শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

মোজাফ্ফর হোসেন'এর গল্প : শেষ মাথাটি কাটাপড়ার আগে

ঘুম থেকে উঠে যা দেখলাম তাতে আমার মাথা ঘুরে গেল। প্রতিদিনের অভ্যাস-মতো বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা ঠিক করে নিলাম। সমস্যা সেখানে না, এরপর যখন রোজকার মতো বারান্দায় দাঁড়িয়ে পথচারীদের একবার দেখে নিতে চাইলাম মাথাটা তখনই ঘুরে গেল। প্রথমে চক্কর দিয়ে ওঠে, মুহূর্তেই মনে হয় পড়ে যাব নিচে। বারান্দা উপর থেকে নিচ পর্যন্ত গ্রিল দিয়ে আটকানো, পড়ে যাওয়ার কোনো শঙ্কা নেই, কিন্তু মনে হলো আমি পড়ে যাচ্ছি। অবিশ্বাস থেকে ফের নিচে তাকালাম। রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে মাথাবিহীন মানুষ।
রিকশাচালকের মাথা নেই, যে লোকটা মুদির দোকানে বসে আছে কিছু বিক্রি করবে বলে তার মাথা নেই, যে কিছু একটা কিনবে বলে দাঁড়িয়ে পকেটবিহীন টিশার্টের বুকে বারবার পকেট খুঁজে হয়রান হচ্ছে তারও মাথা নেই। ফুটপাতের উপর নিচ দিয়ে যারা হাঁটছে কারো মাথা নেই। একটা মোটরসাইকেল চলে যায় চোখের পলকে, মাথাবিহীন চালক, মাথাবিহীন পেছনে কেউ বসে। ফুটপাতে দুজন পড়ে আছে, মৃত কিংবা জীবিত, মাথা নেই তাদেরও। কাঁধের উপর মাথা যেখানে থাকে সেখানটা এমনভাবে ভোতা যেন কোনোদিনই এদের মাথা ছিল না। মাথাবিহীন অন্যরকম এক প্রাণীজগতের বাসিন্দা মনে হয় নিজেকে। 

আমার তখনও বিশ্বাস হয়নি। ভেবেছিলাম স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্নে তো কতকিছুই দেখি আমরা--সবকিছুর কি মাথামুণ্ডু থাকে! এরপর ঘরে এসে বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে পানির ছটা দিয়ে নিই। দেখি সব ঠিকই আছে। তলপেটে প্রস্রাবের চাপ অনুভব করলে হালকা হয়ে নিই। সাবানের পাশে মিনিপ্যাক শ্যাম্পু আছে। সানসিল্ক। শেভিং ফোম থাকলেও আফটার শেভ ফুরিয়ে গেছে। কোনো কিছুই এতটুকু অন্যরকম হয়নি। আবার বাইরে এসে দেখি, একই দৃশ্য। নিশ্চয় কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে। দেখার ভুল তো অবশ্যই। 

রেবেকা? ছোটবোনকে ডাক দিই। ও আসে না। ফের ডাকি। সাধারণত এক ডাকেই চলে আসে কিংবা আসতে না পারলে উত্তর নেয় পাশের ঘর থেকে। আজ এ মুহূর্তে না আসার অনেক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু আমার মাথায় তখন অন্য চিন্তা। আমি নিজেই যাই রেবেকার খোঁজ নিতে। ঘর থেকে বের হতেই চোখে পড়ে মাকে। মাথা নেই। শাড়ি দেখে চিনে নিতে সমস্যা হয় না। মা আলু কুটছে বটিতে। মাথা নেই কিন্তু কাজ করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তার। তাতে আশ্চর্য হই না। মা এভাবেই সংসারে রোবটের মতো কাজ করে যাচ্ছেন বহু বছর ধরে। মাথা থাকা না থাকাতে তার কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা না। এরপর বাবাকে দেখি। তিনি হাতে পেপারটা ধরে আছেন। শেয়ার বাজারে ধস নামার পর থেকে তিনি সকাল সন্ধ্যা পেপার খুলে বসে থাকেন। কিছু পড়েন কিনা বোঝা যায় না। পেপারে যে ছবিগুলো ছাপা হয়েছে সেখানেও কারো মাথা দেখি না। একজনের পাঞ্জাবি পরা ছবি, আঙুল তোলা, ছবির নিচে লেখা জনসভায় বক্তৃতা করছেন মন্ত্রী। বিনোদনের পৃষ্ঠায় ব্রা পরা নায়িকার বড় ছবি। মাথা নেই বলে আন্দাজ করা যায় না। নারীর এমন পোশাক থাকলে চেহারা দেখার খুব প্রয়োজনও থাকে না। 

মাথা নেই মানে কান নেই, চোখ নেই, মুখ নেই, নাক নেই। বাড়িতে কাউকে ডেকে কাজ হবে না। কেউ শুনবে না, কেউ দেখবে না, কেউ কথা বলবে না। দেহের এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যঙ্গ এক মাথাতেই কেন দেওয়া হয়েছে, এটা ভেবে সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিরক্তি আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই টের পাই, মাথা না থাকার কারণে মানুষে মানুষে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়েছে। পাশের বিল্ডিংয়ে আগুন ধরেছে, মানুষ পুড়ে মরছে, কেউ দেখছে না সে দৃশ্য। রাস্তায় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। গাড়ি চলছে। চালকের মাথা নেই। পথচারীও হাঁটছে মাথাবিহীন। মানুষ চাপা পড়ছে, রক্তাক্ত হচ্ছে পথ। মানুষ মানুষে ধাক্কা লেগে বদলে যাচ্ছে গন্তব্য। যে যাচ্ছিলো সামনে, ধাক্কা লেগে ঘুরে পিছনে হাঁটা শুরু করে। 

আমার এতক্ষণে মনে হয়, রেবেকা কোনো কারণে নিচে নেমে পথ ভুল করতে পারে, গাড়িচাপা পড়তে পারে, পথ ভুল করে ভুল বাড়িতেও চলে যেতে পারে। আমি রাস্তায় নামি রেবেকাকে খুঁজতে। মাথাবিহীন মানুষের সড়কে একমাত্র মাথাযুক্ত মানুষ হিসেবে আমার চলতে অসুবিধা হয়। মাথাবিহীন মানুষগুলোর মতো নিশ্চিন্তে হেঁটে যেতে পারি না দেখে কষ্ট বাড়ে। 

একটা গাড়ি তিন রাস্তার মোড়ে মাসহ শিশুকে থেতলে চলে যায়। আমি চিৎকার দিয়ে উঠি। শিশুটা তখনও বেঁচে। মাথা নেই, পা-দুটো কাটা গেছে গাড়ির নিচে। আমি চিৎকার দিয়ে আশেপাশের মানুষের কাছে সাহায্য চাই। কেউ এগিয়ে আসে না। কেউ শোনে না আমার ডাক। শিশুটির রক্তের মধ্যে ছটফটানি এবং রক্তের ভেতর ডুবে যাওয়ার দৃশ্যটি কেউ দেখে না। উল্টো দিকে চোখে পড়ে একটা লোক নারীর শরীর ভেবে এক কিশোরকে নগ্ন করার চেষ্টা করছে। আমি দ্রুত গিয়ে কিশোরকে সরিয়ে দিই। লোকটি সামনে হাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক নারীর বুকে হাত রাখে। লোকটি এবার আরও নিশ্চিত হয়ে তার শাড়িটা খুলে ফেলে। নারীটি চিৎকার দেয় কিনা বোঝা যায় না। মাথা না থাকলে মানুষের চিৎকার দেওয়ার, দ্রোহ প্রকাশ করার ভাষা থাকে না। মেয়েটির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে এমন দৃশ্য আরও চোখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত কোনো দৃশ্যের দিকেই যাওয়া হয় না আমার। সম্মুখে কিংবা পেছনে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারী অথবা শিশু। ছেলে শিশু কিংবা মেয়ে শিশু। কেউ দেখে না। কেউ শোনে না। কোনো দিক থেকে প্রতিবাদ আসে না। আমি প্রতিবাদ করতে গিয়ে দৃশ্যপটের জড়সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। 

একদল যুবক আসে সামনে থেকে। বিচ্ছিন্ন দল। কেউ কাউকে চেনে কিংবা চেনে না। পথ হারিয়ে ভুল পথে ভুল করে তারা এক হয়েছে বলে মনে হয়। তিনজনের হাতে চাপাতি। একজনের হাতে লোহার রড। অন্যজনের হাতে পিস্তল। চাপাতি হাতের যুবকেরা হাঁটার সময় ধারাল চাপাতি সামনে-পেছনে ঘোরাতে থাকে ব্যাটারি চালিত রোবটের মতো। খানিক পর পর পড়ে যাচ্ছে কেউ সামনে। কারো যেহেতু মাথা নেই, মাথা কাটা পড়ার সম্ভাবনাও থাকে না--কারো হাত কাটা পড়ে, কারও পা, কারও পেটের ভেতর থেকে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসে বাইরে। রড হাতে নিয়ে হাঁটা যুবকটির শরীরে যখন কেউ ধাক্কা খায়, তখন সে আন্দাজে বসিয়ে দেয় বরাবর। পিস্তল ধরা যুবক গুলি করেই যায় অনর্গল। কিন্তু গুলি শেষ। যেহেতু তার মাথা নেই, গুলি শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বোঝার কথা না। যুবকেরা চার রাস্তার মোড়ে এসে আলাদা হয়ে যায়। পায়ের নিচে ড্রেন উপচে পড়া নোংরা পানির মতো থকথক করছে রক্ত, নাড়িভুঁড়ি। মানুষগুলো যেহেতু দেখছে না, শুনছে না, মৃত-শরীরের পচা-গন্ধ নিতে পারছে না, কেউ যেহেতু চিৎকার করতে পারছে না, ফলে মুহূর্তের এই বীভৎস চিত্র জীবিত মানুষগুলোর ভেতর কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে না। তারা নির্বিঘ্নে হেঁটে যায় রক্তের ভেতর পা টেনে টেনে। তাদের যেহেতু মাথা নেই, পৃথিবীর কোনো কিছুতেই আর মাথাব্যথা হওয়ার দায় থাকে না। 

আমার সঙ্গে ধাক্কা লাগে একজনের। আরেকজন এসে ধাক্কা দেয় পেছন থেকে। আমি চমকে উঠি। একটু আগে দেখা যুবকদের মতো এদের কারো হাতে চাপাতি কিংবা রড থাকলে আমার আর বেঁচে থাকা হতো না। বেঁচে থাকলেও হয়ত মাথা থাকত না। আমাকে আরও সাবধানী হয়ে চলতে হয়। মাথাবিহীন মানুষের মধ্যে মাথাসমেত মানুষের এ এক জটিল সমস্যা। 

আমি হাঁটতে থাকি, সামনে পেছনে তাকিয়ে। এতক্ষণে ছোটভাই রবির কথাও মনে পড়ে। রবিকেও বাড়িতে দেখিনি। রেবেকা আর রবিকে খুঁজতে খুঁজতে অনেকটা পথ হাঁটা হয়ে যায়। রুবিদের বাড়ির সামনে এসে রুবির কথা মনে পড়ে। রুবি আমার প্রেমিকা। পারিবারিকভাবে আমাদের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পথে। রুবির অবস্থা কেমন জানি না। ওদের বাড়ির গেইট খোলা। দারোয়ান বসে আছে মাথাবিহীন। আমি উঠে পড়ি দোতলায়। রুবির মা ড্রয়িংরুমের অ্যাটাচ বাথরুমে গোসল করছে, নগ্ন হয়ে। দরজা খোলা। সামনেই এক ছেলে বসা। মাথাবিহীন। পাশের ঘরে দরজা খোলা রেখে সঙ্গম করছে আরেক ছেলে। মাথাবিহীন সঙ্গমরত নারী-পুরুষ। মাথা না থাকার কারণে রুবির কোন্ ভাই কোন্ ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে সঙ্গম করছে বুঝতে পারি না। যেহেতু ওদের মাথা নেই, নিজেদের নগ্নতা ও যৌনতা নিয়ে ওদের কোনো মাথাব্যথা নেই। শাশুড়ির নগ্ন শরীর দেখা, হবু স্ত্রীর ভাই-ভাবির সঙ্গমদৃশ্য দেখা অনুচিত কাজ। আমার লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসে। মাথা থাকলে পাপবোধ থাকবে, লজ্জা হবে। আমি এসব দৃশ্যের সামনে মাথাটা লুকোনোর চেষ্টা করি। মাথার কারণে খুব বিব্রত হই নিজের কাছে। রুবিও এভাবে প্রকাশ্যে দিনের আলোয় নগ্ন হতে এবং অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে মিলিত হতে পারে ভেবে আমি চমকে উঠি। রুবির ঘরে যাই। ও বসে আছে বিছানায়। শরীরে কাপড় আছে দেখে আশ্বস্ত হই। মাথাবিহীন রুবিকে দেখে শুরুতে অস্বস্তি হলেও এতক্ষণে মাথাবিহীন মানুষ দেখে দেখে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে রুবিকে জড়িয়ে ধরতে আমার সমস্যা হয় না। রুবিও আমাকে জড়িয়ে ধরে। ও আমাকে চিনে না না-চিনে ধরেছে আমি নিশ্চিত হতে পারি না। রুবি আমার শরীরে এখানে-সেখানে হাত দিতে দিতে মাথায় হাত পড়ে যায়। ও ভুত দেখার মতো সরে যায় আমার কাছ থেকে। ওর শারীরিক অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারি, ভয় পেয়েছে। রুবিকে বোঝাতে পারি না, আমার এ মাথা থাকার পেছনে আমার কোনো হাত নেই। আমি ঘুম থেকে উঠে দেখেছি সকলের মাথা নেই, আমার আছে। আমারটা থেকে গেলে আমি কি করতে পারি! রুবি দেয়ালে ঠোকা খেতে খেতে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। আমার মাথা আছে বুঝতে পেরে ও ভয়ে চিৎকার করে কিনা বুঝতে পারি না। 

আমি নিরাশ হয়ে বের হয়ে আসি। আমার মাথা থাকার কারণে আজ রুবিকে হারাতে হয়। রাস্তার মোড়ে এসে রেবেকাকে পাই। পড়ে আছে রক্তাক্ত। কিন্তু মাথা না থাকার কারণে নিশ্চিত হতে পারি না। একই পোশাক, বয়স ও শরীরের গড়নের আরও নারী থাকতে পারে এই শহরে। গাড়িটি চাপা দিয়ে সামনে থানার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়ে আছে। ভেতর থেকে আহত ড্রাইভার বের হওয়ার চেষ্টা করছে। আমি গিয়ে ধরি ওকে। রেবেকার মতো দেখতে মেয়েটি রেবেকা হোক আর না-হোক এরকম প্রকাশ্যে মানুষ হত্যার প্রতিবাদ করা দরকার। আমার যেহেতু মাথা আছে, আমি চাইলেও প্রতিবাদ না করে থাকতে পারি না। মাথা থাকার এই এক অসুবিধা, এখন যা সকলের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, সেটাও মানতে পারছি না। দেয়ালে থানা লেখা দেখেই বুদ্ধিটা আসে। মাথা যেহেতু আছে, এমন বুদ্ধি আসা স্বাভাবিক ব্যাপার। তবুও নিজের চিন্তা করার ক্ষমতা দেখে নিজেই উদ্বিগ্ন হই। নিজেকে অস্বাভাবিক মানুষ বলে মনে হয়। পরিস্থিতির সঙ্গে খুব বেমানান ঠেকে নিজেকে। খুনি ড্রাইভারকে ধরে থানার ভেতর নিয়ে যাই। দেশে থানা-পুলিশ যখন আছে, নিশ্চয় কিছু আইনকানুন আছে--এভাবে নির্বিঘ্নে একজন অন্যজনকে হত্যা করতে পারে না! ডিউটিরত অফিসার টেবিলে বসা। মাথাবিহীন। আমি ড্রাইভারকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই তিনজন পুলিশ খুনি ড্রাইভারকে ছেড়ে আমাকে ধরে লকআপে ঢুকিয়ে ফেলেন। মাথাবিহীন মানুষের আরেক পরিচয় ওরা বোধবুদ্ধিশূন্য মানুষ। আমি ওদের কিছুতেই বোঝাতে পারি না। যার মাথা নেই তাকে বোঝানোর কোনো পদ্ধতি আমার জানা নেই। খুনি ড্রাইভারকে ওরা হ্যান্ডশেক করে ছেড়ে দেন। আমাকে বন্দি থাকতে হয় সারাদিন। সন্ধ্যার দিকে মাথাবিহীন দুজন পুলিশ একজন মাথাবিহীন বয়স্ক লোককে ধরে আনে। লকআপের তালা খোলার সময় আমি কৌশলে বের হয়ে আসি। 

থানা থেকে বের হতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মোড়ে একটা চেক-পয়েন্ট চোখে পড়ে। মাথাবিহীন পুলিশেরা দাঁড়িয়ে সারিবদ্ধ, যে মানুষগুলোর সঙ্গে তাদের ধাক্কা লাগছে তারা তাদের মাথা আছে কিনা হাত দিয়ে পরখ করে দেখছেন। হাতে তাদের ধারাল অস্ত্র। বুঝতে অসুবিধা হয় না, মাথা থাকলে কেটে ফেলা হবে। মাথাবিহীন মানুষের রাষ্ট্রে কারো মাথা থাকা নিশ্চয় অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এই মুহূর্তে মাথা থাকার কারণে নিজেকে অপরাধী মনে হয় আমার। হতে পারে আমি ছাড়া আর কারও মাথা নেই। কিংবা যাদের মাথা আছে, যাদের নির্দেশে এই শহর কিংবা গোটা দেশের, হতে পারে সমস্ত পৃথিবীর মানুষকে মাথাবিহীন করে দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে, তাদের মাথাটাই কেবল অক্ষত আছে। কিংবা আদৌ নিশ্চিত হতে পারি না এই মুহূর্তে দেশে কিংবা পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কোনো মানুষের মাথা আছে কিনা। 

মাথাবিহীন মানুষের মাঝে একা মাথা নিয়ে বেঁচে থাকা যে কত অভিশপ্ত তা আমি এরিমধ্যে টের পেয়েছি। আমি অবশ্যই বেঁচে থাকতে চাই। বোধবুদ্ধিহীন মানুষের মাঝে নির্বিঘ্নে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় এখন মাথাটা ফেলে দেওয়া। এ দায়িত্ব পালনে আমার সামনে খোলা অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, আমি গেলে ওরা অফিসিয়ালি আমার মাথাটা কেটে নেবে। অন্যদিকে কতগুলো যুবক খোলা চাপাতি হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে শহরে, পথে পথে। ওদের সামনে মাথা পাতলে, ওরাও কেটে দেবে। অফিসিয়ালি না আনঅফিসিয়ালি--কোন পদ্ধতি ভালো হবে? আমি ভাবি। যেভাবেই হোক, মাথা থেকে মুক্তি পাওয়া দরকার আমার, কিন্তু মাথা যেহেতু আছে, মাথা ফেলার এই পদ্ধতিগত চিন্তাটুকু তাড়াতে পারি না। 




-------------
ঋণস্বীকার:
পোলিশ এনিমেটেড শর্টফিল্ম ‘ড্যানি বয়’

৩টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ । সত্যিই মাথাবিহীন মানুষের মধ্যে মাথা ওয়ালা মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা দুষ্কর হয়েছে ।রাষ্ট্র ও চায় না দেশের মানুষের মাথা বলে কোন বস্তু থাকুক ।

    উত্তরমুছুন