শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

হামিরউদ্দিন মিদ্যার গল্প: শালি নদীর হড়পা বান

বানটা প্রথম দেখেছিল বাসেদ সেখের রাতবাঘা ব্যাটা মজিদ সেখ।গ্রামের মানুষের কাছে এখন সেটা বড় কথা নয়।কে আগে দেখেছে সে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করার সময়ও নয় এটা।এখন ঘোর দুর্যোগ! এই দুর্যোগ কাটানোর জন্য মানুষ এখন উপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করছে।

এবছর নামেই বর্ষা,কাজে নয়।অন্যবছর পুকুর,নালা-ডোবা,মাঠ-ঘাট সবই পানিতে টইটুম্বুর হয়ে থাকে।শালি নদীর পেটটা পোয়াতি বউয়ের মত হয়ে যায়।কিন্তু এখন সবই শুখা শুখা।অবশ্য 'খরার দেশ' নামে রটনা আছে এই জেলার।
তা বলে বর্ষাতে পানি হয়নি এমন হাল মজিদ কখনো দেখেনি।আষাঢ় মাসটা ঢিমেতালে কাটতে কাটতে শ্রাবণ মাস পড়তেই পানি ও খাদ্যের ফেরেশতা মিকাইলের দিলে এই শুখা দেশের ধরিত্রীর ওপর রহম জেগেছে। তবে সে কুলোয় ঢালা পানি নয়,খামখেয়ালি ঝিমঝিম করে দু-এক পশলা। যাদের নদীর ধারে জমি তারা টানটান পানিতে আমনধান রোয়ার কাজ শেষ করেছে।একেই তো নামী করে চাষ,তার ওপর পানির টান।ডাঙা টিলা জমির চাষীরা নদীর গাবায় পাম্প লাগিয়ে হুশহুশ পানি তুলেছে। মজিদের বিঘা তিনেক জমির রোয়া কাজ শেষ।সবই নদীর ধারে দখল করা ভেস্টের।কী যে হিড়িক লাগল তখন!নদী পাড়ের মানুষরা গাইতি,কোঁদাল,টাঙনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে লেগেছিল। বাসেদ সেখ তখন তাগড়া মরদ।মজিদকে নিয়ে নদীর পাশে আগলে ছিল কিছুটা।রাতদিন খেটেখুটে, মাটি-ফাটি তেড়ে চাষের উপযোগী করে। খোদা মেহেরবান বছরে একবার খেত ভরা ধান দেয়।বাকি সময় আলু,ডিংলে,মুলোর চাষ।

বউকে হারানোর পর মজিদ আবার বউ পেয়েছে, কিন্তু রফিকুল তার মাকে ফিরে পায়নি।দাদি যতদিন বেঁচেছিল মায়ের অভাবটা বুঝতে পারেনি।এখনো দাদোর ন্যাওটা। রাতে দাদোর কাছেই শোয়।মাটির দু-কুঠরি খড়ের ছাউনি ঘরটার পুবধারের মেঝেটায় মজিদের বাপ থাকে।নদীটা এখান থেকে খুব কাছাকাছি। কতগুলো মাঠ পেরলেই বাঁশবনের আড়াল।কান পাতলে পানি বওয়ার কুল কুল শব্দ কানে আসে।

মজিদ বিছানায় উঠে বসল।কচি মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে চুকচুক করে দুধ খাচ্ছে।কচির মা বলল,কী হল গো তুমার?আজ আবার কুথা বেরুবে?

ভাবছি একবার পলুইটা লিয়ে বেরুব।সারারাত তো পিটির পিটির পানি লাগিয়েই রেখেচে,বাদাবনে মাছের হাউশ্ লাগবেক ভাল।

তুমি রাতবাঘা যাচ্চ যাও,খুকাকে উঠোও না বলে দিচ্চি।মরে ছেলে,রেতের বেলা কিসের উপর পা দিবেক!

সে তুমার চিন্তা নাই।আমি কী রাতবাঘা,রফিকুল আমার থেকুও এক কাট উপরে।

বাঁশের আগলটা ঠেলে মজিদ বাইরে বেরল।আসমানের পানে মুখ তুলল।কোনো তারা ফুটে নেই।গাভীন মোষের বেঢপ পেটের মতো কালো কালো মেঘগুলো সারা আসমান জুড়ে আকুলি বিকুলি করছে।নরম বতরে ব্যাঙ ডাকছে ঘ্যাঙরঘ্যাঙ ঘ্যাঙরঘ্যাঙ। সেই সঙ্গে ঝিঁঝিঁ পোকার গান।খঞ্জনির তাল দিচ্ছে ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে উইচিংড়ের দল।সব মিলিয়ে মিশিয়ে মনে হচ্ছে বাদগী পাড়ার শ্মশান তলায় হরিসংকীর্তনের মতো।

মেঝের ভেতর বাসেদ কাশছে,খক খক করে।শালার ধুকোটা বিড়ি খেয়ে খেয়েই মলো গো!__কাশির শব্দে মজিদ তিতিবিরক্ত হল বাপের ওপর।ত্রস্ত পিঁড়ের ভেতর হেট হয়ে ঢুকল।এঘরের দরজাটা ঠেসানো আছে।এক হাতে ঠেলা মেরে সামান্য ফাঁক করে চেয়ে দেখল,মেঝের ভেতর আব্বার শিথান তলে লন্ঠন জ্বলছে টিমটিম করে।হলুদ আলোটা অনেকক্ষণ ধরেই দমবন্ধ অবস্থায় ছিল, মুক্তি পেতেই ছুটে বেরিয়ে গেল মজিদের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে।রফিকুলের ঘুমন্ত মুখের পানে চেয়ে উঠাতে মন সায় দেয় না। কিন্তু না নিয়ে গেলে খালুই ধরবে কে?

মেঝের ভেতর টুপটাপ করে পানি পড়ছে খোকা।চালাটা বাগা এবার!

মজিদ বিরক্ত হল বাপের বারবার এই আবদারে।__রেতের বেলা কানের গুড়ায় ফ্যাচর-ফ্যাচর কর না দিনি!পালুই এ খড় কী লাফাচ্চে?সব তো পুড়িয়েই শ্যাষ হল।এই অসুময়ে খড় বেচবেক কে!

রফিকুল,এই রফিকুল__কানখড়কা রফিকুল জেগে গেল।

আয় বাপ, মাছ ধরতে যাব।

চোখ কচলে কচলে রফিকুল পিঁড়েতে নামল।

তুর দাদোর ছাতাটা সঙ্গে লিয়ে চল খুকা।__বলে ঘরের ভেতর থেকে সার্জার টর্চটা বের করে আনল মজিদ।পিঁড়ের দেওয়ালে এখানে ওখানে পেরেক পেটানো,পেরেকে নানারকম হাবিজাবি জিনিস তুলা আছে।মাছ রাখার খালুইটা পেড়ে রফিকুলের হাতে দিল।মজিদ নিজে নিল ভারি পলুইটা।

টর্চের আলো ফেলে ফেলে মজিদ সামনে হাঁটছে, রফিকুল বাপের পেছন পেছন।লুঙির কোচরে গুঁজে রাখা বিড়ি বের করে ধরাল মজিদ। অন্ধকারে লাল বিন্দুটা একবার বাড়ে,একবার কমে।রফিকুল বলল,আমাদের আগেই যদি কেউ যেয়ে ঘেটকিয়ে দেয় আব্বা,তাইলে তো মাছই পাবুনি।

ধুর খ্যাপা!বাদাটা কী ছোটখাটো?তবে আগে যেতি পারলে লাভ আছে,দল-দাবড়ার ভেতরে মাছ লড়বেক ভাল।

জমির আল বরাবর হেঁটে হেঁটে ওরা নদীর ধারে চলে এল।নদীর এধারে সারি সারি বাঁশবন,বাবলা,বেনাঝোপ,তাল-খেজুরের গাছ।পাড়টাকে ভাঙনের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বিড়িটাই শেষ টান মেরে মজিদ ছুড়ে ফেলল নদীতে।পলুইটা কাঁধের বা-পাশ থেকে ডান পাশে করল।আচমকা নদীর দিকে আলো মেরে মজিদ বলল,পানিটা বেড়েচে মুনে হচ্চে খুকা!বিকালে দেখলাম চরগুলো ডুবেনি,আর এখন দেখ একটাও চর বেরিয়ে নাই।__রফিকুল তাকাল নদীর পানে,কিন্তু কোনো সায় দিল না।

কাদার ওপর চলতে ছপছপ শব্দ উঠছে।আঁধার রাতে বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে আচমকা কোনো রাতজাগা পাখি ভয়ে ডানা ঝাপটায়। ঝোপঝাড়ের ভেতর নাদুস-নুদুস জাড় ব্যাঙগুলো কুবকাব ঝাপ মারে নদীতে।

ঘোরের মধ্যে থেকে মজিদ বলে,তুই বান দেখেছিস খুকা?

না দেখি নাই।

হঃ দেখেছিস।

না,দেখি নাই বলছি।

তুই দেখেছিস,কিন্তু মুনে পড়তেছেনি।তখন তো তুই পা পা করে চলতে শিখেছিস।খুকারে এই শালী তুর মাকে খেল,ঘরবাড়ি খেল...

রেতের বেলায় ওসব কথা বল না আব্বা।আমার ডর লাগে।__মজিদ চুপ করল।চলতে চলতে রফিকুল আচমকা প্রশ্ন করে,বান কেনে আসে আব্বা?

মানুষকে কাঁদালে যেমন কাঁদে,হাসালে হাসে,রাগালে রাগে।নদীও তেমনি পারা।__রফিকুল বাপের কথার মানে বুঝতে পারে না।

বাদাবনের কাছাকাছি একটা নালা।নদীতে পানির বেগ থাকলে নালা দিয়ে পানি বয়ে যায় ভাড়ালগোড়ের মাঠের পানে।টর্চের আলোয় কালো কালো তালের মতো দুটো মাথা নালাতে নড়ছে।কাছে যেয়ে মজিদ বলল,কী বে লেউলে,রেতের বেলায় মাগ-ভাতারে জাল এড়েছিস?তা মাছ কেমন উঠচে বে?

লেউলের বউ ফিকফিক করে হাসল মজিদের কথা শুনে।এই নির্জন নিঃস্তব্ধতাকে খানখান করে ভেঙে দিয়ে লেউলের বউয়ের হাসিটা চরাচর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।লেউলে বলল,মাছ কুথায়!পতি ক্ষেপে শুদু দু-চারটা পুঁটি মাছ!

পুঁটিমাছের চরচরানি/ভাত দে লো পাটের রানি...গুন গুন করতে করতে ঝাপিয়ে সরু নালাটা পেরল।নালার পর শুরু হয়েছে বাদাবন।

নদী এখানে ধ্বস ছেড়ে ছেড়ে খাল-ডোবা,সরু সরু অজস্র নালার সৃষ্টি করেছে।ধান চাষ হয় না।ঝোপঝাড়, নলখাগড়া,কাঁশবন,আর কলমি-কচুরিপানার রাজত্ব।দলদাবড়ার ভেতরে কই,ল্যাটা,চ্যাং,মাগুর এমনকি পুকুরের দেশি রুই-কাতলাও ঘুরে বেড়ায়।শুধু কী মাছ?ফকিরডাঙার ঝোপের কব্বরের ভেতর থেকে বুড়ো ফকিরও নাকি পানির ভেতর মাছের সুরত ধরে ঘাপটি মেরে থাকে।কেউ যদি ভুল করেও পলুই এ চেবে দিয়েছে,তো সে আর এগোতেও পারে না,পেছতেও পারে না।পানির ভেতর শুঁড়ের মতো কী যেন জড়িয়ে পায়ে ধরে।টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় নদীর পেটে।__সেই কোন যুগ থেকে কথাটা শুনে আসছে মজিদ।ভাগ্য ভাল তেনার কখনো পাল্লায় পড়েনি।

লুঙিটা সেঁটে পাছার তলা দিয়ে গলিয়ে পেছনে গুঁজে মজিদ নেমে পড়ল হপর হপর,রফিকুল প্যান্ট গুটিয়ে বাপের পিছু পিছু।এই বাদাবনে বর্ষায় আধ হাঁটু পানি থাকে।

টর্চের আলো ফেলে ফেলে মজিদ স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে লক্ষ রাখছে পানির দিকে।কোথাও দলদাবড়ার ভেতর মাছ নড়ে উঠলেই ঝপাং করে চেবে দিচ্ছে পলুইটা।তারপর বা-হাত দিয়ে পলুইটা চেপে ধরে,ডান হাত পলুই এর ফুটো দিয়ে গলিয়ে হাতড়াতে থাকে।মাছ চাবা পড়লে অভিজ্ঞ হাত খপ করে মাছের টুঁটি চেপে ধরে বের করে আনে।পলুই এর ছোট্ট চৌহদ্দির মধ্যে মাছ বাবাজীর আর বেরনোর উপায় থাকে না।মাছগুলো রফিকুলের হাতের খালুইটাতে ভরে দিচ্ছে।

গাভীন মোষ গুলো আসমানে চরতে চরতে ঢুস করে ধাক্কা খেতেই ঝিমঝিম করে পানি নামাল আবার।রফিকুল নিমেষে খালুইটা বগলে গলিয়ে নিয়ে ছাতাটা ফুটাল।মজিদও আশ্রয় নিল ছাতার তলে।আঁধারে স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পায়ের পাতায় পানির টান অনুভব হচ্ছে।মজিদ ভাবল ভাগ্যিস আব্বার বুড়ো ছাতাটা এনেছিল।এ শালার ছাতা বটে একখানা!ভাঙতে ভাঙেনি। অথচ পাটজোড়ের হাটে সে কত ছাতা কিনেছে।একটাও টেকেনি__একটু জোরে হাওয়া দিলেই ফড়াস!মজিদ উপর পানে চাইল।এ তো ছাতা নয়,যেন আস্ত একটা ছাউনি!এই যে লম্বা কাঠের বাটটা,এটা পূর্বপুরুষের মেরুদণ্ড। আর এই জালিকাকার ছিপগুলো সব পূর্বপুরুষদের হাড়-পাঁজড়া।সমস্ত পূর্বপুরুষরা মাথার ওপর ছাউনি হয়ে যেন তাদের রক্ষা করছে।এর তলায় ঢুকে গেলে আর কোনো চিন্তা নেই।

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই রফিকুলের প্যান্ট ভিজে গেল।বৃষ্টিটা কমেছে।মজিদ বলল,এতো পানিতে কুথায় মাছ লাফাচ্ছে বুঝা মুশকিল।

তাইলে চলো,আর এট্টু ডাঙা পানে যায়।

ডাঙায় মাছ লাফাচ্ছে!

বাপের এই রাগের কারণ খুঁজে পায় না রফিকুল।তবে বোঝে,বেশি মাছ না পাওয়ায় আব্বার মেজাজটা খিঁচড়ে আছে।সেই থেকে ঘুরে ঘুরে মোটে গোটা তিনেক কই,আর কয়েকটা ল্যাটা মাছ।

আগের বছরেও বর্ষায় বাদায় মাছ ধরতে এসেছিল রফিকুল।মুষলধারে বর্ষা নেমেছিল তবু এত পানি থাকেনি,অথচ এবারে সেভাবে বর্ষায় নামেনি তাও বাদায় এতো পানি!__ব্যাপারটা মাথায় ঢুকে না রফিকুলের।হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থম মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল মজিদ।চুপ খোকা,চুপ!

রফিকুল কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করল।

পানি আছড়ানোর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ পাচ্ছিস খুকা?__বলেই বাদার বাবলা গাছের পানে টর্চ মারল মজিদ।ভয়ে থরথর কাঁপছে।বাপকে এমন কাঁপতে দেখে রফিকুলের খুব ডর লাগল।মজিদ নিমেষেই একবার আশপাশটা চেয়ে দেখে কী বুঝল কে জানে!ত্রস্ত রফিকুলের হাতটা হ্যাচকা টান মেরে ধরে ছুটতে লাগল।উঠ উঠ,টপ টপ উঠ খুকা!বান আইচে রে!সব শ্যাষ করি দিবেক।এই শালী কাউকে ছাড়বেনি, তুর মাকে খেইচে,আরও অনেককে খাবেক!__হপর হপর করে দুইজন ডাঙায় ওঠে।হস হস করে নিশ্বাস নেয়।হাঁপাতে হাঁপাতে মজিদ বলল,মাছের হুবে আমরা আজ মরতে বসেছিলাম রে!শালার খিয়ালই নাই।চো চো তাড়াতাড়ি চো।গাঁয়ের লোককে খবর দিইগা।

আসার সময় যে পথে এসেছিল ওরা,সেই বাঁশতলার নীচে দিয়ে পানি বইছে।কী প্রচন্ড স্রোত! কী তার গর্জন!এমন স্রোত দেখে মজিদের গায়ের লোম গুলো খাঁড়া হয়ে গেছে।পড়িমরি করে ধানবাড়ির আলপথ দিয়ে ছুটতে থাকে দু'জন।গ্রামে পৌঁছে দেখে পানির শব্দে অনেকে উঠে পড়েছে।বাগদী পাড়ার মানুষরা টেনেটুনে ঘরের জিনিস বের করে নিচ্ছে।

(দুই)

অনেকবছর নদীটা এইভাবে ফুলে-ফেঁপে ওঠেনি।সেই যে একবার হয়েছিল 'কাল'বান!তখন রফিকুল আড়াই বছরের।সেদিনের কথা ভাবতে মজিদের গায়ে কাঁটা দেয়।সেই বান কলজেটাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে গেছে।এই জন্য মজিদ তার চোদ্দপুরুষের নামে গালিগালাজ দেয়,শালারা ঘর বাঁধার আর জায়গা খুঁজে পাইনি!পানি বাড়লে নদীর কিছু এসে যায় না,এসে যায় নদীপাড়ের জন-জীবনের।নদী ঠিক তার পথ করে নেয়।সেবার আসমান ফুটো হয়ে গেছিল,আর মিকাইল কুলোয় করে পানি ঢালল।রাত্রে শুয়ে আছে সবাই।হঠাৎ ভোরের দিকে রফিকুল কোঁকিয়ে কেঁদে উঠে।ধড়মড় করে উঠে পড়ে রফিকুলের মা।মজিদ মোষের মতো ঘুমচ্ছিল। রফিকুলের মা ঠেলা মারে,এই শুনছো,কই গো তাড়াতাড়ি উঠো।

হয়েচে কী?

হা দেখো,ঘরের ভেতর পানি ঢুকে গেছে।বিছানা-টিছানা সব ভিজে সপসপে। 

ওদিকে পাশের ঘরে মজিদের বাপ-মা জেগে বসেছে।নিমেষেই মজিদ রফিকুলকে কোলে তুলে নেয়।ভীত দৃষ্টিতে পাঁই পাঁই করে চোখগুলো ঘুরিয়ে দেখে নেয় আশপাশটা।কিছু শোনার চেষ্টা করে।চারিদিকে সোরগোল পড়ে গেল,বান আইচে গো!বান...

কিছু আর নেওয়ার সময় পায় না মজিদ।হড়াস করে পানির স্রোত ঘরের ভেতর আছড়ে পড়েছিল।রফিকুলকে কাঁধে তুলে নিয়ে রফিকুলের মায়ের হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।মজিদের বাপ-মাও বেরিয়ে পড়েছিল।আঁধারে চেয়ে দেখে চারিদিকে সাদা কাপড়ের মতো থৈ থৈ পানি।কী প্রচন্ড স্রোত!কোন দিকে পথ,আর কোনদিকে খাল-ডোবা মালুম হয় না।পা টিপে টিপে এগোচ্ছিল।হঠাই হুমড়ি খেয়ে রফিকুলের মা পড়ে গেল আঁধারে।আর উঠতে পাড়েনি।খ্যাপা মোষের মতো পানির স্রোত গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে নিয়ে যায় শালীর পেটে।রফিকুলকে শক্ত করে ধরে মজিদ উঠেছিল সাবেরালীর দু-তলা দালান কোঠায়।অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিল।মজিদের মা বলেছিল,তুর বউ কই মজিদ,তুর বউ কই?

হাওমাও করে কেঁদে উঠেছিল মজিদ।সে আর নাই গো!স্রোতে ভেসি গেছে!

তিনদিন তিনরাতের পানিতে সরু কেঁচোর মতো লিকলিকে নদীটা কেলে সাপ হয়ে ছোবল মেরেছিল পাড়ের গ্রাম গুলোকে। কত যে ঘরবাড়ি ধ্বসে পড়েছিল!গোরু-ছাগল,হাঁস-মুরগি, মানুষ ভেসেছিল নদীতে।মোসলমান পাড়াটা তাহলে নদীর থেকে দূরে,কিন্তু বাগদী পাড়ার কিছুই আর রাখেনি।সবাই আশ্রয় নিয়েছিল গ্রামের দালান বাড়ি গুলোয়।ইস্কুল ঘরে। বিডিও এসেছিল, রিলিফের গাড়ি এসেছিল,সাংবাদিক এসেছিল।সেই থেকে নদীটা ধ্বস ছেড়ে ছেড়ে অনেক চওড়া হয়ে গেছে। 

বাসেদ মেঝের ভেতর শুয়ে শুয়ে খকখক কাশছে।আমি কী কিছু বুঝি না ভাবচিস?সব বুঝি,সব টের পাচ্চি।

মজিদ খেকিয়ে উঠল,তা টের পাচ্চ তো হয়েচে কী?ফু দিয়ে পানিটা কমিয়ে দিবে?

রফিকুল দাদোর ঘরে প্রবেশ করে। শুনো দাদো পানিটা বাগদী পাড়ার ভিতর দিয়ে বইছে।আমাদের এদিকপানে আসতে বহু দেরী! 

আমাকে একবার লিয়ে চল না ভাই।

তুমি বুড়ো মানুষ কী কত্তে যাবে?ভিড়েমিড়ে কে কুথায় ঠেলি দিবেক!

বাসেদের বয়স নব্বইয়ের ওপরে।সেকালের খাঁটি আখের গুড়,বুটের ছাতু খাওয়া মানুষ। গ্রামে ওর বয়সী কোন জন নেই।শুধু পোদোর পাড়ে বুড়ো অশোক গাছটা ইতিহাস বহন করে চলেছে। 

বাগদী পাড়ার মানুষরা ঘরের জিনিসপত্র বের করে তুলেছে মোসলমান পাড়ায়।একটু বেলা বাড়তেই ধানবাড়ি গুলো এক গলা পানির নীচে।বিভিন্ন গ্রাম থেকে সাইকেল, মোটরবাইকে চেপে বান দেখতে এসেছে।চারিদিকে হৈ হৈ চৈ চৈ।যেন কোন উৎসব! এপাড়ের শীবডাঙা,লাগারডাঙা,করচমনি,পোলশোড়া,অলিগঞ __ওপারের কামারডাঙা,পাটজোড়,বৌলা,পর্বতে,রপটগঞ ঘেঁষে সোনামুখী পর্যন্ত থৈ থৈ পানি। সব গ্রামের একই অবস্থা! পানির কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে কয়েকশো মানুষ।কেউ মোবাইলে ছবি তুলছে,ভিডিও করছে।নদীর ওপাড়ের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।ওধারেই হাসপাতাল,অফিস-আদালত।সকালে যারা পেরিয়ে ছিল,তারা ফেরার পথে খুবই বিপদে পড়ে।নদীর নীচ থেকে এক তালগাছ উচু ব্রীজের উপর দিয়ে একহাঁটু পানি বইছে।বাধ্য হয়ে কাঁধে সাইকেল নিয়ে, বউরা ছেলে কাঁকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এপারে আসছে।মজিদ চোখে চেয়ে দেখতে পারে না এসব।যেখানে তার ধানক্ষেত, সেদিকে শুন্য দৃষ্টিতে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। 

ঘরে ফিরতেই কচির মা বলে,কী গো সকাল থেকে যে তুমি মুখে কিছু তুল নাই?নিজেকে এইভাবে শাস্তি দিলে হবেক?ধান তো তুমার একলার যায় নাই,গাঁয়ের বেবাক মানুষের গেছে।

গাঁয়ের বেবাক মানুষের শুধু চাষটাই ভরসা লয়,তাদের অন্য রুজগার পাতিও আছে। কিন্তু আমার ধানগুলো চলে গেলে সুমবচ্ছর খাব কী?হায় আল্লা!__মাথায় হাত দিয়ে মজিদ বসে পড়ল।কচির মা খেতে দিল।মুখে তুলতে মজিদের রুচি হয় না। কোনমতে দু'মুঠো খেয়ে হাত ধুয়ে উঠে পড়ে।

শুনো কচির মা,শুধু ধানের চিন্তায় লয়।আমাদের ঘরটা মোসলমান পাড়ার সব থেকে বাইরে।পানির বেগ যে হারে বাড়ছে তাতে রেতের বেলাতেই আর থাকবেনি।

ও আল্লা!তুমার মুখে কী কুনু কথা বাধে না?ওসব কুলক্ষুণে কথা মুখে আনতে নাই গো!__কচির মায়ের বুকে হাহাকার। 

গ্রামের প্রবীণরা মাথায় হাত দিয়ে হায় হায় করে ওঠে। এ কী আল্লার গজব পড়ল গো!এদিকে পানিই হয়নি,তবু নদীতে বান!

যারা টিভিতে-রেডিওতে খবর শুনেছে তারা বলে,এদিকে পানি নাইবা হল।পশ্চিমে প্রচুর পানি হইচে।বাঁকুড়ার টাউনে রাস্তাঘাট সব ডুবে যান চলাচল বন্ধ!

ভিড়ের মধ্যে একজন ফোড়ন কাটল,হঁ গো হঁ।সতীরঘাটের দুতলা দালানবাড়িটা ধ্বসে পড়ল।এত পানি যাবেক কুথায়?সব শালার গড়িয়ে গড়িয়ে এই পুবে ধেয়ে আসছে।রেতে পানি কুমলে ভাল,নয়তো সবার কপালে দুঃখু আছে।

(তিন)

বিকালের মধ্যেই পানিটা উঠে এল মোসলমান পাড়ার কাছাকাছি মজিদের ঘরের উঠোনে।গ্রামের অনেকে পরামর্শ দেয় মজিদকে,দেখ বাপ,মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলে চলবেকনি।পানি কুমার তো কুনু লক্ষণ দেকতিছিনি।জিনিসপত্র বের করে কারও বাড়িতে পার করে রাখ।

মজিদ বাঘের মতো হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাল পানির দিকে।তারপর লেগে পড়ল তাড়াতাড়ি। অনেকে মজিদের সঙ্গে হাত লাগাল।গ্রামের সব থেকে বড় চাষী সাবেরালী মন্ডলের দালান কোঠায় তুলল নিয়ে গিয়ে।

রফিকুল দাদোকে ঠেলে উঠাল।দাদো,ও দাদো,চলো এবার।

বাসেদ ঘুমোচ্ছিল।ধড়মড় করে উঠে বলে,কুথায় যাব ভাই?

পানিটা চলে এইচে উঠোনে।ফাঁক পানে বেরুবে চলো।

মজিদ ঘরের ভেতর ঢুকে বাপকে তুলে সোজা করে দাঁড় করাল।এই মাস তিনেক বিছানাতেই পড়ে রয়েছে।কচির মা,রফিকুল ধরে ধরে 'বার বসাতে' নিয়ে যায়।বুড়োকে মাঝে রেখে মজিদ ও রফিকুল দুইপাশে ধরে ফাঁকে বেরল।বুড়ো পেছন পানে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,তুর বউ কই মজিদ?

ওরা সাবেরালীর ঘরে উঠেছে, তুমি চলো।

আমার ছাতাটা লিইচিস তো?

হঁ সব লিইচি,তুমি চলো।

আকার লাঠিটা? 

হঁ সব লিইচি।

হাঁটতে হাঁটতে বুড়ো থম মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল।ঘোলাটে দৃষ্টিতে পানির দিকে চেয়ে ফোকলা দাঁতে হেসে বলল,এই বান দেখে এতো ভয় পাচ্ছিস কেনে বাপ?এ তো হড়পা বান রে!এতো ডরের কী আছে!এমন বান জেবনে কত দেখেচি।

চলো চলো,ওখান থেকুও দেখতি পাবে।

সাবেরালীর বউ মনোয়ারা তালাই বিছিয়ে দিল মজিদের বাপকে।মনোয়ারা বলল,হ্যাঁ গা মজিদের বাপ,তুমার মুনে পড়ছে?আগের বারেও তো আমাদের ঘরে এসে উঠেছিলে।চাচি তখন বেঁচেছেল।

সন্ধে ঘনিয়ে পড়েছে।অনেকেই ভিড় জমিয়েছে এখানে। ভিড়ের মধ্যে নাসু মন্ডল বলে ওঠে,তুমাদের মতো মজবুত ঘর গাঁয়ে আর কাদের আছে বলদিনি চাচি?

গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে আঁধার রাত নামল।বাগদী পাড়া,মোসলমান পাড়ার কেউই রাতে শোয়নি।বস্তা-তালায় বিছিয়ে এর তার ঘরের পিঁড়েতে,ধাপে,ছাদে বসে আছে।এখন হিন্দু-মোসলমান, ধনী-গরীব সবার জীবন একই সুঁতোই বাঁধা।কোলের বাচ্চা কোঁকিয়ে কেঁদে উঠলে মায়ের বুক ধড়াস ধড়াস করে।গ্রামের কুকুরগুলো আসমানে মুখতুলে তারস্বরে হু-উ-উ-উ ডাক পাড়ে।

সাবেরালীর দালানের ছাদে উঠে বসেছিল গ্রামের কিছু মাথাওয়ালা মানুষ।ওরা একসময় নীচে নেমে এসে ভিডটা আরও বাড়িয়ে দেয়।কবরেজ জিকিরুল্লা বলল,শুনো গো,এ বুড়ো ফকিরের কাজ।ফকিরডাঙার ঝোপ তো ডুবে গেছে।কব্বরের ভেতর দিয়ে যত গল গল করে পানি ঢুকছে,বুড়ো ফকির ততই রুষ্ট হচ্ছে।কতবার বলেছি,ওগো জায়গাটার একটু পরিচর্চা করো।সেই কুন কাল থেকে ফকির সাহেব ছেল মোদের গাঁয়ে।আমার কথা তো বাপু কেউ কানে লাওনি!

মাছচাষী মালু সেখের দুটো পুকুর ডুবে গেছে।মেজাজটা খুব খারাপ।ধমকে থামিয়ে দিল জিকিরুল্লাকে,তুমার ওই আলবাল কথা এখন তাকে তুলে রাখদিনি!ফকির সাহেব রুষ্ট হয়েচে!সব শালার ধান্দা!ওখানে মাজার করে কবিরাজী ফলাবে লাই?__জিকিরুল্লার চোখদুটো মরা মাছের মতো হয়ে গেল।হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে রইল।

গ্রামের ইমাম সাহেব হন হন করে সামনে এসে দাঁড়াল।ঘর থেকে চেয়ারটা বের করে বসতে দিল সাবেরালীর ব্যাটা।

হালচাল কী বুঝছো গো জি?

শুনো ভাইসকল,গাঁয়ে সেরেকি গোনাহ প্রচন্ড বেড়ে গেছে।আল্লার রাস্তায় মানুষ আর যাচ্ছে না।টিভি-সিরিয়ালে সব মেতেছে।ছেলেছোকরারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করে।লুকিয়ে ছাপিয়ে মদ-গাঁজা খায়।তাতে কী শুধু ছেলের দোষ!এই পাপের অর্ধেক ভাগীদার ছেলের বাপ-মা।ছোট থেকে মক্তবে,মাদ্রাসায় না পড়িয়ে__একটু ঢোক গিলে দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে নিল ইমাম সায়েব।আবার বলল,বানে,মানুষের ফসল গেছে,ঘর-বাড়ি পড়েছে।এ যখন খাদ্য ও পানির বৃদ্ধি জনিত সমস্যা,তখন নিশ্চয় মিকাইল ফেরেশতা মোদের প্রতি রুষ্ট হয়েছে। তারজন্য আল্লার দরবারে দুইহাত তুলে মোনাজাত করেন সবাই।

বাগদী পাড়ার কয়েকজন বসে আছে ভিড়ের মধ্যে। সর্দার ষষ্টিচরণ ভাবল,কতদিন পর আবার সব এককাছে হলাম।আগে মোসলমান পাড়ার লাগোয়া ঘরছিল বাগদীদের।দুটো পাড়াকে আলাদা করে চেনা যেত না।ফলে অনেক সামাজিক সমস্যায় পড়তে হয় বাগদীদের।ভিন গাঁয়ে ছেলে মেয়ের বিয়ে দিতে গেলে নানা কথা শুনতে হয়।নেড়েগুলোর সাথে মিশে মিশে নাকি নেড়ের মত স্বভাব হয়েছে।সহজে কুটুম্ব করতে চাইত না কেউ।তাই একে একে নদীর দিকে সরে পড়েছে সব।ষষ্টীচরণের পুরনো দিনের কথা মনে পড়ল আজ।বাগদীরা এখনো তাকে সর্দার হিসেবে মান্য করে।ওর কথাতেই ওঠে বসে। কালো কালো নিরীহ মানুষগুলো আঁধারের সাথে মিশে আছে।মুসলমানদের মোনাজাত করতে দেখে ওরা মা কালী,বিপদতারিণীর নাম জপে।

পানিটা এখন মজিদের ঘর পেরিয়ে মোসলমান পাড়ার গোড়ায়।একজন বলল,দেখ মজিদ,ভাগ্যে ঘরের জিনিসগুলো বার করে এনেছিলি,এখন দেকগা ঘরের ভেতর পানি ঢুকে গেছে।

বাগদী পাড়ার অধিকাংশ ঘরই মাটির ঝিঁটেবেড়া খুপরি,কেউ কেউ ইন্দিরা-আবাসের টাকায় ইটের বাড়ি তুলেছে।ধপাস-ধস শব্দ করে অনেক খুপরিই পড়ে গেছে।বিড়িতে টান দিতে দিতে ষষ্টীচরণ বলল,তুমাদের মোসলমান পাড়ার তো কুনু চিন্তা নাই গো!ধানগুলো গেলেও, ঘরগুলো রইল।আর আমরা হলাম জলের পোকা।জলের ধারে বাস।কথায় বলে না,লদীর ধারে বাস/চিন্তা বারোমাস।সেই যে ভিটেছাড়া হলাম একবার!কত রকম প্রতিশ্রুতি দিল সব।তবু শিক্ষে হল নাই শালাদের।আবার সেই লদীর ধারেই ঘর বাঁধলাম।আবার ভিটেছাড়া!

মালু সেখ মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল,এ কী বলচিস বে ষষ্টে?ক্ষতি শুদু তুদের হইচে?মোসলমানদের ক্ষতি হয় নাই?আর আমাদের ঘর-দুয়োরের কী এমন ভরসা আছে?

মজিদের বাপ শুয়ে শুয়ে সব শুনছিল।ওর চারপাশে এবাড়ির বউ-ঝিরা ঘুমে ঢলছে।হঠাৎ নদীর ধার থেকে জনাকয়েক ছুটে এসে জানায়,শুনো গো সবাই,শুনো-ও-ও।পানি কমছে,পানি কমছে।

সঙ্গে সঙ্গে ছুটাছুটি পড়ে গেল।ভিড়টা হালকা হল অনেক।যাদের হাতে টর্চ আছে,তারা পানি দেখল।পানি এখন মজিদের ঘরের কাছাকাছি চলে গেছে।ঘরটা একদিকে কাত হয়ে গেছে।

ইমাম সাহেব কানে হাত দিয়ে আজান দিল।মোসলমানরা দুই হাত তুলে মোনাজাত করল,ও আল্লা এই গরীব-দুঃখীদের ওপর রহম করো।ছেলেপুলের মুখ চেয়ে ধানগুলো বাঁচিয়ে রাখো।

মজিদের বাপ খক খক করে কেশে বলল,তুদের শুদুতেই লাফালাফি, শুধুতেই কুদাকুদি!প্রেথম দেখেই বলেচি,এ হড়পা বান।হড়পাবানে ধানের কিছুই হবেকনি।বড়জোর দু-চারটা গুছি পড়েমো লাগবেক।'কাল'বান পেয়েচিস,যে পলি পড়ে যাবেক!

দাদো তুমার কথায় ঠিক গো!পানি হড় হড় করে নেমে যাচ্ছে।

ভোরের দিকে মজিদের ঘরটা ধপাস করে ধ্বসে পড়ল।__এ কী হল গো আমাদের!বলে কচির মা নাকে কান্না জুড়ে দেয়।

মেহের মোল্লার ব্যাটা অঞ্চল অফিসে কাজ করে।গ্রামের সুবিধা অসুবিধা দেখে।সে বলল,তুমি কাঁদো না গো চাচি।মাঝখান থেকে তুমরাই তো লাভ করে লিলে।মোসলমান পাড়ায় আর কারু ঘর তো পড়েনি।সকালে বি.ডি.ও সাহেব যখন পরিদর্শন করতে আসবেক,তখন ঘরটা দেখিই নামটা খাতায় তুলা করিই দিব।

আকবর সেখ বলল,সোধরুলে আমার গুয়াল ঘরটা গেছে,সকালে ভুলে যাস না যেন!

আজ সকালে লাল টুকটুকে সূর্য উঠেছে।মুঠো মুঠো রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে শালীনদীর দু'পাড়ে।

৭টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো লাগলো। প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে অনেক গল্প লেখা হলেও এই গল্পটার একটা অন্যরকম মাত্রা আছে ।

    উত্তরমুছুন
  2. তোমার প্রতিটি গল্পের মতো এটাও মন ছুঁয়ে গেল ।গদ্যটাও খুব টান টান।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. ধন্যবাদ আপনাকে।নামটি প্রকাশ করেননি,তাই বুঝতে পারলাম না কে।

      মুছুন
  3. তোমার গল্প পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকি, আজ একটু সময় পেয়ে পড়লাম। ভালো লাগল খুব। (জঙ্গিপুর,মুর্শিদাবাদ)

    উত্তরমুছুন
  4. কী দারুণ ভাবে গল্পটা বলে গেছো ভাইটি। খুব খুব ভালো লাগলো। লেখালেখি চলতে থাকুক। শুভকামনা।

    নাহার তৃণা

    উত্তরমুছুন