শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

কাজী লাবণ্য'এর গল্প : খোঁয়াড়

বাইরে দরোজার শেকল আটকানোর ‘ঝনাৎ’ শব্দ টুবলুর কানে কাল বৈশাখীর সময় ঘন স্লেট বর্ণ আকাশের কড়কড় কড়াত করে বাজ বিজুলির শব্দের মত মনে হয়। ওর সারা শরীরে ঠাণ্ডা বিদ্যুৎ প্রবাহ বয়ে যায়। ঝটিতে সে দরোজার দিকে তাকায়, অর্থ না বুঝে আবার তাকায় সামনের চৌকিতে বসা নতমুখী শাবানার দিকে আর এর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝে শাবানা মুখ নিচু করে থাকে, টুবলুর দিকে তাকাতে পারেনা। নত মুখে সে চৌকির একটা জায়গা নখ দিয়ে খুটতে থাকে। মাথার উপরে ঘ্যার ঘ্যার শব্দে একটি ফ্যান ঘুরছে তার দুর্বল বাতাসে জানালার ততোধিক দুর্বল পর্দা উড়ছে, দূরে কোনো এক বাসায় গান বাজছে। টুবলু ভাষা হারিয়ে বিপন্ন মুখে চেয়ে থাকে শাবানার দিকে কিন্তু সে শাবানাকে দেখছিলনা। দেখছিল নিজের আসন্ন ভয়াবহ ভবিষ্যৎ। বাবা দাদা জানতে পারলে কি হবে!

এরকম অবস্থায় শাবানার কেবল মনে পড়ে অসহায় গরুর দুটি চোখ। ঠিক এই ঘরের পেছনে বাবার একটি বহু পুরনো খোঁয়াড় আছে। জন্মের পর থেকেই শাবানা এই খোঁয়াড় দেখেছে। কেউ যখন কোন গরু খোঁয়াড়ে ঢুকিয়ে দিয়ে খোঁয়াড়ের দরোজাটা টেনে সেটির মাথায় লাগানো শেকল বেড়ার গায়ের খুঁটিতে ঝনাৎ করে আটকে দেয় গরুটি তখন মুখ তুলে ঠিক এমন টুবলুর মত করে তাকায়। আর তখন বাবার চোখ দুটি চকচক করে ওঠে। বেশি বেশি গরু ছাগল খোঁয়াড়ে এলে বাবার মেজাজ মর্জি বেশ তোফা থাকে। 

খোঁয়াড় হচ্ছে জমির ফসল অথবা বসতবাড়ির বাগান বিনষ্টকারী গবাদিপশু আটক রাখার গারদ বিশেষ। মুঘল আমলে যখন সরকারি আয়ের প্রধান উৎস ছিল কৃষি, তখন জমির ফসল রক্ষার ক্ষেত্রে এই গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এ সময়ে অর্থনীতিতে গবাদিপশুর ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সরকার এবং জমিদারদের অনুমতি নিয়ে প্রায় প্রত্যেক গ্রামেই খোঁয়াড় ব্যবস্থা গড়ে ওঠেছিল। 

গ্রামে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে খোঁয়াড়ের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ । এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গবাদিপশু চুরি বা ফসল নষ্টের মত কিছু ছোটখাট অপরাধকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হত। 

এসব খোঁয়াড়, খেয়াঘাট, হাটবাজার ডাক হত। ডাক হলে সাধারণত গ্রামের কিছু মধ্যস্বত্বভোগী- ধান্দাবাজ মানুষ এসব ডেকে নিত এবং এ থেকে যা আয় হত তা দিয়ে এদিক সেদিক করে সংসার চালাত। 

** 

শাবানার বাবা জয়নাল খোঁয়াড়ের ব্যবস্থাপক। এই খোঁয়াড়ের জন্য জয়নালের নামই হয়ে গেছে ‘খোঁয়াড়ি’। জীবনের শুরুতে জয়নালের নিয়ন্ত্রণে হাটবাজার ছিল, খেয়াঘাটও ছিল। তখন জয়নালের দৈহিক ও আর্থিক অবস্থা ছিল রমরমা। সত্য মিথ্যা কে জানে লোকমুখে শোনা যায়, সেসময় প্রায় ৬ ফিট লম্বা গায়ে গতরে বলিষ্ঠ জয়নালের নাকি একটি ডাকাতের দল ছিল। ঘরে ছিল তিন তিনজন বউ। প্রথম বউয়ের কোন সন্তানাদি না হওয়ায় দ্বিতীয় বিয়ে করে সে। সন্তান হতে গিয়ে সে বউ মারা গেলে আবার তৃতীয় আরেকটি বিয়ে করে। তৃতীয়জন সন্তান দিয়ে জয়নাল খোঁয়াড়ির ঘর একেবারে ভরিয়ে দেয়। এই সন্তানদেরকে মানুষ করে বড়বউ আকলিমা খাতুন। সাইজে ছোটখাটো নিঃসন্তান আকলিমা খাতুন একটু শক্ত পোক্ত ধরনের হলেও মনটা মায়ায় ভরা। এখনও সংসারের হাল ধরে আছে এই বড় বউ-ই। তৃতীয় বউ বছর বছর সন্তান বিয়োতে গিয়ে আর খোঁয়াড়ির হাতের নির্মম মার খেতে খেতে এখন চির রুগ্ন শয্যাশায়ী। আর এই পঙ্গপালের মত ছেলেমেয়েকে বড় করার দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছে বড় বউ। এখন অবশ্য সেই পঙ্গপালের প্রায় কেউই নেই। ছেলেগুলো বড় হয়ে যে যার মত কোথায় কোথায় চলে গেছে, মেয়েগুলোর বিয়ে হয়েছে। এখন বাড়িতে থাকে শেষের দিককার মেয়ে শাবানা, ওর বাকি ৩টি ভাইবোন, দুই মা আর শাবানার বাবা জয়নাল খোঁয়াড়ি। আয় বলতে তেমন কিছু নেই কিন্তু পোষ্য অনেক। এজন্যে খোঁয়াড়ির মেজাজ সব সময় তিরিক্ষি হয়ে থাকে। প্রায় সময় নিরিহ ছেলেমেয়েগুলো বেধড়ক মার খায়। ওরা খোঁয়াড়ি বাপকে যমের মত ভয় পায়। 

শাবানা বড় হবার পর থেকেই খোঁয়াড়ির বাড়ির চারপাশে নানা ধরনের নানা বয়সের ছেলে পিলেদের আনাগোনা বেড়ে যায়। কারণে অকারণে ছেলেরা আসে, কেউ আবার খোঁয়াড়ি চাচার কুশল জানতেও আসে। এবাড়ি থেকে বিক্রি হয় মুরগির ডিম, গরুর দুধ এসব নিতে আজকাল ছেলেপুলেরা ভিড় জমায়। এবাড়ির রাস্তাই সবার স্কুল কলেজে যাবার একমাত্র রাস্তা হয়ে ওঠে। বিকেলে নদীর পারে হাওয়া খেতে যাওয়া বেড়ে যায় ছেলেদের। বাইসাইকেল গুলি খোঁয়াড়ির বাড়ির সামনে এলে ক্রিং ক্রিং বেল যেন আর থামতে চায়না। খোঁয়াড়ি বেশ মজা পায়। কাউকে কিছু বলে না বরং কাউকে কাউকে একধরনের প্রশ্রয় দেয়। জয়নাল খোঁয়াড়ি মনে মনে কিছু ছেলেকে টার্গেট করে রেখেছে। কিছুদিন ধরে এই ছেলেদের থেকে কৌশলে বেশ এটা সেটা আদায় করে সে। যেমন পাশের পাড়ার মঞ্জু। টার্গেট করা ছেলেদের মধ্যে সে একজন। বেশ সবচ্ছল পরিবারের ছেলে। কলেজে পড়ে। সকাল বিকেল তার এটাই রাস্তা। সন্ধ্যায় তাকে দেখলেই খোঁয়াড়ি ডাক দেয়- 

-কে যায়? মঞ্জু বাবা নাকি? ব্রেক করার জন্য মঞ্জুও রেডি থাকে, ত্বরিত সাইকেল থেকে নেমে এসে বলে - 

-জী চাচা। আসসালামুয়ালাইকুম। আজ আপনার শরীর কেমন চাচা? বলতে বলতে চাচার ডানে বামে পেছনে চঞ্চল চোখে তাকায়। কথা বলে চাচার সাথে চোখ খোঁজে অন্য কাউকে। ধান্দাবাজ খোঁয়াড়ির মঞ্জুরের চঞ্চলতা বুঝতে সময় লাগেনা। সেও হাঁক দেয়- 

-অই শাবানা! আরে একটা টুল ফুল দিয়া যা না। কই গেলিরে! শাবানা অতি দ্রুত নিজের গায়ের ওড়না ঠিকঠাক করে একটি ভীত পুতুলের মত একটা টুল বা মোড়া নিয়ে এসে দেয়। মঞ্জু সতৃষ্ণ নয়নে স্থির তাকিয়ে থাকে টুলওয়ালির দিকে। 

-কিরে, এতবড় ধিঙ্গি মাইয়া, খালি মোড়াটাই আনছিস আরে বলি ঘরে কি কিছুই নাই! মঞ্জুকে কিছু একটা খাইতে দেনা। আদব কায়দা কিছু যদি শেখে! ড্যাং ড্যাং করি পাড়া বেড়াইবে না সংসারের কাম কাজ কোন করবে... শাবানা কিছুতেই ভেবে পায়না কবে কখন সে পাড়া বেড়াতে গেল! বাপের ভয়ে সারাদিন ঘরের কাজ করতেই তো দিন পার হয়ে যায়। আর বাবা মঞ্জুভাইকে খেতে দিতে বলছে, ঘরে কি কিছু খাবার আছে! খাবার যে নাই তা তো বাবাও জানে। সন্ধ্যায় ছোট ভাই বোনগুলি খাবার চেয়ে মিয়ানো দুমুঠ মুড়ি ছাড়া কিছুই পায় নাই। ঘ্যান ঘ্যান করাতে অল্পের জন্য বাপের হাতের মাইর খায় নাই। 

-না না চাচা, আমি কিচ্ছু খাবনা। শাবানার দিকে তাকিয়েই মঞ্জু বলে। এতদিনে মঞ্জুও বুঝে গেছে যে চাচা অনেক কিছু দেখেও দেখেনা। তাছাড়া প্রায়দিন চাচার বায়না মত এটা সেটা এনে দিয়ে সে কিছুটা অধিকার অর্জন করেছে বলে মনে করে। উভয়ে উভয়ের দুর্বলতার সুযোগ নেয় ভালমতই। এভাবেই দিন চলে। 

খোঁয়াড়ির বাড়িটি রেললাইনের পাশেই। এর আশপাশের সব-ই নাকি রেলের জায়গা জমি। ছোট্ট বাড়িটি ভাঙাচোরা টিন দিয়ে ঘেরা। শ্যাওলা ধরা পাকা দেয়াল, উপরে জং ধরা টিন। বাড়ির পাশেই একটি বিশাল রেইনট্রি। যেটি ছাতার মত বাড়ির উপরে ছড়ানো। সামনের জায়গাটি ঢোলকলমীর গাছের বেড়ায় ঢাকা। এই ঢাকা জায়গায় বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত খোঁয়াড়ি একটা হাতল ওয়ালা জীর্ণ চেয়ারে বসে থাকে। সামনের একটি টুলে থাকে পানের বাঁটা। সেটাতে পান, সুপারি, চুন, জর্দা পর্যাপ্ত না থাকলে তার মেজাজ সপ্তমে উঠে যায়। সারাদিন সে ছাগলের মত পান চিবায়। মুখে থাকে পান, আঙুলের ফাঁকে বিড়ি। শতায়ু ফ্রেমের গোল চশমার কাঁচ প্রায় সময় ঝাপসাই থাকে বয়সের ভারে অথবা বিড়ির ধোঁয়ায়। 

শাবানা খোঁয়াড়ির ঘরে সত্যি সত্যিই গোবরে পদ্মফুল। উঠতি বয়সের মেয়েদের এমনিতেই একটা ঠমক ঠামক থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে তা নয়, এই মেয়েটি সত্যিকার অর্থেই অপরূপ রূপবতী। যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন ওর রূপের জেল্লা বাড়ছে। আশপাশের মহল্লায়, গঞ্জে, পাড়ায় অনেকের মুখে মুখে খোঁয়াড়ির মেয়ের কথা শোনা যায়। আর কেবল রূপ নয় মেয়েটি গুণবতীও বটে। ঘরের কাম কাজ যা আছে বড়মার সাথে সাথে সেও করে, অসুস্থ্য মায়ের সেবা ভাইবোন গুলোর দেখাশোনা ঘরের হাঁস মুরগি গাছপালার পরিচর্যা সবই করে সারাদিন মুখ বুজে। এই বয়সের মেয়ে কোথায় খেলা ধুলা করবে কলেজে যাবে...তা না করে সে কাজের মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকে, অবশ্য সে এস এস সি পর্যন্ত পড়েছে। এবং ওর স্কুলের শিক্ষক সহ সবাইকে অবাক করে দিয়ে এস এস সি তে সে একটা দারুণ ফলাফলও করেছিল। কিন্তু তারপর খোঁয়াড়ি বলেছে- 

-হইছে থাউক, গরীবের মাইয়া এত স্কুল কলেজ দিয়া কি হইবে! বাড়ির কাম কাজ করলে তো তাও কিছু আগায়। হাঁস মুরগি গাই গরুগুলার দেখাশুনা করলে চাইরটা আয়পয় হয়। কাঁয় যে কত জজ বারিষ্টার হইবে আর আমাক বসি বসি খাওয়াইবে তাতো আমি ভাল করিয়াই জানি। সেদিন থেকেই শাবানার লেখাপড়ার পাট চুকে যায়। তবে ছোট ছোট ভাইবোন গুলি আজও স্কুলে যাওয়া আসা করে। বাপের চোখ এড়িয়ে হুটোপুটিও করে। তাদের যত দুষ্টুমি আবদার সব শাবানাপুর কাছে। এই গেড়িগুগলি ভাইবোন গুলিকে বড্ড মায়া করে শাবানা। আবার ওদের লেখা পড়ার ব্যাপারে সে বেশ সজাগ। পিচ্চিটা ক্লাশে খুব ভালো করে। 

একদিন সন্ধ্যায় অন্যান্যদিনের মতই মঞ্জু এসে হাজির হয়। ততদিনে মঞ্জু ঘরের ছেলের মত হয়ে গেছে। বাজার সদাই যা লাগে খোঁয়াড়ি নির্বিকারভাবে বলে দেয় মঞ্জুও যা পারে এনে দেয়। খোঁয়াড়ির সাথে তো কথা বার্তা হয়ই, এতদিনে সুযোগ বুঝে শাবানার সাথেও তার সম্পর্ক অনেক সহজ হয়ে এসেছে। কোন কোনদিন উঠানে মঞ্জুর সাথে গল্প করতে করতে খোঁয়াড়ি উঠে ভেতরে চলে যায়। বলে- 

-বাবা এখন যাইওনা, আমি আসতেছি, এই বলে ঘরের ভেতরে চলে যায়। বাপের ইচ্ছে বুঝতে পারে শাবানা কিন্তু ওর কিছুই করার থাকেনা। এভাবেই বছর চলেও যায় আবার ঘুরেও আসে সেসময় খোঁয়াড়ি এক ঘটনা ঘটায়- 

তখন বর্ষাকাল আসি আসি করছে। এই বৃষ্টি, এই রোদ। আর ভয়াবহ কাঁঠালপাকা গরম। সন্ধ্যায় মঞ্জু আসবে জানা কথা। খোঁয়াড়ি আগেই শাবানাকে দিয়ে কিছু চা নাস্তার ব্যবস্থা করে রাখে। সব সময় মঞ্জুকে নিয়ে উঠানে বসলেও সেদিন খোঁয়াড়ি ঘরে বসার আয়োজন করে। শাবানাকে বলে রাখে, মঞ্জু এলে যেন ঘরে পাঠায়। কথামতই সব চলছিল। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। শাবানা আজকাল বাপের উপস্থিতিতেই মঞ্জু ভাইয়ের সাথে কথা বলে। নাস্তা বলতে কিছু ডালের বড়া, মুড়ি মাখা, গাছের আধাপাকা আম আর লাল চা। তাই নিয়ে খোঁয়াড়ির কি আদিখ্যেতা! 

-আরে শাবানা মঞ্জুকে আর কয়টা বড়া দে না, বাবা আর একটু মুড়ি নেও বাবা ... বড়া খুব মজা হইছে! এই ঝড়ি বাইষ্যার দিন এমন ঝাল ঝাল মচমচা বড়া বড়ই সোয়াদ, খাও খাও মচমচা থাকতেই খাও। একটু পরেই কিন্তু লুতা লুতা হইয়া যাইবে, তখন আর খায়া টেছ পাইবা না। শাবানা, মঞ্জুর গ্লাসে পানি দে। 

খাওয়া দাওয়া শেষ হলে চা পান চলছিল। এমন সময় চায়ের কাপ হাতে নিয়ে খোঁয়াড়ি উঠে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। 

-বাবা তুমি একনা বইসো ঝড়ি কমুক পরে যাইও... কি আর এমন রাইত হইছে! বলতে বলতে বাইরে গিয়ে দরোজার পাল্লা টেনে ঝনাৎ করে শেকল তুলে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় মঞ্জু হতবিহবল হয়ে তাকায় শাবানার দিকে। শাবানাও কিছু বুঝে উঠতে পারেনা। সে দৌড়ে গিয়ে দরোজা ধরে টেনে দেখে সত্যিই দরোজা বাইরে থেকে বন্ধ। শাবানা একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়। সে মঞ্জুর দিকে তাকাতে পারেনা। তার মনে হয়, হে আল্লাহ! এই দুনিয়ায় কারো বাপ কি এমন হয়! শাবানার একেবারে মরে যেতে ইচ্ছে করে। উফ এই মুহূর্তে যদি শাবানা দুম করে পড়ে মরে যেত! সে কি করবে এখন! তবে সেতো তার বাপকে চেনে, অতিদ্রুত সে হিসেব কষে নেয় মনে মনে। চা নাস্তা, ঘরে বসা সব কিছুর গুঢ় অর্থ এখন সে বুঝতে পারে। বুঝতে পারে এটা বাবার পরিকল্পিত একটা চক্রান্ত। সে একবার অসহায় দুচোখ তুলে মঞ্জু ভাইয়ের দিকে তাকায় আর মঞ্জুর চোখে সে খোঁয়াড়ের গরুর অসহায়তা দেখতে পায়। পরে রাত গভীর হলে খোঁয়াড়ির পরিকল্পনামত খবর পেয়ে মঞ্জুর বাবা চাচা এসে খোঁয়াড়ির চাহিদামত টাকাপয়সা দিয়ে রাতারাতিই ব্যাপারটা মিটমাট করে ফেলে। মঞ্জু চলে যাবার সময় অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে শাবানার দিকে তাকায়। দৃষ্টিতে ছিল খোঁয়াড়ির মেয়ের প্রতি ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য। রাগে অপমানে শাবানার ইচ্ছে করে গলায় ফাঁস নিতে। উড়না গলায় পেঁচিয়ে ফাঁস নেয়া কোন ব্যাপার না। রেললাইনের নিচে শুয়ে পড়াও কোন ব্যাপার না। মনে মনে সে ঠিক করে ফেলে কাছের থানার ওসিকে একটা চিঠি দিয়ে এসে সে ঝুলে পড়বে। তখন খোঁয়াড়ি বুঝবে মজাটা। কিন্তু ওর অবর্তমানে ছোট ছোট ভাইবোন গুলা একেবারে ভেসে যাবে। সবচেয়ে বড়কথা ওর বেঁচে থাকতে বড় ভাললাগে। জীবনটা কত সুন্দর! জন্মথেকেই সে রেলগাড়ি দেখেছে কিন্তু কোনদিন রেলগাড়িতে চড়ে নাই। ওর খুব ইচ্ছে একদিন সে তার নিজের মানুষের সাথে এই রেলে চড়ে চলে যাবে আপন ঠিকানায়। ওদের কলেজের ফিজিক্স আপা কি সুন্দর রেলে চেপে কলেজে আসেন। স্টেশন থেকে কলেজ খুব দূর নয় উনি ছোট্ট একটি ছাতা মাথায় হেঁটে হেঁটে কলেজে আসেন। উনাকে শাবানার খুব ভালো লাগে। উনার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে ভালো লাগে। আমার মুক্তি আলোয়... আলোয়... 

পরদিন শাবানা বিছানা থেকে উঠেনা, খায়না, নায়না, কারো সাথে কথা বলেনা। পর পর দুদিন গেলেও যখন সে উঠলনা, বাপের একাধিক ডাক উপেক্ষা করে শুয়ে থাকল, তখন খোয়াড়ি ঘরে ঢুকে মেয়ের চুলের গোছা মুঠো করে ধরে বেদম পেটাতে শুরু করে। আর বলতে থাকে- 

-নাটক শুরু কচ্চিস হারামজাদি! ক্যান তোর কি হইছে! মঞ্জু তোর কি হয়! মঞ্জু কি তোর ভাতার হয়! যাত্রাপালার নায়িকা আসছে! ক্যান বাপে চাইরটা টাকা পাইসা পায় সেটা তুই চাইস না! তোর ক্ষতি কি! তোকে তো কিচ্চু করা লাগে না! যা করার আমিই করি... বাপের সুখ চাইস না, তা চাবু ক্যানে! সব বেইমানের ঝাড়বংশ! জারুয়ার বাচ্চা, এতগুলা মাইনষের ভাত কাপড় আইসে কোনটে থাকি! আজ তোর একদিন কি আমার একদিন...বলেই মেয়েকে গরুর মত মারতে থাকে, একই সাথে গালিগালাজের ফোয়ারা ছোটাতে থাকে... এমন সময় ফণা তোলা ভয়ংকর সাপের মত পেছন থেকে খুব মৃদু কিন্তু কঠিন স্বরে বড় বউ আকলিমা খাতুন হিসহিস করে উঠে, অগ্নিকণ্ঠে বলে- 

-ছাড়েন! অরে ছাড়েন কইলাম! নইলে এই দা দিয়া আজ এক কোপে আপনের কল্লা আমি নামায় দিমু। সেয়ানা মাইয়া, গায়ে হাত তুলেন শরম করেনা! মাইয়াডার কাছে আর কি চান! এ্যা! বিয়ার বয়স হইচে সে নিয়া কোন কতা নাই, মাইডার লেখাপড়াও বন্ধ করি দিলেন, মাইয়াডার জেবন শ্যাষ করি দেওচেন ফির অকে ধরি মারোচেন! আপনে কি মানুষ! যাত্রাপালা তো আপনে শুরু কচ্চেন! মাইয়ারে যাত্রার নটি বানাইচেন! সেই নটির কামাই দিয়া দিনরাত মদ গেলেন! মদারু! মাতাল! ছ্যাব দেই আপনের মুখে! ওয়াক থু! খোঁয়াড়ি পেছন ফিরে দেখে গরুর বিচালি কাটার ধারালো দা মাথা থেকে মাত্র এক বিঘৎ দূরে লকলক করছে। সে আকলিমাকে চেনে। ছোটখাটো গড়নের সর্বদা এক বিঘত ঘোমটার আড়ালের এই নারী সব পারে। এই দন্ডে শাবানারে ছাইড়া না দিলে কল্লায় কোপ দিতে তার এতটূকু হাত কাঁপবেনা। সে শাবানাকে ছেড়ে দিয়ে ঘর থেকে সুড়সুড় করে বের হয়ে যায়। 

মঞ্জুর ঘটনাটা ছিল এমন ঘটনার শুরু। এরপরে এমন আরো ঘটনা বেশ ক’বার বেশ ক’জনের সাথে সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছে সে। খুব ঘন ঘন সে এমন করেনা, এসব হিসেব নিকেশে সে শেয়ালের মত ধূর্ত। এসব কথা মানসম্মানের ভয়ে কেউ কাউকে বলে না। তাই জানাজনিও হয়না। এই সুবর্ণ সুযোগ খোঁয়াড়ি বারবার ব্যবহার করে। এসব ঘটনায় সে বেশ মোটা অংকের টাকা পায় এবং সে আবার তার পুরনো অভ্যাসমত বাংলামদ এনে তাতে ডুবে থাকে। বাড়িতে এত গুলো মানুষের খাদ্য খোরাক আছে কি নেই, মেয়েটি বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে, সে চেষ্টা নেই, সে থাকে নিজের মত। 

শাবানা আর খোঁয়াড়, আয়ের এই দুই উৎস নিয়ে আজকাল খোঁয়াড়ি বেশ ভালো দিন কাটায়। বাংলায় ডুবে থাকে বাংলায় সাঁতার কাটে। এখন ফসলের মৌসুম, প্রচুর গরু ছাগল খোঁয়াড়ে আসে, সেই সাথে খোঁয়াড়ির রসদও আসে। 

** 

এর পর কিছুদিন থেকে আবার সে খাতির জমিয়েছে হিন্দু পাড়ার ভুবন মাষ্টারের ছোটছেলে টুবলুর সাথে। এই মাষ্টার মশাইয়ের স্কুলে পড়েছে শাবানা। টুবলুদা শাবানার স্যারের ছেলে। এই স্যার শাবানাকে খুব আদর করত। সবসময় বলত কোন অবস্থাতেই পড়াশোনা ছাড়বা না। তোমার ব্রেইন খুব শার্প, অসুবিধা হলে আমার কাছে আসবা। স্যারের ছেলের প্রতি তার অন্যরকম একটা সমীহ ভাব কাজ করে। মঞ্জু ভাইয়ের পর রাজিব দা গেছে, গেছে বকুল ভাই এবারের শিকার এই টুবলু। 

এবারে শাবানা অনেক পরিণত, সাহসী। ক্রমশ এই নোংরামির বিরুদ্ধে ওর মন বিদ্রোহ করে উঠে। ধীরে ধীরে বাপের শক্তির বিপরীতে সে ভয়, সংশয় কাটিয়ে মনে মনে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। বাপের বিরুদ্ধে মনে জমে ওঠে ক্রোধ, ঘৃণা, ক্লেদ। সকলের অজান্তে সে প্রতিবাদের রাস্তা খোঁজে। কি করলে এসব বন্ধ করা যায় আর এমন বাপকেও শায়েস্তা করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে থাকে। ওর কোলের ভাইটি এখন আর ছোট্টটি নেই সেও বড় হয়েছে। বোনের ব্যাপারগুলি সেও বোঝে। শাবানা ওর ভাই আর মা মিলে বসে বসে এ নিয়ে বুদ্ধি পরামর্শ করে। মায়ের পরামর্শে সে ছোট ভাইয়ের সাথে কলেজে ভর্তি হয়েছে। বাপের ভয়ে কলেজে না গেলেও বাড়িতে বসে বসে সে একটা জিদ নিয়ে লেখাপড়া করে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে। কঠিন সাবজেক্ট গুলি টুবলুদা প্রায় সময় দুভাইবোনকে দেখিয়ে দেয়। টুবলুদা সম্পুর্ন অন্যরকম একজন মানুষ। সে অন্য কারো মত নয়। টুবলুদা শহরের নামকরা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। একটু একটু করে শাবানার বাপের ব্যাপার গুলো বোঝার পরও সে এবাড়িতে আসে। আসে কেবল শাবানার জন্য। শাবানার মা ওর ছোট ভাই শহিদ সবার সাথে টুবলুর ভাল সম্পর্ক। সবচেয়ে যে ব্যাপারটা টুবলুকে বিস্মিত করে, তা হচ্ছে শাবানার মেধা। আশ্চার্য্য মেয়েটি! ইলাভেন ক্লাশের ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ বুঝিয়ে দিলেই বুঝে যায়। শহিদের কাছে সব বেড়াছেড়া লাগলেও শাবানার কাছে পরিষ্কার। 

টুবলুকে নিয়ে খোঁয়াড়ি পুরনো নাটকের আবার মঞ্চায়ন করতে যাচ্ছে এটা শাবানা আগেই টের পেয়েছিল। আজকাল আর শাবানা ওর বাপকে এতটুকু ভয় পায়না, কেবল যখন চুল ধরে মার শুরু করে তখন সেটা অসহ্য লাগে। আর মারের চেয়েও অসহ্য লাগে কিছুদিন পর পর এক এক জনকে বড়শিতে গেঁথে ফেলা। বড়শির টোপ হতে শাবানার আর ভাল লাগেনা। সে আর টোপ হবে না। 

মঞ্জু ভাই সেইযে চলে গেছে আর কোনোদিন তার ছায়াও দেখা যায়নি। কিন্তু তার সেই ঘৃণাভরা চোখের দৃষ্টি শাবানা ভুলতে পারেনা। অপরাধী না হয়েও নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। 

** 

নখ খুঁটা বন্ধ করে শাবানা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। সোজাসুজি টুবলুর ভয়ে, বিস্ময়ে, রাগে অগ্নিশর্মা হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে খুব সহজ ভাবে বলে- 

-টুবলুদা ভয় পেওনা, মাথা ঠান্ডা রাখ- বাইরে মা ও শহিদ আছে ... 

তোমার সাইকেল খোঁয়াড়ের ভেতর জবাগাছের নিচে রাখা আছে, সেটা নিয়ে সাবধানে জলদি চলে যাও। বাবা তোমাদের বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই তুমি পৌঁছে যাবা। তোমাকে দেখে আমার বাপজানের মুখটা কেমন হয় দেখতে পারলে বেশ হত, ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি নিয়ে বলে সে। টুবলু খুব অবাক দৃষ্টিতে সামনের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে। এক্ষুনি বাবা দাদা জানতে পারবে। তারপর কিযে ভয়াবহ কান্ড হবে! ঠান্ডা মাথার ছেলে টুবলু ঠান্ডা দৃষ্টিতেই শাবানার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও মনে হয় এই মেয়ে কোন মানুষ নয়! পরীর দেশের পথা হারানো এক পরী, পথ হারিয়ে সে এই স্যাঁতস্যাঁতে জীর্ণ ঘরে এসে পড়েছে গোবরে কমল কথাটির সার্থকতা আনতেই। কিন্তু কি বলে এই মেয়ে! সে একা চলে যাবে! ফিজিক্স কেমিস্ট্রির মত শক্ত বিষয়গুলি সহ দুনিয়ার এতকিছু সে বোঝে আর এটা বোঝেনা যে একে ছাড়া টুবলুর চলবে না... 

হাত বাড়িয়ে সে শক্ত করে অনিবার্য হাতটি ধরে... তারপর 

ভেজা রাতের ঘন অন্ধকারে জোনাকির মত দুটি ছেলেমেয়ে নিজেদের পথে মিলিয়ে যায়। 




লেখক পরিচিতি
কাজী লাবণ্য
গল্পকার।
ঢাকায় থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন