শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

উপল মুখোপাধ্যায়ের গল্পঃ : ট্রিগার

পেডিয়াট্রিক এজমা

( ১)
মামন বলল,ট্রিগার নিয়েই চিন্তা। এত ট্রিগার। অডিওভিসুয়ালি দেখালো কত ট্রিগার হয়।`ধুলো- ময়লা , গন্ধ -সুগন্ধ খুব তেজি ,একদম চলবে না। ট্রিগার। বুম্বা বলল ,আর বদ গন্ধ খুব মৃদু সেও কি ..... 

- জানি না বাবা। বলল না তো কিছু।

- ওই ডাক্তার চলবে না।

- তুমিই তো খোঁজ দিলে।

- এমনি ভালোই, তবে বাচ্চাদের এজমার আলাদা স্পেশালিস্ট আছে - ডাক্তার ঘোষ।

- আমি ছোটাছুটি করতে পারব না।এ ডাক্তার ও ডাক্তার। মাসে পাঁচদিন কামাই হচ্ছে।

- ফিটলের স্কুল।

- আর আমার অফিস ?

- হোক।

মামন জোরে জোরে কথা বলতে থাকল। রাত হয়ে এল। ওর ম্যাক্সি উঠে উরু অবধি দেখা যাচ্ছে কিন্তু কিছুই হল না।বুম্বা চোখ তুলে তুলে হাতের তালু দেখছিল।ওপরে চোখ ও হাত উঠে পড়েছিল। হাতের ওপর থেকে বইয়ের ওপর ওর দেখা চলে গেল। অনেক বই দেখল। সেগুলো কিছু ওর কেনা কিছু মামনের। অনেক বই ওদের , এই ফ্ল্যাট ঠাসাঠাসি বই।ফিটলের বয়স পাঁচ সে খুবই দ্রুত দৌড়য় আর খুব তাড়াতাড়ি বড় হচ্ছে। যত বড় হবে ততই ওর আরো বেশি, বেশি বই লাগবে। আলাদা
ঘর লাগবে , বাথরুম লাগবে , স্যানিটারি ও ইলেকট্রিক ফিটিংস লাগতে থাকবে - সব বেশির দিকে। তাহলে কোনটা কমানো যায়। একদিকে ছেলের জায়গা বড় হবে কিছুর বিনিময়ে তো হবে। কারণ ফ্ল্যাট কমবে না বাড়বে না। বুম্বা ঠিক করেছে সে বই সরাবে,তাদের বই। বাবার আমলের কিছু বই আছে , মার্ বই আছে- শ্রী অরবিন্দের লাইফ ডিভাইন , সাবিত্রী--এই সব আছে। মার কটা চোখ ছিল। সে চোখে ছানি অপারেশন খুব ঝামেলার। সেটা চলে গেলে মা অন্ধ মূষিক হয়ে যাবে, সে মূষিক ধরার বাইরে যেতে পারেই। মাকে ছানি কাটার জন্য বারবার চেক আপে নিয়ে যায় বুম্বা। তখনো বিয়ে হয় নি, সে অফিস থেকে আসত আর মা দাঁড়িয়ে থাকত।চোখ ঠিকঠাক অপারেশন হয়। মার্ বইও সরাতে হবে। এছাড়া বই থেকে ধুলো হচ্ছে। যত পুরোনো বই ততো ধুলো।ধুলোয় সবচেয়ে বড় ট্রিগার , এজমা বাড়ায়। ফিটলের পেডিয়াট্রিক এজমা ধরা পড়েছে। ঘরে ঘরে এজমা হাঁফানি বাড়ছে , বড় হচ্ছে। রোগের জন্য জায়গা ছাড়তে হচ্ছে - বই সরছে। বুম্বা বিছানা ছেড়ে মামন ও ফিটলেকে ছেড়ে , বেডরুম ছেড়ে , ড্রইং কাম ডাইনিংয়ের দিকে এগোল যেখানে টিভি। ও টিভিতে নিউজ চ্যানেল দেখল। মুম্বাই শহর দেখানো হচ্ছে। কাল থেকে চলছেই। মুম্বাই আক্রান্ত।

(২)

শহর
একটা শহরের সব আক্রান্ত হতে পারে না। অত বড় শহর মুম্বাই তার ওপর সমুদ্রের ধারে। সব বড় শহরই আগে গ্রাম থাকে।তারপর নানান কারণে সেগুলো শহর হয়ে ওঠে। শহর হয়ে যাবার পর অনেক বছর চলে গেল - শতাব্দী। তারপর দেখা গেল সেই শহর নিয়ে খুব অসুবিধে হচ্ছে। হয়তো নদী শুকিয়ে গেল ,তার পাশে শহরটাও আস্তে আস্তে গুরুত্বহীন হয়ে অনামী অজানা হয়ে পড়ে রইল। কোথাও সমুদ্র দূরে চলে গেল , কোথাওবা ভূমিকম্পে মাটির নীচে গোটা শহর পড়ে আছে, কোথাও যুদ্ধে ভেঙ্গেচুরে ক্ষমতার আলো থেকে হীন হয়ে, জৌলুস চোটে গিয়ে শহর নষ্ট হয়ে গেছে। এরকম সব।এখন সময়ে শহরের মরে যাওয়া হয় অনেক ধীরে , আগের শহরকে পুরোটা না মেরে সেই নামের আশপাশে অনেক শহর তৈরী করে মারা হয়। টিভিতে মুম্বাই দেখাতেই পারে। কেউ না হয় কালাশনিকভ , গ্রেনেড আর রকেট লঞ্চার নিয়ে প্রকাশ্যে দোলাল তবু ব্যাপারটা কি শহর মারার মতো নৃশংস হবে ? বুম্বা ভাবছিল হঠাৎ আক্রমণ যাতে বোমা বন্দুক ভূমিকা নেয় আর এজমার মতো কিছু যা চারদিক অনিবার্য দখল নিচ্ছে কোন প্রদর্শন - দুলুনি ছাড়াই, অবশ্য এজমারও ট্রিগার আছে - ধুলো।বুম্বা জানলা খুললো , ব্যালকনির জানলা। বারন্দা দিয়ে দিয়ে রাতের আলো আসতে দিলো সেটা ঘর অবধি চলে যাবে। ও নিজে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করল, এবার আর আলো ঘরে যেতে পারে না। ফ্ল্যাটের কারু কোন অসুবিধে হবে না। সবাই সুবিধে মতো ঘুমোচ্ছে - মামন ,ফিটলে আর কেউ আছে কি ? অন্ধকার বারন্দায় দাঁড়িয়ে তিনতলার ওপর থেকে ঘরে আরো লোকআছে কিনা দেখা জরুরি। ওপর থেকে নিচে নামার কথাও ওর মনে হল তার জন্য আত্মহত্যার দরকার নেই। এই সময়শহরের গন্ধগুলো ওর কাছে আসতে লাগল, নানান খাবারদাবার ,সুন্দর আতর, ডিও , কোথা থেকে এসে ওকে কাছে নিল।
বুম্বা দেখল ও রাতের শহরের সব গন্ধে ডুবে আছে। কড়া থেকে নানান খাবারের গন্ধ আসছে যদিও সে রান্না দেখা যায় না।

বারন্দায় দাঁড়িয়ে বুম্বা ঠিক করে বসে কাল ছুটি , কাল মাংস আনতে হবে সঙ্গে মাছও , রান্না করবে, অসুখ থেকে ছুটি নেবে ,কাজে যাবে না সে ।কিছুতেই না।

৩)

স্থাপত্য

তবে ছুটি শেষ হয়ই। কাজের কথায় আসা যাক। কাজের কথা ভাবলে শহরের আর্কিটেকচারের কথা মনে পড়ে , কাজেরও স্থাপত্য আছে। যে দপ্তরটিতে , যে আপিস বাড়িটিতে বুম্বা কাজ করে তা দুশো বছরের অনেক বেশি পুরনো। এখানে নানানদপ্তর আছে তা সবই এক পুরোনো নয় প্রয়োজন মতো বাড়ি বেড়েছে। এখানে বাড়ি বা স্থাপত্য কেউ হঠাৎ ভাঙেনি। পরে বানালে বিবর্তন হয়ে তফাৎ হয়েছে। যেমন পুরনো তিনতলা বাড়ি চটকে চারতলা , পাঁচতলা হলে সেই বাড়ানো তলাগুলো আলাদা হতে পারে। তেমনি হয়েছে তাতে কাজের পার্থক্য হয় নি। কাজ একই আছে। কাজের মনোভাবও দুশো বছরেরঅনেক পুরনো। এই বাড়িতে কাজ করলে বাড়ির স্থাপত্যের মতো , শহরের আর্কিটেকচারের মতো একটা কিছু চেপে বসে বলেই বুম্বার মনে হয়েছে। এই করতে সে জানলার ওপারে স্টক এক্সচেঞ্জের দিকে তাকাল। এক্সচেঞ্জ ততো পুরনো না হলেওবেশ আগের বলেই মনে হয়। সেটা আপিসের দোতলা থেকে একশো ফুট দূরে মানে স্টক এক্সচেঞ্জের দোতলা। আর আপিসের গেট থেকে এক্সচেঞ্জের গেট একশো কুড়ি ফুট দূরে কারণ রাস্তাটি বঙ্কিম হয়েছে। রাস্তা বঙ্কিম বটে তবে ভঙ্গুর নয় , বেশ মোটা ও শক্তপোক্ত সেখানে বছর বছর বিটুমিন পড়ে বেশ পুরু , তার ওপর হকাররা বসলেও শহরের আর্কিটেকচার একই থাকে। এই বাণিজ্যিক কেন্দ্র মানে যেখানে বুম্বাদের হেড কোয়ার্টার আর স্টক এক্সচেঞ্জ আর তাদের আশপাশের অসংখ্য দুশো বছরের পুরোনো ব্যবসার নানান গিল্ড ও সিন্ডিকেটের ইতিহাস ধরলে বোঝা যেতে পারে উপনিবেশের চিন্তা। সেখানে প্রাচীনতম    গ্রন্থাগার আছে , সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক আছে যা মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ করে - টাকা। আর টাকার পরিমান এক হলেও তার চলাচলের গতিবেগ বেড়ে এই শহর তৈরী হয়েছে।এক্সচেঞ্জ আর হেড অপিসের মাঝে রাস্তার দূরত্ব আর চোখের পথে দোতলা থেকে দোতলার দূরত্বে কুড়ি ফুট ফাঁক আছে এ বুঝতে বুম্বার দশ বছর লেগেছে। এই দশ বছরে ও চাকরি বাকরি করেছে , কাজের মনোভাবে পড়ে ও বাড়ির ভাষা হারিয়েছে তবে সেটা কিছু পুষিয়ে দেয় রাস্তা যেখানে হকাররা বসে। সেখানে ওরা টিফিন করতে নামে আর নানান ভাষায় কথা বলে। ওপারেই কিন্তু স্টক এক্সচেঞ্জ আপিসের গেট থেকে একশো কুড়ি ফুট দূরে সে দাঁড়িয়ে।

বুম্বা ভাবল একটা আক্রমণ করলে হয় না ? আসলে দোতলা থেকে দোতলা অনেক চেনা মনে হয়।স্বভাবতই তা কাছেরও।

তাই স্টক এক্সচেঞ্জকে সে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করল। সে বলল , বোমা এখানেও ফাটতে পারে। অমিত বলল , ফাটতেই পারে। স্বপ্নাদি বলল, ফাটাতে ওরা ফিন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্টকেই বেছে নেবে।  বুম্বা জিজ্ঞেস করল , কারা। 

- যে কেউ হতে পারে।

- যে কেউ মানে ? আইডেন্টিফাই করতে হবে।

- সে আমি কী করে করব।

- তোমার কথা হচ্ছে না।

- তবে কার কথা হচ্ছে।

- আক্রমণের কথা হচ্ছে।

- মুম্বাই।

- না মুম্বাই তো আক্রান্তই। কলকাতা।

- কলকাতায় টিভি দেখছে।

- কলকাতা টিভি।

- বোকার মতো.....ওটা চ্যানেলের নাম।

- আর নাম।

- তবে সত্যি , এখানেও ফাটতে পারে।

বুম্বা বলল, আমার মনে হয় ফাটলে স্টক এক্সচেঞ্জের সামনেই ফাটবে। অমিত বলল,ঠিক. স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে।

- কিন্তু স্টক এক্সচেঞ্জের সামনেই তো আমাদের অফিস।

- অফিস বলে নয় - হেড কোয়ার্টার।

- পাশাপাশি।

- এই তো মুশকিল।

- কিছু করার নেই। আর্কিটেকচার।

- না। টাউন প্ল্যানিং।

- আর কান্ট্রি প্ল্যানিং ?

- শহরের পাশেই গ্রাম।

- ব্যাস, হয়ে গেল।

- মোগল আমলে শহর আর গ্রামের মধ্যিখানে ফাঁকা জমি থাকত।

- এখনও আছে।

- মোটেই নেই।

- আছে , সেখানে ফুটবল একাডেমি হচ্ছে।

- মারাদোনা।

- মারাদোনাকে দেখেছিস।

বুম্বা বলল,  আমার বউ দেখেছে। দারুন ! ফর্সা ! বেঁটে মনেই হয় না ! সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেছিল। 

- মামন ?

- হ্যাঁ।

- আমরা কিন্তু সরে যাচ্ছি।

- কেন ?

- আমরা আক্রমণ নিয়ে কথা বলছিলাম।

- মুম্বাই আক্রান্ত কলকাতা নয়।

- সে জন্য।

- হ্যাঁ সে জন্য।

এই ভাবে সবাই আক্রমণ থেকে সরে যাচ্ছিল। বুম্বা ভাবল বলে, স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে দোতলার দূরত্ব আর আপিসের গেট থেকে স্টক এক্সচেঞ্জের দূরত্বের কথা।

- স্টক এক্সচেঞ্জের গেট আপিসের গেট থেকে একশো কুড়ি ফুট দূরে।

- মেপেছিস ?

- হ্যাঁ।

- কী ভাবে ?

- পা মেপে মেপে।

- পা।

- হ্যাঁ।

অমিত বলল , হাত মেপে দেখলে দেখতিস আরো বেশি।  বুম্বা বলছিল ,  হবে। তবে দোতলা থেকে ওটারদূরত্ব কম।

- মানে ?

- আপিসের দোতলা আর স্টক এক্সচেঞ্জের দোতলা।

- কেমন ?

- চোখের মাপে।

- ও।

সবার খিদে পেয়েছিল ও ঘুম ঘুম পেয়েছিল। আপিসের মধ্যে ঘুমনো যায় না। তাই সবাই টিফিন করতে চলে গেল। কেউ কেউ বাড়ি থেকে খাবার আনে , বুম্বা আনে না। সে বাড়ি থেকে খাবার আনতে ভুলে যায়। খুব তাড়া থাকে তাই ভোলে আবার অনেক সময় এনেও খেতে ভুলে যায়। তাই রাস্তায় নেমে ও খাবার খায়।এই রাস্তার খাবারের ব্যাপারে বড় বড় পেটের ডাক্তারের মত হচ্ছে - রাস্তায় অনেক শস্তায় টাটকা খাবার পাওয়া যায় শুধু বাসনপত্র ধোয়া হয় না তাই রোগে র সম্ভবনা থাকে। এই কারণে ধুলোর মধ্যেও হকারদের খাবার বিক্রি হচ্ছে , সকলে খাচ্ছে আর খোলা গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে।মাঝেমাঝে সেই সব গন্ধ ফেনিয়ে ফেনিয়ে গুরুতর ঘ্যাম ফাইন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্টযের বড় বড় এস্টাব্লিশমেন্টগুলোতে ঢুকে পড়ে, বুম্বাদার হেডকোয়ার্টারও বাদ যায় না। সেখানে মাছ ভাজার গন্ধ , মাংস কসার গন্ধ , চাউমিনের গন্ধ সব আসে। এসে গন্ধ ঘোরে। বুম্বার ভালো লাগে - সকলের কল্পনায় খাবার ডাই করা চলে। তাতে অবশ্য কিছু আসে যায় না - কাজ কাজের মতো থাকে , নির্ধারিত দায়িত্ব একই থাকে , প্রশাসনিক হেডকোয়ার্টারের স্থাপত্য থেকে কাজকেও একই রকম রেখে দেয়। সেখানে একই রকম সব চলে আসছে উপনিবেশের আমল থেকে। যতই খাবার দাবার খাওয়া যাক এর কোনও হেল দোল নেই যদি না কোনো আক্রমণ হয়। আর হলে তা যে স্টক এক্সচেঞ্জ আর হেড কোয়ার্টারের সামনের রাস্তাতেই হবে। এরপর হবে কমান্ডোব হানা , তারপর হবে গ্রেনেড বিস্ফোরণ , তারপর আগুন জ্বলবে - হতেই থাকবে, এ ব্যাপারে আপিসের সবাইকে ভাবাতে পেরেছে ভেবে বুম্বার মজা হচ্ছিল। সে টিফিন করতে করতে হাসছিল।

( ৪)

ট্রিগার

টিভি নিয়ে এক মুশকিল হয়েছে।তাতে খুবই খবর থাকে। সারা পৃথিবী্, দেশ ও আক্রমণের খবর কিন্তু ছবির মান খুবই খারাপ। অর্ধেক বোঝা যাচ্ছে না। সামনে টিভি চলছে মুম্বাইতে আক্রমণ চলছে বর্ণনা আছে,ছবিও, তবে অনেক কিছু স্পষ্ট নয়। এমন হতে পারে সে সব যে কেউ তুলেছে। চারদিকে ক্যামেরা , এর ওর হাতে মোবাইল বিশেষ করে মুম্বাইতে টেলিডেনসিটি তো একশো শতাংশ ছাড়িয়ে কোথায় পৌঁছল কে জানে। ওখানে আক্রমণ হল, অনেক ছবি এমনিই উঠে যাবে সে সব ধারাবিবরণীর মতো টিভিতে ঢুকে যাবে -যত বড় ঘটনা ততো বড় ফুটেজ। আসল ঘটনা যখন ঘটল টিভির লোকজন ক্যামেরা নিয়ে পৌঁছতেই পারেনি কিন্তু ছবির খামতি নেই কোথাও , গাদা গাদা চ্যানেলে লাইভ স্ট্রিমিং হতেই থাকছে। তবু বুম্বা বিশেষ করে নজর করছিল বন্দুকের দিকে যেখান থেকে গুলি ছোঁড়া হচ্ছে। সে দেখল ক্যামেরার ফোকাসিং বন্দুকের দিকে নয় যে বন্দুক ছুঁড়ছে তার দিকে। গুলি ছোঁড়া আক্রমণকারীর ঘ্যাম চেহারাটা ধরাই ওদের উদ্দেশ্য। বেঁচে গেলে ওই লোক বা ছেলে অথবা মেয়ে কেউকেটা হবে সে তার বিচারে ফাঁসি হোক বা না হোক।আর ফাঁসি হলে কেউকেটা হওয়ায় তার সাতবার ফাঁসি হবে অন্তত মিডিয়া তা করে দেখাবে। সে জন্য ক্যামেরা দেখা যাচ্ছে -তাক করে আছে আক্রমণকারী কে,তার অস্ত্র একদম আবছা। বুম্বা খুব চেষ্টা করে অস্ত্রটির সঙ্গে চোখের পথে যতদূর কম সম্ভৱ দূরত্ব রচনা যেমন সে করে থাকে আপিসের দোতলার ঘরে বসে স্টক এক্সচেঞ্জের দোতলার সঙ্গে।চোখের দেখায় ওই দূরত্ব পায়ের মাপের থেকে কম। হাতের মাপে আরো কমবে কি ?

 সে জানে এ শহরে আক্রমণ হলে ওখানেই হবে -আপিস আর স্টক এক্সচেঞ্জের মাঝে।বুম্বার খুব কাছেই হবে। তারপর কী হবে নির্ভর করবে কে কোথায় থাকবে তার ওপর যা কেউ জানে কি ? অনেক চেষ্টা করেও বুম্বা বন্দুক আর তার নির্ধারক অংশগুলোর খোঁজ পাচ্ছে না। টিভিতে দেখা যাবে না ধরে নিয়ে বুম্বা ভাবছিল চোখের দেখার কথা। এই দেখতে দেখতে ও মামনকে দেখল , ফিটলেকেও দেখতে পেল। সবাই ঘরেতে রয়েছে।

রাত হয়ে আসছে। এবার খাওয়া দাওয়া হবে। সবাই নিঃশ্বাস নেবে। ফিটলের নিঃশ্বাসের কষ্ট হয়েছে, ওকে নিঃশ্বাস নিতে হবে। কষ্ট হলেও। অনেক ট্রিগার, সে সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কাল একবার ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

টেস্টগুলো হয়ে গেছে , আর একবার ভালোভাবে দেখে কাউন্সেলিং করে তার পর ওষুধ দেওয়া হবে।বুম্বাকেও যেতে হবে। সমস্ত বই সরাতে হবে , নড়াতে হবে , ধুলো রাখা যাবে না , সুগন্ধি রাখা যাবে না, খাওয়া দাওয়া নিয়ে বারণ থাকবে , ধূমপান করা যাবে না। আর সব করা যাবে। তারাও সব খাওয়া দাওয়া খেয়ে নিল।তারপর বুম্বা মামনকে বললো, চল শুই।

মামন শুয়ে পড়ল তার ম্যাক্সি উরু অবধি উঠল , বুক অবধি উঠল , বিছানা আঁকাবাঁকা হল আরো কিছুকিছু হল। সবাই খুব ভালো ভাবে নিঃশ্বাস নেয়। বুম্বা এরপর টিভিটাকে নিঃশব্দ করে চালালো। সে দেখল টিভিতে স্পষ্ট দেখানো হচ্ছে মুম্বাই মুক্ত হয়েছে সেখানে আর কোনো আক্রমণকারী নেই। টিভির ছবি এত স্পষ্ট যে ঝকঝক করে।বুম্বা ইচ্ছে করে টিভিটা অস্পষ্ট করে দিল তারপর বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দরজা বন্ধ করে শহরের আলো আর খাবারের গন্ধ শুঁকতে লাগল। বইগুলো কাল সরিয়ে বস্তা বন্দি করে রাখবে। একে একে বস্তাগুলো বিক্রি করবে। মার্ বই ,ওর নিজের বই-ধূলো ও পূরনো,সব সরিয়ে ফেলবে তারপর ফিটলেকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে। শহরের গন্ধ তার কাছে আসছিল তার মধ্যে নানান ট্রিগারও আছে। বুম্বা আবার আক্রমণের কথা ভাবতে থাকে। তার সামনে স্টক এক্সচেঞ্জের পুরনো বাড়ি, যে হেড কোয়ার্টারে তার আপিস সব উঠে আসছিল। সে চোখের দূরত্ব আর আসল পায়ে হেঁটে দূরত্বের তফাৎ নিয়ে ভাবে।

এক্সচেঞ্জের বাড়ি সরানোর কথা ভাবে। এক্সচেঞ্জ সরে যায় , ক্রমশই সরে যেতে থাকে। সরে সরে শহর ও গ্রামের মাঝামাঝি ফাঁকা জায়গায় স্থান নিল। সেখানে মারাদোনা এসে ফুটবল একাদেমি করেছে। খুব ফর্সা আর সুন্দর একদম বোঝা যায় না এত বেঁটে । বল নিয়ে ছুটতে থাকে কাটায়,কাটায় আক্রমণ করে । শহরের সব স্থাপত্য আর কাজের আর্কিটেকচার ভেঙে পড়ে,শুয়ে পড়ে। বুম্বা এসে মামনের শরীরে শোয়, দেখে মামন নেই বিছানা পড়ে আছে। আরও অনেক ঘর হয়েছে। সেই অনেক ঘরের ভেতর দিয়ে,সুন্দর করিডোর দিয়ে বুম্বা হাঁটতে থাকে।

সব অস্পষ্ট আলোয় ঝলমল করছে। 

সারা বাড়ি থেকে ধূলো ও বই খারিজ করে ওরা ফিটলেকে নিয়ে বিকেলে ডাক্তার দেখাতে গেল। ডাক্তারবাবু রিপোর্ট দেখে,ওষুধ দিয়ে বড় স্ক্রীনে ছবি দেখিয়ে ওদের বোঝাতে সুরু করলেন। বুম্বা দেখল তাতে বড় বড় করে ট্রিগার শব্দটা ভেসে উঠেছে -ট্রিগার। বুম্বা আক্রমণকারীর বন্দুক দেখতে পাচ্ছিল স্পষ্ট । সেই সময় ঘরটা অদ্ভূত খাবারখানার গন্ধে ভরে গেল যেমন শহর রাতে বারন্দায় দাঁড়ালে পাঠিয়ে দেয় অথবা আপিসে কিছু সুগন্ধিও এল - আতর নাকি ডিও।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন