শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

নাসিমা আনিস'এর গল্প : কিডনির কারবার

এই গল্পটা আমার। আমি এর জন্মদাতা, গল্পবস্তু যতকিঞ্চিত উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। অবশ্য সেভাবে ধরলে, কিবা আমার কিংবা আপনার! হাতপা মাথামুণ্ডু পাঁজর কলিজা সবই উত্তরাধিকার সূত্রেই তো প্রাপ্ত! কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চয়ই সবাই মানবেন, মাথার ঘিলুটা খাটানোর ইচ্ছা বা ক্ষমতা সকলের একান্ত নিজের। এখানে এক বিন্দু কারো অংশিদারি নাই। হ্যাঁ, বিপদের ভাগটা নিয়ে যদি ভাবা যায় তবে তাও অবশ্য নিজের উপরই বর্তায়। আর কে না জানে, নো রিস্ক নো গেইন। সাহসই হলো সেই অবস্তু যা থাকলে এবং জায়গা মতো একবার দেখিয়ে ফেলতে পারলে কেল্লা ফতে।

একবার ব্যাংকে ইংরেজিতে লেখা একটা কথা পড়েছিলাম, যতদূর মনে পড়ে লেখা ছিলো ‘আইডিয়া থাকলেই আপনি টাকা কামাতে পারবেন কিন্তু টাকা থাকলেই যে আইডিয়া পেয়ে যাবেন এমন নাও হতে পারে’। তারপর থেকে আমি আইডিয়াকে খুবই গুরুত্ব দেই এবং পেয়ে গেলে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আপনি বলতে পারেন, বাবা একবার তো আইডিয়া দেখালে, দেখিয়ে এখন তোমার পরিবার ভিটাছাড়া হওয়ার উপক্রম, আবার কেন? কিন্তু এটুকু বলে আপনি ভদ্রলোক মানুষ পিঠ টান দেবেন, তাতো হবে না! কেন এমন হলো, কে এর জন্য দায়ী, তা অন্তত বলে দিয়ে যান! আপনি সহনশীল অভিজ্ঞ মানুষ তাই অনুরোধ করতেই পারি, নিদেনপক্ষে আমি এখন কি করব সেটা বলবেন! বললে দুটো পয়সা গাঁট থেকে খসে পড়বে, কি পড়ার উপক্রম হবে তাতো নয়, হ্যাঁ কিছুটা সময় বেহুদা বেরিয়ে যাবেই আপনার। তো, সেই ভয়ে আর এগুবেন না, এই তো! তবে নিজের কাজে যান আমি কাগজ কয়টা পিজি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ আর মিটফোর্ডের দেয়ালে মেরে একটু আরাম করি। বলা ভালো, বড় মামিকে শুধু একটা ম্যাসেজ দিয়েছি, ‘টাকা জোগাড় করে আমি বাড়ি ফিরবো তার আগে যেন মাকে ভিটা ছাড়া না করে মামাকে বলবেন বিষয়টা দেখতে’। 

পোস্টারের লেখাটা আরেকটু বড় হলে ভালো হতো, হরফটা এত ছোটো, নাহ্ ঠিকই আছে, যার দরকার সে ঠিক দেখে কল দেবে। ‘জরুরী ভিত্তিতে একটি সুস্থ তাজা কিডনি বেচা হবে, রক্তের গ্রুপ বি পজেটিভ’। বি পজেটিভ খুব কমন রক্ত গ্রুপ। রক্ত সহজ লভ্য হলে কি, কিডনি তো সহজ নয়! নিশ্চয়ই আজ রাত কি কাল দিনের মধ্যেই ফোন চলে আসবে। পকেটে চল্লিশ টাকা আছে, পাউরুটি খেয়ে এখনো দুটো দিন পার করে দেয়া যাবে। তারপর রোগীর আত্মীয়রা নিজের গরজেই আমার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। 

উদ্যানে ঢুকতেই আল্লাদি ভঙ্গিতে ‘নাগলিঙ্গম’ নাম ঝোলানো মোটা গাছটার বাহারি ফুল নিয়ে কি যে ঢং! এ রকম একটা গাছ করেও তো আল্লাহ আমাকে পাঠাতে পারত! দরিদ্র চেহারার যুবকযুবতী ঘনিষ্টভাবে দাঁড়িয়ে আছে গাছে ঠেস দিয়ে। ছেলেটার গোপন অঙ্গ মেয়েটার উরুতে বিদ্ধ করে কথা বলছে, দেখতে দেখতে বেঞ্চিতে বসি। পোশাকে কি চেহারায় ওদের একটুও প্রেমময় লাগে না, সংশয়ও জাগে, খরিদ্দার বিক্রেতা কিনা ! 

এমন ঠ্যাটা রোদ, ছায়াতে বসে থাকলেও মুখে রোদের ভাপ লাগে, ঘাম শুষে নেয়। সৌদিতে অবশ্য এর চেয়ে বেশি রোদে মাঠে কাজ করেছি, সে টাকার জন্য। জীবনে একটা পয়সা কামাই করে দেখলাম না যখন, তখন মাসে ত্রিশ হাজার টাকা আর থাকা খাওয়া ফ্রি চাকরি। কোম্পানির কাজ, গম খেতে কাজ করবো, পানি দেয়ার কাজ। তিন বছরের কন্ট্রাক্ট, ইচ্ছা করলে সারা জীবন থাকা যায়। রোদ বেশি তাই সন্ধ্যার পর রাত দশটা এগারটা পর্যন্ত ঠাণ্ডায় ঠাণ্ডায় কাজ। রাতে মাঠে কাজ, শুনতেই অভিনব লাগে। সঙ্গে বক্কর, কোম্পানির বড় কর্তার আত্মীয়, বিশ্বাসের উপর বিশ্বাস, মাগো, এমন সুযোগ রোজ আইয়ে না গো! 

কিন্তু পৌঁছেই -- পারমানবিক বিদ্যুত তো সব জায়গায় যায় নাই মিয়া, দিনেই কর্ম, ভালো কইরা কাপড় পইরা মাঠে নাইম্যা পড়, এমন কাম দ্যাশে কত করছো মিয়া! কোম্পানির আত্মীয় বক্করই এসব বলে। মানে প্রথম ধাক্কাটা মাতবার বক্করের। ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই বলে কোম্পানির মালিক জেলে, দশ হাজারে যদি কাজ করতে চাও তো অন্য কোম্পানিতে বন্দোবস্ত কইরা দেই। থাকা খাওয়া নিজের। একমাসের বেতন হাতে আসার আগেই এই সব! তারপর বাঙালির অকৃত্রিম চিরন্তন বিদ্রোহ, একই লটে যাওয়া বত্রিশ জনের তেরজনের তিনমাস মানবেতর জেল জীবন এবং শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরত। একটা দুইটা খুন করা কারো কারো কাছে প্রার্থনীয় ছিল বটে। কত খুন করেছি মনে মনে, শুধু হাতের কাছে পাওয়া যায়নি বলে। আর কাকে যে খুন করবো তাই তো জানি না। 

কোম্পানির আত্মীয় বলে যাকে সমীহ করেছি সেই বক্করও আমাদের কাতারে, জেলে, বেচারা কুবের, এত তাড়াতড়ি তার মাতব্বরির সাম্রাজ্যের পতন হবে সে কি জানতো! খুন করলে এদেশে কি শাস্তি হয়, সবার জানা। জুম্মার পর প্রকাশ্য দিবালোকে কতল! রোষের অনলে পুড়তে পুড়তে বদলা নিবোই বলে বোকার মত এমন মানুষকে পিটালাম! এবং জেলে গেলাম। জেলে গিয়ে জানলাম আমাদের যে ভাওতা দিয়ে এনেছে তার নাম এমএসসি, মোটেই সে জেলে যায়নি, গেছে আমেরিকায়। ‘নিশ্চয় হালায় সাদা চামড়ার লগে ফূর্তি মারতে গেছে, পাইলে হালার ফূর্তি টাইট্টা কুত্তারে দিতাম’-- মন্তব্য বেলালের। এখন আমরা জানি, এমএসসি বেশি টাকার লোভ দেখিয়ে এনে অন্য কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়েছে আমাদের, এই তার ব্যবসা। এমএসসি কারো নাম হয়! হয়, মোফাখখারুল সামস চৌধুরী। এত বড় নাম মুখে আসে! ‘খানকির পোলাগো নাম এমন সুন্দরই হয়’ বেলালেরই মন্তব্য। বাপের রাখা নাম, নাকি নিজের রাখা! জে এম চৌধুরী, গুরা মিয়া চৌধুরী না! 

জেল থেকে বেরিয়েও তাদের নজরদারি। কিভাবে ধার শোধ করব এই ভেবে যখন আত্মহত্যার পরিকল্পনা করি তখনও সমস্যা, আত্মহত্যার উপকরণ নাই এই বন্দী দশায়। বিষ, দড়ি, ছুরি, ব্লেড, কিচ্ছু নাই। পরনের লুঙ্গি গলায় পেঁচিয়ে মরার চেষ্টা করে হাসির পাত্র হয় ফরহাত মিয়া ওরফে ফরু। বেলালই সমাধান দেয় -- এমন কইরা হইব না, ফেরত যাওয়ার সময় প্লেন থেইক্যা ঝাঁপ দিছ্, শালা গো কাছ থেইক্যা ভাড়ার টাকাটা তো উশুল হইব! ফরহাত মিয়া প্লেন থেকে ঝাঁপ দেয়ার সময় কিভাবে জানালা খুলবে, আদৌ সেটা সে খুলতে সক্ষম হবে কিনা কিংবা খোলার সময় কেউ দেখে ফেললে কী হবে সে সব বিবেচনা না করে লুঙ্গি কাছা দেয় মনে মনে -- কেন লুঙ্গি? আরে, জেলে আসার আগে পরনে লুঙ্গিই ছিল। এক লুঙ্গিতে জেলে তিন মাস, চিমটি দিলে ময়লা ওঠে। তো লুঙ্গি কাছা দিতে দিতে তার বুকে বল আসবে, দেহুক শালারা মরতে ভয় পায় না বীরবাঙালি, জেল তো বালের নাহাল! আল্লার দেশে মানুষরে এমন কইরা কষ্ট দিতে আনে, তুমি এর বিচার কইর আল্লাহ.....জানালা খুললে হুহু হাওয়া ঢুকবে, বুক ভরে শ্বাস নিবে তারপর ঝাঁপিয়ে পড়বে ফরহাত মিয়া। 

ঝাঁপ দেয়া এমন কোন কঠিন কাম না, কত ঝাঁপ দিছি ছোটবেলা, কাঁটা ভরা বাবলা গাছের মাথা থেইক্যা লাফায় পড়ছি টইটুম্বুর বিলে, এমনি এমনি না তো, হালিমের মায়ের ডেকচির সব ভাত খাইতে দেবে এই শর্তে। তো বাংলাদেশের সীমানায় হলেই সবচে ভালো হয়। এমনিতেই ডেডবডি কেউ খুঁজে পাবে না, পাবে কোথাও একটা হাত, কোথাও একটা পা কিংবা মাথাটা। রশীদ বলছিল, ঝাঁপ মারার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের তোড়ে তোর সব ফালাফালা হইয়া যাইব, পুরা বডি লইয়া পড়তেই পারবি না, এমনকি মেঘের মইধ্যে পড়তে পারলে সারা জীবন সেখানেই ভাসবি, বরফের লগে গড়াগড়ি, কোলাকুলি, বরফ খাবি আর বরফ হাগবি, হাঃ হাঃ! রশীদ স্কুল শেষ করেনি, কোত্থেকে এমন আজগুবি বৈজ্ঞানিক খবর পায় কে জানে! আমি শুধরে দেই, ভাসবে না, পড়বে। মধ্যাকর্ষণের জন্য প্রবল বেগে পৃথিবীর দিকে ছুইট্টা যাবে ফরহাত, যত উপর থাইক্যা পড়বে, তত বেশি ফোর্সে পড়বে, পইড়া ভেটকাইয়া যাবে। রশীদ আবার বলে, পড়লেও হাতপামাথা একখানে থাকব না। মানুষ ওর মেয়েমানুষ মার্কা হাতপা নিয়া গবেষণা করবে। 

‘মেয়েমানুষ’ শব্দটা বলার সঙ্গে সঙ্গে জেলে কে কাকে কোথায় মেরে কি সুখ পেয়েছে, সে কথা উঠলে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয় রশীদ। বেলাল অন্তত বলে, দুইজাতের জন্য দুই রকম অনুভূতি, মানে মেয়েমানুষ হইলে লোকে ভাববে রেপ কেইস, কইরা টুকরা কইরা ফালায় দিছে, বাসে হয় এ সব, আমদের দেশে, পাশের দেশে, পেপারে দেখছি, হায় আল্লা, আইজকাইল প্লেনেও এইসব হয়! মানে একখান হাত কি পা দেইখা একটু আদিরস পাইলো, এই আর কি! পুরুষ বুঝলে অন্য রকম হবে একদম ..... শুয়ার মার্কা একটা ভাবনায় ডুব দিয়াই ভাইস্যা উঠবে... যা হোক। যাই হোক, রশীদের এক কথা, অঙ্গপতঙ্গ একসাথে থাকবে না। --তর্ক না করি, যেনেই পড়ুক! তবু সে নিজের দেশে পড়তে চায়, নিজের সীমানায় প্লেন থেকে ঝাঁপ দেবে। জীবিত অবস্থায় তার পক্ষে বাবামার সামনে দাঁড়ানো কোনভাবেই সম্ভব না। 

কিডনিটা কত টাকায় বিক্রি হতে পারে, তিন/চারে হবে না! ধার শোধ করেও যেন হাতে লাখ খানেক থাকে। যত কিডনি বেচার কথা ভাবি তত নিজেকে প্রয়োজনীয় প্রয়োজনীয় বস্তু মনে হয়। লুঙ্গি ছিঁড়ে গলায় ফাঁশ দিলে কিংবা প্লেন থেকে লাফিয়ে পড়লে বিশাল লস হয়ে যেত! 

সন্ধ্যায় পার্ক থেকে বেরুনোর মুখে ফোন। হ্যালো বলতেই কেটে গেল। যাত্রাবাড়ি এক পরিচিতর বাড়ি যাবার ইচ্ছা এখন। আবার ফোনটা বেজে উঠল। মামির ফোন, হ, চিন্তা কইরেন না, সাত দিনের মইধ্যে টাকা ফেরত দেবে কোম্পানি, মায়রে কইয়েন। টাকা না দিয়া যাইব কই হালায়, পেদানি দিমু না! বক্করের খোঁজ জানি না তো! 

সময় লাগবে না করেও তিন দিন পর খবর হলো আজ। সকালে ফোন পেয়ে হাসপাতাল আসছি, বেসরকারি হাসপাতাল, বৃদ্ধ এক মহিলার কিডনি বদলানো হবে। আমাকে বারবার বলছে, অপরিচিত কোন মানুষের সাথে কথা বলবা না। যে যাই বলুক বলবা উনি আমার খালাম্মা লাগেন, খালাম্মাকে দেখ্শোনা করতে আসছি। মহাবিপদ, খালাম্মা বলে শেষে কিডনিটা ফ্রি না নিয়া নেয়! আমি বলি, কিন্তু আমি তো কিডনি বেচতে আসছি, টাকা দিতে হবে! 

-- দেব দেব, টাকা তো দেবই কিন্তু তুমি বলবা উনি তোমার খালাম্মা, নাইলে কিডনি বেচতে পারবা না, কিডনি কেনাবেচা বেআইনি। 

আমি বলি, ঠিক আছে, ইনি আমার খালাম্মা, কিন্তু টাকা ব্যাংকে না দেয়া পর্যন্ত আমি কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হবো না। 

-- ঠিক আছে। কিন্তু তোমার তো সব পরীক্ষা না করে বলা যাবে না যে তোমার কিডনি আমার মায়ের শরীরে লাগবে। 

ধন্দে পড়ে যাই, পরীক্ষার নামে ভর্তি করে শেষে অজ্ঞান করে পেট ফেঁড়ে কিডনিটা নিয়ে যদি রাস্তায় ফেলে দেয়? গোটা মানুষটাই যেখানে হাপিস করে দেয় সেখানে সামান্য একখান কিডনির জন্য কি বলার থাকবে! একবারের জন্যই এই কথাগুলো মনে আসে, খালাম্মার ছেলে লোকটাকে ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। 

আত্মীয়স্বজন মিছিল করে আসে খালাম্মাকে দেখতে, সবাই বলে ডায়লাইসিস করার দিন আপনাদের শেষ হয়ে আসছে, খুশির খবর। আচ্ছা, এই ছেলেটা দেবে! বেশ বেশ, একটা কিডনি দিয়েও মানুষ দিব্যি আশি বছর চালায়ে দিতে পারে। 

আমি চমকে উঠি, আশি বছর কে বাঁচাত চায়, নাকি কিডনি দিলে পরমায়ু বেড়ে যায়! মুখে বলছে বটে কিন্তু চোখে করুণা নাকি ঘৃণা! আহারে গরীব মানুষ কিংবা ব্যাটা কসাই, শরীর থেকে কিডনি বেচতে আসছে! শরীর খাটিয়ে রোজগার করতে পারিস না ছেলে! কেউ কেউ মাদকাসক্ত মনে করে ঘুরেফিরে আমাকে পরখ করছে চোখে চোখ রেখে। বিবিধ দৃষ্টির সামনে নিজের দেহটাকে নিয়ে আজকাল খুব লজ্জা করে, মনে হয় দেহটা আমার না, আমাকে কিছু কাল ব্যবহার করতে দিয়েছিল কিন্তু আমি মওকা পেয়ে মিসইউজ করছি। এইচএসসি পাশ করা একটা ছেলে তুই, কিছুই করতে পারলি না! শেষে কিনা বাপমার দেয়া শরীরটা বেচতে চাস! 

মামি ফোন দেয়, ধরি না। ম্যাসেজ করি, অপেক্ষা করো, টাকা নিয়া আসব। একটা ম্যাসেজ লেখা আছে, প্রতিদিন একবার পাঠায় দেই। 

পরীক্ষার রিপোর্ট খুব ভালো, আমার মায়ের না দেখা এই বৃদ্ধ বোনটার সাথে আমার সব কিছু হুবহু মিলে গেছে। ডাক্তাররা নাকি বলেছে এত কিছু এতো ভালোভাবে মিলে যাওয়া আমরা এর আগে পাইনি। প্রথমে ওরা বলে আপাতত তোমার একাউন্টে দুই লাখ দেই, বাকিটা অপারেশানের পর নাও। আমি বলি, না, যদি আমি মারা যাই তাহলে তো আর দেবেন না, পুরোটাই এখন দেবেন। খালার ছেলেটা বলে, এখন তো হাসপাতালে আমাকে তিন লাখ জমা দিতে হবে, আমার একদম হাত খালি ভাইয়া, দুই লাখ পরে নাও? আমি বলি আমাকে একটু ভাবতে দেন। পরদিন ভেবে টেবে বলি, তিনলাখ এখন দেবেন, আমি যদি বাঁচি তো বাকি এক পরে দিয়েন। লোকটা খুশি হয়। মামিকে মেসেজ করি, একাউন্ট নাম্বার দিলাম, মায়ের ছবি দিয়ে মাকে নমিনি করে আমার ব্যাংকে টাকা রাখছি, আমি মারা গেলে মা ঢাকায় এসে এই টাকা নিয়া ভিটা ছাড়ায় নিবে। বাঁচলে সাত দিন পর কথা বলব। আবার ফোন বন্ধ রাখি। 

হাসপাতালে শুয়ে থাকি ফ্যানের নিচে, দু’এক দিন পর অপারেশান। খালাম্মার ঘরে এসি চলে। মুখোমুখি ঘর, টের পাই। আমার কেবিনের সামনে লোকজন ঘোরাঘুরি করে। এর মধ্যে খালাম্মার অবস্থা একদিন খুব খারাপ হয়ে যায়, আমি ভাবি টাকাটা ফেরত দিতে হবে, অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়। কিংবা কি জানি একটু মুক্তির আনন্দও কাজ করেছিল কিনা। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার তো কোন গার্জিয়ান নাই যদি শরীর থেকে আরো কিছু কেটে রাখে তো কে দেখবে! একবার মনে হয় হাসপাতালের কোন কেবিন বয়কে ভাই পাতাই, বলি আমাকে একটু দেখ ভাই, মরে গেলে শুধু এই নাম্বারে ফোন দিয়া জানায় দিও আমি মারা গেছি। আর এরা যেন বাকি টাকার বদলে আমার লাশটা বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। 

সাতদিন পর মামিকে ফোন করব বলেছিলাম। তিন দিন শেষ। এখনো জানি না কবে অপারেশন। আবার অনেকগুলো পরীক্ষার জন্য সিরিঞ্জি ভরে রক্ত নিয়ে যায়। পুরাতন মেসেজটা আবার করি, দশদিন পর ফোন দিব, চিন্তার কোন কারণ নাই। শুয়ে শুয়ে ভাবি বৃদ্ধাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ওরা এত কষ্ট করছে! যদি সত্যি সুস্থ হয়ে না ওঠেন! আমার ঘাড়মাথা গরম হয়ে যায়। না, নিশ্চয়ই তারা জেনে শুনেই সব করছে। এত টাকা, শ্রম কি বিফলে যেতে পারে! 

রিসিপশনে মনোহারী গাঢ় সবুজ আর হালকা হলদে টাটকা কামরাঙার ছবি, সতর্কীকরণ, কামরাঙা কিডনির জন্য বিপজ্জনক, কিডনি রোগির জন্য মহাবিপজ্জনক। মরণত্তোর কিডনি দিন, আপনজনকে কিডনি দিন, কিডনি বেচাকেনা আইনত .....। বাইরে নাকি খুব গরম, ভিতরেও। মানুষ হাঁশফাঁশ করে। একটু বৃষ্টি চায়, পৃথিবী ঠাণ্ডা হওয়া দরকার। বৃদ্ধার ছেলে কতগুলো গল্পের বই রেখে গেছে। আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়ার চেষ্টা করি, গ্রামের বেশিরভাগ ছেলেরা ভালো পড়ুয়া হয় না। বই পড়া শহুরে বিলাসিতা তবু আমি পড়ার চেষ্টা করি। পড়তে পড়তে খেই হারিয়ে ফেলি, পড়তে পড়তে কখনো উদাস হয়ে যাই। আর কে যেন রোজ একটা স্প্রাইটের বোতলে একটা নিঃসঙ্গ রজনীগন্ধার ডাটা গুজে রেখে যায়, বোতলটা কেবিনেটের পিছনে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি তাকে দেখতে পাই না। টের পাই মাঝরাতে যখন ঘ্রাণ ছড়ায়। কখনো সে বোতল ছেড়ে আমার কাছে এসে বসে, মাথায় হাত বুলিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে কি বলে। কখনো দু’লাইন গান শোনায়। আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। 

মাঝে মাঝে রোগির লোকজন দূর থেকে আমাকে দেখেই চলে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় যাকে আমি কিডনি দিচ্ছি তিনি কি আমাকে দোয়া করবেন যেন আমি আর কোন ধাপ্পাবাজের হাতে ধরা না খাই! মাঝে মাঝে মনে হয় যে লোকটা আমাকে পথে বসিয়েছে তাকে যদি আমি কিডনি দেব বলে ঠিক করতে পারতাম তাহলে খুব মজা হতো। যেদিন কিডনি দেয়ার কথা থাকতো সেদিন যে করেই হোক আমি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যেতাম, ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সোজা মুন্সিগঞ্জ, ভবের চর। হাওয়া হা হা বিলে ছোটবেলার মত ঘুড়ি উড়াতাম। মাঞ্জা দিতাম সূতায় আচ্ছা করে, সবারটা কাটা পড়তো আমার সূতায়। এদিকে ভোকাট্টা হয়ে সেই লোকটার লোকজন আমার পিছনে ঘুরতো! কি ভালো যে হতো! 

মামিকে দেয়া মেসেজের দশদিনের পাঁচদিন বাকি থাকতে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকি। এর মধ্যে আমার ব্যাংকের কাগজপত্র এক কেবিন বয়ের কাছে গচ্ছিত রেখেছি। মা জানে আমার একাউন্ট, তো এবার সব ঠিকঠাক, জীবনে একটা কাজ অন্তত গুছিয়ে করতে পারলাম, মৃত্যুতে আর ভয় কী!। 

ওটি এত ঠাণ্ডা, আমার শীত লাগে মাঘ মাসের রাতের মতো। ওটির ড্রেসে শুয়ে আছি, নেংটা নেংটা লাগা ছাড়া অনুভূতিতে তেমন কিছু কাজ করে না। চারিদিকে যন্ত্রপাতি, তালের শাঁসের মত ঝুলে থাকা বাতি আর অদূরে আরো একজন শুয়ে আছেন, আমি তার উপস্থিতি অনুভব করি। তিনি নিশ্চয়ই আমার খালাম্মা। আমার মায়ের না দেখা বোন, আমারও না দেখা খালাম্মা। 

আমি কাকে যেন বলি, আমাকে অজ্ঞান করবেন? উত্তর দেয় না। যেন উত্তর না দেয়াই নিয়ম। নার্সগুলো দূরে দূরে, দেখে মনে হয় এরা প্রেতাত্মা, মমতাহীনও। 

মাথার কাছে ঘড়ি থাকলে বুঝতে পারতাম কয়টা বাজে। হয়ত ঘড়ি আছে, আমি তো চোখই খুলতে পারছি না। দুপুরের আগে ঢুকেছি, এখন কি বিকাল? নাকি রাত হয়ে গেছে? নাকি সকাল? কিন্তু চোখ না খুলেই আমি বুঝতে পারি, আসলে এখনও দুপুর, অপারেশান এখনো শেষ হয়নি। কাটাকাটি চলছে, আঁচড়ের মোলায়েম অনুভূতি, ফিশফিশ কথাও চলছে। আমি চোখ বন্ধ করেই অনুভব করি, একটা লোক আমার মাথার কাছে, সে কথা বলছে না। আমার মনে হচ্ছে সব মনোযোগ আমার কাছে, মূল রোগী বৃদ্ধা তাদের কোন বিষয়ই না। আমার কিডনিটাই তাদের সবচেয়ে আরাধ্য, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু। যাকে দেয়া হবে তাকে নিয়ে কোন কথা নাই, সে ফালতু বুড়ি একটা। ছেলেরা আদেখলাপানা করলেই কি তাকে এমন একটা তরতাজা কিডনি দিতে হবে নাকি! পেটটা খানেক কেটে সেলাই করে দাও হে, ছেলেরা সান্ত্বনা নিয়ে থাকুক। 
আমি ঠিক শুনছি, -- হ্যাঁ, এমএসসির কপালটা ভালো, এমন তরতাজা কিডনিটা সে পেল এত তাড়াতাড়ি, শালারা টাকা দিয়ে সব কিনে নেয়। স্যার উপরে অপেক্ষা করছেন এমএসসির পেট ফেঁড়ে। বিদেশ থেকে নামি ডাক্তারও উড়ে এসেছে এই কাজের জন্য। আমার রুদ্ধ কণ্ঠ, সারা শরীর অবশ, ওরা শুধু কিডনি কেন, বুড়োটার যা যা অকেজো আমার যুবক তাজা দেহ থেকে এক এক করে সব নিতে পারে, এমনকি আমার শক্তিশালী পুংলিঙ্গটা পর্যন্ত। এমএসসির জন্য আমার পুরো বডিটা নিলেও কিচ্ছু করার নাই। অভিভাবকহীন আমি। এমএসসি কি দশ লাখ দিয়ে ডাক্তারদের কাছ থেকে কিনে নিচ্ছে কিডনিটা? নাকি আরো বেশি দামে! হায়, এখানেও মধ্যস্বত্বভোগীরা! আমি পাবো মোটে চার, যদি বেঁচে বের হতে পারি! বাকি ছয় ডাক্তাররা! নাকি অথোরিটি! এমএসসির ভবিষ্যত আছে, দেশেবিদেশে তার ব্যবসা, চাইলে দেশের রাজনীতিও সে হ্যান্ডেল করতে পারে, কিংবা কে জানে এখনই তা করছে কিনা! বুড়ির আর আমার আছেটা কী! 

বুড়িটা মানে আমার মায়ের না দেখা বোন, আমার না দেখা খালাম্মা। আমার আর তার মধ্যে পার্থক্য কী, বাঁচলেও চলে, মরলেও চলে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন