু নারীর তেমন-কিছু আকর্ষণ যা ব্যাখ্যা করা যায় না। কিছু নারীর দৃষ্টি খুব প্রখর এবং ইনটুইশন তীক্ষ্ন।

"লেনিনগ্রাদ থেকে ক্লিনিকাল করতে এসেছি।” আমি বলি।

"তাই ? কিন্তু তোমাকে খুব অসুস্থ দেখাচ্ছে, শরীর খারাপ নাকি?"

"জ্বর"

আমার মা হলে যা করত, সে চট করে হাত দিয়ে আমার কপাল স্পর্শ করে বলল, "ইস তুমি যে পুড়ে যাচ্ছো, কোন ওষুধ খেয়েছ? তুমি বরং শুয়ে থাক, আমি পানি গরম করে দিচ্ছি।"

অনেকটা ঠেলেই বলা চলে সে আমাকে রুমে নিয়ে শুইয়ে দিয়ে নিজের রুমে গেল। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এল জ্বরের ওষুধ নিয়ে। চা করে দিল গরম। গরম চায়ে গলাটা শান্ত হল। বলল, “তুমি এখন ঘুমাও, আমি বিকেলে এসে দেখে যাবো আবার।” বিকেলে একটু ভালো বোধ হলো। কথা হলো।

নাম বলেছিল, লিলি।

“লিলি ব্রিক?”

লিলি ব্রিক ছিল মায়াকোভস্কির পেইন ও প্রেমিকার নাম।

ও হেসে বলেছিল, “তুমি লিলি ব্রিককে চিন? আমি লিলি গুসকভা।”

২য় বর্ষের সাহিত্যের ছাত্রী, গিয়েছিল গ্রীষ্মের বিনির্মাণ দলে।

কাজ শেষ করে ফিরেছে, রাতটি কাটিয়ে পরের দিন চলে যাবে গ্রামে ২ সপ্তাহের জন্য, তারপর ফিরে আসবে, শুরু হবে ক্লাশ। শ্বেতসাগরের তীরের অতি প্রাচীন ‘কলেঝমা’ গ্রামে ওর বাড়ি। স্ট্যালিনের “বেলামোর ক্যানাল ” যেখান থেকে শুরু হয়েছে তার প্রায় ৮০ কিমি পূবে। এই গ্রাম এক সময় ছিল নভগরদের বীর নারী “মার্থা পসাদনিৎসার”। মস্কোর রাজা তৃতীয় ইভান যখন তেড়ে আসছিল নভগরদ দখল করার জন্য, তার বিরুদ্ধে এবং নভগরদ স্বাধীনতা রক্ষার জন্য অত্যন্ত সাহসি ভূমিকা পালন করেছিল সে। জনগনকে সংগঠিত করে বিশাল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল মস্কোর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। যদিও নভগরদকে পরাজিত করে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল, মার্থা ছিল কারামজিন, পুশকিন ও ইয়েসিনিন সহ বহু রুশ কবির স্বাধীনতার অনুপ্রেরণা। তাই ১৮৬২ সালে নভগরদে স্থাপিত হাজার বছরের রুশ রাষ্ট্রের মনুমেন্ট মার্থাকে এড়িয়ে যেতে পারে নি। তার মূর্তিও খোদাই করা আছে সেখানে। মার্থার প্রজাদের একজন ছিল হয়তো লিলির পূর্বপুরুষদের কেউ।

“কলেঝমা” নদী ওদের গ্রামের উপর দিয়ে এঁকে বেঁকে গিয়ে মিশে গিয়েছিল শ্বেত সাগরে। যখন আমার ওর সাথে পরিচয় হয় ৮০ দশকের মাঝামাঝি, তখন ওদের গ্রামে মানুষ ছিল ২০০ জনেরও কম ।“জারিয়া সেভেরা” বা “উদীচী আভা” নামে বিখ্যাত একটি মাছ ধরার সমবায় ছিল সেই গ্রামে। সোভিয়েত দেশের গুটিকয় লাভজনক সমবায়ের একটি। ওর পিতা ছিল সেই সমবায়ের জেলে।বেশ সুনাম ছিল তার।

তার মেয়ে এসেছে শহরে সাহিত্য পড়তে।

সময়টা ছিল সারা পৃথিবীর হাজারো মানুষের মত আমারও জীবনের ক্রান্তিকাল। সমাজতন্ত্রের নামে একনায়কতন্ত্র, অকাতর, হত্যা, নির্যাতন, সন্ত্রাস ইত্যাদির যে তথ্যগুলো ছিল লোহার সিন্দুকে তালাবদ্ধ তা বের হয়ে আসতে শুরু করেছে। দেশ ও সমাজতন্ত্রের শত্রু বলে লক্ষ কোটি মানুষকে গুলাগ নামের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছে। ইউক্রেনে যে কুখ্যাত "গলোদোমর" (দুর্ভিক্ষ)* লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে, বের হয়ে এসেছে যে, তা ছিল সম্পূর্ণভাবে পার্টি ও রাষ্ট্রের দ্বারা তৈরী। ইউক্রেনের ক্ষুধিত মানুষ যাতে ওখান থেকে বের হয়ে এসে অন্যত্র সেই খবর পৌঁছে দিতে না পারে বা বিশৃংখলার সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য সৈন্য দিয়ে ইউক্রেনের বর্ডার ঘিরে রেখেছে বিশ্ব মানবতার পাহারাদার সম্প্রদায়।

ফরাসি বিপ্লবের গিলোটিনে জীবন হারিয়েছিল ৪০ হাজার, রুশ বিপ্লবের ধ্বংসযজ্ঞে জীবন হারালো প্রায় ২০-৪০-৬০-১১১ ইত্যাদি কত মিলিয়ন কে জানে? মানব বলির সংখ্যায় কী আসে যায় সমাজতন্ত্র যেখানে লক্ষ্য ?

অথচ মানব হত্যা, মানব নিপীড়নই যদি লক্ষ্য হয় তবে সামন্ততন্ত্র ধ্বংস করে পুজিতন্ত্র এবং পুজিতন্ত্র ধ্বংস করে সমাজতন্ত্র তৈরী করার প্রয়োজন ছিল কি? কুড়াল তো জল্লাদের হাতে যা, সন্তের হাতেও তাই। জিউস পিতা ক্রনস (Kronos)** ভয় পেত তার সন্তানদের। ভয় একটাই যে তারা তাকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে নেবে।

ক্ষমতা, ক্ষমতাই সব।

তাই কোন সন্তানের জন্ম হলেই সে তাকে গিলে ফেলতো টুপ করে। ফরাসি বিপ্লব এবং রুশ বিপ্লব নিজস্ব সন্তানদের গিলে খেয়েছে ক্রনসের চেয়েও বড় নৃশংসতায়। আমরা জানতাম না অথবা জেনেও উটপাখি ছিলাম।

একে অন্যের যত সদৃশই হোক না কেন, একজন মানুষ আর একজন মানুষের মত নয়। তাই যখন পেরেস্ত্রইকা চোরাবালিতে, গর্বাচভ উল্টা পথে হাঁটছেন, "বিপ্লবেই মুক্তি" এই মোহ কাটতে শুরু করেছে এবং একটি বিরাট দৈত্যাকার রাষ্ট্র বিলুপ্তির ডেল্যুশনে ভুগছে, দেশে তখন ভাঙছে আমাদের “উটপাখি সম্মেলন”, ভাঙছে দার্শনিক ক্লীবতায়। হাজার হাজার বিভ্রান্ত আশাহতদের একজন ছিলাম আমি।

নাতালিয়া নামে নারীকে ভালোবেসেছিলাম কিন্তু ছিলাম মরুতে ক্যাকটাসের মত শুকনো ও তৃষ্ণার্ত।

খুব সামান্য একজন মানুষ, কাফকার মানব-কীট গ্রেগরের চেয়েও ছোট।

উটপাখি বালিতে মুখ ঢাকে, আমি বইয়ের জগতে নিয়েছি আশ্রয়।

সের্গেই ইয়েসিনিন আমাকে পাগল করে দিয়েছিল। পুশকিন, আফানিসিয়ি ফেত, তিউতচেভ , দস্তয়ভস্কী আমাকে ডাক্তারি পড়ার ফাঁকে ফাঁকে রেখেছিল সম্মোহিত করে। গ্যেটের ফাউস্টপড়ে যেমন অভিভুত হয়েছিলাম : "মুহুর্ত থেমে দাঁড়াও ! তুমি সুন্দর ", তেমনি থমাস মানের ফাউস্টের বিশুদ্ধ প্রেমের যন্ত্রণা আমার মধ্যেকার শূন্যতাকে ( void) দিয়েছিল এক বিশ্ববিলয়ী কলেবর।

ঠিক এমনি কৃষ্ণ সময়ে আমার লিলির সাথে পরিচয় হয়েছিল। আমি ছিলাম অসীম মহাসমুদ্রে ভাসমান দিকভ্রান্ত কলম্বাস আর সে হয়েছিল গুয়ানাহানি (Guanahani) দ্বীপ।***

খুব শীঘ্রই জেনে গেলাম যে সে-ও আমার মতই কবিতার পাগল। সে নিজের রুম থেকে কবিতার বই নিয়ে এসেছিল।সুন্দর আবৃত্তি করে শুনিয়েছিল তার প্রিয় কিছু কবিতা। তার মুখেই প্রথম আবিস্কার করেছিলাম রুশ অনুবাদে রবীন্দ্রনাথকে। আমাদের জীবনের ধ্রুবতারা কবি ছিল তারও প্রিয়।

কী কাকতালীয় নক্ষত্র সংযোগ!

কী অপূর্ব যৌবনের মোহনা।

মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে পরিচয় যার সাথে কত সহজেই সে স্থান করে নিল আমার হৃদয়, সমস্ত জীবনের জন্য। শরৎ-সাহিত্য পড়া হয়ে গিয়েছিল স্কুলের দরজা পেরুবার আগেই। শরৎ চন্দ্রের নায়িকারা ছিল ধ্যানে জ্ঞানে। সেই নায়িকাদেরই একজন আমার প্রিয় হয়ে এসেছিল সুদূরের বন, জল ও জলপ্রপাতের দেশ কারেলিয়ায়।এবং এমন কাকতালীয় ভাবে, তা কোনদিন স্বপ্নেও ভাবি নি।

পরের দিনও প্রচন্ড জ্বর ছিল, দিনটা কেমন গেছে টের পাই নি।

পরে শুনেছি অপ্রকৃস্থের মত প্রলাপ বকেছি, বাংলায়। সে কিছু বোঝেনি, মায়ের কথা উল্লেখ করেছি আর একটা শব্দ, সম্ভবত কোন একটা নাম, এসেছে বার বার। সে পাশে থেকে টাওয়েল ভিজিয়ে আমার জ্বরের সাথে লড়াই করেছে নি:সঙ্গ কক্ষে । না আমি তার কেউ নই । কিন্তু সে আমার কাছে এক শাশ্বত স্বর্গীয় নারী যার দেখা শুধু গাছ- পাখী- নদী-জলের এই পৃথিবীতেই মেলে। এরই মাঝে আমি ঘুমিয়ে পড়লে এক ফাঁকে যেয়ে তার যাবার টিকেট বদলে এনেছে। সিদ্ধ করে এনেছে গরম গরম আলু যার রয়েছে ক্ষুধা উদ্রেক কারী ঘ্রাণ, আর ক্যানড ফিশ্। ক্ষুধা বোধ করেছিলাম কিন্তু মুখে দিয়ে কোন রুচি বোধ করলাম না। সময়টা ছিল কঠিন। দোকানগুলো ছিল গড়ের মাঠ, ফার্মাসির তাকগুলো শূন্য। হাসপাতালগুলোর একই দশা। এত বড়, এত সুন্দর, এত ধনী দেশ অথচ মানুষ দিন কাটাচ্ছিল অনাহার অর্ধাহারে, বিশেষত পেনশন ভোগী বৃদ্ধ মানুষগুলো।

এই দেশকে এই নি:স্বতায় এনেছিল অতি পরিকল্পিত ভাবে সেই দেশের “উটপাখি পার্টি” ও সেই পার্টির কিম্ভুত দশাননের দল, যাদের পকেটে আঁটছিল না রুবল। লগ্নির বাজার চেয়ে কাঁদছিল ছায়ার আড়ালের ক্ষুধিত পাষাণ।

পরের দিন জ্বর ছেড়ে গেল, মাথাটা হাল্কা বোধ হল, শরীরে বল ফিরে পেলাম। বললাম "তুমি আমাকে তোমাদের শহর ঘুরিয়ে দেখাবে ? " সারাটা বিকেল ঘুরলাম পাশাপাশি। ভারী সুন্দর একটা পার্ক, পাশে বয়ে গেছে কলকলে পাহাড়ী ঝরনা। যেখানেই শব্দ করে নদী বয়, সেখানেই আমি হারিয়ে ফেলি আমাকে । আমার সত্তায় নদী ছোটে চিরন্তন। আমি নদীর তীরে নিয়েছি প্রথম শ্বাস, নদী আমার অঘোরে প্রলাপ বকার শব্দ। মা, নারী, নদী ও মাতৃভূমির সতত মেটামরফোসিস চলে আমার সত্তায়, চাইকোভস্কির সুর যেমন এক লয় থেকে অন্য লয়ে রূপান্তরিত হয়ে সৃষ্টি করে সম্মোহনী আবর্তন, নদী তেমনি আমার গহিনের সুর ।

নদীর গুঞ্জন, পাখীর কূজন, গাছের পাতায় পাতায় বাতাসের মৃদুমন্দ শব্দ আর সেই নারীর ধীর,পরিশীলিত কন্ঠস্বরের ওঠা নামা শুনতে শুনতে আমি হাঁটছিলাম কি উড়ছিলাম বুঝে উঠতে পারি নি। বিশ্ব সংসার মুগ্ধ হয়েছিল। রাতের নীরবতার অনিন্দ্যতায় ফুলে যেমন পাপড়িগুলো খুলে খুলে আসে আকাশ -তারার উষ্ণতায়, তেমনি কি এক অবোধ্য বোধ কোকোন বন্দী প্রজাপতির মত ডানা মেলতে চাইছিল আমার মধ্যে। আমার তাকে ভালো লাগছিল অসম্ভব ।

হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছলাম যেখানে আর পথ নেই সামনে যাবার। বুক উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেয়াল। সুতরাং হয় নদীতে নামা, নয় দেয়াল টপকানো,নয় পিছনে ফেরা -এই ছিল বিকল্প। সিদ্ধান্ত হল দেয়াল টপকাবো। পাহাড়ের ঢালু, আমাদের দিক থেকে তত উঁচু নয় দেয়ালটি, যতটা উঁচু অন্য দিকে। তাই দেয়ালে ওঠা যত সহজ, নামা তত সহজ নয়।দেয়াল টপকানো পুরুষের জন্য বিশেষ বড় কোন কাজ নয়, পুরুষে বানর বাস করে অবিরল। আমি দেয়ালে উঠে লাফ দিয়ে নেমে গেলাম । দাঁড়ালাম দেয়াল ঘেঁষে ওকে সাহায্য করার জন্য। সে দেয়ালে উঠেছে ঠিকই কিন্তু ভয় পাচ্ছে ঝাঁপ দিতে। স্কার্ট পরার কারণে কাজটি তার জন্য তত সহজও ছিল না। আমি দেয়াল ঘেষে দাঁড়িয়ে, আর সে দেয়ালের উপড়ে। তাকিয়ে আছি। ও ইতস্তত করছে। তারপরে আমিই সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব যত্ন করে কোলে নিয়ে নামিয়ে আনলাম।

কয়েকটি মুহুর্ত সে ছিল আমার সংস্পর্শে, না দেয়াল, না মাটির। এই বিশাল বিশ্বে যে শূণ্যতা আমাদের ঘিরে আছে অনন্তকাল ধরে এবং যা থাকবে অনন্তকাল, যার কোন শুরু নেই, শেষ নেই, এবং গ্রহ, নক্ষত্র, ধুমকেতু যে শূন্যে সাঁতরায়, আমি এক মানব মাটিতে পা রেখে শূন্যে ধরে আছি এক মানবীকে, যার সৌন্দর্য পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যকে অতিক্রম করে পরিণত হয়েছে এক শাশ্বত শুদ্ধতায়। আর সে পড়ে যাওয়ার ভয়ে অসম্ভব নিবিড়তায় আকড়ে ধরে আছে আমাকে। অবোধ্য এক বিদ্যুৎ জন্ম হল তার শরীরে, তা আমার শরীরে সংক্রমিত হয়ে জাগিয়ে তুলল আমার প্রতিটি দেহকোষ, প্রতিটি কণা, তারপর ধীরে ধীরে আমার পা বেয়ে প্রোথিত হল মাটিতে।

মাটির পৃথিবীতে লাগল শিহরণ।

এই সেই ফাউস্টের চিৎকার করার মুহূর্ত : " মুহুর্ত থেমে দাঁড়াও ! তুমি সুন্দর !"

না, আমাদের মুহূর্ত প্রলম্বিত হয় নি, থেমে থাকে নি সময়। আমি বিহবলতা কাটিয়ে পৃথিবীর কন্যাকে নামিয়ে রেখেছি অতি যত্নে পৃথিবীর বুকেই, পূজারী যেমন তার দেবীকে দেয় সমস্ত ভালোবাসা, আমি আজও বুঝে উঠতে পারি নি, আমি কি দিয়েছিলাম তাকে।

সে অনেকক্ষণ কোন কথা বলে নি।

আমরা হেঁটেছি হাত ধরে পাশাপাশি।

কি ভাবছিল বা বোধ করছিল আমি জানি না। হয়তো কিছুই নয় । হয়তো অনেক কিছু? মহাকাল তার বুকে ধরে আছে কত অনুভূতি, কত অশ্রু, আমরা সেই মহাসমুদ্রে তার খোঁজ পাবো কি করে ? আর আমিই কি ভাবছিলাম তা হয়তো তালাবদ্ধ আছে মগজের কোথাও। কিন্তু চাবিটি …...?

"একটুকু ছোয়া লাগে একটুকু কথা শুনি” এই কি সেই ছোয়া?

এই কি সেই কথা যা কখনই বলা হয় না?

আর যা বলা হয় না তাকে কি শুনতে হয় হৃদয় দিয়ে?

আবার কথা শুরু হল। কত কথা। কবিতার কথা, কবিতা ও ভালোবাসার কথা। ন্যায় অন্যায়, শোষণহীন সমাজের কথা। দূরের কোন এক দেশের কথা, যে দেশে অকপট পানকৌড়ি জলে সাঁতরায়, হাওয়া খেলা করে সরিষার হরিদ্রায়, আমনের ধান গলা পর্যন্ত ডুবে থাকে প্রেমিক পুরুষের মত, নদীগুলো বুকে বয়ে নিয়ে যায় রং বেরংয়ের হাওয়া ভরা পালে ভালোবাসা। যে দেশে মা পথ চেয়ে থাকে নক্ষত্রের প্রদীপ হাতে।

হাটতে হাটতে পৌঁছলাম পেত্রজাভোদস্কের ওনেগা হ্রদের তীরে। বেশ সুন্দর হ্রদ, বিশাল বড়। এই হ্রদের মধ্য দিয়ে শ্বেত সাগর ও বাল্টিক সাগরকে সংযোগ করে ১৯২৮-১৯৩২ সালে তৈরি করা হয়েছিল ২২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ “বেলামোর ক্যানাল” বা “শ্বেতসাগরের খাল”, **** যা ছিল প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার” অন্যতম যাদুর বাস্তবায়ন। শুধু মাত্র গুলাগের বন্দিদের ব্যবহার করে, বিনা পারিশ্রমিকে তৈরি করা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম মেগা প্রজেক্ট। কত রক্ত, অশ্রু, অস্থি এই খালে ধুয়ে গেছে। প্রায় আড়াই লক্ষ কয়েদির শ্রম, প্রায় ১২ হাজার প্রাণের বলি। তাদের ছিল অপরাধির তকমা গলায়। অথচ প্রকৃত অপরাধিরা ছিল ক্ষমতায়, আর সাম্যের স্বপ্নদেখা জনগণ জেলে।

ওনেগা আমাকে পাগল করে দিয়েছিল।

গ্রীষ্মের মৃদু মন্দ বাতাসে ছোট ছোট ঢেউ এসে মাথা কুটছিল কত শত লক্ষ বছরের মস্ত এক পাথরে। সেই পাথরের ওপরে সে বসেছিল নগ্ন ধবল পা ভিজিয়ে। হাত দিয়ে ছিটাচ্ছিল জল এদিক সেদিক।ওনেগার বুক কি আমার বুক? সেই স্বচ্ছ জলে ডোবানো এক জোড়া ধবল পা কি আমার বুক-জলে ডুবানো? সে ছিল আনমনা। দশলক্ষ নল-খাগড়া মাথা নাড়ছিল বাতাসে, আর ওনেগা বিশাল বিস্তীর্ণ এক কম্পিত বুক নিয়ে শুয়েছিল নীল আকাশের দিকে মুখ করে ।

পরের দিন খুব সকালের ট্রেনে চলে গেল সে ।

আমি ফিরে এলাম লেনিনগ্রাদে। গ্রীষ্ম চলে গেল। ক্লাশ শুরু হলো নতুন বছরের। আস্তে আস্তে এগিয়ে এল নানা রং হাতে সোনালী শরৎ। তারপরে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া, বৃষ্টি, তুষার, শীত। লেনিনগ্রাদের হিংস্র শীত যা বুকের শূন্যতাকে জমাট করে পরিবর্তিত করে দেয় সাদা সাদা বেলুগায়, যা খুব ধীরে সাঁতরায় বুকের গহীন সমুদ্রে ।

তারপর সেই দেশ ভেঙে গেল খন্ড খন্ড হয়ে, যেমন আয়না পড়ে ভেঙে যায়। যেমন স্বপ্নকে হত্যা করে ভেঙে যায় ঘুম ....

পাদটিকা :

*গলোদোমর (Holodomor) ১৯৩২-১৯৩৩ সালে পার্টি-ভগবানের পলিসি দ্বারা সৃষ্ট ইউক্রেনের দুর্ভিক্ষ যাতে ২.৫-২.৭৫ মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়। এ কারণে ইউক্রেনিয়ানরা রাশিয়ানদের দোষারূপ ও ঘৃনা করে, অথচ ভগবান ছিল একজন গোফওয়ালা খল জর্জিয়ান, যে সমান ভাবে হত্যা করেছে রুশ, ইউক্রেনিয়ান, তাতার , ফিনিশ, কাজাক সহ স্বজাতির সাচ্চা দেশপ্রেমীদের ।

**ক্রনস : গ্রীক মাইথোলজী - জিউসের পিতা। ভবিষ্যতবানী করা হয়েছিল যে তার এক সন্তান তাকে সিংহাসন চ্যুত করে ক্ষমতা দখল করবে । তাই রেয়া , তার স্ত্রী, যখনই কোন সন্তানের জন্ম দিত সে তখনই তাকে গিলে ফেলত। এভাবে সে তার ৫ সন্তানকে গিলে ফেলে। রেয়া ৬ষ্ঠ সন্তান জিউসের জন্ম দেয় গোপনে ক্রীট দ্বীপে এবং আইডা পর্বতের এক গুহায় তাকে লুকিয়ে রেখে নবজাতকের কাপড়ে পেচিয়ে একটি পাথর তুলে দেয় ক্রনসের হাতে ৬ষ্ঠ সন্তান বলে । ক্রনস যথা রীতি গিলে ফেলে । জিউস গোপনে বড় হয়ে তার পিতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার পেট কেটে তার পূর্ববর্তী ভাই বোনদের ( ডেমেতার , হেস্টিয়া, হেরা,হেডিস ও পসেইডন) উদ্ধার করে ।

ক্রনস এমনই ভগবান যে পাথর আর সন্তানের মধ্যে তফাত করতে পারেনা, যেমন সাচ্চা দেশপ্রেমীদের তফাত করতে পারেনি লেনিনের উত্তরসূরী ভগবান।

***গুয়ানাহানি দ্বীপ ( বর্তমান বাহামার সান সালভাদর দ্বীপ) কলম্বাস যখন ক্লান্ত এবং মহাসাগরে বিভ্রান্ত, ঠিক তখনই আশার আলোকবর্তিকা নিয়ে এই দ্বীপ ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে।

****বেলামোর ক্যানালের তথ্যসূত্র : The history of the Gulag by Oleg V. Khlebniuk.




কিন্তু আমার আবার দেখা হয়েছিল লিলির সাথে। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক সন্ধ্যায়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পরে।

মানুষের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছিল। বেশীর ভাগ মানুষকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল অকল্পনীয় ও অবর্ণনীয় জীবন সংগ্রামে। কাজ ছিল না, বেঁচে থাকার জন্য মানুষ তখন কী করে নি।যে ব্যবসা করা ছিল মাত্র কিছুদিন আগেও নিষিদ্ধ ও অপরাধ, মানুষ ঝাপিয়ে পড়েছিল তাতে। ছোট ছোট শহর ও গ্রামের মানুষেরা ছুটে যেত মস্কো, লেনিনগ্রাদ ইত্যাদি বড় বড় শহরে। সেখান থেকে জামা, কাপড়, খাদ্য ইত্যাদি পণ্য কিনে নিজেরা বহন করে নিয়ে যেত স্ব স্ব শহরে বা গ্রামে, বিক্রি করে সামান্য কিছু লাভ যা হতো, তা দিয়ে কোনমতে বাঁচতো। তাদের বলা হতো ‘চেলনকি’। তাদের চাঁদা দিতে হতো রাস্তার রিকেটিয়ারদের।মেয়েদেরও অনেকে এই ‘চেলনকি’র কাজ করতো। সারা দেশব্যাপী দেহব্যবসা ধারণ করেছিল মহামারির আকৃতি। হঠাৎ নিঃস্ব হয়ে যাওয়া রুশ নারীর সম্মান নিয়ে তেজারতি করার সওদাগরেরা সারা বিশ্বে বসিয়েছিল মহা মুনাফার মেলা।

১৯৯১ সাল।

হোস্টেলের রুমে আধশোয়া হয়ে টিভি দেখছিলাম। টিভির আওয়াজ ছাড়িয়ে দরজায় মৃদু শব্দ । দেখি লিলি। লিলি ব্রিক বলে ডেকেছিলাম যাকে বহুদিন আগে। মার্থা পসাদনিৎসার গ্রামের লিলি গুসকভা। মার্থা মাথা নত করে নি। কিন্তু লিলি বদলে গিয়েছিল।

চেহারা ভাঙ্গা, দেহ লিকলিকে। যেন বিশাল ঝড় গেছে ওর উপর দিয়ে।

কিন্তু রূপ সে হারায় নি, রূপ তার তখনও কামনা জাগানো।

কতদিন পরে দেখা কিন্তু আমি ওকে ভুলি নি।

কম-দামি ওভারকোট গায়ে। দৃষ্টির আলো আগের মত উজ্জ্বল নয়, অনেকটাই স্তিমিত।

লিলি বলেছিল, “প্রায়ই লেনিনগ্রাদ আসি, কিন্তু কখনও সাহস হয় নি, ভেবেছি হয়তো চলে গিয়েছো, হয়তো আমাকে চিনবেই না। আজ কী যেন একটা ঘোরের মধ্যে মনে হল যাই, আছো কিনা দেখে আসি। তাই চলে এলাম।”

ওর হাসিতে আগের ঐশ্বর্য ছিল না। কী যেন একটা বিষণ্ণতা ছিল এতকাল পরে আমাকে খুঁজে পাওয়া আপাত সুখী মুখে। ওর ওভার কোট খুলে ঝুলিয়ে রাখি। আলিঙ্গনে আবদ্ধ হই।

বিস্ময় তখনও কাটে নি। কত কথা, কত স্মৃতি। পড়াশুনো শেষ করেছে। কোটি কোটি স্বপ্নভঙ্গ মানুষের মতই কাজ নেই। তবে কোন অভিযোগ করে নি বা সাহায্য চায় নি। অতি কাছের কোন মানুষকে বহুদিন পরে পেলে যেমন হয়, তেমনি উষ্ণ সন্ধ্যা। ওর চেয়ে আমারই উচ্ছ্বাস ছিল বেশি।

ও বলেছিল, মা মারা গেছে। এবং বুড়ো বাবা অসুস্থ ও পুরোপুরি এলকোহলে নিমজ্জিত।

কবিতার কল্পনার জগতে বিচরণ আর হয় না।

“বিয়ে করো নি ?”

প্রশ্নটা ছিল উভয়মুখি।

“সে অনেক কথা, আজ থাক। তোমার কথা শুনি।”

“তুমি কি অসুস্থ?”

চুপ করে ছিল, তারপরে বলেছিল, “না ভালো আছি। তুমি কেমন আছো, বল।”

আমার রান্না করা দেশী খাবার খেতে গিয়ে ওর মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। মুখে দেখা দিয়েছিল
বিন্দু বিন্দু ঘাম। খেয়েছে পাখির মত। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। উঠে দাঁড়িয়েছিল চলে যাবার জন্য
।জানালার বাইরে কনকনে শীতের বাতাসের রাত। গাছগুলো পত্রহীন দুলছিল শা শা শা তুষার ঝঞ্ঝায়। তুষার ঘুরছিল চক্রাকারে । বিপন্ন পথ ঘাট। বলেছিলাম, “এই ঝড়ের রাতে কই যাবে?”

“ট্রেনে চড়বো, সকালে পেত্রোজাভোদস্ক পৌঁছাবো।”

“এখন কোন বাস, কোন ট্রাম পাবে না”

তখন ট্যাক্সি ছিল সাধারণ মানুষের জন্য রাজার বাহনের মত।

আমার রুমমেট থাকতো না, ওর খালি বিছানা দেখিয়ে বলেছিলাম থেকে যেতে।

ও কথা বাড়ায় নি।

পেত্রোজাভোদস্কে সে আমাকে “লেভ অসানিনের” কবিতা পড়ে শুনিয়েছিল। বলেছিল ওর প্রিয় কবি। অসানিনের কবিতার একটি বই ছিল আমার কাছে। সেই বই বের করে বলেছিলাম পড়ে শোনাতে। আমার দিকে ও তাকিয়েছিল অদ্ভুত দৃষ্টিতে। কিন্তু হাতে তুলে নিয়েছিল বইটি।

“তুমি এখনও কবিতা-পাগল আছো? কবিতা পড়ার সেই দিন কি আর আছে?”

“কিছু পাগল চিরকালই পাগল থাকে, কিছু পাগল সুস্থ হয়ে সংসারি হয়।”

আমি সুস্থ হই নি।

বলেছিল, “কতকাল কবিতা পড়ি নি, জীবন এখন নিছকই গদ্যের।”

সুন্দর ছিল ওর কবিতা আবৃত্তির গলা এবং অভিব্যক্তির ঝংকার।

“আমার ভালোবাসা থেকে
কত ভার্স্ত, কত দিনের দূরত্ব ছিল
তোমার ভালোবাসার ?
তুষার ঝঞ্ঝায় ধরণী ও গগন একাকার
ছাইরঙা আকাশ ছুঁয়েছে গৌর নিহার,
বসুধার ঘরে আমি তোমাকেই খুঁজতে এসেছি
হিমানি-ঝঞ্ঝার কত পথ, কত অম্বর পার করে ।”

(লেভ অশানিন, ভালোবাসার গান)

অনেক রাতে ঘুমাতে গিয়েছিলাম।

আলো নিভানো ঘরের দুই বিছানায় দুই চাঁদনী চাকতি যৌবন, ঘুম আর আসছিল না।

ওকে ডেকেছিলাম আমার কাছে চলে আসতে এবং আশ্চর্য সে এসেছিল বাক্য হীন।

আমি পিড়াপিড়ি করেছিলাম প্রচুর।

সে রাজি হতে চায় নি, চেয়েছে শুধু আমার আলিঙ্গন, এর বেশি নয়।

শেষ পর্যন্ত আমরা অনম্বড় দুইটি লতার মত নিবিড়তায় জড়িয়ে ছিলাম, অকৈতব ও অস্খলিত।

যেন অচ্ছোদ সরোবরে অবগাহন। সমাপ্তির মাত্র ২ ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু সে প্রবেশের দ্বার উন্মোচন করে নি। দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে অচঞ্চল। শেষের অতি সামান্য পথটুকু অতিক্রম করতে দেয় নি। আমি খুব উত্তপ্ত ও উন্মুখ ছিলাম আগুনমুখো দেয়াশলাইয়ের কাঠির মত প্রজ্জ্বলিত হয়ে নিভে যাবার জন্য। তার অনিন্দ্য সুন্দরকে কাছে পাবার এক আগ্নেয়গিরি আকাংখা।

ওর কথাগুলো ছিল অবিশ্বাস্য অবাস্তব ও কবিতার মত। নারী পুরুষ অত কাছাকাছি পৌঁছে অমন সব
কথা বলে না বরং নিমজ্জিত থাকে অনুভূতির অবারণ পাঁপড়ি ছেড়ায়। কিন্তু মানুষের জীবন হচ্ছে অবাস্তব ও অঘটনীয় ঘটনার সমন্বয়।

ওর প্রতিটা কথা মনে আছে।

“থাক না ওই সামান্যটুকু বাকি। ইচ্ছেকে ডানা মেলতে দিলেই তো সব শেষ হয়ে যাবে।এই যে উন্মুখতা, এই যে চুম্বকের মত পরস্পরের সাথে লেগে থাকা তা তো মুহূর্তেই নিভে যাবে। তুমি পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। আমি জেগে থাকবো। মেয়েদের জ্বলে উঠতে সময় লাগে, জুড়াতেও।”

ওর মধ্যে যে কবি সত্ত্বা ছিল, তা যেন জেগে উঠেছিল পুরোপুরি।

“বরং আমরা দুজনেই জেগে থাকি সারা রাত। পাখি ডেকে ওঠা পর্যন্ত, ফুল ফোটা পর্যন্ত। যখন শিশির ঝরতে শুরু করবে, যখন পূবের আকাশ ফর্সা হয়ে আসবে শুধু তখনই শিথিল হোক আমাদের দেহের একাত্মতা। এই লতা-পাতার মত নিবিড় মিশে থাকা। তোমার বুকে আমার পিঠ, আমার বুকে তোমার হাত, মুঠি পূর্ণ করে। কোন ফাঁক নেই, চামড়ার সাথে চামড়া মিশে গেছে। পদ্ম এমন করে মুঠোতে পোরা যায় না, মুঠোতে পদ্মের দল ভেঙ্গে মলিন হয়ে যায়। কিন্তু আমি বুক দিয়ে তোমার মুঠো পূর্ণ করে দিয়েছি প্রবল আকর্ষণে। তোমার মুঠোপূর্ণ কোমলতায় ভাঙার কিছু নেই। তুমি কি জাগ্রত বুকের কাঠিন্য টের পাও ? আমার দেহের প্রতিটি কণায় যে জাগরণি কম্পন তার এন্টেনা বুকের ওইখানে। ওখানেই আছে আমার আকাংখার পরিমাপ, কতটুকু আমি তোমাকে চাই, গহীনের কতটা গভীর পর্যন্ত। তোমার শক্ত ও কঠিন হয়ে ওঠা পৌরুষ তো আমার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেই। আমরা দুজনেরই চেতনায় এখন মাদকের সুনামি।ভীষণ ভালো লাগছে। আমি কতকাল কল্পনায় তোমাকে এইভাবে কামনা করেছি। এই তো এখন প্রাপ্তি ও তৃপ্তির মাত্র কয়েক মুহূর্ত অদূরে সমাপ্তির চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। প্রাপ্তির ফোটা যেই ঝড়বে তখনই মৃত্যু হবে আকাংখার।

অথচ যতক্ষণ না শেষ হবে ততক্ষণই আমরা উন্মুখ থাকবো। সবটাই শেষ হয়ে যাক আমি চাই না, তুমি আমাকে চিরকাল মনে রাখবে এই অপ্রাপ্তির জন্য, চিরকাল।”

এর পরে সে উঠে, কাপড় পরে বাইরে গিয়েছিল। গিয়েছিল শতাব্দীর চেয়েও দীর্ঘ করিডোর হেঁটে মেয়েদের বাথরুমে। ফিরে এসে শুয়েছিল পাশের বিছানায়। মনে হয় না সে ঘুমাতে পেরেছিল। আমারও ঘুম হয় নি।

পরে বুঝেছিলাম সেই রাতে লিলির কোন মাথা গোঁজার ঠাই ছিলো না । সে ছিল গৃহহীন। কয়েক মাস পরেই লিলির মৃত্যু হয়েছিল ৮০র দশকে উদ্ভুত ভয়াল মহামারির মরণ-ব্যাধিতে।

ওর মৃত্যুর পরেই শুধু অনুধাবন করেছিলাম সেই রাতে ওর অতৃপ্তির আগুনের দেয়াল সৃষ্টির রহস্য। সে আমাকে তার মঙ্গল মাদুলি পরিয়ে সরিয়ে রেখেছিল মড়কের ছোবল থেকে। অতৃপ্তিই নারীকে পুরুষের, পুরুষকে নারীর বুকে বাঁচিয়ে রাখে।

সেও মরে নাই। যতদিন মানুষ মানুষকে মনে করে ততদিনই মানুষের আয়ু।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন