শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী'এর গল্প : প্রথম পারাজিক

বহু যুগ আগের কথা বলছি। মনে পড়েছে তোমার? মনে পড়ছে সেদিনের এমনই এক নিশীথ রাত্রির কথা? এমনই ফুলের ঘ্রাণে আমোদিত বাতাস। এক বসন্তের সন্ধ্যা ও এক তারা ভরা নিশীথের কথা? তখন তোমার নাম ছিল সুদিন্ন। তোমার দেহটি ছিল পুরুষের। তুমি ছিলে এক সুন্দর যুবক। তারপর কেটে গেছে হাজার হাজার বছর। এখন তুমি নারী দেহ প্রাপ্ত হয়েছ। আত্মার তো নির্দিষ্ট কোনও রূপ নেই। যখন যে দেহে থাকে তখন তার সেই রূপ। এখন যেন তোমার কী নাম? সেঁজুতি? তাইতো? সেঁজুতি কথার অর্থ জানো? সন্ধ্যা প্রদীপ। সেই মনোহর সন্ধ্যায় তোমার জীবনে নেমে এসেছিল হাহাকার। আজও তোমার সেই কৃতকর্ম ফল তোমার পিছু ছাড়েনি। তুমি মুক্তি পাওনি সুদিন্ন!

হ্যাঁ, আমি সেঁজুতি। এই শতাব্দীর বস্তুবাদী যুগের মানুষ, কিন্তু আপনি কে? কেনই বা আমার হাহাকার ভরা জীবনে ঢুকে পড়ছেন?

আমি সময়। তোমাকে মনে করিয়ে দিতে চাই তোমার পূর্বাপর। অনেক অনেক কাল আগে একটা ভয়ানক ভুল হয়ে গেছিল তোমার। 


নিস্তব্ধ রাত্রি। ঘরের ভেতরটা ছাতিম ফুলের তীব্র সুবাসে ভরে গেছে। অদ্ভুত মাদক এক গন্ধ। সেঁজুতি ঘর থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। বারান্দার রেলিঙে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকালো। আকাশে আজ অগণিত তারাদের ভীড়। সরু একফালি চাঁদ ছাতিম পাতার ফাঁক থেকে উঁকি দিচ্ছে। আজ সেঁজুতির যেন সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তিও অবশিষ্ট নেই। 

তার শরীরও আজ মনের সাথে বিকল হয়েছে। বারান্দার ঠিক সামনে রাস্তার উপরেই ঝাঁকড়া ছাতিম গাছটাতে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রস্ফুটিত সাদা ফুল, মেঘমুক্ত রাতের আকাশে উচ্চকিত করছে তাদের অস্তিত্ব। ফুলের গন্ধ ও বিকাশে এখন সমস্ত রাত্রি হয়ে উঠেছে মোহময়ী অপরূপা। তবু সুন্দর এই রাত্রি সেঁজুতির মনে এতটুকু শান্তি দিতে পারে না। সে নিশ্চিত আজকেও তার ঘুম আসবে না। সে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়, বিরক্ত হয় ছাতিমের ঘ্রাণে। সে একটা চেনা ফোন নম্বরে বার বার ডায়াল করে চলে। ফোন সুইচড্ অফ বলে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ স্বেচ্ছায় হারিয়ে গেছে জনারণ্যে, তাকে কি আর খুঁজে পাবে সে? সেঁজুতি ভাবতে থাকে।


(২) 

হঠাৎ সেঁজুতির সামনে থেকে মায়িক জগতটা অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকে আর কিছু চিত্ররূপ ধরা পড়ে তার মানসপটে। সে পৌঁছে যায় বৈশালীর কলন্দক গ্রামে। কলন্দক এক ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত গ্রাম। কলন্দক শব্দের অর্থ হলো কাঠবিড়ালী। শোনা যায় এই গ্রামের অধিবাসীরা তাদের পুজোর নৈবেদ্য প্রথমে কাঠবিড়ালীদের খাওয়াত, সেই কারণে গ্রামের নাম হয় কলন্দক। তারা পাঁচ যুবক রওনা হয়েছিল বৈশালী নগরের দিকে। 

এ আজকের কথা নয়। এ দৃশ্য বহু বহু প্রাচীন। ইতিহাস পড়ে বলেই সে বিশদে জানে, প্রাচীন যুগে বৈশালী ও মগধ ভারতবর্ষের ষোলো জনপদের মধ্যে অন্যতম দুটি সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে সেখানে বুদ্ধ তার ধর্মমত প্রচার করেছিলেন। বিশেষতঃ বুদ্ধের বোধিলাভ থেকে নির্বাণলাভ পর্যন্ত ব্যাপ্ত সময়কালটা তিনি এই সন্নিহিত জনপদগুলিতেই কাটিয়েছিলেন। কয়েকদিন ধরে সেঁজুতি একা হলেই এমন অদ্ভুত কিছু দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে। কী এর কারণ সে জানে না। জানে না সুদিন্ন কে? বহু যুগের ওপার থেকে কেন তার জীবনে তিনি এসে দাঁড়াচ্ছেন? তাকে ছেড়ে নীলাদ্রির এমনভাবে হঠাৎ চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সেঁজুতি। সে কি তবে, মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে? বাস্তবকে পেছনে ফেলে নিজের ভেতরে গড়ে তুলতে চাইছে পরাবাস্তব এক জগত? তাই কি সে এমন দৃশ্য দেখছে? এ কি তার ভেতরের সুপ্ত অবসাদেরই বহিঃপ্রকাশ? 

বৈশালীর মহাবন কুটাগারশালা মহাবিহার। সদ্য অস্ত গেছে দিনমণি। সন্ধ্যার পূর্বকাল। সেঁজুতি শুনতে পেল হাজার হাজার শ্রমণদের সান্ধ্য বন্দনা। 

"বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি। ধর্মং শরণং গচ্ছামি। সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি।" 

এমনকী সে দেখতে পেল অমিতাভ বুদ্ধকে! আলোকোজ্জ্বল মুখখানি তাঁর ক্ষমা ও প্রেমে পরিপূর্ণ। দীর্ঘদেহী ও সুঠাম তিনি। পরনে তাঁর একখানি মলিন ও অনুজ্জ্বল চীবর। যা স্থানে স্থানে ভাঁজ যুক্ত ও জীর্ণ। যে বয়সের বুদ্ধকে সে দেখতে পেয়েছে, তা আন্দাজ মধ্য চল্লিশ হলেও তাঁর অঙ্গে তারুণ্যের লাবণ্য পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। আর সেই সঙ্গে এক প্রবল ব্যক্তিত্ব যা সমগ্র পৃথিবী শাসণ করতে সক্ষম। তাঁর দৃঢ় চোয়াল ও উন্নত নাসা এবং তাঁর গায়ের রঙ পীতাভ। সেঁজুতি বৌদ্ধ সাহিত্যে পড়েছিল বুদ্ধের গায়ের রঙ ছিল তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ। হয়তো বাহ্যিক শরীরের প্রতি প্রবল ঔদাসিন্য, অযত্ন এবং দিবাভাগের রৌদ্রে উন্মুক্ত স্থানে থাকার জন্য, তাঁর গাত্রবর্ণ কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে গেছিল। তবে তাঁর দুটি অনুপম চোখ সেঁজুতি কখনও ভুলতে পারবে না। সুগত বুদ্ধ একটি পাথরের চাতালে বসেছিলেন। তাঁর পাশে একটি কষ্টি পাথরের ভিক্ষা পাত্র ও একটি ছোট ঝোলা। 

ভক্তরা দলে দলে এসে তাঁকে প্রণাম করে যাচ্ছেন। বড় সুন্দর বিকেলের এই মুহুর্ত। সঙ্ঘের দীপাধারগুলিতে কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্বলে উঠবে প্রদীপ। বহিরাগতরা বিদায় নিচ্ছে ক্রমশঃ। সান্ধ্য বন্দনার পরবর্তী সময় হলো শ্রমণদের বিদ্যাচর্চা এবং ধ্যানচর্চার সময়। অন্ধকারে মহাবনের রাস্তা বিপদসঙ্কুল হতে পারে। হিংস্র জীবজন্তুর ভয় আছে। আছে দস্যু তস্করদের ভয়ও। দ্রুত বিদায় নিচ্ছে তাই সমাগত জনতা। একটু দূরে জনতার ভীড় বাঁচিয়ে বসেছিল এক যুবক। যুবকটিকে ওর সঙ্গীরা ইশারায় তাদের কাছে ডাকলো। সঙ্ঘে আগত ভক্তদের বুদ্ধ'র উপস্থিতিতে নিজেদের মধ্যে কথা বলা নিষিদ্ধ। সর্বদর্শী বুদ্ধ গোলোযোগ একেবারে সহ্য করতে পারেন না। 

এই নিয়ম শ্রমণরা নিষ্ঠা সহকারে সঙ্ঘের অভ্যন্তরে সব সময় মেনে চলেন। সুদিন্নর সঙ্গীরা হলেন -ভদ্রক, বিশাখ, সৌপর্ণ ও প্রিয়ঙ্গ এই চারজন যুবকেরা সবাই সুদিন্নর সমবয়স্ক ও সকলেই কলন্দক গ্রামেরই অধিবাসী। দূরে বসে থাকা যুবকটির নামই সুদিন্ন। সুদিন্ন কলন্দক গ্রামের এক ধনাঢ্য শ্রেষ্ঠির একমাত্র সন্তান। বছর খানেক আগে তার বিয়ে হয়েছে। তার স্ত্রী সকুলা রাজগৃহের এক সম্ভ্রান্ত বংশীয় শ্রেষ্ঠির কন্যা এবং অপরূপ সুন্দরী। সুদিন্নর বন্ধুদের মধ্যে সৌপর্ণেরও মাস দুয়েক হয়েছে বিয়ে হয়েছে। 

আজ বৈশালীনগরের এক বস্ত্রব্যবসায়ী শ্রেষ্ঠির কাছ থেকে সে কাশীর সূক্ষ বস্ত্র কিনে নিয়ে যাবে তার নব পরিনীতা বধূর জন্য। আরও একটি কারণে তারা সবাই এসেছে বৈশালী। বৈশালীর গণ নাট্যশালায় বিখ্যাত নট ও নটীদের সমাবেশ হবে আজ রাতে। সেখানে সারা রাত ধরে চলবে নট ও নটীদের অপরূপ শিল্প প্রদর্শণ। সন্ধ্যের আগে সেখানে পৌঁছাতে পারলে সামনের দিকে আসন পাওয়া সম্ভব হতো। সুদিন্ন আসতে দেরী করায় তার সঙ্গীরা ক্রমশঃ অস্থির হয়ে উঠতে থাকে। 

আজ সকালে সুদিন্ন তার বন্ধুদের সঙ্গে বৈশালী নগরে এসেছিল। সারাদিন পথশ্রমে তারা বেশ ক্লান্ত হয়ে গঙ্গার কাছে এসে স্নান করতে নদীতে নামে। তখন সে দেখতে পায় কয়েকজন শাক্য শ্রমণদের। কী অপূর্ব শান্তি ও প্রজ্ঞা তাদের চোখে মুখে। তারা স্নানের ঘাটে অল্পবয়স্ক কয়েকটি কিশোরকে আশ্রমের অধিবাসী হওয়ার জন্য প্রস্তুত করছিলেন। 

-এসো, ভয় নেই। আমি তোমার পাশেই থাকবো। ক্ষুর তোমার মাথায় কোনো আঘাত করবে না।

একটু দূরে কয়েকজন শ্রমণ কয়েকটি বালকের মাথা ন্যাড়া করছিলেন। তার আগে অন্য কয়েকজন নদীর বালি-মাটি ও গোবর দিয়ে অতি যত্নে তাদের চুল ধুইয়ে জলে নামিয়ে গায়ের ময়লা হাত দিয়ে ঘষে ধুয়ে দিচ্ছিলেন। সুদিন্ন তাদের মুখে এক অপূর্ব কান্তি দেখেছিল। তারা বলছিলেন,

-স্নান করে পবিত্র হয়ে আজ মানব জীবনের পরমপদ, বুদ্ধের আশ্রয় লাভ করবে তোমরা। এই কাষায় বস্ত্র পরিধান করে নতুন জীবনের পথে এগিয়ে চলো। 

তাদের পেছনে কৌতূহলী হয়ে সুদিন্ন এগিয়ে যায়, আর পৌঁছায় বৈশালীর কুটাগারশালা মহাবিহারে। শাক্যপুত্র শ্রমণদের সম্পর্কে কত নিন্দা এতদিন তার কানে এসেছিল। 

তারা কথার জাদু বিস্তার করে নাকি তরুণদের তাদের দলে টেনে নেয়। তারপর তাদের মাথা মুড়িয়ে শ্রমণ করে তোলে। শুনেছে বুদ্ধের কথাও। তার ঋদ্ধির কথা কানে এসেছে সুদিন্নর। নিশ্চয় তিনি অলৌকিক বিভূতি ও উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষ হবেন। যদি তা না হতো, তবে মগধ, কোশল, বজ্জী সব দেশের রাজারা তাঁকে এত মানতেন না বা সমীহ করতেন না। 

রাজারা তো শুধু চোখে দেখেন না , কানেও দেখেন। সমস্ত রাজ্য জুড়ে তাদের গুপ্তচর বাহিনী সক্রিয় থাকে সদা সর্বদা। বুদ্ধ এখানে আছেন, সে কথা সে সকালে শ্রমণদের মুখে জানতে পেরে উপস্থিত হয়েছে মহাবনে। বুদ্ধকে আজ সে একবার দর্শন করতে চায়। বন্ধুদের ইচ্ছা না থাকলেও তারা সুদিন্নর উৎসাহে আসতে বাধ্য হয়েছে। বৈশালীর রাজ পরিবার বুদ্ধ ও ভিক্ষু সংঘের খাদ্য ও ভেষজ সরবরাহের দায়িত্ব নিয়েছে। 

মগধ, কোশল দুই রাজ্য থেকেই ব্রাহ্মণগণ ও লিচ্ছবী গণপারিষদের শীর্ষস্থানীয় কিছু কর্তা ব্যক্তি এসেছেন বুদ্ধের সঙ্গে বাক্যালাপ করতে। ফুল, খাদ্য, গন্ধদ্রব্য, ঘি, মধু, বিবিধ উপকরণ নিয়ে দূর দূরান্ত থেকে আসছে উপাসকরা, শ্রমণরা আর আসছেন অগণিত সাধারণ মানুষ। তারা বুদ্ধকে একবার চোখে দেখে ধন্য হতে চান। বিহারের ছায়ায় আসন পাতা হয়েছে। ধ্যান সমাপ্ত করে পূজ্য শাক্যপুত্র গৌতমবুদ্ধ এসে তার আসনে বসবেন। বুদ্ধের সাহায্যকারী সেবক ও উপস্থাপক সিংহ সমাগত অতিথিদের অপেক্ষা করতে বললেন। মধ্যাহ্ন ভোজনের পর সামান্য সময় বিরতি নিয়েছেন বুদ্ধ। তিনি আসা মাত্রই প্রশ্নোত্তরপর্ব শুরু হলো। সুগত বুদ্ধ সমাগত ভক্তদের প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলেন। সুদিন্নও আজ বুদ্ধকে দেখে ধন্য হলো। কী যেন এক অপূর্ব সন্মোহ আছে মানুষটার মধ্যে। মুহুর্তে নিজেকে সমর্পণ করতে মন চায়। 


(৩)

নিলাদ্রি আর সেঁজুতি। ওদের মাত্র এক বছর কয়েক মাস হলো বিয়ে হয়েছে। নিলাদ্রি একটা বিদেশি ওষুধ কোম্পানীতে চাকরি করে। অফিসে তার প্রবল চাপ। এক একদিন রাত হয়ে যায় তার বাড়ি ফিরতে। সেঁজুতির রাগ ভাঙাতে সেদিন ফুল নিয়ে বাড়ি ফেরে সে। সেঁজুতির ফুল খুব প্রিয়। বিশেষ করে সাদা আর সুগন্ধী ফুল। ফুল দেখলেই রাগ ভুলে খুশিতে মুহুর্তে উজ্জ্বল সে। সেলসের পোড় খাওয়া চাকুরে নিলাদ্রি মানুষের মন ভোলাতে ওস্তাদ। সেঁজুতিকে পড়ে ফেলেছে সে। 

সেঁজুতি আধা মফস্বল শহরের এক সরকারী হাসপাতালের নার্স। ডিউটির চাপ সামলে রোজ নির্দিষ্ট সময়ে সে ফিরে আসে, তার সরকারী আবাসনে। তার আবাসনটির অবস্থান ঠিক হাসপাতালের পিছনেই। সারাদিন তার গতে বাঁধা একঘেয়ে জীবন। হাসপাতালের রুটিন ডিউটি করা আর বাড়ি ফিরে এসে ঘরের কাজ করা। মাঝে মাঝে এক আধটু বই পত্র পড়ে সেঁজুতি। তার প্রিয় বিষয় হলো ইতিহাস। বিয়ের পর থেকে নিলাদ্রীই তার সমস্ত অন্তঃস্থল জুড়ে বিরাজ করে। বাড়ি ফিরেই সে নিলাদ্রীকে কাছে চায়, আর সারা সন্ধ্যা ধরে অপেক্ষা করে নিলাদ্রির। এই শহরে ওর জানাশোনা কেউ নেই। 

সহকর্মীদের সঙ্গে এখনও তেমন আলাপ জমেনি। সেঁজুতির এখানে কোনো বন্ধুও নেই। তার আবাসনের সামনে একটা একলা ছাতিম গাছ বাড়িতে সেঁজুতির সঙ্গী। চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় সে। ছাতিম গাছের পাতাগুলো চাঁদের আলোয় দেওয়ালে আলো ছায়ার খেলা চালাতে থাকে। ঘরের কোনো কাজে মন লাগে না সেঁজুতির। 

কখন আসবে নিলাদ্রি? তার ভেতরে দম বন্ধ কষ্টরা মাথা কোটে। সে ভাবে নিলাদ্রি এসে ডাইনিং এর চেয়ারে বসলেই সে রাতের রান্না শুরু করবে। কথা বলতে বলতেই সব্জী কাটবে, চাল ধোবে, ভাত বসাবে। অনেক অনেক কথা বলবে সে। সারাদিন কত ঝামেলা গেছে ডিউটিতে কিংবা তার সঙ্গে কোন পেশেন্ট পার্টি আজ মিসবিহেভ করেছে সব। ঘড়ি দেখে সময় পেরিয়ে গেলেই, ফোন করে সে। কিছুক্ষণ পরে পরেই করে। অধৈর্য্য লাগে ওর ভেতরে ভেতরে। নিলাদ্রি কেন এখনও আসছে না? এত দেরি তো হয়না! তবে? অবশেষে বারান্দা ছেড়ে শোবার ঘরের বিছানায় আশ্রয় নেয় সেঁজুতি। স্মার্ট ঝকঝকে একমুঠো রোদের মতো তার স্বামী। সুঠাম এবং সুদর্শণ। ঈশ্বরের অনেক করুণায় এমন স্বামী পেয়েছে সে। ওর মতো উত্তাল ভালোবাসতে কেউ পারে না। আবার তেমনি রোম্যান্টিক। এখনও যখন আসছে না এর যোগ্য শাস্তি ওকে দেবে সেঁজুতি। আজ বিছানা ছেড়ে উঠবে না সে। রান্নাও করবে না, কথাও বলবে না ঠিক করে নেয় সে। তারপর ছদ্ম ঘুমের ভান করে বিছানায় শুয়ে বালিশে নিজের মুখ গুঁজে রাখে। মনে মনে কল্পিত দৃশ্য ও সংলাপ সাজাতে থাকে সে। নীলাদ্রি এসে বলবে,

কী হয়েছে তোমার? এমন করে শুয়ে আছ যে? শরীর খারাপ?

উত্তর নেই।

রাগ করেছ? সরি। ভেরি সরি। আচ্ছা কান ধরছি আমি।

উত্তর নেই।

ফুল এনেছি। তোমার প্রিয় জুঁই ফুল। হোটেল থেকে খাবারও এনেছি। ভেজ পোলাউ আর পনির। তুমি যা যা ভালোবাসো। প্লিজ উঠে পড়ো।

উত্তর নেই।

এরপর নিলাদ্রি অভদ্র হয়ে উঠবে। জোর করে তাকে কোলে তুলে, ডাইনিং এ নিয়ে যাবে আর খুব খুব আদর করবে। এতকিছু ঘটার পর এবার সেঁজুতি চোখ খুলবে এবং সে আদরের প্রত্যুত্তর দেবে আর তার রাগ ভেঙে যাবে। তারপর সারা রাত জুড়ে তারা দুজনে দুজনকে অনেক অনেক ভালোবাসবে।

রাত হয়েছে। ট্রেন থেকে নেমে তাড়াতাড়ি ওভার ব্রীজের দিকে ছোটে নিলাদ্রি। আজকেও সেঁজুতি বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল। কাজের সময় ফোন এলে সমস্যা হয়, সেঁজুতি তা কিছুতেই বুঝতে চায়না। কয়েকদিন ধরে তাই সে নিজের ফোনটাকে 'ডু নট ডিসটার্ব' মোডে রেখে দিচ্ছে। আজকে বেশ কয়েকটা মিট ছিল। তারপর ইয়ার এন্ডিং চলছে। অফিসে নানারকম চাপ। এত চাপ যে এক একসময় তার মনে হয় যে সে চাকরিই ছেড়ে দেবে। 

সেঁজুতি শুধু অভিমান করে, কিছুতেই কিছু শুনতে চায় না। এইজন্য নানারকম কৌশল করে আজকাল সে। তার অশান্তি একদম ভালোলাগে না। এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের গায়ে দু-একটা ফুলের দোকান। 'আজ কী ফুল আছে মাসি?' বলে একপলক সেখানে দাঁড়ায় সে। একটু রাত হয়ে গেছে। ফুলের ঝুড়িতে কয়েকটা জবা আর গাঁদার মালা পড়ে আছে। দ্রুত চোখ চালিয়ে নিল নিলাদ্রি। এই রে, এতো পুজোর ফুল! যাঃ কী হবে এবার? এই ফুল দিয়ে তো তার বাড়ির দেবীর পুজো হবে না! আজকে একেবারে নিরস্ত্র হয়ে সেঁজুতির মোকাবিলা করতে হবে! সর্বনাশ! 

মাঝে মাঝে নিলাদ্রির মনে হয়, সেঁজুতির এই মফস্বলে বদলি হওয়া সম্পূর্ণ পরিকল্পনা মাফিক। কেবল নিলাদ্রিকে একা পেতে চায় সে। তাই কলকাতার মেডিক্যাল কলেজ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন মফস্বলের হাসপাতালে বদলি হয়ে চলে এসেছে সেঁজুতি। তা না হলে একবারও কলকাতায় তাদের বাড়িতে, মায়ের কাছে যেতে চায় না কেন? নিলাদ্রি ওর এখনকার বাসস্থান হাসপাতালের এই আবাসনে এতটুকু শান্তি পায় না। তার টালাপার্কের পাড়ার আড্ডাটা বড় মনে পড়ে। 

সারাদিন কাজ করে বাড়ি ফিরে মায়ের মুখটা একবার দেখতে ইচ্ছা করে। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা খুব নিঃসঙ্গ হয়ে গেছেন, তাদের টালা পার্কের বাড়িতে। সেঁজুতির অনিচ্ছায় মাকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে পারেনি নিলাদ্রি। তার শুধু মনে হয় প্রত্যেকটা মানুষ তার বার্ধক্যে কী ভীষণ অসহায়। শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর। এই জরা, ব্যাধি আর মৃত্যু যন্ত্রণা একদিন একজন শাক্যবংশীয় রাজপুত্রকে বাধ্য করেছিল সর্বস্ব ত্যাগ করতে। 

নিলাদ্রি বাড়ি থাকলে সেঁজুতি কোনও কাজ করতে চায় না। সারাক্ষণ কথা বলতে চায় আর কথায় কথায় অভিমান তার। নিলাদ্রির কেমন ভয় করে তখন। ওভার ব্রীজের সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পায়ে খুব জোড়ে হোঁচট খায় সে। রাত প্রায় দশটা। স্টেশান চত্বর প্রায় ফাঁকা। রিক্সার জন্য অপেক্ষা না করে, সে হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতে সে বুঝতে পারে তার প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। এখন এক কাপ চা বিস্কুট খেলেও অনেকক্ষণ চলে যাবে। কিন্তু তাতে আরও খানিকটা দেরি হয়ে যাবে। নিলাদ্রির দাঁড়াতে আর সাহস হয় না।

স্টেশান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার তাদের বাসস্থান। অতটা পথ এক নিঃশ্বাসে হেঁটে অবশেষে সে তাদের সরকারী আবাসনের গেটে এসে পৌঁছায়। কয়েকটা কুকুর নির্জন গলিপথে ডেকে ওঠে। নিলাদ্রির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সঙ্কেত দেয়, আজ তার কপালে দুঃখ আছে। সে দরজায় বেল বাজায়। বেল বেজেই চলে, ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। সেঁজুতি কি এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে? পকেট থেকে ফোন বের করে ডায়াল করে নিলাদ্রি। ফোন সুইচড্ অফ। সে কী করবে বুঝতে পারে না। বড় অসহায় লাগে তার। 

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর তার মনে হয় বারান্দা বেয়েই উপরে উঠবে। তিনতলায় বেয়ে ওঠা কঠিন হলেও একেবারে অসম্ভব নয়। আবাসনের চওড়া ছড়ানো কার্নিস বেয়ে ওঠা যাবে। নিলাদ্রির শরীর নিয়মিত যোগাসন করায় বেশ শক্তপোক্ত। সে জানে সেঁজুতি সাধারণতঃ সারাদিন বারান্দার দরজা বন্ধ করে না। পরিশ্রমে শরীর ক্লান্তিতে অবসন্ন লাগলেও সে এছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পায় না। সাবধানে কার্নিস বেয়ে উপরে উঠতে থাকে নিলাদ্রি। সানশেডের গায়ে ঘষা লেগে হাতে চোট পায় সে। ছাল উঠে গেছে। হাত জ্বালা করা অগ্রাহ্য করে সে বারান্দার রেলিং টপকায়। বারান্দার দরজা বন্ধ নয়। রাত প্রায় বারোটা, সে খোলা দরজা দিয়ে চোরের মতো নিজের শোবার ঘরে ঢোকে। ঢুকেই সে সবিস্ময়ে দেখে সেঁজুতি জেগে আছে। তাকে সামনে আসতে দেখে সেঁজুতি ঘুমের ভান করছে সেটাও বুঝতে পারে নিলাদ্রি। সে এসে সেঁজুতির কপালে হাত রাখে। 

কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ?

সেঁজুতি হঠাৎ প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে। মাঝরাতে সেঁজুতির অতি নাটকীয় আচরণ অসহ্য মনে হয় নিলাদ্রির। দরজা না খোলার কারণ জানতে চাইলে আরও ঝামেলা বাড়বে মনে করে সে কিছু জানতে চায় না। এখন তার দরকার সামান্য একটু খাবার আর ঘুম। নিলাদ্রি রান্নাঘরে ঢোকে। ক্লান্তভাবে প্রেশার কুকারে চাল ডাল ধুয়ে বসায়। কাল সকালে আবার তাকে অফিস যেতে হবে। 


(৪)

সাক্ষাৎপ্রার্থীরা বুদ্ধকে অভিবাদন জানিয়ে নিজের নিজের আসন গ্রহন করলেন। বৈশালী গণপরিষদের এক কর্তাব্যক্তি প্রথম প্রশ্ন শুরু করলেন। তার নাম মহালি। 

ভন্তে, আমি লিচ্ছবি বংশীয় একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে চিনি। তার নাম সুনক্ষত্ত। তিনি আপনার সন্নিধানে প্রায় তিনবছর যাবৎ বাস করছেন এবং একজন শ্রমণ। তাঁর কাছে সাধন লব্ধ উপলব্ধি কেমন তা জানতে চাওয়া হলে তিনি আমাকে জানিয়েছেন তিনি সাধনার সময় শুধুমাত্র বাসনা তৃপ্তিকর, মনোহর নানা প্রকার দিব্যরূপ দেখতে পান। কোনো দিব্য শব্দ তিনি শুনতে পান না। আমার প্রশ্ন হলো, মনোমুগ্ধকর এমন কোনো দিব্য শব্দের কি সত্যি অস্তিত্ব আছে? নাকি অস্তিত্ব থাকতেও তিনি শুনতে পাননি? বুদ্ধ উত্তরে বললেন, 

বাসনা তৃপ্তিকর মনোমুগ্ধকর দিব্য শব্দের অস্তিত্ব থাকা সত্বেও সুনক্ষত্ত শুনতে পায়নি। 

কিন্তু এর কারণ কী মহামান্য?

এর কারণ সাধনকালে সবাই একই সময়ে একই ফল লাভ করে না। সাধন অভ্যাস এবং পূর্বজন্মের সংস্কারের পার্থক্যের জন্য প্রত্যেকের ফল একরকম হয় না। তবে ভিক্ষুর লক্ষ্য শুধুমাত্র দিব্য দর্শণ ও শ্রবণ নয়। এই ধর্ম উৎকৃষ্ট ও মহৎ। অষ্টাঙ্গিক মার্গের মাধ্যমে বাসনার ক্ষয় ও নির্বাণ বা মুক্তিলাভই হলো এই ধর্ম পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য। 

অষ্টাঙ্গিক মার্গ কী প্রভু?

একে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ বলে। যেমন – সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্মান্ত, সম্যক আজীব, সম্যক ব্যায়াম, সম্যক স্মৃতি, এবং সম্যক সমাধি। এই হলো অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এর যথার্থ ফল পেতে অর্থাৎ উৎকৃষ্ট ফল পেতে এই ধর্মাচার পালনের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্ঘে থেকে ব্রহ্মচর্য্য পালন করা প্রয়োজন। কৌশাম্বিতে পরিব্রাজক মন্ডিষ্য আর দারুপত্রিকের শিষ্য জালিয় এর আগে আমার কাছে একইভাবে ভিক্ষুর লক্ষ্য কী তা জানতে চেয়েছিল। 

এরপর বুদ্ধ আরও অনেকের প্রশ্নের উত্তর দিলেন। তার কথাগুলো সুদিন্নর মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করলো। তার মনের ভেতর উদয় হলো ভিক্ষু হবার তীব্র বাসনা। সব কথা তার কানে ঢুকলো না। কেবল মনে হতে লাগলো, তাকে সঙ্ঘে থেকে ব্রহ্মচর্য পালন করতে হবে। এরজন্য তাকে উপসম্পদা নিতে হবে। তার মনে এক আশ্চর্য উন্মাদনা জেগে উঠলো। এতদিন সে ধর্ম বিষয়ে অনাগ্রহী ছিল। বাড়িতে তাদের প্রতিষ্ঠিত যজ্ঞবেদী আছে। তবে যাগ যজ্ঞ, পুজোর উপকরণ বা ব্রাহ্মণদের তার ভালো লাগেনি। এতদিন সে ব্রাহ্মণদের যতবার নিজের বাড়িতে দেখেছিল ততবার তার তাদের দেখে বিশেষ শ্রদ্ধার ভাব জাগেনি। তবে আজ এ কী পরিবর্তন এল তার মনে? সুদিন্নর নিজেকেই কেমন অচেনা মনে হয়।

সুদিন্ন অবাক ও নিষ্পন্দ হয়ে বসে ভাবতে থাকে, এক ভিক্ষুর লক্ষ্য সম্পর্কে। সেও চায় সম্পূর্ণ মার্গ ফল। এক্ষুণি বুদ্ধ বললেন, শ্রেষ্ঠ মার্গ ফল পেতে হলে দরকার ব্রহ্মচর্য্য পালন। তাহলেই সম্ভব সাধনলব্ধ অলৌকিক ক্ষমতা লাভ। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো যে, সে প্রব্রজ্যা নেবে। 

ধীরে ধীরে চরাচর জুড়ে সন্ধ্যা নামলো। সুদিন্ন এখনও তার জায়গায় বসে আছে। তার সহচররা অধৈর্য্য হয়ে বিহারের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। বুদ্ধ অবশেষে উঠে দাঁড়ালেন। একটা পাথরের চাতালে তাঁর জন্য আসন পাতা হয়েছিল। তিনি দাঁড়াতে তাঁর সহায়ক সিংহ তাঁর বসবার আসনটি হাতে নিয়ে তাঁর পিছনে চলতে শুরু করলেন। সুদিন্ন বুদ্ধের যাত্রাপথে এসে দাঁড়ালো। সে দূর থেকে বুদ্ধের উদ্দেশ্যে মাটিতে মাথা ঠেকালো। বুদ্ধ স্মিত হাসলেন। বললেন, 

-রাত্রি সমাগত। গৃহে ফিরে যাও। তোমার সঙ্গে সঙ্গী কেউ নেই? নগর এখান থেকে খানিকটা দূরে। একাকী পথ বিপদসঙ্কুল।

আমার সঙ্গীরা বাইরে অপেক্ষা করছে। কিন্তু আমি আর তাদের সঙ্গে আমার ঘরে ফিরতে চাই না। আমি প্রব্রজিত হতে চাই। সংসারের সমস্ত আকর্ষণ আমি হারিয়েছি। দয়া করে আমার প্রার্থনা মঞ্জুর করুন।

তুমি কি বিবাহিত? তোমার পরিবারে কে কে আছেন?

আমি বিবাহিত। এখনও নিঃসন্তান। আমার বাড়িতে বাবা মা আছেন। আমি তাদের একমাত্র সন্তান।

প্রব্রজ্যা নিতে হলে তবে তোমাকে, তোমার পরিবারের ও আত্মীয়বর্গের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। নাগরিক থেকে অনাগরিক হিসেবে প্রব্রজ্যা নিতে হলে এই অনুমতির প্রয়োজন। এই নিয়মটি এখন সঙ্ঘে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া সন্ন্যাস নেবার আগে নিজের মনও বিশেষরূপে যাচাই করে নেবার প্রয়োজন। ভালো করে ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষণিক উত্তেজনার বস্তু নয়।

নিজের মন আমি যাচাই করে নিয়েছি মহামান্য। সংসার সুখ আমি আর চাই না। আপনার বাক্য সমূহ আমার জীবনের গতি সহসা পরিবর্তন করে দিয়েছে। এতদিন আমি যেন অন্ধকার এক মোহের জগতে বাস করতাম। আজ আমার সামনে আলোকিত দীপাধার নিয়ে আপনি উপস্থিত হলেন। আজই আমি গৃহে ফিরে যাবার ব্যবস্থা করছি। তবে সবার অনুমতি নিয়ে খুব শীঘ্রই আবার আপনার সম্মুখীন হব। 

সুদিন্ন ঘরে ফিরে এসেছে। ঘরে ফেরা পর্যন্ত কারুর সঙ্গে কথা বলেনি। তার স্ত্রী সকুলা তাকে ডেকে ডেকে ফিরে গেছে। সে ফিরে আসার পর থেকে তার শয়ন কক্ষে আর প্রবেশ করেনি। সুদিন্ন ঘরে ফেরার পর থেকে কোনো খাদ্য পর্যন্ত গ্রহন করেনি। অমঙ্গল আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে ওঠেন তার পিতা মাতা। সুদিন্নর মা সুদিন্নকে বললেন,

বাছা কঠিন খাদ্য কেন ফিরিয়ে দিচ্ছ? আমাদের কী দোষ বলো! তুমি কি মনে কোনো কারণে ব্যথা পেয়েছ? 

না, মা আমি তোমাদের একটা কথা বলতে চাই। আমি আর সংসারে থাকতে চাই না। সংসার ছেড়ে আমি শাক্যমুণির সঙ্ঘে প্রব্রজ্যা নিয়ে থাকতে চাই। কাল আমি মহাবনে ভগবান বুদ্ধকে দেখে এসেছি। তিনি আমাকে তোমাদের অনুমতি থাকলে, তবেই প্রব্রজ্যা দেবেন বলেছেন।

হায় হায় এ কী বলছো বাছা! তুমি যে আমাদের একমাত্র সন্তান। এই সেদিন কত আশা করে তোমার বিয়ে দিলাম। এখনও বছরও পার হয়নি। তুমি এ চিন্তা ত্যাগ করো।

সুদিন্ন পরিবারের কারুর কথা শুনলো না। সকুলার সঙ্গে আর কথাই বললো না। মন আকৃষ্ট হবে মনে করে তার দিকে তাকিয়েও দেখলো না। কিছুতেই বাড়ির লোকের অনুমতি না পাওয়ায় সুদিন্ন অনশন শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত ছেলের জেদের কাছে তার মা বাবা হার মানলেন। তারা নিতান্ত দুঃখে সম্মতি দিলেন। সুদিন্ন যাবার আগে সকুলার কাছে একবার এল। অদ্ভুত প্রশান্ত তার মুখ। সে বললো, 

চললাম। শুধুমাত্র এই একটি শব্দ।

সকুলার ভেতরটা ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছিল। সে তবু নিজেকে বেঁধে রাখলো। সে জানে জগতে মেয়েদের চাওয়ার কোনো দাম নেই। সেই মুহূর্তে তারও স্বামীর সঙ্গে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছিল। ঘরের দমবন্ধ পরিবেশ ছেড়ে তারও প্রব্রজ্যা নিতে মন চাইছিল। সকুলা দেখেছে, দলবদ্ধভাবে ভিক্ষুণীরা কী সুন্দর দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। অরণ্য, গিরি গুহা সর্বত্র তারা বিচরণ করতে পারে। তার কি কোনোদিন তেমন সৌভাগ্য হবে? নাকি আজীবন শ্বশুর, শাশুড়ির সেবা আর পাকশালায় যবাগু রান্না করেই দিনগুলো কেটে যাবে তার? 

সে অন্যমনস্ক হয়ে চেয়ে রইলো সুদিন্নর দিকে। নিজের দুর্ভাগ্য বা সুদিন্নর চলে যাওয়ার জন্য, নাকি এ দুটির জন্যই তার চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে এলো। তারপর দূর থেকে সে মাটিতে প্রণাম করলো। সুদিন্ন চলে গেল। সকুলার চোখের জল বা নীরব প্রণাম দুটোই তার চোখে পড়ল না। কারণ সে তার মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রেখেছিল। সকুলা দেখতে পেল দূরে সরে যেতে যেতে একসময় সুদিন্ন সম্পূর্ণ চোখের আড়ালে চলে গেল। ঘরের ভেতর থেকে শুধু ভেসে আসছিল সুদিন্নর মায়ের তীব্র আর্ত চিৎকার। হঠাৎ সকুলার বুকের ভেতরটা বড় ফাঁকা মনে হলো। 

(৫) 

তাকে শেষ পর্যন্ত থানায় টেনে আনবে সেঁজুতি, এতটা নিলাদ্রি ভাবতেই পারেনি। দোষের মধ্যে সে মায়ের কাছে গিয়ে থেকেছে। মায়ের অসুখটা আবার বেড়েছে। মাকে হসপিটালে পাঠিয়ে, সেও ওই রুমে থেকে গেছিল। এ ছাড়া উপায়ও ছিল না। চব্বিশ ঘন্টা মাকে দেখাশুনো করার আর কেউ নেই। সে মায়ের একমাত্র ছেলে এবং তার দিদি এখন আমেরিকা প্রবাসী। নীলাদ্রি সেঁজুতির অশান্তির ভয়ে ওকে মিথ্যে বলেছিল। অফিসের কাজে কয়েকটা দিন বাইরে থাকতে হবে বলে জানিয়েছিল। সেঁজুতি তাদের অফিসের কলিগ ভদ্রদাকে ফোন করে ওর খোঁজ নিয়ে, সব খবর জোগাড় করে নিয়েছিল। 

তারপর বাড়ি ফেরার পরই বীভৎস বিস্ফোরণ। ঝগড়া অশান্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে নিলাদ্রি সেঁজুতিকে কিছুতেই চুপ করাতে পারেনি। বাধ্য হয়ে ঘর ছেড়ে নীচে নেমে, বাইরের বেঞ্চে এসে বসেছিল সে। এমন সময় পুলিশের গাড়ি দেখতে পেয়ে নিলাদ্রি চমকে ওঠে। সেঁজুতি কখন পুলিশ ডেকেছে। কিছু বুঝতে না পেরে ঘরে ঢুকে নিলাদ্রী হতভম্ব! সেঁজুতির গায়ে অজস্র সিগারেটের ছ্যাঁকার দাগ। সারা ঘরে পোড়া সিগারেটের গন্ধ। সেঁজুতির অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ নিলাদ্রিকে গ্রেপ্তার করলো।

থানার লকআপে মাথা নীচু করে বসে থাকে নিলাদ্রি। একটাও কথা বলে না। যেন সমস্ত বলা কওয়া তার শেষ হয়ে গেছে। 

রাত বারোটা নাগাদ, হঠাৎ থানায় ছুটে আসে সেঁজুতি। পাগলের মতো। মাথার চুল এলোমেলো, শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটাচ্ছে। 

ওকে ছেড়ে দিন আপনারা। আমার আর কোনও অভিযোগ নেই। আমি ওকে নিয়ে যেতে এসেছি।

নিলাদ্রি অফিসে না এসেই ওর রেজিগনেশান লেটারটা মেইল করে দিয়েছে। নিমতলা শ্মশানঘাটে বসেই ও ওর পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করে নিল। এতদিন যে সূক্ষ্ম সুতোর মতো দায়বদ্ধতার আঁশ ওর শরীরে লেগে ছিল, আজ সকালে তার থেকে মুক্তি পেয়ে গেছে সে। বড় শান্তির মৃত্যু পেয়েছে তার মা। ঘুমের মধ্যেই চির শান্তির দেশে চলে গেছেন। মায়ের দেহটা ইলেকট্রিক চুল্লির উচ্চ তাপে পুড়ছে আর বাইরে পুড়ে যাচ্ছে নিলাদ্রির সব চাওয়া পাওয়া। 

নাঃ আর কোনও আপসের জীবনকে প্রশ্রয় দেবে না সে। আগে থেকেই চাকরিটা ছেড়ে দেবে ভেবে রেখেছিল নিলাদ্রি। এত চাপ সে আর নিতে পারছিল না। সে একটা নিরিবিলি জীবন চায়। শহরের ভীড় থেকে দূরে। টানাপোড়েন বিহীন উদার মুক্ত জীবন। কোনও নিরালা পাহাড়ি গ্রামের স্বপ্ন দেখে নিলাদ্রি। এই শহর এই সভ্যতা থেকে অনেক দূরে। সে একটু হিসেব করে নেয়। তার বয়স এখন বত্রিশ। এই বয়সে সে শুনেছে তার ঠাকুরদাও ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কেউ বলে, তিনি সাধু হয়ে গেছিলেন। মোটমাট তার কোনো খোঁজ কোনও দিন কেউ আর পায়নি। 

এ জীবনে এখনও কত কিছু দেখা হয়নি! নিজের দেশটারই কত জায়গায় যাওয়ার আছে। দেখেনি গাড়ওয়ালের পুষ্প উপত্যকা, উলার লেক, অরুণাচলের ঘন জঙ্গল, চন্দ্রতাল, সূর্যতাল, কিংবা মহাকাশ্যপের শেষ ধ্যান সমাধি নেওয়া কুক্কুটপাদগিরি। যে পর্বতের গুহার ভেতর আজও মহাকাশ্যপ বুদ্ধের দেওয়া স্বর্ণ সূত্রে গ্রথিত কাষায় বস্ত্র নিয়ে অপেক্ষা করছেন ভাবী মৈত্রয় বুদ্ধের আগমনের। 

সেই বস্ত্রখানি পরবর্তী বুদ্ধ মৈত্রয়কে অর্পণ না করলে মহাকাশ্যপের কোনওদিন মুক্তি হবে না। এক অনন্ত ও মুক্ত জীবনের স্বপ্ন সে অনেকদিন ধরে দেখে। কে যেন তাকে আহ্বান জানায় এখনই বেড়িয়ে পড়ার। পড়াশুনো, চাকরি, সংসার এসবের জন্য তার শুধু একটু দেরি হয়ে গেল, সেই ডাকে সাড়া দিতে। একবার চোখ বন্ধ করে একটা গাঢ় শ্বাস ফেললো নিলাদ্রি।

সেঁজুতির মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল। নিলাদ্রি আর ওর মুখ মনে করতে চায় না। সে তার ফোন থেকে সিমটা খুলে গঙ্গার জলে ফেলে দিল। তারপর ফোনটা একটা দোকানে বেচে দিল। সঙ্গে শুধু অল্প কিছু টাকা আছে তার। নিলাদ্রি হাওড়া থেকে উত্তর ভারত যাওয়ার ট্রেনে উঠে বসলো। 

নিলাদ্রিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেঁজুতি নানারকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ছ মাস হয়ে গেছে। যে স্বেচ্ছায় চলে গেছে! এমন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে কীভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে এত বড় পৃথিবীতে? নিলাদ্রি চাকরি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে গেছে। ফোনেও ওকে পাওয়া যায়নি। সেঁজুতি জানে সে দিনের পর দিন নিলাদ্রির সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে। সে যত জোরে নিলাদ্রিকে নিজের কাছে বেঁধে রাখতে চেয়েছে। নিলাদ্রি যেন তত দূরে সরে গেছে তার কাছ থেকে। এখন সেঁজুতির মনে হয়, সে নিজেই তাদের সম্পর্কের ছোট্ট পাখিটাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছে। প্রায় প্রতিটা বিনিদ্র রাতে অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হতে সেঁজুতির মধ্যে কী এক রূপান্তর ঘটে চলেছে। রোজ রাতে তার সামনে অভিনীত হচ্ছে সুদিন্নর জীবন কথা।


(৬)

আজ কতদিন পরে আবার নিজের গ্রামের পথে ফিরে চলেছে সুদিন্ন। কতদিন হয়ে গেছে হিসেব করতে লাগলো সুদিন্ন। হ্যাঁ তা প্রায় দীর্ঘ তিন বছরের মতো হবে। এতদিন একবারও খোঁজ নেয়নি সে, কেমন আছে তার ফেলে আসা স্বজনবর্গ। প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা পাওয়ার পরেই সুদিন্ন নানারকম কৃচ্ছসাধন করতে শুরু করে। এতদিনে সে সাধন জগতে প্রবেশ করার ছাড়পত্র পেয়েছে। সে একইসঙ্গে আরণ্যিক(অরণ্যে ও গিরিগুহায় বসবাস করতে লাগলো), পাংশুকুলিক( মৃত ব্যক্তিদের পরিধেয় বস্ত্র থেকে বস্ত্র সংগ্রহ করে সেই বস্ত্র খন্ড সেলাই করে এবং রঞ্জক দিয়ে রঙ করে চীবর প্রস্তুত করতো। এটি ছিল খুবই পরিশ্রম সাপেক্ষ একটি কাজ। পিন্ডপাতিক(ভিক্ষায় যা পাওয়া যাবে তাই গ্রহন করা), এবং সপদানচারিক(অর্থাৎ লোভ ত্যাগ করে ভালো মন্দ সমস্ত গৃহ থেকে ভিক্ষান্ন সংগ্রহ করা।) ধুত পালন করেছে।

বিশাল ব্যাপ্ত বজ্জী দেশের রাজধানী হলো বৈশালী। সুদিন্ন বৈশালী নগর থেকে অনেক দূরে অরণ্য পরিবৃত এক গ্রামে বাস করছিল। সেই গ্রাম এবং সন্নহিত অঞ্চলে হঠাৎ এক ভয়ানক দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। একরকম ছত্রাকের আক্রমণে ওই স্থানের খেতের সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে গেল। অভিজ্ঞ লোকেরা বলতে লাগলো এ হলো শ্বেত চিতি রোগ। সাধারণ মানুষ নিজেদের খাদ্যেরই সংস্থান করতে পারছিল না, তাই ভিক্ষা পাওয়া বিশেষ কষ্টসাধ্য হয়ে গেল। এই কষ্টকর পরিস্থিতিতে সুদিন্ন ঠিক করলো নিজের পূর্বাশ্রম অর্থাৎ নিজের গ্রামে গিয়ে ভিক্ষা করবে। পরিচিত পরিবেশে হয়তো ভিক্ষা সুলভ হবে।

সুদিন্ন কলন্দক গ্রামে পৌঁছে জ্ঞাতি আত্মীয়দের বাড়ি থেকে আলিপাক সংগ্রহ করে তার সঙ্গী ভিক্ষুদের দিল। এক একটা আলিপাকে দশ জন ভিক্ষুর জন্য রান্না করা অন্ন ব্যঞ্জন ও ভাত ছিল। জ্ঞাতিরা তাদের জন্য প্রায় ষাটটি আলিপাকের ব্যবস্থা করলেন। এতদূর এসে একবার সকুলার মুখটা দেখার জন্য সুদিন্ন ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত উতলা হয়ে উঠলো। 

আশ্চর্য ব্যাপার! সকুলাকে এতদিন তার একেবারেই মনে পড়েনি। গৃহের যত কাছে সে এগিয়ে আসতে লাগলো, ততই সে সকুলার প্রতি তীব্র টান অনুভব করতে লাগলো। কত রাতে কত ভাবে তারা সময় কাটিয়েছে, কেবল সেই সব বিস্মৃত অতীত তার সামনে এসে দাঁড়ালো। নিজের এই দূর্বলতায় সুদিন্ন নিজেই খুব বিব্রত বোধ করলো। সকুলাকে সে এতদিন কোনও গুরুত্বই দেয়নি। আজ সে সকুলাকে দেখতে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে! নিয়তির কি অদ্ভুত পরিহাস! তবুও সে না গিয়ে থাকতে পারলো না। 

নিজেকে আড়াল করতে সে তার গায়ে দেবার বস্ত্র খন্ডটি দিয়ে মাথা ঢেকে নিল। বাইরে তখন গ্রীষ্মের প্রখর রোদ। মুখ ঢাকা অস্বাভাবিক নয়। সে মুখ ঢাকা অবস্থায় তার নিজের বাড়ির সামনে উপস্থিত হলো। ঠিক সেই সময় গত রাতের বাসী ভাত বা কুল্মাস ফেলতে তাদের দাসী, বাড়ির সামনে বেরিয়েছিল। সুদিন্ন নিজের জন্য সেই ভাতই চেয়ে নিলো, তারপর বাড়ির সামনে বসে একটি পাঁচিলের দিকে মুখ করে বসে খেতে শুরু করলো। তাদের বাড়ির দাসী, তার হাত ও পা দেখে এবং গলার স্বর শুনে তাকে সুদিন্ন বলে সন্দেহ করলো। এনদাসীর কথায় সুদিন্নর বাবা বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে সুদিন্নকে দেখে চিনতে পারলেন এবং আনন্দে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। পরের দিন তিনি সুদিন্নকে বাড়িতে খেতে বললেন। সুদিন্ন রাজি হয়ে গেল কারণ সে অন্ততঃ একবার সকুলাকে দেখতে চায়। 

এক প্রবল রোগের মতো এই ইচ্ছে তাকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। সকুলাকে দেখতেই সে এতদিন পর আবার কলন্দক গ্রামে এসেছে। সুদিন্নকে দূর থেকে সকুলাও দেখতে পেল। রোগা, গায়ের রঙ কালো হয়ে যাওয়া এবং মলিন চীবর পরা সুদিন্নকে বড় অচেনা বলে মনে হলো সকুলার। তার মনে হলো যেন সুদিন্নর বয়স অনেক বেড়ে গেছে। অবিকল তির্থীক ভিখারীদের মতো দেখতে হয়েছে সুদিন্নকে। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতো শান্ত ও সৌম্য শ্রী যেন এতটুকুও নেই সুদিন্নর ভেতর।

সুদিন্ন চলে যাওয়ার পরে সকুলাদের বাড়িতে সকলের মন বিষণ্ণ। সুদিন্নকে দেখার পর থেকে শোকে, দুঃখে তার মা ও বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সকুলার মনে কী এক অজ্ঞাত কারণে কোনও দুঃখবোধ জাগ্রত হচ্ছে না। সে শুনতে পেল, সিন্দুক এবং পেটিকা থেকে সমস্ত ধন আজ রাতেই বের করা হবে। কাল সুদিন্নর সামনে সেগুলো রেখে তাকে আবার সংসারে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানানো হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শাশুড়ি দাসীকে দিয়ে সকুলাকে তার ঘরে ডেকে পাঠালেন।

অন্ধকার রাত। কুলুঙ্গীতে প্রদীপ জ্বলছে। সেই আলোয় রাশিকৃত সোনা ও হীরের গয়না দেখতে পেল সকুলা। সেগুলো তার শাশুড়ির বিছানায় জড়ো করা ছিল। সকুলাকে দেখতে পেয়ে শাশুড়ি উঠে বসলেন আর বলতে লাগলেন, 

তোমাকে কাল সকালে এই গয়নাগুলো সব পড়তে হবে মা। সঙ্গে কাশীর এই সোনার কারুকার্য করা সূক্ষ্ম বস্ত্র থাকবে তোমার পরনে। তিনি একটি উজ্জ্বল শ্বেত বর্ণের বস্ত্র দেখালেন। কাল আমি নিজে তোমার চুল বেঁধে দেব। যে করেই হোক, তোমাকে আমার ছেলেকে আবার ঘরে ফিরিয়ে আনতে হবে। সে যেন আর আমাদের ছেড়ে না যায়। আমি যতদূর জানি সুদিন্ন তোমাকে খুব ভালোবাসতো। সেদিন কোন কুক্ষণে সে যে বৈশালী নগরে গেছিল তা কে জানে! শুনেছি শাক্যমুণি খুব ঋদ্ধিসম্পন্ন। তার প্রভাবেই সে তোমাকে আর আমাদের ভুলে গেছে। তবে কাল আমি দেখেছি সুদিন্নর চোখ সারাক্ষণ তোমাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছিল। এখন তুমিই আমাদের শেষ ভরসা সকুলা।

এতক্ষণ পর সকুলার শ্বশুর ঘরে এলেন। তিনি ঘরের যে জায়গায় মাদুর বিছানো ছিল তা তুলে ধরলেন। স্তুপাকার স্বর্ণমুদ্রার রাশি দেখা গেল। তিনি বললেন এগুলির মধ্যে অনেক ধরনের রত্নও আছে। যা আমি নানা দেশে বাণিজ্য করতে গিয়ে সংগ্রহ করেছি। এই রত্ন বহু কষ্ট করে সে দেশের রাজ কর্মচারীদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমি সংগ্রহ করেছি। এই সমস্ত ধনই আমার মৃত্যুর পর গণপরিষদের লিচ্ছবীরা দখল করে নেবে, যদি এই পরিবারের কোনো উত্তরাধিকারী না থাকে। আমার সারাজীবনের এত কষ্টের সঞ্চয় বেহাত হয়ে যাবে। তিনি আর কিছু বললেন না। বোধহয় বলতে সঙ্কোচ অনুভব করলেন।

সকুলা ভাবছিল, এই আমিত্ব থেকেই যত চিন্তার উৎপত্তি। যদি মৃত্যুর পর তাদের সম্পদ অন্য কেউ দখলও করে নেয়, তাতে আর কী যায় আসে! তবু ওঁরা কত চিন্তিত! বুদ্ধ বলেন বিষয় বাসনাই হলো যত চিন্তার মূল। বুদ্ধের শান্তিদায়ী বাক্য নিজের কানে শুনতে বড় ইচ্ছে করে সকুলার। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার সেই সৌভাগ্য হয়নি। এইসব কথা সে ভিক্ষার্থী বৌদ্ধ ভিক্ষু ও শ্রমণদের কাছে শুনেছে। তবে, তার বিহার বা আরামে গিয়ে বুদ্ধকে দর্শণ করার কোনও সুযোগ আজও হয়নি। 

সকাল থেকে সুদিন্নর জন্য নানা রকম রান্না চলতে লাগলো। ক্ষীর, পায়েস, নানা রকমের পিঠে, ঘৃতপক্ক শালী ধানের ভাত, নানা রকমের মাংস। তাকে সাহায্য করছেন বাড়ির বয়স্কা দাসীরা আর তার শাশুড়ি। একটু রোদ ওঠার পরেই সুদিন্ন এসে পৌঁছাল।

খাওয়ার পর্ব মিটতেই সুদিন্নর মা সকুলার হাত ধরে তাকে সুদিন্নর সামনে নিয়ে এলেন।

দেখো বাছা, একবার ওর দিকে চেয়ে দেখো। কতটুকুই বা বয়স। ওর এই রূপ যৌবন সবই যে ব্যর্থ হয়ে যাবে! আর আমাদের ধন রত্ন, বংশে সন্তান না এলে সবই লিচ্ছবীরা দখল করে নেবে। তুমি এর একটা উপায় করো। তুমি একান্তই যদি সংসারে না ফিরতে চাও, ওকে একটা সন্তান দিয়ে যাও।

সুদিন্ন সকুলার দিকে তৃর্ষার্ত দৃষ্টিতে তাকালো। দেখলো অপরূপ সৌন্দর্য্য মন্ডিত তার পূর্ণ যৌবনা শরীর! এই নারী তার কাছে একসময় কতো সুলভ ছিল। কত নিশীথে কত প্রকারে তারা মিলিত হয়েছে। কী রহস্য আছে এই নারী শরীরে? কতবার শুনেছে শরীর অনিত্য, পঙ্কিল, অশুচি। তবু কেন এত দুর্নিবার আকর্ষণ! এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে যেন এই নারীর জন্য অনন্ত নরকবাসও স্বীকার করতে পারবে সে! 

রাজগীরে ভিক্ষু ও নগরবাসীর চেতনালাভের জন্য বুদ্ধ একবার এক অভিনব পন্থা নিয়েছিলেন। সিরিমা নামের এক বারবনিতা বাস করতো রাজগীরে। অপরূপ ছিল তার দেহ লাবণ্য। একবার যুবতী সিরিমাকে লোভের বশবর্তী হয়ে কে বা কারা হত্যা করে। বুদ্ধ তার দেহটি যাতে সৎকার না করা হয় সেজন্য মগধরাজ বিম্বিসারকে অনুরোধ জানান। দেহটিকে যাতে শিয়াল, শকুন না খেতে পারে তার জন্য রাজা বুদ্ধের অনুরোধে পাহারাও বসান। 

স্বাভাবিক নিয়মে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে দেহটি পচতে শুরু করে। বুদ্ধ ভিক্ষুদের সৌন্দর্য্যের প্রতি ষ্পৃহাশূন্য করতে প্রতিদিন সিরিমার মৃতদেহটি দেখতে বলেন। ধীরে ধীরে সুন্দর দেহটি কঙ্কালে পরিণত হয়। বিম্বিসার সিরিমার মৃতদেহটি দেখতে নগরবাসীদেরও বাধ্য করেন। যে না দেখবে তাকে আট স্বর্ণমুদ্রা দন্ড দিতে হবে বলে তিনি ঘোষনা করেন। সে সময় সুদিন্নও সিরিমার পচাগলা মৃতদেহ দেখে শিউরে উঠেছিল। সুন্দরী সিরিমার দেহ থেকে তখন স্থানে স্থানে মাংস খসে পড়ছে। ছড়াচ্ছে বীভৎস দুর্গন্ধ। মানুষের সেই শেষ পরিণতি দেখে সেও ত্যাগের লক্ষ্যে তখন অবিচল হয়ে উঠেছিল। তবে আজ তার এ কী হলো?

মায়ের ডাকে সম্বিত ফেরে সুদিন্নর। পুত্রবীজ দেবে তো বাছা?

সুদিন্নর বুকের ভেতরটা দুলে উঠলো। সে মোহিত হয়ে তাকিয়ে থাকে সকুলার দিকে। সকুলার মুখের ভাব কঠিন। সকুলা কি তাকে চায় না? নাকি এ তার নারী সুলভ লজ্জা? তাই হবে নিশ্চয়। দেহ মনে উদগ্রীব সুদিন্ন মহাবনের এক নির্দিষ্ট জায়গায়, সন্ধ্যাবেলায় এক বকুল বৃক্ষ চাতালে সকুলাকে পাঠিয়ে দিতে বলে চলে যায়। 

(৭)

সকুলার ঋতুকালীন রজঃস্রাবের পরে জ্যোতিষীর হিসেব মতো এক নির্দিষ্ট দিন ঠিক করা হয়েছে। সেইমতো দাসী পূর্বাহ্নে সুদিন্নকে জানিয়ে এসেছে। চাঁদ ওঠার পর এক সুদৃশ্য ঢাকা রথে সকুলা রওনা হলো বৈশালীর মহাবনের দিকে। সকুলাকে আজ তার শাশুড়ি বহুমূল্য হীরের গয়নায় সাজিয়ে দিয়েছেন। তার পরনে ঘন নীল রঙের উর্ধ্ববাস, মাথার কবরীতে সোনার কাঁটা। গলায় হীরের চন্দ্রহার চন্দ্রালোকে ঝকমক করছে। 

গ্রীষ্মের শেষে বকুল চাতাল অজস্র ঝরে পড়া বকুল পুষ্পে সমাকীর্ণ। সকুলার সঙ্গে যে দাসী দুজন এসেছিল তারা কর্পাস বস্ত্র দিয়ে বৃক্ষের সুবৃহত কান্ডটি বেষ্টন করে আচ্ছাদন তৈরি করে দিয়েছে। এখানে আজ প্রকৃত অর্থেই ফুলশয্যা রচিত হবে। বৃক্ষ বেষ্টনের মধ্যে প্রবেশ করতে গিয়ে চোখে পড়লো দূরে সুদিন্ন দাঁড়িয়ে আছে উদগ্রীব ও ব্যাকুল হয়ে। দাসী দুজন সরে যেতেই আচ্ছাদনের ভেতর প্রবেশ করলো সে। বকুল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে একফালি চাঁদ দেখা গেল সে সময়। সকুলা সুদিন্নর দিকে মিনতি ভরা করুণ চোখে চাইলো। বললো,

আমাকে স্পর্শ করবেন না। এ মহা পাপ আমার দ্বারা যেন না হয়। আপনার অঙ্গে প্রভু বুদ্ধের দেওয়া পবিত্র চীবর! আমাকে দয়া করুন! 

কোনো পাপ নেই, সকুলা। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসায় কোনো ফাঁকি নেই, প্রিয়া! দুষ্কর সাধনাও আমার মন থেকে কখনও তোমাকে মুছে ফেলতে পারেনি। এসো কাছে এসো। একবার কাছে এসো।

না। আমাকে ছেড়ে দিন। বিষাক্ত সাপের মতো ভয়ানক পাপ আমাদের স্পর্শ করবে। দয়া করুন!

কোনও পাপ হবে না। আমি তোমাকে ভালোবেসে পুত্রবীজ দেব। এতে কোনও পাপ হবে না। এই শেষবার। কথা দিচ্ছি এই জীবনে কখনও আর তোমার সামনে এসে দাঁড়াবো না। আমাকে ফিরিয়ে দিও না সকুলা! এসো, রূপসী! কাছে এসো!

তারপর চন্দ্রালোকে, বকুলের ঘ্রাণেভরা নির্জন নিভৃত অরণ্যের নিষুতি নিশীথে পর পর তিনবার উপগত হলো সুদিন্ন। তীব্র সংরাগে, স্বেচ্ছায়, ভালোবাসায়। তারপর নিঃশেষে শেষ হয়ে গেল সেই কুহকিনী মায়াবিনী রাত।

সকালের আলোয় সেই মায়াভরা রাত্রির সমস্ত আবেগ কোথায় অন্তর্হিত হলো। সুদিন্ন ঘুম থেকে উঠে আর সকুলাকে সেই বকুল চাতালে দেখতে পেল না। তার রথ সহ কখন যেন সে ফিরে গেছে। সুদিন্নর জন্য শুধু পড়ে আছে, কেবল নিঃসীম ক্লান্তি, আর গ্লানি। এ কী করলো সে? অনন্ত নরকবাস করেও যে এ পাপের ক্ষমা হয় না। সে এই পবিত্র ধর্মের গায়ে কালিমা লেপে দিল! হায় হায় কী করে সে এমন করতে পারল? অন্ধ কামনা এ কোন অন্ধকারের গর্ভে নামিয়ে দিল তাকে!

বুদ্ধ জরুরী ভিত্তিতে ভিক্ষুদের মহাসন্মেলন ডেকেছেন। তিনি সুদিন্নকে প্রশ্ন করলেন,

তুমি তোমার পূর্ব পত্নীর সঙ্গে স্বেচ্ছায় দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছ এবং মৈথুন ধর্ম সেবন করেছ?

হ্যাঁ ভন্তে।

মূর্খ! এটি অনুচিত, অবৈধ এবং ভিক্ষুদের অকরণীয়। তুমি ধর্মবিনয়ে প্রব্রজিত হয়ে যাবজ্জীবন পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য পালনে অক্ষম ও পরাজিত হয়েছ। অর্থাৎ তুমি পারাজিক হয়েছ। তোমার শুভ বুদ্ধির পরাজয় হয়েছিল। তাই তুমি ধর্ম থেকে চ্যুত, বর্জিত এবং ভ্রষ্ট হয়েছ। আজ থেকে সুদিন্ন অন্যান্য ভিক্ষুদের সঙ্গে উপসথ (উপবাস), প্রবারণা ইত্যাদি বিনয়কর্ম করার অযোগ্য বিবেচিত হলো। পারাজিক প্রাপ্ত ভিক্ষু কোন রকম বিনয় সংবাস করতে পারবে না। 

সংঘে বসবাস করার তার আর কোনো অধিকার নেই। সুদিন্নর সঙ্গে আর কোনো ভিক্ষু একত্র বাস করতে পারবে না। যে ভিক্ষু সজ্ঞানে মৈথুন ধর্ম পালন করবে তার পারাজিক আপত্তি হবে। এই দণ্ড নীতি এখন থেকে সংঘে প্রতিষ্ঠিত হলো। সুদিন্নই হলো পারাজিক দণ্ডে দণ্ডিত প্রথম পারাজিক। সুদিন্নর মৈথুন অপরাধ হয়েছিল বলে এরপর থেকে এই ধরণের অপরাধের দণ্ড প্রথম পারাজিক হিসেবে পরিচিত হলো। সুদিন্নই হলো এই ধর্মের সেই প্রথম পারাজিক। সঙ্ঘে যে বা যারা এরপর সুদিন্নর সঙ্গে বিন্দুমাত্র যোগাযোগ রাখবে, সঙ্ঘ তাকেও বর্জন করবে। এই মর্মে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলো।


তারপর দীর্ঘ বারো বছর কেটে গেছে। বিশাখা জেতবন বিহারে বুদ্ধের সামনে এক দীর্ঘাঙ্গী সুন্দরী নারীকে নিয়ে এল। তার যৌবন প্রায় অতিক্রান্ত হয়েছে। তবে সে এখনও বেশ সুন্দরী। সঙ্গে তার বালক পুত্রটিও এসেছে। বিশাখা বুদ্ধকে বলেছিল মেয়েটির কথা। মেয়েটি বড় দুঃখিনী। তার নাম সকুলা। তার স্বামী সুদিন্ন পারাজিক দন্ড পেয়ে আর সংসারে ফিরে আসেনি। 

সুদিন্নর খোঁজ আর কখনও পাওয়া যায়নি। বহু ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করে একা একা সকুলা তার ছেলেকে বড় করে তুলেছে। সুদিন্নর কী হয়েছে, বা সে কোথায় গেছে তা কেউ জানে না। এখন সকুলা ও তার পুত্র বীজক বুদ্ধের কাছে প্রব্রজ্যা চায়। সংসার বহুকাল আগেই সকুলার কাছে বিষবৎ। কারুণিক বুদ্ধ তাদের প্রব্রজিত করবেন আশ্বস্ত করলেন।

সেঁজুতি অবশেষে বুঝতে পেরেছে তার এই অপেক্ষার কারণ। সেও তো বহু বহু যুগ আগে সারা জীবন অপেক্ষায় রেখেছিল তার পুণ্যবতী স্ত্রী সকুলাকে। মহাকালের কাছে মানুষের গণনা করা হাজার হাজার বছর সময়ের হিসেব অতি তুচ্ছ। বহু যুগের ওপার থেকে সে আজ এসেছে নারী হয়ে। এ অপেক্ষা তার পূর্বাপর প্রারব্ধ কর্মফল। এই দুঃখ প্রাপ্তি ও অপেক্ষা তাই অনিবার্য। বুদ্ধের কৃপায় অপ্রত্যাশিত অতীত দর্শন সেঁজুতিকে সমস্ত মানসিক সমস্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করলো কারণ ভ্রষ্ট হলেও সুদিন্ন একদিন বুদ্ধের ,ধর্মের ও সঙ্ঘের শরণ নিয়েছিল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন